৪৯
পাটনার উদ্দেশে মার্চ শুরু করলেন ক্লাইভ। পথের দু’ধারে উপচে পড়ছে ভিড়। জোড়া জোড়া কৌতূহলী চোখ শাহিসড়ক দিয়ে হেঁটে চলা ইংরেজদের মধ্যে থেকে কর্নেল ক্লাইভকে চিনে নেওয়ার কোশিশ করছে। কোন মানুষটা রবার্ট ক্লাইভ-সাবিৎ জঙ্গ? কোথায়? জনতা এ ওর ঘাড়ের উপরে প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। শীতে জুবুথুবু এলাকা অচানকই গরম হয়ে উঠেছে উত্তেজনায়।
ক্লাইভের ফৌজ বলতে গোরা পল্টন ও দিশি সেপাই মিলিয়ে শ’পাঁচেক পদাতিক সেনা, শতখানেক বেয়নেটধারী গোরা ঘোড়সওয়ার, গো-গাড়ির উপরে চাপানো গোটা ছয়েক ফিল্ড পিস কামান। এছাড়া রয়েছে ফৌজি ব্যান্ডের বাজনদারেরা, বারুদ, রসদের গাড়ি ও মুটেমজুর, কুলি-কামিনের দল। প্রথমেই চলেছে কামানের গাড়িগুলো। পশ্চিমাকাশ পানে উঁচু হয়ে রয়েছে তোপের নল। দেহাতি আনপঢ় লোকজন শুনেছে পলাশির লড়াইয়ে এই তোপগুলোর বড় ভূমিকা ছিল। এগুলোর শক্তি নাকি ভয়নাক। নিমেষে বিপক্ষকে গুঁড়িয়ে দেয়। পথের ধারে জমায়েত লোকজন অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে কামানের গাড়িগুলোর দিকে। তোপের গাড়ির পিছনে পতাকার দণ্ড হাতে চলেছে জনৈক গোরা পল্টন। উত্তুরে হাওয়ায় দাপটের সঙ্গে উড়ছে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরাটাকার পতাকা। ইংরেজদের শক্তি, অহংকার ঔদ্ধত্যের প্রতীক। পতাকাধারীর পিছনে চলেছে ফৌজি ব্যান্ডের বাজনদারেরা। ব্যান্ডে বাজছে রুল ব্রিটানিয়ার সুর। বাজনদারদের পিছনে ঘোড়ার পিঠে চেপে চলেছেন কর্নেল ক্লাইভ। তার ঠিক পিছনে কিছুটা তফাতে চলেছে তাঁর দেহরক্ষীরা। তাদের পিছনে বাকি অফিসারেরা। হেস্টিংস, ওয়ালশ, ওয়াটস, ফোর্ড ও আরও অনেকে। তারপরে বেয়নেটধারী গোরা পল্টন, একেবারে শেষে চলেছে দিশি সেপাইরা।
অবাক হয় জনতা। পাটনা শহরের প্রবেশদ্বার এসে পড়ল প্রায়। কিন্তু ইংরেজ বাহিনী যে একেলাই চলেছে। কোথায় নবাব? কোথায় তার বাহিনী? নবাবের সঙ্গেই তো আসার কথা ছিল ইংরেজদের। মানুষের স্বভাবিক পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা নীরবে বলে দেয় অনেক উহ্য কথা। আমআদমি বোঝে এই অভিযানের মূল নায়ক ইংরেজরা। নবাবের হুকুম বা ফরমাশ তামিলের বান্দা নন ক্লাইভ। তা যদি হত, তবে নবাবের ফৌজই আগে প্রবেশ করত পাটনা শহরে। তাদের পিছনে আসত ইংরেজবাহিনী।
পাটনা শহরের প্রবেশদ্বার আগলে দাঁড়িয়ে রয়েছেন হাজি আলি। নবাবের হুকুম—শহরে প্রবেশ করার আগে রুখতে হবে ইংরেজবাহিনীকে। নবাবের ইরাদা, আগে তিনি প্রবেশ করবেন পাটনা শহরে, তার পিছু পিছু ঢুকবে ইংরেজবাহিনী। রামনারায়ণের উপরে হুকুম হয়েছে, তাঁর বাহিনী যেন হাজিকে মদত দেয়। মুর্শিদাবাদে যাই ঘটুক না কেন, নবাব হওয়ার পর এই প্রথম পাটনায় আসা—পাটনাবাসীকে মিরজাফর খাঁ দেখিয়ে দিতে চান তিনি মোটেই পুতুল নবাব নন।
নবাবের হুকুম তামিল করার জন্য দ্রুত পাটনায় ফিরতে চেয়েছিলেন রামনারায়ণ। আসলে এই ছুতোয় নবাবের হেফাজত থেকে তিনি পালিয়ে যেতে চাইছিলেন। কিন্তু রামনারায়ণের পাটনায় ফেরার আরজি নামঞ্জুর করলেন নবাব। অগত্যা নবাবের আদেশে হাজি আলির হাত দিয়ে নিজের সেনাপতির কাছে বার্তা পাঠালেন রামনারায়ণ– পাটনা শহরে প্রবেশের আগে রুখতে হবে কর্নেল ক্লাইভকে। মদত দিতে হবে হাজি আলিকে।
রবার্ট ক্লাইভের পথরোধ করতে হবে। কথাটা ভেবেই রক্তচাপ বেড়ে যাচ্ছে হাজি আলির। তাঁর মনে ক্ষীণ আশা ছিল, নবাব যদি সদলবলে একটু পা চালিয়ে এসে ক্লাইভের আগেই পাটনা শহরে ঢুকে পড়েন, তাহলে তাঁকে আর এই ঝকমারির মধ্যে পড়তে হবে না। কিন্তু গতকাল যে খবর হাজি আলি পেয়েছেন তা খুবই হতাশাজনক। পাটনা এসে পৌঁছতে নবাবের এখনও দিন দুয়েক সময় লাগবে। ওদিকে কর্নেল ক্লাইভ পাটনায় পৌঁছলেন বলে। অগত্যা শহরের প্রবেশদ্বারের মুখে সেনা সমাবেশ করতে বাধ্য হলেন হাজি আলি।
হঠাৎই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল ইংরেজ ফৌজ। ভুরু কোঁচকাল ঘোড়ার পিঠে বসে থাকা ক্লাইভের। দূরে দেখা যাচ্ছে পাটনা শহরের প্রবেশদ্বার। কিন্তু ব্যাপার কী? পথ আটকে দাঁড়িয়ে রয়েছে একদল সেপাই। হাতিয়ারবন্ধ। এরা কি লড়াই করতে চায়? তাজ্জব হয়ে গেলেন ক্লাইভ।
হেস্টিংস ও নবকৃষ্ণ ঘোড়া নিয়ে এগিয়ে গেলেন সামনে।
হাজি আলি বিনীত ভাবে জানালেন, ‘আপাতত এখানেই ছাউনি ফেলতে হবে আপনাদের।’
নবকৃষ্ণ ঝাঁঝের সঙ্গে শুধোলেন, ‘মজাক করছ নাকি? পাটনা দুর্গের দোরগোড়ায় এসে ক্লাইভ সাহেব এখানে ছাউনি ফেলবেন কেন?’
‘শহরের অন্দরে যাওয়ার পরোয়ানা নেই।’
‘পরোয়ানা নেই মানে? কার পরোয়ানা?’ পরম বিস্ময়ের সঙ্গে প্রশ্ন করলেন নবকৃষ্ণ।
‘হুজুরের।’
হাঁ হয়ে গেলেন নবকৃষ্ণ ও হেস্টিংস দু’জনেই।
হেস্টিংস শুধোলেন, ‘কে তোমার হুজুর?’
‘নবাব মিরজাফর খাঁ। তিনি এখানে এসে না পৌঁছনো পর্যন্ত এখানেই আপনাদের ছাউনি ফেলে অপেক্ষা করতে হবে। আগে হুজুর শহরে ঢুকবেন। তারপরে আপনারা।’
হতচকিত ভঙ্গিতে মুখ চাওয়াচাওয়ি করলেন হেস্টিংস ও নবকৃষ্ণ।
নবকৃষ্ণ বিরক্তির সঙ্গে শুধোলেন, ‘এই পরোয়ানা কেন?’
হাজি বিনীত ভাবেই বললেন, ‘মালুম নেই।’
নবকৃষ্ণ চোখ পাকিয়ে বললেন, ‘ভালো চাও তো পথ ছেড়ে দাও। ক্লাইভ সাহেব কি নবাবের হুকুমের গোলাম? কার পথ আটকাচ্ছ সে খেয়াল আছে? নবাব তিনবেলা সেলাম ঠোকেন তাঁকে। ক্লাইভ সাহেবকে নবাবের পরোয়ানা দেখাচ্ছ? এখনই পথ যদি না ছাড়ো তো অনর্থ ঘটে যাবে। তখন সবদিক সামাল দিতে পারবে তো?’
রীতিমতো শঙ্কিত হয়ে হাজি আলি বললেন, ‘গোস্তাকি মাফ করবেন। আমি নবাবের বান্দা। শ্রেফ হুকুম তামিল করছি। পথ ছেড়ে সরে দাঁড়াতে পারব না।’
চোয়াল শক্ত করে হেস্টিংস শুধোলেন, ‘ইজ দিস ইওর লাস্ট ওয়ার্ড?’
‘জি সাহেব। আমি নবাবের নিমক খাই। বেইমানি তো করতে পারি না।’
‘নাউ বি প্রিপেয়ার্ড টু ফেস দ্য ক্যানন শটস।’ আঙুল উঁচিয়ে হুমকির সুরে বললেন হেস্টিংস।
ইংরেজি কথাটা তর্জমা করে হাজিকে বুঝিয়ে দিলেন নবকৃষ্ণ।
ভয়ে বুক কেঁপে উঠল হাজি আলির। ত্রাস ছড়িয়ে পড়ল তার সঙ্গে থাকা সেপাইদের মধ্যেও।
ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে ফিরে এলেন হেস্টিংস ও নবকৃষ্ণ।
সব শুনে রাগে ও অপমানে ভয়ানক হয়ে উঠল ক্লাইভের মুখটা। এ ভাবে তাঁর পথ আটকানোর মানে? কী চান নবাব? ইংরেজদের হেয় করতে চান? বুঝিয়ে দিতে চান তিনি সুবে বাংলার সর্বশক্তিমান নবাববাহাদুর। ইংরেজরা তার হুকুমের দাস?
চোয়াল শক্ত করে ক্লাইভ বললেন, ‘মার্চ ফরোয়ার্ড। কুইক।’
দূর থেকে হাজি আলি দেখলেন তড়িৎ গতিতে ধেয়ে আসছেন ক্লাইভ। তার গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে দ্রুত এগিয়ে আসছে ইংরেজবাহিনী। হেস্টিংস ও নবকৃষ্ণকে না হয় নবাবের হুকুমতের কথা শুনিয়েছেন। কিন্তু কী বলবেন ক্লাইভকে?
হাজি ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলেন, পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা সেপাই-পেয়াদারা সংখ্যায় কমতে শুরু করেছে। বিপদ আন্দাজ করে গুটি-গুটি সরে পড়ছে। রামনারায়ণের বাহিনীর যে সমস্ত সেপাইরা তাঁকে মদত দিতে এসেছিল, তারা পালিয়েছে আগেই। মনে সাহস জুগিয়েও হাজি আলি নিজের সেপাইদের আর ধরে রাখতে পারলেন না। ক্লাইভকে তিরবেগে এগিয়ে আসতে দেখে তারা ক্রমশ ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়তে লাগল। প্রবেশদ্বারের সমুখে কার্যত প্রায় একাকী দাঁড়িয়ে আছেন বিব্রত ও বিধ্বস্ত হাজি আলি। সঙ্গে সামান্য কয়েকজন অনুগত সেপাই।
ঘোড়ার রাশ টেনে ধরলেন ক্লাইভ। নেমে এলেন ঘোড়ার পিঠ থেকে।
হাজি এগিয়ে এসে ক্লাইভকে কুর্নিশ জানিয়ে বললেন, ‘পাটনা শহরে আপনাকে স্বাগত। আসুন হুজুর। আসুন। আপনার রহেমে এই বান্দা যেন খুশ তবিয়ত থাকে।’
কোম্পানির নিশান উড়িয়ে রাজকীয় ভঙ্গিমায় পাটনা শহরে প্রবেশ করলেন ক্লাইভ।
আকাশে উড্ডীন কোম্পানির বিরাটাকার পতাকা, ফিল্ড পিস কামানের উদ্ধত নল, এবং নবাবকে ছাড়াই প্রবল ঔদ্ধত্যের সঙ্গে ইংরেজদের পাটনা শহরে প্রবেশ দেখে পাটনাবাসীর অনেক কৌতূহলেরই নিরসন হয়ে গেল। রাস্তার দুপাশে জমায়েত হওয়া অসংখ্য মানুষ বুঝল, সত্যিই সুবে বাংলায় ইংরেজরা এখন দুর্ধর্ষ শক্তি। হুকুম, পরোয়ানায় এদের বশে রাখার সাধ্য নবাবের নেই।
আম-লোগ বরাবরই তাগদবাজের বশ। নিমেষে ইংরেজ ভজনা শুরু হয়ে গেল পাটনা শহরে। ক্লাইভের নামে জয়ধ্বনি দিতে লাগল পথের ধারে ভিড় জমানো মানুষজন।
ক্লাইভকে স্বাগত জানিয়ে কেল্লার অভ্যন্তরে নিয়ে যাওয়ার জন্য ছুটে এল কেল্লাদার।
পাটনায় ঢোকার পথে সাময়িক বাধা পেয়ে ক্লাইভের মেজাজ তখনও গরম হয়ে রয়েছে। কেল্লাদারের খাতিরদারিকে উপেক্ষা করে শহরের বাইরে এসে ছাউনি ফেললেন গঙ্গার উন্মুক্ত চরে।
.
লোকলস্কর, সেপাই-পেয়াদা, বন্দুকচি, ধানুকি, মুটেমজুর, হাতি-ঘোড়া-উট, তোপের গাড়ি, বাইজি-কসবীসহ বিরাট লটবহর নিয়ে দুদিন পরে ধীরে সুস্থে পাটনা শহরে ঢুকে চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল মিরজাফরের। এ তাঁর নিজের রাজত্ব না ইংরেজ-অধিকৃত কোনও শহর। জায়গায় জায়গায়, গাছের ডাল থেকে ঝুলছে ইংরেজ কোম্পানির পতাকা। সাহেবদের খাতিরদারির জন্য এ কাণ্ড যে আমআদমিই ঘটিয়েছে তা দিব্যি বুঝলেন নবাব। ক্লাইভের অবস্থান যে তাঁর উপরে সেটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে পাটনাবাসীর কাছে। ফের তীব্র হতাশা গ্রাস করল নবাবকে। মাথায় চাপানো উষ্ণীষটা বড় ভারী বলে মনে হল। বিষণ্ণ মেজাজে পাটনা দুর্গে প্রবেশ করলেন তিনি।
ইংরেজরা ছাউনি ফেলেছে শহরের বাইরে। গঙ্গার চরে। একথা শুনে একই সঙ্গে শঙ্কা ও স্বস্তির অনুভূতি হল নবাবের। ক্লাইভ কি রুষ্ট হয়েছেন? শঙ্কা তাই নিয়ে। আর স্বস্তি? আপাতত কর্নেলের মুখটা সর্বক্ষণ দেখতে হবে না।
আজকাল নিজের মনের গতির আন্দাজ পান না নবাব। মনের গহীন এলাকাটা ক্রমশ দুরূহ হয়ে পড়ছে তাঁর কাছে। ঠিক কী যে তিনি চান, তা বুঝে উঠতে পারেন না। মাঝে মাঝে মেজাজটা ভীষণ গরম হয়ে ওঠে। এ সময়ে তার সব রাগ গিয়ে পড়ে অপেক্ষাকৃত দুর্বল মানুষের উপরে, যারা তার হুকুমের বান্দা।
হাজি আলিকে তলব করলেন মিরজাফর। বান্দা হুকুম তামিল করেনি। পাটনা শহরে প্রবেশের মুখে বাধা দেয়নি ইংরেজদের। বেইজ্জত করেছে নবাবকে।
ত্রস্ত হাজি আলি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে হাজির হলেন নবাবের সমুখে।
কোনও ভূমিকা ছাড়াই নবাব গর্জন করে উঠলেন, ‘হুকুম তামিল হল না কেন?’
নিজের গর্দান বাঁচাতে হাজি আলি সব দায় চাপিয়ে দিলেন রামনারায়ণের ঘাড়ে। বললেন, ‘আমি কোশিশ করেছিলাম। লেকিন বেইমানি করল রামনারায়ণজির ফৌজ। কর্নেলকে আসতে দেখেই ভেগে পড়ল তারা। আমার ফৌজ তো গুনতিতে কমই ছিল হুজুর। রামনারায়ণজির সেপাইদের দেখে তারাও ভাগতে লাগল। এর পরেও কি ক্লাইভ সাহেবকে শহরের বাইরে রুখে দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব ছিল? এই বান্দাকে রহেম করবেন হুজুর।’
ধন্দে পড়ে গেলেন নবাব।
গলা খাটো করে হাজি আলি ফের বললেন, ‘এ রামনারায়ণজিরই কারসাজি। তিনি গোপনে বার্তা দিয়েছিলেন তার সেপাইদের। ক্লাইভ সাহেবকে যেন বাধা না দেওয়া হয়।’
রাগে, অপমানে ফুঁসছেন মিরজাফর খাঁ। রামনারায়ণকে ডেকে পাঠালেন।
রামনারায়ণ ব্যস্ত হয়ে ছুটে এসে সেলাম জানালেন নবাবকে।
পাটনার নায়েব সুবাদারের নামে যে শিকায়ত জানিয়ে গেল হাজি আলি, তার অবশ্য কোনও সাবুত নেই। নবাব ও পথে গেলেন না। বললেন, ‘পিছনের পাঁচ সালের খাজনা আদায় উশুলের হিসেবের খতেন আমি দেখতে চাই। জাবেদা খাতা তৈয়ার রাখুন। দু’দিন পরে দেখব।’
‘জি হুজুর।’ মুখে একথা বললেও আতঙ্কের চোরাস্রোত বয়ে গেল রামনারায়ণের মনের অন্দরে। তবে কি নবাব তাকে উপড়ে ফেলার জন্য জুতসই সাবুতের তালাশ করছেন? হিসেব দাখিল করতে গেলেই তো তিনি ফাঁপরে পড়বেন। পাটনায় প্রভূত শক্তিশালী হয়ে উঠে নিজামতের প্রাপ্য অনেক টাকাই এ কয়েক বছরে তিনি নিজের জেবের মধ্যে পুরেছেন। তাহলে উপায়?
.
রাত গভীর। পাটনা দুর্গ নিঝুম। কড়া শীতে একেবারে জুবুথুবু। ঘুমিয়ে কাদা প্রায় সকলে। শুধু বরফের মতো ঠান্ডা পাথরের চাতালের উপরে লাঠি ঠুকে ঠুকে পায়চারি করে বেড়াচ্ছে রাতপাহারায় নিযুক্ত সেপাইরা। শীতের প্রকোপ থেকে বাঁচতে মোটা পশমের আলোয়ানে এদের মাথা থেকে হাঁটু পর্যন্ত জড়ানো। তবুও হুল ফোটাচ্ছে ঠান্ডা হাওয়া। পাহারার ফাঁকে অনেকে এক জায়গায় জড়ো হয়ে আগুনে হাত-পা সেঁকে শরীরটাকে গরম করে নিচ্ছে।
কুয়াশা পড়েছে জব্বর। বাতিস্তম্ভের আলো ঘোলাটে। খানিক দূরের জিনিসও ঝাপসা দেখাচ্ছে। চোরের মতো চুপিসাড়ে, আলোয়ানে আপাদমস্তক মুড়ে সন্দেহজনক ভাবে এগিয়ে চলেছে এক ছায়ামূর্তি। হঠাৎই রঘুরাম সিং-এর নজরে পড়ে যায় লোকটা। রামনারায়ণের একজন অতি বিশ্বস্ত গুপ্তচর রঘুরাম। রাতে দুর্গের অন্দরে বিশেষ নজর রাখার জন্য তাঁর উপরে হুকুম করেছেন রামনারায়ণ। রঘুরামের চোখদুটো ভয়ানক। অনেক কিছুই তার নজরে পড়ে যায়, যা আর পাঁচজনে দেখতে পায় না। নিঃশব্দে ছায়ামূর্তির পিছু নিল রঘুরাম।
.
ঘুম নেই মিরকাজিমের চোখে। ঘর গরম রাখার জন্য একনাগাড়ে জ্বলছে আগুন। সেই আগুনের আলোয় স্পষ্ট নবাব মিরজাফর খাঁর সহোদরের কপালে ফুটে ওঠা দুশ্চিন্তার রেখা। ঘটনার গতিপ্রকৃতি দেখে তাঁর মালুম হচ্ছে পাটনার নায়েব সুবাদারি তাঁর নসিবে নেই। তিনি ভেবেছিলেন পাটনা দুর্গে পা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কয়েদ হবেন রামনারায়ণ। সেরকম কিছুই ঘটল না। গত পাঁচ সালের খাজনার হিসেব দাখিল করার জন্য রামনারায়ণকে হুকুম করেছেন নবাব। সে যাই হোক, নবাবের উপরে আর ভরসা রাখতে পারছেন না মিরকাজিম। অনেকদিন ধরেই পাটনার পরবর্তী নায়েব সুবাদার হিসেবে মিরকাজিমের নামটা আলোচিত হয়ে চলেছে নিজামতের অলিন্দে। কিন্তু কার্যসিদ্ধি হচ্ছে না কিছুতেই। অনেক ওমরাহ আড়ালে বিদ্রুপ করছেন। মিরকাজিম ভেবেছিলেন তাঁকে পরবর্তী মনিব ভেবে বিশেষ খাতির দেখাবে পাটনা দুর্গের কর্মচারীরা। না! তেমনও কিছু ঘটল না। ঘোর বেইজ্জতি। এ জন্য দায়ী তাঁর সহোদর। বুজদিল, ডরপোক নবাব। ইংরেজদের ভয়ে কেবল সিঁটিয়ে রয়েছেন। মিরজাফরের প্রতি তীব্র নফরতিতে ভরে উঠেছে মিরকাজিমের মন। আর নবাবের মুখের দিকে চেয়ে থাকা নয়। এবারে যা করার তা তার নিজেকেই করতে হবে।
নির্দিষ্ট ছন্দে পরপর তিনবার মৃদু টোকা পড়ল দরজায়। সচকিত হয়ে উঠলেন মিরকাজিম। রাত জেগে এই আগন্তুকেরই ইন্তেজার করছিলেন তিনি। দ্রুত ছুটে এসে দরজা খুললেন সন্তর্পণে।
ছায়ামূর্তি ঢুকে পড়ল অন্দরে। ভেজিয়ে দিল দরজাটা।
শুনসান আঁধারে মোড়া অলিন্দে একটা থামের আড়াল থেকে দৃশ্যটা দেখল রঘুরাম। দরজা ভিতর থেকে বন্ধ হতেই নিঃশব্দে এগিয়ে এসে দরজার গায়ে কান পাতল সে।
কক্ষের অন্দরে কথাবার্তা চাপাস্বরে হলেও, কথাগুলো স্পষ্ট ভেসে আসছে রঘুরামের কানে। গলার আওয়াজেই আগন্তুককে চিনে নিতে কোনও অসুবিধা হল না রঘুরামের। মিরকাজিমের পরিকল্পনার কথা শুনে সে শিউরে উঠল। হঠাৎই তাঁর চোখে পড়ল দরজার গায়ে একটা ছিদ্র। সেই ছিদ্র পথে চোখ রাখল রঘুরাম।
একটা চামড়ার খেরিয়া ছায়ামূর্তির হাতে তুলে দিয়ে মিরকাজিম চাপা গলায় বললেন, ‘হাজার মোহর আছে এই খেরিয়ায়। কাজ হাসিল হলে আরও দেব। লেকিন যেমন বললাম কালই কাজটা হাসিল করা চাই।’
‘জি হুজুর।’
‘পারবে তো?’
‘এই বান্দার উপর আপনি ভরসা রাখতে পারেন।’
‘বেশ এসো এখন। সাবধান। কেউ যেন টের না পায়।’
কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসছে ছায়ামূর্তি।
রঘুরাম দ্রুত সরে যায় থামের আড়ালে।
ছায়ামূর্তি অন্ধকার অলিন্দ পথে দ্রুত মিলিয়ে যেতেই আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে রামনারায়ণের সেনাপতি বচন সিং-এর হাভেলিতে গিয়ে হাজির হয় রঘুরাম। করাঘাত করে দরজায়। ঘুম জড়ানো চোখে বিছানা ছেড়ে উঠে এসে রঘুরামকে দেখে চমকে ওঠে বচন সিং। চিন্তিত মুখে শুধোলেন, ‘কী হয়েছে রঘুরাম?’
মাথা ঝুঁকিয়ে সেলাম জানিয়ে রঘুরাম বলে, ‘হুজুর, বাত বহুত জরুরি।’
.
