1 of 2

পলাশির পরে – ২৯

২৯

সকাল থেকেই আকাশের মুখ থমথমে। সূর্য মুখ লুকিয়েছে মেঘের আড়ালে। ভোর রাত থেকে বৃষ্টি নেমেছিল। বেশ কয়েকঘণ্টার অবিরাম ধারাবর্ষণ থেমেছে খানিক আগে। কলকাতার পথঘাট জলকাদায় মাখামাখি। বর্ষা গিয়েছে। এসেছে শরৎ। তবুও বর্ষার বিরাম নেই।

খুব ভোরে ঘুম ভেঙে গেল ক্লাইভের। চটপট ফ্রেশ হয়ে নিলেন। বৃষ্টি একটু ধরতেই কেল্লা থেকে বেরিয়ে ঘোড়ার পিঠে চেপে গঙ্গার ধার বরাবর পাথর বাঁধানো পথ ধরে দক্ষিণমুখে ছুটে চললেন। সঙ্গী হলওয়েল, রজার ড্রেক, ওয়ালশ, কোম্পানির সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ব্রোহিয়ার, মুনশি নবকৃষ্ণ ও ব্যক্তিগত দেহরক্ষী স্ট্রন।

পথে যেতে যেতে শহরটাকে মন দিয়ে জরিপ করছিলেন ক্লাইভ। সেই মার্চে এই শহর ছেড়ে চন্দননগরের পথে রওনা হয়েছিলেন, পলাশি জয় করে ফিরলেন চার মাস পরে। বর্ষাস্নাত কলকাতার সঙ্গে ক্লাইভের এই প্রথম সাক্ষাৎ।

বর্ষার জল পেয়ে চারিদিকে উচ্ছৃঙ্খল ভাবে বেড়ে উঠেছে গাছপালা। বড় বেশি ঘন হয়ে উঠেছে ঝোপ-জঙ্গল। ক্লাইভ দেখলেন, হুগলি নদীর কুল ছাপিয়ে নিচু জায়গাগুলো জলে প্লাবিত হয়েছে। তিনি ভাবতে লাগলেন, এই শহরটাকে ইংরেজদের বসবাসের পক্ষে আদর্শ করে তুলতে হলে ঢেলে সাজাতে হবে। বহু টাকার প্রয়োজন। হুগলি নদীকে বশে আনতে হলে শক্তপোক্ত একটা বাঁধ দেওয়ার প্রয়োজন। তিনি শুনেছেন বর্ষায় নদী উপচে ভেসে যায় গুদামগুলো। হর সাল বহুত লোকসান হয়। পাকা রাস্তার সংখ্যা শহরে খুবই কম। রাস্তাঘাট পাকা করা দরকার। না হলে চলাচলে বড্ড অসুবিধা। গড়তে হবে নিকাশি ব্যবস্থাও। এসব না হয় ধীরে ধীরে করা যাবে, কিন্তু সবার আগে প্রয়োজন শক্তপোক্ত একটা কেল্লা।

ফোর্ট উইলিয়ামের হতশ্রী দশা। গেল বছরে কলকাতা আক্রমণ করে কেল্লাটাকে মারাত্মক ভাবে জখম করে দিয়ে গিয়েছিলেন সিরাজদ্দৌলা। হতশ্রী, কঙ্কালসার চেহারা নিয়ে কোনওরকমে দাঁড়িয়ে রয়েছে ফোর্ট উইলিয়াম। এ কেল্লাকে মেরামত করে ফের পোক্ত করে তোলা আর সম্ভব নয়। অবিলম্বে কলকাতায় একটা মজবুত কেল্লা গড়ে তুলতে চান ক্লাইভ।

সিরাজদ্দৌলা অতীত হয়ে গেলেও ইংরেজদের বিপদ যে পুরোপুরি কেটে গিয়েছে তা বলা যায় না। হানা দিতে পারেন অযোধ্যার নবাব সুজাউদ্দৌলা, ফের হাঙ্গামা বাধাতে পারে মারাঠারা। ফরাসি জেনারেল কাউন্ট লালি বিরাট ফৌজ নিয়ে দক্ষিণ ভারতে আসছেন। চন্দননগর পুনরুদ্ধারের কোশিশ করতে তিনি যে বাংলায় হানা দেবে না, তারই বা নিশ্চয়তা কোথায়। অতএব ইংরেজদের সুরক্ষার জন্য দ্রুত একটা কেল্লা গড়ে তোলা দরকার।

কিন্তু কোথায় গড়ে তোলা হবে নতুন কেল্লা? এ নিয়ে গতকাল আলোচনায় বসেছিলেন ক্লাইভ। কোম্পানির সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ব্রোহিয়ার বললেন, ‘একটা প্লেস আমি আইডেন্টিফাই করেছি। ড্রাফটেড অ্যা প্রোপোসাল। মি হলওয়েল ও মি ড্রেক এনডোরস করেছেন। আমরা ওখানে নতুন একটা কেল্লা গড়তে পারি।’

পাইপের ধোঁয়া ছেড়ে ক্লাইভ শুধোলেন, ‘জায়গাটা কোথায়?’

টেবিলের উপরে বিছানো ম্যাপের উপর আঙুল রেখে ব্রোহিয়ার বললেন, ‘এই যে। এখান থেকে সামান্য দক্ষিণে।’

ম্যাপের উপরে চোখ রেখে ভুরু কোঁচকালেন ক্লাইভ।

হলওয়েল ঝুঁকে পড়ে বললেন, ‘বিসাইড দ্য ওল্ড ডক।’

‘আই সি।’ আর কোনও মন্তব্য না করে চোখ বুজে পাইপ টানতে লাগলেন ক্লাইভ। দেহের অভিব্যক্তিতে খুব স্পষ্ট যে ব্রোহিয়ারের প্রস্তাবটা তাঁর বড় একটা পছন্দ হয়নি।

‘অ্যাকর্ডিং টু মাই প্ল্যান, উই মে এক্সিকিউট দ্য ওয়ার্ক ইন টু ফেজেস।’ এই বলে ক্লাইভের প্রতিক্রিয়ার জন্য তাঁর মুখের দিকে তাকালেন ব্রোহিয়ার।

‘প্লিজ প্রসিড।’ চোখ বুজেই বললেন ক্লাইভ।

‘ইন দ্য ফার্স্ট ফেজ রিভার ব্যঙ্ক সাইড অ্যান্ড গোডাউনস উইল বি প্রোটেক্টেড।’

‘দেন?’ এবারে চোখ খুলে প্রশ্ন করলেন ক্লাইভ।

‘আই ওয়ান্ট টু ফর্টিফাই দ্য হোয়াইট টাউন উইথ গ্ল্যাসিস অ্যান্ড ডিচেস।’

ক্লাইভ চমকে উঠে বললেন, ‘ও মাই গুডনেস।’

‘ডু ইউ নট এগ্রি উইথ দিস প্রোপোসাল স্যার?’

ক্লাইভ দ্বিধাহীন কণ্ঠে বললেন, ‘নো। গ্ল্যাসিস অ্যান্ড ডিচেস উইল স্পয়েল দ্য সিটি।’

ব্রোহিয়ার বললেন, ‘বাট হাউ ক্যান উই প্রোটেক্ট দ্য হোয়াইট টাউন স্যার?’

ক্লাইভ একটু বিরক্তির সুরে বললেন, ‘শহরের মাঝখানে এভাবে দেওয়াল তুললে আর খাত খুঁড়লে এই সুন্দর শহরটাই যে নষ্ট হয়ে যাবে। তাছাড়া যে এলাকার কথা আপনারা বলছেন, তার কাছে-পিঠে রয়েছে অনেক বাড়িঘর। উই নিড ফ্রি স্পেস ইন ফ্রন্ট অফ দ্য ফোর্ট। আমার মনে হয় আপনারা যে জায়গাটা আইডেন্টিফাই করেছেন, দ্যাট ইজ নট আইডিয়াল ফর ফোর্ট উইলিয়াম।’

মুখ গোমড়া হল হলওয়েল ও ড্রেকের।

ব্রোহিয়ার অসহিষ্ণু গলায় বললেন, ‘মিলিটারি ক্যান্টনমেন্ট ও একই সঙ্গে সিভিলিয়ানদের প্রোটেকশন, আই মিন প্রোটেকশন অফ দ্য হোয়াইট টাউন এই দুটোকে মেলানোর মতো আর তো অন্য কোনও জায়গা দেখছি না।’

‘ফরগেট দ্য অ্যাবসার্ড আইডিয়া টু স্যারাউন্ড দ্য এনটায়ার হোয়াইট টাউন উইথ গ্ল্যাসিস অ্যান্ড ডিচেস। অনলি থিংক অ্যাবাউট নিড অফ অ্যা মিলিটারি ফোর্স।’

রজার ড্রেক আঁতকে উঠে বললেন, ‘বলছেন কী মশায়? গত বছরের মতো ফের যদি ক্যালকাটা অ্যাটাক্‌ড হয়, তখন কী হবে? হোয়াইট টাউন প্রোটেক্টেড থাকলে অনেকে বেঁচে যাবে।’

ক্লাইভ উদ্ধত ভঙ্গিতে পাইপের ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, ‘ইন ফিউচার এই শহরে ইংরেজদের সংখ্যা অনেক বাড়বে। বাড়িঘরের সংখ্যাও বাড়বে। শুধু হোয়াইট টাউন বলে কিছু থাকবে না। ইংরেজরা ছড়িয়ে পড়বে থ্রু আউট দ্য সিটি। কত জায়গায় খাত খুড়বেন আর পাঁচিল দেবেন?’

হলওয়েল গম্ভীর মুখে বললেন, ‘ইউ হ্যাভ নট ফেসড দ্য গ্রিম সিচুয়েশন লাস্ট ইয়ার।’

রজার ড্রেক শুধোলেন, ‘ডু ইউ হ্যাভ এনি অলটারনেটিভ প্ল্যান ইন ইওর মাইন্ড?’

ক্লাইভ বললেন, ‘আই অ্যাম প্রোপোজিং টু বিল্ড নিউ ফোর্ট উইলিয়াম অ্যাট গোবিন্দপুর।’

চোখ কপালে তুলে হলওয়েল বললেন, ‘দ্যাট উড বি অ্যাওয়ে ফ্রম দ্য মেইন টাউন।’

ক্লাইভ ঘাড় নেড়ে বললেন, ‘ইয়েস। বাট উই গেট দ্য ক্লিয়ার স্পেস।’

ড্রেক অসহিষ্ণু গলায় বললেন, ‘ইফ উই হ্যাভ টু ফেস দ্য গ্রেভ সিচুয়েশন এগেইন? দেন?’

ক্লাইভ বললেন, ‘দ্য ইংলিশ মেন ক্যান টেক টেম্পোরারি শেল্টার ইন দ্য ফোর্ট। আই ওয়ান্ট মোর স্পেস দ্যান ইউ প্রোপোসড।’

ব্রোহিয়ার শুধোলেন, ‘আপনি যতটা জায়গার কথা ভাবছেন, গোবিন্দপুরে তা কোথায় পাবেন?’

ক্লাইভ মুচকি হেসে বললেন, ‘আছে। আপনারা ভালো করে খুঁজে দেখেননি, তাই পাননি।’

মুখ গোমড়া হল ব্রোহিয়ার, ড্রেক ও হলওয়েলের।

ক্লাইভ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘টুমোরো আই উইল শো ইউ দ্য স্পট।’

সকলকে নিয়ে আজ সেই স্পট দেখাতেই চলেছেন ক্লাইভ। পথে অবশ্য অন্য একটা কাজের জন্য থামতে হবে তাঁকে।

পাশ থেকে নব মুনশি বলে উঠলেন, ‘হুজুর ওই যে গোরস্থান।’

ঘোড়ার রাশ টেনে ধরলেন ক্লাইভ।

সামান্য উঁচু, ঢিবির মতো জমি। বর্ষায় জলে ডোবে না। এ তল্লাটে সবুজ খুব ঘন। গোটা এলাকা জুড়ে রয়েছে বড়বড় গাছপালা। সবুজ পাতা ও ডালপালার আগ্রাসী বিস্তার আকাশকে প্রায় ছেয়ে ফেলেছে। স্যাঁতসেঁতে মাটি বুনো ঘাস, লতাগুল্মে আচ্ছাদিত। এটাই শহর কলকাতার বুকে ইংরেজদের গোরস্থান। এর পুব দিকে আছে কোম্পানির বারুদঘর—পাউডার ম্যগাজিন ইয়ার্ড। তার ওপাশে কোম্পানির হাসপাতাল। নামেই অবশ্য হাসপাতাল। না আছে ডাক্তার, না আছে ওষুধপত্র। সাহেবরাই ঠাট্টা করে বলে, কোনও পরিকাঠামো নেই বলেই হাসপাতাল থেকে গোরস্থানের দূরত্ব বড় কম।

ঘোড়া থেকে নেমে পড়ল সকলে।

গোরস্থানে প্রবেশের মুখে কাঠের তোরণদ্বারের উপরে খোদাই করে লেখা রয়েছে ‘ক্যালকাটা সেমেটারি’। ভিতরে এঁকেবেঁকে গিয়েছে পায়ে চলা সুঁড়ি পথ। মূল প্রবেশ পথের দু’পাশের কিছুটা এলাকা শাল গাছের খুঁটি পুতে, গাছের ডালপালা দিয়ে ঘিরে রাখা রয়েছে। এছাড়া গোটা এলাকাটা আগলহীন। বুনো জন্তু জানোয়ারের অবাধ বিচরণ ক্ষেত্র। যে কোনও সময় হানা দিতে পারে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার বা দাঁতাল বুনো শুয়োর। মাঝে মাঝে কবরের উপরের মাটি বর্ষার জলে ধুয়ে গিয়ে বেরিয়ে পড়ে গলিত শবদেহ। তার প্রতীক্ষায় বড় বড় গাছের মাথায় ওত পেতে বসে থাকে শকুন, হাড়গিলের দল। ঝোপের আড়াল থেকে উঁকি দেয় হায়না, শেয়াল। বিষধর সাপের আনাগোনা এ তল্লাটে কম নয়। সব মিলিয়ে এ স্থান বেশ বিপজ্জনক।

ভিতরে চলাচলের পথের দু’দিকে সার দিয়ে পরপর রয়েছে সমাধিগুলো। কোনও কোনও সমাধি স্রেফ মাটি চাপা দেওয়া, কোনও সমাধির উপরে সরু ইট বিছিয়ে পাকা করা হয়েছে। কোনও সমাধিকে ঘিরে গড়া হয়েছে ছোট্ট সমাধিমন্দির। যার যেমন সামর্থ। সমাধিক্ষেত্রের গড়ন দেখে বোঝা যায় একের সঙ্গে অন্যের বিত্তের তফাত। ফলকে খোদাই করা সাল-তারিখের খতেন বলে, যারা শায়িত রয়েছেন, তাদের বেশিরভাগেরই জীবনমুকুল অকালে ঝরে গিয়েছে। কারণ কলেরা বা বাংলার কুখ্যাত অজানা জ্বর।

মুর্শিদাবাদ থেকে কলকাতায় ফেরার পথে জাহাজেই জ্বরে আক্রান্ত হয়েছিলেন অ্যাডমিরাল ওয়াটসন। পক্ষকালের মধ্যেই হানা দিল যমদূত। কিছুদিন আগে এই গোরস্থানেই তাঁকে সমাহিত করা হয়েছে।

অ্যাডমিরাল ওয়াটসনের সমাধির সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন ক্লাইভ। তেকোনা টুপিটা হাতে নিয়ে নত মস্তকে ওয়াটসনের বিদেহী আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানালেন। ফুলের ঝুড়ি এগিয়ে দিলেন নবকৃষ্ণ। রাশি রাশি নানা রঙের ফুল গ্রেভের উপরে ছড়িয়ে দিলেন ক্লাইভ। ফুলে ঢেকে গেল কর্দমাক্ত মাটি।

ওয়াটসনের কবরের পাশে নতমস্তকে দাঁড়িয়ে আছেন ড্রেক, হলওয়েল, ওয়ালশ ও ব্রোহিয়ার।

ক্লাইভ স্বগতোক্তির ঢঙে বললেন, ‘ভেরি আনহ্যাপি ফেট।’

‘ইয়েস। আনটাইমলি কাট অফ ইন দ্য মিডস্ট অফ হিজ সাকসেস।’

ক্লাইভ বললেন, ‘হি মাস্ট বি ক্রাউন্ড উইথ গ্লোরি অ্যান্ড রেপুটেশন। কোম্পানির সার্ভিসে ওঁর ডেডিকেশন অ্যান্ড সাকসেস উইল মেক হিজ মেমোরি পারটিকুলারলি ইন ইন্ডিয়া সারভাইভ টু লেটেস্ট এজেস। উই মাস্ট কনস্ট্রাক্ট অ্যা ডিসেন্ট টুম্ব হিয়ার।’

ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালেন সকলে।

মি ব্রোহিয়ারের উদ্দেশে ক্লাইভ বললেন, ‘প্লিজ প্লেস অ্যা প্ল্যান ড্রয়িং অ্যাট দ্য আরলিয়েস্ট।’

‘ইয়েস স্যার।’

‘স্যার!’ হঠাৎই তীব্র চিৎকার করে উঠে ঝাঁপিয়ে ক্লাইভকে মাটিতে শুইয়ে দিল স্ট্রন।

হতচকিত হয়ে গেল সকলে।

চকিতে কোমরবন্ধনী থেকে পিস্তল বের করে স্ট্রন ফের চেঁচিয়ে উঠল, ‘সি দ্য স্নেক।’

উপরের দিকে তাকিয়ে হাড় হিম হয়ে গেল সকলের। গাছ থেকে ঝুলছে এক বিষধর গোখরো সাপ। তার চকচকে অচঞ্চল দেহটাই এক বীভৎস ভয়ের প্রতিচ্ছবি। আর একটু হলেই ছোবল মারত ক্লাইভের মাথায়। এখনও ফনা তুলে আছে সেই বিষাক্ত, ভয়ংকর সরীসৃপ।

বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে উঠে দাঁড়ালেন ক্লাইভ।

ট্রিগার টিপল স্ট্রন। গুড়ুম।

অব্যর্থ নিশানা। গাছ থেকে ছিটকে পড়ল সাপটা। মাথাটা একেবারে গুঁড়িয়ে গিয়েছে।

গোরস্থান থেকে দ্রুত বেরিয়ে এল গোটা দলটা। ফের ঘোড়ার পিঠে উঠে বসল সকলে। ঘোড়সওয়ার বাহিনী এবারে ছুটে চলল গোবিন্দপুরের উদ্দেশে।

পথের দু’পাশে ধানক্ষেত জলে ডুবে একেবারে দিগন্ত বিস্তৃত লেকের চেহারা নিয়েছে। মাঝে মাঝে রয়েছে ডোবা, জলা, বুনো ঝোপ, বড় বড় গাছ। ফাঁকেফোকরে উঁকি দিচ্ছে গোলপাতায় ছাওয়া দরিদ্র মানুষের কুটির। পথে এতটাই কাদা যে খুব জোরে ছুটতে পারছে না ঘোড়া। ঢিমে তালে চলেছে। কিছুটা এগিয়ে পশ্চিমদিকে বাঁক নিল ঘোড়সওয়ার বাহিনী।

ধানক্ষেত ফুরিয়ে গিয়ে এবারে জঙ্গল ক্রমশ বাড়ছে। সরু পথ ধরে নদীর প্রায় কিনারায় এসে পৌঁছলেন ক্লাইভ। ঘাসে ঢাকা সামান্য উঁচু ঢিবির মতো এক খণ্ড জমির উপরে উঠে ঘোড়ার রাশ টেনে ধরলেন। অদূরে দেখা যাচ্ছে হুগলি নদী। হলওয়েল, ড্রেক ও ব্রোহিয়ার হাঁ হয়ে গেলেন। কেউই বুঝে উঠতে পারছেন না, এখানে কোথায় কেল্লা গড়ার কথা ভাবছেন কর্নেল ক্লাইভ। চারিদিকে হেঁতাল, গোলপাতা, ম্যানগ্রোভের ঘন জঙ্গল। রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের আদর্শ বাসভূমি।

হলওয়েল অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘এখানে কেল্লা?’

ক্লাইভ বললেন, ‘ইয়েস। হোয়াই নট?’

ড্রেক পরম বিস্ময়ের সঙ্গে বললেন, ‘উইদিন দিস টাইগার উড?’

ক্লাইভ জবাব দিলেন, ‘জঙ্গল কেটে সাফ করতে হবে।’

ব্রোহিয়ার বেজার মুখে বললেন, ‘লো ল্যান্ড এরিয়া।’

‘মাটি ফেলে উঁচু করে দিলেই হল।’

ব্রোহিয়ার ফের বললেন, ‘ইভেন অ্যা হাই টাইড উড ইনানডেট দ্যাট ল্যান্ড।’

ক্লাইভ বললেন, ‘আগে গঙ্গার তীর বরাবর পাথর গেঁথে বাঁধ দিতে হবে। জঙ্গল কেটে সাফ করে দিলে চমৎকার একটা জায়গা বেরিয়ে আসবে। এবারে পিছন দিকে তাকিয়ে দেখুন পিছনে কত খানি ক্লিয়ার স্পেস রয়েছে। বাড়িঘরের আড়ালে লুকিয়ে সাডেনলি দুর্গের কাছে আসতে পারবে না এনিমি। আপনারা কেল্লার কথা ভাবছিলেন ক্রাউডেড এলাকায়। পুরোনো ফোর্ট উইলিয়ামও ছিল ক্রাউডেড এরিয়ায়। সেই কারণে গত বছরে নবাবের ফৌজ খুব বেশিমাত্রায় জখম করতে পেরেছিল কেল্লাকে। গোলা ছুড়ে নবাবের ফৌজকে আটকাতে পারেননি আপনারা। গোলা গিয়ে ধাক্কা খেয়েছিল আমাদেরই ঘরবাড়ির গায়ে। চন্দননগরে ফরাসিদের ফোর্টও ছিল কনজেস্টেড এরিয়ায়। তাই ফরাসিদের ফোর্ট অ্যাটাক করার কাজটা আমাদের কাছে খুব সহজ হয়ে গিয়েছিল।’

অবশেষে ব্রোহিয়ার, ড্রেক, হলওয়েল মানতে বাধ্য হলেন যে ক্লাইভ যে জায়গাটা বেছেছেন, সেটা সত্যিই দুর্গ গড়ে তোলার জন্য আদর্শ স্থান। নতুন প্ল্যান তৈরি করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন ব্রোহিয়ার। দিন সাতেকের মধ্যেই ক্লাইভের উপস্থিতিতে কয়েকশো মজুর, কাঠুরিয়া কুঠার, কোদাল, বেলচা নিয়ে লেগে পড়ল জঙ্গল সাফ করার কাজে। কলকাতার বুকে নতুন ফোর্ট উইলিয়াম গড়ে তোলার কাজ শুরু হয়ে গেল।

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *