৪৫
ক্লাইভের নিমন্ত্রণ রক্ষায় ইংরেজ শিবির অভিমুখে যেতে যেতে হাওদায় বসে মিরজাফর ভাবতে লাগলেন, আজ হয়তো কড়া দু’কথা শুনিয়ে দেবেন ক্লাইভ। এমনকি হয়তো কালই কলকাতায় ফিরে যাওয়ার কথা জানিয়ে দেবেন। ইংরেজদের বকেয়া মেটানোর বিষয়ে আলোচনার জন্যেই তো দেওয়ানকে ডেকে পাঠানো। দু’দিন হয়ে গেল দেওয়ান এসেছেন রাজমহলে, কিন্তু ইংরেজদের পাওনার বিষয়ে এখনও তাঁর তরফ থেকে দেওয়ানের সঙ্গে আলোচনায় বসার কোনও উদ্যোগ নেই। ক্লাইভ এবারে হয়তো সুলেনামার শর্ত ইনকার করার ইলজাম আনবেন তাঁর উপরে। কিন্তু তিনি কী করে ক্লাইভকে বোঝাবেন যে স্ক্র্যফটনের সামনে দুজনে কোলাকুলি সারলেও দেওয়ানের হাভেলিতে মিরনের হামলার পর থেকে রায়দুর্লভের মুখোমুখি হওয়ার কথা ভাবলেই তিনি সংকুচিত হয়ে পড়ছেন।
দেওয়ানকে ডেকে পাঠানোর বুদ্ধি দিয়েছিলেন ক্লাইভ। মিরজাফর ভেবেছিলেন, তাঁর চিঠি পেলেও জান খতরা হওয়ার ভয়ে ঘর ছেড়ে বেরোবেন না দেওয়ান। আসবেন না রাজমহলে। বানচাল হয়ে যাবে ক্লাইভের কৌশল। তখন তিনি ক্লাইভ সাহেবকে বলতে পারবেন, দেওয়ান সাহেব তো এলেন না, কী আর করা যাবে। চলুন আপাতত পাটনা অভিযান সেরে আসি। তারপরে মুর্শিদাবাদে ফিরে আপনাদের বকেয়া আমি মিটিয়ে দেব। রামনারায়ণের দৌলত হাতে এলে আপনাদের কিস্তির টাকা মেটাতে আমার কোনও তকলিফ হবে না। কিন্তু রাজমহলে এসে রায়দুর্লভ হাজির হওয়ায় ভেস্তে গেল সেই পরিকল্পনা।
মিরজাফরের মেজাজ শরিফ নেই। এই ওয়াক্তে এখানে দেওয়ানের উপস্থিতি তিনি মোটেই চাইছিলেন না। নবাব জানেন, কূটবুদ্ধি খুব ভালো খেলে রায়দুর্লভের মাথায়। ইংরেজদের বকেয়া মেটানোর বিষয়ে একটা ফয়সালা হয়ে গেলেও দেওয়ান হয়তো কর্নেলকে কুপরামর্শ দিয়ে পাটনা অভিযান বরবাদ করে দেবেন। রামনারায়ণ যে এই মুহূর্তে দেওয়ানের তাঁবের আদমি, তা শুধু নবাব কেন, তামাম মুর্শিদাবাদ জানে।
ইংরেজ শিবিরে পৌঁছে একেবারে হকচকিয়ে গেলেন নবাব। চারিদিক আলোয় আলোয় ছয়লাপ। একেবারে উৎসবের মেজাজ। রঙিন কাপড়চোপড় ও ফুল দিয়ে চারিদিক সাজিয়ে তুলে জায়গাটাকে বেহেস্তের মতো সুন্দর করে তোলা হয়েছে। সবে সন্ধে নামছে। গাছগাছালি থেকে ভেসে আসছে ঘরে ফেরা পাখিদের কিচিরমিচির। হঠাৎই দুম করে একটা পটকা ফাটার শব্দে বেজায় চমকে গিয়ে উপরের দিকে তাকালেন নবাব। কালচে নীল আকাশের গায়ে বিচিত্র নকশা তৈরি করল আতশবাজি।
ইংরেজদের হঠাৎ এত আমোদ-আশরতের হেতু কী? ভেবে ঠাহর করে উঠতে পারলেন না নবাব। ওয়ারেন হেস্টিংস এগিয়ে এসে খাতির করে তাঁকে নিয়ে গেলেন ক্লাইভের তাঁবুর অন্দরে।
নবাবের জন্যেই অপেক্ষা করছিলেন ক্লাইভ। তিনি উঠে দাঁড়িয়ে দু’দিকে হাত প্রসারিত করে মাথা ঝুঁকিয়ে স্বাগত জানালেন নবাবকে।
কুরসিতে বসলেন নবাব। বিদায় নিলেন হেস্টিংস। দোভাষীর কাজ চালানোর জন্য ক্লাইভের অদূরে একখানা চৌপাইয়ের উপরে বসলেন নবকৃষ্ণ।
ক্লাইভ বললেন, ‘ইউ আর হিয়ার। আপনাকে বাদ দিয়ে কি আমরা খুশি মানাতে পারি? সো আই ইনভাইটেড ইউ ইন দ্য ডিনার পার্টি।’
‘কীসের খুশি?’ কৌতূহলী গলায় প্রশ্ন করলেন মিরজাফর।
‘ওয়েট। আই উইল টেল ইউ এভরিথিং। আই উইল গিভ ইউ অ্যা সারপ্রাইজ।’
একজন অর্ডারলি গড়গড়া রেখে গেল। ফরসির নলটা টেনে নিলেন নবাব।
ক্লাইভ বললেন, ‘আই অবসারভড দেওয়ান রেপেক্টস ইউ ভেরি মাচ। দিস ইজ হাউ ইট শ্যুড বি ইন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন। চিঠি পেয়েই তুরন্ত কেমন ছুটে এলেন এখানে। ইউ সেইড, হি উইল নট কাম। আই থিংক ইউ আর মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিং ইওর দেওয়ান।’
গম্ভীর হলেন মিরজাফর। ক্লাইভের মনের আন্দাজ পাওয়ার কোশিশ করতে লাগলেন।
ক্ষণিকের নীরবতা ভেঙে ক্লাইভ শুধোলেন, ‘ডু ইউ রিয়েলি ওয়ান্ট টু ডিসমিস দেওয়ান?’
‘জি সাহেব।’
‘ডোন্ট ডু দ্যাট। ইট ইজ মাই রিকোয়েস্ট।’
‘দেওয়ান আমার সঙ্গে গদ্দারি করতে চান। আপনাকে আগেই বলেছি।’
‘ইয়ে গলত আন্দাজ। হি উইল নট হ্যাভ দ্যাট কারেজ। আই অ্যাম অ্যাসিওরিং ইউ।’
নিমরাজি মুখ করে মিরজাফর বললেন, ‘বেশ, আপনি যখন চাইছেন তখন—না হয়—’
ক্লাইভ জোশের সঙ্গে বললেন, ‘আমি চাইছি না, আপনি ভুল করতে যাচ্ছিলেন, আই অ্যাম কারেক্টিং ইওর মিসটেক। থিংক ওয়াইজলি। এই মুহূর্তে রায়দুর্লভজি ছাড়া নিজামতের দেওয়ানের দায়িত্ব সামলানোর মতো কামিল-ই-ইনসান কেউ নেই। একসঙ্গে কাজ করতে গেলে ভুল বোঝাবুঝি হতেই পারে হুজুর, বিকজ অফ দ্যাট হোয়াই ইউ ব্রেক দ্য রিলেশনশিপ? আপনি দেওয়ানের সঙ্গে কাজিয়া মিটিয়ে নিন। এতে নিজামতের ভালো হবে।’
ক্লাইভের এই নাতিদীর্ঘ বক্তৃতায় মিরজাফর খাঁ কেমন যেন সম্মোহিত হয়ে পড়লেন। তাঁর মনে হল সত্যিই হয়তো তিনি ভুল করছিলেন। তাঁর কানে দেওয়ানের নামে সমানে বিষ ঢেলে গিয়েছে মিরন। সেই সব কথা বিশ্বাস করেছেন তিনি। মিরন নালায়েক। রাজনীতির কতটুকুই বা বোঝে? মিরনের কথায় প্ররোচিত হয়ে সত্যিই হয়তো তিনি গলত কদম ওঠাতে যাচ্ছিলেন।
‘বেশ। দেওয়ানকে আপনি তলব করুন এখানে।’ নিমরাজি গলায় বললেন নবাব।
‘ওয়েল সেইড। আপনি সমঝদার ইনসান।’ এই বলে ডোরিতে টান দিলেন ক্লাইভ।
ঘন্টি বাজল। একজন অর্ডারলি এসে ঢুকল ঘরে।
একটি চিরকুটে দ্রুত কয়েক লাইন লিখে রায়দুর্লভের কাছে পাঠিয়ে দিলেন ক্লাইভ।
পুরোটাই নাটক। মিরজাফর বুঝতে পারলেন না। আগে থেকেই এই পরিকল্পনার কথা রায়দুর্লভকে জানিয়ে রেখেছিলেন ক্লাইভ। দেওয়ান সাহেব তৈরিই ছিলেন। চিরকুট হাতে পেয়েই তিনি ঝড়ের গতিতে এসে হাজির হলেন। নাটুকেপনায় রায়দুর্লভও কম যান না। দেহের অভিব্যক্তিতে স্পষ্ট বুঝিয়ে দিতে লাগলেন, নবাবের উপস্থিতিতে তিনি অস্বস্তি বোধ করছেন। এই ওয়াক্তে ক্লাইভ তাঁকে না ডেকে পাঠালেই ভালো করতেন।
‘আসুন দেওয়ান সাহেব।’ উষ্ণ অভ্যর্থনা জানালেন ক্লাইভ।
রীতিমতো অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে কুরসিতে এসে বসলেন রায়দুর্লভ।
‘শুনলাম নবাবের সঙ্গে আপনার বাতচিত নেই।’ ভনিতা ছাড়াই কথাটা ছুড়ে দিলেন ক্লাইভ।
রায়দুর্লভ চুপ করে রইলেন।
সবটাই আগে থেকে ছকে রাখা। পরপর কী প্রশ্ন আসবে, কোন প্রশ্নের উত্তরে কী বলতে হবে, কখন চুপ করে থাকতে হবে তা দেওয়ানকে আগে থেকেই শিখিয়ে পড়িয়ে রেখেছেন ক্লাইভ।
ক্লাইভ ফের প্রশ্ন করলেন, ‘আর ইউ প্ল্যানিং টু বিট্রে নবাব?’
রায়দুর্লভ মরিয়া গলায় বললেন, ‘বিলকুল না হুজুর। মসনদের লালচ আমার নেই।’
‘সে কী? আমি তো শুনেছি পাটনার নায়েব সুবাদারকে বাগি হতে মদত দিচ্ছেন আপনি।’
‘ইয়ে ঝুটা ইলজাম। দেশ বেচ্যায়েন হলে মুসিবতের আঁচে নবাবের মতো দেওয়ানও তো জিন্দা পুড়ে মরবেন। আমি কেন নিজেকে খতরার মধ্যে ফেলতে চাইব?’
মিরজাফরের দিকে তাকালেন ক্লাইভ। এই নাটকে মিরজাফর এতটাই প্রভাবিত হয়ে পড়েছেন, যে দেওয়ানের উপরে গদ্দারির ইলজাম ওঠানোর জন্য তিনি অপরাধবোধে ভুগতে লাগলেন। ক্লাইভের মুখপানে চাইতে তাঁর অস্বস্তি লাগছে। আনত চোখে তিনি ভূমির দিকে চেয়ে রইলেন।
মুচকি হেসে ক্লাইভ এবারে বললেন, ‘নবাব রিগ্রটেড হিজ মিসটেক। আশা করি আপনিও নবাবের উপরে কোনও আখেজ রাখবেন না।’
‘আমি নবাবের নিমক খাই। তাঁর প্রতি আখেজ, আদাওতি আমার নেই। নবাব বাহাদুর ভুল বুঝেছেন আমাকে। আমার হাভেলিতে হামলা হয়েছে। এই বেইজ্জতিতে আমি দুঃখ পেয়েছি।’
কুরসি ছেড়ে উঠে এসে রায়দুর্লভকে বুকে জড়িয়ে ধরে মিরজাফর আবেগের সঙ্গে বলে উঠলেন, ‘আমার গুস্তাকি মাফ করবেন দেওয়ান সাহেব।’
লজ্জিত হওয়ার ভান করে রায়দুর্লভ বললেন, ‘আপনি সুবে বাংলার নবাব। আপনি কারও কাছে মাফি মাঙতে পারেন না। আমি তো মামুলি এক ইনসান। আপনার গোলাম।’
ক্লাইভ মজা পাচ্ছেন মনে মনে। দেওয়ান সাহেব একেবারে নিখুঁত অভিনয় করে চলেছেন।
কোলাকুলি সেরে নিয়ে অতীতের সব আদাওতি ভুলে যাওয়ার ওয়াদা করলেন দুজনেই।
হাততালি দিয়ে উঠে ক্লাইভ বললেন, ‘উই মাস্ট সেলিব্রেট দিস রিইউনিয়ন।’
মিরজাফর বললেন, ‘আপনাদের পাওনার বিষয়ে আলোচনাটা এখনই সেরে নিলে হত না?’
‘উই উইল ডিসকাস দ্য ইস্যু ইন দ্য পার্টি উইথ শ্যাম্পেন। টু ডে ইজ ক্রিসমাস ইভ। টুয়েন্টি ফোর্থ ডিসেম্বর। দিস টাইম লাস্ট ইয়ার আই ওয়াজ বিজি ফাইটিং টু রিক্যাপচার ফোর্ট উইলিয়াম। সেলিব্রেশন হয়নি। সো, টু ডে উই অ্যারেঞ্জ অ্যা গ্র্যান্ড পার্টি।
.
নবাব ও দেওয়ানকে সঙ্গে নিয়ে তাঁবুর পিছন দিকে কানাতে ঘেরা বড় একটা লনে এসে পড়লেন ক্লাইভ। পার্টির এলাহি আনজাম-আয়োজন দেখে হাঁ হয়ে গেলেন নবাব ও দেওয়ান দু’জনেই। তাদের মনে হল, অচানকই খোয়াবের এক টুকরো দুনিয়ায় এসে পড়েছেন।
চারিদিক চিরাগ ও মোমবাতি জ্বেলে খুব সুন্দর করে সাজিয়ে তোলা হয়েছে। তা ছাড়াও লনের উপরে জায়গায় জায়গায় লোহার বাতিদানে পুড়ছে অভ্রের পাত। কড়া ঠান্ডায় শরীর গরম রাখার জন্য লকড়ি জড়ো করে আগুন জ্বালানো হয়েছে। লনের উপরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বাহারি সুজনিতে মোড়া টেবিল ও চেয়ার। এক জায়গায় লম্বা টেবিলের উপরে থরে থরে সাজানো রয়েছে রকমারি খাবারদাবার। আরেকদিকে একটা টেবিলের উপরে সাজানো রয়েছে রকমারি মদের বোতল। পোর্ট, ক্ল্যারেট, ওয়াইন, মদিরা, শ্যাম্পেন, বিয়ার। কালো আকাশের বুকে বিচিত্র নকশা তৈরি করছে আতশবাজি। লনের একপ্রান্তে একটা তোপও রয়েছে। এই আশরতের আনজামের মধ্য আবার তোপ কেন সেটা বুঝতে পারলেন না নবাব ও দেওয়ান কেউই।
লনের মাঝে দাঁড়িয়ে ছিলেন ওয়ারেন হেস্টিংস, লাশিংটন, ওয়ালশ, ফোর্ড-সহ ইংরেজ সেনাবাহিনীর সব অফিসারেরা। এগিয়ে এসে তাঁরা নবাব ও দেওয়ানকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানালেন।
ক্লাইভের ব্যক্তিগত দেহরক্ষী ও বহু গুণের অধিকারী গ্রাহাম স্ট্রনের নেতৃত্বে একদল বাজনদার প্রস্তুত হয়ে আছে। স্ট্রনের হাতে ভায়োলিন। ঘাড় অবধি লম্বা চুল। খুবই সুপুরুষ চেহারা স্ট্রনের। বহু মানুষের ভিড়েও আলাদা করে সে নজর কেড়ে নেয়। এই ছেলেটিকে বিশেষ স্নেহ করেন ক্লাইভ। স্ট্রনের দিকে চেয়ে তিনি ইশারা করলেন। ব্যান্ডে বেজে উঠল ক্রিসমাস ক্যারোল।
মুগ্ধ চোখে ভায়োলিনের ছড় টানা দেখছিলেন নবাব। এই বাদ্যযন্ত্র আগে কখনও দেখেননি।
ক্লাইভ বললেন, ‘হিজ নেম ইজ গ্রাহাম স্ট্রন। ভেরি ট্যালেন্টেড। গুড মিউজিশিয়ান। এক সময়ে সার্কাসে খেলা দেখাত। কাজ চলে যাওয়ায় ফৌজে নাম লিখিয়েছে। অ্যাডমিরাল ওয়াটসনের ফৌজে ছিল। মাদ্রাজ থেকে ফলতা আসার পথে আমার নজরে পড়ে। আই ইনক্লুডেড হিম ইন মাই ফোর্স।
‘বাজনাটার নাম কী?’
‘ভায়োলিন। অ্যা ওয়েস্টার্ন ইনস্ট্রুমেন্ট।’
রায়দুর্লভ বললেন, ‘অনেকটা আমাদের রবাবের মতো।’
ওয়ারেন হেস্টিংস বলে উঠলেন, ‘রাইটলি সেইড। ভায়োলিন ইভলভড ফ্রম রবাব।’
‘বড়িয়া। পশ্চিম দুনিয়া আউর হিন্দুস্থানের বহুত আচ্ছা তালমিল।’
নবাবের কথা শুনে ক্লাইভ বললেন, ‘জাস্ট লাইক আওয়ার রিলেশনশিপ উইথ ইউ। আসুন এবারে আমাদের বকেয়ার ব্যাপারে আলোচনাটা সেরে ফেলা যাক।’
অদূরে লকড়ি জ্বালিয়ে ক্যাম্প ফায়ারের আয়োজন। মিরজাফর ও রায়দুর্লভকে নিয়ে একটা টেবিলে এসে বসলেন ক্লাইভ। অর্ডারলি এসে টেবিলে রেখে যায় শ্যাম্পেনের পাত্র, বেলেহাঁসের রোস্ট, ভেড়ার মাংসের কাবাব ও ফ্রুট স্যালাড।
শ্যাম্পেনের পাত্র তুলে নিয়ে ক্লাইভ বললেন, ‘টুয়েন্টি থ্রি অ্যান্ড হাফ লাখ ডিউ ইন নভেম্বর।’
রায়দুর্লভ অসহায় গলায় বললেন, ‘ইতনা রুপেয়া মেটানোর কড়ি তোশাখানায় নেই সাহেব।’
শ্যাম্পেনের পাত্রে একটা চুমুক দিয়ে পাত্রটা টেবিলের উপরে নামিয়ে রাখলেন ক্লাইভ।
মিরজাফর চিন্তিত। শ্যাম্পেন, বেলেহাঁসের মাংস, ভেড়ার মাংসের কাবাব সবই বিস্বাদ লাগছে তাঁর। টাকা দিতে না পারার অর্থ ক্লাইভ বেঁকে বসবেন। পাটনা অভিযান ভণ্ডুল হয়ে যাবে। রামনারায়ণের খাজানার নাগাল পাওয়া যাবে না।
‘হাউ মাচ ক্যান ইউ পে নাউ?’ মাংসের টুকরো কাঁটায় গেঁথে প্রশ্ন করলেন ক্লাইভ?
কোমরবন্ধনী থেকে গোটানো একটা কাগজ বের করে চোখের সামনে মেলে ধরে রায়দুর্লভ বললেন, ‘করিব সাড়ে বারো লাখ।’
মিরজাফর মরিয়া গলায় বললেন, ‘আপাতত এই টাকা মিটিয়ে দিচ্ছি। বাকি টাকা পাটনা থেকে ফিরে না হয়—’
মিরজাফরকে বাধা দিয়ে ক্লাইভ বলে উঠলেন, ‘না। এখনই পুরো তেইশ লাখ টাকা চায় কোম্পানি। আদার ওয়াইজ আই উইল নট বি অ্যালাউড টু গো টু পাটনা উইথ মাই কনটিনজেন্ট।’
হিসেবের কাগজে ফের ডুব দিলেন রায়দুর্লভ। মিরজাফর বিমর্ষ।
খানিক বাদে হিসেবের কাগজ থেকে মুখ তুলে রায়দুর্লভ বললেন, ‘আপনাদের টাকা মিটিয়ে দেওয়ার একটা তরিকা আছে। আপনি রাজি হবেন কি না জানি না।’
চকিতে রায়দুর্লভের দিকে তাকালেন নবাব।
রায়দুর্লভ বললেন, ‘সাড়ে বারো লাখ টাকা নগদে মিটিয়ে দেওয়া হবে।’
ক্লাইভ বললেন, ‘ওয়েল। বাট দ্য রেস্ট অফ দ্য মানি?’
মিরজাফরের চোখে কৌতূহল। তাকিয়ে আছেন রায়দুর্লভের মুখপানে।
রায়দুর্লভ বললেন, ‘বর্ধমানরাজ তিলকচাঁদ, নদিয়ারাজ কৃষ্ণচন্দ্র ও হুগলির ফৌজদার ওমর বেগের নামে একটা পরোয়ানা নবাব যদি লিখে দেন—’
হাঁ হয়ে গেলেন নবাব।
ক্লাইভ শুধোলেন ‘কীসের পরোয়ানা?’
রায়দুর্লভ বললেন, ‘বর্ধমান, নদীয়া আর হুগলির পৌষ কিস্তির মালগুজারির টাকা মুর্শিদাবাদে না পাঠিয়ে কলকাতা কাউন্সিলের মালখানায় জমা করার হুকুমত। পৌষ কিস্তিতে ওই তিন জায়গা থেকে করিব সাড়ে দশ লাখ টাকা আদায় হওয়ার কথা।’
ক্লাইভ উল্লসিত হয়ে গলা তুলে বললেন, ‘ব্রিলিয়ান্ট। ব্রিলিয়ান্ট আইডিয়া। জাস্ট লাইক পোস্ট ডেটেড চেক। আই থিংক কোম্পানি উইল অ্যাকসেপ্ট দিস প্ল্যান।’
হাসি ফুটল মিরজাফরের মুখে। শেষ পর্যন্ত পাটনা অভিযানের কাঁটা দূর হল।
নবাবের উদ্দেশে ক্লাইভ শুধোলেন, ‘ডু ইউ এগ্রি উইথ দিস প্ল্যান?’
মিরজাফর খুশি গলায় বললেন, ‘সহি উপায় বাতলেছেন দেওয়ানজি। আমি রাজি।’
কুরসি ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে ক্লাইভ বললেন, ‘দ্য মিটিং ইজ ওভার। নাউ লেট আস সেলিব্রেট।’
স্বভাবতই দারুণ খুশি ক্লাইভ। মুর্শিদাবাদের কোষাগারের হালত যে খুব ভালো নয়, তা তিনি বিলক্ষণ জানতেন। এত সহজে যে বকেয়া আদায় হবে এ কথা মোটেই আন্দাজ করেননি তিনি। মনে মনে রায়দুর্লভের বুদ্ধির তারিফ করলেন ক্লাইভ। তুখোড় মাথা লোকটার। এঁকে প্রাপ্য টাকার উপরে পাঁচ পারসেন্ট কমিশন দেওয়াই যায়। ক্লাইভ তাঁর ডান হাতের পাঁচ আঙুল প্রসারিত করে দেখালেন রায়দুর্লভকে। ইঙ্গিতটার অর্থ ঠিকই বুঝলেন দেওয়ান সাহেব। মুচকি হাসলেন।
ভায়োলিনে একের পর এক ক্রিসমাস ক্যারোলের সুর বাজিয়ে চলেছে স্ট্রন। লঘু মেজাজে হাসি ঠাট্টায় মেতেছেন হেস্টিংস, লাশিংটন, ফোর্ড, ওয়ালশ। শ্যাম্পেনের পাত্র হাতে তাদের দিকে এগিয়ে গেলেন ক্লাইভ। এবারে দুই আঙুল তুলে ভিকট্রি চিহ্ন দেখালেন সতীর্থদের। তাঁরা জানতেন যে নবাব ও দেওয়ানকে ডেকে নিয়ে ক্লাইভ তেইশ লাখ টাকার ফয়সালা করতে বসেছেন। এ কাজে তিনি সফল হয়েছেন বুঝে সবাই খুশি। সকলকে নিয়ে আমোদে মেতে উঠলেন ক্লাইভ। ক্যারোলের ছন্দের সঙ্গে নাচের তালে পা মেলাতে লাগলেন।
অদূরে কুরসিতে বসে আছেন মিরজাফর ও রায়দুর্লভ। জাহাঁবাজ ক্লাইভকে এমন লঘু মেজাজে কখনও দেখেননি তারা। জুলজুলে চোখে তারা চেয়ে দেখতে লাগলেন ক্লাইভের কাণ্ডকারখানা।
পাথরের গেলাসে ভাঙের শরবত নিয়ে এগিয়ে এল এক দাখিলা। সঙ্গে নবকৃষ্ণ।
নবকৃষ্ণ মাথা ঝুঁকিয়ে সেলাম ঠুকে বললেন, ‘ভাঙের শরবত হুজুর।’
খুশি হয়ে গেলাস হাতে তুলে নিলেন নবাব। এক চুমুকে উড়িয়ে দিলেন শরবত। ‘থোড়া আউর লে আও।’ ছুটল দাখিলা। নিজে দাঁড়িয়ে থেকে নবাব ও দেওয়ানের আপ্যায়নের দেখভাল করতে লাগলেন নবকৃষ্ণ। বেশ কয়েক গেলাস ভাঙের শরবত পান করে বেশ নেশা চড়ে গেল নবাবের। চোখে সব কিছু রঙিন দেখতে লাগলেন। কুরসি ছেড়ে উঠে টলমলে পায়ে এগিয়ে গেলেন ক্লাইভের দিকে। জড়ানো গলায় বলতে লাগলেন, ‘পা-ট-না! পা-ট-না। রা-ম-না-রা-য়-ণ বুডঢা বেতমিজ। কো-তল করব।’
‘জরুর। নাউ লেট আস সেলিব্রেট দ্য সাকসেস ইন অ্যাডভান্স।’ এই বলে নবাবের হাত ধরে বাজনার ছন্দে পা মেলাতে লাগলেন ক্লাইভ। ভাঙের প্রভাবে নবাবের মেজাজ এখন দারুণ ফুরফুরে। মনের পর্দায় দেখছেন রামনারায়ণের রাশি রাশি দৌলত। টাকা-মোহর-সোনা-হিরে-জহরত। খেরিয়া বোঝাই হয়ে সেসব চলেছে মুর্শিদাবাদ অভিমুখে।
ক্লাইভকে অনুকরণ করে বাজনার তালে পা মেলানোর কোশিশ করে চলেছেন নবাব। হঠাৎই গর্জন করে উঠল তোপ। রাত বারোটা। এসে পড়ল পঁচিশে ডিসেম্বর। প্রভু যিশুর শুভ জন্মদিন। তুমুল কোলাহলে ফেটে পড়ল ইংরেজরা।
সহসা তোপের আওয়াজ শব্দ ও উচ্চকিত হইহুল্লোড়ের শব্দ শুনে ঘাবড়ে গিয়ে বেসামাল হয়ে প্রায় মুখ থুবড়ে পড়ে যাচ্ছিলেন নবাব। ক্লাইভ তাঁকে ধরে ফেলে সামলে নিলেন।
.
