1 of 2

পলাশির পরে – ২৮

২৮

সব মিলিয়ে কুড়ি পঁচিশটা বজরা, নৌকো ও সুলুপ। ভাগীরথীর জল ভেঙে এগিয়ে চলা নৌবহরের ঠিক মাঝের বিলাসবহুল বজরার আরোহী রবার্ট ক্লাইভ। ফিরে চলেছেন কলকাতায়।

বজরার ছাতে খাটানো চাঁদোয়ার নীচে আরামকেদারায় গা এলিয়ে প্রসন্ন চিত্তে নিজের কামালিয়তের কথা ভাবছিলেন ক্লাইভ। একজন আবদার এসে পাশে রেখে গেল আলবোলা।

খানিকবাদে নবকৃষ্ণ এসে ক্লাইভের অদূরে একটা নীচু চৌপাইয়ের উপরে বসল।

একদৃষ্টে নদীর পাড়ের দিকে চেয়ে রয়েছেন ক্লাইভ। আকাশ আজ মেঘমুক্ত ও ঝকঝকে। চন্দননগর পার হচ্ছে নৌবহর। নদীর পশ্চিম তীর ঘেষে চলেছে ক্লাইভের বজরা। ফোর্ট অঁরলিও দুর্গটা তাঁর চোখে পড়ল। দুর্গের সর্বাঙ্গে ভয়ানক ক্ষতচিহ্ন। চেহারা কঙ্কালসার। নিস্তব্ধ, নিশ্চুপ, পরিত্যক্ত ফরাসিদের কেল্লা যেন প্রেতাত্মার মতো দাঁড়িয়ে আছে।

গত মার্চে ফরাসিদের বাণিজ্য বিস্তারের স্বপ্ন চুরমার করে দিয়েছেন ক্লাইভ। চন্দননগর ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছে ফরাসি বণিকেরা। গোলার আঘাতে ভেঙে পড়া কেল্লার এক বুরুজের দিকে চেয়ে নিজের অজান্তেই নিষ্ঠুর আনন্দের এক হাসি খেলে গেল ক্লাইভের মুখে। পাশে চৌপাইয়ের উপরে রাখা দূরবীনটা দ্রুত টেনে নিলেন তিনি। তাতে চোখ লাগিয়ে ফরাসিদের দুর্গের দিকে চেয়ে সজোরে হেসে উঠলেন। তারপর দূরবীনটা নবকৃষ্ণর দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘দ্যাখো মুনশি দ্যাখো।’

নবকৃষ্ণ দূরবীনে চোখ রাখলেন।

ক্লাইভ তর্জনী উঠিয়ে বললেন, ‘ওই ভাঙা বুরুজটার দিকে তাকাও।’

ক্লাইভের অঙ্গুলিসংকেত লক্ষ করে তাকালেন নবকৃষ্ণ।

‘দেখেছ?’

নবকৃষ্ণ হেসে বলে, ‘চমৎকার। ভাঙা বুরুজের মাথায় বসে আছে একপাল শকুন।’

‘রাইট। ভালচারস।’ এই বলে ফের সজোরে হেসে উঠলেন ক্লাইভ।

চোখ থেকে দূরবীন নামিয়ে নবকৃষ্ণ বললেন, ‘আপনার কামালিয়তের নিশান।’

ক্লাইভ বললেন, ‘ওই বুরুজের মাথায় ফরাসিদের মস্ত নিশানটা উড়ত।’

‘এখন শকুনে নেত্য করছে।’

ফোর্ট অঁরলিও পার হয়ে এগিয়ে চলল নৌবহর।

ফরসির নলটা টেনে নিয়ে ক্লাইভ বললেন, ‘যে কাজে এসেছিলাম, তা ফুরিয়ে গেল মুনশি।’

নবকৃষ্ণ বলেন, ‘মনে পড়ে হুজুর, পলাশিতে রওনা হওয়ার আগে এই চন্দননগরের ঘাটে দাঁড়িয়েই বলেছিলাম, আপনার কুদরতি তুজুক হয়ে যাবে। হল কিনা?’

‘এবারে কী করা যায় বল তো?’

‘কাজ তো আছেই। আপনার পোষ্য ইয়ে নবাবের দেখভাল।’

মুচকি হাসলেন ক্লাইভ। ‘সে জন্য স্ক্র্যাফটন আছে। ওয়ারেন আছে। আমি কী করি?’

