৪৭
দু’দিন পরেই বিদায় নেবে ঘটনাবহুল ১৭৫৭ সাল। শুভাগমনের অপেক্ষায় ১৭৫৮।
সন্ধে নেমেছে। আজ জাঁকিয়ে পড়েছে ঠান্ডা। কুয়াশা নেমে এসেছে মাটির বুকে। গাছের পাতা থেকে মাটিতে জল ঝরে পড়ার টুপটাপ শব্দে মুখর রাজমহলের এই নির্জন প্রান্তর। অনুচ্চ এক টিলার পাদদেশে ইংরেজ শিবিরের সারি সারি তাঁবুর মাঝে চলাচলের পথে বাতিস্তম্ভে জ্বলছে মশালের আলো। টিলার উপরে কর্নেল ক্লাইভের তাঁবু। কুয়াশায় আবছা। তাঁবুর সামনে লোহার দণ্ড থেকে ঝুলিয়ে রাখা বুলস আই লণ্ঠনের আলো কুয়াশায় ঘোলাটে।
নব মুনশির সন্ধানে টিলার ঢাল বেয়ে দ্রুত উপরে উঠছিল স্ট্রন। দেখা হয়ে গেল পথেই।
ক্লাইভের তাঁবু থেকে বেরিয়ে আলোয়ানে মাথা মুড়ে দ্রুত নেমে আসছিলেন নবকৃষ্ণ। পাটনার নায়েব রামনারায়ণের উদ্দেশে লেখা একটা চিঠির তর্জমা করতে হবে। কর্নেলের ফরমায়েশ। কাজটা জরুরি। আগামি কাল সকালেই চিঠিটা নিয়ে ক্লাইভের দূত রওনা হবে পাটনার পথে।
‘মুনশিজি।’ স্ট্রনের গলায় ঝরে পড়ে উদ্বেগ।
থমকে দাঁড়িয়ে নবকৃষ্ণ বলেন, ‘আরে বডি গার্ড সাহেব যে। সারাদিন ছিলে কোথায়? সকাল থেকে টিকিটির দেখা নেই। দুপুরে ভাবলাম একহাত শতরঞ্জ খেলব। কোথাও দেখা পেলাম না তোমার। তা এমন হন্তদন্ত হয়ে চলেছ কোথায়? উপরে? কর্নেল এখন খুবই ব্যস্ত। মিটিং চলছে।’
‘শুনলাম আপনি সাহেবের তাঁবুতে গিয়েছেন। আমি আপনার খোঁজে যাচ্ছিলাম মুনশিজি। একটা কথা—’ কিছু বলতে গিয়ে থমকে যায় স্ট্রন। উদ্ভ্রান্তের মতো তার চেহারা।
খটকা লাগে নবকৃষ্ণর মনে। তিনি শুধোলেন, ‘কী হয়েছে?’
একবার মরিয়া চোখে নবকৃষ্ণর মুখপানে একবার চেয়ে ফের চোখ নামিয়ে নেয় স্ট্রন।
‘গোল পাকিয়ে এসেছ কোথাও?’ প্রশ্ন করেন নবকৃষ্ণ।
‘আপনার থোড়া মদত চাই মুনশিজি।’
‘সে তো তোমার মুখ দেখেই বুঝতে পারছি। তা কী হয়েছে সেটা বলবে তো?’
‘একবার আমার তাঁবুতে আসুন। জলদি।’
অবাক হন নবকৃষ্ণ। ‘তোমার তাঁবুতে? এখন?’
‘হুঁ। বহুত জরুরি বাত।’
‘এখানে দাঁড়িয়ে বলা যায় না? কর্নেল মেলা কাজ দিয়েছেন। বড্ড হুড়োতাড়ার মধ্যে আছি।’
কাতর মিনতি করে স্ট্রন, ‘প্লিজ একবার আসুন আমার টেন্টে।’
কী এমন জরুরী বিষয় যে এখানে দাঁড়িয়ে বলা যায় না, তাঁবুতে তাঁকে নিয়ে যাওয়ার জন্য জোরাজোরি করছে স্ট্রন। ধন্দে পড়ে নবকৃষ্ণ বললেন, ‘বেশ। চলো।’
তাঁবুতে ঢুকে নবকৃষ্ণ বলেন, ‘বলো কী ব্যাপার?’
‘এদিকে আসুন।’
নবকৃষ্ণর কৌতূহল বাড়তে থাকে।
পাশাপাশি দুই কামরাওয়ালা তাঁবু। মাঝে মোটা অস্বচ্ছ কানাতের দেওয়াল।
পাশের ঘরের দরজার পর্দা সরিয়ে ভিতরে উঁকি দিয়ে নবকৃষ্ণ চমকে ওঠেন।
উলটো দিকে মুখ ফিরিয়ে চৌপাইয়ের উপরে বসে রয়েছে এক যুবতী। পরনে মলিন একখানা কাপড়। গায়ে জড়ানো একখানা চাদর। কোমরের কাছ পর্যন্ত নেমে এসেছে মাথা ঠাসা এলো চুল। দেহের গড়নে স্পষ্ট যৌবনের জলুস।
পলাশির যুদ্ধের পরে ইংরেজ বাহিনীর গোরা পল্টন ও দেশি সেপাইদের হাতে এসেছিল নগদ টাকা। তাতে সেনাবাহিনীর নিয়মকানুন একেবারে ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়। মদ ও মেয়েমানুষের নেশায় উচ্ছৃঙ্খল হয়ে পড়ে সেনারা। টাকার গন্ধে সেনা ছাউনির আশেপাশে মাছির মতো ভন ভন করতে শুরু করে দালালের দল। নিত্য দিশি গণিকাদের আনাগোনা শুরু হয় চন্দননগরের ইংরেজ ক্যাম্পে। সেই সঙ্গে অঢেল দিশি মদের জোগান। সে এক চূড়ান্ত বেলেল্লাপনা। রোজ রাতেই হইচই, চিৎকার, চেঁচামেচি এমনকি গণিকার দখল নিয়ে নিজেদের মধ্যে হাতাহাতি মারামারি পর্যন্ত। ক্লাইভ বিরক্ত হয়ে হুকুম জারি করেন, ইংরেজ সেনা ছাউনিতে কোনও জেনানা যেন প্রবেশ না করে। এর পরে কেউ যদি সেনা ছাউনির অন্দরে মেয়েমানুষ নিয়ে ফূর্তির দায়ে অভিযুক্ত হয় তো তাকে কোর্ট মার্শালের মুখোমুখি হতে হবে। এই হুকুমের পর থেকে পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আসে।
নবকৃষ্ণ জানেন, গ্রাহাম স্ট্রন অন্য ধাতের যুবক। খানিকটা ভাবুক প্রকৃতির। মদের প্রতি ঝোঁক থাকলেও সেই বজবজের ঘটনার পর থেকে মদের নেশায় কখনও মাত্রা ছাড়িয়ে বেলেল্লাপনা করেনি। নারীসঙ্গের আকুতি তার নেই। কিন্তু হঠাৎ তার হল কী? কর্নেলের আদেশ অমান্য করে ভর সন্ধেবেলা কোথা থেকে একটা সোমত্থ মেয়েমানুষকে নিয়ে এসে তুলল নিজের তাঁবুতে?
ঘরের পর্দা নামিয়ে দিয়ে অবাক হয়ে নবকৃষ্ণ শুধোলেন, ‘কী ব্যাপার বলোতো? কে এ?’
স্ট্রন বোকার মতো হাসি মুখ করে বলে, ‘অ্যা ইয়ং গার্ল।’
‘চোখের তো আর মাথা খাইনি হে বাপু। গার্ল তো দিব্যি বুঝতে পারছি। কিন্তু কে এ?’
‘হার নেম ইজ বিদ্যা।’
‘কোত্থেকে জোটালে?’
‘জঙ্গলে ঘুরতে গিয়ে দেখতে পাই।’
‘অ্যাঁ? জঙ্গলে?’ ভয়ানক অবাক হন নবকৃষ্ণ।
‘অচানকই দেখা পাই। বড় মুসিবতের মধ্যে পড়েছে ও।’
হতভম্ব হয়ে স্ট্রনের মুখপানে চেয়ে থাকেন নবকৃষ্ণ।
‘পরে সব বলব আপনাকে।’
চিন্তিত মুখে নবকৃষ্ণ বলেন, ‘সে না হয় বললে, আমি ভাবছি অন্য কথা। এক জেনানাকে নিজের তাঁবুতে এনে তুলেছ? কর্নেলের হুকুমত ভুলে মেরে দিয়েছ নাকি?’
‘না। দ্যাটস হোয়াই আই অ্যাম সিকিং ফর ইওর হেল্প।’
‘উরিব্বাপ। এ যে দেখছি আমার গর্দান নেওয়ার আনজাম করছ।’
স্ট্রন মরিয়া হয়ে বলে, ‘স্রেফ মজা লোটার জন্য এই লেড়কিকে আমি ক্যাম্পে নিয়ে আসিনি মুনশিজি। হার স্টোরি উইল ব্রিং টিয়ারস টু ইওর আইজ।’
‘সেরেছে। এ যে দেখছি গভীর জল।’
‘মতলব?’
‘ডিপ ওয়াটার। আশনাই-মহব্বতের ব্যাপার স্যাপার। তাই তো?’
লাজুক হাসি হেসে নবকৃষ্ণর ঘনিষ্ঠ হয়ে স্ট্রন চাপা গলায় বলে, ‘সহি আন্দাজ করেছেন মুনশিজি। ফলেন ইন লাভ উইথ হার।’
নবকৃষ্ণ মনে মনে বললেন, এদেশি মেয়েমানুষ নিয়ে তোমাদের যে রঙিন আদিখ্যেতা বিগত এক বছর ধরে দেখলাম সাহেব, তাতে মা সরস্বতীর একটু কৃপা পেলে রায়গুণাকরের ঢঙে আর একখানা বিদ্যাসুন্দর কাব্যি লিখে নাম কিনতে পারতাম। মুখে বললেন, ‘কৃষ্ণ কৃষ্ণ। জয় গোবিন্দ।’
স্ট্রন ফের শুধোল, ‘মতলব?’
‘ওই আমার ভগবানকে একটু স্মরণ করলাম। তোমার পাল্লায় পড়ে গর্দানখানা না যায়।’
শূন্যে দৃষ্টি ভাসিয়ে স্ট্রন বলে, ‘প্রে টু গড মুনশিজি, লেট বিদ্যা রিচ ক্যালকাটা সেফলি।’
আঁতকে উঠলেন নবকৃষ্ণ, ‘অ্যাঁ? কলকাতা?’
‘শি লিভস দেয়ার। ওকে কলকাতা পাঠানোর একটা উপায় করে দিন মুনশিজি।’
‘এ যে আমাকে ভয়ানক ঝকমারির মধ্যে ফেললে সাহেব।’
নবকৃষ্ণর হাতদুটো ধরে স্ট্রন বলে, ‘আপনি ছাড়া গতি নেই।’
‘সাহেব তুমি ভোলেভালা লোক। মহব্বতের দরিয়ায় নাও ভাসিয়েছ। ভালো-মন্দ বোধ এখন তোমার নেই। দাঁড়াও এ মেয়েকে একটু বাজিয়ে দেখি। এ ঘরে ডাকো একবার।’
দ্রুত পাশের ঘরে চলে যায় স্ট্রন। খানিকবাদে তার পিছু পিছু ঘরে এসে ঢোকে বিদ্যা। গায়ে জড়ানো চাদরখানা ঘোমটার মতো করে মাথার উপরে তোলা। বিদ্যা জড়োসড় হয়ে দাঁড়ায়।
বিদ্যাকে আপাদমস্তক জরিপ করে নবকৃষ্ণ শুধোলেন, ‘তুমি কে গো মেয়ে?’
‘বিদ্যা। বিদ্যাধরী দাসী।’
‘নামটাতো সাহেবের মুখেই শুনেছি।’
‘আর কী জানতে চান বলুন?’
‘মুখের উপর অমন ঘোমটা টেনে রাখলে কি কথা কওয়া যায়?’
মাথার উপর থেকে আবরণ সরায় বিদ্যা। চমকে ওঠেন নবকৃষ্ণ। এ যুবতী যে দিমাগ বিগড়ে দেওয়ার মতো সুন্দরী। স্ট্রনের আর কসুর কী?
নবকৃষ্ণ শুধোলেন, ‘ঘর কোথায় তোমার?’
‘কলকাতার কাছেই। বরানগরে।’
‘কোন বাড়ি?’
