৮
হিরাঝিল প্যালেসের নহবতখানা থেকে ভেসে আসছে সানাইয়ের সুর। প্যালেসের চৌহদ্দিতে ঢোকার মুখে সদর দরওয়াজার একপাশে কাড়ানাকাড়া, ঢাক, ঢোল, শিঙা নিয়ে প্রস্তুত হয়ে আছে কয়েকশো বাজনদার। এদের দলপতি কেশবলাল সতর্ক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে মোরাদবাগ প্যালেস অভিমুখে চলে যাওয়া পথের দিকে। নিরাপত্তার খাতিরে সেই পথের দু’পাশে মোতায়েন শয়ে শয়ে হাতিয়ারবন্ধ সেপাই।
খানিকবাদেই ওই পথ ধরেই মোরাদবাগ থেকে হিরাঝিল প্যালেসে আসবেন ব্যারন অফ প্ল্যাসি, কর্নেল রবার্ট ক্লাইভ। নামটার মাহাত্ম্য যে কী, তা বাজনদারদের দলপতি মিশিরলালও বোঝে। তাই সে হুঁশিয়ার। গোরাপল্টন পরিবেষ্টিত ঝালরদার পালকিটাকে এগিয়ে আসতে দেখলেই বাজনার আওয়াজে কাঁপন ধরাতে হবে আকাশে-বাতাসে।
প্রস্তুত হয়ে আছে হিরাঝিলের বুরুজে গোলন্দাজের দলও। বাজনা বেজে উঠলেই তারা শূন্যে তোপ দাগতে শুরু করবে। এভাবেই হিরাঝিল কুরনিশ জানাবে হবু নবাব মিরজাফরের বহুত খাতিরের মেহমান কর্নেল রবার্ট ক্লাইভকে।
সদর দরওয়াজার মুখে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন জগৎশেঠ, রায়দুর্লভ ও মিরন। ক্লাইভকে হিরাঝিল প্যালেসে স্বাগত জানানোর জন্য মিরজাফরের প্রতিনিধি হিসেবে তাঁরাও প্রস্তুত।
মিরজাফর নিজেও এই দলে সামিল হতে চেয়েছিলেন। তাঁকে নিরস্ত করেছেন স্বয়ং ক্লাইভ। যিনি বাংলার মসনদে বসতে চলেছেন, পথে দাঁড়িয়ে ইংরেজ সেনাপতির জন্য তাঁর অপেক্ষা করাটা দিশি লোকেদের চোখে একটু বেমানান ঠেকতে পারে।
এই সব খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে ক্লাইভ ইদানীং ভয়ানক সচেতন। মুর্শিদাবাদ ছেড়ে পালিয়ে গেলেও সিরাজদ্দৌলা নামটা কাঁটার মতো বিঁধে আছে কর্নেলের মনের মধ্যে। কিছুতেই কাঁটাটা পুরোপুরি উপড়ে ফেলে তিনি নিশ্চিন্ত হতে পারছেন না। একদল বণিক সুবে বাংলার নবাবকে মসনদ ছাড়া করল– এই ব্যাপারটাকে যে কী ভাবে দেখছে আমআদমি, কী প্রতিক্রিয়া তাদের অন্তরে তা নিয়ে কর্নেলের ভাবনার অন্ত নেই।
ওয়াটস, কিলপ্যাট্রিক, স্ক্র্যাফটন, মুনশি নবকৃষ্ণ যতই তাঁকে বোঝান যে, সিরাজের বরবাদিতে দরবারের ওমরাহরা খুশি মানাচ্ছে, খুশি হয়েছে তামাম সুবে বাংলার জমিদারেরা, প্রজারাও স্বস্তি পেয়েছে, তবুও ক্লাইভের সন্দিগ্ধ মন চট করে বিশ্বাস করতে চায় না এসব কথা। ইংরেজদের দুশমন সমঝে সুবে বাংলার রাজধানীর আমআদমি যদি আচমকা ফুঁসে ওঠে, প্রত্যাঘাত করতে চায়, তবে বাঁচার পথ থাকবে না। গণবিক্ষোভের ভয়ে কাঁটা হয়ে আছেন ক্লাইভ।
ওদিকে নানা রঙের গুলাব ও লতাপাতার সাজসজ্জায় ঠিক যেন একখণ্ড বেহেস্ত হয়ে উঠেছে হিরাঝিলের আমদরবার। ঘরের এক মাথায় সামান্য উঁচুতে মঞ্চের উপরে রয়েছে সুন্দর কারুকাজ করা মেহগিনি কাঠের বড়সড় একখানা কুরসি। কাঠের গায়ে জায়গায় জায়গায় সাঁটা রয়েছে নকশাদার রুপোর পাত। কুরসিতে বসার নরম গদি সমুদ্রনীল মখমলে মোড়া। কুরসির উপরে ছাউনির মতো রয়েছে রুপোর চাঁদোয়া। তা চারকোণা কনকদণ্ডের সঙ্গে বাঁধা।
চতুষ্কোণ ছাউনির নীচে ঠিক মাঝখানে মঞ্চের উপর স্থাপিত এই কুরসিই হল সুবে বাংলার বহুকাঙ্ক্ষিত মসনদ। যা দখলের জন্য ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার, সরফরাজ খাঁর মওত, ঘসেটি বেগমের বরবাদি, শওকত জঙের দেহান্ত, মিরজাফরের জশন, সিরাজের জহমত।
নিজের উচ্ছ্বাস গোপন করতে পারছেন না মিরজাফর। দু’চোখে উপচে পড়ছে খুশি। আর কয়েক পল পরেই তিনি আনুষ্ঠানিক ভাবে হয়ে উঠবেন সুবে বাংলার নবাব। শুধু কর্নেলের পৌঁছনোর অপেক্ষা। ইনসানের নসিব কী করে বদলায় তা ভেবে মিরজাফর অভিভূত। পয়গম্বরকে সুক্রিয়া জানানোর ভাষা খুঁজে পাচ্ছেন না।
আরব দেশের নজফ থেকে এসে মুর্শিদকুলির জামাই নবাব সুজাউদ্দিনের অধীনে সামান্য এক সৈনিক হিসেবে নিজামতের নোকরিতে যোগদান মিরজাফরের। আলিবর্দির আমলে বহাল হন মেদিনীপুরের ফৌজদারের পদে। এই তাঁর খুশনসিবির শুরুয়াত।
কিছুকাল পরে নবাবের ফৌজের সিপাহসালারের পদে অভিষিক্ত হলেন মিরজাফর। কিন্তু বর্গি দমনে অকর্মণ্যতার জন্য ওই পদ থেকে অপসারিত হলেন। পরে তদ্বির করে ফের ফিরে পেলেন পুরোনো পদটি। এ ভাবে মিরজাফরের জীবনে বারবার ঘর বদলেছে নসিব।
সিরাজের আমলের শুরুতে মিরজাফর ছিলেন নবাবের অপছন্দের তালিকায়। ১৭৫৬ সালে কলকাতা আক্রমণের সময় বাহাদুরের মতো লড়াই করে নবাবের সুনজরে এলেন তিনি। কিন্তু অল্পকাল পরেই নবাবের বিষনজরে পড়লেন। সিরাজ অনুভব করলেন যারা তাঁকে মসনদচ্যুত করতে চায় সে দলে মিরজাফরও আছেন। সিপাহসালারের পদটা গেল। কিন্তু অপরিণত সিরাজ সেনাবাহিনীর মধ্যে ঐক্যস্থাপনের উদ্দেশে অনেকের নিষেধ সত্ত্বেও পলাশির যুদ্ধের ঠিক আগে ওই পদটি মিরজাফরকে ফের ফিরিয়ে দিলেন।
বিশ্বাসঘাতকতা করলেন অকৃতজ্ঞ মিরজাফর। পলাশির যুদ্ধে সিরাজকে মদত না দিয়ে তিনি নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করলেন। এ নিয়ে মিরজাফরের মনে অবশ্য কোনও অনুশোচনা নেই। এটাই তো দরবারি রাজনীতির তরিকা। সুযোগসন্ধানী না হলে, বিবেকের কাঁটা উপড়ে না ফেলতে পারলে যে উপরে ওঠা যায় না!
একদা দরবার রাজনীতিতে কোণঠাসা হয়ে পড়া যে মিরজাফর খাঁ চূড়ান্ত বরবাদির প্রহর গুনছিলেন, আজ সেখান থেকে তাঁর উত্তরণ সুবে বাংলার নবাবের পদে। তবু এখনও যেন ঘটনাটা পুরোপুরি বিশ্বাস করে উঠতে পারছেন না মিরজাফর। প্রবল উত্তেজনায় তিনি ছটফট করছেন। থেকে থেকেই দৃষ্টি চলে যাচ্ছে মসনদের দিকে। কয়েক পল। আর মাত্র কয়েক পল!
মিরজাফর বসে আছেন মসনদের অদূরে মামুলি একখানা কুরসিতে। ওমরাহ, জমিদারেরা জনে জনে এসে কুরনিশ জানিয়ে যাচ্ছে। পেশ করছে নজর। এসবে মিরজাফরের তেমন কোনও মনোযোগ নেই। যন্ত্রের মতো সেলাম, তসলিম, কুরনিশ গ্রহণ করছেন। নজরানা, পেশকাশ এসব চালান করে দিচ্ছেন পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দাখিলাদের হাতে।
উমিচাঁদ এগিয়ে এসে নজর পেশ করে খোশামোদি ঢঙে বললেন, ‘ভরা দরবারে শূন্য মসনদ বড় বেমানান লাগছে। আপনি মসনদে বসুন জাঁহাপনা। এ কুরসির মালিক তো এখন আপনিই!’
মুচকি হাসলেন মিরজাফর।
যে যাই বলুক না কেন, কর্নেল ক্লাইভ এসে না পৌঁছনো পর্যন্ত কিছুতেই তিনি মসনদে বসবেন না। ক্লাইভ হাত ধরে তাঁকে মসনদে বসিয়ে দেবেন– এই হল মিরজাফরের খায়েশ। কোনও লুকোছাপা নেই, ঘনিষ্ঠ বৃত্তে এসব তিনি কবুলও করেছেন। সে কথা লোকের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছে। দরবারে উপস্থিত অভ্যাগতদের অনেকেই এ নিয়ে কানাকানি, ফিসফাস করছে। কেউ কেউ নবাব মিরজাফর খাঁকে ইতিমধ্যেই ক্লাইভের গর্ধভ বলে ভূষিত করেছেন। এসব মিরজাফর মোটেই গায়ে মাখছেন না। কর্নেল ক্লাইভের প্রতি রয়েছে তাঁর অকৃত্রিম শ্রদ্ধা।
দুঃসহ হয়ে উঠেছিল জীবন। হররোজ ত্রাসের আবহে দিন কাটানো। এই বুঝি গর্দান গেল। এক সময় সিরাজের চোখের দিকে তাকালে মিরজাফরের বুক কেঁপে উঠত। সহসা সেই দুঃসহ জীবনের উপর যেন নেমে এল বেহস্তের কওসর। তার ধারাস্নানে মিরজাফরের জিন্দেগি রঙ্গিলা হয়ে গেল।
ক্লাইভের কুদরতিতেই তো তাঁর এই খুশনসিবি। কর্নেলই তো তাঁর পয়গম্বর। আবেগে মিরজাফরের দু’চোখে চিক চিক করে ওঠে পানি। এসব ভাবতে ভাবতে আনমনা হয়ে পড়েছিলেন হবু নবাব। সহসা কেঁপে উঠলেন কাড়ানাকাড়া, ঢাক, ঢোল, শিঙার শব্দে। কেঁপে উঠল দরবারে উপস্তিত অভ্যাগতরাও। হিরাঝিলের আনাচেকানাচে বসত গেড়ে থাকা কয়েক হাজার সফেদ কবুতর ভয় পেয়ে আকাশে চক্কর কাটতে লাগল।
ওই যে তিনি আসছেন!
খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন মিরজাফর। আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়াল দরবার ঘরে উপস্থিত সকলে। হিরাঝিলের দরবার কক্ষে প্রবেশ করলেন কর্নেল ক্লাইভ। সঙ্গে কিলপ্যাট্রিক, আয়ারকুট, ওয়াটস, ওয়ালস, স্ক্র্যাফটন, লাসিংটন, মুনশি নবকৃষ্ণ-সহ আরও অনেকে। সমুখে তাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে আসছেন মিরন, জগৎশেঠ ও রায়দুর্লভ।
হাসিমুখে মিরজাফরের দিকে এগিয়ে গেলেন ক্লাইভ। প্রবল উত্তেজনায় কুরসি ছেড়ে সামনে কয়েক পা এগিয়ে আসতে গিয়ে মিরজাফরের হোঁচট খাওয়ার উপক্রম হল। পরনের জরিদার ঝলমলে জোব্বা সূচ্যগ্র বাহারি নাগরায় আটকে গিয়ে প্রায় বেসামাল হয়ে গিয়েছিলেন তিনি। দ্রুত কয়েক পা এগিয়ে এসে মিরজাফরকে ধরে ফেললেন কর্নেল ক্লাইভ। না হলে হয়তো দরবারে সবার সমুখে গালিচার উপর হুমড়ি খেয়ে পড়তেন নতুন নবাব। বেসহবত, বেনজির কাণ্ড ঘটে যেত একখানা।
মাথা ঝুঁকিয়ে ক্লাইভ বললেন, ‘সেলাম নবাব বাহাদুর। সহি সালামত থাকুন।’
মাথা ঝুঁকিয়ে ক্লাইভের হাত দুটো নিজের কপালে ঠেকিয়ে মিরজাফর বললেন, ‘বহুত সুক্রিয়া।’
ক্লাইভ বললেন, ‘আমার মনে হয় এতদিন যারা সুবে বাংলা শাসন করেছেন ইউ আর দ্য মোস্ট ওয়ার্দি অফ দোজ। সবসে কামিল ইনসান। এটা তামাম বাংলার খুশনসিব।’
মিরজাফর খাঁ আবেগে বিগলিত। আপনার মেহেরবানি। তাই আমার এই তকদির।’
‘আসুন নবাব বাহাদুর। মসনদে বসুন। প্রোটেক্ট দ্য ডিগনিটি অফ দিস চেয়ার।’
এই বলে মিরজাফরের হাত ধরে মসনদের দিকে এগিয়ে গেলেন ক্লাইভ। সেই মুহূর্তে মিরজাফরের মনে হল, গোটা দুনিয়ার হর খুশি যেন বারিশ হয়ে ঝরে পড়ছে গোটা দরবার ঘরে। ক্লাইভের হাত ধরে তিনি যেন পৌঁছে গিয়েছেন বেহস্তের খুবসুরত এক গুলবাগিচায়।
মসনদে বসলেন মিরজাফর। ক্লাইভের মুখে লেগে আছে মৃদু হাসি। ওমরাহ, জমিদার ও অন্যান্য অভ্যাগতরা সবাই আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। চৈতিতে খুশির সুর বিলিয়ে দিতে লাগল দরবারি নহবত। সেই সঙ্গে বেজে উঠল বিলিতি ব্যান্ডের বিউগল, ব্যাগপাইপ, ট্রাম্পেট। প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের বাদ্যযন্ত্রের এক বিচিত্র ঐকতান। গোটা দরবার মাথা ঝুঁকিয়ে তসলিম জানাল।
মিরজাফর মসনদে বসার পর কয়েক পা পিছিয়ে এলেন ক্লাইভ। মাথা নুইয়ে তসলিম জানালেন নতুন নবাবকে। দ্রুত পিছন থেকে এগিয়ে এলেন লাশিংটন। ক্লাইভের হাতে তুলে দিলেন রুপোর উপরে মিনার কাজ করা অপূর্ব সুন্দর একটা বাক্স। ক্লাইভ ফের এগিয়ে গেলেন সামনে। বাক্সটা খুললেন। ভিতরে লাল ভেলভেট কাপড়ের উপরে ঝলমল করছে সোনাদানা, হিরে-জহরত।
ক্লাইভ বললেন, ‘হুজুর এই আমার নজরানা।’
মিরজাফরের মুখে ফের জমাট বাঁধল খুশি। চকচক করে উঠল চোখদুটো। বাক্সটা হাতে নিয়ে আর্দ্র গলায় বললেন, ‘বহুত বহুত সুক্রিয়া। আপনার ফয়েজে আমার জিন্দেগির সুখা জমিন অচানকই গুলিস্তান বনে গেল।’
মুচকি হাসলেন ক্লাইভ। তারপর এবারে নাটকীয় ভঙ্গিতে দরবারে উপস্থিত অভ্যাগতদের দিকে ঘুরে বললেন, ‘অনারেবল অডিয়েন্স। কয়েকটা কথা আপনাদের উদ্দেশে আমার বলার আছে।’
মিরজাফরের দু’চোখে অসীম উৎকণ্ঠা। ওমরাহ, জমিদারেরা সবাই স্থানুবৎ। বেবাক চোখগুলোর দৃষ্টি জড়ো হয়েছে কর্নেল ক্লাইভের মুখের উপর।
ক্লাইভ বললেন, ‘এই কথাগুলো এই ওয়াক্তে আপনাদের খুলে না বললে আপনারা হয়তো ইংরেজ কোম্পানিকে ভুল বুঝবেন।’
আনত চোখে একবার ভূমির দিকে চাইলেন ক্লাইভ, তারপর চোখ তুলে সকলের উদ্দেশে বললেন, ‘এ দেশে সওদা করতে এসে নবাব বাদশার সঙ্গে লড়াই করা মোটেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির তামান্না নয়। আমরা চিরকালই এদেশের কানুনকে ইজ্জত দিয়েছি। আমরা সওদা করেছি শাহ সুজার ফরমানের জোরে। কিন্তু নবাব সিরাজদ্দৌলা বারবার আমাদের বেইজ্জত করতে চেয়েছেন, সুবে বাংলায় আমাদের বিজনেস রাইটস কেড়ে নিতে চেয়েছেন, আলিনগরের সুলেনামার কন্ডিশনগুলো ভায়োলেট করেছেন, ফরাসি জেনারেল বুসির সঙ্গে হাত মিলিয়ে, ফরাসি ফৌজিদের সুবে বাংলায় ডেকে এনে চিরকালের মতো আমাদের বরবাদ করতে চেয়েছেন। তাই বাধ্য হয়েই পলাশিতে নবাবের সঙ্গে আমাদের লড়তে হয়েছে। এর দায় আমাদের নয়, সিরাজদ্দৌলার। অলমাইটি গড অন্যায়ের প্রতিকার চেয়েছেন, তাই পলাশিতে সঙ্গদিল সিরাজদ্দৌলার এই পরিণাম। সিরাজদ্দৌলার পরিবর্তে যিনি মসনদে বসলেন, তিনি একজন সাচ্চা আদমি। কামিল ইনসান। আমি মনে করি বাংলায় এবারে শান্তি ফিরবে।’
ক্লাইভের মুখ থেকে নিজের প্রশংসা শুনে আহ্লাদে প্রায় গলে পড়ছেন মিরজাফর। মুখে মৃদু হাসি। চোখের তারায় খেলা করছে তামাম দুনিয়ার হর খুশির রং।
ক্লাইভ বলে চললেন, ‘নবাব মিরজাফরের ইনভিটিশনে আমি ফৌজ নিয়ে মুর্শিদাবাদে এসেছি। এখানে ক্যাম্প করে বসে থাকার কোনও ইচ্ছে বা সময় আমার নেই। কয়েকদিনের মধ্যেই উই উড রিটার্ন টু ক্যালকাটা অ্যান্ড অ্যাটেন্ড সোললি টু কমার্স। দ্যাটস অল আই ডিজায়ার্ড টু কনভে টু ইউ।’
ওমরাহ ও জমিদারেরা সবাই উঠে দাঁড়িয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে অভিবাদন জানালেন ক্লাইভকে।
মিরজাফর কুরসি ছেড়ে উঠে এসে ক্লাইভের হাতদুটো ধরে বললেন, ‘আপনি আমাদের মেহমান। আমার জিন্দেগির এই খুশির ওয়াক্তে যতদিন আপনার ইচ্ছে হয়, মুর্শিদাবাদে থাকুন। খুশি মানান। নবাব মিরজাফর খাঁ বেইমান নয়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যাতে এদেশে বিনা তকলিফে সওদা করতে পারে, তা আমি নিশ্চই দেখব। এবারে একটা কাজ আছে জনাব। আমরা সিরাজদ্দৌলার তোশাখানা খুলিনি। আপনার জন্যেই ইন্তেজার করছিলাম। আপনাদের যে তোফা দেব বলে আমি কবুল করেছি, চলুন এই ওয়াক্তে মিটিয়ে ফেলি। আপনার সমুখেই তোশাখানার দরওয়াজা খুলতে চাই আমি। কী দৌলত আছে নবাবের তা আপনি খোদ নিজেই দেখে নিন।’
এই বলে কর্নেল ক্লাইভের হাত ধরে দৃঢ় পদক্ষেপে দরবার ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন মিরজাফর।
খানিকবাদে হিরাঝিলের তোশাখানার সামনে জড়ো হল সবাই। সুবে বাংলার নবাবের ধন-দৌলতের অনেক রংদার কহানি শুনেছেন ক্লাইভ। তা কতটা সত্যি আর কতটা মিথ্যে তার সহি আন্দাজ পাওয়া শক্ত। আজ নিজের চোখে তা প্রত্যক্ষ করার সুযোগ। ক্লাইভ তাই উত্তেজিত। তীব্র উত্তেজনা ও কৌতূহল ওয়াটস, কিলপ্যাট্রিক, স্ক্র্যাফটন, ওয়ালস, হেস্টিংস, লাশিংটনের চোখেমুখেও। যেন অ্যারাবিয়ান নাইটসে পড়া কোনও রত্নভান্ডারের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন তাঁরা।
জুলজুলে চোখে তোশাখানার লোহার দরজায় লাগানো মস্ত বড় হুড়কোটার দিকে চেয়ে আছেন নবকৃষ্ণ। ভাবছেন, এ কক্ষের অন্দরে যা আছে, তার ছিটেফোঁটা হাতে এলেও দিব্যি কেউকেটা বনে যাওয়া যাবে। কড়ির জোরে ছড়ি ঘোরনো যাবে কলকাতার গোটা হিন্দু সমাজের মাথায়।
মাসিক ষাট টাকা বেতনের মুনশি নবকৃষ্ণ। সিরাজদ্দৌলার রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে নিজের জীবন বাজি রেখে ফলতায় রসদ পাঠিয়ে তিনি মদত দিয়েছিলেন ইংরেজদের। নিজের নসিবকে জড়িয়ে ফেলেছিলেন ইংরেজদের নসিবের সঙ্গে। ভাবীকালের সঠিক আন্দাজ পেতে তার ভুল হয়নি। কর্নেল ক্লাইভের তিনি একান্ত স্নেহভাজন। কামেয়াবির এই ওয়াক্তে কর্নেল কি তাকে বঞ্চিত করবেন, না দৌলতের ছিটেফোঁটা ছুড়ে দেবেন তাঁর দিকে!
সবুরে মেওয়া ফলে খুবই ভালো বোঝেন নবকৃষ্ণ। আগ বাড়িয়ে লোভী মানুষের মতো তিনি আবদার করতে চান না ক্লাইভের কাছে। চোখ বুজে গোবিন্দকে একবার স্মরণ করলেন নবকৃষ্ণ। কিন্তু মনের পর্দায় ভেসে উঠল অন্য একটা মুখ। কোথায় সেই শ্যামবর্ণ, মনোমোহিনী বংশীধারী? নব মুনশি চোখ বুজে দেখতে পাচ্ছেন ক্লাইভের মুখটা। আপনমনে মুচকি হাসেন মুনশি। ক্লাইভই তো তাঁর গোবিন্দ।
দেওয়ান রায়দুর্লভের নির্দেশে দু’জন দাখিলা বেশ কসরত করে সশব্দে খুলে ফেলল হুড়কোটা। তারপর হাত লাগাল আরও কয়েকজন। ভীষণ ভারী লোহার পাল্লা দু’টো ঠেলে দরজা উন্মুক্ত করা মাত্র দু-একজন মরদের কাজ নয়।
এগিয়ে এল বেশ কয়েকজন দাখিলা। সশব্দে পাল্লা দু’টো ঠেলে সরিয়ে দিল তারা। ভিতরে ঘন কালো অন্ধকার। বাতিদান হাতে ছুটে এল কয়েকজন বাতিকর। অভ্রের পাত জ্বলা উজ্জ্বল আলোয় পথ দেখাল তারা। তোশাখানার অন্দরে প্রবেশ করলেন রায়দুর্লভ, মিরজাফর, জগৎশেঠ ও মিরন। এদের পিছনে কর্নেল ক্লাইভ, ওয়াটস, ওয়ালস, স্ক্র্যাফটন, কিলপ্যাট্রিক, লাশিংটন ও নবকৃষ্ণ।
ঘরখানা বিশাল। ওপ্রান্তের দেওয়াল আলো-আঁধারিতে দূরে কোথাও হারিয়ে গিয়েছে। একদিকের দেওয়ালজুড়ে সারি সারি কাঠের মোটা তক্তা দিয়ে তৈরি তাক। সেগুলো নানা দ্রব্যসামগ্রীতে ঠাসা। দেওয়ালের আরেকদিকে ঘেঁষে রয়েছে অনেকগুলো বড় বড় সিন্দুক। মেঝের উপরেও জায়গায় জায়গায় রয়েছে শ্বেতপাথরের চৌপাই, লোহার মস্ত মস্ত তোরঙ্গ। পোড়া মাটির বড় বড় কলসি। মুখে উলুপ দেওয়া।
ইংরেজদের জোড়া জোড়া কৌতূহলী চোখগুলো ঘুরছে চারিদিকে। দাখিলাদের হাতে ধরা বাতিদানের আলো গোটা ঘরটাকে আলোকিত করার জন্য যথেষ্ট নয়। দেওয়ালের গায়ে জায়গায় জায়গায় রয়েছে দেওয়ালগিরি। বাতিকরেরা জ্বালিয়ে দিল দেওয়ালগিরির আলোগুলো। উজ্জ্বল রোশনিতে ঝলমল করে উঠল গোটা তোশাখানা। প্রস্তুত হয়েছিল কর্মচারীরা। দেওয়ান রায়দুর্লভের নির্দেশে তারা একের পর এক সিন্দুকের কপাটগুলো উন্মুক্ত করতে লাগল। খুলে দিল তোরঙ্গের ডালা, মাটির জালার মুখের উলুপ।
ক্লাইভের চোখ ঝলসে গেল। তোরঙ্গে, সিন্দুকে, মাটির জালার ভিতরে বোঝাই হয়ে রয়েছে হিরে, জহরত, মণি, মুক্তো, সোনা, রুপোর বহু মূল্যবান অলংকার, স্তূপীকৃত আশরফি, সিক্কা টাকা। একের পর এক শ্বেতপাথরের টেবিলের উপরে সাজানো রয়েছে বেলজিয়াম কাচের বহুমূল্যবান ঝাড়বাতি, রুপোর বাসনপত্র, ঘর সাজানোর শৌখিন বিলিতি জিনিপত্র। হিরে-জহরত, খচিত অলংকার এবং ঝাড়বাতির পলকাটা কাচের গা থেকে প্রতিফলিত আলোর জলুসে গোটা ঘর যেন অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছে।
রায়দুর্লভ, জগৎশেঠ, মিরজাফরের মুখে বার বার ইংরেজরা শুনেছে নবাবের তোশাখানার সে জলুস আর নেই। আলিবর্দির সময়ে বর্গির আক্রমণ সামাল দিতে গিয়ে সব প্রায় নিঃশেষ হয়ে গিয়েছে। চমকিত চোখে অলংকারে ঠাসা একটা সিন্দুকের দিকে চেয়ে স্ক্র্যাফটন ভাবছিলেন, এই যদি প্রায় উজাড় হয়ে যাওয়া নবাবের ঐশ্বর্যের নমুনা হয়, তাহলে তার ভরভরাট অবস্থাটা কেমন হতে পারত। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সামান্য বাঁধা মাইনের চাকুরে, ঘুস ছাড়া যারা বাবুগিরি ফলাতে পারে না, তাদের কাছে সুবে বাংলার নবাবের দৌলতখানার অবশিষ্ট এই ঐশ্বর্যই মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট।
মসনদে বসানোর শর্ত হিসেবে মিরজাফরকে দিয়ে যে চুক্তিপত্র সই করিয়ে নিয়েছিল ইংরেজরা সেই মোতাবেক ইংরেজদের এক কোটি সাতাত্তর লাখ টাকা দেওয়ার কথা নতুন নবাবের। কোম্পানির ঘরে ঢুকবে এক কোটি টাকা। কলকাতা যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ হিসেবে ইংরেজরা পাবে পঞ্চাশ লাখ, হিন্দুরা বিশ লাখ ও আরমানিরা সাত লাখ। চুক্তির বাইরেও কিছু টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন মিরজাফর। সে টাকা নবাব হওয়ার খুশিতে দেওয়া পেশকাশ। ঢুকবে ক্লাইভসহ অন্যান্য গণ্যমান্য ইংরেজ সাহেবদের পকেটে। কর্মচারীদের এই ব্যক্তিগত মুনাফার কথা কোম্পানি অবশ্য জানতে পারবে না। এর পরিমাণও কম নয়। বাহান্ন লাখ টাকা। সব মিলিয়ে ইংরেজদের দাবি অনুযায়ী মিরজাফরকে মেটাতে হবে দু’কোটি উনত্রিশ লাখ টাকা।
প্রাথমিক চমকের ঘোর কাটিয়ে উঠে তোশাখানায় মজুত সম্পদের আর্থিক মূল্য কত হতে পারে তা জানার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লেন ক্লাইভ। ইংরেজদের উপস্থিতিতেই বেশ কয়েক ঘণ্টা কসরত করার পর তোশাখানার কর্মচারীরা যে হিসেব পেশ করল, তা দেখে ভাঁজ পড়ল ক্লাইভের কপালে। ইংরেজদের প্রাপ্য বলে যত টাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন মিরজাফর তত টাকার সম্পদ তোশাখানায় নেই।
গম্ভীর গলায় মিরজাফর, রায়দুর্লভ ও জগৎশেঠের উদ্দেশে ক্লাইভ বললেন, ‘উই মে অ্যাকসেপ্ট ইনস্টলমেন্টস। বাট ইউ হ্যাভ টু ক্লিয়ার আওয়ার ডিউস উইদিন অ্যা শর্ট পিরিওড অফ টাইম। জগৎশেঠের হাভেলিতে বসে এ বিষয়ে কাল কথা হবে।’
গটমট করে তোশাখানা থেকে বেরিয়ে এলেন ক্লাইভ। দেহভঙ্গিমা দেখে মনে হল রুষ্ট হয়েছেন। নবকৃষ্ণসহ অন্যান্য ইংরেজ সাহেবরাও ক্লাইভকে অনুসরণ করলেন।
ক্লাইভের সম্মানে ডিনারের এলাহি আয়োজন করা হয়েছিল হিরাঝিল প্যালেসে। তা উপেক্ষা করে পালকিতে চেপে বসলেন ক্লাইভ। অনেক চেষ্টা করেও রায়দুর্লভ, জগৎশেঠ, মিরজাফর তাঁর মত পরিবর্তন করতে পারলেন না। ইংরেজ বাহিনী ফিরে চলল মোরাদবাগ প্যালেসে।
ক্লাইভকে বিদায় জানিয়ে হিরাঝিল প্যালেসে এসে ঢুকলেন নবাব মিরজাফর। ক্ষুব্ধ হয়েছেন কর্নেল। ইংরেজদের পাওনা মেটাতে হবে দ্রুত। একবারে মেটানো সম্ভব না হলেও মেটাতে হবে ধাপে ধাপে, কিস্তিতে। কিন্তু কোথা থেকে আসবে টাকা? কোনওরকমে ইংরেজদের পাওনা না-হয় মেটালেন, কিন্তু তাঁর নবাবির খরচ? সেনাবাহিনীর খরচ? এসব আসবে কোথা থেকে? চোখে অন্ধকার দেখলেন মিরজাফর। সহসা তাঁর মনে হল, মসনদের স্বাদ নোনতা।
.
