৪
পলাশির যুদ্ধের পরেই বাসা বদল করেছেন মিরজাফর খাঁ। বেগম, বাঁদি, গোলাম, বান্দা, রিসতেদারসহ জাফরাগঞ্জের প্রাসাদ ছেড়ে হিরাঝিল প্যালেসে এসে উঠেছেন। ক’দিন আগেও নবাব সিরাজদ্দৌলার ঐশ্বর্য ও সৌন্দর্যপ্রীতির পরিচায়ক ছিল হিরাঝিল প্যালেস। ভাগীরথীর পশ্চিম পাড়ে মনসুরগঞ্জে এর অবস্থান। তাই কেউ কেউ বলে মনসুরগঞ্জের প্যালেস। ঘসেটি বেগমের মোতিঝিল প্রাসাদের গরিমাকে ম্লান করতে এই প্রাসাদ গড়েছিলেন সিরাজদ্দৌলা।
মোতিঝিলের আদলেই এই প্রাসাদকে ঘিরে রেখেছে অশ্বখুরাকৃতি একটি ঝিল। অবশ্য মোতিঝিলের মতো প্রাকৃতিক নিয়মে এর জন্ম নয়। সিরাজের খায়েশে খনন করা হয়েছিল। মোতিঝিলের চেয়েও আকারে বড়। ‘হিরাঝিল’ নামকরণ সিরাজেরই করা।
প্যালেস তো নয় যেন খোয়াবে দেখা একটুকরো রঙিন দুনিয়া। বেহেস্তের মতো সুন্দর। গতকাল বাসা বদলের ধকলে গোটা প্যালেসটা ঘুরে দেখার অবকাশ পাননি মণি বেগম—হিরাঝিল প্যালেসের নয়া মালকিন। আজ সকাল থেকেই তিনি মহলে মহলে ঘুরছেন। দেখে দেখে যেন আশ আর মিটছে না বেগম সাহেবার।
শিশমহলের চকমিলানো মেঝেতে দাঁড়িয়ে দেওয়ালে ও ছাতে গাঁথা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আয়নায় নিজের হাজার হাজার প্রতিবিম্ব দেখে মণি বেগম স্তম্ভিত। যেদিকেই তাকাচ্ছেন চোখ ঝলসে যাচ্ছে। তাঁর রূপের জলুসে গোটা শিশমহল যেন হাসছে। পুরুষের চোখে তারিফের ভাষা দেখে কিশোরী বয়স থেকেই মণি বেগম বুঝতেন তিনি অপরূপা। খোদাতালা তাঁকে নিপুণ ভাবে গড়েছেন। আজ যেন হিরাঝিলের অশুমার আয়নায় নিজের রূপকে নতুন করে আবিষ্কার করলেন বুডঢা মিরজাফরের যুবতী ভার্যা। নিজের প্রতিবিম্বের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে মণি বেগমের মনে হল, দর্পণে যাকে দেখছেন, এ যেন তিনি নন, বেহেস্তের কোনও হুরী।
ছেলেমানুষি খেয়ালে কত্থক নাচের ভঙ্গিতে কয়েকবার পাক খেলেন নৃত্যপটীয়সী বেগম সাহেবা। মুহূর্তেই যেন ঝড় উঠল। নিপুণ পায়ের ছন্দ। অপূর্ব দেহভঙ্গিমা। গোটা শিশমহল ঝলমল করে উঠল। নিজের এই ছেলেমানুষিতে হাসি পেয়ে গেল বেগম সাহেবার। সজোরে হেসে উঠলেন। সে হাসিতে যেন মুক্তো ঝরে পড়ল।
শিশমহল থেকে বেরিয়ে এসে বাগানের পথ ধরে হিরাঝিলের নৌকোঘাটের পানে হেঁটে চললেন মণি বেগম। ঠিক যেন চলমান এক যৌবনবহ্নি। বেগম সাহেবার পরনের পেশোয়াজ ও কুর্তি গায়ের সঙ্গে সেঁটে আছে। বড় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যৌবন সুবাসে ভরপুর নারীদেহের অবয়ব। তাঁর গলায় জড়ানো আশমানি ওড়না উড়ছে বাতাসে। চলার ছন্দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দুলছে চিকন কোমর ছাড়িয়ে গুরুনিতম্বের উপরে এসে পড়া লম্বা বেণী। জরির ফিতে দিয়ে বাঁধা। বেণীর গায়ে গাঁথা রয়েছে কয়েকটা তাজা গুলাব। লাল রঙের। বেগম সাহেবার ঠোঁট তাম্বুলরাঙা। দুই চোখে সুরমা। মসৃণ দুই গালে আফশাঁর প্রলেপ। মণি বেগম হেঁটে চলেছেন। চলার পথ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে আতরের সুগন্ধ।
নিজেকে কী করে মোহিনী রূপে সাজিয়ে তুলতে হয় মণি বেগম তা জানেন। সৌন্দর্য, আত্মবিশ্বাস ও ব্যক্তিত্বের অসামান্য নিদর্শন বছর পঁচিশের এই নারী। প্রায় সাত-আট সাল তো হয়ে গেল মিরজাফরের সঙ্গে তাঁর শাদি হয়েছে। এখনও মণি বেগমের মুখপানে তাকালে বহেরা বনে যান বুডঢা মিরজাফর। বুড়ো খসমের কামনামদির চোখদুটো দেখে হেসে ফেলেন মণি বিবি। হাসিন মুখের সেই হাসি দেখে মিরজাফরের বোধবুদ্ধি সব কেমন যেন গুলিয়ে যায়। স্থানকাল ভুলে বিবিকে সবলে আকর্ষণ করার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েন। পাশেই যে গোলাম-বাঁদিরা রয়েছে সে হুঁশ থাকে না। এমন অবস্থায় খসমের মান রাখতে ধরা না দিয়ে কৌশলে পিছলে যান মণি বেগম। নরম আঙুল দিয়ে মিরজাফরের গালে ঠোনা মেরে বলেন, ‘বেশরম বুডঢা কাঁহেকা।’ বিবির মুখে এই তিরস্কার শুনে বেওকুফের মতো হেসে ওঠেন মিরজাফর। মণি বেগম বোঝেন, বোকাসোকা এই বুডঢা মানুষটা তাঁর তালুবন্দি।
নুড়ি বিছানো পথের দুপাশে কেয়ারি করা বাগিচা নতুন বর্ষার সমাগমে যেন বেশি রকমের সবুজ হয়ে উঠেছে। ঘন সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে ফুটে রয়েছে রং বেরঙের সুগন্ধি ফুল। গোটা পথ জুড়ে জায়গায় জায়গায় মাথার উপরে ধনুকের ছিলার মতো বাহারি নকশার কাঠামো আঁকড়ে বেড়ে উঠেছে মাধবীলতা। মণি বেগম থমকে দাঁড়িয়ে পড়েন। মুখের কাছে নুয়ে পড়েছে মাধবীলতার কচি সবুজ পাতায় ভরা একটি ডাল। ফের ছেলেমানুষি পেয়ে বসে বেগম সাহেবাকে। সবুজ পাতা দুই আঙুলে ধরে নিজের নরম গালে বোলাতে থাকেন। চোখ বুজে যায় আবেশে, সুখে।
মণি বেগম ভাবেন, তিনি বহুত খুশনসিব এক আওরত। যা ঘটে গেল তার জীবনে তা কোনও সুনহরি খোয়াব? নাকি সত্যি? ছিলেন সামান্য এক তওয়ায়েফ। পরে সিপাহসালার মিরজাফরের বেগম। এখন নবাব-বেগম। হিরাঝিল প্যালেসের নয়া মালকিন। খোদার বহুত মেহেরবানি! নৌকোঘাটে পৌঁছে বিদ্যুৎগতিতে কয়েক ধাপ নীচে নেমে প্রশস্ত চাতালের উপর সহসা থমকে দাঁড়িয়ে পড়েন তিনি। আরও কিছু ধাপ নীচে ছলাৎছলাৎ করে পাড়ে এসে ধাক্কা খাচ্ছে হিরাঝিলের জলরাশি, প্রায় কাঁচের মতো স্বচ্ছ। সেদিকে একদৃষ্টে চেয়ে থাকেন বেগম সাহেবা। চোখের পর্দায় সহসা চলমান হয়ে ওঠে অতীতের তসবির।
নবাব আলিবর্দি খাঁর পেয়ারের নাতি সিরাজদ্দৌলার শাদি হবে। মুর্শিদাবাদ তাই রংদার। সুবে বাংলার রাজধানী উৎসবের ফূর্তিতে ভাসছে। ত্রিপোলিয়া তোরণদ্বার পার হয়ে চেহেল সেতুনের দিকে এগিয়ে চলেছে কয়েকখানা পালকি। আরোহীরা হল জেহানাবাদের নামী তওয়ায়েফ বিশু বেগ ও তার দলবল। এরা আসন্ন উৎসবে মুজরোর দাওয়াত নিয়ে এসেছে।
পালকিতে বসে চিকের আড়াল থেকে মুর্শিদাবাদ শহরটাকে দু’চোখ ভরে দেখছিল ষোলো বছরের এক কিশোরী। তার নাম মণি। মেয়েটির পরনে সস্তা শালোয়ার ও কুর্তা, জায়গায় জায়গায় তালিতাপ্পি মারা। সে হল তওয়ায়েফ বিশু বেগের মেয়ে বুব্বু বাইয়ের বাঁদি।
সেকেন্দ্রার কাছে বলকুন্ডা নামে এক অখ্যাত গ্রামের এক গরিব পরিবারে মণির জন্ম। দুবেলা ভালো করে খাবার জুটত না। তার বাপ কে মণি জানে না। জ্ঞান হতে দেখে আসছে তার গরিব মাকে। মেয়ের রূপ আছে। এই রূপই হয়তো একদিন নসিব ফেরাতে পারে। এই ভেবে গরিব মা মেয়েকে তুলে দিলেন বাইজি বিশু বেগের হাতে।
ঠিকমতো তালিম পেলে মণিও হয়তো একদিন নামজাদা বাইজি হয়ে উঠতে পারে। তাহলে মেয়ের খাওয়াপরার ভাবনা থাকবে না। মণির মা এমনই ভেবেছিলেন।
বিশু বেগ ঠাঁই দিলেন মণিকে। তবে সে ভাবে নাচ শেখার সুযোগ হল না মণির। বব্বুরই বয়সি মণি। বিচক্ষণ বিশু বেগ ঠিকই বুঝেছিলেন রাজা-বাদশার মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো রূপ মণির। এ মেয়ে তালিম পেয়ে পাকা তওয়ায়েফ হয়ে উঠলে বব্বুর কোনও কদর থাকবে না।
বিশু বেগ যখন তালিম দিতেন বব্বুকে, মন দিয়ে দেখত মণি। গভীর মনোযোগের সঙ্গে নজর করত বিশু বেগের হাতের মুদ্রা, পায়ের চলন। রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে মণি গোপনে সেই নাচের তরিকা, ছন্দ রপ্ত করত। সারাদিনে তো ফুরসত মেলে না। বব্বুর খিদমত খাটতে হয়। পান থেকে চুন খসলে পিঠে পড়ে কোড়ার আঘাত।
মণির এই কসরত বিশু বেগের নজর এড়ায়নি। কিন্তু মুখে কিছু বলেননি তিনি। মেয়েটির অধ্যবসায় ও প্রতিভা বিশু বেগকে মুগ্ধ করেছিল। তিনি ঠিক করলেন আগে তার নিজের মেয়ে বব্বু প্রতিষ্ঠা পাক, তারপরে তিনি আসরে পেশ করবেন মণি বাঁদিকে।
