1 of 2

পলাশির পরে – ৪৩

৪৩

গিরিয়ায় এসে ক্লাইভের মুখ গম্ভীর হল। পড়ে আছে ধু-ধু শূন্য প্রান্তর। অপরিষ্কার হয়ে আছে গোটা ময়দান। জায়গায় জায়গায় গর্তের মধ্যে পড়ে আছে পোড়া ছাই। তার চারপাশের ঘাস পুড়ে ঝামাকালো হয়ে আছে। বোঝাই যাচ্ছে এগুলো চুলা জ্বালানোর সাবুৎ। জায়গায় জায়গায় ছড়িয়ে রয়েছে হাতি-ঘোড়ার মল, আবর্জনা। বাতাসে উড়ছে এঁটো শালপাতা।

ক্লাইভ বুঝলেন, কিছুদিন আগে এখানে নবাবের ছাউনি পড়েছিল। নিশ্চয়ই তিনি তাঁবু গুটিয়ে আরও সামনে এগিয়ে গিয়েছেন। স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথাবার্তা বলে নবকৃষ্ণ শুনলেন, নবাব রাজমহলের দিকে গিয়েছেন।

ক্লাইভ গম্ভীর মুখে বললেন, ‘লেট আস মুভ অ্যাহেড।’

কয়েকদিন পরে ফৌজ নিয়ে রাজমহলে এসে পৌছলেন ক্লাইভ। গিরিয়ায় অপেক্ষা করার কথা লিখেও, নবাব এগিয়ে রাজমহল অবধি চলে আসায় তিনি যে বেশ বিরক্ত হয়েছেন সেটা বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য নবাবের ছাউনি থেকে মাইল খানেক দূরে ছাউনি ফেলার হুকুম দিলেন।

ক্রমশ মরে আসছে দিনের আলো। টকটকে লাল রঙের সূর্যটা খানিকবাদে হারিয়ে যাবে পাহাড়ের আড়ালে। টিলার উপরে নিজের তাঁবুর সামনে একাকী দাঁড়িয়ে রয়েছেন ক্লাইভ। ঠোঁটে গোঁজা রয়েছে পাইপ। দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন দূরে। যতদূর চোখ যায় গাছপালা আর বুনো ঝোপে ঢাকা ধু-ধু প্রান্তর! কালচে রং ধরেছে সবুজের গায়ে। কুয়াশা নামছে। দূরের সবুজ কুয়াশায় ইতিমধ্যেই ঝাপসা হয়ে এসেছে। অনেকটা দূরে দেখা যাচ্ছে শাদা ফিতের মতো ছাইরঙা গঙ্গা।

নদীর দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে ক্লাইভের মনে পড়ে গেল অতীতের কথা। দেখতে দেখতে একটা বছর কেটে গেল এই বাংলায়। এই তো সেদিন—গত বছর ঠিক এই সময়ে তিনি ফৌজ নিয়ে পৌঁছেছিলেন ফলতায়। তারপরে কত কাণ্ড ঘটে গেল গত কয়েক মাসে। সামনের কয়েকটা বছর বাংলার রাজনীতিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আরও অনেক কিছু ঘটবে। তার ফায়দা তোলার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে ইংরেজদের।

ভবিষ্যতের ঘটনাপ্রবাহের অবয়ব যেন ক্লাইভের চোখে ক্রমশ যেন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। গোটা হিন্দুস্তানকে ইংরেজ অধিকারে নিয়ে আসা খুব কঠিন কাজ নয়। ইদানীং এরকম একটা দুঃসাহসিক ভাবনা উঁকি দিচ্ছে তাঁর মনে। ইংরেজদের মুঠোর মধ্যে গোটা একটা দেশ। ঐশ্বর্যে ভরপুর হিন্দুস্তান। ক্লাইভের চোখদুটো লোভে চকচক করে ওঠে।

এখন শুধু প্রয়োজন সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ। আরও সৈন্য চাই। সঙ্গে যে পরিমাণ সৈন্য রয়েছে তা দিয়ে হিন্দুস্তান কবজা করা যাবে না। এ কথাটা বোঝাতে হবে লন্ডনের বড় সাহেবদের। একদল দক্ষ সৈন্য ও কয়েকজন সাহসী উদ্যোগী অফিসারকে পাঠালে এ দেশে ইংরেজ অধিকার কায়েম করা খুব একটা কঠিন কাজ হবে না। তারপর খুশিমতো দৌলত লুঠে নেওয়া যাবে। এই প্রস্তাব নিয়ে বড় সাহেবদের কাছে দরবার করার জন্য একবার লন্ডনে যেতে চান ক্লাইভ। তবে সে সময় এখনও আসেনি। আপাতত ঘটনাপ্রবাহের উপরে তিনি কড়া নজর রাখতে চান।

.

জানালার চিলমন পর্দার ফাঁক দিয়ে ভোরের প্রথম আলো এসে পড়েছে তাঁবুর অন্দরে। সবে ঘুম ভেঙেছে নবাবের। সহসা চমকে উঠলেন তিনি।

গুড়ুম! গুড়ুম! গুড়ুম!

দূর থেকে ভেসে আসছে কামানের গর্জন। ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসলেন মিরজাফর খাঁ। নিমেষে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল তার চোখেমুখে। বিস্ফারিত হয়ে উঠল চোখদুটো। এই সাতসকালে তোপ দাগছে কারা? নবাবের মনে পড়ে গেল এ বছরের গোড়ার দিকের এক ভয়ানক স্মৃতি।

৫ ফেব্রুয়ারি, ১৭৫৭। সেদিন কলকাতায় ঘন কুয়াশার চাদরে মোড়া ভোরে এভাবেই কামানের শব্দে ঘুম ভেঙেছিল মিরজাফরের। হালসিবাগানে উমিচাঁদের বাগানবাড়ি প্রাঙ্গণে নবাব সিরাজদ্দৌলার ছাউনিতে অতর্কিতে আক্রমণ চালিয়েছিলেন রবার্ট ক্লাইভ। সিপাহসালার মিরজাফর খাঁর তাঁবু ফুড়ে বেরিয়ে গিয়েছিল কামানের একটা গোলা। প্রবল ত্রাসে প্রায় অর্ধনগ্ন অবস্থায় তাঁবু ছেড়ে বেরিয়ে এসে দিগভ্রান্ত হয়ে ছুটেছিলেন মিরজাফর। কুয়াশার আড়ালের ওপার থেকে ভেসে আসছিল ইংরেজদের চিৎকার। ‘অ্যাটাক! অ্যাটাক! ডেস্ট্রয় দ্য এনিমি।’

আজ নিজের তাঁবুটা অক্ষত দেখে সাময়িক স্বস্তি পেলেন মিরজাফর। মানুষের চিৎকার চেঁচামেচি, কোলাহল অবশ্য শোনা যাচ্ছে না। পোশাকাশাক সামলে ছুটে বাইরে বেরিয়ে এসে নবাব নিশ্চিন্ত হলেন। না, কেউ তাঁর ছাউনির উপরে হামলা করেনি। কামানের শব্দ ভেসে আসছে দূর থেকে। শীতের বাতাস দূরের শব্দকে অনেক কাছে টেনে আনছে। তাই মনে হচ্ছে যেন দুশমন একেবারে দুয়ারে এসে হাজির হয়েছে।

সমানে গর্জন করছে তোপ। গুড়ুম! গুড়ুম! গুড়ুম!

রাজমহলের এই আইরান প্রান্তরে তোপ দাগছে কারা?

আতঙ্ক ছড়িয়েছে নবাবের গোটা শিবিরে। অনেকেই তাঁবু ছেড়ে বেরিয়ে এসে তোপগর্জনের উৎস খোঁজার চেষ্টা করছে। ছোট একটা টিলার উপরে দাঁড়িয়ে মিরজাফর দেখলেন দূর থেকে তিরবেগে ছুটে আসছে একজন ঘোড়সওয়ার। দূরবিনে চোখ রেখে দেখলেন, গোবিন্দমল্ল। তাঁরই কাসিদ বাহিনীর দলপতি।

টিলার ঢাল বেয়ে উঠে এসে নবাবের তাঁবুর সামনে ঘোড়া থেকে নামলেন গোবিন্দমল্ল। তাঁর মুখে অবশ্য শঙ্কার ছাপ নেই। ঠোঁটের কোণে লেগে আছে মৃদু হাসি।

ব্যস্ত হয়ে নবাব প্রশ্ন করলেন, ‘কী পয়গাম? তোপ দাগছে কারা?’

গোবিন্দমল্ল বলে, ‘চিন্তার কিছু নেই হুজুর। তোপ দাগছে গোরা পল্টন।’

প্রবল বিস্ময়ের সঙ্গে মিরজাফর প্রশ্ন করেন, ‘গোরা পল্টন?’

‘জি হুজুর। কর্নেল ক্লাইভ ফৌজ নিয়ে এসে পড়েছেন।’

‘কর্নেল ক্লাইভ!’ বিস্ময়ে স্বগতোক্তির মতো কথাটা আওড়ালেন মিরজাফর।

গোবিন্দমল্ল বলে, ‘জি হুজুর। ক্লাইভ সাহেব তাঁবু গেড়েছেন এখান থেকে মাইল খানেক দূরে।’

রাজমহলে পৌঁছেও নবাবের সঙ্গে মোলাকাত না করে খানিক দূরে তাঁবু ফেলার অর্থ হাতড়াতে থাকেন মিরজাফর খাঁ। মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে আরও অনেক প্রশ্ন। ক্লাইভ পৌঁছে গেলেন রাজমহলে। কোনও আগাম খবর পাঠালেন না কেন? এখানে এসে প্রথমেই নবাবের সঙ্গে সাক্ষাৎই বা করলেন না কেন? কী তাঁর মনসুবা?

নবাবের চিন্তিত মুখের দিকে চেয়ে গোবিন্দমল্ল বললেন, ‘ভাবনার কিছু নেই হুজুর। গোরা পল্টনেরা মহড়া দিচ্ছে মাঠে। তোপের পাল্লা পরখ করছে।’

শশব্যস্ত হয়ে তাঁবুর অন্দরে প্রবেশ করেন মিরজাফর।

নবাবের হাতিকে তাঁবুর সামনে এনে দাঁড় করাল মাহুত।

খানিকবাদে দরবারি পোশাকাশাকে সজ্জিত হয়ে অন্দর থেকে বেরিয়ে এলেন মিরজাফর খাঁ। দ্রুত চড়ে বসলেন হাতির পিঠে। ক্লাইভের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য তিনি ব্যস্ত। নবাবের সঙ্গী গোবিন্দমল্ল, মিরকাজিম ও পঁচিশজন দেহরক্ষী।

.

ইংরেজদের ছাউনির কাছে এসে চমকে গেলেন নবাব। খোলা বিস্তীর্ণ মাঠে দুপক্ষে ভাগ হয়ে যুদ্ধের মহড়া দিচ্ছে ক্লাইভের ফৌজ। দূরে একটা টিলার গায়ে তোপ দাগছে গোলন্দাজরা। তোপের পাল্লা পরীক্ষার এই ধকল সইতে গিয়ে পাহাড়ের সবুজ উপড়ে গিয়ে মাটি বেরিয়ে পড়েছে।

মাঠের আরেকদিকে কামানের সঙ্গে সমানে গজরাচ্ছে ফ্লিন্টলক রাইফেল। চাঁদমারি করছে অন্য একদল সৈন্য। গোরা পল্টনদের মহড়া দেখে মিরজাফরের হাড়হিম হয়ে গেল। সাধারণত কোনও বড় লড়াইয়ের আগে এমন কঠোর অনুশীলন করে নিজেদের প্রস্তুত করে ফৌজিরা। মিরজাফর দেখলেন, মাঠের একেবারে মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন ক্লাইভ। গভীর মনোযোগের সঙ্গে মহড়া পর্যবেক্ষণ করছেন।

দূর থেকে নবাবকে দেখতে পেলেন ক্লাইভ, তবে তাঁর উপস্থিতিকে আলাদা করে কোনও গুরুত্ব দিলেন না কর্নেল। রাইফেল হাতে নিজের নিশানা পরখের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।

হাতির পিঠ থেকে নেমে এলেন নবাব।

নবকৃষ্ণ তসলিম জানিয়ে বললেন, ‘সেলাম হুজুর। সহি সালামত। খুশ তবিয়ত থাকুন।’

নবাব প্রশ্ন করলেন, ‘কখন পৌঁছলেন কর্নেল?’

‘গতকাল অপরাহ্নে।’

সামান্য ইতস্তত করে মিরজাফর বললেন, ‘পূর্ণিয়ায় জবরদস্ত লড়াইয়ের খবর পেয়ে গিরিয়া ছেড়ে আমি এগিয়ে এসেছিলাম। কর্নেলের গুসসা হয়নি তো?’

নবাবের ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া ভীত মুখটা দেখে মজা পেলেন নবকৃষ্ণ। মুখে বললেন, ‘কর্নেল সাহেব আপনার জিগরিদোস্ত। তিনি কি আপনার উপর গোঁসা করতে পারেন?’

গোলামেরা কয়েকখানা কুরসি নিয়ে এল।

নবকৃষ্ণ বললেন, ‘আপনারা বসুন। আপনার আগমন সংবাদ সাহেবকে জানিয়ে আসি।’

গোরা পল্টনদের কুচকাওয়াজ দেখে ত্রাসে বাক্যিহারা হয়ে গিয়েছেন মিরকাজিম।

গোবিন্দমল্ল কিছুটা স্বাভাবিক।

নবকৃষ্ণকে ডেকে মিরজাফর বললেন, ‘এক বাত মুনশিজি!’

মাঠের দিকে যাওয়ার জন্য উদ্যত নবকৃষ্ণ ঘুরে তাকালেন। ‘মুনশিজি’—কথাটা বড় মধুর শোনাল নবকৃষ্ণের কানে। নবাব তো দূরের কথা কোম্পানির সামান্য চাকুরে বলে এতকাল মুর্শিদাবাদ দরবারের সামান্য ওমরাহরাও তাঁকে উপেক্ষা করেছে, তাচ্ছিল্য করেছে। আর আজ? স্বয়ং সুবে বাংলার নবাব খাতির করে মুনশিজি বলে সম্বোধন করছেন তাঁকে! এসবই সম্ভব হয়েছে ক্লাইভ সাহেবের জন্য। তাঁর দাপটে তটস্থ নবাব। তাই এই অপ্রত্যাশিত সম্ভাষণ। ক্লাইভের উপরে নবকৃষ্ণর প্রভাব যে কতখানি, তা অনেকেই জানে।

নবাব খোশামোদের সুরে বললেন, ‘বড়িয়া কুচকাওয়াজ। বড়িয়া কসরত।’

‘যা বলেছেন হুজুর।’

‘কর্নেল সাহেবের ফৌজকে আমি দশ হাজার রুপেয়া ইনাম দেব।’

‘বহুত খুব। কর্নেল খুশি হবেন।’ এই বলে মাঠের অন্দরে প্রবেশ করলেন নবকৃষ্ণ। ‘ক্লাইভের কাছে গিয়ে বললেন, ‘আপনার মদ্দা গর্ধভটা এসে পড়েছে হুজুর।’

বন্দুকের ট্রিগার টিপতে গিয়ে নজর ঘুরিয়ে চকিতে নবকৃষ্ণের মুখের দিকে চাইলেন ক্লাইভ। ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি।

নবকৃষ্ণ চাপা গলায় বললেন, ‘ফৌজিদের মহড়া দেখে বেজায় ঘাবড়ে গিয়েছেন। বোধহয় ভাবছেন মসনদ এই রাজমহলেই বেহাত হয়ে গেল।’

ট্রিগার টিপলেন ক্লাইভ। ঝিং শব্দে বুলেট গিয়ে ধাক্কা খেল দূরে চাঁদমারির জন্য খাড়া করে রাখা লোহার দণ্ডে। নিখুঁত নিশানা।

‘আপনাকে খুশি করার জন্য দশ হাজার টাকা ফৌজিদের মধ্যে বিলিয়ে দিতে চাইছেন।’

‘ভেরি গুড।’

‘এখন আপনি সাক্ষাৎ করবেন কি?’

‘ঘণ্টাখানেক বসিয়ে রাখি। দহসত আরও জবরদস্ত হবে। কী বল?’

‘যেমন আপনার খায়েশ।’ এই বলে ক্লাইভের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নবাবের সম্মুখে এসে নবকৃষ্ণ বললেন, ‘একটু অপেক্ষা করুন। কর্নেল কাজ সেরে আসছেন।’

অগত্যা মাঠের ধারে অপেক্ষা করতে বাধ্য হলেন মিরজাফর খাঁ। ভেবেছিলেন কর্নেলের হাতেই সিক্কা টাকায় ভরা চামড়ার খেরিয়াগুলো তুলে দেবেন। মত বদলে নবকৃষ্ণর হাতে টাকার খেরিয়াগুলো তুলে দিয়ে হাসি হাসি মুখ করে বললেন, ‘ইনাম। দশ হাজার রুপেয়া।’

মাথা ঝুঁকিয়ে নবাবকে ফের তসলিম জানালেন নবকৃষ্ণ।

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *