১৩
জরুরি দরবার বসেছে হিরাঝিল প্রাসাদে। মসনদে আসীন মিরজাফর। তাঁর দুপাশে বসে আছেন রায়দুর্লভ ও জগৎশেঠ মহাতপচাঁদ। সকলেরই মুখের অভিব্যক্তিতে প্রকাশ পাচ্ছে উৎকণ্ঠা।
জগৎশেঠের পাশে মিরন। উত্তেজনায় সে স্থির হয়ে বসতে পারছে না। বারবারই কুরসি ছেড়ে উঠে দাঁড়াচ্ছে। তাগদ-জোশ-জলুস সব হারানো বেদৌলত, বেইজ্জত, সিরাজদ্দৌলার বিধ্বস্ত, যন্ত্রণাক্লিষ্ট চেহারাটা দেখে খুশিতে ফেটে পড়ার অপেক্ষায় রয়েছে মিরন। সেই সঙ্গে তার মনে উঁকি দিচ্ছে লুৎফুন্নেসার খুবসুরত মুখটা। আপাতত চেহেল সেতুনে বন্দিনী হয়ে আছে লুৎফা। দীর্ঘকাল ধরে ধরে যে নারীকে সে মনের গহীনে কামনা করেছে, সে আজ তার হাতের মুঠোয়। লুৎফাকে নিয়ে রংদার তসবির মনের পর্দায় আঁকতে আঁকতে সুখের আবেশে মিরন বিভোর। আশনাই-আশরতের খোয়াবে মশগুল।
রায়দুর্লভের পাশে মিরকাশিম বসে আছেন শান্ত হয়ে। সকলের তারিফদারি পেয়ে তাঁর চিত্ত প্রসন্ন। তাঁর পিঠ চাপড়ে বাহবা দিয়েছেন মিরজাফর, রায়দুর্লভ ও জগৎশেঠ। তবে মিরন এ ব্যাপারে নিরুত্তাপ। খুশি মনে সে একবারও মিরকাশিমকে তারিফ জানায়নি। বরং আড়ালে বলছে, এর মধ্যে মিরকাশিমের কুদরতি কোথায়? পলাতক সিরাজ আজ না হলে কাল তো ধরা পড়তই। হাজার হাজার কসিদের নজর এড়িয়ে সুবে বাংলায় সিরাজের পক্ষে নিজেকে লুকিয়ে রাখা তো কোনওভাবেই সম্ভব ছিল না। যেকোনও আনপঢ় আদমিও সিরাজকে গ্রেফতার করতে পারত।
ভাঙের নেশা আর নারীবিলাসে মজেছেন মিরজাফর। এতেই বুদ হয়ে থাকেন দিনরাত। নিজামত চলে মিরনের খায়েশে। সম্বন্ধীর কাছ থেকে তারিফ না পেলেও একটি ঘটনায় মিরজাফরের দামাদ খুব খুশি। মোরাদবাগ থেকে একটা চিরকুট এসে পৌঁছেছে তাঁর হাতে। কর্নেল ক্লাইভ পাঠিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘বহুত সুক্রিয়া। আপনার কুদরতিতে তামাম সুবে বাংলা সত্যিই এবার খুশি মানাতে পারবে।’ মিরকাশিমের কামালিয়তকে স্বীকৃতি দিয়েছেন স্বয়ং কর্নেল ক্লাইভ। আর কী চাই?