চেহেল সেতুন যাওয়ার পথে অন্য একটা ডুলিতে বসে চিকের আড়াল থেকে মণি বাঁদির মতো বিশু বেগও মুর্শিদাবাদ নগরীকে অবাক চোখে দেখছিলেন। পথঘাট, দোকানপাট, কুঠি-হাভেলি সবেতেই সমৃদ্ধির ছোঁয়া। ডুলিতে বসে রঙিন এক খোয়াব দেখতে থাকেন বিশু বেগ। তওয়ায়েফ হয়ে হিন্দুস্তানে দিন গুজরান করা এখন বেশ কঠিন। জাহাঙ্গির, শাহজাহান বাদশার আমলের রবরবা এখন তুজুকে ঠাঁই নিয়েছে। অযোধ্যার নবাব, বেনারসের রাজারও সেই কড়ির জোর আর নেই। বাইজির কদরদারি করবে কে? তবে মুর্শিদাবাদের জলুস এখনও অটুট আছে। নাচের আসরে এখানকার কোনও রইস আদমির যদি বব্বুকে মনে ধরে, তবে তার একটা হিল্লে হয়। বাকি জীবনটা নিশ্চিন্তে কাটাতে পারেন বিশু বেগ। কিন্তু দুনিয়াদার কি তাঁকে এতটা দয়া করবেন?
সিরাজদ্দৌলার বিয়ের অনুষ্ঠান উপলক্ষে মেহফিল বসল চেহেল সেতুনে। তামাম সুবে বাংলার জমিদার, আমির, ওমরাহরা সব হাজির। নরম গালিচার উপরে নেচে চলেছে বব্বু বাই। বীণকার, সারেঙ্গিবাদক, তবলচি ঝড় তুলছে বাজনায়। নাচতে নাচতে বব্বু ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। পা চলছে না। একসময় নাচ থামিয়ে দেয় সে। থেমে যায় বীণকার, তবলচি, সারেঙ্গিবাদক। বীণকারের পাশে বসে গাইছিলেন বিশু বেগ। তিনিও থমকে গেলেন।
হইহই করে ওঠে সিরাজির নেশায় মাতাল রসিকের দল। মনের তুষ্টি হয়নি তাঁদের। তাঁরা আরও নাচ দেখতে চায়।
‘কেয়া হুয়া বাইসাহেবা?’ প্রশ্ন করেন মিরজাফর।
‘গোস্তাকি মাফ কিজিয়ে হুজুর। বব্বু বাই থক গয়ি।’ মাথা নুইয়ে জবাব দেন বিশু বেগ।
‘তো কেয়া? দুশরা কিসিকো পেশ কিজিয়ে।’
সকলে গলা মেলায়। ‘বেশক।! জরুর।’
কী করবেন বিশু বেগ। নিজেই নামতে পারেন আসরে। কিন্তু গত কয়েকদিনের জ্বরে ধরে তাঁর শরীরটা দুর্বল হয়ে পড়েছে। আসরে নাচার মতো দম নেই। আমির-ওমরাহরা সব নাচের নেশায় মেতে উঠেছে, এখন আসর ছেড়ে চলে যাওয়া মানে ঘোর বেইজ্জতি।
অগত্যা মণি বাঁদিকে আসরে পেশ করলেন বিশু বেগ।
মাথায় সলমা চুমকি বসানো আসমানি ওড়না। পরনে জরির কাজ করা কাঁচুলি, পেশোয়াজ ও ঘাঘরা সজ্জিত, আসরে দাঁড়িয়ে মাথা নুইয়ে সকলকে কুর্নিশ জানায় মণি বাঁদি। আবির্ভাবেই বাজিমাত। মণি বাঁদির মুখের দিকে তাকিয়েই আমির-ওমরাহদের কলিজার খুন ছলকে ওঠে।
সুর তোলে বীণকার। গান ধরেন বিশু বেগ। তবলচি চাঁটি মারে তবলায়। সুর ছড়ায় সারেঙ্গি। নিমেষে নাচের ছন্দে ঝড় তোলে মণি। আশ্চর্য হয়ে যান বিশু বেগ। পাকা তওয়ায়েফওয়ালির মতো নাচের কায়দা, চোখের চাহনি, মরদের কলিজা থেকে খুন ঝরানোর এত ছলাকলা কী করে রপ্ত করল দেহাতের আনপড় এই মেয়েটা?
সামনের সারিতে বসে সিপাহসালার মিরজাফর খাঁ সাহেব একদৃষ্টে চেয়ে থাকেন মণির মুখের দিকে। চোখের পলক পড়ে না। মণির দুচোখের চাহনি তার হৃদয়কে মাতাল করে দেয়।
পরের দিনই বিশু বেগের কুঠিতে এসে হাজির হন মিরজাফর। কোনও ভণিতা ছাড়াই সুবে বাংলার সিপাহসালার বলেন, ‘মণিকে এক রাতের জন্য হারেমে নিয়ে যেতে চাই বাই সাহেবা।’
ইঙ্গিতটা স্পষ্ট বুঝতে পারেন বিশু বেগ। তাঁর অহংবোধে আঘাত লাগে। এক সময়ে তামাম হিন্দুস্থানে বহু নবাব-বাদশার দরবারে মুজরো করেছেন বিশু বেগ। ভরা যৌবনে তাঁর রূপের কদরদারও কম ছিল না। কিন্তু এমন কুৎসিত প্রস্তাব কেউ কখনও তার সামনে পেশ করার হিম্মত করেনি। বিশু বেগ সব সময় নিজের সম্ভ্রম বজায় রেখেছেন। সকলকে বুঝিয়ে দিয়েছেন তিনি একজন কলাকার। কসবি নন।
বিশু বেগকে চুপ করে থাকতে দেখে মিরজাফর খাঁ বলে ওঠেন, ‘যা ইনাম চান, তাই পাবেন বাই সাহেবা।’
‘ইয়ে নেহি হো সাকতা।’ দৃঢ় কণ্ঠে জবাব দেন বিশু বেগ।
মিরজাফরের মুখের সব খুশির রং এক লহমায় মিলিয়ে যায়।
গলার স্বরটা বোধ হয় একটু বেশিই চড়ে গিয়েছিল। আর যাই হোক, মিরজাফর খাঁ ইমানদার আদমি। সুবে বাংলার সিপাহসালার।
বিশু বেগ পরক্ষণেই মাথা ঝুঁকিয়ে বলেন, ‘গোস্তাকি মাফ করবেন হুজুর। আমরা কলাকার। কসবি নই। আমরা নাচ দেখিয়ে পয়সা কামাই। শরীর নিয়ে সওদা করি না।’
কেউ যেন সপাং করে চাবুক দিয়ে আঘাত করে মিরজাফরের মুখের উপর। তিনি বাক্যিহারা হয়ে গেলেন। মাথা নিচু করে উঠে দঁড়িয়ে রইলেন।
‘আপনি সত্যিই মণিকে চান?’ প্রশ্ন করেন বিশু বেগ।
চকিতে চোখ তুলে তাকান মিরজাফর। ব্যস্ত হয়ে জবাব দেন, ‘জরুর।’
‘মণিকে শাদি করে বেগমের ইজ্জত দিতে পারবেন?’
মুহূর্তের জন্য থমকে যান মিরজাফর। বেশ কয়েক বছর আগে ফৈজিকে দেখে মিরজাফর খাঁ মুগ্ধ হয়েছিলেন। কিন্তু তাকে নিয়ে রতিসুখে মেতে ওঠার কোনও উপায় ছিল না খাঁ সাহেবের। ফৈজি ছিল সিরাজের পিয়ারি। গতরাতের মেহফিলে মণি বাইয়ের নাচ দেখতে দেখতে ঘোর লেগেছিল মিরজাফরের চোখে। কে এই হুরি? ভাবে, ভঙ্গিতে, দেহের গড়নে ঠিক যেন ফৈজি।
সিপাহসালারকে নিরুত্তর দেখে তাঁর মুখের দিকে কৌতূহলী চোখে চেয়ে থাকেন বিশু বেগ।
ক্ষণিকের স্তব্ধতা ভেঙে মিরজাফর বলে উঠলেন, ‘বেশ আমি রাজি। শাদিই করব মণিকে।’
মণির না হয় একটা গতি হয়ে গেল। কিন্তু কী হবে বব্বুর? বিশু বেগ এবারে একটা মোক্ষম চাল দিলেন। বললেন, ‘মণি ও বব্বু দুজনেই আমার মেয়ে। দো বহেন। বব্বু আমার নিজের মেয়ে। মণিকে আমি লালন করেছি। মণিকে পেতে হলে বব্বুকেও শাদি করতে হবে আপনাকে। দুজনকেই বেগমের ইজ্জত দিতে হবে।’
মিরজাফর বললেন, ‘মঞ্জুর। এ তো আমার খুশনসিব।’
সিরাজের শাদির অনুষ্ঠান মিটে যাওয়ার কিছুদিন পরেই ঘটা করে মণি বাই ও বব্বু বাইয়ের সঙ্গে মিরজাফরের বিয়ে হল। পুরুষের মন জয়ের ছলাকলায় মণির মতো প্রতিভা নেই বব্বুর। জাফরাগঞ্জের জেনানামহলের অন্দরে মামুলি আর পাঁচজন জেনানার মতো দিন কাটতে লাগল তার। বব্বু এতেই খুশি। সে জানে, না আছে তার মণির মতো রূপ, না আছে মায়ের মতো নাচের প্রতিভা। তবুও সে যা পেল, তা নিয়ে দুনিয়াদারের কাছে তার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।
কিন্তু মণি বাই কিন্তু অন্য ধাতুতে গড়া। শুধু বিত্তে, গয়নায়, দিন গুজরানের নিরাপত্তায় তার মন ভরে না। গরিব ঘরে জন্মে একদিন পদে পদে লাঞ্ছিত হয়েছে মণি। আজ সে চায় তাগদ, জোশ, হুকুম করার ক্ষমতা।
কাছাকাছি কোথাও একটা পাখি খুব সুন্দর সুরে ডাকছে। মণি বেগমের হুঁশ ফেরে। এলোমেলো হাওয়ায় থিরথির করে কাঁপছে হিরাঝিলের জল। ঘরমুখো হন বেগম সাহেবা।
পলাশির যুদ্ধে হেরে পালিয়ে গিয়েছেন সিরাজদ্দৌলা। মসনদে বসতে চলেছেন মিরজাফর। বোকাসোকা বুডঢা মিরজাফরকে হাতের মুঠোয় রেখে চালনা করা তেমন কোনও কঠিন কাজ নয়, মণি বেগম বোঝেন। মিরজাফরের আড়ালে থেকে সুবে বাংলার শাসনযন্ত্রকে নিয়ন্ত্রণ করতে চান তিনি। আরও একটা খায়েশ আছে আছে তাঁর। নিজের গর্ভজাত পুত্র নজমউদ্দৌলাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে যাওয়া।
একদিন সুবে বাংলার নবাব হবে নজমউদ্দৌলা—এই সুখ কল্পনায় মণি বেগম রোমাঞ্চিত হয়ে ওঠেন। তবে এর বাস্তব রূপায়ণ যে খুব সহজ নয়, একথাও বোঝেন বুদ্ধিমতী এই নারী। মিরজাফরের অবর্তমানে তাঁর বড় পুত্র মিরনই মসনদের প্রথম হকদার। কিন্তু খোদার কী খায়েশ তা কে বলতে পারে? এসব এলোমেলো নানা কথা ভাবতে ভাবতে হিরাঝিলের নৌকাঘাট থেকে প্রাসাদের দিকে ফিরে চললেন মণি বেগম। তার পিছন পিছন হাঁটতে থাকে বাঁদির দল।
‘আম্মিজান।’ দূর থেকে ছয় বছরের বালক নজমউদ্দৌলার চিকন গলার আওয়াজ ভেসে আসে।
মণি বেগম সচকিত হয়ে ওঠেন।
এই অচেনা পরিবেশে অনেকক্ষণ মাকে না দেখে উতলা হয়ে পড়েছিল নজমউদ্দৌলা। বাঁদির কোল থেকে জোর করে নেমে সে মায়ের দিকে দৌড়ে আসে।
মণি বেগম দুহাত বাড়িয়ে দেন। ছেলে এসে মায়ের কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
.
জাফরাগঞ্জের প্রাসাদটা পুত্র মিরন ও তাঁর পরিবারের জন্য ছেড়ে দিয়েছেন মিরজাফর। তাঁর প্রথম বিবি, আলিবর্দির দুঃসম্পর্কের বোন শাহ খানম হিরাঝিলে যাননি। পুত্র মিরনের সঙ্গেই তিনি রয়েছেন।
পলাশি জয়ের খুশি মানাতে আলোয় মুড়েছে জাফরাগঞ্জ প্যালেস। মজলিশ বসছে রোজ। চলছে খানাপিনা আর হুল্লোড়। আতর, গুলাব, কাবাব, দুনিয়াজা শরাব সব মিলিয়ে এক উগ্র গন্ধে সবসময় ম-ম করছে জাফরাগঞ্জের প্রাসাদ। ইতর গোছের, বিকৃত রুচির দুই মোসাহেব চুনিলাল ও মুন্নিলালকে নিয়ে রোজ রাতে এখানে আসর জমিয়ে তোলে মিরন।
সারাদিন শহরে তাণ্ডব চালিয়ে সন্ধেবেলা জাফরাগঞ্জের মজলিশে হাজির হয় চুনিলাল ও মুন্নিলাল। শরাবের পাত্র হাতে নিয়ে তেল চপচপে ভাজা মাংস, গোস্তের দুনিয়াজা মৌজ করে চিবোতে চিবোতে তারা তাদের দৈনিক কুকর্মের খতেন পেশ করে নবাবজাদা মিরনের কাছে।
হররোজের মতো সেদিনও মজলিস জমে উঠেছিল জাফরাগঞ্জে।
শরাবের পাত্রে চুমুক দিয়ে চুনিলাল গর্বের সঙ্গে বলে, ‘আজ তিন লেড়কিকে আপনার হারেমে নিয়ে তুলেছি। খুবসুরত চিজ। একেবারে তাজা গুলাব। খুশবুদার।’
মিরন চুনিলালের পিঠে একটা চাপড় মেরে বলে, ‘বহুত আচ্ছা।’
‘হুজুর খুশ, তো দুনিয়া খুশ।’ খোশামুদে হাসি হাসে চুনিলাল।
গলায় শরাব ঢেলে মিরন বলে, ‘খুশ আর কি করে থাকি চুনিলাল? আমার দিল জখম হয়ে আছে লুৎফুন্নেসার জন্যে। উয়ো হাসিনা ভেগে গেল।’
মুন্নিলাল বলে, ‘সে তো জানি। লুৎফা বেগম হুজুরের কলিজা।’
চুনিলাল ভাজা মাংসের টুকরো চিবোতে চিবোতে বলে, ‘ভেগে আর যাবে কোথায় হুজুর? জরুর পাকড়াও করবে কাসিদ রা। তারপর চালান হবে হুজুরের হারেমে। হারেমে একখানা ঘর সাজিয়েগুছিয়ে রেখেছি। গুলাবের পাপড়ি ছড়ানো বিছানায় লুৎফাকে নিয়ে আপনি খুশি মানাবেন।’
কামার্ত দৃষ্টি শূন্যে ভাসিয়ে মিরন বলে, ‘লেকিন জিন্দা পাকড়াও হবে তো?’
চুনিলাল বলে, ‘হবে হবে। খোদা মেহেরবান। বেশক হুজুরের খায়েশ পূরণ করবেন।’
চিন্তিত গলায় মিরন বলে, ‘হারেমে আসতে যদি নারাজ হয়, বহুত জিদ্দি আওরত!’
চুনিলাল বলে, ‘এ ক’দিনে জিদ্দি আওরত তো কম দেখলাম না হুজুর। সবাই তো আপনার হাতে পড়ে সিধে হয়ে গেল।’
মুন্নিলাল খ্যা খ্যা করে বিশ্রি রকম হেসে উঠে বলে, ‘বহুত রগড় হবে। সিরাজের পিয়ারি হবে হুজুরের বাঁদি।’
‘চুপ রহো বেওকুফ।’ মুন্নিলালের মাথায় জবরদস্ত এক চাঁটি মেরে ধমকে ওঠে মিরন। মুন্নিলালের হাতে ধরা শরাবের পাত্র থেকে শরাব ছলকে পড়ে গালিচায়।
মিরন বলে, ‘বাঁদি নয় বেগম হবে। শাদি করব।’
চুনিলাল বলে, ‘ইয়ে তো জব্বর খুশি কা বাত। ফির হুজুরের শাদি হবে।’
মুন্নিলাল বলে, ‘খানাপিনা হবে, মেহফিল হবে, ফূর্তি হবে।’
হঠাৎই ভয়ানক গম্ভীর হয়ে মিরন বলে, ‘ফূর্তির আরও অনেক কিসিম আছে মুন্নিলাল। মওত নাচাব চেহেল সেতুনে। আলিবর্দির হর রিসতেদারের মওত।’ এই বলে হিংস্র হাসিতে ফেটে পড়ে মিরন। চুনিলাল ও মুন্নিলালও সেই হাসিতে যোগ দেয়।
ঠিক তখনই হন্তদন্ত হয়ে কক্ষে প্রবেশ করে মিরনের খাস গোলাম কাদির। তার চোখেমুখে ভয়ের ছাপ। গোলামের ত্রস্ত ভাব দেখে মিরনের ভুরু দুটো কুঁচকে যায়। সে শুধোয়, ‘কেয়া হুয়া কাদির?’
‘হুজুর হাতিয়ারবন্ধ গোরা পল্টন। প্রায় একশো জন। কুঠির দেউড়িতে।’
‘গোরা পল্টন?’ ভয় ধরে মিরনের চোখেমুখেও। চুনিলাল ও মুন্নিলালও ত্রস্ত।
‘সঙ্গে তোপের গাড়িও আছে।’
মিরন, চুনিলাল ও মুন্নিলালের মেহফিলের মেজাজ, শরাবের নেশা ছুটে যায়।
একটা চিরকুট মিরনের হাতে ধরিয়ে দিয়ে কাদির বলে, ‘হিরাঝিল থেকে এসেছে।’
কাদিরের হাত থেকে চিরকুটটা প্রায় ছিনিয়ে নিয়ে চোখের সামনে মেলে ধরে মিরন।
মিরজাফরের হাতের লেখা চিনতে তার কোনও অসুবিধা হয় না। চিরকুটে লেখা আছে ‘বেটা তুরন্ত একবার হিরাঝিল প্যালেসে এসো। এখনই। বহুত জলদি।’
.