 ‘আপনি কাজের মানুষ। কাজ ঠিক জুটে যাবে। আপাতত কিছুদিন আয়েশ করুন।’

‘ও আমার নসিবে নেই। মাদ্রাজে ফেরার জন্য ঘন ঘন রিমাইন্ডার আসছে বুঝলে?’

‘ফিরে যাবেন?’ বিমর্ষ মুখে প্রশ্ন করে নবকৃষ্ণ।

‘সাউথে নাকি ফরাসিদের সঙ্গে জোর লড়াই বাধতে পারে।’

‘আপনি চলে গেলে বাংলায় যে ফের গোলমাল পেকে উঠবে। নবাবের কী হাল হয়েছে সে তো নিজের চোখেই দেখে আসলেন। রায়দুর্লভ ঘুটি সাজাচ্ছে। হানা দিতে পারেন সুজাউদ্দৌলা, হামলে পড়তে পারে বর্গিরা। এতসব ঝক্কি পোহাবে কে?’

মৃদু হাসি মুখে এনে ক্লাইভ বলেন, ‘না মুনশি। এখনই ফিরে যাচ্ছি না আমি। অ্যাডমিরাল ওয়াটসন ফিরে যাবেন জাহাজগুলো নিয়ে। তার সঙ্গে মেজর আয়ারকুটকে পাঠিয়ে দেব। উইথ অ্যা বিগ কনটিনজেন্ট।’

‘যাক। বড় নিশ্চিন্ত হলাম হুজুর।’

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ক্লাইভ বললেন, ‘একটা কথা কয়েকদিন ধরেই ভাবছি মুনশি। আই নিড ইওর হেল্প।’

‘বলুন হুজুর। আপনার হুকুম তামিল করতে বান্দা হাজির।’

ক্লাইভ বললেন, ‘উই ওয়ান দ্য ব্যাটেল অফ প্ল্যাসি। লেকিন সেলিব্রেশন কোথায়?’

‘কী বলতে চাইছেন, একটু খোলসা করে বলুন হুজুর।’

‘তোমরা প্ল্যাসির ভিকট্রিটা সেলিব্রেট করতে পার না?’

নবকৃষ্ণ একগাল হেসে বললেন, ‘সে তো হচ্ছেই হুজুর। কলকাতায় ফিরে দেখবেন, মহল্লায় মহল্লায় ফূর্তির বান ডেকেছে। কোম্পানির কামালিয়তের কথা জেনে লোকে একেবারে ডগমগ। সুতানুটিতে নাকি কোম্পানির নিশান উড়িয়ে নেত্য করছে লোকে। লিটেরালি ড্যান্সিং।’

গম্ভীর মুখে ফরসির নলে টান দিয়ে ক্লাইভ বললেন, ‘বাট রেস্ট অফ দ্য বেঙ্গল? আই ওয়ান্ট সেলিব্রেশন অল ওভার বেঙ্গল উইথ পম্প অ্যান্ড শো।’

কথাটা শুনে থমকে গেলেন নবকৃষ্ণ।

ক্লাইভ দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন তীরের দিকে। ভেসে আসছে ঢাকঢোলের শব্দ, উলুধ্বনি। গাঁয়ের মেয়েবউয়েরা জড়ো হয়েছে এক বটবৃক্ষের নীচে। দূরবিনে ফের চোখ রেখে ক্লাইভ বললেন, ‘অ্যা রিলিজিয়াস ফেস্টিভাল।’

নবকৃষ্ণ বললেন, ‘আজ মনসাদেবীর পুজো। তারই ভিড়।’

ক্লাইভ কৌতূহলী চোখে মুনশির দিকে তাকালেন।

‘স্নেক গডেস।’ বললেন নবকৃষ্ণ।

‘কত রকমের গড আর গডেস তোমাদের! ভাবলেই মাথা ঘোরে।’

নবকৃষ্ণ বলেন, ‘গাঁ-গঞ্জে সাপের বড় উপদ্রব। সর্প-দংশন থেকে বাঁচার কামনায় এই পুজো।’

অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছেন ক্লাইভ। নব মুনশির কথাটা ঠিক শুনলেন না। তটভূমির পানে চেয়ে কতকটা স্বগতোক্তির ঢঙে বললেন, ‘গডেস! দ্যাট উইল বি আ গুড আইডিয়া।’

নবকৃষ্ণ হাঁ মুখ করে ক্লাইভের দিকে চেয়ে রইলেন। সাহেবের চিন্তাস্রোতের তল পাচ্ছেন না।

ক্লাইভ বললেন, ‘পলাশির কামালিয়ত তামাম বাংলা জুড়ে সেলিব্রেট করার জন্য তোমরা একটা রিলিজিয়াস ফেস্টিভ্যালের আনজাম করতে পার না?’

এ কঠিন কাজ। কোনও সন্দেহ নেই। নবকৃষ্ণ ডুব দেন গভীর চিন্তায়।

ক্লাইভ উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। ‘কোম্পানির সাকসেসের জন্য সেলিব্রেশন অল ওভার বেঙ্গল—অ্যা গ্র্যান্ড ফিস্ট অফ দ্য জেন্টুস—অ্যারেঞ্জ করা যায় না?’

‘সেই উপায়ই তো হাতড়াচ্ছি হুজুর।’ গালে হাত বুলোতে বুলোতে বলেন নবকৃষ্ণ।

ফরসির নল মুখে দিয়ে আনত চোখে ভাবতে থাকেন ক্লাইভও। হঠাৎ বলে ওঠেন, ‘তোমরা তো কথায় কথায় কালীঘাটে যাও। উইশ ফুলফিলমেন্টের জন্য পুজো কর। তা পলাশিতে কোম্পানির কুদরতির জন্য একটা পুজোর আয়োজন করা যায় না? সেই পারপাসে সারা বাংলা জুড়ে ফূর্তি হবে, আমোদ হবে বেশ কয়েকদিন ধরে।’

নবকৃষ্ণ চোখ গোল্লা করে চেয়ে থাকেন ক্লাইভের মুখপানে। তাঁর মনসুবা এবারে খুব স্পষ্ট হয়ে ধরা দেয় নবকৃষ্ণর চোখে। কী তুখোড় কৌশল! পুজোর নামে, উৎসবের নামে সারা বাংলা জুড়ে হিন্দুসমাজকে মাতিয়ে দিয়ে তাদের কাছে টানতে চাইছেন তিনি।

ভিন দেশে বাণিজ্য করতে এসে সে দেশের নবাবকে উৎখাতের দায় যে কোম্পানির ঘাড়ে এসে পড়েছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। কী উদ্দেশ্য এদের? এই ভেবে প্রজাদের একটা অংশ বাঁকা চোখে তাকাচ্ছে কোম্পানির দিকে। ক্লাইভ নিজেও বুঝতে পারছেন সে কথা। নীতির তুলাদণ্ডে বিচার করলে এ কাজ অবশ্যই অনৈতিক। পলাশি জয়ের নামে সারা দেশকে উৎসবে মাতিয়ে কার্যত সকলের নজর ঘুরিয়ে দিতে চাইছেন ক্লাইভ। উৎসবে লোককে মাতিয়ে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন, না, কোম্পানি কোনও অনৈতিক কাজ করেনি। স্বৈরাচারী নবাবকে মসনদ থেকে সরিয়ে এদেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে। তাই আমোদ, তাই ফূর্তি, তাই উৎসব, তাই আশরত। যা জোরদার প্রচার করা যায়, মানুষ তাই বিশ্বাস করে। বেড়ে বুদ্ধি।

কিন্তু সাহেবের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করতে হলে কী করা যায়। ভেবে কুল পান না নবকৃষ্ণ।

 ‘এই ভাবে ভাব—নবাব সিরাজদ্দৌলা ওয়াজ অ্যান ইভিল পাওয়ার। তাকে ডেস্ট্রয় করেছে কোম্পানি। যেভাবে তোমাদের গডেস কালী ইভিল পাওয়ারকে ডেস্ট্রয় করে। বেসিক্যালি ইট উইল বি অ্যা সেলিব্রেশন ফর দ্য সাকসেস অফ অ্যা বেনেভোলেন্ট পাওয়ার। সারা বাংলা জুড়ে একটা কালীপুজোর আয়োজন করা যায় না?’ ধূর্ত ক্লাইভের দুচোখ চকচক করে ওঠে।

স্বগতোক্তির ঢঙে নবকৃষ্ণ বলেন, ‘কালীপুজো?’

ক্লাইভ বলেন, ‘কান্ট ইউ মেক ইট অ্যা বিগ ফেস্টিভ্যাল? উপায় বাতলাও মুনশি।’

নবকৃষ্ণ খানিকটা বিরস মুখে বলেন, ‘হুজুর কালীপুজো তো একদিনের। তাতে আর আমোদ-আহ্লাদ কতটা হবে? তাছাড়াও ও পুজো হয় গভীর রাতে। কালীপুজোর হুজুগে গোটা দেশকে মাতিয়ে তোলা কঠিন।’

ক্লাইভ বললেন, ‘তোমাদের তো অনেক রকমের গডেস আছে, তাহলে অন্য কোনও পুজো।’

হঠাৎই প্রবল উৎসাহের সঙ্গে নবকৃষ্ণ বলে ওঠেন, ‘উপায় আছে হুজুর। দুর্গাপুজো।’

‘বেশ তারই আয়োজন কর।’ খুশি গলায় বললেন ক্লাইভ।

‘সুবে বাংলার বেশির ভাগ হিন্দু জমিদার বাড়িতে ওই পুজো হয় বসন্তকালে।’

‘বসন্তকাল? মতলব?’

‘স্প্রিং হুজুর স্প্রিং। মার্চের দিকে।’

চোখ প্রায় কপালে তুলে ক্লাইভ বললেন, ‘মার্চ! দ্যাট উইল বি টু লেট।’

বিরস মুখে নবকৃষ্ণ বললেন, ‘তা অবিশ্যি ঠিক।’

ক্লাইভ বললেন, ‘সাকসেসের পর সেলিব্রেশন কুইকলি না হলে তার ইমপ্যাক্ট থাকে না।’

প্রবল উত্তেজনায় সহসা চেঁচিয়ে উঠলেন নবকৃষ্ণ, ‘উপায় আছে হুজুর। অকালবোধন।’

উৎসাহের সঙ্গে নবকৃষ্ণের মুখপানে চাইলেন ক্লাইভ।

নবকৃষ্ণ বললেন, ‘রাবণ বধের আগে মা দুর্গার আরাধনা রামচন্দ্র করেছিলেন শরৎকালে।’

রাবণ, মা দুর্গা, রামচন্দ্র, শরৎকাল একসঙ্গে এতগুলো দুরূহ শব্দের ধাক্কায় তালগোল পেকে গেল ক্লাইভের মাথার মধ্যে। ভুরু কুঁচকে তাকালেন মুনশির মুখপানে।

‘শরৎ মিন্স অটাম হুজুর অটাম। খুব দূরে নয়। বেশ কয়েকদিন ধরে জাঁকজমক হইহুল্লোড় হতে পারে। ভাদ্রকৃষ্ণ নবমীতে দেবীর বোধন। তদবধি আশ্বিন শুক্ল নবমী। টানা ষোলো দিনের পুজো। সিক্সটিন ডেজ।’ এক নিঃশ্বাসে বলে গেলেন নবকৃষ্ণ।

‘দ্যাটস নাইস।’

নবকৃষ্ণ বলেন, ‘সিংহবাহিনী মা দুর্গা, অসুর নিধনে রত। মায়ের মূর্তিটাই বড় জাঁকের।’

‘অসুর কী?’ প্রশ্ন করেন ক্লাইভ।

চোখ গোল্লা করে নবকৃষ্ণ বলেন, ‘ডেমন।’

‘আই সি। দ্যাট মিনস ইভিল পাওয়ার।’

‘সহি আন্দাজ করেছেন হুজুর। স্ট্যান্ডিং অন দ্য ব্যাক অফ লায়ন, মাদার গডেস কিলিং অসুর।’

‘ভেরি গুড। পারবে তো ওই সময়ে সারা বাংলা জুড়ে এই ফেস্টিভ্যাল অ্যারেঞ্জ করতে?’

নবকৃষ্ণ জোশের সঙ্গে বলেন, ‘ভাববেন না হুজুর, আপনার খায়েশ পূরণ করবে এই বান্দা। শুধু নদিয়ার মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রকে ডেকে আপনি একটু কড়কে দিয়ে বলবেন বসন্তে নয়, এই শরতে সারা বাংলার সব জমিদার বাড়িতে দুর্গাপুজো করা চাই। সে যেমন তেমন পুজো নয়, খুব জাঁকের পুজো হতে হবে। কৃষ্ণচন্দ্রই হালে হিন্দুসমাজের মাথা কি না। উনি হুকুম করলে সবাই শুনবে।’

ক্লাইভ হেসে বললেন, ‘বেশ বলে দেব। পুজোয় আম-আদমিদের ঘটা করে খাওয়াতে হবে। আই ওয়ান্ট অ্যা গ্র্যান্ড ফিস্ট। আদার ওয়াইজ ইউ কান্ট ইনভলভ কমন পিপল।’

‘তাও হবে। সুতানুটিতে ও দায়িত্ব আমার। কিন্তু হুজুর যেমনটা আপনি চাইছেন, ওই গ্র্যান্ড ফিস্টের কথা শুনলে অনেক জমিদারের মুখ গোমড়া হতে পারে।’

‘তাঁরা নারাজ হবে বলছ?’

‘নারাজ ঠিক নয়। আপনার মুখের উপর কি না বলার হিম্মত হবে কারও?’

‘তাহলে?’

‘আসলে হুজুর বিশাল খরচের ধাক্কা সকলের ঘাড়ে পড়বে তো? জমিদার হলে কী হবে, দরাজ দিল আর ক’জনের?’

‘নবাবকে বলে না হয় কিছুটা খাজনা মকুবের ব্যাবস্থা করে দেব। সেই টাকাতে উইথ গ্র্যান্ডিওর ফেস্টিভ্যাল অ্যারেঞ্জ করুক সকলে।’

নবকৃষ্ণ মাথা ঝুঁকিয়ে বলেন, ‘হুজুর আপনি সত্যিই অবতার। মোক্ষম পথ বাতলেছেন।’

দুর্গাপুজোর আয়োজনের কল্পনায় বেশ উত্তেজিত হয়ে পড়লেন নবকৃষ্ণ। মানসচক্ষে যেন নিজের গৃহে আয়োজিত পুজোর জলুসটা দেখতে পাচ্ছেন তিনি। দৃষ্টি শূন্যে ভাসিয়ে তিনি বলে চলেন, ‘দেখবেন হুজুর সুতানু্টি-কলকাতা-গোবিন্দপুর জুড়ে কী কাণ্ড ঘটিয়ে বসি। আমার গৃহেই পুজোর এলাহি আয়োজন করব। ষোলো দিন ধরে নাচা-গানা, খানা-পিনা হবে। কবিগান হবে, কেষ্টযাত্রা হবে, পুতুলনাচ হবে, বাই-নাচ হবে। বিশাল এলাকা জুড়ে শয় শয় তাবু পড়বে। ভিয়েন বসবে। ঝাড়বাতির আলোয় ঝলমল করবে ঠাকুরদালান। হাজার হাজার লোকলস্কর জড়ো করে এমন কাণ্ড ঘটাব না হুজুর, তামাম বাংলা জুলজুল চোখে চেয়ে দেখবে।’

ক্লাইভ হাততালি দিয়ে বলে উঠলেন, ‘বিউটিফুল। এমনই তো আমি চাইছিলাম।’

নবকৃষ্ণ বললেন, ‘পুজোর দিনে আমার গৃহে কিন্তু আসতেই হবে আপনাকে। আগাম দাওয়াত দিয়ে রাখলাম। আমি জানি কৃষ্ণচন্দ্র আপনাকে নদিয়ায় নিয়ে যাওয়ার জন্য ঝুলোঝুলি করবেন।’

ক্লাইভ হেসে বললেন, ‘নদিয়া নয়, তোমার হাভেলিতেই আমি যাব।’

উৎসাহে, আনন্দে ঝকঝক করছে নবকৃষ্ণর চোখমুখ। তিনি বললেন, ‘আর একটা কথা হুজুর। আমার জন্য একটা তোপ বরাদ্দ করবেন। পলাশির তোপ। স্মারক হিসেবে মাথায় করে রেখে দেব। সেই তোপের গর্জন দিয়ে শুরু হবে মায়ের সন্ধিপুজো।’

গুড়ুম! সহসা ভেসে এল তোপধ্বনির আওয়াজ। বজরার আনাচেকানাচে বসে থাকা জলচর পাখির দল চমকে গিয়ে উড়ল আকাশে। ক্লাইভ ও নবকৃষ্ণ দু’জনেই কেঁপে উঠলেন। কথায় কথায় অনেকটা সময় অতিবাহিত হয়ে গিয়েছে। ক্লাইভের বজরা তখন পেরিন পয়েন্ট অতিক্রম করছে। অদূরে সুতানুটি। ফের গর্জন করে কামান।

নবকৃষ্ণ হেসে বললেন, আপনাকে ওয়েলকাম জানানোর জন্য তোপ দাগছে পেরিন পয়েন্ট।

কুরসি ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন ক্লাইভ।

.

কেল্লাঘাটে ভিড়ল ক্লাইভের বজরা।

বজরা থেকে নেমে দেখলেন গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে আছেন গভর্নর ড্রেক, হলওয়েল ও কাউন্সিলের অন্যান্য মেম্বাররা। এত বড় একটা লড়াই জিতে, কোম্পানির ভবিষ্যৎকে মজবুত জমির উপরে দাঁড় করিয়ে ফিরলেন, অথচ তাঁর কলিগদের মধ্যে কোনও আনন্দ উচ্ছ্বাস নেই! বেশ হতাশ হলেন কর্নেল ক্লাইভ।

হলওয়েল এগিয়ে এসে বললেন, ‘ওয়েলকাম কর্নেল। উই আর হেয়ার টু রিসিভ ইউ উইথ অ্যা ভেরি স্যাড নিউজ। অ্যাডমিরাল ওয়াটসন ইজ নো মোর।’

‘হোয়াট?’

‘হি এক্সপায়ার্ড অ্যা ফিউ ডেজ এগো।’

ক্লাইভ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন বেশ কিছুক্ষণ। তারপরে শুধোলেন, ‘কী হয়েছিল?’

ড্রেক বললেন, ‘দ্যাট ডেডলি ফিভার অফ বেঙ্গল।’

চার্লস ওয়াটসন। হিন্দুস্তানে কোম্পানির বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষার জন্য ইংল্যান্ডের রাজার পাঠানো নৌবহরের প্রধান। এককথায় রাজার প্রতিনিধি। ওদিকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারী কর্নেল ক্লাইভ। দুজনের মধ্যে কে বড়? কার হুকুমে চলবে কোম্পানির ফৌজ? এই নিয়ে দুজনের মধ্যে ব্যক্তিত্বের সংঘাত বাধত প্রায়ই। আবার ইংরেজদের স্বার্থের কথা ভেবে সেসব মিটেও যেত দ্রুত। কখনও কম্প্রোমাইজ করতেন ক্লাইভ, কখনও ওয়াটসন। কিন্তু লড়াইয়ের ময়দানে ওয়াটসনের সঙ্গে ক্লাইভের তালমিল ছিল অনবদ্য। হিন্দুস্তানের দক্ষিণ উপকূল, পশ্চিম উপকূল তারপরে সুবে বাংলা। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এদেশে লড়াই করেছেন দু’জনে। ফলতা থেকে বজবজ, থানা, কলকাতা, হুগলি, চন্দননগর হয়ে পলাশি। কত স্মৃতি! কত কাহিনি!

চুপচাপ সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগলেন উপরে।

তার পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে ড্রেক বললেন, ‘ফ্রেঞ্চ আর অ্যাট ওয়ার উইথ আস ইন ম্যাড্রাস। সিচুয়েশন ইজ নট ভেরি গুড ইন আওয়ার ফেভার। কাউন্ট লালি বিইংগ অ্যাপয়েন্টেড অ্যাজ ফ্রেঞ্চ গভর্নর জেনারেল অ্যাপ্রোচিং পণ্ডিচেরি উইথ অ্যা বিগ ফোর্স। মিস্টার পিগট ওয়ান্টস ইওর প্রেসেন্স ইন ম্যাড্রাস অ্যাট দ্য আরলিয়েস্ট।’

ক্লাইভ কোনও জবাব দিলেন না। নীরবে সিঁড়ি ভাঙতে লাগলেন।

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *