1 of 2

পলাশির পরে – ৪৬

৪৬

টিলার উপর থেকে তিরবেগে নেমে আসা জলধারা মাটির উপরে আছড়ে পড়ে নুড়ি পাথরের প্রতিরোধ ঠেলে নিজের খেয়ালে বয়ে চলেছে। এ যেন যৌবনের দুর্বার, দুর্মদ গতি। সমস্ত বাধা তার কাছে তুচ্ছ।

ঝরনার ধারে বড় একটা পাথরের গায়ে ঠেস দিয়ে বসে রয়েছে গ্রাহাম স্ট্রন। কর্নেল ক্লাইভের দেহরক্ষী। বছর পঁচিশের যুবক। তার আজ ছুটি। আশপাশের জায়গাটা ঘুরে দেখার নেশায় ক্লাইভের অনুমতি নিয়ে সে ক্যাম্প থেকে বেরিয়েছে সকালে। এখন গড়িয়ে যাচ্ছে শীতের মিঠে দুপুর। অনেক ঘোরাঘুরি করে ক্লান্ত হয়ে দুদণ্ড জিরিয়ে নিচ্ছে স্ট্রন। সঙ্গে রয়েছে তার ভায়োলিনখানা। কাঁধ থেকে ঝোলানো। কোলের উপরে রাখা রয়েছে বন্দুক। আশেপাশে ঘন জঙ্গল। অদূরে বয়ে চলেছে গঙ্গা। ঘন গাছপালার ফাঁক দিয়ে মাঝে মাঝে দেখা যাচ্ছে জলের রুপোলি রেখা। পাতার ফাঁক দিয়ে তেরছা ভাবে রোদ এসে পড়েছে মুখে। মাথার টুপিটা একদিকে হেলিয়ে রোদ্দুরকে আড়াল করে স্ট্রন।

পাহাড়, ঝরনা, চড়াই-উতরাইয়ে ভরা জমি, ঘন সবুজের সমারোহ, পাশ দিয়ে বয়ে চলা গঙ্গা সব মিলিয়ে রাজমহল ও তার আশপাশের এলাকা খুবই সুন্দর। চন্দননগর ক্যাম্পের একঘেয়েমি থেকে মুক্তি। তবে খুব বেশিদিন এখানে থাকার উপায় নেই। শিগগিরই নাকি তাঁবু গুটিয়ে পাটনার দিকে রওনা হতে হবে। চলে যাওয়ার আগে জায়গাটার যাবতীয় সৌন্দর্য, রূপরস প্রাণ ভরে আস্বাদ করে নিতে স্ট্রনের এই অ্যাডভেঞ্চার।

স্ট্রন দেখেছে, জায়গায় জায়গায় সবুজের বুক চিরে হঠাৎ হঠাৎই যেন ফুঁড়ে উঠেছে পাথর ও সরু লাল ইটের তৈরি ইমারত। সবই ভগ্নপ্রায় হাভেলি। বোঝাই যায় একসময়ে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা ছিল এই রাজমহল। অনেক দূর থেকে চোখে পড়ে সবুজের দিবার টপকে জেগে থাকা আকবরি মসজিদের চূড়া, জীর্ণ হয়ে পড়া মানসিংহের প্যালেসের প্রবেশদ্বার সিংহীদালান। এসব রাজমহলের অতীত জলুসের ইয়াদগার। আকবর বাদশার আমলে এখানে রাজধানী স্থাপন করেছিলেন তাঁর সেনাপতি মানসিংহ। তারপরে ঢাকায় স্থানান্তরিত হয় রাজধানী। সেখান থেকে ফের রাজমহলে রাজধানী সরিয়ে আনেন শাহজাহান বাদশার ছেলে শাহ সুজা। এখানে এসে তাঁর কাছ থেকে বাংলায় ব্যাবসার ফরমান আদায় করে নিয়ে গিয়েছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। তারপরে পেরিয়ে গিয়েছে একশো বছরেরও বেশি সময়। বাদশা ঔরঙ্গজেবের আমলে শেষবারের মতো এখান থেকে ঢাকায় সরে যায় রাজধানী। পরে ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে রাজধানী স্থানান্তরিত করেন নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ। তুজুকের এসব কহানি নব মুনশির মুখ থেকে শুনেছে স্ট্রন। এদেশের নবাব-বাদশাদের কিসসা-কহানি খোয়াবের দুনিয়ার মতো রঙিন। শুনতে বেশ লাগে।

কানে ভেসে আসছে একটানা ঝরনার জল গড়িয়ে পড়া ও জল বয়ে যাওয়ার ঝরঝর, কুলকুল আওয়াজ। এই শব্দের সঙ্গে আশপাশ থেকে এসে মিশছে হরেক রকমের পাখির কলকাকলি। স্ট্রনের মনে হয় ঠিক যেন একটা কনসার্ট। কেমন যেন একটা খুশির আমেজ মিশে আছে এতে। কিন্তু জীবনের খুশিগুলো সব হারিয়ে যায় কেন? সহসা মন কেমন করে ওঠে স্ট্রনের। কালো মেঘের মতো একরাশ দুঃখ এসে ভিড় করে তার মনের আকাশে। চেতনাকে আচ্ছন্ন করে দেয়। স্ট্রনের মনে হয়, এ দুনিয়ায় খুশি, আশরত, পেয়ার মহব্বত—এসব বহুত কিমতি চিজ।

কোলের উপরে রাখা বন্দুকটা সরিয়ে রেখে ভায়োলিনের ছড় টানতে শুরু করে স্ট্রন। কিছুক্ষণের মধ্যে তার হাতের ছোঁয়ায় মূর্ত হয়ে ওঠে করুণ একটা সুর।

মায়ের মুখটা আবছা মনে পড়ে স্ট্রনের। তখন সে খুবই ছোট। মা মারা যান। বাপ ছিলেন গরিব। জুতো সেলাই করে দিন গুজরান করতেন। মা চলে যাওয়ার পরেই ফের বিয়ে করেন তিনি। লেখাপড়া শেখা হয়নি স্ট্রনের। নিজের রোজগারের টাকায় সংসারের জোয়াল টেনে বেড়াতে জেরবার তার বাবা। স্ট্রনকে লাগিয়ে দেন এক রইস আদমির আস্তাবলে ঘোড়া দেখভালের কাজে। সেও বাড়ি থেকে অনেক দূরে। স্ট্রনের মনে হয়েছিল বাপ যেন এভাবে ঝেড়ে ফেলে দিলেন তার প্রতি তাঁর সব দায়-দায়িত্ব। সেই থেকে স্ট্রন ঘরছাড়া। বাপের সঙ্গে কোনও যোগাযোগ নেই তার। বাপ-মায়ের ভালোবাসা তার কাছে দূর আকাশের নক্ষত্রের মতো অজানা, ধরাছোঁয়ার বাইরে।

আস্তাবলের কাজে সামান্য ত্রুটি হলেই জুটত মালিকের চাবুক। পিঠে দাগ বসে রক্ত জমাট বেধে যেত। মালিকের অত্যাচার সইতে না পেরে একদিন কাজ ছেড়ে পালাল স্ট্রন। তখন শৈশব আর কৈশোরের সন্ধিক্ষণে। কিছুদিন পরে কাজ জুটল এক সার্কাসের দলে। শিল্পীদের ফাইফরমায়েশ খাটার কাজ। তবে ডানপিটে স্ট্রন কিছুদিনের মধ্যেই শিখে ফেলল বিপজ্জনক ট্রাপিজের খেলা। কদর বাড়ল সার্কাসের দলে। তারিফ পেল ম্যানেজারের। সেই যেন প্রথম সে বুঝল এই দুনিয়ায় খুশি কী? আনন্দ কী বস্তু?

অলস এই দুপুরে সবুজের মাঝে ঝরনার পাশে একাকী বসে থাকতে থাকতে অতীতের সব ছবি ভিড় জমাতে থাকে স্ট্রনের মনে। সার্কাসের ব্যালে ট্রুপে নাচ করত বাপ-মা মরা ফুলের মতো এক কিশোরী। সোফিয়া ইভানস। সেও ছিল স্ট্রনের আরেক খুশির কারণ। কিশোর স্ট্রনের বাহাদুরি দেখে তারিফির ভাষা ফুটে উঠত সোফিয়ার মুখে। সার্কাসে থাকতে থাকতেই ভায়োলিন বাজাতে শিখেছিল স্ট্রন। অবসর সময়ে সে যখন ভায়োলিনে সুর তুলত, তার পাশে মাঝে মাঝে এসে চুপ করে বসে থাকত সোফিয়া। বাজনা শুনত। স্ট্রনের ভালো লাগত সোফিয়ার সান্নিধ্য। ধীরে ধীরে দুজনের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে উঠল। হঠাৎই কয়েকদিনের জ্বরে মারা গেল সোফিয়া। স্ট্রনের জীবন থেকে খুশির উজ্জ্বল রোশনি যেন দপ করে নিভে গেল এক লহমায়।

এর বছর দুয়েক পর হঠাৎই একদিন উঠে গেল সার্কাস। কাজ হারিয়ে টান পড়ল পেটে। শেষে রোজগারের তাগিদে অ্যাডমিরাল ওয়াটসনের নৌবহরে নাম লিখিয়ে লন্ডন থেকে সে চলে এল মাদ্রাজে। মাদ্রাজ থেকে বাংলা। ঘটনাচক্রে কর্নেল ক্লাইভের নজরে পড়ে গেল সে। তিনিই অ্যাডমিরালকে বলে স্ট্রনকে নিজের বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত করে নিলেন। ক্লাইভের ব্যক্তিগত দেহরক্ষী দলের একজন সৈনিক হিসেবে স্ট্রন কোম্পানির চাকরিতে বহাল হল।

গ্রাহাম স্ট্রন যে ফৌজের আর পাঁচজন সৈন্যের থেকে আলাদা, বুদ্ধিমান, দুঃসাহসী, বহুগুণের অধিকারী, তা বোঝেন ক্লাইভ। তারিফও করেন প্রকাশ্যে। খানিকটা প্রশ্রয়ও দেন। গত বছর এই সময়ে বজবজ দুর্গ দখলের সময়ে সেনাবাহিনীর ডিসিপ্লিন ভেঙে সে যা কাণ্ড ঘটিয়েছিল তাতে তার সাজা হওয়ার কথা। নোকরি খতম হয়ে যেতে পারত, কিন্তু সে যাত্রায় তাকে রেয়াত করেন ক্লাইভ। ভিন দেশে এসে কাজ হারিয়ে অথৈ জলে পড়ত স্ট্রন। রক্ষা করলেন ক্লাইভ। তাই কর্নেলের প্রতি স্ট্রনের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। অবশ্য সেদিন নেশার ঘোরে যে কাণ্ড সে ঘটিয়েছিল, তাতে বজবজ দুর্গ দখলের কাজটা অত্যন্ত সহজ হয়ে গিয়েছিল।

মনের পর্দায় কেবলই আনাগোনা করছে তার অতি তুচ্ছ, ক্ষুদ্র জীবনের টুকরো টুকরো তসবির। তবে আজ কেন যেন সব কিছু ছাপিয়ে বার বার তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে সোফিয়ার একটা ছবি। ঘুমিয়ে আছে সোফিয়া। চোদ্দ বছরের কিশোরী। ফুলে ফুলে ঢাকা। তার মাথার কাছে দাঁড়িয়ে আছে স্ট্রন। অস্ফুট স্বরে বলছে ‘গুড বাই সোফিয়া। রেস্ট ইন পিস।’

ভায়োলিন বাজিয়ে চলেছে স্ট্রন। দু’চোখ বন্ধ। দুই গাল বেয়ে নেমে আসছে জলের ধারা।

সহসা কানে ভেসে আসে নারীকণ্ঠের তীক্ষ্ণ চিৎকার। চমকে ওঠে স্ট্রন। ভাবনার স্রোত নিমেষে অন্তর্হিত হয়। থেমে যায় ভায়োলিনের ছড় টানা। উৎকর্ণ হয়ে সে শুনতে পায় নারীকণ্ঠের অস্পষ্ট গোঙানির আওয়াজ। খুব দূরে নয়। কাছেই কোথাও।

চকিতে উঠে দাঁড়ায় স্ট্রন। ভায়োলিনটা কাঁধে ফেলে বন্দুক হাতে ছুটে যায়।

ঝোপঝাড়ের আগল ঠেলে কিছুদূর এগিয়ে স্ট্রন দেখে, বুনো ঘাসে ঢাকা জমিতে এক যুবতীর উপরে ঝাঁপিয়ে পড়েছে নবাবের বাহিনীর জনৈক হাবশি সেপাই। উদগ্র লালসায় দৈত্যের মতো চেহারার লোকটা জবরদস্তি সেই যুবতীকে নগ্ন করার কোশিশ করছে। লোহার মতো শক্ত হাতে ফাঁসে বন্দি যুবতী নিজের ইজ্জত বাঁচাতে অসহায় ভাবে হাত-পা ছুড়ে চলেছে। এ যেন ব্যাধের জালে আটক কবুতরের অসহায় ডানা ঝটপটানি। কামতাড়নায় উন্মাদ হয়ে উঠেছে হাবশি সেপাইটা, জোর করে নিজের মুখটা মেয়েটির মুখের উপরে নামিয়ে এনে চুম্বনে উদ্যত হয়।

সাময়িক ঘোর কাটিয়ে উঠে বন্দুকটা হাতে নিয়ে স্ট্রন গুলি চালাল শূন্যে। গুড়ুম!

এই শান্ত নিরিবিলি জায়গায় বন্দুকের আওয়াজ শুনে ঘাবড়ে গিয়ে যুবতীকে ছেড়ে দিয়ে চকিতে ঘুরে দাঁড়াল লোকটা। নিমেষে প্রবল আতঙ্কের ছাপ ছড়িয়ে পড়ল তার মুখে।

বন্দুক তাক করে দাঁড়িয়ে আছে স্ট্রন। আঙুল ট্রিগারে।

হাবশি সেপাই দুহাত তুলে খানিকটা পিছিয়ে যায়। তারপরে ঝোপ-জঙ্গল ভেদ করে উর্দ্ধশ্বাসে দৌড়তে থাকে। বন্দুক ফেলে স্ট্রন দ্রুত ছুটে এসে হাঁটু মুড়ে বসল যুবতীর সামনে।

শীত ও ত্রাসে কাঁপছে বিদ্যা। পরনের শাড়ি সম্পূর্ণ ভিজে। ভিজে মাথার চুল। সে গঙ্গাস্নানে গিয়েছিল। ফেরার পথে এই বিপত্তি। বিস্ময় ও ভয়জড়ানো চোখে স্ট্রনকে সে জরিপ করতে থাকে।

স্ট্রন বলল, ‘ডরো মাত। আমি জানোয়ার নই। জেনানার ইজ্জতের কিম্মত বুঝি।’

সহসা মেয়েটির নজর গেল নিজের বেআবরু বুকের উপরে। লজ্জায় চোখ নামিয়ে দ্রুত বুকের উপরে আঁচল টানল সে। পরনের শাড়ি উরুর উপরে অনেকটা উঠে গিয়েছে। দ্রুত শাড়িটা টেনে নামাল সে। আঁচল টেনেটুনে কোনওরকমে ঢাকল উন্মুক্ত নাভিদেশ। ভেজা শাড়ি এঁটে বসেছে দেহের উপরে। অচেনা এই পুরুষের সামনে লজ্জায় যেন মাটিতে মিশে যেতে লাগল যুবতী।

স্ট্রন ফের বলল, ‘ডরো মাত।’

বিদ্যা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। এখনও যেন দুঃস্বপ্নের ঘোর লেগে আছে তার চোখে।

স্ট্রন শুধোয়, ‘কে তুমি?’

‘বিদ্যা।’

‘ঘর কোথায় তোমার?’

‘কাছেই।’ বিদ্যা জবাব দেয় সংক্ষেপে।

‘এখানে তো কোনও লোকবসতি নেই।’

কোনও জবাব না দিয়ে আনত চোখে ভূমির দিকে চেয়ে থাকে বিদ্যা।

কেমন যেন খটকা লাগল স্ট্রনের। কথাবার্তায় ঢঙে একে দেখে ঠিক দেহাতের আনপঢ় জেনানা বলে মনে হয় না। খুবসুরত এই যুবতী এই নির্জন স্থানে একাকী এল কোথা থেকে।

 ‘গঙ্গায় নাইতে গিয়েছিলাম। ফেরার পথে ওই হাবশি দৈত্যটা হঠাৎ পিছন থেকে–’ সহসা ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে বিদ্যা।

 ‘কে আছে তোমার বাড়িতে?’ শুধোয় স্ট্রন।

 ‘কেউ না।’

স্ট্রন লক্ষ করে মেয়েটি শীতে ঠকঠক করে কাঁপছে। নিজের গায়ের কোটটা খুলে নিয়ে স্ট্রন বলে, ‘এটা গায়ে দিয়ে নাও।’

ভিজে কাপড় গায়ের সঙ্গে লেপটে থাকায় বড় অস্বস্তি বোধ করছিল বিদ্যা। বেআবরু হয়ে পড়েছে ভরা যৌবনের সকল চিহ্ন। দ্বিধা না করে স্ট্রনের লম্বা কোটটা দ্রুত গায়ে জড়িয়ে নেয় বিদ্যা। অশালীন ভাবে ফুটে ওঠা দেহসম্পদকে আড়াল করতে পেরে অনেকটা স্বাভাবিক হয় সে।

স্ট্রন বলে, ‘চলো তোমাকে পৌঁছে দিয়ে আসি।’

‘কোথায়?’

‘তোমার ঘরে।’

ঝোপ-জঙ্গল ভেদ করে হাঁটতে থাকে দু’জনে।

খানিকবাদে বুনো ঝোপের মধ্যে দিয়ে এঁকেবেঁকে যাওয়া শুড়ি পথ ধরে স্ট্রনকে নিয়ে একটা জীর্ণ ইমারতের সামনে এসে দাঁড়ায় বিদ্যা।

অবাক হয়ে স্ট্রন শুধোয়, ‘এই তোমার ঘর?’

‘হ্যাঁ।’ করুণ একটা হাসি ফুটে ওঠে মুখে।

কথা না বাড়িয়ে বিদ্যার পিছন পিছন অন্দরে প্রবেশ করে স্ট্রন। স্যাঁতসেঁতে প্রায়ান্ধকার ঘর। দিনদুপুরেই যেন আঁধার নেমেছে। আশেপাশের মহীরুহ আড়াল করেছে সূর্যকে। রোদ্দুর এখানে বড় একটা আসে না। ঘরের অন্দরে শীত বড় তীব্র।

বিদ্যা বলে, ‘বোসো সাহেব। আমি কাপড় বদলে আসি।’

আড়ালে চলে যায় বিদ্যা। আড়াল থেকেই ছুড়ে দেয় চামড়ার কোটটা।

সেটা তুলে নিয়ে গায়ে জড়িয়ে নেয় স্ট্রন।

ঘরের পশ্চিমদিকের দেওয়ালে জাফরির ফাঁক দিয়ে চুঁইয়ে এসে ঢুকেছে সামান্য আলো। একদিকের ছাত প্রায় ভেঙে পড়ার উপক্রম। কয়েকটা দরজায় পাল্লা নেই। জানোয়ারেরা যে কোনও সময় ঢুকে পড়তে পারে ঘরে। এটা যে বিদ্যার স্থায়ী ঠিকানা, তা বিশ্বাস হয় না স্ট্রনের। নিশ্চয়ই বিপদে পড়ে এখানে আশ্রয় নিয়েছে বিদ্যা। কী তার আসল পরিচয়?

‘কী ভাবছ সাহেব?’ কাপড় বদলে স্ট্রনের সামনে এসে দাঁড়ায় বিদ্যা।

স্ট্রন মুচকি হেসে সারল্যের সঙ্গে বলে। ‘তোমার কথা।’

আনত চোখে বিদ্যা বলে, ‘এ ঘরে এসো।’

বিদ্যার পিছু পিছু পাশের ঘরে প্রবেশ করে স্ট্রন।

বিদ্যা বলে, ‘বড় ঠান্ডা। দাঁড়াও আগুন জ্বালি।’

ঘরের কোণায় জড়ো করে রাখা কিছু লকড়ি টেনে এনে চকমকি পাথর ঠুকে আগুন জ্বালে বিদ্যা। মুগ্ধ চোখে বিদ্যাকে দেখছিল স্ট্রন। হঠাৎই চোখ তুলে তাকায় বিদ্যা। চোখাচোখি হতেই লজ্জিত হয়ে চোখ সরিয়ে নেয় স্ট্রন।

মুচকি হেসে বিদ্যা বলে, ‘হাঁ করে অমন দেখছ কী?’

স্ট্রন বলে, ‘তোমাকে। ইউ আর বিউটিফুল।’

আগুনটা দাউ দাউ করে জ্বলে উঠেছে। বেশ আরাম বোধ হয় স্ট্রনের।

বিদ্যা বলে, ‘বিউটিফুল মানে জানি সাহেব। তোমাদের ভাষার কিছু কিচ্ছু কথা বুঝি। এসো। হাত পা ছড়িয়ে বসো এখানে।’

বড় একটা ঘরের এক কোণায় মেঝেতে বিছানো খড়ের উপরে পাতা রয়েছে মলিন একটা সুজনি। তার উপরে বসে পড়ে স্ট্রন। বিদ্যা বসে অদূরে।

‘সত্যি করে বলো তো কে তুমি?’

‘বিদ্যা। বিদ্যাধরী।’

‘এ তোমার ঘর নয়।’

চুপ করে থাকে বিদ্যা।

‘কোনও মুসিবতে পড়ে তুমি এখানে এসে উঠেছ।’

হঠাৎই ঠোঁট কামড়ে ধরে নিঃশব্দে কেঁদে ওঠে বিদ্যা। নিজেকে সামলে নিয়ে আঁচলে চোখ মুছে বলে, ‘ঠিকই আন্দাজ করেছ সাহেব। এখনও যে বেঁচে আছি, নিজেরই বিশ্বাস হতে চায় না।’

‘ডরো মাত ডার্লিং। আমি মদত দেব তোমাকে।’

‘সত্যি বলছ সাহেব?’ আবেগে স্ট্রনের হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে বিদ্যা।

স্ট্রন জবাব দেয়, ‘বিলকুল। বিলিভ মি।’

বিদ্যা বলে, ‘জানি তোমরা কলকাতা থেকে এসেছ। ক’দিন পরে তো ফিরে যাবে। আমাকে তোমাদের সঙ্গে কলকাতায় নিয়ে যেতে পার সাহেব? সামান্য আলাপে বেহায়ার মতো ভিক্ষে চাইছি। কিছু মনে করো না।’

অবাক হয়ে স্ট্রন শুধোয়, ‘কলকাতায় যেতে চাও? তোমার ঘর ওখানে?’

নীরবে মাথা নেড়ে সম্মতি জানায় বিদ্যা।

‘হাউ স্ট্রেঞ্জ! এখানে তুমি কার সঙ্গে এলে?’

এরপর বিদ্যা বলে যায় তার নিজের কথা। গ্রামের কথা, বুড়ো বরের সঙ্গে চিতায় পুড়ে মরার ত্রাসে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে পড়ার কথা, সমাজচ্যুত হওয়া, তারপরে রতু সরকারের হাতে পড়ে গণিকাবৃত্তি আঁকড়ে ধরা। কোনওকিছুই সে বাদ দেয় না সে। অকপটে বলে যায় সব কথা।

বিদ্যার কাহিনি শুনে দুঃখে স্ট্রনের বুকের মধ্যে কেমন যেন মোচড় দিয়ে ওঠে। সে শুধু একা নয়, অনেকের জীবন থেকেই যে খুশির সব রং বড় তাড়াতাড়ি হারিয়ে যায়।

হাঁটুতে মুখ গুজে কাঁদতে থাকে বিদ্যা।

স্ট্রন ফের শুধোয়, ‘লেকিন এখানে কী করে এলে তুমি?’

বিদ্যা বলে যায়, রতু সরকারের সঙ্গে ঈশ্বরী ও তার কাশীযাত্রার কথা। পথে সুতীর কাছে বজরায় হামলা করে মিরনের অনুচরেরা। অন্ধকারের মধ্যে ঈশ্বরী ঝাঁপ দিয়ে পড়ে বর্ষায় উত্তাল নদীতে। আক্রান্ত হয় রতু সরকার। কী হল তাদের অন্তিম পরিণতি তা বিদ্যার জানা নেই। তাকে নিজেদের বজরায় তুলে নিয়ে নদীতে ভেসে চলে শয়তানেরা। সেই রাতে চার জনে বিদ্যার শরীরটাকে নিয়ে খেলায় মাতে। পাশবিক যৌন নির্যাতন সইতে না পেরে জ্ঞান হারায় বিদ্যা। শতানেরা বোধহয় ভেবেছিল প্রাণ নেই শরীরে। তাই অর্ধনগ্ন বিদ্যাকে তারা ফেলে যায় নদীর নির্জন চরে। জ্ঞান ফিরতে বিদ্যা দেখে পিতৃস্নেহে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন এক বৃদ্ধ ফকির। তিনি তাকে উদ্ধার করে নিয়ে আসেন এই আস্তানায়। বিদ্যা তাকে বাবা বলে ডাকত। দিন পনেরো আগে মারা যান সেই ফকির। তারপর থেকে সে একাকী দিন গুজরান করে চলেছে এই ভগ্ন হাভেলিতে।

নিজের কাহিনি শেষ করে আঁচল দিয়ে চোখের জল মোছে বিদ্যা।

স্ট্রনের দু’চোখে চিকচিক করছে জল।

বিদ্যা বলে, ‘জানো সাহেব খুব বাঁচতে সাধ আমার। সে কারণেই ভগবান বোধ হয় আমাকে মরতে দিতে চান না। তাই তিনিই বোধহয় তোমাকে পাঠিয়েছেন এখানে।’

মুগ্ধ চোখে বিদ্যার দিকে চেয়ে থাকে স্ট্রন।

‘এত কিছুর পরেও আমি যে বেঁচে আছি, ভাবলে আমার নিজেরই অবাক লাগে। এ ক’দিন বড় তকলিফের মধ্যে কেটেছে। শুধু ভেবেছি কী করে এই অবস্থা থেকে উদ্ধার পাব? তোমার উপরে ভরসা করতে পারি সাহেব। আমি রূপ বিকিয়েছি কলকাতায়। পুরুষের নজর চিনি। তুমি মানুষ মন্দ নও। ইচ্ছে করলেই তো তুমি জোর করে ভোগ করতে পারতে এই শরীরটা। কিন্তু তা তো করোনি। বলো সাহেব আমাকে কলকাতায় পৌঁছে দেওয়ার কোনও উপায় করতে পার?’

এই বলে প্রচণ্ড আবেগে ও উত্তেজনায় স্ট্রনকে আঁকড়ে ধরে বিদ্যা।

স্ট্রনের দেহের সঙ্গে প্রায় লেপটে গিয়েছে সে। স্ট্রনের সারা শরীর শিহরিত হয়ে ওঠে। ধমনীতে রক্ত ছুটতে থাকে দুরন্ত গতিতে। তীব্র আবেগে শক্তবাহুবন্ধনে বিদ্যাকে জড়িয়ে ধরে স্ট্রন।

‘জরুর ডার্লিং। তোমাকে আমি কলকাতায় নিয়ে যাব। জরুর।’

দ্রুত নিঃশ্বাস পড়তে থাকে স্ট্রনের। তার ঠোঁটদুটো চেপে বসে বিদ্যার নরম দুই ঠোঁটের উপরে। চুম্বনে ধরা দেয় বিদ্যা। জল গড়িয়ে পড়ে তার দু’গাল বেয়ে।

জল স্ট্রনের চোখেও। তার দেহের প্রতিটি কোষে, শিরায় শিরায় যেন ছড়িয়ে পড়ছে তীব্র আনন্দের এক অনুভূতি। এর নাম খুশি।

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *