৩১
সেদিন ছিল রাখিপূর্ণিমা।
এই দিনে ভাইয়ের মঙ্গলকামনায় বোন রাখি বাঁধে ভাইয়ের হাতে। মোহনলালের মনে পড়ছিল বহেন হিরার কথা। এই বোধ হয় প্রথম, এই বিশেষ দিনটিতে হিরার সঙ্গে তার দেখা হবে না।
হিরা নানারকম রঙিন ফুল দিয়ে রাখি তৈরি করত নিজে। দাদার হাতে রাখি বাঁধতে বাঁধতে বলত, ‘এই যে বড়ে ভাইয়া আমি রাখি পরিয়ে দিলাম তোমার হাতে, সব লড়াইয়ে তুমি গালেব হবে। কোনও খতরা তোমাকে ছুতে পারবে না।’
মোহনলাল বলতেন, ‘তাই যেন হয় বহেন। এই খুশকামনা জানিয়ে হর সাল এই দিনটিতে তুমি রাখি বেঁধে দিও আমার হাতে।’
দীর্ঘশ্বাস ফেলেন মোহনলাল। নসিব সব তছনছ করে দিয়েছে। হারিয়ে গিয়েছে হিরা।
ভারাক্রান্ত হৃদয়ে চুপ করে আকাশের দিকে চেয়ে থাকেন মোহনলাল। ক্যাঁচকোঁচ শব্দ তুলে শম্বুক গতিতে এগিয়ে চলেছে গো-গাড়ি। বেশ কয়েকজন আম-আদমির সঙ্গে সেই গাড়িতেই জনৈক সওয়ারি মোহনলাল—নবাব সিরাজদ্দৌলার সুহৃদ, সুবে বাংলার ভূতপূর্ব দেওয়ান। চলেছেন ময়মনসিংহের জমিদারবাড়ির উদ্দেশে।
ভিক্ষুকের জালসাজিস নিয়েছেন মোহনলাল। কাঁধে ভিক্ষার ঝুলি। হাতে বাঁশের লাঠি। পরনে ময়লা তাপ্পি মারা জোব্বা। মাথায় রুক্ষ চুল। মুখে ঘন দাড়ি প্রায় বুক পর্যন্ত নেমে এসেছে। এই বেশ দেখে কারও পক্ষেই আসল লোকটিকে চেনা সম্ভব নয়। মাস দেড়েকের উপর বনেজঙ্গলে পালিয়ে বেড়ানোর ধকল সইতে সইতে চেহারাটা অনেক ভেঙেছে। ক্রমাগত স্থান পরিবর্তন করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন মোহনলাল। তাঁর খোঁজে এখনও প্রতিনিয়ত গোটা সুবে বাংলা চষে বেড়াচ্ছে নিজামতের কাসিদরা।
খানাখন্দে ভরা অসমতল রাস্তা। বর্ষার মরশুমে এ পথে চলাচল খুবই কষ্টকর ব্যাপার। একে চরাই-উতরাইয়ে ভরা উঁচুনিচু পথ, তার উপরে নরম মাটিতে বসে যাচ্ছে গাড়ির চাকা। সর্বশক্তি প্রয়োগ করেও আলিসান বলদ দুটো টেনে তুলতে পারছে না মাটিতে গেঁথে যাওয়া চাকা।
গাড়োয়ান পরেশান। থেকে থেকে গাড়ি থেকে অবতরণ করে সওয়ারিদেরই গাড়ির চাকা টেনে তোলার কাজে হাত লাগাতে হচ্ছে। এ কাজে হাত লাগাচ্ছেন মোহনলালও। এই মানুষটার অমানুষিক শক্তি ও কর্মক্ষমতা দেখে সহযাত্রীরা অনেকেই বিস্মিত।
জনৈক সহযাত্রী বললেন, ‘মালুম হচ্ছে আপনি পালোয়ান আদমি।’
কোনও জবাব না দিয়ে মুচকি হাসলেন মোহনলাল।
তাঁর সঙ্গে এই দলটির আলাপ একটি চটিতে। ক্লান্ত মোহনলাল দু’দণ্ড বিশ্রামের জন্য থেমেছিলেন সেখানে। চটির আঙিনায় বসে কয়েকজন আম-আতরাফ মানুষ নাস্তা সারছিল। আহার্য বলতে সামান্য কয়েকমুঠো ভিজে নরম চিঁড়ে আর খানিকটা আখের গুড়।
এদের কথাবার্তা শুনে মোহনলাল শুধোলেন, ‘আপনারা ময়মনসিংহের রাজবাড়ি যাচ্ছেন বুঝি?’
