1 of 2

পলাশির পরে – ৫০

৫০

গত পাঁচ সালের আদায়-উশুলের হিসেব-খতেন পেশ করতে বলেছেন নবাব মিরজাফর খাঁ। পাটনার দেওয়ানখানাজুড়ে জোর হুড়োহুড়ি ও ব্যস্ততা। আমিন-কানুনগোসহ দেওয়ানখানার অন্য সব কর্মচারীদের নাওয়াখাওয়ার সময় নেই। জাবেদা খাতার পাতায় পাতায় হিসেবের গরমিলে গোঁজামিল দিতে গিয়ে তারা জেরবার। রামনারায়ণের অনুগত দেওয়ানখানার এই কর্মচারীরাও মনিবের মদতে এতকাল বেআইনি রোজগারে ফুলে ফেঁপে উঠেছে। নবাবের কাছে সব যে ফাঁস হয়ে যাওয়ার উপক্রম! ত্রস্ত কর্মচারীরা নিজেদের ত্রুটি আড়াল করতে মরিয়া।

এতকাল নামে-বেনামে পাটনার দেওয়ানখানা থেকে প্রচুর টাকা সরিয়েছেন রামনারায়ণ। তিনি অবশ্য একে কোনও অপরাধ বলে মনে করেন না। যে টাকা নিজামতের প্রাপ্য ছিল, সে টাকার একটা অংশ ঢুকেছে তাঁর জেবের ভিতরে। তাঁর পূর্বসূরীরাও এই একই তরিকায় প্রচুর দৌলতের মালিক হয়েছিল। কিন্তু রামনারায়ণের সমস্যা হল তিনি এখন নবাবের চোখের বালি। তাঁর সামান্য ত্রুটিবিচ্যুতিকেই এখন পর্বতপ্রমাণ অপরাধ বলে দেখবেন নবাব। তাঁর সুনজরে থাকলে সাতখুন মাপ। নিজামত এই কায়দাতেই চলে।

কয়েকমাস আগে নবাব যখন টাকাকড়ির হিসেবপত্র চেয়ে তাঁকে মুর্শিদাবাদে তলব করেছিলেন, তখন ‘তবিয়ত আচ্ছা নেই’ বলে নবাবের হুকুমত এড়িয়েছিলেন রামনারায়ণ। একদা সিরাজদ্দৌলার অনুগত রামনারায়ণের আন্দেশা ছিল, নয়া জমানায় নবাব বা ক্লাইভ কেউই তাঁকে রেয়াত করবেন না। মুর্শিদাবাদে পা দিলেই তিনি গ্রেফতার হবেন। তারপর হয় জিন্দানখানায় পচে মরতে হবে, নয়তো সিরাজদ্দৌলার মতোই কোনও ঘাতকের হাতে অচানকই দেহান্ত হবে তাঁর।

রামনারায়ণের উমিদ ছিল নসিবের চাকা ঘুরবে। মিরজাফর খাঁ মসনদে বসতে না বসতে অন্তর্কলহ শুরু হয়েছে নিজামতের অন্দরে। দেওয়ান ও নবাবের সম্পর্কে চিড় ধরেছে। মুর্শিদাবাদ থেকে ভেসে আসছে এসব কথা। রাজনীতির হাওয়া কখন কোন দিকে কী ভাবে ঘুরবে কেউ জানে না। কিছুদিন পরে অচানকই তিনি যেন আলোর রেখা দেখতে পেলেন। ক্লাইভের সঙ্গে মন কষাকষি শুরু হয়েছে নবাবের। নিজামতের উপরে নিজের নিয়ন্ত্রণ জোরদার করতে তাগদবাজ হিন্দুদের কাছে টানছেন ক্লাইভ। এই কূটনীতির আঁচ পেয়ে উৎফুল্ল হয়ে ওঠেন রামনারায়ণ। মাথার উপরে ক্লাইভের হাত থাকায় নবাবের রোষ থেকে রক্ষা পেলেন মেদিনীপুরের ফৌজদার রাজারাম, বাঁচলেন রায়দুর্লভ। অতএব তাঁরও আশা আছে। ইংরেজদের সঙ্গে সম্পর্কটা মজবুত করতে পারলেই হল।

জাঁ ল-য়ের খোঁজে পাটনায় এলেন আয়ারকুট। চতুর রামনারায়ণ সেই ওয়াক্তে উপহার ও পেশকাশে আয়ারকুটকে বশ করে ফেললেন। আয়ারকুট নিজেও অনুধাবন করলেন বাস্তবচিত্র। অহেতুক রামনারায়ণকে তং করলে কোম্পানিরই ক্ষতি। ফিরে গিয়ে একথা তিনি বোঝালেন ক্লাইভকে। মুনশি নবকৃষ্ণও ওই একই কথা বললেন। আয়ারকুট ও নবকৃষ্ণের প্রভাবে রামনারায়ণ সম্বন্ধে ক্লাইভের ধারণা বদলে গেল। কর্নেল ক্লাইভ তার পক্ষে—গোবিন্দমল্ল মারফত এ কথা জেনে খুশিতে ভেসেছিলেন রামনারায়ণ। নসিবের চাকা ঘুরছে। রাখে হরি মারে কে।

এ পর্যন্ত সব ঠিকই ছিল। হাওয়া বইছিল রামনারায়ণের অনুকূলেই। কিন্তু পাটনা দুর্গে এসে খাজনার খতেন চেয়ে বসে সহসা সবকিছু ওলটপালট করে দিলেন মিরজাফর খাঁ। হিসেব দাখিল করতে গেলেই সাবুত মিলবে—রামনারায়ণ দুর্বৃত্ত। নিজামতের টাকা তছরুপ করেছেন। তারপর? ক্লাইভ যদি মুখ ফিরিয়ে নেন, তাহলে?

আতঙ্কে তাই ঘুম উড়েছে রামনারায়ণের। আপাতত কী করে নবাবের কাছে হিসেব দাখিল করা থেকে অব্যাহতি পাওয়া যায়, তার একটা উপায় খুঁজে বের করতে তিনি মরিয়া।

‘বলছেন কী? হিসেব পেশ করার হুকুম করেছেন নবাব?’ প্রশ্ন করলেন রায়দুর্লভ।

‘জি হুজুর। আপনি সুবে বাংলার দেওয়ান। সমঝদার আদমি। বুঝতে পারছেন সবই। নবাব চোরির ইলজাম আনতে চাইছেন আমার উপরে।’ বিরস মুখে গুজারেশ করলেন রামনারায়ণ।

অবাক হয়ে খানিকটা স্বগতোক্তির ভঙ্গিতে অস্ফুট স্বরে রায়দুর্লভ বলে উঠলেন, ‘আজিব বাত।’

কথাটা ঠিক মতো শুনতে পেলেন না রামনারায়ণ। ‘জি হুজুর?’

‘আপনার বিষয়ে নবাবের সঙ্গে কর্নেলের বাতচিতের সময় আমি হাজির ছিলাম। এমন তো কোনও কথা হয়নি। ক্লাইভ সাহেব তো সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন পাটনার কুরসিতে আপনিই বহাল থাকবেন। কোনও কিসিমে আপনাকে তং করা চলবে না।’

‘ইয়ে তো বহুত খুশনসিব কি বাত। লেকিন নবাব তা মানছেন কোথায়?’

রায়দুর্লভ বললেন, ‘আমি ভাবছি নবাবের ইতনা হিম্মত কী করে হল?’

‘আমিও তো ভেবে কুল পাচ্ছি না হুজুর।’

নবাবের রিস্তেদার ও খানদানের লোকজন, বাইজি, কসবি এরা গোটা পাটনার দুর্গটা প্রায় দখল করে নিয়েছেন। এই হট্টগোল থেকে দূরে থাকতে দুর্গ থেকে কিছুটা দূরে গঙ্গার তীরে এক হাভেলিতে উঠেছেন সুবে বাংলার দেওয়ান রায়দুর্লভ। ঘরের মধ্যে আগেনাগারে পুড়ছে অভ্রের পাত। দেওয়ালগিরিতে পুড়ছে মোমবাতি। রায়দুর্লভের কপালে ভাঁজ। তিনি গভীর চিন্তায় মগ্ন। তাঁর সামনে হাতজোড় করে বসে প্রায় বলির পাঁঠার মতো কাঁপছেন রামনারায়ণ—পাটনার দোর্দণ্ডপ্রতাপ নায়েব সুবাদার।

সহসা মুখ তুলে রায়দুর্লভ বললেন, ‘উপায় একটাই আছে। নবাব আপনাকে ছোবল মারতে চাইছেন, বাঁচতে হলে ওঝাকেই ইয়াদ করতে হবে।’

রায়দুর্লভের কথার ইঙ্গিতটা ধরতে না পেরে হাঁ করে চেয়ে রইলেন রামনারায়ণ।

‘ক্লাইভ সাহেবকে তুরন্ত জানাতে হবে সব কথা। তিনিই ভরসা।’

‘জানি হুজুর। তবুও যে বল পাচ্ছি না মনে। আগর ক্লাইভ সাহেবের বাত নবাব না মানেন তো?’ চিন্তিত গলায় বললেন রামনারায়ণ।

মুচকি হেসে রায়দুর্লভ বললেন, ‘বুডঢা গর্ধভ মনিবের অবাধ্য হবে বলছেন?’

‘তাই তো দেখছি হুজুর। মির্জা শামসুদ্দিনের জবান ঝুটা বলে সাবুত করতে চাইছেন নবাব।’

‘ক্লাইভ সাহেবের সঙ্গে গোপনে একবার দেখা করতে পারবেন আপনি?’

‘ইয়ে বড়ি মুশকিল কি বাত। নবাবের কাসিদরা আমার উপরে কড়া নজর রেখেছে। অনেক কসরত করে তাদের নজর এড়িয়ে আপনার হাভেলিতে এসেছি।’

‘বেশ। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। আমিই সব কিছু জানাচ্ছি কর্নেলকে।’

‘বহুত বহুত সুক্রিয়া হুজুর। আপনার সঙ্গে বাতচিত করে অনেকটা ভরসা পেলাম।’

.

রাত গভীর। চারিদিক নিস্তব্ধ। জবরদস্ত ঠান্ডায় কালো আলোয়ানে মাথা মুড়ে যেন ঘুমিয়ে রয়েছে চরাচর। রায়দুর্লভের হাভেলি থেকে বেরিয়ে এলেন রামনারায়ণ। মাথা থেকে হাঁটু পর্যন্ত আলোয়ানে মোড়া। অন্ধকারে প্রায় মিশে গিয়েছেন। হঠাৎই তিনি থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। কাছেই ঝোপের মধ্যে নড়াচড়ার শব্দ। পিছু নিল কি কেউ? অচানকই ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে তার সামনে দিয়ে ছুটে গেল বনবেড়াল জাতীয় কোনও জন্তু। নিশ্চিন্ত হলেন রামনারায়ণ। না কোনও গুপ্তঘাতক নয়। পা চালিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি দুর্গের হাতায় এসে পড়লেন।

গঙ্গার তীরভূমি বরাবর মেঠো পথ। পথের উপরে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে বুনো ঝোপ। মাঝে মাঝেই পথের পাশে মাথা উঁচু করে রয়েছে বড় বড় ঝাঁকড়া গাছপালা। পাটনা দুর্গের পিছন দিকে জঙ্গলাকীর্ণ এই অংশে লোকজন বড় একটা আসে না। এই এলাকাটা দিনের বেলাতেও ছায়াবৃত থাকে। রামনারায়ণের হাভেলি থেকে বেরিয়ে এই পথ ধরে বেশ কিছু দূর গিয়ে দুর্গের প্রাকারের একটা ভাঙা অংশের মধ্যে দিয়ে গলে দুর্গ থেকে বেরিয়ে সরাসরি গঙ্গার তীরে গিয়ে পড়া যায়। এই পথেই ভোজপুরী পাহারাদারের জালসাজিশে রায়দুর্লভের হাভেলিতে গিয়েছিলেন রামনারায়ণ। জংলা পথে জানোয়ারের ভয় আছে। রামনারায়ণের হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরা রয়েছে বাঁশের একটা মজবুত লাঠি। তিনি হেঁটে চলেন সন্তর্পণে। আশেপাশের কোনও গাছ থেকে ডেকে উঠল একটা রাতচরা পাখি। বড় মনহুশ আওয়াজ। চমকে উঠলেন রামনারায়ণ। ঠিক তখনই বুনো ঝোপ ভেদ করে অতর্কিতে তাঁর উপরে ঝাপিয়ে পড়ল এক আততায়ী।

আচমকা এই হামলায় বেসামাল হয়ে মাটিতে পড়ে গেলেন রামনারায়ণ। হাতের লাঠিটা ছিটকে গেল। লোকটা দারুণ বলশালী। লোকটা নিমেষে রামনারায়ণের বুকের উপরে চড়ে বসে লোহার মতো শক্ত দু’হাতে তাঁর গলা টিপে ধরল। দম আটকে আসছে রামনারায়ণের। নিজের দু’হাত দিয়ে প্রাণপণে গলার ফাঁস আলগা করার কোশিস করতে লাগলেন।

তারপরেই দ্বিগুণ চমক। হঠাৎই রামনারায়ণের গলার ফাঁস আলগা হয়ে গেল। অস্ফুট আর্তনাদ করে সেই বলশালী লোকটা লুটিয়ে পড়ল মাটিতে। খুবই দ্রুততার সঙ্গে ঘটে গেল সব কিছু। একেবারে চোখের নিমেষে। উঠে বসে হাঁপাতে লাগলেন রামনারায়ণ।

তড়িৎগতিতে মশাল হাতে ছুটে এল দুটো লোক। বচন সিং ও রঘুরাম।

এখনও আতঙ্কমুক্ত হতে পারেননি রামনারায়ণ। ত্রস্ত গলায় শুধোলেন ‘ক- কে?’

‘আমি বচন সিং।’

বিস্ফারিত চোখে নিজের বিশ্বস্ত দুই কর্মচারীকে ইয়াদদস্ত করলেন রামনারায়ণ।

বচন সিং শুধোল, ‘আপনি সালামত আছেন তো হুজুর।’

‘তোমরা? এখানে?’

‘আপনাকে খতম করতে এসেছিল এই আদমি।’

‘কে?’ বচন সিং-এর মুখপানে চেয়ে শুধোলেন রামনারায়ণ।

‘এক গদ্দার। আপনার খুবই পরিচিত। ভালো করে চেয়ে দেখুন।’

রঘুরামের হাত ধরে কোনওরকমে উঠে দাঁড়ালেন রামনারায়ণ। আতঙ্কে এখনও হাত-পা কাঁপছে। অদূরে হুমড়ি খেয়ে পড়ে আছে আততায়ী। নিথর, নিস্পন্দ। তার পিঠে গেঁথে আছে একটা বর্শা। মুখটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না। মাটি ভিজে উঠেছে রক্তে। সে রক্তের দাগ রামনারায়ণের পরনের কাপড়েও লেগেছে।

রামনারায়ণ ফের শুধোলেন, ‘কে এ? কৌন হ্যায়?’

তীব্র নফরতির সঙ্গে লাশটাকে পা দিয়ে চিৎ করে দিল বচন সিং।

আঁতকে উঠলেন রামনারায়ণ, ‘ল-ছ-ম-ন!’

‘জি হুজুর। আপনার খাস গোলাম।’ বলল বচন সিং।

রঘুরাম বলল, ‘মিরকাজিমের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল বেইমান লছমন।’

‘বলছ কী? বেসাহারা এই ছোকরাকে ভালোবেসে গোলামের নোকরি দিয়েছিলাম!’

বচন সিং বলে, ‘নিমকহারাম। খরিশের বাচ্চা। মিরকাজিম ও লছমনের গোপন আঁতাতের কথা জেনে ফেলেছিল রঘুরাম। আমাকে এসে জানায়। সেই থেকে আপনার উপরে কড়া নজর রেখেছিলাম আমরা। পাহারাদারের জালসাজিশে আপনাকে দুর্গ থেকে বেরোতে দেখে আপনার পিছু নিই। আপনি রায়দুর্লভজির হাভেলিতে গিয়েছিলেন, সব জানি।’

বচন সিং ও রঘুরামকে বুকে জড়িয়ে ধরে রামনারায়ণ বললেন, ‘কী ইনাম চাও বলো।’

‘ইনাম চাই না হুজুর। আপনাকে সালামত রাখতে পেরেছি। এতেই খুশি।’ বলল বচন সিং।

নিজের দুই কর্মচারীর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতায় তার চোখদুটো জলে ভরে উঠল।

বচন সিং বলল, ‘এখন এই লাশটা নিয়ে কী করা যায়?’

রামনারায়ণ হুকুম করলেন, ‘গঙ্গায় ছুড়ে ফেলে দাও।’

হুকুম তামিল করল বচন সিং ও রঘুরাম। তারপর দুজনকে সঙ্গে নিয়ে নিজের হাভেলিতে এসে ঢুকলেন রামনারায়ণ। যদিও সাক্ষাৎ মৃত্যুদূতকে প্রত্যক্ষ করেছেন ক্ষণেক পূর্বে, তবুও তার মনে হতে লাগল লছমন একটা মস্ত উপকার করে গিয়েছে। রামনারায়ণের ধূর্ত মস্তিষ্কে ঝিলিক দিচ্ছে দারুণ একটা মতলব। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রয়েছে বচন সিং ও রঘুরাম। রামনারায়ণ গম্ভীর গলায় বললেন, ‘শোনো, নায়েব সুবাদারকে খতম করতে চেয়েছিল কেউ—কাল এই খবর চাউর করে দিতে হবে গোটা দুর্গে। লেকিন লছমনের বিষয়ে কেউ যেন কিছু জানতে না পারে।’

বচন সিং ও রঘুরাম অবাক চোখে তাকায় রামনারায়ণের দিকে।

রামনারায়ণ বলেন, ‘লছমন তার মনিবকে খতম করতে চেয়েছিল শুনলে লোকে বলবে এটা পাটনা দুর্গের অন্দরের কাজিয়া। মূল সাজিশি যে মিরকাজিমের তা মনে হবে না কারও। কেননা কোনও সাবুত নেই। লছমন মৃত। তার জবান থেকেও কিছু আর জানার উপায় নেই।’

বচন সিং মাথা নেড়ে বলে, ‘ইয়ে সহি বাত।’

‘খবরটা ছড়িয়ে দিতে হবে এই তরিকায়– কোনও এক আততায়ী নায়েব সুবাদারের কক্ষে ঢুকে ঘুমন্ত অবস্থায় তাঁকে খতম করার কোশিশ করেছিল। গোলমালের আওয়াজ পেয়ে গোলাম-বাঁদিরা ছুটে আসে। আততায়ী পালিয়ে যায়। অন্ধকারে কোথাও লুকিয়ে পড়ে। তাকে চিনতে পারেনি কেউই। এই সংবাদ চাউর হলে সকলের সন্দেহ গিয়ে পড়বে নবাবের শিবিরের উপরে। এতে লাভ হবে আমার। আর হ্যাঁ। আরেকটা কথাও সকলকে জানিয়ে দেওয়া চাই, নায়েব সুবাদার জখম হয়েছেন, বিছানা ছেড়ে উঠতে পারছেন না।’

বচন সিং অবাক হয়ে বলে, ‘লেকিন হুজুর আপনি তো—’

মুচকি হেসে রামনারায়ণ বললেন, ‘বিলকুল চাঙ্গা আছি। যা বললাম, তাই করো।’

নায়েব সুবাদারকে সেলাম জানিয়ে বিদায় নিল বচন সিং ও রঘুরাম।

হাভেলির গোলাম-বাঁদিদের ডেকে তাদের হাতে রুপেয়া গুঁজে দিয়ে তাঁর বিষয়ে কী বলতে হবে তা বলে দিলেন রামনারায়ণ।

এরপর গৃহবৈদ্যকে ডেকে নিজের বুক ও কাঁধ অঞ্চলে সুচারুভাবে কাপড়ের পট্টি জড়িয়ে নিলেন। যাতে মনে হয় তিনি ছুরিকাঘাতে জখম হয়েছেন। এই অজুহাতে আপাতত হিসেব দাখিলের হাত থেকে নিস্তার পাওয়া যাবে।

.

পরের দিন রামনারায়ণের পরিকল্পনামাফিক ছড়িয়ে পড়ল খবরটা। হুলুস্থূল পড়ে গেল গোটা দুর্গে। তাজ্জব বনে গেলেন মিরজাফর খাঁ। এ খবর সত্যি না মিথ্যে তার যাচইমতেহানি করতে গিয়ে ধন্দে পড়ে গেলেন নবাব। রামনারায়ণ অতিশয় ধূর্ত লোক। হিসেব দাখিলের কাজটা এড়াতে এ কোনও কৌশল নয় তো? এ কথাও যেমন ভাবছেন নবাব, তেমনই অন্যদিকে ভাবছেন খবরটা যদি সত্যি হয় তাহলে তাঁর অজ্ঞাতে কে করল এই কাজ? এর জিম্মেদারি এই ওয়াক্তে তাঁর ঘাড়েই এসে পড়বে। তাঁর সঙ্গে রামনারায়ণের আদাওতির কথা সকলেই জানে। ক্লাইভের এসব শুনলে কী ভাববেন?

দুশ্চিন্তায় অস্থির হয়ে পড়লেন নবাব। ঘটনার সত্যতা যাচাই করার জন্য গোবিন্দমল্লকে পাঠালেন রামনারায়ণের হাভেলিতে।

রামনারায়ণের সঙ্গে একান্তে সাক্ষাৎ করলেন গোবিন্দমল্ল। তাঁকে খুলে বললেন সব কথা। সেই সঙ্গে পেশকাশ হিসেবে তাঁর হাতে ধরিয়ে দিলেন মোহরের খেরিয়া। গায়ে জড়ানো মোটা আলোয়ানের আড়ালে নিমেষে তা চালান করে দিলেন গোবিন্দমল্ল।

রামনারায়ণ বললেন, ‘যেমন বললাম, কথাটা সে ভাবেই নবাবের কানে তুলবেন।’

‘ভাববেন না হুজুর। বান্দা পেশকাশের ইজ্জত রাখতে জানে।’

.

কিছুক্ষণ পর নবাবের কক্ষে এসে সেলাম জানালেন গোবিন্দমল্ল।

নবাব উৎকণ্ঠার সঙ্গে শুধোলেন, ‘কী বুঝলে? ঘটনাটা সত্যি না রামনারায়ণের কৌশল?’

‘রামনারায়ণজির উপরে হামলা হয়েছিল। উনি সচমুচ ঘায়েল হয়েছেন।’

তবুও মিরজাফরের মনের সংশয় দূর হয় না। ‘ভালো করে পুছতাছ করে দেখেছ?’

‘জি হুজুর। এই বান্দা আপনাকে কখনও ঝুট বলেনি।’

বিস্মিত গলায় মিরজাফর শুধোলেন, ‘কে করলে এই কাজ?’

ক্ষণেকের জন্য মাথা নিচু করে নীরব থাকেন গোবিন্দমল্ল। তারপর মুখ তুলে বললেন, ‘বান্দার গোস্তাকি মাফ করবেন হুজুর। আমার মনে হয়, জনাব মিরকাজিমকে ডেকে পুছতাছ করলেই আপনার প্রশ্নের জবাব পেয়ে যাবেন।’

‘সাবুত আছে?’

‘না হুজুর। আমার আন্দাজ।’ এই বলে বিদায় নিলেন গোবিন্দমল্ল।

ফরসির নলে ঘনঘন টান দিতে লাগলেন মিরজাফর। তাঁরও মনে হয়েছিল এই ঘটনা যদি সত্যি হয়, তাহলে এ কাজ মিরকাজিম ছাড়া আর কারও হতে পারে না। হঠাৎই তার সহোদরের প্রতি প্রবল আক্রোশে ফুঁসতে লাগলেন মিরজাফর। কেবলই তাঁর মনে হতে লাগল, তাঁর রক্তের সম্পর্কের রিস্তেদারেরা সকলেই এক একটি আহাম্মক। এঁরা তাঁর কোনও উপকার করতে পারেন না কেবল তাকে মুসিবতের মধ্যে টেনে নিয়ে যেতে পারেন। পাটনার দেওয়ানখানায় টাকা তছরুপের কথা তিনি জানেন। হিসেব দাখিল করতে বলে রামনারায়ণকে বেকায়দায় ফেলেছিলেন। সাবুত মিলত। ক্লাইভকে বোঝাতে পারতেন রামনারায়ণ ডাকাইত, বেইমান। এই সুযোগ হাতছাড়া হতে বসেছে মিরকাজিমের বেওকুফিতে। সহসা যেন নবাব অনুভব করলেন, পাটনার নায়েব সুবেদারি তো দূরের কথা, সামান্য ফৌজদারের দায়িত্ব সামলানোর মতো আক্কেল জ্ঞান নেই তার সহোদরের। মিরকাজিম নাদান, নালায়েক।

ক্ষিপ্ত হয়ে তখনই মিরকাজিমকে তলব করলেন নবাব। কড়া যাচ ইমতেহানির মুখে পড়ে মিরকাজিম কবুল করলেন যে রামনারায়ণকে খতম করার পরিকল্পনা তাঁরই ছিল।

‘বেওকুফ কাঁহিকা।’ চাপা গলায় গর্জন করে উঠলেন নবাব।

শির ঝুঁকিয়ে মিরকজিম বললেন, ‘মনে হয়েছিল ক্লাইভ সাহেব নারাজ থাকায় পাটনার নায়েব সুবাদারের কুরসিতে আমাকে বসাতে পারবেন না আপনি, তাই মরিয়া হয়ে–’

তাচ্ছিল্যের সুরে নবাব বললেন, ‘বাহাদুর ইনসান!’

অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলেন মিরকাজিম।

‘খুদ নিজে খতম করতে গিয়েছিলে রামনারায়ণকে?’ ঝাঁঝালো গলায় প্রশ্ন করেন নবাব।

‘না।’

‘তবে?’

‘রামনারায়ণজির খাস গোলাম লছমনকে টাকা দিয়ে বশ করেছিলাম। লছমনই—’

চকিতে এক কৌশল ঝিলিক দেয় মিরজাফরের মাথায়। আরও পেশকাশ দিয়ে লছমনকে বশীভূত করে তার জবানে যদি বলানো যায়, সে নায়েব সুবাদারকে খতম করতে গিয়েছিল ঠিকই কিন্তু এটা পাটনা দুর্গের অন্দরের কাজিয়া। এর সঙ্গে নবাব বা তাঁর রিস্তেদারদের কোনও যোগ নেই। তাহলে এই ওয়াক্তে বড় উপকার হয় তাঁর। প্রবল আগ্রহের সঙ্গে মিরজাফর প্রশ্ন করেন, ‘কোথায় লছমন?’

‘আজিব বাত। লছমন বেপাত্তা। কোনও খোঁজ নেই তার।’ বললেন মিরকাজিম।

সহসা ঝড়ের গতিতে ঘরে প্রবেশ করে গোবিন্দমল্ল বললেন, ‘লছমনের খোঁজ মিলেছে হুজুর। তাঁর লাশটা ভাসছে গঙ্গায়।’

চমকে উঠলেন মিরকাজিম। মিরজাফরের মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল।

গোবিন্দমল্ল ফের গুজারেশ করলেন, ‘চিঠি আছে হুজুর। ক্লাইভ সাহেব পাঠিয়েছেন।’

চিঠিটা দ্রুত গোবিন্দমল্লের হাত থেকে নিয়ে চোখের সামনে মেলে ধরলেন নবাব।

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *