৪৪
প্রকৃত অর্থেই ঘণ্টাখানেক নবাবকে অপেক্ষা করানোর পর কুচকাওয়াজের ময়দান ছেড়ে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য এগিয়ে এলেন ক্লাইভ।
‘ওয়েলকাম হুজুর। ওয়েলকাম টু মাই ক্যাম্প।’ হাসি মুখে সম্ভাষণ করলেন কর্নেল।
ক্লাইভের মনসুবা কী? তা নিয়ে আকাশ-পাতাল ভাবতে ভাবতে গত এক ঘণ্টা সময় বড় উৎকণ্ঠায় কাটিয়েছেন মিরজাফর। কর্নেলের মুখে হাসি দেখে খানিকটা নিশ্চিন্ত হলেন তিনি। কুরসি ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে নবাব বললেন, ‘সেলাম সাহেব। সহি সালামত, খুশ তবিয়ত থাকুন।’
‘প্লিজ সিট। প্লিজ সিট।’ এই বলে নবাবের উলটোদিকে কুরসিতে বসলেন ক্লাইভ। মাথা থেকে তেকোনা টুপিটা খুলে পাশে চৌপাইয়ের উপরে রাখলেন। মহড়ার ধকলে দরদর করে ঘামছেন। ঘাড় অবধি লম্বা চুল বেয়ে জল ঝরছে টপটপ করে।
ক্লাইভ বললেন, ‘আপনার চিঠি আমি ঠিক সময়েই পেয়েছিলাম। আই ওয়াজ অ্যা লিট্ল লেট টু লিভ আফটার ফিনিশিং সাম ওয়ার্ক। গিরিয়া ছেড়ে এগিয়ে এসে আপনি ভালোই করেছেন।’
মিরজাফরের বুক থেকে যেন পাষাণভার নেমে গেল। হাঁফ ছেড়ে তিনি বাঁচলেন। অপেক্ষা না করে ফৌজ নিয়ে রাজমহল চলে আসায় কর্নেল মোটেই তার উপরে বিরক্ত হননি। এই অবধি সাহেব নিজেই যখন চলে এসেছেন তখন নিশ্চয়ই পাটনা যেতে আপত্তি করবেন না—এই ভেবে ভিতরে ভিতরে বেশ পুলকিত হয়ে উঠলেন নবাব।
রুপোর পিরিচে করে কফি নিয়ে এল অর্ডারলি।
ক্লাইভ বললেন, ‘এদিকে ঠান্ডা বড় জবরদস্ত। কফি ওয়ার্মস দ্য বডি।’
‘সহি বাত।’ এই বলে রেকাবি থেকে কফির পিরিচ তুলে নিলেন নবাব।
কফির কাপে চুমুক দিয়ে ক্লাইভ শুধোলেন, ‘পূর্ণিয়ার পয়গাম কী আছে?’
কফির কাপে চুমুক দিয়ে হাসি মুখে নবাব বললেন, ‘আমি আপনাকে খুশখবর শোনাতে পারি। বাগিদের ঢিট করেছে খাদিম হোসেন। পূর্ণিয়া নিয়ে আর কোনও তকলিফ নেই। খাদিমকে আমি পূর্ণিয়ার ফৌজদার পদে বহাল করেছি।’
ক্লাইভ বললেন, ‘দ্যাটস গুড। আই অ্যাম রিলিভড। আফটার স্পেন্ডিং হলিডেজ হিয়ার ফর অ্যা উইক আই উইল গো ব্যাক টু ক্যালকাটা।’
মিরজাফর একটু দমে গিয়ে বললেন, ‘ওয়াপস যেতে চান?’
‘ইয়েস। দেয়ার ইজ নাথিং এলস টু ডু হিয়ার।’
‘পূর্ণিয়ার অচল সিং তো মামুলি এক ইনসান। রামনারায়ণজি খতরনক।’
‘ডু ইউ ওয়ান্ট টু ডিক্লেয়ার ওয়ার এগেইনস্ট হিম?’
‘জি সাহেব। তিনি গদি ছাড়তে নারাজ হন তো আমাকে লড়াই করতেই হবে। আপনি ফৌজ নিয়ে আমার সঙ্গে পাটনায় চলুন।’
কিছুই যেন জানেন না, এমন ভাব করে ক্লাইভ শুধোলেন, ‘রামনারায়ণজির কসুর কী আছে?’
‘আমাকে মুসিবতের মধ্যে ফেলতে চান তিনি। অচল সিং-এর মতো বাগিদের মদত দিয়ে বেচ্যায়েন করছেন বাংলাকে। অযোধ্যার নবাব সুজাউদ্দৌলাকে মদত দিয়ে তাঁর হাতে বাংলার মসনদ তুলে দিতে চান। বুডঢা গদ্দারকে সবক শেখানো দরকার।’
কফি শেষ করে চৌপাইয়ের উপরে পিরিচ নামিয়ে রাখলেন ক্লাইভ। তারপর কোটের পকেট থেকে পাইপটা বের করে ঠোঁটে গুঁজলেন। একজন অর্ডারলি এসে চকমকি পাথর ঠুকে পাইপে আগুন ধরিয়ে দিয়ে গেল। কুরসির গায়ে দেহটাকে এলিয়ে দিলেন ক্লাইভ।
রুদ্ধশ্বাস উৎকণ্ঠায় ক্লাইভের প্রতিক্রিয়ার জন্য অপেক্ষা করছেন মিরজাফর। কেবল নিজের উচ্ছৃঙ্খল বাহিনীর ভরসায় রামনারায়ণের সঙ্গে পাঞ্জা কষতে যাওয়ার সাহস তার নেই। ক্লাইভ যদি পাটনা যেতে রাজি না হন তো তাঁকে রাজমহল থেকে ফিরে যেতে হবে। সে এক ঘোর বেইজ্জতি।
ধোঁয়ার কুণ্ডলী উড়িয়ে সোজা হয়ে বসলেন ক্লাইভ। গম্ভীর মুখে বললেন, ‘আই অ্যাম সরি। ইট ইজ নট পসিবল ফর মি টু গো টু পাটনা।’
নিমেষে চুপসে গেলেন নবাব। গায়েব হয়ে গেল তার খুনজোশি। মুখে জমাট বাঁধল আঁধার। ক্ষণেক ইতস্তত করে শুধোলেন, ‘আপনি নারাজ কেন?’
নবাবের প্রশ্নটা প্রত্যাশিত। এর উত্তরে কী বলবেন সেটা আগে থেকেই ভাবা ছিল ক্লাইভের। বললেন, ‘কোম্পানি উইল নট অ্যালাউ মি টু মুভ অ্যাহেড ফারদার।’
মিরজাফর একেবারে বিস্মিত হয়ে গেলেন। তিনি জানতেন বাংলায় ক্লাইভ মানে কোম্পানি আর কোম্পানি মানে ক্লাইভ। কোনও বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য অন্য কারও মুখপানে তাকিয়ে থাকতে হয় না তাঁকে। তাঁর ইচ্ছাই কোম্পানির ইচ্ছা। এখন যে শুনছেন অন্য কথা।
মিরজাফরের ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া মুখের উপরে ছুরির ফলার মতো ধারাল দৃষ্টি হেনে ক্লাইভ বললেন, ‘এক বাত আপনার বোধহয় ইয়াদ নেই।’
ক্লাইভের এই প্রশ্ন শুনে কেমন যেন থতমত খেয়ে গেলেন মিরজাফর।
‘পলাশির ইকরারনামা মোতাবেক এই নভেম্বরে দ্বিতীয় কিস্তির তেইশ লাখ রুপেয়া মেটানোর কথা ছিল আপনার। সে কথা আপনি রাখেননি। কোম্পানি ওয়ান্ট দ্যাট অ্যামাউন্ট ইমিডিয়েটলি। এই টাকা না পেলে ফৌজ নিয়ে পাটনা যাওয়ার হুকুমত কিছুতেই কোম্পানি আমাকে দেবে না।’ গলায় ক্ষোভের সুর মিশিয়ে কথাগুলো বললেন ক্লাইভ।
চোখে অন্ধকার দেখলেন মিরজাফর খাঁ। নবাবিয়ানা ও নিজামত চালানোর খরচ বাঁচিয়ে রেখে এই মুহূর্তে ইংরেজদের দেওয়ার মতো অত টাকা কোষাগারে নেই বলেই তাঁর ধারণা। এই অর্থ-সংকট থেকে পরিত্রাণ পেতে রামনারায়ণের দৌলত দখলের মনসুবা নিয়ে তিনি পাটনায় যেতে চাইছেন, ওদিকে এখনই ক্লাইভ চাইছেন টাকা।
কাতর মিনতির সুরে নবাব বললেন, ‘কয়েক মাহিনা ইন্তেজার করা যায় না সাহেব?’
‘ইন্তেজার করতে পারে কোম্পানি। লেকিন আপনি এখনই বকেয়া না মেটালে এখান থেকে ফৌজ নিয়ে আমাকে ক্যালকাটায় ফিরে যেতে হবে। কোম্পানি উইল নট অ্যালাউ মি টু মুভ অ্যাহেড ফারদার উইথ মাই কনটিনজেন্ট।’
একেবারে গভীর গাড্ডায় পড়লেন মিরজাফর খাঁ। সত্যিই কি তবে বেইজ্জত হতে হবে? তামাম বাংলার মানুষ জানবে নবাব বুজদিল। একার হিম্মতে রামনারায়ণকে শায়েস্তা করতে পাটনা যাওয়ার মুরোদ তাঁর নেই। ক্লাইভ পাটনা যেতে নারাজ বলে রাজমহল অবধি এগিয়েও ফিরে এলেন নবাব। মিরজাফর খাঁ নালায়েক। ডরপোক। এই আলোচনা চলবে রাজধানীর অলিগলিতে।
নবাবের চিন্তিত মুখটা ভালো করে ইয়াদদস্ত করে ক্লাইভ বললেন, ‘ হোয়াই আর ইউ থিংকিং সো মাচ? আপনি ইমানদার আদমি। প্রমিজ করেছিলেন সহি ওয়াক্তে কিস্তির টাকা আপনি মিটিয়ে দেবেন। এখনও যদি মিটিয়ে দেন তো আই হ্যাভ নো প্রবলেম গোইং টু পাটনা ইফ কোম্পানিজ ডিম্যান্ড ইজ সেটলড।’
হতাশ গলায় মিরজাফর বললেন, ‘আভি আপনাদের দাবি মেটানোর মতো রুপেয়া তোশাখানায় আছে কি না আমার জানা নেই। দেওয়ান সাহেব বলতে পারবেন।’
‘বেশ তো, দেওয়ান সাহেবকে তলব করুন এখানে।’
‘তলব করতেই পারি, তবে দেওয়ান সাহেব সেই হুকুমত ইনকার করতে পারেন।’
দেওয়ানের সঙ্গে নবাবের সম্পর্কে যে চিড় ধরেছে সে কথা ভালো করেই জানেন ক্লাইভ। তবুও, কিছুই না জানার ভান করে তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘নবাবের হুকুম দেওয়ান তামিল করবেন না? হোয়াট আর ইউ সেয়িং? নিজামত চলছে কি করে?’
‘দেওয়ানকে বরখাস্ত করতে চাই আমি।’ গম্ভীর গলায় বললেন নবাব।
প্রমাদ গুণলেন ক্লাইভ। পলাশির সুলেনামার বিষয়ে বিস্তারিত জানেন রায়দুর্লভ। তাছাড়া ইংরেজদের সঙ্গে তার সম্পর্ক ইদানীং খুবই মধুর। এখন নবাব যদি দেওয়ানকে বরখাস্ত করার মতলব আঁটেন তো খুবই বিপদের কথা। রায়দুর্লভ দেওয়ানের পদ থেকে সরে গেলে যিনি দেওয়ান হবেন তাঁর কাছ থেকে হকের টাকা বুঝে নিতে তকলিফ হতে পারে কোম্পানির।
কোনও রাখঢাক না করে ক্লাইভের সমুখে বিষ উগরে দিয়ে মিরজাফর ফের বললেন, ‘দেওয়ান বেইমানি করছেন আমার সঙ্গে। ইদানীং আমার কোনও কথাই মানছেন না। সময়মতো ফৌজিদের মাহিনা চোকাচ্ছেন না। আমাকে তকলিফের মধ্যে পড়তে হচ্ছে। দেওয়ান দরবারে আসেন না। টাকাকড়ির হিসেব দাখিল করেন না। তার উপরে অচল সিং, রামনারায়ণকে মদত দিচ্ছেন।’
এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে থামলেন নবাব।
ক্লাইভ বুঝলেন দু’জনের মধ্যে গোলমাল বেশ ভালোই পেকে উঠেছে। একদিক থেকে মনে মনে খুশিই হলেন তিনি। নিজামতের মাতব্বরেরা যত কোন্দল করবেন নিজেদের মধ্যে তত দুর্বল হবেন নবাব। তাতে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করতে সুবিধা কোম্পানিরই।
আপাতত সুকৌশলে কিস্তির বকেয়া টাকাটা আদায় করতে চান ক্লাইভ। তিনি শুধোলেন, ‘ডু ইউ হ্যাভ এনি এভিডেন্স টু সাপোর্ট হোয়াট ইউ আর সেয়িং?’
ক্ষুব্ধ কণ্ঠে মিরজাফর বললেন, ‘সাবুৎ? আমি সহি বাত বলছি।’
ক্লাইভ নরম গলায় বললেন, ‘জানি, আপনি ইমানদার আদমি। লেকিন কোনও সাবুৎ ছাড়া তো দেওয়ানের উপরে এমন গহেরা ইলজাম আনা সহি কাম হবে না।’
মুখ গম্ভীর হল মিরজাফরের।
ক্লাইভ বললেন, ‘আপনি, দেওয়ান সাহেব, জগৎশেঠজি ইনকিলাব চেয়েছিলেন। তাই আমরা মদত দিয়েছি আপনাদের। সিরাজদ্দৌলাকে হটিয়ে আপনি মসনদে বসেছেন। এখন আপনারা যদি নিজেদের মধ্যে কাজিয়া বাঁধান, দেন হু উইল টেক কেয়ার অফ দ্য পিপল? হোয়্যার ডু উই গো? উই হ্যাভ কাম টু ডু ট্রেড উইথ ইওর ট্রাস্ট।’
ক্লাইভের কথার প্যাঁচে নাজেহাল অবস্থা নবাবের। হতাশ গলায় বললেন, ‘সহি বাত। আপনাদের সকলকে সহি সালামত রাখার দায় আমার। লেকিন…’
‘লেকিন কোম্পানি সহি সালামত থাকে কী করে? তেইশ লাখ রুপেয়া নিজামতের কাছ থেকে আমাদের পাওনা। কোনও জুলুমবাজি নয়। পলাশির সুলেনামায় লেখা আছে। আপনার ও দেওয়ানের দস্তখত আছে তাতে। আপনি কি দেওয়ানের সঙ্গে কাজিয়ার অজুহাত দিয়ে সব জিম্মেদারি কাঁধ থেকে ঝেড়ে ফেলতে চাইছেন?’
ক্লাইভের গলার স্বর একটু বেশি রকমের রুক্ষ শোনাল মিরজাফরের কানে। ঘাবড়ে গিয়ে জোড়হস্ত হয়ে তিনি বললেন, ‘আমার উপরে গলত ইলজাম আনবেন না সাহেব। আপনাদের হকের টাকা মেটাব না, এমন মনসুবা আমার নেই।’
ধূর্ত রবার্ট ক্লাইভ জানেন এই পরিস্থিতিতে মাথা গরম করলে চলে না। নরমে-গরমে, অনুনয়ে-ধমকে নবাবকে মুঠোর মধ্যে রেখে, সুতো দিয়ে খুশি মতো নাচিয়ে টাকা আদায়ই আসল কথা। কৌশলে তিনি তুখোড়। নিমেষে গলার স্বর কয়েক পর্দা নামিয়ে বললেন, ‘গোস্তাকি মাফ করবেন হুজুর। আই অ্যাম সরি ইফ মাই ওয়ার্ডস হার্ট ইউ। আমার উপর কোম্পানির চাপ যে কতটা সেটা নিশ্চয়ই আন্দাজ পাচ্ছেন। লড়াই তো কোম্পানির অনেকেই চায়নি। আমার কথাতেই তো গোরা পল্টন পলাশির ময়দানে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল।’
আবেগতাড়িত হয়ে ক্লাইভের হাতদুটো ধরে মিরজাফর বললেন, ‘আপনি আমার দোস্ত। আপনার কথায় কিছু মনে করিনি আমি।’
ক্লাইভ বললেন, ‘ইউ মাস্ট আন্ডারস্ট্যান্ড দ্যাট ইফ কোম্পানি ডাজ নট গেট দ্য মানি দেন দ্য রেসপনসিবিলিটি উইল ফল অন মি।’
‘আল্লার নামে কসম খেয়ে বিলকুল সচ বলছি—তোশাখানার আখবরাত আমি জানি না।’
ক্লাইভ মোলায়েম গলায় বললেন, ‘আপনি দেওয়ানকে এখানে তলব করুন। ইস্যু অ্যান অর্ডার টু প্রেসেন্ট দ্য অ্যাকাউন্ট বিফোর ইউ। দেন সেটল দ্য ম্যাটার।’
মিরজাফর খানিকটা নিমরাজি হয়ে বললেন, ‘বেশ আমি চিঠি লিখে দিচ্ছি।’
উঠে দাড়ালেন ক্লাইভ। কুরসি ছেড়ে উঠলেন মিরজাফরও।
দূরে দাঁড়িয়ে আছে হাতি। বিমর্ষ মুখে সেদিকে এগিয়ে চললেন নবাব। খানিক দূরে দাঁড়িয়ে রয়েছেন মিরকাজিম ও গোবিন্দমল্ল। নবাবের বিরস মুখটা দেখে মিরকাজিমের বুকের ভিতরটা ছাঁৎ করে উঠল। সেবার তার পাটনার গদিতে বসার খোয়াব বরবাদ হয়েছিল আয়ারকুটের জন্য। এবারে কি কর্নেল ক্লাইভের জন্য ফির একবার তা বরবাদ হতে চলেছে? পাটনা অভিযানের পরিকল্পনা কর্নেল কি নাকচ করে দিলেন? মিরকাজিম জানেন ক্লাইভ আপত্তি করলে পাটনার পথে আর এক পা’ও এগোবেন না নবাব। মনোবাসনা পণ্ড হওয়ার আন্দেশায় নিজের সহোদরের উদ্দেশে মনে মনে বিষোদ্গার করতে লাগলেন মিরকাজিম—‘আপনি বুজদিল! আহাম্মক! বেওকুফ! সাধে কি মির্জা শামসুদ্দিন আপনাকে বলে কর্নেল ক্লাইভের মদ্দা গর্ধভ!’
নবাবের পাশে হাঁটতে হাঁটতে ক্লাইভ বললেন, ‘এই ভালো হল হুজুর। আমি জানি, আপনার চিঠি পেলে এখানে ছুটে আসবেন দেওয়ান। আপনার হুকুমত ইনকার করার হিম্মত তাঁর হবে না।’
হাতির পাশে এসে দাঁড়ালেন মিরজাফর খাঁ। প্রস্তুত দেহরক্ষীরা। প্রস্তুত মাহুত।
তসলিম জানালেন ক্লাইভ। হাতির পিঠে চেপে বসলেন নবাব। কিছুক্ষণের মধ্যেই নবাবের ক্ষুদ্র বাহিনী পথের বাঁকে অদৃশ্য হয়ে গেল।
নবাবের প্রস্থান পথের দিকে তাকিয়ে ক্লাইভ মুচকি হাসলেন। এগিয়ে এলেন নবকৃষ্ণ।
ক্লাইভ শুধোলেন, ‘কী বুঝছ মুনশি?’
‘নবাবের চিঠি পেয়ে দেওয়ান ছুটে আসবেন?’ পালটা শুধোলেন নবকৃষ্ণ।
‘আসবে না বলছ?’
‘আসবে কি? শুনেছি দেওয়ান তার হাভেলিতে হামলার পর থেকে কনফাইন্ড হিমসেলফ ইন দ্য প্যালেস। গুপ্তঘাতকদের হাতে খুন হওয়ার ভয়ে কাঁটা হয়ে আছেন।’
‘জানি। স্ক্র্যাফটন লিখেছিল।’
‘তাহলে?’
‘পরের চালটাও আমার ভাবা আছে মুনশি। ক্যাম্পে চলো। চিঠির মুসাবিদা করতে হবে।’
ক্লাইভে অভিসন্ধির আন্দাজ পেতে কামানো মাথায় হাত বোলাতে লাগলেন নবকৃষ্ণ।
তাঁবুতে ফিরে এসে দ্রুত একটা চিঠি লিখে ফারসিতে তর্জমার জন্য নবকৃষ্ণের হাতে তুলে দিলেন ক্লাইভ। চিঠিটা রায়দুর্লভের উদ্দেশে লেখা। ক্লাইভ লিখলেন ‘…দেওয়ানজি আশা করি সহি সালামত, খুশ তবিয়ত আছেন। আমার চিঠি পাওয়ার পরপরই হয়তো নবাবের একটা চিঠি পাবেন আপনি। দেওয়ানখানার টাকাকড়ির হিসেব-খতেন নিয়ে তুরন্ত একবার রাজমহলে আসার জন্য আপনার উপরে হুকুম করবেন নবাব। ভয় নেই। এ পরামর্শ আমিই তাঁকে দিয়েছি। আমিও চাই আপনি দ্রুত একবার রাজমহলে আসুন। আমি স্ক্র্যাফটন সাহেবকে লিখে দিচ্ছি—পথে ফর দ্য সেক অফ ইওর সিকিউরিটি বেশ কিছু ফৌজিকে আপনার সঙ্গে সে পাঠিয়ে দেবে। আমাদের পাওনা তেইশ লাখ টাকা কী করে মেটানো যায় তার একটা ডেফিনিট প্ল্যান নিয়ে আসবেন। এ থেকে মুনাফা তো আপনারও হবে। ফাইভ পারসেন্ট কমিশন…’
ক্লাইভের চিঠি ও তেইশ লাখের ফাইভ পারসেন্ট কত হয়, হিসেব করে রায়দুর্লভের ভয়ডর ছুটে গেল। কয়েকদিনের মধ্যেই নবাবের চিঠি এসে পড়ল দেওয়ানের হাতে। যথাসময়ে জনা পঞ্চাশ গোরা পল্টন ও নিজের দেহরক্ষীদের কড়া পাহারায় নায়েব নন্দকুমারকে সঙ্গে নিয়ে তিনি রাজমহলে এসে পৌঁছলেন।
ইংরেজ শিবিরের পাশেই ছাউনি ফেললেন রায়দুর্লভ।
দেওয়ান এলেন কিন্তু নবাবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলেন না। ওদিকে দেওয়ানকে ডেকে বাতচিত করার কোনও আগ্রহও দেখালেন না নবাব। দু’জনের সম্পর্কটা যে একেবারে বিষিয়ে গিয়েছে, তার প্রত্যক্ষ সাবুৎ পেলেন ক্লাইভ। এতদিন তিনি স্ক্র্যাফটনের মুখ থেকে এ বিষয়ে নানা কথা শুনে আসছিলেন। দুজনের সম্পর্কের যে এতটা অবনতি হয়েছে তা আন্দাজ করতে পারেননি। তিনি ভাবনায় পড়লেন। দুই মাথা এক না হলে ইংরেজদের বকেয়া আদায় করা কঠিন। হঠাৎই ধূর্ত ক্লাইভের মাথায় একটা বুদ্ধি এল। ডিনারের দাওয়াত পাঠালেন নবাবকে।
.
