৬
সুলুপ-পানসি-বজরা নিয়ে গড়া এক নৌবহর ভাগীরথীর জলরাশি তোলপাড় করে এগিয়ে চলেছে। পলাতক নবাবের খোঁজে ফৌজসহ রাজমহল অভিমুখে চলেছেন মিরকাশিম।
এখনও মুর্শিদাবাদের দরবারি রাজনীতির অলিগলিতে মিরকাশিমের নাম খুব একটা আলোচিত নয়। স্বনামে পরিচিত হওয়ার মতো তেমন কোনও কীর্তিস্তম্ভও তাঁর নামের পিছনে নেই। লোকে তাঁকে মিরজাফরের দামাদ বলেই চেনে।
মিরকাশিমের পয়দায়িস ও পরবারিস পাটনা শহরে। পাটনার কাছে লোহানিপুরের একজন ছোটখাটো জায়গিরদার ছিলেন তাঁর আব্বাহুজুর রাজি খান। পরদাদা ইমতিয়াজ খাঁ ইস্পাহান থেকে সপরিবারে এদেশে এসেছিলেন। তিনি ছিলেন পড়িলিখি বুজুর্গ আদমি, নামজাদা এক শায়ের। কিছুদিন পাটনার দেওয়ানের পদেও অধিষ্ঠিত ছিলেন।
পরিবারে লেখাপড়ার চর্চা থাকায় মিরকাশিমও অনেকটা লেখাপড়া শিখেছেন। গণিত ও জ্যোতিষশাস্ত্রে তিনি সুপণ্ডিত। সৎ চরিত্র, বড়ে খানদান দেখে তাঁর সঙ্গে মিরজাফরের বেটি ফতিমা বিবির বিয়ের রিসতা পাকা করেছিলেন স্বয়ং নবাব আলিবর্দি খাঁ। প্রচুর যৌতুক তিনি দিয়েছিলেন নবদম্পতিকে। সেই সঙ্গে তিনি মিরকাশিমের জন্য ধার্য করেছিলেন দুশো টাকা মাসোহারা।
মিরকাশিম হিসেবি মানুষ। খুবই সাদামাঠা তার দিন গুজরানের তরিকা। অন্যান্য ওমরাহদের মতো সিরাজি ও জেনানার প্রতি তেমন তীব্র ঝোঁক তাঁর নেই। তিনি পয়সা ওড়ানোর চেয়ে সঞ্চয়ে বেশি মনোযোগী। এই গুণের জন্য উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি ও সামান্য মাসোহারা নিয়েই তিনি যথেষ্ট বিত্তশালী।
সিরাজদ্দৌলাকে মসনদচ্যুত করার জন্য গোটা দরবার যখন উত্তাল, নসিবের চাকা ঘোরানোর জন্য জীবনজুয়ায় মত্ত মনসবদার, বেনিয়ান, ওমরাহ, জমিদারেরা, ইনকিলাবের ডামাডোলে কে কত মুনাফা লুঠতে পারে, তার হিসেব হিসেবনিকেষে তাঁরা যখন মহাব্যস্ত, মিরকাশিম তখন এসব থেকে অনেক দূরে। আবেগে ভেসে হঠকারিতা করার মতো মানুষ তিনি নন। মিরকাশিম পা ফেলতে পছন্দ করেন গণিতের সূত্রে বাঁধা ছকে, একেবারে ঠান্ডা মাথায়, হুশিয়ার আদমির মতো রীতিমতো তজবিজ করে। যাতে লোকসানের ঝুঁকিটা কম হয়।
তবে পলাশির প্রান্তরে ইনকিলাব ঘটে যাওয়ার পর থেকে মিরকাশিমের মনটা বড় চঞ্চল হয়ে উঠেছে। মসনদে বসতে চলেছেন শ্বশুর মিরজাফর খাঁ। এবার দরবারে বড় একটা পদ জুটতে পারে। না—শুধু এই নয়, মিরকাশিমের মনের গভীরে রয়েছে আরও কিছু। মিরজাফরের বয়স হয়েছে। কতদিন নবাবগিরি করতে পারবেন তার ঠিক নেই। মিরন মূর্খ, নালায়েক। মিরজাফরের অবর্তমানে মসনদে বসে রাজ্যপাট চালানো মিরনের পক্ষে আদৌ সম্ভব কি? তাহলে তো বাংলার ভবিষ্যৎ…না! এখনই এতটা ভাবতে রাজি নন মিরকাশিম। বিচক্ষণ এই মানুষটা বোঝেন সহসা উচ্চাকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ তাঁর জীবনের পক্ষে খতরনক হয়ে উঠতে পারে। পা ফেলতে হবে চুপিসারে, কৌশলে। উপযুক্ত সময়ের জন্য ইন্তেজার করতে হবে। গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান অনুকূল কি না, তা যাচ-ইমতেহানি করে দেখতে হবে। তবেই তো নিশ্চিত হবে কামেয়াবি। এই হল মিরকাশিমের জীবনদর্শন।
তবুও থেকে থেকে অস্থির হয়ে উঠছে তাঁর মন। ভাবীকালের গর্ভে কী আছে তা জানার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছেন মিরজাফরের দামাদ। বজরার ভিতর নিজের কক্ষে ফরাসের উপর বসে ফরসির নল মুখে দিয়ে চিন্তিত মুখে চেয়ে আছেন সামনে বিছানো কাগজে আঁকা নিজের রাশিচক্রের উপর। কপালে ভাঁজ। ময়ূরের পালকের কলমটা কালিতে চুবিয়ে আঁকিবুঁকি কাটছেন কাগজের উপরে। গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান অনুকূলে আসতে কত দেরি, সেই হিসেব কষে চলেছেন মিরজাফরের দামাদ। পাশে পড়ে রয়েছে জ্যোতিষশাস্ত্রের মোটামোটা পুঁথি—তালেনামা।
অনেকক্ষণ বই নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে করতে চোখদুটো ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। তার উপরে আলো কমে এসেছে ঘরে। খানিকবাদে দাখিলারা এসে আলো জ্বেলে দেবে ঘরে। একটানা বসে কাজ করতে করতে পিঠটাও কেমন যেন ব্যথা ব্যথা করছে। লেখাপড়ার সরঞ্জাম গুটিয়ে রেখে বজরার উন্মুক্ত পাটাতনের উপরে এসে দাঁড়ালেন মিরকাশিম।
সন্ধে নামতে আর বেশি দেরি নেই। মেঘ জমেছে পশ্চিমাকাশে। বৃষ্টি এল বলে। বজরা-সুলুপ-পানসি সবই পাড়ের দিকে ঠেলছে মাঝি-মাল্লারা। আজকের মতো যাত্রা সাঙ্গ হল। আবার চলা শুরু হবে কাল ভোরে।
মিরকাশিমের অধীনে স্থলসেনারা নৌবহরের সঙ্গে তালমিল রেখে নদীর তটরেখা বরাবর এগোয়। স্থলবাহিনীর কাসিদরা ঘোড়া দাবড়ে সারাদিন বিভিন্ন এলাকা ঘুরে পলাতক নবাব সিরাজদ্দৌলার খোঁজ করে বেড়ায়। দিনের শেষে নৌবহর যেখানে নোঙর করে সেখানে পৌঁছে মিরকাশিমের কাছে সারাদিনের কাজের খতেন পেশ করে।
প্রত্যেকদিনই আশায় আশায় থাকেন মিরকাশিম। আজ বুঝি কাসিদরা কোনও খুশির খবর আনবে। কিন্তু দিনের শেষে একরাশ অবসাদ ও হতাশা মিরকাশিমকে গ্রাস করে। তার সামনে এসে কাসিদরা মাথা ঝুঁকিয়ে চেয়ে থাকে ভূমির দিকে। না এখনও সিরাজের কোনও খোঁজ মেলেনি। জ্যোতিষের পুঁথি ঘেটে মিরকাশিম গণনা করে জেনেছেন সামনে তার শুভ সময় আসছে। কিন্তু যে কাজের গুরুভার মিরজাফর তার কাঁধে চাপিয়েছেন সে কাজে সফল হতে না পারলে আদৌ তার নসিবের চাকা ঘুরবে কি? কোথায় সিরাজদ্দৌলা?
মিরকাশিম চিন্তিত মুখে মেঘে ছাওয়া আকাশের দিকে চেয়ে থাকেন।
.
হঠাৎ একটা ঝাঁকুনি দিয়ে দুলে উঠল নৌকাটা। ভয় পেয়ে সিরাজের হাতটা চেপে ধরল লুৎফুন্নেসা। লুৎফার কোলে মধ্যে ঘুমন্ত উম্মেসায়েরা ঘুম থেকে জেগে উঠে কেঁদে উঠল। তাকে শান্ত করার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ল লুৎফা।
সিরাজদ্দৌলা ব্যস্ত গলায় মাঝিদের উদ্দেশে শুধোলেন, ‘কী হল?’
উত্তরের অপেক্ষা না করে দ্রুত ছইয়ের ভিতর থেকে বেরিয়ে এলেন সিরাজ। হতাশ গলায় মাঝিদের দলপতি কওসর জানাল, ‘নৌকা চরায় আটকে গিয়েছে হুজুর।’
‘হায় আল্লা! সর্বনাশ। কী হবে এখন?’ আতঙ্কিত হয়ে পড়েন সিরাজ।
চারজন মাঝি বেশ কিছুক্ষণ কসরত করে আটকে যাওয়া নৌকোটাকে ফের ভাসালো জলে। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন সিরাজদ্দৌলা। প্রশ্ন করলেন, ‘এটা কোন জায়গা?’
কওসর জানায়, ‘নজদিকে নাজিরপুরের মোহনা হজরত।’
‘তাহলে তো রাজমহল প্রায় এসেই গিয়েছি। দ্রুত এগিয়ে চলো।’
‘লেকিন হুজুর—’ কথা অসমাপ্ত রেখে মাথা নুইয়ে দাঁড়িয়ে থাকে কওসর।
‘কী হল?’ সিরাজের গলায় প্রকাশ পেল বিরক্তি।
‘সামনে আর এগোনো যাবে না।’
‘কী?’ সিরাজের গলাটা বেশ চড়ে যায়। প্রশ্নের ভঙ্গিতে পুরোনো শাহি মেজাজের ছায়া পড়ে। কওসর কেঁপে ওঠে।
‘গুস্তাকি মাফ করবেন হজরত। নাও বাওয়ার জন্য জেয়াদা পানি নেই দরিয়ায়।’ গুজারেশ করে কওসর।
সিরাজের মুখ এক নিমেষে অন্ধকার হয়ে যায়। কওসরকে প্রশ্ন করে জানলেন, নাজিরপুরের মোহনা এখান থেকে মাত্র কয়েক ঘণ্টার পথ। মোহনায় পৌঁছতে পারলে গঙ্গা বেয়ে রাজমহল একেবারে নাগালের মধ্যে। সেখান থেকে উট বা ঘোড়ার পিঠে চেপে পাটনা পৌঁছতে তেমন কিছু তকলিফ হবে না। সিরাজ ভাবেন, তার চিঠি পেয়ে জাঁ ল এতক্ষণে নিশ্চয়ই পাটনা ছেড়ে মুর্শিদাবাদের পথে রওনা হয়ে গিয়েছেন। পথেই ল সাহেবের সঙ্গে তার দেখা হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি। সবই পরিকল্পনা মতো এগোচ্ছিল, হঠাৎই বাধ সাধল নদী।
অসহায় গলায় সিরাজ শুধোলেন, ‘কী হবে কওসর? উপায় কী?’