সহসা বেজে উঠল কাড়ানাকাড়া। সিরাজদ্দৌলাকে নিয়ে দরবার ঘরে প্রবেশ করল পেয়াদারা। গোটা দরবার আলো করা প্রকাণ্ড বেলোয়ারি ঝাড়বাতির নীচে এসে দাঁড়ালেন সিরাজ। কোমরে বাঁধা দড়ি। হাতদুটো পিছমোড়া করে বাঁধা। পায়ে লোহার বেড়ি।
মিরজাফর, রায়দুর্লভ, জগৎশেঠ—সকলেরই চোখগুলো বিস্ফারিত হয়ে উঠল। কে দাঁড়িয়ে আছে তাদের সামনে? ইনি সিরাজদ্দৌলা? শেষ দেখা হয়েছিল পলাশির প্রান্তরে। নবাবের উষ্ণীষটা তখনও ছিল তাঁর মাথায়। বিপদ বুঝে উটের পিঠে চেপে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন। সেদিন ছিল ২৩ জুন, আজ ২ জুলাই। প্রায় দশ দিন পরে ফের সামনাসামনি দু’তরফের মোলাকাত।
এ ক’দিনে কী চেহারা হয়েছে সিরাজের? কোথায় সেই সুকুমার মুখমণ্ডলে ভেসে থাকা রাগী চোখদুটো? কোথায় সেই গুমানি? এ যে জীবনযুদ্ধে হেরে যাওয়া একজন অসহায় মানুষ। দেহের উজ্জ্বল গৌরবর্ণে যেন কালি ঢেলে দিয়েছে কেউ। কোটরাগত চোখদুটো ক্লান্তিতে যেন বুজে আসতে চাইছে। সত্যিই কি ইনি আলিবর্দির দৌহিত্র মনসুর-উল-মুলক—সিরাজদ্দৌলা—শাহকুলি খাঁ—মিরজা মহম্মদ—হায়বৎজঙ্গ বাহাদুর? যাঁকে চোখের সামনে বচপনকাল থেকে বেড়ে উঠতে দেখেছেন এই প্রবীণ মানুষেরা, কয়েকদিন আগেও যিনি ছিলেন তামাম সুবে বাংলার নবাব, যাঁর হাতে কোতল হওয়ার ভয়ে সদা শঙ্কিত ছিলেন মিরজাফর, জগৎশেঠ, রায়দুর্লভ, তিনিই আজ বন্দি হয়ে তাদের সামনে বিচারপ্রার্থী? এই উলটপুরাণ কোনও খোয়াব নয়তো?
গিরদায় ঠেস দিয়ে কাত হয়েছিলেন মিরজাফর। সিরাজদ্দৌলাকে দেখে বিস্মিত চোখে সোজা হয়ে বসলেন। সিরাজের তৈরি হিরাঝিলে, তাঁরই চোখের সামনে মসনদে আসীন মিরজাফরের মনের গহীনে কোথায় যেন কাঁটা বিঁধছে। আলিবর্দির মতো বাহুবলে মসনদ দখল করেননি তিনি। সুবে বাংলার নবাবের বিরুদ্ধে মাত্র আড়াই হাজার সেনা নিয়ে কামেয়াব হওয়ার কথা নয় ইংরেজদের। চল্লিশ-পঞ্চাশ হাজার ঘোড়সওয়ার নিয়ে এসেও বারো বছরে বাংলার নবাবকে কাবু করতে পারেনি বর্গিরা। যা প্রায় অসম্ভব ছিল পলাশির প্রান্তরে তাই সম্ভব হয়েছে মিরজাফর-রায়দুর্লভ-জগৎশেঠের মতো কিছু মানুষের গদ্দারি ও কর্নেল ক্লাইভের কুদরতিতে।
সিরাজের চোখের দিকে তাকাতে কেমন যেন অস্বস্তি বোধ করছেন মিরজাফর। মনে হচ্ছে, তাঁর চোখের সামনে থেকে পেয়াদারা সিরাজকে সরিয়ে নিয়ে গেলে তিনি স্বস্তি বোধ করবেন।
‘এই আসামীর কী বিচার করবেন হুজুর?’
জগৎশেঠের প্রশ্ন শুনে রায়দুর্লভের দিকে তাকালেন মিরজাফর।
রায়দুর্লভ গুজারেশ করলেন, ‘হয় জিন্দেগিভর জিন্দানখানায় দিন গুজার নয়তো মওত।’
মিরন উত্তেজিত হয়ে বলে উঠল, ‘জিন্দানখানা কভি নেহি। জিন্দা দিন গুজার করার কোনও হকই নেই এই আসামীর। মওতই একমাত্র নিদান হওয়া উচিত।’
মাথা ঝুঁকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন সিরাজ। এবারে মুখ তুলে কাতর কণ্ঠে বললেন, ‘আপনারা কী আমাকে একটু রহেম করতে পারেন না? মসনদ-দৌলত-তাগদ-জলুস এসব আমি আর কিচ্ছু চাই না। আপনারা আমাকে বাঁচতে দিন। স্রেফ এক আমআদমির মাফিক। এই মুলুক ছেড়ে আমি চলে যাব। আমি ভিখ মাঙছি আপনাদের কাছে। একটু রহেম করুন।’
সিরাজের এই কাতর আর্তি শুনে বিশ্রি ভঙ্গিতে হেসে উঠল মিরন। হাসি থামিয়ে সিরাজের উদ্দেশে বলল, ‘খরিশের বাচ্ছাকে কেউ কি জিন্দা রাখে জনাব?’
জগৎশেঠ মহাতপচাঁদ বলে উঠলেন, ‘পলাশিতে জিৎ-হাসিল করলে আমাদের কি আপনি জিন্দা ছেড়ে দিতেন? আপনাকে জিন্দা রাখা মানে তো আমাদের জানকে খতরার মধ্যে ফেলা।’
মিরন উত্তেজিত হয়ে জোর গলায় বলে উঠল, ‘বেশক। সাচ্চা বাত। মওকা পেলেই খরিশের বাচ্চা ফের ছোবল মারতে চাইবে।’
প্রবল উত্তেজনায় কুরসি ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে নবাব মিরজাফরের দিকে কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে তসলিম জানিয়ে মিরন বলল, ‘আপনি হুকুম করুন হুজুর। এখনই কোতল করি আজাজীলের এই আওলাদকে। হয় ভাগীরথীর পানিতে ডুবিয়ে মারব নয়তো চকবাজারের রাস্তায় শূলে চড়াব। মুর্শিদাবাদের হর আদমি দু’চোখ ভরে দেখুক সিরাজদ্দৌলার বরবাদি। তারপর শেষ করব আলিবর্দির হর রিসতেদারকে। এক এক মওতের হবে এক এক রকমের কিসিম। আলিবর্দির খানদানের নাম মুছে যাবে সুবে বাংলা থেকে। তুজুক স্রেফ ইয়াদ রাখবে মিরজাফর ও তাঁর খানদানকে।’
মিরজাফর বলে উঠলেন, ‘নেহি। শান্ত হও বেটা।’
মিরজাফরের এই প্রতিক্রিয়ায় স্তম্ভিত মিরন। কী বলছেন আব্বাহুজুর? সিরাজদ্দৌলাকে জিন্দা রাখতে চান?
খানিকটা যেন আশার আলো দেখতে পেয়ে মুখ তুলে মিরজাফরের মুখপানে চাইলেন সিরাজ।
মিরজাফর বললেন, ‘ক্লাইভ সাহেবের সঙ্গে আলোচনা না করে এই মামলায় আমি কোনও ফয়সালা করতে রাজি নই। সবকিছু জানিয়ে এখনই একবার হিরাঝিলে আসার জন্য কর্নেলের কাছে আমি চিঠি পাঠিয়েছিলাম। উনি জানিয়েছেন, তবিয়ত আচ্ছা নেই। আজ আসতে পারবেন না। আসবেন আগামীকাল। আপাতত জিন্দানখানায় বন্দি করে রাখা হোক সিরাজকে। তাঁর কী সাজা হবে সেটা আগামীকালই চূড়ান্ত করা যাবে।’