দলপতি বললেন, ‘হ্যাঁ। ওখানে আজ মহাভোজ। জমিদার কৃষ্ণকিশোরের ভ্রাতা দত্তক নেবেন এক ব্রাহ্মণ সন্তানকে। এই খুশিতেই ভোজের আয়োজন। জমিদারমশায় ঢোল-শোহরৎ করে সব প্রজাকে দাওয়াত দিয়েছেন। আপনি শোনেননি?’
মৃদু হেসে মোহনলাল বলেন, ‘শুনেছি।’
‘আপনিও কি ওদিকেই যাচ্ছেন?’
‘হ্যাঁ। রাজবাড়ির ভোজ বলে কথা!’
‘পায়ে হেঁটে যাবেন এতটা পথ?’
‘উপায় কী? ভিক্ষুক মানুষ। গো-গাড়ির ভাড়া চোকানোর মুরোদ নেই।’
‘বেশ তো চলুন না আমাদের সঙ্গে।’
‘আপনাদের অসুবিধা হবে।’
‘না না অসুবিধা হবে কেন? ঢের জায়গা আছে গাড়িতে।’
অগত্যা ওই মানুষগুলোর সঙ্গে গো-গাড়িতে চেপে বসলেন মোহনলাল। পলাশির যুদ্ধের পর মুর্শিদাবাদে ফিরে এসে শ্রীমন্তলালকে নিয়ে তিনি পালিয়ে যান। বাঁচার তাগিদে মোরাদবাগ প্যালেস ছেড়ে নিখোঁজ হয়ে যায় হিরাও। কোথায় সে আত্মগোপন করেছে, সুস্থ আছে কি না, ভালো আছে কি না, বেঁচে আছে কি না এসব কিছুই মোহনলালের জানা নেই।
বোনের কথা মনে পড়তেই সুবে বাংলার ভূতপূর্ব দেওয়ানজির চোখদুটো জ্বালা করে ওঠে। দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যায়। আত্মগোপন করতে গিয়ে কত কষ্টই না সহ্য করতে হচ্ছে হিরাকে! মনকে শক্ত করেন মোহনলাল। ময়লা দছমালে চোখ মোছেন। আজ কিছুতেই তিনি চোখের জল ফেলবেন না। এতে শ্রীমন্তের যে অকল্যাণ হবে।
নিরাপদ আশ্রয় পেয়েছে শ্রীমন্তলাল। নতুন পরিচয়ে আজ তার অভিষিক্ত হওয়ার দিন। রাজকীয় পরিবেশে সুখ, বিত্ত, বৈভবের মধ্যে বড় হয়ে উঠবে সে। যেমনটা হওয়ার ছিল, তাই হবে। এই দুঃসময়ে এই তো অনেক পাওয়া। পরমেশ্বরের অশেষ করুণা।
পলাশিতে পরাজয়ের পরেও বেশ কিছুদিন একটা স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন মোহনলাল। সিরাজ পলাতক। শুনেছিলেন পরাজিত নবাব পাটনার দিকে গিয়েছেন নায়েব রামনারায়ণের সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য। মোহনলাল ভেবেছিলেন, শ্রীমন্তলালকে কোনও নিরাপদ আশ্রয়ে রেখে তিনিও পাটনায় গিয়ে যোগ দেবেন সিরাজের সঙ্গে। তার পরে ফের ফৌজ গড়ে তুলে হামলে পড়বেন মুর্শিদাবাদে। পুনরুদ্ধার করবেন সিরাজের মসনদ। ইংরেজদের বিতাড়িত করবেন বাংলা থেকে। কিন্তু সেই স্বপ্ন চুরমার হয়ে গিয়েছে। সিরাজের মৃত্যু সংবাদ শুনে ভেঙে পড়েছেন মোহনলাল। নির্মূল হয়ে গিয়েছে সব আশা। প্রত্যাঘাতের খোয়াব তিনি আর দেখেন না।
পরপর অনেকগুলো গো-গাড়ি পিছন পিছন আসছে। সবাই চলেছে জমিদারবাড়ির উদ্দেশে। গোটা পথটাই অর্থহীন দৃষ্টিতে পিছনে আগত শকটগুলির দিকে চেয়ে রইলেন মোহনলাল। গায়ে পড়ে খোশগল্প করতে চাইছিল সহযাত্রীদের দলপতি। আলাপ-আলোচনা যথাসম্ভব এড়িয়ে যাচ্ছেন মোহনলাল। ভালো লাগছে না কিছু। শ্রীমন্তলালকে দেখার জন্য তাঁর মনটা অস্থির হয়ে উঠেছে।
বেলা প্রায় দ্বিপ্রহরে রাজবাড়ির সমুখে এসে পৌঁছল গো-গাড়ি।
ভিড় ঠেলে রাজবাড়ির সদর দেউড়ির দিকে এগোতে লাগলেন মোহনলাল।
মাসখানেক আগে সন্ন্যাসীর ছদ্মবেশে এই বাড়িতে তিনি এসেছিলেন শ্রীমন্তলালকে দত্তক গ্রহণের প্রস্তাব নিয়ে। জমিদার কৃষ্ণকিশোর সম্মতি জানিয়ে বলেছিলেন—তিনি নন, দত্তক নেবেন তার ভাই কৃষ্ণগোপাল। পরের দিনই কৃষ্ণগোপালকে সঙ্গে নিয়ে আমহাটি ছুটে গিয়েছিলেন কৃষ্ণকিশোর। অনিন্দ্যসুন্দরকান্তি শ্রীমন্তলালকে দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন দুই ভাই।
সেদিনই তারা রাজবাড়িতে নিয়ে আসেন শ্রীমন্তকে। তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে অশ্রুসজল চোখে রাজমাতা বলেছিলেন, ‘যশোদাদুলাল এল আমার ঘরে। গোবিন্দের অশেষ কৃপা।’
দত্তক গ্রহণের অনুষ্ঠানকে ঘিরে জমিদারবাড়ি সংলগ্ন মাঠে বিরাট ম্যারাপ বাঁধা হয়েছে। ভিয়েন বসেছে। চারিদিকে ব্যস্ততা। লোকে লোকারণ্য। ম্যারাপের নীচে কাঙালি ভোজনের আয়োজন। আহারে বসেছে সারি সারি লোক। বাসন্তী পোলাওয়ের গন্ধে ম-ম করছে চারিদিক। পরিবেশনকারীরা পাতের উপর উপুড় করে দিয়ে যাচ্ছে লুচি-মন্ডা-মিঠাইয়ের ঝুড়ি। বিরাট দলবল নিয়ে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে কাঙালি ভোজনের তদারক করছেন নায়েবমশায়। কৃষ্ণকিশোরের কড়া নির্দেশ আজকের এই শুভ দিনে কেউ যেন অভুক্ত অবস্থায় এ বাড়ি থেকে ফিরে না যায়। বিশিষ্টজনদের আপ্যায়ন অবশ্য অন্দরমহলে।
নহবতখানা থেকে ভেসে আসছে খুশির সানাই। আম্রপল্লব, দেওদার পাতায় সেজে উঠেছে জমিদারবাড়ি। নাটমন্দির প্রাঙ্গণে হচ্ছে দত্তক গ্রহণের মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান। ঘিয়ে রঙের মসলিনের কুর্তা ও শাদা পায়জামায় বড় অপূর্ব মানিয়েছে শ্রীমন্তকে। চারিদিকে উপচে পড়ছে ভিড়। সেপাই-পেয়াদারা সেই ভিড় সামলাতে হিমসিম। আজ গৃহের দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছেন কৃষ্ণকিশোর। আসুক, সকলে আসুক। দেখে যাক রায়চৌধুরী বংশের উত্তরাধিকারীকে। প্রজারা চাক্ষুষ করে যাক ভাবীকালের রাজাবাবুকে।
শ্রীমন্তলাল আসনপিঁড়ি হয়ে বসে আছে মৃগচর্মের আসনে। তার মুখোমুখি বসে আছেন কৃষ্ণগোপাল। একপাশে বসে আছেন কুলপুরোহিত, তাঁর মুখোমুখি বসেছেন কৃষ্ণকিশোর। কৃষ্ণগোপালের দুই পত্নী, কৃষ্ণকিশোরের দুই পত্নী ও রাজমাতা একতলার অন্দরমহলে বসে চিকের আড়াল থেকে প্রত্যক্ষ করছেন মাঙ্গলিক ক্রিয়াকর্ম।
যজ্ঞকুণ্ডের উপরে স্তূপীকৃত বেলকাঠের উপরে বড় এক কলসি ঘি উপুড় করে দিলেন কুলপুরোহিত। প্রজ্বলিত শলাকা ছোঁয়ালেন যজ্ঞকুণ্ডে। দাউদাউ করে জ্বলে উঠল আগুন। উদাত্ত কণ্ঠে বৈদিক মন্ত্র উচ্চারণ করতে লাগলেন পুরোহিত।
অতিকষ্টে ভিড় ঠেলে এগিয়ে এসে সামনে এক চিলতে বসার জায়গা পেয়েছেন মোহনলাল। প্রত্যক্ষ করছেন শ্রীমন্তলালের নবজন্ম। হোমের আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে শ্রীমন্তের অতীত সত্ত্বা। হারিয়ে যাচ্ছে পুরোনো পরিচয়। মুছে যাচ্ছে সিরাজ ও হিরার রক্তের দাবি। আলিবর্দির খানদানের সঙ্গে মোহলালের খানদানের রিস্তেদারির সাবুত। এ সব ভেবে মুচড়ে উঠছে মোহনলালের বুকের ভিতরটা। তবুও শান্তি, তবুও আনন্দ। অন্তর বিদীর্ণ হয়ে গেলেও খুশি ঝলকাচ্ছে মোহনলালের চোখেমুখে। আসল পরিচয় প্রকাশ পেলে নয়া জমানা এই বালককেও রেয়াত করত না। ফুলের মতো এই শিশুর কলিজাও ছিঁড়ে নিত দুশমনেরা। বালাই ষাট। অন্য পরিচয়েই না হয় বেঁচে থাক শ্রীমন্তলাল। সুখে থাক। ভালো থাক।
হিরার দেওয়া ‘শ্রীমন্তলাল’ নামটা মুছে গেল একেবারে। নাটমন্দির প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে জমিদার কৃষ্ণকিশোর রায়চৌধুরী ঘোষণা করলেন, আমি এই বালকের নতুন নামকরণ করলাম, যুগলকিশোর রায়চৌধুরী—আজ থেকে সে হল কৃষ্ণগোপাল রায়চৌধুরীর পিণ্ডাধিকারী ও উত্তরাধিকারী।
হর্ষধ্বনি করে উঠল সমবেত জনতা। ‘জয়! রাজকুমার যুগলকিশোরের জয়!’
দোতলার অন্তঃপুরে চিকের আড়াল থেকে এই দৃশ্য দেখে শাড়ির আঁচলে আনন্দাশ্রু মুছলেন রাজমাতাসহ অন্যান্য অন্তঃপুরবাসিনীরা।
নিঃশব্দে কাঁদছেন মোহনলালও। এ কান্না খুশির। মনে মনে বলছেন, বহেন হিরা কোথায় তুমি? শুনতে পাচ্ছ না এই কলরব—জয়! রাজকুমার যুগলকিশোরের জয়! তোমার পুত্রই তো এই যুগলকিশোর। আশীর্বাদ করো তোমার পুত্রকে। কথা দিয়েছিলাম বহেন, একদিন তোমার পুত্রকে আমি বাংলার মসনদে বসাব। সে কথা রাখতে পারিনি আমি। তবে তোমার পুত্রকে নিরাপদ আশ্রয়ে রেখে গেলাম। রাজকীয় মর্যাদায় তাকে প্রতিষ্ঠিত করে গেলাম। জানি না তোমার সঙ্গে আর কোনওদিনও আমার দেখা হবে কি না। যদি দেখা হয়, এই সুখের মুহূর্তের কথা বিস্তারিত বলব তোমাকে। রাজপুত্রের মতোই লালিত হবে তোমার সন্তান। তার কথা ভেবে আর চোখের জল ফেলো না যেন বহেন।
যুগলকিশোরের উদ্দেশে কুলপুরোহিত বললেন, ‘এবারে প্রণাম করো তোমার পিতাকে।’
কৃষ্ণগোপালের পা ছুঁয়ে প্রণাম করল যুগলকিশোর।
‘দীর্ঘজীবী হও বাবা।’ হাঁটু মুড়ে বসে পোষ্যপুত্রকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন কৃষ্ণগোপাল।
যুগলকিশোরকে একবার ছোঁয়ার জন্য প্রবল আবেগে সামনে এগিয়ে গেলেন মোহনলাল। চারিদিকে হইহই করে উঠল লোকজন। আরে? কী অনাসৃষ্টি কাণ্ড! এক ভিক্ষুক সবক ভুলে রাজকুমারের গায়ের উপরে প্রায় হামলে পড়েছে! তেড়ে এল লেঠেলরা। একটা লাঠি এসে পড়ল মোহনলালের পিঠে। যন্ত্রণায় কাতরে উঠলেন তিনি।
ধমকে উঠলেন কৃষ্ণকিশোর। ‘থামো তোমরা।’
প্রখর ব্যক্তিত্বপূর্ণ গলার আওয়াজে নিমেষে স্তব্ধতা নেমে গোটা নাটমন্দির প্রাঙ্গণে।
লাঠির বাড়ি খেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছেন মোহনলাল। তাঁকে মাটি থেকে তুলে জোড়হস্ত হয়ে কৃষ্ণকিশোর বললেন, ‘অপরাধ মার্জনা করবেন। এ গৃহে আপনি আজ অতিথি। তবুও লাঞ্ছনা ভোগ করতে হল আপনাকে।’
মোহনলাল বললেন, ‘ওদের কসুর কোথায়? কসুর তো আমারই।’
খটকা লাগল কৃষ্ণকিশোরের মনে। ভিক্ষুকের গলার আওয়াজ খুবই যেন পরিচিত।
কৃষ্ণকিশোর শুধোলেন, ‘কে আপনি?’
‘দরিদ্র এক প্রজা। আমার মতো মানুষের কি আর পৃথক পরিচয় থাকে বাবা? এই বালককে দেখে মনে হল, ঠিক যেন বাসুদেবনন্দন। স্বর্গের দেবশিশু যেন মাটিতে নেমে এসেছে। তাই ওকে একবার ছোঁয়ার জন্য সবক ভুলে এগিয়ে এসেছিলাম।’
কৃষ্ণকিশোর মৃদু হেসে বললেন, ‘বেশ তো, আপনি ওকে আশীর্বাদ করুন।’
সামান্য ইতস্তত করে মোহনলাল বলেন, ‘যদি কিছু মনে না করেন তো, রাজকুমারকে সামান্য নজরানা দিতে চাই আমি।’
‘বেশ তো দিন। আপনার যা অভিপ্রায়।’
ঝুলির থেকে একটা মোহর বের করলেন মোহনলাল।
আশেপাশে দণ্ডায়মান অনেকে চমকে উঠল। স্তম্ভিত হয়ে গেলেন কৃষ্ণকিশোরও। সামান্য এক ভিক্ষুকের ঝুলিতে মোহর?
অকুস্থলে দাঁড়িয়ে ছিল বাসুদেব। তাকে কথা দিয়েছিলেন মোহনলাল—দত্তক গ্রহণের অনুষ্ঠানের দিন যে ভাবেই হোক, তিনি হাজির হবেন ময়মনসিংহের জমিদার বাড়িতে। শ্রীমন্তলালকে আশীর্বাদ করে যাবেন। ভিক্ষুককে এভাবে সামনে এগিয়ে আসতে দেখে বাসুদেবের সন্দেহ হয়েছিল ইনিই মোহনলাল। সেই সন্দেহ পুরোপুরি দূর হল মোহর দেখে। বাসুদেবের মুখপানে চেয়ে মোহনলালও একঝলকের অর্থপূর্ণ চকিত দৃষ্টিতে বুঝিয়ে দিলেন তার আসল পরিচয়। তারপর দৃষ্টি ঘুরিয়ে আশেপাশের স্তম্ভিত মুখচোখগুলির দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন, ‘আমাকে ভুল বুঝবেন না আপনারা। আমি তস্কর নই। এককালে প্রচুর বিত্তের অধিকারী ছিলাম। নসিবের ফেরে সব হারিয়েছি। সামান্য এই মোহরখানাই সঙ্গে আছে। ভিক্ষুকের কাছে মোহর বড় বিপজ্জনক বস্তু। প্রাণ সংশয় হতে পারে। তাই এটা রাজকুমারকে নজরানা দিয়ে ভারমুক্ত হতে চাই।’
কৃষ্ণকিশোর বললেন, ‘বেশ। আপনার যখন ইচ্ছে—’
ডান হাতের তালুতে মোহর। হাতটা বাড়িয়ে দিলেন মোহনলাল। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে তার মুখপানে চেয়ে রইল যুগলকিশোর।
কৃষ্ণগোপাল বলেন, ‘উনি দিচ্ছেন, নাও।’
হাত বাড়িয়ে মোহরটা নিল যুগলকিশোর।
‘প্রণাম করো।’ আদেশ করলেন কৃষ্ণকিশোর।
দ্রুত ঝুঁকে পড়ে পায়ে হাত দিয়ে মোহনলালকে প্রণাম করে যুগলকিশোর।
‘দীর্ঘজীবী হও বাবা। সুখে থেকো চিরকাল।’ মোহনলালের দুচোখ জলে ভরে ওঠে। অতিকষ্টে আবেগ দমন করে বললেন, ‘বেশ—আমি এখন আসি।’
ব্যস্ত হয়ে কৃষ্ণকিশোর বলে উঠলেন, ‘সে কী? আহার না করেই চলে যাবেন?’
বাসুদেব বলে উঠল, ‘আপনি ব্যস্ত হবেন না রাজাবাবু। আমি ওঁর আহারের ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। আসুন আমার সঙ্গে।’
জমিদারবাড়ির পিছনের দিকে আস্তাবল এলাকায় মোহনলালকে নিয়ে এল বাসুদেব। এ তল্লাট বেশ নির্জন। দূর থেকে ভেসে আসছে কোলাহল।
বাসুদেব বলে, ‘আপনি ইশারা করার আগেই কিন্তু আপনাকে চিনতে পেরেছি আমি।’
‘সে আমি বিলক্ষণ বুঝেছি।’
বাসুদেব গলা খাটো করে বলে, ‘এখানে বেশিক্ষণ থাকা আপনার পক্ষে নিরাপদ নয়। নিজামতের একদল গুপ্তচর গত ক’দিন থেকে এ এলাকায় ঘোরাফেরা করছে। ও দলের পাণ্ডা রায়দুর্লভের ফৌজের এক রিসালদার– লগন সিং। আপনি চেনেন।’
আস্তাবলে ঢুকে একটা ঘোড়া বের করে নিয়ে এসে বাসুদেব বলে, ‘জবরদস্ত তুর্কি ঘোড়া। এটা আমারই। আপনি দ্রুত চলে যান এখান থেকে। বিভিন্ন এলাকা থেকে অগণিত মানুষ আসছে রাজবাড়িতে। কসিদেরা ভিড়ে মিশে আছে।’
দ্রুত ঘোড়ায় চড়ে বসেন মোহনলাল।
একটা কাপড়ের পুঁটুলি এগিয়ে দিয়ে বাসুদেব বলে, ‘রেখে দিন। খাবারদাবার।’
পুঁটুলিটা ঘোড়ার পিঠে বেঁধে নিলেন মোহনলাল। তারপর খিড়কি পথ দিয়ে ঘোড়া হাঁকিয়ে দ্রুত বেরিয়ে গেলেন। আঁকাবাঁকা অসমতল পথ ধরে ছুটে চললেন। তিনি আজ অনেকটাই ভারমুক্ত, নিশ্চিন্ত। আপাতত তাঁর গন্তব্য বোকাইনগরের পোড়ো দুর্গ। শরীর বড় ক্লান্ত। কয়েকটা দিন বিশ্রাম প্রয়োজন।
হঠাৎই মোহনলালের কানে ভেসে এল অনেকগুলো ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দ। বেশ কিছুটা তফাতে ঘোড়া হাঁকিয়ে কারা যেন আসছে। একবার ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকালেন তিনি। সঙ্গে সঙ্গে তাঁর কান ঘেষে বেরিয়ে গেল একটা তির। সঠিক সময়ে মাথা নুইয়ে নিজেকে বাঁচালেন মোহনলাল। লক্ষ্যভ্রষ্ট তির গিয়ে বিদ্ধ হল একটা গাছের গায়ে। বিপদ বুঝে প্রাণপণে দু’পায়ের গোড়ালি দিয়ে লাথি কষালেন ঘোড়ার পেটে। দুরন্ত গতিতে বন্ধুর পথ ধরে ছুটে চলল মোহনলালের ঘোড়া।
.