‘এখানে অপেক্ষা করা ছাড়া কোনও উপায় নেই হজরত। তেজ বারিস না হলে নাও বাওয়ার পানি মিলবে না।’
সিরাজ চকিতে আসমানের পানে চাইলেন। এক চিলতে মেঘ নেই আকাশে। কবে তেজ বারিশের হদিশ মিলবে কে জানে। দুশ্চিন্তায় অস্থির হয়ে ওঠেন সিরাজ।
কওসর বলে, ‘নজদিকে একটা গ্রাম আছে হজরত। সেখানে গেলে হয়তো দানাপানি মিলবে।’
দানাপানির কথায় সহসা যেন হুঁশ ফিরল সিরাজের। সঙ্গের রসদ শেষ হয়ে গিয়েছে। গত তিন দিন ধরে তিনি, লুৎফা ও উম্মেসায়েরা তিনজনেই অভুক্ত। হিরাঝিলের আয়েশ-আসরতে যাদের দিন-গুজরান করার কথা সিরাজের বদ-কিসমতির ভাগীদার হয়ে তারা আজ বেসাহারা হয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। মাথার উপর ছাত নেই, পেটে ভাত নেই। তিনিই তো দায়ী এ জন্যে। সিরাজের দুচোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে।
হুকুমের ইন্তেজারে জোড় হাত করে সামনে দাঁড়িয়ে আছে কওসর। তার দেহেও ক্লান্তির ছাপ। অভুক্ত অন্যান্য মাঝি-মাল্লাদের শরীরেও যেন আর দাঁড় বাওয়ার এক বিন্দু শক্তিও নেই। খিদের জ্বালায়, ক্লান্তিতে সব ধুকছে। আহারের সংস্থান করা এখন সবচেয়ে জরুরি।
সিরাজদৌলা হুকুম করলেন, ‘পাড়ে নৌকা ভেড়াও কওসর।’
‘জি হজরত।’
সত্যিই নদীতে জল খুব কম। লগা দিয়ে ঠেলে নৌকোটাকে পাড়ের দিকে নিয়ে গেল কওসর ও তার সঙ্গী তিনজন মাঝি। লুৎফা ও উম্মেসায়েরাকে নিয়ে পাড়ে নামলেন সিরাজদ্দৌলা।
পাড়ে নেমে গ্রামের কোনও চিহ্ন দেখতে পেলেন না সিরাজদ্দৌলা। যদিও কওসর বলেছিল কাছেই একটা গ্রাম আছে। চারিদিকে শুধু ঘন ঝোপ আর জঙ্গল। এদিকে বেলা ফুরিয়ে আসছে। রাত কাটানোর জন্য আশ্রয় দরকার। তার চেয়েও জরুরি আহার জোগাড় করা। কওসরের জিম্মায় বেগম লুৎফা ও বেটি উম্মেসায়েরাকে বসিয়ে রেখে সিরাজ গেলেন জনবসতির সন্ধানে।
একটা ঝাঁকড়া বটগাছের গায়ে ঠেস দিয়ে বসল ক্লান্ত লুৎফা। তার কোলে নিস্তেজ হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে তিন দিনের অভুক্ত উম্মেসায়েরা। তার গায়ে পরম মমতায় হাত বোলাতে থাকে লুৎফা। কী বুঝদার এই একরত্তি মেয়ে! আব্বাজানের বদ-কিসমতির আন্দাজ তার শিশুমনও নিশ্চয়ই পেয়েছে। কষ্টকর এই নৌযাত্রায় উম্মেসায়েরা বিশেষ বিরক্ত করেনি। অভুক্ত থাকলেও খিদেয় কাঁদেনি। কখনও সিরাজের কোলে, কখনও লুৎফার কোলে চুপ করে শুয়ে থেকেছে। মাথাটা সামনে ঝুঁকিয়ে উম্মেসায়েরার কপালে চুমু খায় লুৎফা।
সন্ধের মুখে ঘরে ফিরছে পাখিরা। তাদের কিচিরমিচির শব্দে চারিদিক একেবারে মুখর হয়ে উঠেছে। সিরাজ যে-পথে আশ্রয় ও আহারের সন্ধানে গিয়েছেন সে দিকে চেয়ে লুৎফা ভাবতে থাকে, শয় শয় গোলাম-বাঁদিরা যার হুকুমের অপেক্ষা করেছে, ছেলেবেলা থেকে যে কোনও কিছু চাইতে না চাইতেই খিদমতদারেরা সব কিছু এনে যার সামনে হাজির করেছে, চাঁদ পেড়ে আনতে বললেও, তা পালন করার জন্য জান কবুল করেছে বান্দারা, সেই সিরাজ আজ সাধারণ এক মরদের মতো বেটি ও বিবির জন্য আশ্রয় আর আহার্যের সন্ধান করে বেড়াচ্ছে অচেনা এক গাঁয়ে। সিরাজের বদনসিবের কথা ভেবে দুঃখে ভরে ওঠে লুৎফার মনটা। মসনদই তো সিরাজের মুসিবতের মূল কারণ।
লুৎফা ভাবে, আহা, সিরাজ যদি আলিবর্দির নাতি না হয়ে, নবাব না হয়ে সামান্য এক মরদ হত, এমন একটা অচিন গাঁয়ে সিরাজের সঙ্গে যদি ঘর বাঁধতে পারত সে, আর পাঁচজন আদমি ও আওরাত দেহাতে যেভাবে ঘর বাঁধে ঠিক সে ভাবে, তাহলে কত নিবিড় ভাবে কাছে পাওয়া যেত সিরাজকে। মসনদ মানেই তো রক্ত, কাঁটা, ষড়যন্ত্র! নবাব-বাদশার জীবনের চেয়ে আমআদমির জীবন খারাপ কীসে? সে জীবনে অর্থের অভাব থাকলেও সুখ তো কিছু কম নেই। বাংলা মুলুক ছেড়ে পালিয়ে গিয়ে, মিরজাফর ও ইংরেজদের নাগালের বাইরে চলে গিয়ে কোনও একটা অচেনা জায়গায় ঘর বেঁধে সে আর সিরাজ কি একটা সুখের ঘর গড়ে তুলতে পারে না? পরক্ষণেই নিজেকে ধিক্কার দেয় লুৎফা। কী স্বার্থপরের মতো ভাবনা তার। শুধু একান্তভাবে কাছে পাওয়ার জন্য মামুলি এক মরদের মতো সিরাজকে কি সে বেঁধে রাখতে পারে?
আজ না হয় ভাগ্যের পরিহাসে সিরাজ মসনদচ্যুত। কিন্তু পাটনার নায়েব রামনারায়ণের মদত ও ফরাসিদের সাহায্য পেলে আবার হয়তো অচিরেই বাংলার মসনদ দখল করবে সিরাজ। আকাশের দিকে মুখ তুলে দোয়া মাঙে লুৎফা– হে সর্বশক্তিমান আল্লা! তাই যেন হয়। সিরাজের জিন্দেগি ফের শান-শওকত-রওশনে ভরিয়ে দাও।
ঠিক তখনই কাছাকাছি কোথাও ডেকে ওঠে একটা হুতোম প্যাঁচা। বড় মনহুস আওয়াজ। লুৎফার বুক কেঁপে ওঠে। আঁধার নেমে আসছে দ্রুত। কোথায় গেল সিরাজ?
.
কিছুদূর এগোনোর পর একটা মসজিদ দেখে আশান্বিত হয়ে উঠলেন সিরাজদ্দৌলা। মসজিদ যখন আছে তখন নিশ্চয়ই মুসাফিরদের জন্য আশ্রয়ের ব্যবস্থাও থাকবে। সামনে এগিয়ে গিয়ে কয়েক ধাপ মাটির সিঁড়ি বেয়ে মসজিদের দাওয়ায় উঠলেন সিরাজদ্দৌলা। চারিদিক নিঝুম। কোনও জনমানবের অস্তিত্ব নজরে পড়ছে না। মসজিদের দরজায় হুড়কো লাগানো রয়েছে।
খানিকটা হতাশ হয়ে মসজিদের দাওয়া থেকে নেমে এলেন সিরাজ।
‘কে আপনি? কাকে খুঁজছেন?’
প্রশ্নটা শুনে চমকে গিয়ে সিরাজ ঘুরে তাকালেন।
দেখলেন অদূরে দাঁড়িয়ে আছেন মাঝবয়সি একজন মানুষ। পরনে কালো রঙের খিরকা। তার উপরে রঙবেরঙের কাপড়ের টুকরো দিয়ে তাপ্পি মারা রয়েছে। লোকটির মুখে রুক্ষ দাড়ি। মাথায় ঝাঁকড়া চুল। চুল ও দাড়িতে পাক ধরেছে। তাঁর দুচোখের কৌতূহলী দৃষ্টি সিরাজের মুখের উপরে স্থির হয়ে রয়েছে।
সিরাজ এগিয়ে গেলেন তার দিকে।
লোকটি শুধোয়, ‘কে আপনি? কোত্থেকে আসছেন?’
জবাবে সিরাজ বলেন, ‘আমি এক মুসাফির। আসছি জাহাঙ্গিরনগর থেকে। যাব সাসারাম। নদীতে পানি নেই। আর এগোতে পারছি না। চরায় নৌকো আটকে গিয়েছে, তাই এখানেই নেমে পড়লাম। সঙ্গে জেনানা ও মাসুম বাচ্চা আছে।’
‘কোথায় তারা?’ কৌতূহলী গলায় প্রশ্ন করে লোকটি।
‘নদীর ধারে বসিয়ে রেখে এসেছি। আমাদের একটু আশ্রয় দেবেন?’
‘আপনি তো আচ্ছা বেওকুফ আদমি। জেনানা, বাচ্চা নিয়ে ভেসে পড়েছেন দরিয়ায়। এই সময় এখানে যে নাহানে পানি থাকে না, তা জানতেন না?’
একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দুদিকে মাথা নাড়েন সিরাজ। দেহভঙ্গিতে ঝরে পড়ে হতাশা।
লোকটি বলে, ‘আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে বড্ড তকলিফের মধ্যে আছেন।’
সিরাজ বললেন, ‘রসদ ফুরিয়ে গিয়েছে। আমরা গত তিন দিন ধরে দানাপানি জোটেনি।’
‘সে কী?’ চমকে ওঠে লোকটি।
‘আমার বেটির উমর তিন সাল। সেও ভুখা রয়েছে।’
লোকটি ব্যস্ত হয়ে বলে, ‘বলছেন কী? আপনি শিগগিরই পরিবারকে এখানে নিয়ে আসুন। মসজিদের পিছন দিকে একখানা ঘর আছে। ওটাই মুসাফিরখানা।’
এ কথা শুনে খুশি হয়ে সিরাজ বলেন, ‘বহুত সুক্রিয়া।’
লোকটি ফের বলে, ‘কেউ তো বড় একটা আসে না এ তল্লাটে। ঘরখানা পড়েই থাকে। ভাঙাচোরা ছোট্ট একখানা ঘর। পরিবার নিয়ে থাকতে হয়তো আপনার তকলিফ হবে।’
‘না না কোনও তকলিফ হবে না। যা পাওয়া যাচ্ছে এই আমাদের কাছে অনেক।’
‘তবে আলাদা রসুই ঘর আছে। কুয়োতলাও আছে।’
‘এ তো দিব্যি ব্যবস্থা। জলদি সামান্য কিছু আহারের আনজাম করতে পারেন?’
‘জরুর। এই গরিবখানায় আপনার যত্নআত্তির কোনও ত্রুটি হবে না। এখনই সব ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। যতক্ষণ না নদীতে নাও বাওয়ার পানি পাচ্ছেন ততদিন এখানেই থাকুন। আমি ভবঘুরে লোক। ঘুরে ঘুরে বেড়াই। আজ এখানে থাকি তো কাল আরেক জায়গায়। তবে আপনার ভাবনার কোনও কারণ নেই। সেলিমের ঘর কাছেই।’
‘সেলিম কে?’
‘আমার মুরিদ। সেই আপনাদের দেখভালের সব আনজাম করবে।’
সিরাজ মৃদু গলায় বলেন, ‘বহুত বহুত সুক্রিয়া। আপনার পরিচয়?’
লোকটি হাসে। ‘কী পরিচয় দেব? আমি একজন ফকির। বলতে পারেন আমি খোদাতালার পথের রাহী।’
সিরাজ শুধোন, ‘শুভ নাম?’
‘পিরজাদা শাহদানা।’
.