মিরজাফরের প্রস্তাব রায়দুর্লভ, মিরকাশিম ও জগৎশেঠের মনে ধরল। তাঁরাও ভেবে দেখলেন, সিরাজের বিষয়ে তড়িঘড়ি কোনও সিদ্ধান্ত নিতে গেলে বিপদ হতে পারে। তামাম মুর্শিদাবাদের বহু মানুষের কাছেই আলিবর্দি হলেন প্রায় পয়গম্বরের সমান। তাঁর দৌহিত্রকে রাতারাতি কোতল করে ফেললে প্রজা বিক্ষোভ হতে পারে। তাছাড়া কর্নেল ক্লাইভকে আঁধারে রেখে এমন গুরুত্বপূর্ণ মামলার ফয়সালা করা মোটেই উচিত নয়। সিরাজের বিষয়ে তিনি কী চান সেটা জানা দরকার। কাল অবধি অপেক্ষা করাই ভালো। ঠিকই বলছেন মিরজাফর।
এ সিদ্ধান্তে মিরন মোটেই খুশি নয়। ভুরু কুঁচকে গেল তার। রাগে ফুঁসতে লাগল সে। আব্বাজানের মুখে শুধু ক্লাইভ, ক্লাইভ আর ক্লাইভ শুনতে শুনতে মিরন তিতিবিরক্ত। ইনকিলাব ঘটে গিয়েছে মুর্শিদাবাদে। সিরাজদ্দৌলা অতীত। মসনদে বসেছেন মিরজাফর। এখন আর ওই টোপিওয়ালা ইংরেজদের মুরুব্বি ঠাওরানোর কী আছে? দেশ চলবে নবাবের খুশখেয়ালে। চিরকাল যেমন চলে এসেছে, তেমনই। ক্লাইভের মুখের দিকে নবাবকে চেয়ে থাকতে হবে কেন? এভাবে চলতে থাকলে তো ইংরেজরাই একদিন মসনদের দখল নিয়ে নেবে। আপাতত নিজের মনের ভাব গোপন করে গোমড়া মুখে বসে রইল মিরন।
মিরকাশিম প্রশ্ন করলেন, ‘সিরাজকে কি হিরাঝিলেই কয়েদ করে রাখা হবে?’
মিরজাফর বললেন, ‘না। সিরাজ থাক মিরনের হেফাজতে। জাফরাগঞ্জের জিন্দানখানায়।’
এই নিদান শুনে মিরনের মুখে হাসি ফুটল। সিরাজের ভবিতব্য কী হবে, দরহালই তা সে মনে মনে নির্ধারণ করে ফেলল।
মিরজাফর বললেন, ‘দেখো বেটা, সিরাজের উপর যেন কোনও জুলমাত না হয়।’
মিরন মুখে হাসির রেশ বজায় রেখে বলল, ‘বান্দা আপনার এই বাত ইয়াদ রাখবে।’
পেয়াদারা সিরাজদ্দৌলাকে নিয়ে চলে গেল দরবার ঘর ছেড়ে। মসনদ ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন মিরজাফর। দরবার ভাঙল।
.
জাফরাগঞ্জের কয়েদখানায় বন্দি হলেন সিরাজদ্দৌলা। এখন তিনি মিরনের হেফাজতে।
স্যঁতসেঁতে অন্ধকার খুপরি ঘর। সিরাজকে কারাকক্ষের ভিতরে ঢুকিয়ে পেয়াদারা খুলে দিয়েছে পায়ের বেড়ি। শিকলের শক্ত বাঁধনে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে টনটন করছিল পা দুটো। পায়ের বাঁধন খোলায় খানিকটা যেন আরাম বোধ করলেন সিরাজ। হাত দুটোও কারারক্ষী মুক্ত করে দিয়েছে অসীম অনুগ্রহে।
পাথরের মেঝের উপর বিছানো মলিন একটা চটের উপরে হাঁটু মুড়ে নামাজ আদায়ে বসলেন সিরাজদ্দৌলা। নামাজ শেষ করে উপরের দিকে মুখ তুলে বেশ জোর গলাতেই বলে উঠলেন, ‘রহেম করো আল্লা! একটু রহেম করো আমায়!’
পাথরের দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে প্রতিধ্বনিত হল সিরাজের আর্তি। তাঁর মনে হল, কেউ যেন খিলখিলিয়ে হেসে উঠে ব্যঙ্গ করল তাঁকে। খুবই চেনা নারীকণ্ঠের খুশ ইলহান আওয়াজ।
‘কে তুমি?’ প্রশ্ন করলেন সিরাজদ্দৌলা।
‘আমি ফৈজি ফয়জান। মনে পড়ে জ্যান্ত গোর দিয়েছিলেন আমায়?’
কাতর গলায় সিরাজ বলেন, ‘আমাকে মাফ করো ফৈজি।’
‘মাফ করার আমি কে হুজুর? আপনার বিচার করবেন দুনিয়াদার।’
‘তুমিও কি চাও আমার মওত?’
‘আমার চাওয়া না চাওয়ায় কী এসে যায় হুজুর? আমি তো মামুলি এক জেনানা। আপনার কামনার পুতুল ছিলাম আমি। আমায় নিয়ে আপনি খেলা করেছেন। তারপর নিজের হাতেই জ্যান্ত গোর দিয়েছেন। খেলা শেষ হলে মাসুম বাচ্চারা যেমন হাতের পুতুলকে আছড়ে ভাঙে, তেমনই আমাকে শেষ করে দিয়েছিলেন আপনি। আপনার মতোই আমিও তো বাঁচতে চেয়েছিলাম কিন্তু দুনিয়াদার আমার এই তামান্না মঞ্জুর করলেন না।’
সিরাজ দু’হাতে কান চেপে ধরে চেঁচিয়ে ওঠেন, ‘চুপ করো, ফৈজি চুপ করো।’
‘বদকিসমতি আমারই।’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফৈজি।
‘আমি জানি। তোমার প্রতি বেনজির জুলমাত করেছি আমি। রহেম করো আমায়।’
‘জানেন হজরত—চারিদিকে দেওয়াল গাঁথা অন্ধকূপে বন্দি হয়ে শুধু একমুঠো বাতাস খুঁজেছি আমি। সামান্য একঝলক বাতাস যে এত কিমতি, সিনা ভরে শ্বাস নেওয়া যে আল্লার কতখানি মেহেরবানি তা আগে কখনও বুঝিনি। আমার কলিজা ফেটে যাচ্ছিল। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল। একটু বাতাস—শুধু একটু বাতাস বলে আমি চেঁচিয়েছি। গলা চিরে খুন ঝরেছে। তবু কেউ শোনেনি আমার কথা। একফোঁটা জলের জন্য আমি ছটফট করেছি।’
সিরাজ ফের চেঁচিয়ে ওঠেন, ‘খামোশ। থামো ফৈজি। থামো।’
‘আপনার খুশখেয়ালে আমার জহমত। বদনসিবি। মওতের পরে আজাদি পেয়েছি আমি। এই আখিরাতে সিনা ভরে শ্বাস নেওয়ার জন্য আমি শুধু বাতাস খুঁজে বেড়াই।’
সিরাজদ্দৌলা কাতর কণ্ঠে বলে ওঠেন, ‘ফৈজি মাফ করো। রহেম করো আমায়।’
পাথরের দেওয়ালে প্রতিধ্বনিত হল কথাগুলো। হুঁশ ফেরে সিরাজদ্দৌলার। তাঁরই হুকুমতে জ্যান্ত গোর দেওয়া হয়েছিল ফৈজিকে। তার মওত হয়েছে বহুদিন আগে। কোথা থেকে সে আসবে এই কয়েদখানায়। বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন সিরাজদ্দৌলা। অপরাধবোধ আজ যেন তাঁকে কুরে কুরে খাচ্ছে।
বহু অর্থ ব্যয় করে দিল্লি থেকে বাইজি ফৈজি ফয়জানকে মুর্শিদাবাদে আনিয়েছিলেন সিরাজ। হিরাঝিল প্রাসাদে ফৈজিকে নিয়ে আশনাই, আশরতে দিব্যি খুশির দিনগুলো কাটছিল। হঠাৎই একদিন সিরাজ জানতে পারলেন ফৈজির সঙ্গে তাঁর ভগিনীপতি সৈয়দ মহম্মদ খাঁর প্রণয়াভিসার চলছে। নিমেষে চুরমার হয়ে গেল সিরাজের মনের মধ্যে গড়ে ওঠা মহব্বতের আলিশান ইমারত। আশিকের নরম চোখদুটোয় জ্বলে উঠল ঈর্ষার আগুন। ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে ফৈজিকে জ্যান্ত গোর দেওয়ার নিদান দিয়েছিলেন সিরাজদ্দৌলা।
শুধু তো ফৈজি নয়। সিরাজের মনের অবচেতনে আজ বারবার উঁকি দিচ্ছে হোসেনকুলি খাঁও। প্রকাশ্য রাজপথে হত্যা করা হয়েছিল হোসেনকুলিকে। তবে এই হত্যার পিছনে সিরাজ ছিলেন নিমিত্তমাত্র।
ঘসেটি বেগম ও আমিনা বেগম—দু’জনেই হোসেনকুলির সঙ্গে অবৈধ প্রণয়ের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। আলিবর্দির দুই বেটির কিসসার কথা কানাকানি হতে হতে চেহেল সেতুনের দিওয়ার টপকে তামাম মুর্শিদাবাদ শহরে ছড়িয়ে পড়ে মুখরোচক আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছিল। আলিবর্দির খানদানের মান-ইজ্জত ধুলোয় মিশে যাওয়ার উপক্রম। হোসেনকুলিকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিয়ে এই সঙ্কট থেকে পরিত্রাণ চাইলেন শরফ উন্নেসা। সিরাজের নানি বেগম। তিনি উত্তেজিত করে তুললেন সিরাজকে। সিরাজেরই মদতে বাড়ি থেকে টেনে বের করে প্রকাশ্য রাস্তায় খুন করা হল হোসেনকুলিকে। আলিবর্দির দৌহিত্রের নৃশংস আচরণ দেখে শিউরে উঠেছিল তামাম মুর্শিদাবাদের মানুষ। মওতের পর কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলা হয়েছিল হোসেনকুলির দেহ। রক্তে ভেসে গিয়েছিল রাজপথ।
কারাকক্ষের বাইরে বাতিদানে জ্বলছে রেড়ির তেলের আলো। গরাদের ফাঁক গলে সেই আলোর এক ফালি এসে ঢুকেছে ভিতরে। এই আলো-আঁধারিতে হঠাৎই নিজের দুই করতলের দিকে তাকিয়ে শিউরে উঠলেন সিরাজদ্দৌলা। মনে হল, দুই করতল রক্তে রাঙা। সেখান থেকে টপ টপ করে রক্ত ঝরে পড়ছে কয়েদখানার মেঝেতে। এ রক্ত হোসেনকুলির, এ রক্ত ফৈজির, এ রক্ত সেই সব আজনবি মানুষের, একদা খুশখেয়ালে খেলার ছলে ভাগীরথীর বুকে নৌকো উলটে যাদের জলে ডুবিয়ে মেরে ইয়ারদোস্তদের নিয়ে মজা লুটেছিলেন তিনি।
ডুকরে কেঁদে উঠে সিরাজদ্দৌলা বলেন, ‘হে দুনিয়াদার! মাফ করো আমাকে। তাগদ, তাকাব্বুরি, খুনজোশী–ইনসানকে অন্ধ করে দেয়। গুমরাহী করে তোলে। ন্যায়-অন্যায়বোধ হারিয়ে যায় শান-শওকতের গুমানিতে। আজ আমি এসব অন্তর থেকে উপলব্ধি করতে পারছি। আমাকে রহেম করো খোদাতালা। শুধু একটু বাঁচতে দাও আমায়!’
.
জাফরাগঞ্জ প্রাসাদের ঘড়িয়াল ঘণ্টা পিটিয়ে জানায় রাত তিন প্রহর।
কারাকক্ষের বাইরে থেকে ভেসে আসে পদচারণার শব্দ। কেউ আসছে এদিকে। কে আসছে কারাকক্ষের দিকে এই অনওয়াক্তে? অজানা আশঙ্কায় সিরাজের বুক কেঁপে ওঠে।
ক্লান্ত, অবসন্ন শরীরটা চাইছে বিশ্রাম। চোখদুটো আধ বোজা। শুয়ে আছেন পাথরের মেঝেতে। মলিন জীর্ণ চটের আস্তরণের উপরে। পায়ের শব্দ শুনে দেহটাকে উত্তলিত করেন সিরাজ। এক ছায়ামূর্তি কারাকক্ষের বন্ধ দরওয়াজার সমুখে এসে দাঁড়াল।
সিরাজ শুধোন ‘কে?’
উত্তর দেয় না ছায়ামূর্তি। আবছা আলোয় তার দেহের অবয়ব দেখে আগন্তুককে কেমন যেন চেনা চেনা বোধ হয় সিরাজের। ভুরু কুঁচকে জরিপ করার কোশিশ করেন।
বিকারগ্রস্ত সিরাজদ্দৌলা ফের প্রশ্ন করেন, ‘কে তুমি? হোসেনকুলি? ইনসাফ চাইতে এসেছ?’
সশব্দে হেসে উঠে ছায়ামূর্তি বলে, ‘হোসেনকুলি! নামটা এখনও ইয়াদ আছে আপনার?’
‘রহেম করো হোসেনকুলি। রহেম করো আমাকে।’
‘আমি তো আপনাকে রহেম করতেই এসেছি জনাব।’
‘সত্যি বলছ?’
ঠিক এই সময় একজন দাখিলা এগিয়ে এসে কারাকক্ষের দরজার মুখে একটা শামাদান রেখে যায়। অভ্রের পাতজ্বলা জোরালো আলোয় পুরোপুরি আলোকিত হয়ে ওঠে প্রায়ান্ধকার কক্ষ।
আগন্তুকের চেহারাটা অনেকটা স্পষ্ট হয় সিরাজের চোখে। খুবই চেনা মুখ। তবুও কেমন যেন অচেনা ঠেকে সিরাজের আছে। কোথায় দেখেছেন একে? মনে পড়ে না। কৌতূহলের সঙ্গে তিনি শুধোন, ‘তুমি তো হোসেনকুলি নও। কে তুমি?’
‘আমি মহম্মদী বেগ। আমাকে ইয়াদ নেই আপনার?’
দুই রক্ষী এসে লোহার দরজাটা খুলে দিয়ে চলে যায়। কারাকক্ষের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে মহম্মদী বেগ। সিরাজের মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়।
এবারে ধীরে ধীরে সব কথা মনে পড়ে যায় সিরাজের। একসময় নিজামত কেল্লায় আলিবর্দির খাস বান্দাদের সর্দার ছিল মহম্মদী। একদা বর্গির আক্রমণে, পিতা-মাতা সবাইকে সে হারিয়েছিল। পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল তাদের বসতবাটি। চকবাজারের পথের একপাশে পড়ে থাকা ক্ষুধায় কাতর, তোশদান হাতে বসে থাকা মহম্মদীর করুণ চোখদুটো দেখে করুণার উদ্রেক হয় আলিবর্দির মনে। তিনি তাকে চেহেল সেতুনে নিয়ে আসেন। গোলামের কাজে নিয়োগ করেন। স্বভাববগুণে কিছুদিনের মধ্যেই আলিবর্দির প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠে মহম্মদী। অনাথা এক বালিকার সঙ্গে তার বিয়ে দিয়েছিলেন শরফ উন্নেসা। নবদম্পতিকে অনেক যৌতুকও দিয়েছিলেন। একান্তে সংসার পাতার জন্য মহম্মদী বেগকে একটা হাভেলি উপহার দিয়েছিলেন আলিবর্দি। নিজামত কেল্লা ছেড়ে যাওয়ার সময় আলিবর্দির পা জড়িয়ে ধরে মহম্মদী ঝরঝর করে কেঁদে ফেলেছিল। বলেছিল, ‘আমি জিন্দেগিভর আপনার গোলাম হয়ে থাকব হুজুর।’
এই কারাকক্ষে রাত তিন প্রহরে আলিবর্দির স্নেহধন্য, তাঁর একান্ত অনুগত মহম্মদী বেগের আগমন সিরাজের কাছে একেবারেই অপ্রত্যাশিত। সিরাজের ভগ্নহৃদয়ে আশার সঞ্চার হয়। তবে কি মহম্মদী তাঁকে আজাদ করে দিতে এসেছে?
সিরাজ আবেগজড়িত গলায় বলেন, ‘তুমি…তুমি মহম্মদী?’
‘জি হুজুর। চিনতে পারছেন না?’
‘তুমি এসেছ? তোমাকে আমার কাছে আসতে দিল ওরা?’
সিরাজের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মুচকি হাসে মহম্মদী বেগ।
সিরাজ বলেন, ‘মহম্মদী তুমি নিশ্চয়ই আমাকে আজাদ করে দিতে এসেছ?’
‘জি হুজুর। সহি আন্দাজ আপনার।’
‘কেউ জানতে পারলে তোমার যে পরেশানি হবে।’
অন্ধকারে শ্বাপদের চোখের মতো ধকধক করে জ্বলছে মহম্মদীর চোখদুটো। মুচকি হেসে সে বলে, ‘আমার জন্য আপনি ভাববেন না জনাব। আলিবর্দি খাঁর খানদানের হর আদমির সেবা করাই আমার মজবুরি।’
সিরাজদ্দৌলা আবেগে মহম্মদী বেগের হাতদুটো চেপে ধরে বলেন, ‘তোমাকে আমি চিরকাল ইয়াদ রাখব মহম্মদী। জলদি আমাকে এই জিন্দানখানার বাইরে নিয়ে চলো। আমি সুবে বাংলা ছেড়ে চলে যাব। মসনদ, তাগদ, শান-শওকত এসব আর কিচ্ছু চাই না। হিন্দুস্তানের কোনও এক দেহাতে আজনবি এক আম-আদমির মতো বাঁচতে চাই আমি। আমাকে মুক্তি দাও মহম্মদী। তুমি বেশক পয়গম্বরের দূত। তাই এই মুসিবত থেকে আমাকে উদ্ধার করতে এসেছ। আমার জহমত জুড়িয়ে দাও মহম্মদী। জুড়িয়ে দাও।’
‘জরুর। আপনার হর জহমত-তকলিফ নিভানোর জন্যই তো আমি এসেছি।’
এই বলে চকিতে কোমরবন্ধনী থেকে একটা খঞ্জর বের করে সিরাজদ্দৌলার বুকে আমূল বিঁধিয়ে দেয় মহম্মদী বেগ।
সিরাজের তীব্র আর্তনাদ জাফরাগঞ্জের পাষাণপুরীর দেওয়ালে দেওয়ালে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। রাতের স্তব্ধতা খান খান হয়ে যায়। বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজদ্দৌলা মুখ থুবড়ে পড়লেন পাথরের মেঝের উপরে। অস্ফুট স্বরে শুধু বললেন, সে-লা-ম! ম-হ-ম্ম-দী সে-লা-ম।
নিথর হয়ে গেল সিরাজের দেহ। তাজা রক্তস্রোত পাথরের মেঝের উপর দিয়ে গড়িয়ে গিয়ে কারাকক্ষের বাইরে ছড়িয়ে পড়তে লাগল।
সিরাজদ্দৌলার রক্তস্নাত নিষ্প্রাণ দেহটার দিকে তাকিয়ে থরথর করে কেঁপে উঠল মহম্মদী বেগ। রক্তমাখা দু’হাতে মুখ ঢেকে সে আর্তনাদ করে উঠল, ‘ হায় আল্লা! এ আমি কী করলাম?’
.
