৫
মেজর আয়ারকুট গর্জন করে উঠলেন। ‘হোয়াট ডু ইউ থিংক? ক্যান ইউ ডু হোয়াটএভার ইউ ওয়ান্ট? হোয়াই দেয়ার ইজ কমোশন অল ওভার দ্য সিটি?’
ফারসিতে অনুবাদ করে শান্ত গলায় কথাটা বুঝিয়ে দিলেন ওয়ারেন হেস্টিংস।
মিরজাফর নরম গলায় বললেন, ‘আপনারা ভুল বুঝছেন। আমি এসবের কিছুই জানি না।’
হেস্টিংস বললেন, ‘আপনি মসনদে বসবেন দু’দিন পরে। রাজধানীতে কী ঘটছে তা জানি না বলে তো আপনি জিম্মেদারি এড়াতে পারেন না।’
‘রাজধানীর দেখভালের ভার আমি বেটা মিরনের হাতে দিয়েছিলাম।’
‘হোয়াই ইজ হি মেকিং দ্য সিচুয়েশন সো কমপ্লিকেটেড?’ আয়ারকুটের গলায় বিরক্তি।
হিরাঝিল প্যালেসের দরবার ঘর থমথমে। মাথা নিচু করে বসে রইলেন মিরজাফর।
‘চুনিলাল-মুন্নিলাল কে? তাদের নামে ইতনা শিকায়ত কেন?’ প্রশ্ন করলেন হেস্টিংস।
‘আমার বেটা মিরনের দোস্ত ওরা।’
আয়ারকুট ঘরের মধ্যে পায়চারি করতে করতে বললেন, ‘কর্নেল ক্লাইভ ইজ ভেরি মাচ অ্যানয়েড উইথ অল দিজ আনওয়ান্টেড ট্রাবল্স।’
মিরজাফরের উদ্দেশে শান্ত গলায় হেস্টিংস বললেন, ‘আপনি উড বি নবাব। এভাবে আম আদমির তকলিফ বাড়ালে তারা কি খুশদিলে আপনাকে কুর্নিশ জানাবে? যদি এই শারারতি চলতে থাকে তাহলে কর্নেল আসবেন না মুর্শিদাবাদে।’
চকিতে চমকে উঠে হেস্টিংসের পানে চাইলেন মিরজাফর।
হেস্টিংস বললেন, ‘কাশিমবাজার থেকেই কর্নেল ফিরে যাবেন কলকাতায়। আপনার হয়ে কর্নেল লড়াই করেছেন পলাশিতে। কর্নেলের মদতে সিরাজদ্দৌলাকে হটিয়ে আপনি মসনদে বসতে চলেছেন। আগর আপনার জমানার শুরুয়াতেই যদি মুর্শিদাবাদ বেচ্যায়েন হয়ে ওঠে তার জিম্মেদারি তো কর্নেলের ঘাড়ে এসেও পড়বে।’
আয়ারকুট ধমকে উঠলেন, ‘ইউ ক্যান্ট স্পয়েল দ্য গুড ইমেজ অফ কর্নেল।’
ওয়ারেন হেস্টিংস ফের মোলায়েম স্বরে বললেন, ‘আপনার সুবা আপনি চালাবেন। এর মধ্যে মাথা গলানোর কোনও ইচ্ছে নেই কর্নেলের। কিন্তু তাঁর দিকটা ভেবে দেখুন। তিনি এখানে থাকাকালীন এই জুলমাত চলতে পারে না। এতে তিনি বেইজ্জত হচ্ছেন।
একদিকে তোপ দাগার মতো আয়ারকুটের তর্জন-গর্জন ও অন্যদিকে হেস্টিংসের মাখনের মতো মোলায়েম ভাষায় চালানো ছুরি, দুইয়ের মাঝে পড়ে মিরজাফরের অসহায় অবস্থা। মৃদু কণ্ঠে তিনি বললেন, ‘আপনি কর্নেলকে বুঝিয়ে বলবেন। তিনি যেন গুসসা না করেন। মুর্শিদাবাদ আসতে নারাজ না হন। আমি জিম্মেদার থাকলাম। আর ঝুট ঝামেলা হবে না।’
এই সময় মিরন এসে প্রবেশ করল দরবার ঘরে। সঙ্গে চুনিলাল ও মুন্নিলাল। শরাবের প্রভাবে এদের সকলেরই চোখ জবাফুলের মতো লাল। তবে জাফরাগঞ্জ প্যালেস ও হিরাঝিল প্যালেসের বাইরে তোপের গাড়িসহ সঙিন হাতে তাগড়াই চেহারার গোরা পল্টনদের খাড়া থাকতে দেখে এদের নেশা ছুটে গিয়েছে।
দরবার ঘরের মধ্যে অস্থির ভাবে পায়চারি করছেন আয়ারকুট। ওয়ারেন হেস্টিংস শান্ত, ধীরস্থির। বসে আছেন কুরসিতে। মিরজাফরের উলটো দিকে। দীর্ঘদেহী আয়ারকুটের কোমরের একদিক থেকে ঝুলছে তরবারি, আরেক কোমর থেকে ঝুলছে পিস্তল। মেজর আয়ারকুটের আগুনে চোখদুটোর দিকে তাকিয়ে চুনিলাল ও মুন্নিলালের বুকের রক্ত হিম হয়ে গেল।
কড়া চোখে মিরনের দিকে তাকিয়ে জবাবদিহি চাওয়ার ঢঙে মিরজাফর প্রশ্ন করলেন, ‘শহরে এত জোরজুলুম চলছে কেন?’
মিরন জবাব দিল, ‘পলাশির কামেয়াবির খুশিতে আমার দোস্তরা একটু ফূর্তি মানাচ্ছিল।’
ভুরু কুঁচকে গেল হেস্টিংসের। ‘হোয়াট? ইউ আর কিলিং পিপল, অ্যাবিউজিং ওম্যান, ডেস্ট্রয়িং প্রপার্টি। একে বলে ফূর্তি মানানো?’
কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল মিরন। তার আগেই মিরজাফর ধমকে উঠলেন, ‘খামোশ!’
মিরন চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
চুনিলাল ও মুন্নিলালকে জরিপ করে আয়ারকুট প্রশ্ন করলেন, ‘হু আর দিজ টু গাই?’
ভয়ে কাঁপতে লাগল চুনিলাল ও মুন্নিলাল। মিরন মৃদু গলায় বলল, ‘মেরা দোস্ত। চুনিলাল আউর মুন্নিলাল।’
‘ও! ইউ আর দ্য ইনফেমাস ডুয়ো বিহাইন্ড অল সর্টস অফ ট্রাবল্স।’
চুনিলাল ও মুন্নিলালের সামনে এসে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়ালেন আয়ারকুট। বললেন, ‘লিসন কেয়ারফুলি। ইফ ইউ রেইজ হ্যান্ড এগেইনসট এনিওয়ান অফ আলিবর্দিস ফ্যামিলি, দেন কর্নেল ক্লাইভ উইল রুইন বোথ অফ ইউ।’
সাহেবের ভাষা বুঝতে না পেরে হাঁ করে তার মুখের দিকে চেয়ে রইল চুনিলাল ও মুন্নিলাল। কথাটা এই দুজনের উদ্দেশে বলা হলেও আসল লক্ষ্য যে মিরজাফর ও মিরন তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ফারসিতে কথাটা ভালো করে বুঝিয়ে দিলেন হেস্টিংস।
তারপর জুতোর শব্দ তুলে দরবার ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন দুই সাহেব। ব্যস্ত হয়ে তাদের পিছন পিছন ছুটে এলেন মিরজাফর।
মিরনের সারা শরীর অপমানে জ্বলতে লাগল। চুনিলাল ও মুন্নিলাল নবাবজাদার মুখের দিকে তাকিয়ে তার অন্দরের উত্তাপের আঁচ পেল। সেই আগুনকে আর একটু উসকে দেওয়ার জন্য চুনিলাল বলল, ‘ইয়ে তো মুশকিল কি বাত। নবাব কৌন হ্যায়? মিরজাফর খাঁ ইয়া কর্নেল ক্লাইভ?’
দাঁতে দাঁত চেপে মিরন বলল, ‘কিছুদিন চুপচাপ থাকো তোমরা। তারপর দেখছি।’
.
হিরাঝিল প্যালেস থেকে বেরিয়ে আসার পথে এর বৈভব ও সমৃদ্ধি মন দিয়ে জরিপ করছিলেন ওয়ারেন হেস্টিংস। সিরাজদ্দৌলার তৈরি এই প্যালেসের স্থাপত্য গৌরবের কথা তিনি শুনেছেন অনেকের মুখে। আগে কখনও দেখা হয়নি। পাকা জহুরির মতো চোখ বুলিয়ে থামের গড়ন, খিলানের নকশা সব মনের মধ্যে গেঁথে নিচ্ছিলেন তিনি। কোনওদিন যদি সুযোগ আসে তবে এরকম একটা প্যালেস গড়ে উপহার দেবেন স্ত্রী মেরিকে। কিন্তু এমন সৌভাগ্য কি তার হবে? এরকম একটা প্যালেস গড়তে গেলে যা বিত্তের প্রয়োজন, তা কোথায় পাবেন তিনি? কোম্পানির চাকরির বাঁধা মাইনেতে মনের মতো সাজানোগোছানো একটা বাংলোর মালিক হওয়াই যে দুষ্কর।
হঠাৎ এই রাতে হিরাঝিল প্যালেসে গোরা পল্টনদের আগমনে শঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন মণি বেগম। কী মতলব ইংরেজদের?
বাঁদি এসে জানাল, মিরজাফর খাঁ সাহেবের সঙ্গে কোনও ব্যাপারে আলোচনা করতে এসেছিলেন দুই সাহেব। তাঁরা ফিরে যাচ্ছেন। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন মণি বেগম। বেগম মহলের চিলমনের আড়াল থেকে দেখলেন, মোরামের পথের উপর দিয়ে সদর দেউড়ির দিকে এগিয়ে চলেছেন দুই সাহেব। তাদের পাশে পাশে হাঁটছেন মিরজাফর। বাগানের ঝলমলে আলোয় তাদের স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
ওয়ারেন হেস্টিংসের উপর চোখ আটকে গেল মণি বেগমের। সত্যিই সুপুরুষ যুবক এই সাহেব। মাথায় তেকোনা হ্যাটের নীচ থেকে নেমে এসেছে সোনালি চুল। হাঁটার ভঙ্গিতে প্রখর আত্মবিশ্বাসের ছাপ। বড় সুন্দর দেখাচ্ছে। মণি বেগম অপলক চোখে হেস্টিংসকে দেখতে লাগলেন।
দেউড়ির পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে দুটো পালকি। অপেক্ষা করছে কাহারের দল। পালকিতে ঢুকে পড়লেন হেস্টিংস। আরেকটা পালকিতে উঠলেন আয়ারকুট। কাহাররা পালকি দুটো উঠিয়ে দ্রুত সদর দেউড়ি দিয়ে বেরিয়ে গেল।
মণি বেগমের নজর থেকে হারিয়ে গেলেন হেস্টিংস সাহেব। বেগম সাহেবা অনুভব করলেন তাঁর বুকের রক্ত কেমন যেন চঞ্চল হয়ে উঠেছে।
.
আয়ারকুট ও হেস্টিংসের দৌত্যে কাজ হল। মুর্শিদাবাদের সর্বত্র যে নৃশংশতার আগুন জ্বালিয়েছিল মিরন, তা দ্রুত নিভে গেল। গুন্ডামি, রাহাজানি, লুঠতরাজ ছেড়ে গা ঢাকা দিল দুষ্কৃতিরা। শান্তি ফিরল রাজধানীতে।
গোরা ফৌজিদের এখন খোলাখুলি কুরনিশ জানাচ্ছে আমলোগ। তসলিম জানাচ্ছে গভীর কৃতজ্ঞতায়। বহু মানুষের জান ও দৌলত রক্ষা পেয়েছে কর্নেল ক্লাইভের সৌজন্যে—শহরের সর্বত্র একথা লোকের মুখে মুখে ফিরছে। শয়তানদের সবক শিখিয়ে ছেড়েছেন ক্লাইভ। তাঁর নির্দেশে ফৌজসহ আয়ারকুট ও হেস্টিংস এসে পড়তেই জুড়িয়ে গিয়েছে উত্তপ্ত শহর।
হ্যাঁ। কর্নেল ক্লাইভই মসিহা। তিনি থাকলেই সব ধাতে থাকবে, ছন্দে চলবে–মুর্শিদাবাদের অনেক ওমরাহের অন্তরের এই একিন এখন সাধারণ প্রজাদের মনেও শিকড় গেড়েছে। এর আন্দাজ পাচ্ছে চকবাজার। মানুষের মন কি বাত উড়ছে হাওয়ায়। কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে।
সিরাজদ্দৌলা অতীত। মুর্শিদাবাদ ছেড়ে চলে গিয়েছেন তিনি। তাঁর কী হল এ নিয়ে আমজনতার তেমন মাথাব্যথা নেই। কুরসি বদল তারা আগেও দেখেছে। পুরোনো জমানা চলে যায়, নয়া জমানা আসে। কেউ নবাব থেকে ফকির হয়, কেউ বা ফকির থেকে নবাব। কেউ বরবাদ হয়ে আঁধারে ডুবে যায়, কারও জিন্দেগি হয়ে ওঠে রংদার, তাগদ ও দৌলতের জলোয়ায় জেল্লাদার।
আমআদমি জানে, কুরসি বদল স্রেফ চেহেল সেতুনের অন্দরে, ক্ষমতার অলিন্দে পরিবর্তন আনে। এসবের সঙ্গে সাধারণ মানুষের দিন গুজারের কোনও সম্পর্ক নেই। জহমতে ভরা তাদের জীবনকে নয়া জমানা সহসা সুখের আফশাঁয় মুড়ে দেবে, এমন দুরাশা তারা করে না। সুবহ্শাম রুটিরুজির ভাবনা যাদের করতে হয়, তারা চায় কেবল চ্যায়েন—স্বস্তি। পলাশির লড়াইয়ের পরে সহসা জ্বলে ওঠা আগুনে জনগণের কপাল পুড়তে বসেছিল অনেকের। ক্লাইভের হস্তক্ষেপে তারা স্বস্তি পেয়েছে।
‘সিচুয়েশন ইজ নর্ম্যাল। সাধারণ মানুষের মনে ইংরেজদের প্রতি কোনও অ্যাডভার্স ফিলিং নেই’—জানিয়েছিলেন আয়ারকুট। তবুও কোনও ঝুঁকি নিতে চান না কর্নেল ক্লাইভ। তিনি সতর্ক। তাঁর ইচ্ছায় ও মিরজাফরের হুকুমে নগরীর শান্তিরক্ষায় কোতোয়ালির সেপাইদের পাশাপাশি মোতায়েন হয়েছে গোরা পল্টন।
২৯ জুন ১৭৫৭ সাল। সকালের আলো ফুটতে না ফুটতেই চকবাজারে এসে ভিড় জমাচ্ছে অগণিত কৌতূহলী মানুষ। দুঃস্বপ্নের প্রহর কাটিয়ে গতকালই ছন্দে ফিরেছে চকবাজার। ফুলমান্ডির বিপণিগুলি রঙের বাহারে ফের ঝলমলে। আতর-গুলাল-মিঠাই-মোরব্বার দোকান আগের মতোই দ্রব্যসম্ভারে ঠাসা। কোনও কোনও দোকান উপচে মালের পসরা হুমড়ি খেয়ে প্রায় পথের উপরে এসে পড়েছে। আশপাশের সরাই, চটি থেকে ভেসে আসছে কাবাব, দুনিয়াজা, দমপোক্তের স্বাদু গন্ধ। দুধ, মালাই, শরবত, লস্যি বিকোচ্ছে দেদার। চবুতরার নীচে বসে গণৎকার-নজ্জুম, ফকির, দরবেশ মানুষকে ইয়াদদস্ত করে, করকোষ্ঠী বিচার করে ভবিতব্যের আন্দাজ দিচ্ছে। এ সবই খুশদিল চকবাজারের টুকরো টুকরো তসবির। খুবই পরিচিত।
আজ অবশ্য এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাড়তি কিছু। চাপা গলায় গুলতানিতে মশগুল লোকজন। তাদের চোখেমুখে উত্তেজনা। এ উত্তেজনা আতঙ্কের নয় কৌতূহলের। সকলেরই দৃষ্টি পথের দিকে। রোদের ঝাঁ-ঝাঁ উত্তাপ মাথায় নিয়ে লোকজন দাঁড়িয়ে থাকলেও কারও মধ্যেই বিরক্তির ভাব নেই। আছে কেবল জিন্দা তুজুক হয়ে ওঠা একটা মানুষকে একবার চোখে দেখার ছটফটানি।
পথের দুপাশে সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে মিরজাফরের রিসালার সৈন্যরা। মোতায়েন রয়েছে দশাসই চেহারার সব গোরা পল্টনেরাও। তাদের হাতে ধরা সঙিনের মাথায় ঝকঝক করছে ভয় ও সম্ভ্রম জাগানো ইস্পাতের ফলা। কড়া নিরাপত্তার বেষ্টনীতে মুড়ে ফেলা হয়েছে রাজপথ। জনতা দাঁড়িয়ে আছে ফৌজিদের এই বেষ্টনীর পিছনে। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই এই পথ দিয়ে তিনি হেঁটে যাবেন। পলাশির যুদ্ধের ছয় দিন পর এই প্রথম কর্নেল রবার্ট ক্লাইভ পা রাখতে চলেছেন মুর্শিদাবাদের মাটিতে। কাশিমবাজার থেকে মুর্শিদাবাদ নগরীর উপকণ্ঠ পর্যন্ত হাতির পিঠে চড়ে এসেছেন কর্নেল ক্লাইভ। সেখান থেকে ফৌজসহ পায়ে হেঁটে তিনি নগরীতে প্রবেশ করবেন।
‘দূর বাস! দূর বাস!’ বলতে বলতে কোড়া হাঁকিয়ে দৌড়ে গেল দুই ঘোড়সওয়ার।
হইচই পড়ে গেল চারিদিকে। এইবার তিনি আসছেন। এতদিন তার মুর্শিদাবাদে আসার নানা গুজব ডানা মেলে বাতাসে উড়েছে। এবারে সত্যিই আসছেন তিনি। চঞ্চল হয়ে উঠল পথের দু’পাশের লোকজন। পথের ধারে নিরাপত্তার বেষ্টনী তৈরি করা নিজামতের বরকন্দাজ ও গোরা পল্টন দুই দলই ভয়ানক ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
দূর থেকে মিলিটারি ব্যান্ডে ভেসে আসছে বিলিতি গানের সুর। একেবারে সামনে ধীর গতিতে এগিয়ে আসছে দুজন ঘোড়সওয়ার। তারা এগোচ্ছে পাশাপাশি। একটি ঘোড়ার পিঠে বসে আছে মিরজাফরের রিসালার একজন সেপাই। তার হাতে নিজামতের নিশান। পাশের ঘোড়াটির পিঠের সওয়ার জনৈক গোরা পল্টন। তার হাতে ধরে রাখা দণ্ডের মাথায় উড়ছে কোম্পানির ঝান্ডা। এদের পিছনে এগোচ্ছে ছোটখাটো একটা গোলন্দাজ বাহিনী। সঙ্গে রয়েছে দুটো ফিল্ড পিস কামান। গো-গাড়ির উপর চাপানো।
গোলন্দাজ বাহিনীর ঠিক পিছনে রয়েছে মিলিটারি ব্যান্ড। তার পিছনে দিশি সেপাইরা। হাতে ফ্লিন্টলক রাইফেল। তাদের পিছনে কর্নেল ক্লাইভ। তাঁর একপাশে মিরন ও আরেকপাশে জগৎশেঠ মহাতপচাঁদ ও দেওয়ান রায়দুর্লভ। কর্নেলের ঠিক পিছনে হাঁটছেন মেজর কিলপ্যাট্রিক, মেজর গ্র্যান্ট, স্ক্র্যাফটন, ওয়ালশ, ওয়াটস, লাশিংটনসহ আরও অনেকে। সব শেষে রয়েছে গোরা পল্টনেরা। লোকজন হাঁ করে দেখছে ইংরেজবাহিনীর এই কুচকাওয়াজ। কৌতূহলী অসংখ্য, জোড়া জোড়া চোখ খুঁজছে কর্নেল ক্লাইভকে। জিন্দা তুজুক হয়ে ওঠা সেই মানুষটা কোথায়?
চকবাজারের পথ ধরে বেশ দ্রুত গতিতে হেঁটে চলেছেন ক্লাইভ। পরনে হাঁটু পর্যন্ত লম্বা কোট ও ব্রিচেস। মাথায় হ্যাট। কোমরের একপাশে ঝুলছে পিস্তল। আরেক পাশ থেকে ঝুলছে তরবারি। প্রতি পদক্ষেপে ফুটে উঠছে প্রখর ব্যক্তিত্ব ও আত্মবিশ্বাস। তাঁর হাঁটার ছন্দের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে হিমসিম খাচ্ছে মিরন। হাঁফ ধরেছে জগৎশেঠ ও রায়দুর্লভেরও।
রাস্তার পাশ থেকে গুঞ্জন উঠছে, ‘ওই তো সাবিৎ জঙ্গ। ওই যে নবাবজাদা মিরনের পাশে।’
কামানের গাড়ির চাকার ঘড়ঘড় শব্দ ও ইংরেজবাহিনীর ভারী বুটের শব্দে চকবাজার যেন থরথর করে কাঁপছে। এদেশি লোকেরা নবাবকে যুদ্ধে যেতে দেখেছে। হাজার হাজার পদাতিক, বরকন্দাজ, বন্দুকচি, ধানুকি, লোকলস্কর, হাতি ঘোড়া উট, মুটে, মজুর বেলদার নিয়ে যুদ্ধে যায় নবাব। মেলা হইচই আর চিৎকার চেঁচামেচিতে চারিদিক কেমন যেন একটা গোল পেকে ওঠে। গোটা বাহিনী এগোয় বিশৃঙ্খল ভাবে। মনে হয় একের সঙ্গে অপরের যেন কোনও তালমিল নেই। যে যার খুশখেয়ালে চলেছে। কিন্তু ইংরেজ ফৌজের এই তিনশো দেশি সেপাই আর দু’শো গোরা পল্টন পা ফেলছে একসঙ্গে। গোটা ফৌজ এগোচ্ছে একই ছন্দে। এই অদৃষ্টপূর্ব শৃঙ্খলা দেখে জনতা অভিভূত।
হাঁটতে হাঁটতেই চারিদিকে চোখ বুলিয়ে নিচ্ছেন কর্নেল ক্লাইভ। জরিপ করে নিচ্ছেন শহরটার মেজাজ। ক্লাইভের চোখে পড়ছে পথের দুপাশে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকা পেল্লায় পেল্লায় সব ইমারত। পথের উপর প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়া চকবাজারের বিপণিগুলির সাজসজ্জা ও সেসবে মজুত উমদা পসরা দেখে কর্নেল স্তম্ভিত। মনে মনে ভাবছেন, সুবে বাংলার রাজধানীর এই জলুস ও জেল্লার কাছে হার মানবে লন্ডন নগরী। সুন্দর নকশায় গড়ে ওঠা পথের দুপাশের সুবিশাল হাভেলিগুলো স্পষ্টই বুঝিয়ে দিচ্ছে এখানকার রইস আদমিদের কড়ির জোর কতখানি।
নাহ্! একসঙ্গে এত বিত্তশালী লোকের বসবাস লন্ডন শহরে নেই, মনের গহীনে তারিফদারি থাকলেও ক্লাইভের অভিব্যক্তিতে তার কোনও বহিঃপ্রকাশ নেই। মুখটা অসম্ভব রকম গম্ভীর।
নহবত বাজছে ত্রিপলিয়া তোরণদ্বারে। ক্লাইভকে রাজকীয় অভ্যর্থনা জানাতে মিরজাফরের কোশিশে কোনও খামতি নেই। সানাইয়ের সুরের সঙ্গে মিলেমিশে যাচ্ছে মিলিটারি ব্যান্ডের আওয়াজ। বিচিত্র এই ঐকতান ছড়িয়ে দিচ্ছে খুশির বার্তা। এসে পড়েছেন ক্লাইভ। ইনকিলাব খতম। সিরাজদ্দৌলা অতীত। এবারে মসনদে বসবেন মিরজাফর।
ত্রিপলিয়া তোরণদ্বার পার হয়ে ক্লাইভ এগিয়ে চলেন নিজামত কেল্লার ঘাটের দিকে। সেখানে অপেক্ষা করছে সুদৃশ্য ময়ূরপঙ্খী বজরা। তাতে চড়ে ক্লাইভ যাবেন ওপারে। ফৌজসহ ঘাঁটি গাড়বেন মোরাদবাগ প্যালেসে।
‘গুড়ুম গুড়ুম গুড়ুম।’ কামানের গর্জনে সহসা কেঁপে উঠল গোটা নগরী। চমকে উঠলেন ক্লাইভও। মুহূর্তের জন্য কুঁচকে গেল তাঁর সোনালি ভুরুযুগল। হাঁটার গতি স্লথ হল কিছুটা।
রায়দুর্লভ জানালেন, ‘নিজামত কেল্লা তোপ দেগে আপনাকে সেলাম জানাচ্ছে।’
প্রসন্ন হলেন কর্নেল। মিলিয়ে গেল ভ্রুকুঞ্চন। মুখে দেখা দিল মৃদু হাসির রেখা। দূরে দেখা যাচ্ছে নিজামত কেল্লার মিনার, বুরুজ। সেদিকে তাকিয়ে মাথা থেকে টুপিটা খুলে নিয়ে সামান্য মাথা নোয়ালেন ক্লাইভ।
আমজনতা হর্ষধ্বনিতে ফেটে পড়ল।
কেল্লার নৌকোঘাটে এসে বজরায় উঠলেন ক্লাইভ। বহরদারেরা দাঁড় বাইতে লাগল। ছাতে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ দৃষ্টিতে সামনের দিকে চেয়ে রইলেন ক্লাইভ। চোখে পড়ছে আড়ে-বহরে বিশাল, সুন্দর নকশায় গড়া মোরাদবাগ প্যালেস। সকালের রোদ্দুরে ঝকমক করছে আকাশের বুকে জেগে থাকা মার্বেল পাথরে মোড়া উদ্ধত মিনারগুলো। পাতলা লাল গৌড়ীয় ইটে গড়া প্রাসাদ। ইটের জায়গায় জায়গায় রয়েছে শ্বেতপাথরের বাহারি কাজ। জানলার জাফরিগুলোও শ্বেতপাথরের। পুব আকাশে সঞ্চারমান সূর্যের আলোয় গোটা প্রাসাদ যেন হাসছে।
ক্লাইভের মুখ থেকে অস্ফুট স্বরে বেরিয়ে এল একটা শব্দ। ‘বি-উ-টি-ফু-ল!’
পাশেই দাড়িয়েছিলেন জগৎশেঠ। কথাটা তাঁর কানে গেল। তিনি ঠোঁটে একটা মুচকি হাসি ঝুলিয়ে ক্লাইভের কথার রেশ ধরে বললেন, ‘সহি বাত। খুবসুরত মকান। ক’দিন আগেও ওটা ছিল দেওয়ান মোহনলালের হাভেলি।’
ক্লাইভ চকিতে মুখ তুলে জগৎশেঠের দিকে চেয়ে শুধোলেন, ‘মোহনলাল এখন কোথায়?’
‘ভেগেছে। লেকিন মোহনলালের বহেন হিরা বেগম গ্রেফতার হয়েছে। জানেন তো হিরা বেগমের সঙ্গে সিরাজদ্দৌলার আশনাই ছিল।’
এসব কেচ্ছাকাহিনি শোনার অভিপ্রায় নেই ক্লাইভের। তিনি প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে প্রশ্ন করেন, ‘আই থিংক সামবডি ইজ চেজিং বিহাইন্ড হিম?’
জগৎশেঠ বলেন, ‘বিলকুল। বেশক গ্রেফতার হবে মোহনলাল।’
দূরে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন ক্লাইভ। তাঁর চোখে পড়ল আরও একটা প্যালেস। অনেকটাই ঢাকা পড়েছে সবুজের আড়ালে। তবে জায়গায় জায়গায় দ্বীপের মতো জেগে আছে গম্বুজ, মিনার, উঁচু চবুতরার আচ্ছাদন। ক্লাইভ শুধোলেন, ‘ওটা কোন প্যালেস?’
জগৎশেঠ জবাব দেন, ‘হিরাঝিল। আগে ছিল নবাব সিরাজদ্দৌলার প্যালেস। এখন মিরজাফর খাঁ দখল নিয়েছেন।’
হিরাঝিলের দিকে এক দৃষ্টে চেয়ে থেকে ক্লাইভ বললেন, ‘ইট ইজ টু গুড।’
মহাতপচাঁদ অর্থাৎ জগৎশেঠ চোখের ইশারায় তাঁর দেওয়ান রণজিৎ রায়কে ডাকলেন।
রণজিৎ রায় এগিয়ে এলেন। পিছনে একজন দাখিলা। তাদের হাতে ধরা সুন্দর কাজ করা রুপোর একটা বড়সড় রেকাবি। তার উপরে রয়েছে মণিমুক্তো খচিত একটি সুদৃশ্য পানপাত্র।
মহাতপচাঁদ জোড় হাত হয়ে বলেন, ‘আপনার জন্য আমার তরফ থেকে মামুলি এক তোফা।’
ক্লাইভ পানপাত্রটা নেড়ে চেড়ে দেখলেন। তাঁর চোখেমুখে ফুটে ওঠে তারিফির ভাষা।
মহাতপচাঁদ হেসে বলেন, ‘আপনার জন্য অনেক কসরত করে জোগাড় করেছি।’
ক্লাইভ মুচকি হেসে পানপাত্রটা আবার রুপোর রেকাবির উপরে রেখে দেন।
জগৎশেঠ অবাক হওয়া গলায় প্রশ্ন করেন,‘পসন্দ হয়নি আপনার?’
‘এসবের জরুরত নেই শেঠজি। নতুন নবাবকে মসনদে বসাতে এসেছি। সুবে বাংলায় আইনের শাসন চালু করাই আমার মুসিবত। আমরা চাই চ্যায়েন—শান্তি। যাতে বিনা তকলিফে সওদা করতে পারি।’
মহাতপচাঁদ বেশ অপ্রস্তুত হয়ে বললেন, ‘ইয়ে তো মামুলি এক তোফা।’
জগৎশেঠের কথার জবাব না দিয়ে ক্লাইভ এগিয়ে গেলেন সামনে। কাঠের রেলিঙে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলেন ওপারের দৃশ্য। মনে মনে বললেন, শেঠজি, তোমার চেয়ে আমি কয়েকশো গুণ ধুরন্ধর। বেওকুফ ঠাওরিও না আমায়। শুধু দামি তোফা দিয়ে রবার্ট ক্লাইভকে ভোলাতে পারবে না। আমার লক্ষ্যটা অনেক বড়। কী ভাবনা ঘুরপাক খাচ্ছে আমার মনের মধ্যে, তার নাগাল পাওয়া এখনই তোমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।’
মোরাদবাগ প্যালেসের নৌকোঘাটের খুব কাছে এসে পড়েছে বজরা। নহবতখানা থেকে ভেসে আসছে সানাইয়ের সুর। ক্লাইভকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য ঘাটে দাঁড়িয়ে রয়েছেন মিরজাফর খাঁ ও অনেক গণ্যমান্য ওমরাহ।
বজরা থেকে নেমে এলেন ক্লাইভ। বেজে উঠল কাড়ানাকাড়া। গর্জন করল তোপ। কান ফাটানো শব্দে আকাশবাতাস কেঁপে উঠল। বজরা থেকে নেমেই ক্লাইভ দেখলেন, ঘাট থেকে প্যালেসে যাওয়ার পথে বিছানো রয়েছে লাল গালিচা। এর উপর দিয়ে তাঁকে হেঁটে যেতে হবে।
.