‘বাবু রতন সরকারের হাভেলি। কলকাতায় রূপ বেচতাম বাবু। আপনারা যাকে বলেন কসবি।’
বিদ্যার কথার ভঙ্গিতে ফুটে ওঠে অন্তরে প্রচ্ছন্ন যন্ত্রণা। ছলছল করে ওঠে চোখদুটো।
‘সাহেবকে বলেছ সব কথা?’
‘হুঁ।’ আনত চোখে কথাটা বলে বিদ্যা।
‘তা তোমার রতনবাবু কোথায়?’
‘জানি না।’
‘জানো না মানে?’
‘সে অনেক লম্বা কহানি বাবু। আপনি ব্যস্ত মানুষ। ক্লাইভ সাহেবের মুনশি। আমার কহানি শোনার ফুরসত কী হবে আপনার?’
নবকৃষ্ণ লক্ষ করলেন, মহাকবি কালিদাস বর্ণিত নায়িকাসুলভ গ্রীবা ভঙ্গিমা করে করুণ মুখে কথাটা ছুড়ে দিল বিদ্যা। সে মুখের দিকে চাইলে কোনও পাষাণ হৃদয়েও করুণার সঞ্চার হতে বাধ্য। বাতচিতে তুখোড় নবকৃষ্ণও কেমন যেন অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন। থতমত খাওয়া ভাবটা গোপন করে নবকৃষ্ণ বললেন, ‘তা তুমি ঠিকই আন্দাজ করেছ মেয়ে। অত সময় এখন আমার হাতে নেই।’
‘আপনাকে সব খুলে বলব মুনশিজি।’ মরিয়া হয়ে বলে স্ট্রন।
‘আতান্তরে পড়ে নব মুনশির স্মরণ যখন নিয়েছ, তখন গতি একটা হয়ে যাবে।’
‘হয়ে যাবে? বলছেন?’ স্ট্রন উল্লসিত হয়ে ওঠে।
বিদ্যার মুখে জমাট বাঁধে আশার আলো।
নবকৃষ্ণ বলেন, ‘কাল কাকভোরে কর্নেলের একখানা চিঠি নিয়ে কাশিমবাজারের উদ্দেশে রওনা হবে একখানা বজরা। তাতেই না হয় তুলে দিও তোমার পিয়ারিকে। কাশিমবাজারের কাজ সেরে বজরাখানা যাতে কলকাতা যায়, সে বন্দোবস্ত করে দিচ্ছি।’
আবেগে নবকৃষ্ণকে জড়িয়ে ধরে স্ট্রন বলে, ‘আই উইল বি ফর এভার ইনডেটেড টু ইউ।’
বিদ্যা এগিয়ে এসে ভূমিতে আনত হয়ে প্রণাম করে নবকৃষ্ণকে।
স্ট্রন বলে, ‘চলুন মুনশিজি, আপনাকে এগিয়ে দিয়ে আসি।’
‘এসো সাহেব। মাঝিমাল্লাদের সঙ্গে কথা বলে সব কিছু এখনই বুঝে নাও।’
পথ হাঁটতে হাঁটতে বিদ্যার কাহিনি নবকৃষ্ণকে সংক্ষেপে বলে স্ট্রন।
সব শুনে নবকৃষ্ণ বলেন, ‘সবই গোবিন্দের ইচ্ছে। বুঝলে সাহেব। না হলে এ মেয়ের সঙ্গে তোমার অচানক ওভাবে দেখা হওয়ার তো কথা নয়।’
স্ট্রন লাজুক হাসি হাসে।
নবকৃষ্ণ হঠাৎ বললেন, ‘কর্নেলের কানে একবার তুলতে হবে বিষয়টা।’
সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে স্ট্রন। বলে, ‘দেন আই উইল বি অ্যাকিউসড ফর ভায়োলেটিং হিজ অর্ডার।’
মুচকি হেসে নবকৃষ্ণ বলেন, ‘ও নিয়ে তুমি ভেব না। কথা পাড়ার কায়দা আছে। কর্নেল অবুঝ নন। ঠিক মতো বুঝিয়ে বলতে পারলে তিনি বুঝবেন সবই।’
তবুও সন্দিহান চোখে নবকৃষ্ণর মুখ পানে চেয়ে থাকে স্ট্রন।
‘ভয় নেই রে বাপু, ভয় নেই। কর্নেলকে সব খুলে না বললে, পাহারা বাড়ানো যাবে না। আর পাহারা মজবুত না হলে তোমার কান্ট্রি গার্ল বেহাত হয়ে যেতে পারে। দিনকাল ভালো নয়। যে রমণীরত্ন তুমি জঙ্গল ছেঁচে ঘরে এনে তুলেছ, দিমাগ বিগড়ে দেওয়ার মতো রূপ তার। তোমার পাকা নজর সাহেব। নবাব বাদশারা এ মেয়ের সন্ধান পেলে নির্ঘাত হারেমে নিয়ে তুলত। তোমার বহেরা বনার কারণটা বুঝি। পরে কর্নেল ডেকে পাঠালে নিজের মুখেই সব খোলসা করে বোলো।’
এবারে প্রাণ খুলে হেসে ওঠে স্ট্রন। সে হাসিতে খুশি, সংকট থেকে পরিত্রাণের আনন্দ সব কিছু মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।
.
পাটনা দুর্গের খাস দরবার ঘরে বসে চিঠিটায় চোখ বুলিয়ে ভয়ে রীতিমতো কাঁপতে থাকেন রামনারায়ণ। তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে আছেন গোবিন্দমল্ল। নবাব মিরজাফরের দূত।
নবাব লিখেছেন ‘…টাকা-কড়ির হিসেব-নিকেশ সব তৈয়ার রাখুন। খুব শিগগিরই রাজমহল থেকে পাটনার উদ্দেশে আমি রওনা হব। বিরাট ফৌজ নিয়ে আমি আসছি। কর্নেল ক্লাইভও তার বাহিনী নিয়ে আসছেন আমার সঙ্গে। কোনও গোলমাল কাজিয়া আমি চাই না। আশা করি এবারে কুরসি ছেড়ে দেবেন আপনি। আমার ভাই মিরকাজিমের নামে ফের পাটনার নায়েবগিরির পরোয়ানা ফের জারি হয়েছে। পাটনার সুবাদারের পদে মিরনকে আমি নিয়োগ করেছি। আপাতত পাটনার দায়দায়িত্ব আপনি মিরকাজিমকে বুঝিয়ে দেবেন। নবাবের সঙ্গে গদ্দারি করার খেসারত দিতে হবে আপনাকে…’
বাঁশপাতার মতো কাঁপছে রামনারায়ণের হাতে ধরা চিঠিটা।
অসহায় গলায় রামনারায়ণ শুধোলেন, ‘আমার কী কসুর হল জাসুসজি?’
‘কী বলব বলুন, নবাবের খায়েশ।’ গোবিন্দমল্লের মুখে মুচকি হাসির আভাস।
‘এ তো জুলুম। জবরদস্তি। এতো কাল নিজামতের সেবা করে শেষে এই ইনাম?’
‘গদ্দারির ইলজাম আছে আপনার নামে।’
‘একথা বিশ্বাস করেন আপনি? আপনি জাসুস। সব খবরই তো রাখেন।’
‘নবাব বিশ্বাস করেন এটাই বড় কথা।’
‘বেশ। এই জুলমাত মানব না আমি।’
‘কী করবেন?’
‘লড়াই। নবাবকে জানিয়ে দেবেন রামনারায়ণ জিন্দা থাকতে পাটনার কুরসি ছাড়বে না।’
‘বেশক জানাব।’ মুচকি হেসে জেবের ভিতর থেকে একটা কাগজ বের করেন গোবিন্দমল্ল।
উত্তেজিত রামনারায়ণ বলে চলেন, ‘রাজমহল থেকে পাটনায় আসার পথে যত সেতু আছে সব ভেঙে গুঁড়িয়ে দেব আমি। দেখি নবাব কী করে ফৌজ নিয়ে পাটনায় ঢোকেন।’
‘শান্ত হোন হুজুর। এই চিঠিটা পড়ে দেখুন।’
গোবিন্দমল্লের কথা শুনে বিস্ফারিত চোখে রামনারায়ণ শুধোলেন, ‘আবার কোন চিঠি?’
‘কর্নেল ক্লাইভ আপনাকে লিখেছেন। মনে হয় খুশখবর। পড়ে দেখুন।’
দ্রুত গোবিন্দমল্লের হাত থেকে চিঠিটা নিয়ে চোখের সামনে মেলে ধরলেন রামনারায়ণ। তাঁর মুখে ফুটে উঠল হাসি। সে হাসি ক্রমশ চওড়া হতে লাগল।
ক্লাইভ লিখেছেন, ‘…আমি নবাবের সঙ্গে পাটনায় আসছি। তবে ঘাবড়াবেন না। পাটনার কুরসিতে আপনিই বহাল থাকবেন। আমি তার জামিনদার থাকলাম। আয়ারকুটের মুখে আপনার সব কথা শুনেছি আমি। আমার উমিদ আপনি পাটনায় থাকলে সুবে বাংলা সালামত থাকবে। তবে একটা কৌশল করতে হবে আপনাকে। নবাব পাটনার কাছাকাছি পৌঁছে গেলে আপনি এগিয়ে এসে তাঁকে ওয়েলকাম জানাবেন। মাস্ট শো ইওর অ্যালেজিয়েন্স টু নবাব। ভয় পাবেন না। আপনাকে সালামত রাখার দায়িত্ব আমার। খুব শিগগিরই দেখা হবে।…’
পিরানের জেবের ভিতরে চিঠিটা চালান করে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন রামনারায়ণ।
‘জয় সিয়ারাম। জয় বজরংবলী।’
গোবিন্দমল্ল বললেন, ‘মালুম হচ্ছে পয়গাম খুশির।’
‘বিলকুল। আমি ভেবেছিলাম কর্নেল আমার বরবাদি চান।’
‘প্রথমে তাই চাইতেন। তার ভুলটা ভাঙিয়ে দিয়ে গিয়েছেন আয়ারকুট সাহেব।’
‘হ্যাঁ। ক্লাইভ সাহেব খুদ চিঠিতে লিখেছেন সে কথা।’
মাথা ঝুঁকিয়ে গোবিন্দমল্ল বলেন, ‘আমার ইনাম?’
‘জরুর মিলবে ইনাম।’ এই বলে ডোরিতে টান দিলেন রামনারায়ণ।
.
গুম মেরে আছেন মিরজাফর খাঁ। হতাশা ভুলতে শরাবের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন। রাজমহল থেকে পাটনা আসার পথে ক্লাইভ তাকে বুঝিয়েছেন, পাটনার কুরসিতে রামনারায়ণকে রেখে দেওয়াই ভালো। এতে সুবে বাংলা সলামত থাকবে। ক্লাইভ স্পষ্টতই জানিয়ে দিয়েছেন এই ওয়াক্তে লড়াই ঝামেলা কিছুই তিনি চাইছেন না। কলকাতায় ফেরার তাড়া আছে তাঁর। তাঁকে একবার মাদ্রাজে যেতে হতে পারে।
মিরজাফর উত্তেজিত হয়ে বারবার বোঝানোর কোশিশ করেছিলেন, ‘রামনারায়ণ গদ্দার।’
‘সাবুত কোথায়? দেওয়ানজির নামেও তো একই ইলজাম ছিল।’
এ কথা শুনে রাগে ও অপমানে মিরজাফরের সর্বাঙ্গ জ্বলে উঠেছিল। সাবুত! তিনি সুবে বাংলার নবাব, তাঁর কথার কোনও দাম নেই? সাবুত-সহ তাকে গুজারেশ করতে হবে সব কিছু? ক্লাইভের মুখের উপরে এ কথা ছুড়ে দিতে পারেননি নবাব।
ক্লাইভ হাসিমুখে ফের বলেছিলেন, ‘আমি আপনার ভালাই চাই।’
ভালাই? খালি হাতে পাটনা থেকে ফিরে গেলে কী ভালো হবে তাঁর? টাকার অভাবে তিনি চোখে অন্ধকার দেখছেন। ভেবেছিলেন রামনারায়ণের দৌলত দখল করবেন। মিরজাফরের মনে হয়েছিল চিৎকার করে বলে ওঠেন, রামনারায়ণের টাকাকড়ি নিজের হেফাজতে নিতে পারলে তো ভালাই হতো আপনাদেরও। আপনাদের বকেয়া সহি ওয়াক্তে মিটিয়ে দিতে পারতাম।
না, একথাও ক্লাইভকে বলতে পারেননি মিরজাফর খাঁ। ক্লাইভের বলিষ্ঠ দুই হাত যেন গলায় চেপে বসে রুদ্ধ করে দিয়েছে কণ্ঠস্বর।
রায়দুর্লভ, রাজারাম, রামনারায়ণ সকলেই সহি সালামত রয়ে গেল। কারণ কর্নেল ক্লাইভ চান না এদের বরবাদি। ভিতরে ভিতরে রাগে ফুঁসতে থাকেন নবাব। তাঁকে গুম মেরে বসে থাকতে দেখে ক্লাইভ বলেন, ‘আপনি চিঠি লিখুন রামনারায়ণকে। পাটনা শহরে ঢোকার আগেই তিনি যেন নিজে এসে আপনাকে তসলিম জানান। মসনদের প্রতি অ্যালেজিয়েন্স দেখিয়ে যান।’
মিরজাফর মসনদে বসার পর পার হয়ে গেল ছয় মাস, কিন্তু এখনও তাঁর প্রতি আনুগত্য জানাননি রামনারায়ণ। একাধিকবার নবাবের হুকুমত ইনকার করেছেন। পাঠাননি নজরানা। কোন ভরসায় তাঁকে ফের এমন চিঠি লিখবেন নবাব? ফের একবার বেইজ্জত হওয়ার জন্য?
মিরজাফর বলেছিলেন, ‘রামনারায়ণ বেতমিজ। নবাবের হুকুম তিনি মানবেন না।’
ক্লাইভ বলেন, ‘আমার মনে হয় এ আপনার ভুল ধারণা।’
অগত্যা ক্লাইভের প্রস্তাব মেনে নিয়ে গোবিন্দমল্লের হাত দিয়ে ফের একটা চিঠি পাঠিয়ে দিলেন নবাব। তার জবাব এখনও আসেনি।
মানসিক অশান্তিতে তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে মিরজাফরের মন। ক্লাইভের খায়েশের কাছে বারবার পরাজয়ে আশমান সমান ঠেলে ওঠা নবাবের অহংবোধ গুঁড়িয়ে মিশে যাচ্ছে জমিনে। মিরজাফরের মনে হচ্ছে পরিণতি এমন হবে বুঝলে কখনোই তিনি নবাব হওয়ার প্রস্তাবে রাজি হতেন না।
মসনদে বসে মিরজাফর ভেবেছিলেন, তার খায়েশে চলবে দুনিয়া। কিন্তু আজ তিনি ক্লাইভের ইচ্ছের গোলাম। দুঃসহ এই পরিস্থিতি। কিন্তু ক্লাইভকে অগ্রাহ্য করে ঘুরে দাঁড়ানোর মুরোদ নেই তাঁর। কারণ ভয়। দহসত। একদিকে বর্গি, আরেকদিকে অযোধ্যার নবাব সুজাউদ্দৌলা। আক্রান্ত হলে ক্লাইভ ও তার গোরা পল্টনই যে ভরসা। জ্বালা জ্বালা। অসহ্য জ্বালা। অন্তর্দাহে জ্বলছে গোটা শরীর। একদিকে ক্লাইভকে তাঁর প্রয়োজন, অন্য দিকে ক্লাইভের প্রখর ব্যক্তিত্ব ও কূটনীতির চাপে তাঁর আজাদ দিল পিঁজরায় বন্দি পোষা চিড়িয়ার মতো ছটফট করছে। সহসা অস্থির হয়ে ওঠেন মিরজাফর খাঁ। তাঁর সম্বন্ধে মির্জা শামসুদ্দিনের কথাটাকেই কী মনে রাখবে তুজুক?
অবসাদে ডুবছেন নবাব। শরাবই এখন মনের এই তকলিফ দূর করার একমাত্র ইলাজ।
গোবিন্দমল্ল এসে সেলাম ঠোকেন।
নেশায় ঢুলু ঢুলু চোখে শুধোলেন, ‘কী পয়গাম?’
‘হুজুরকে নজর পেশ করতে রামনারায়ণজি এখানে আসবেন।’
ওদিক থেকে কোনও প্রত্যুত্তর নেই। চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকেন গোবিন্দমল্ল। তাকিয়ায় ঠেস দিয়ে কাত হয়ে শুয়ে আছেন নবাব। সামনে পড়ে রয়েছে শরাবের শূন্য পাত্র। নবাবের চোখদুটো বোজা। মাঝে মাঝে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ছে মাথাটা। নবাবের মৃদু নাসিকা গর্জনের আওয়াজ ভেসে এল কানে। মুচকি হেসে গোবিন্দমল্ল ধীর পায়ে কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলেন।
.
