1 of 2

পলাশির পরে – ৪৮

৪৮

পাটনা শহরে খবরটা ছড়িয়ে পড়ল রাতারাতি। নবাব আসছেন। বর্তমানে তিনি ছাউনি ফেলেছেন শহর থেকে কয়েক ক্রোশ দূরে। ফৌজ নিয়ে কর্নেল ক্লাইভও আসছেন তাঁর সঙ্গে। পাটনাবাসীর মনে অসীম কৌতূহল। তারা শুনেছে পলাশির ময়দানে ইনকিলাবের পর থেকে সুবে বাংলায় প্রবল শক্তিশালী হয়ে উঠেছে ইংরেজ কোম্পানি। নবাব মিরজাফর খাঁ কার্যত ক্লাইভ সাহেবের খায়েশের গোলাম হয়ে পড়েছেন। তবে একথায় অনেকেরই ঠিক যেন একিন হয় না।

মুর্শিদকুলির জমানা থেকে শুরু করে সিরাজদ্দৌলা পর্যন্ত নবাবের দাপট পাটনাবাসী দেখেছে। মুর্শিদকুলি, সুজাউদ্দীন, আলিবর্দির জমানায় ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকত ইংরেজ সওদাগরেরা। নবাব তো দূরের কথা, সোরার কারবারের জন্য পাটনার নায়েব সুবাদারের সামান্য অনুগ্রহ পেতে একসময় শির ঝুঁকিয়ে ঘন ঘন দরবার করেছে ইংরেজ কুঠিয়াল। এ সব তো পাটনাবাসীর চোখে দেখা।

সেই ইংরেজরা আজ এত শক্তিমান? নবাব তাদের ইচ্ছের দাস? হাতের পুতুল? মুর্শিদাবাদ থেকে বহু দূরে পাটনায় বসে অনেকেই যেন ঠিক মেনে নিতে পারছে না এ কথা। কেউ বলে ইয়ে ঝুটবাত। কেউ বলে গুজব। কেননা পাটনা এসে পৌঁছনোর পথে রাজধানীর অনেক খবরের গায়েই নানা রঙের প্রলেপ পড়ে যায়। হারিয়ে যায় সত্যির রং। কোন খবর সাচ্চা, আর কোন খবর ঝুটা তা সমঝবুঝ করে নিতে জেরবার হয়ে যায় আম-আদমি। গুলতানি, গুফতগু জোরদার হয়ে ওঠে পাটনার অলিগলিতে, মাণ্ডিতে, মাণ্ডিতে।

তবে বেওকুফ নয় পাটনাবাসী। তারা আন্দাজ করতে পারছে পাটনা অভিযানের আড়ালে নবাব মিরজাফর খাঁর মনসুবা কী! রামনারায়ণের বরবাদি চান তিনি। ওদিকে ইংরেজরা নাকি আবার রামনারায়ণের পক্ষে। তাহলে ফৌজ নিয়ে নবাবকে মদত দিতে পাটনায় কেন আসছেন ক্লাইভ? জবর শীতের এক সন্ধের পাটনা দুর্গের নজদিকে ব্যস্ত এক মাণ্ডিতে পথের ধারে দাঁড়িয়ে আলোয়ানে মাথা মুড়ে পান চিবোতে চিবোতে গুলতানিতে মেতে ওঠে একদল লোক। বাক-বিতণ্ডায় হাওয়া গরম হয়ে উঠতে থাকে।

‘ক্লাইভ আসছেন নবাবের খায়েশে। নবাবকে মদত দিতে। রামনারায়ণ এবারে খতম হবে।’

‘কভি নেহি। ইংরেজদের খায়েশের গোলাম বনেছেন নবাব। ক্লাইভের ওফাদার রামনারায়ণজি। তাঁকে খতম করবে কে?’

‘তো বাতাও, ইংরেজলোগকা চাহাত কা গুলাম বন গয়া নবাব– ইয়ে ক্যায়সে সচ হ্যায়?’

তর্কে মত্ত পরস্পরবিরোধী মতামতে বিশ্বাসী দু’পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি বাধার উপক্রম হয়।

ভিড়ের মধ্যে থেকে কোনও বিচক্ষণ ব্যক্তি বলে ওঠে, ‘খামোশ। শান্ত হও ভাই। কয়েকদিনের মধ্যেই তো নবাব মিরজাফর খাঁ ও কর্নেল ক্লাইভ দু’জনেই আসবেন পাটনায়। সেই মওকায় চোখে দেখে বুঝে নিও, কে কার খায়েশের বশ।’

উৎকর্ণ হয়ে জনতার আলাপ-আলোচনা শুনতে ব্যস্ত চবুতরার নীচে বসে থাকা গুলদস্তার কারবারি বলে ওঠে, ‘ইয়ে সহি বাত।’

রইস আদমি থেকে সামান্য গুলদস্তার কারবারি—নবাব ও ক্লাইভের পাটনায় আগমনকে কেন্দ্র করে উত্তেজিত সকলেই।

ওদিকে পাটনা দুর্গ নিঝুম। নবাবকে স্বাগত জানানোর কোনও আয়োজন-আনজাম নেই। গত কয়েকদিন যাবৎ নায়েব রামনারায়ণজি আমদরবারে গরহাজির। সহজে অংক মেলাচ্ছে আমজনতা। পাটনার গদিতে সহোদর মিরকাজিমকে বসাতে চান মিরজাফর খাঁ। পদ থেকে বরখাস্ত হওয়ার পরোয়ানা নিশ্চই চলে এসেছে রামনারায়ণজির হাতে। তাই পাটনা দুর্গ বেরং।

পাটনার বাসিন্দাদের বড় একটা অংশের মন ভালো নেই। এরা চান রামনারায়ণই পাটনার কুরসিতে বহাল থাকুন। মিরকাজিমের সম্বন্ধে কানাঘুষোয় যতটুকু তারা জেনেছেন, তাতে তাঁর উপরে ভরসা করতে পারছেন না প্রায় কেউই। সময়টা ভালো নয়। পাটনায় হানা দিতে পারেন সুজাউদ্দৌলা, হানা দিতে পারে বর্গিরা। মানুষ চিন্তিত নিজেদের সুরক্ষা নিয়ে। তাদের বেশির ভাগেরই ভরসা রয়েছে রামনারায়ণের উপরে। কিন্তু কী আর করা যাবে? কিসমত ইনসানের আরজুর বান্দা নয়।

কিন্তু দিনদুয়েকের মধ্যে চমকে উঠল শহরবাসী। শোরগোল পড়ে গেল চারিদিকে। হঠাৎই সাজো সাজো রব পাটনা দুর্গে। আলোর মালায় সেজে উঠল গোটা কেল্লা। নহবতখানায় বেজে উঠল সানাই। সে সুর উপচে পড়া খুশির। দুর্গের অন্দরে বইছে ফূর্তি-আশরতের হাওয়া। হঠাৎ কী হল? এত খুশি কীসের? তাহলে কী নবাবের সঙ্গে সমঝোতা হয়ে গেল রামনারায়ণের? আশা-নিরাশায় দুলতে থাকে আমজনতা।

একদিন সকালে দামামা, কাড়ানাকাড়ার শব্দে বেজায় ঘাবড়ে গিয়ে আমজনতা দেখল, বেশ ফৌজ নিয়ে, নিজামতের নিশান উড়িয়ে হাতির পিঠে চেপে পুবমুখো চলেছেন রামনারায়ণ।

এ কোনও লড়াইয়ের আনজাম নয়। পাটনা দুর্গসূত্রে ছড়িয়ে পড়ল খবরটা– নবাবকে খোশ-আমদেদ করে পাটনা দুর্গে নিয়ে আসার জন্য নবাবের ছাউনিতে চলেছেন নায়েব রামনারায়ণ। নাচতে নাচতে হেলেদুলে চলেছে বাজনদারেরা। সেই বাজনার তালে তালে মাথা দোলাচ্ছেন রামনারায়ণ। নায়েবজির খোশমেজাজ ও পাটনাদুর্গের খুশির আমেজ দেখে তাজ্জব বনে গেল পথের ধারে ভিড় করে দারিয়ে থাকা জনতা। তবে কী মত বদলালেন মিরজাফর খাঁ, পাটনার কুরসিতে রামনারায়ণই বহাল থাকছেন?

.

ক্লাইভ লিখেছিলেন নবাবের তাঁবুতে গিয়ে তাঁকে স্বাগত জানাতে। কিন্তু রামনারায়ণের সেই সাহস হল না। নবাবের সঙ্গে সাক্ষাতের পূর্বে তিনি ইংরেজদের ছাউনিতে এসে হাজির হলেন।

রামনারায়ণকে ওয়েলকাম জানিয়ে খাতির করে ক্লাইভের কাছে নিয়ে গেলেন উইলিয়াম ওয়াটস। সোরার কারবারের বিষয়ে কর্নেলের সঙ্গে বিশেষ আলোচনার জন্য কয়েকদিন আগে মুর্শিদাবাদ থেকে ওয়াটস সাহেব এখানে এসে পৌঁছেছেন।

ক্লাইভের পায়ে প্রায় লুটিয়ে পড়ে রামনারায়ণ বললেন, ‘হুজুর আপনি আমার মাদার, আপনিই ফাদার। আপনি ভরসা দিলে বাঁচব, নয়তো গর্দান নেবেন নবাব।’

পাশ থেকে নবকৃষ্ণ বলে উঠলেন, ‘হুজুর হলেন স্বয়ং গোবিন্দের অবতার। ঘোর কলিতে ধরায় এসেছেন। গোবিন্দের শ্রীচরণে ঠাঁই নিয়েছেন, আপনার আর ভাবনা কী?

রামনারায়ণের দুই চোখ বেয়ে নেমে আসছে জলের ধারা।

ক্লাইভের উদ্দেশে নবকৃষ্ণ বললেন, ‘টিয়ারস পরম ভক্তির লক্ষ্মণ হুজুর।’

রামনারায়ণের সঙ্গে করমর্দন করে ক্লাইভ বললেন, ‘ডরো মাত বাবু।’

‘ডর কি সহজে যায় হুজুর? নবাবের গুসসা। এক হুকুমে মুণ্ডু খসে যেতে পারে।’

নবকৃষ্ণ বলেন, ‘ছাড়ুন দেখি আপনার নবাবের কথা। সাহেবের চোখের দিকে চাইলে তাঁর পিলে অবধি কেঁপে ওঠে। সাহেবের ইচ্ছের বিরুদ্ধে চলার হিম্মত আছে আপনার নবাবের?’

‘সেই জন্যেই তো নবাবের সঙ্গে সাক্ষাতের পূর্বে হুজুরের কাছে ছুটে আসা।’

‘পাটনার কুরসিতে আপনিই থাকবেন। আই কনভিনসড নবাব।’

জোড়হাত হয়ে রামনারায়ণ বললেন, ‘হুজুর আমি আপনার দাসানুদাস।’

এবারে রামনারায়ণের দুই দাখিলা বেশ বড়সড় একটা কাঠের পেটিকা নিয়ে এগিয়ে এল।

রামনারায়ণ হাত কচলে তোশামুদে হাসি হেসে বলেন, ‘হুজুরের নজরানা।’

নিজের হাতেই পেটিকার ডালা খুলে ক্লাইভের চোখের সামনে মেলে ধরেন রামনারায়ণ।

ক্লাইভের চোখ ঝলসে যায়। সোনা, হিরে, চুনি, পান্নার বহুমূল্যবান অলংকারে পেটিকাটি ঠাসা।

মুচকি হেসে ক্লাইভ বললেন, ‘সুক্রিয়া। এবারে নবাবের সঙ্গে সাক্ষাতটা সেরে আসুন।’

কাঁচুমাচু মুখ করে রামনারায়ণ বলেন, ‘একলা যেতে ভয় লাগছে হুজুর। যদি কয়েদ করে?’

ক্লাইভ হেসে উঠে বললেন, ‘ডরো মাত বাবু, ডরো মাত।’

বিরক্তির সঙ্গে নবকৃষ্ণ বলে ওঠেন, ‘আপনার আক্কেল কী বলুন তো মশায়? খোদ ক্লাইভ সাহেব ভরসা দিচ্ছেন, তাতেও আপনার প্রত্যয় হচ্ছে না?’

রামনারায়ণকে ইতস্তত ভাব দেখে ক্লাইভ বললেন, ‘আপনি ওয়াটসকে সঙ্গে নিয়ে যান।’

হাসি ফুটল রামনারায়ণের মুখে। ‘হে-হে। বহুত বহুত সুক্রিয়া হুজুর। বহুত বহুত সুক্রিয়া।’

ওয়াটসকে সঙ্গে নিয়ে খোশমেজাজে নবাবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চললেন রামনারায়ণ।

রামনারায়ণকে দেখেই গোবিন্দমল্ল এগিয়ে এসে চাপা স্বরে বললেন, ‘করেছেন কী হুজুর?’

রামনারায়ণের ঘাবড়ে গিয়ে বললেন, ‘কেন? কসুর কী হল?’

‘আপনাকে বলেছিলাম না সরাসরি নবাবে ছাউনিতে আসতে।’

থতমত খেয়ে রামনারায়ণ বললেন, ‘পথে ইংরেজ ছাউনি পড়ল তাই–’

‘কথাটা নবাবের কানে গিয়েছে।’

‘হেই সিয়ারাম!’ রামনারায়ণ আঁতকে ওঠেন।

গোবিন্দমল্ল বলেন, ‘মিরকাজিমের গুপ্তচরেরা কথাটা তুলেছে নবাবের কানে। গুসসা হয়েছে নবাবের। এ নিয়ে পুছতাছ করলে বলবেন, আপনাকে ফৌজ নিয়ে আসতে দেখে পথে আটকেছিল গোরা পল্টনেরা। কার্যত আপনাকে গ্রেফতার করে তারা ক্লাইভ সাহেবের সামনে হাজির করেছিল। আমি এমনই বুঝিয়েছি।’

‘বহুত সুক্রিয়া।’

‘শুধু সুক্রিয়াতে কি কাজ হয় রামনারায়ণজি? ইনাম?’

‘বিলকুল।’ এই বলে নিজের গলা থেকে একছড়া মুক্তোরমালা খুলে নিয়ে গোবিন্দমল্লের হাতে গুঁজে দিলেন রামনারায়ণ।

গোবিন্দমল্ল খুশি গলায় বললেন, ‘অন্দরে যান। তবে একটু হিসেব কষে কথা কইবেন।’

.

ফরাসে কাত হয়ে শুয়ে ফরসির নল হাতে আয়েশ করছিলেন মিরজাফর খাঁ। রামনারায়ণ তাঁবুর অন্দরে প্রবেশ করতেই বিদ্রুপের ঢঙে মিরজাফর বলে উঠলেন, ‘আসুন নায়েবজি আসুন। আপনি তো এখন বহুত তাগদবাজ আদমি। খোদ ক্লাইভ সাহেবের মুরুব্বি। ইংরেজলোগের দোস্ত।’

রামনারায়ণ মনে মনে বললেন, মদ্দা গর্ধভ হওয়ার চেয়ে মুরুব্বি হওয়া ভালো। মনের ভাব গোপন করে তসলিম জানিয়ে বললেন, ‘ইয়ে ঝুটা ইলজাম হুজুর। ইংরেজলোগের সঙ্গে আমার কোনও দোস্তি নেই।’

‘সচ বলছেন?’

‘বিলকুল সচ বাত হুজুর।’

‘আমি শুনেছি, ক্লাইভ সাহেবের সঙ্গে মোলাকাত করতে গিয়েছিলেন আপনি।’

ভিতরে ভিতরে কেঁপে উঠলেন রামনারায়ণ। গোবিন্দমল্লের শেখানো বুলি তোতাপাখির মতো আউড়ে গেলেন। তবে একথায় নবাবের একিন হল কি না তা বুঝতে পারলেন না। নবাবের চোখ বোজা। ফরসির নলে টান দিয়ে চলেছেন।

নবাবকে ফের তসলিম জানালেন রামনারায়ণ। বিশাল ভুঁড়ি নিয়ে কোমরের উপরের অংশ সামনে ঝোঁকাতে আজকাল বড় কষ্ট হয় তাঁর। তবুও শরীরটাকে ঝোঁকালেন অনেকটা। বললেন, ‘এতকাল নিজামতের নিমক খেয়েছি। আমি স্রেফ আপনারই বান্দা হুজুর।’

‘ইয়ে খুশি কি বাত।’ একথা বিদ্রুপ না অন্তর থেকে বলা তার দিশা পেলেন না রামনারায়ণ। ভয়ে দুরু দুরু করছে তাঁর বুক। এখনই না নবাব কয়েদ করার হুকুম করেন তাঁকে।

মিরজাফর শুধোলেন, ‘পাটনার হালচাল কী?’

‘বড়িয়া। সব কুছ সহি সালামত আছে হুজুর। আপনি খুদ যাচ-ইমতেহানি করে নেবেন।’

কাঠের একটা পেটিকা নিয়ে আসে দুই দাখিলা।

‘হুজুরের নজরানা।’ ফের শির ঝোঁকালেন রামনারায়ণ।

ডালা খুলতেই ঝলমল করে ওঠে সোনাদানা, হিরে-জহরত। মিরজাফরের চোখদুটো চকচক করে ওঠে। একই সঙ্গে রামনারায়ণের প্রতি ক্রোধে তাঁর সর্বাঙ্গ জ্বলে ওঠে। সম্মুখে জোড়হাত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা তাঁর তকলিফের কারণ। একে কয়েদ করার পরোয়ানা জারি করে তাঁর যাবতীয় সঞ্চয় দখল করে নেওয়া যায়। তাহলে কিছুটা হলেও নবাবের আর্থিক সঙ্কট মেটে। কিন্তু সে উপায় নেই। রামনারায়ণের বরবাদি চান না কর্নেল ক্লাইভ। মিরজাফর হঠাৎ মনস্থ করলেন ক্লাইভ যাই বলুন না কেন, তিনি এখনই গ্রেফতার করবেন রামনারায়ণকে।

এই সময়ে নবাবের খাস গোলাম এসে বলল, ‘হুজুর ওয়াটস সাহেব আপনার দর্শন চান।’

ভুরু কুঁচকে গেল মিরজাফরের। উইলিয়াম ওয়াটস। সেই ধূর্ত লোকটা! হঠাৎ কী মনসুবা নিয়ে হাজির এখানে? নিশ্চয়ই ক্লাইভের কাছ থেকে কোনও বার্তা নিয়ে এসেছেন। ক্লাইভের মুখটা মনে পড়তেই ভয়ে ফের গুটিয়ে গেলেন নবাব। রামনারায়ণকে কয়েদ করার আরজু গায়েব হয়ে গেল তার মগজ থেকে। কাত হওয়া অবস্থা থেকে তিনি সোজা হয়ে বসলেন। গোলামের উদ্দেশে হুকুম করলেন, ‘ওয়াটস সাহেবকে অন্দরে নিয়ে এসো।’

রামনারায়ণ জোড়হাত হয়ে বললেন, ‘পাটনা দুর্গে কখন পায়ের ধুলো দেবেন হুজুর?’

গম্ভীর গলায় মিরজাফর বললেন, ‘কাল রওনা দেব। আজ আমার ছাউনিতেই আপনি থাকুন। আমার সঙ্গেই পাটনায় যাবেন।’

‘জি হুজুর।’ এই বলে নবাবকে তসলিম জানিয়ে মনের মধ্যে একরাশ ভয় নিয়ে তাঁবু থেকে বেরিয়ে এলেন রামনারায়ণ। নবাবের ছাউনিতে রাত্রিবাসের হুকুম। আজ রাতেই না কোতল হয়ে যান। গলায় জড়ানো তুলসীর মালা ছুঁয়ে মনে মনে বললেন, ‘হে গোবিন্দজি রক্ষা করো।’

রামনারায়ণ বেরিয়ে যেতেই তাঁবুর অন্দরে ঢুকলেন ওয়াটস।

হাসিমুখে নবাব শুধোলেন, ‘কেমন আছেন সাহেব?’

‘হুজুরের রহেমে সহি সালামত খুশ তবিয়ত আছি।’ জবাব দিলেন ওয়াটস।

দু’চারটে মামুলি কথাবার্তা চালানোর পর ওয়াটস সাহেব এলেন কাজের কথায়। বললেন, ‘কর্নেল ক্লাইভের মনসুবা পাটনার সোরার ইজারা তিনি নিতে চান।’

দুপুরের আহারের পর ফরসির নল মুখে দিয়ে সামান্য ঝিমুনির ভাব আসছিল মিরজাফরের। ওয়াটসের প্রস্তাব শুনে তা এক লহমায় দূর হয়ে গেল। আসলে সোরার ইজারা থেকে হর সন মোটা টাকা উপায় হয় নবাবের। হুগলির আরমানি কারবারি খোজা ওয়াজিদ প্রতিবছরই নবাবকে ঘুষ দিয়ে পাটনার সোরার ইজারা নেন। কিন্তু ক্লাইভের হাতে সোরার ইজারা গেলে নবাব তো তার কাছ থেকে ঘুষ চাইতে পারবেন না। নবাবের রোজগারের উপরেই যে থাবা বসাতে চাইছেন ক্লাইভ।

এমনিতেই তো পলাশির যুদ্ধের পর থেকে খানিকটা গায়ের জোরে ছাপরার সব চেয়ে উৎকৃষ্ট সোরা উপযুক্ত মূল্য না দিয়েই নিয়ে যাচ্ছে ইংরেজরা। বর্তমান ইজারাদার খোজ ওয়াজিদ এ নিয়ে বারবার শিকায়ত জানিয়েছেন নবাবের কাছে। কিন্তু তিনি ক্লাইভের মুখ চেয়ে ইংরেজদের কিছু বলতে পারেননি। তবুও খোজা ওয়াজিদকে চাপ দিয়ে ঘুষ বাবদ মোটা টাকা উপায় করেন নবাব। এবার যে এই রোজগারের পথও বন্ধ হওয়ার উপক্রম।

নবাবকে চুপ করে থাকতে দেখে ওয়াটস বললেন, ‘কর্নেলের চিঠি আমি সঙ্গে নিয়ে এসেছি। বুঝতেই পারছেন হুজুর বিভিন্ন জায়গায় ঘাঁটি সামলাতে আমাদের প্রচুর বারুদের প্রয়োজন।’

‘নবাব বললেন, ‘সোরা তো আপনারা পাচ্ছেনই।’

‘চড়া দামে খরিদ করতে হচ্ছে হুজুর। ইজারা পেলে আমাদের তকলিফ দূর হয়।’ এই বলে ক্লাইভের চিঠি নবাবের হাতে ধরিয়ে দিলেন ওয়াটস। নবাব চোখ বোলাতে লাগলেন চিঠিতে।

ওয়াটস বললেন, ‘মুফতে ইজারা চাইছেন না কর্নেল। চিঠিতে স্পষ্ট লিখেছেন। খোজা ওয়াজিদ ইজারা বাবদ যে টাকা তোশাখানায় জমা দেয়, তিনি সেই টাকাই জমা দেবেন।’

ধূর্ত কটা চোখে নবাবকে জরিপ করতে লাগলেন ওয়াটস। নবাবের চোখ আবদ্ধ ক্লাইভের চিঠিতে। ওয়াটস ফের বললেন, ‘আমার উমিদ কর্নেলের আরজি আপনি মঞ্জুর করবেন।’

তীব্র বিরক্তির ছাপ মিরজাফরের চোখেমুখে। বললেন, ‘ভেবে দেখি কী করা যায়।’

নবাবকে ফের একবার তসলিম বিদায় নিলেন ওয়াটস।

রাগে জ্বলছে মিরজাফর খাঁ’র সর্বাঙ্গ। ইংরেজলোগ তাঁর দোস্ত নয়। শিরদাঁড়ায় এক বিষফোঁড়া। এই ফোঁড়া কেটে দূর করতে না পারলে তার শরীরের ইলাজ হবে না, কমবে না জ্বলুনি।

প্রতি মুহূর্তে নানা ছুতোয় টাকা টাকা করে ইংরেজরা হাত পাতছে নবাবের কাছে। ইংরেজ বাহিনীর খরচ বহন করতে হচ্ছে নবাবকে। অবশ্য এজন্য কাকে দুষবেন নবাব? তিনি নিজেই তো এই মোতাবেক ইকরারনামায় দস্তখত করেছেন। রাজারাম, রায়দুর্লভ, রামনারায়ণ কাউকেই তিনি ঢিট করতে পারলেন না। এঁদের ধন-দৌলত দখল করতে পারলেন না। কারণ ক্লাইভ। এখন তিনি চাইছেন সোরার ইজারা। ঘুষ বাবদ নবাবের বাড়তি আয় বন্ধ হওয়ার উপক্রম। ধূর্ত রবার্ট ক্লাইভ তো তাঁকে ভিখিরি বানিয়ে ছাড়বেন!

সহসা অন্য আরেক দুশ্চিন্তা এসে থানা গাড়ল মিরজাফরের মনে। নাই বা হল রামনারায়ণের দৌলত দখল, নবাব ভেবেছিলেন, পাটনায় এসে নায়েব সুবাদার ও জমিদারদের থেকে মোটা টাকা নজরানা আদায় করে ফিরবেন। লোকে দহসত থেকে মোটা নজরানা দেয় তাগদবাজ আদমিকে। পাটনার পথে তাঁর থেকে কয়েকক্রোশ এগিয়ে তাঁবু ফেলেছেন ক্লাইভ। তার উপরে ইংরেজ ফৌজ চলাচল করে খুব দ্রুত। ক্লাইভ যদি সাড়ম্বরে তাঁর ফৌজ নিয়ে নবাবের আগেই পাটনায় ঢুকে পড়েন, তাহলে সকলের ধারণা হবে ক্লাইভই এখন সুবে বাংলায় সবচেয়ে তাগদবাজ আদমি। তাঁকে তুষ্ট রাখতে পারলেই সহি সালামত থাকবে সকলে। সেই হেতু হয়তো নবাবের প্রাপ্য নজরানার মোটা অংশটাই দখল করে নেবেন ক্লাইভ। নবাবের ভাগে জুটবে ছিটেফোঁটা। এই ভেবে অস্থির হয়ে পড়লেন নবাব। তখনই তলব করলেন তাঁর অতি বিশ্বস্ত সেনাপতি খোজা হাজিকে।

খোজা হাজি এসে তসলিম জানাতেই নবাব বললেন, ‘এখনই পাটনার উদ্দেশে রওনা হয়ে যাও। ইয়াদ রেখো, আমি পাটনায় পৌঁছনোর আগে কোনওমতেই কর্নেল ক্লাইভ যেন পাটনা শহরে ঢুকতে না পারেন।’

নবাবের কথা শুনে বুক কেঁপে উঠল হাজির। কী দুরূহ কাজের ভার তাঁর কাঁধে চাপালেন নবাব। আটকাতে হবে কর্নেল ক্লাইভকে, যাঁর ভয়ে নবাব নিজেই সবসময় ত্রস্ত হয়ে থাকেন।

মনের ভাব গোপন করে ফের মাথা ঝুঁকিয়ে হাজি বললেন, ‘জি হুজুর।’

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *