1 of 2

পলাশির পরে – ৪০

৪০

রাজবল্লভ যা বললেন, তা যেন ঠিক বিশ্বাস করতে পারছে না মিরন। বিস্ফারিত চোখে সে শুধোল, ‘আপনি যা বলছেন সব সত্যি?’

রাজবল্লভ সম্মতিসূচক মাথা নেড়ে বললেন, ‘জি হুজুর। আপনাকে গলত বাত বলব কেন?’

তবুও যেন একিন হয় না মিরনের। ফের শুধোয়, ‘চুনিলাল ও মুন্নিলালের মওত হয়েছে?

সম্মতিসূচক মাথা নেড়ে রাজবল্লভ বললেন, ‘জি হুজুর। কাসিদ খবর এনেছে।’

কক্ষে প্রবেশ করে কাদির। মুখে ভয়ের ছাপ। ‘হুজুর!’

‘হুয়া কেয়া?’ কাদিরকে ইয়াদদস্ত করে বিরক্তির সঙ্গে শুধোয় মিরন।

‘চুনিলাল ও মুন্নিলালের লাশ নিয়ে এসেছে কোতোয়ালির সেপাইরা।’

কাদিরের উপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে হাতের ইশারায় তাকে চলে যেতে বলে মিরন। তার দেহভঙ্গিতে হতোদ্যম ভাবটা প্রকট হয়ে উঠেছে। ঝুলে পড়েছে কাঁধ। ঝুলে পড়েছে নীচের ঠোঁট। গায়েব স্বভাবসুলভ খুনজোশি। সত্যিই সে বিস্মিত। স্তম্ভিত। মির্জা মেহেদির মওতকে ঘিরে কয়েক ঘড়ি সময়ের মধ্যে রাজধানীর হাওয়া যে এমন গরম হয়ে উঠবে, তা সে কল্পনাও করতে পারেনি।

খতম হয়েছে দুশমন। বরবাদ হয়ে গিয়েছে দেওয়ান রায়দুর্লভের মনসুবা। মির্জা মেহেদি জিন্দা নেই। কর্নেল ক্লাইভ ফৌজ নিয়ে এলেও ইনকিলাব হবে না। এই ভেবে ভোর রাতে চেহেল সেতুন থেকে ফিরে ঘুমিয়ে পড়েছিল মিরন। এমন আরামের ঘুম সে অনেকদিন ঘুমোয়নি।

কিন্তু এর মধ্যে ঘটে গেল এত কাণ্ড! বেহুদা, একদল আনপঢ় আম-আদমি-নিজামতের চাবুক হজম করার জন্য যারা পয়দা হয়, জিন্দেগিভর জুলমাতের শিকার হয়েও ইনসাফ না চেয়ে যারা চিরকাল নিজের বদ-কিসমতিকে জিগরপস্তানির জন্য দোষারোপ করে, তারা কিনা নবাবজাদার দুই ইয়ারদোস্তের গায়ে হাত ওঠাল? খুন করল? নবাবের গুমানির ইয়াদগার চেহেল সেতুনের উপর এরা পাথর ছুড়ে মারছে? নবাবজাদার উপরে নফরতি? কেরাহিয়াত?

প্রবল আক্রোশে ফুঁসতে লাগল মিরন। তার হতচকিত চোখদুটো ধীরে ধীরে ভয়ানক হিংস্র হয়ে উঠল। সহসা তার সব রাগ গিয়ে পড়ল দেওয়ান রাজবল্লভের উপরে। গর্জন করে উঠল মিরন, ‘কী করছিলেন আপনি? আমাকে বেইজ্জত করার জন্যই কি দেওয়ান হয়েছেন?’

ভয়ে কেঁপে উঠে রাজবল্লভ বলেন, ‘হুজুর আমার কসুর কী? খবরটা শুনেই তো আমি ছুটে এসেছি। আপনার প্যালেসের চারিদিকে ফৌজ মোতায়েন করেছি। মির্জা মেহেদিকে খতম করার মনসুবা তো আমার জানা ছিল না। জানলে আগে থেকে হুঁশিয়ার হতাম।’

‘খামোশ। ফৌজ, তোপ হাতি, ঘোড়া, বন্দুকচি, ধানুকি–স্রেফ কিছু বেহুদা ইনসানের মোকাবিলা করার জন্য? নবাবজাদা নালায়েক? বুজদিল?’

‘এছাড়া আর কী করার ছিল হুজুর? আপনাকে সালামত রাখার জন্য জাফরাগঞ্জকে ঘিরে ফৌজ মোতায়েন করা ছাড়া তখন কী আর করতে পারতাম আমি?’

কিছু একটা বলতে গিয়ে থমকে গেল মিরন। উত্তেজনায় পায়চারি করতে লাগল।

রাজবল্লভ বললেন, ‘মির্জা মেহেদির লাশ চেহেল সেতুনের অন্দরে এখনও পড়ে আছে।’

থমকে দাঁড়িয়ে মিরন শুধোল, ‘সে কী? কেল্লার অন্দরেই তো দাফনের হুকুম ছিল।’

‘আমআদমি কেল্লা ঘিরে ধরেছিল। লাশ ফেলে পালায় চুনিলাল ও মুন্নিলাল।’

‘গ্রেফতার হয়েছে?’

‘কার কথা বলছেন?’ প্রশ্ন করেন রাজবল্লভ।

‘চুনিলাল ও মুন্নিলালের খুনিয়ারালোগ গ্রেফতার হয়নি?’

রাজবল্লভ জবাব দেন, ‘কে গ্রেফতার করবে? পালিয়ে গিয়েছে কোতোয়ালির সেপাইরা।’

‘সব শালা ডরপোক—বুজদিল কাঁহিকা।’

এই বলে পায়চারি করতে করতে প্রবল উত্তেজনায় ফের চেঁচিয়ে ওঠে মিরন। ‘বেইজ্জতি! ঘোর বেইজ্জতি! কভি বরদাস্ত করব না আমি।’

মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকেন রাজবল্লভ।

মিরন ফের গর্জন করে, ‘আমলোগের ইতনা হিম্মত হয় কী করে? এদের মদতদার কে?’

রাজবল্লভ বলে, ‘কেউ নয় হুজুর। নিজেদের খুশখেয়ালেই তারা—’

রাজবল্লভকে বাধা দিয়ে মিরন বলে উঠল, ‘সব শালা কুত্তাকে জাহান্নামে পাঠাব আমি। আভি মওত নাচবে। চুনিলাল ও মুন্নিলালকে যারা খতম করেছে, তাদের ঘরে আগ লাগিয়ে দিন। সেই আগুনে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারুন বেতমিজদের।’

শিউরে উঠলেন রাজবল্লভ। কী বলছে এই নির্বোধ ছোকরা? এতে রাজধানী যে আরও গরম হয়ে উঠবে। দেওয়ানকে স্থানুবৎ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ধমকের সুরে মিরন বলে উঠল, ‘এখানে খাড়া হয়ে আছেন কেন? হুকুম তামিল করুন জলদি।’

রাজবল্লভ বললেন, ‘লেকিন হুজুর–’

কড়া চোখে রাজবল্লভের দিকে তাকায় মিরন।

সহসা ভেসে এল গোলমালের আওয়াজ। ব্যস্ত হয়ে কক্ষে প্রবেশ করল কাদির।

বিরক্তির সঙ্গে মিরন শুধোয়, ‘ফির কেয়া হুয়া?’

কাদির বলে, ‘হুজুর, প্যালেসের দুয়ারে হাজির রেসিডেন্ট সাহেব। সঙ্গে গোরা পল্টন।’

মিরনের তড়পানি, হম্বিতম্বি, খুনজোশি নিমেষে স্তিমিত হয়ে গেল। ‘ইতনা জলদি?’ এই বলে জানলার কাছে ছুটে গিয়ে মিরন দেখল, প্যালেসে ঢুকতে স্ক্র্যাফটন ও হেস্টিংসকে বাধা দিচ্ছে নিজামতের সেপাইরা। আগুনে মেজাজে ভয়ানক তম্বি করছেন স্ক্র্যাফটন। সঙিন উঁচিয়ে ধরেছে গোরা পল্টনেরা। হাতাহাতি বাধবার উপক্রম।

সহসা শূন্যে গুলি ছুড়ে বসল কয়েকজন গোরা পল্টন।

রাজবল্লভ বললেন, ‘রেসিডেন্ট সাহেবের সঙ্গে কাজিয়া বাধালে ভয়ানক কাণ্ড হয়ে যাবে হুজুর। নবাবের সঙ্গে কোম্পানির রিশতেদারি টুটে যাবে। নবাব দায়ী করবেন আপনাকেই।’

কেমন যেন অসহায় বোধ করল মিরন।

‘আমি খাতির করে রেসিডেন্টসাহেবকে এখানে নিয়ে আসছি।’ এই বলে মিরনের অনুমতির অপেক্ষা না করে কক্ষ থেকে দ্রুত বেরিয়ে গেলেন রাজবল্লভ।

রাগে ফুঁসছেন স্ক্র্যাফটন। সাহেবের লাল মুখটা আরও লাল হয়ে উঠেছে। নবাবজাদার স্পর্ধা দেখে তিনি তাজ্জব। বেওকুফ ছোকরা দেউড়িতে দাঁড় করিয়ে রেখেছে ইংরেজ রেসিডেন্টকে? আগুন জ্বলছে স্ক্র্যাফটনের মাথায়। হাতের কাছে গোটা কয়েক কামান পেলে তখনই হয়তো উড়িয়ে দিতেন গোটা প্যালেসটাকেই।

সহসা সদর দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন রাজবল্লভ।

তাঁকে দেখেই ক্ষিপ্ত হয়ে গর্জন করে উঠলেন স্ক্র্যাফটন, ‘কোথায় নবাবজাদা?’

রাজবল্লভ হাত কচলে বিনীত ভাবে বললেন, ‘হুজুর প্যালেসের অন্দরেই আছেন।’

‘হাউ ডেয়ার ইউ আর? ইংরেজ রেসিডেন্টকে বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখেছেন?’

‘গোস্তাকি মাফ করবেন সাহেব। অন্দরে আসুন।’

আর কথা না বাড়িয়ে হেস্টিংসকে নিয়ে গটমটিয়ে প্যালেসের অন্দরে ঢুকে পড়লেন স্ক্র্যাফটন। ঝড়ের গতিতে দরবার ঘরে এসে হাজির হলেন। আর বেওকুফি নয়। ইংরেজদের ভয়ে ধাতে এসেছে মিরন। ইংরেজ রেসিডেন্ট সাহেবকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য আগে থেকেই দরবার ঘরে এসে অপেক্ষা করছিল সে।

যেন কিছুই ঘটেনি—এমন একটা ভাব করে হাসি মুখে স্ক্র্যাফটন ও হেস্টিংসকে ওয়েলকাম জানাতে গিয়ে স্ক্র্যাফটনের আগুনে মেজাজ দেখে দমে গেল মিরন। মিলিয়ে গেল মুখের হাসি।

কোনও ভূমিকা না করেই মিরনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে প্রবল ঔদ্ধত্যের সঙ্গে স্ক্র্যাফটন শুধোলেন, ‘ইউ এগেইন মেড দ্য সিচুয়েশন গ্রেভ। ক্রিয়েটেড ট্রাবল ফর আস। ডিস্টার্বড পিস অফ দ্য ক্যাপিটাল টাউন। হু এমপাওয়ারড ইউ টু ডু সো?’

আগুন ঝরছে স্ক্র্যাফটনের মুখচোখ থেকে। ভয়ে কাঁপছেন রাজবল্লভ।

‘হু অর্ডারড ইউ টু কিল মির্জা মেহেদি?’ ফের গর্জন করলেন স্ক্র্যাফটন।

মিরন নিশ্চুপ। স্থানুবৎ দাঁড়িয়ে আছে অপরাধীর মতো।

‘হোয়াই হ্যাভ ইউ কমিটেড সাচ অ্যা নুইসেন্স?’

হেস্টিংস বললেন, ‘কর্নেল ক্লাইভ আজ বিকেলে মুর্শিদাবাদে এসে পৌঁছবেন।’

মিরন বলল, ‘ম্যায়নে সোচা থা কী ফির ইনকিলাব হোগি।’

চোখ বিস্ফারিত করে স্ক্র্যাফটন শুধোলেন, ‘ইনকিলাব? রেভোলিউশন? মতলব?’

ইতস্তত করে মিরন বলল, ‘কর্নেল ক্লাইভ ফৌজ নিয়ে আসছেন। আমার মনে হয়েছিল, দেওয়ান রায়দুর্লভ মির্জা মেদিকে মসনদে বসাতে চান। সোচা থা ইনকিলাব হোগি। তাই আব্বাহুজুরের কুরসিকে সালামত রাখতে মির্জা মেহেদিকে আমি—’

স্ক্র্যাফটন ও হেস্টিংস স্তম্ভিত।

স্ক্র্যাফটন বলে উঠলেন, ‘হ্যাভ ইউ গন ম্যাড?’

হেস্টিংস শুধোল, ‘কোথা থেকে আপনি শুনলেন ইনকিলাবের কথা?’

‘শুনিনি। আন্দাজ করেছিলাম।’

আঁতকে উঠে হেস্টিংস বললেন, ‘ও মাই গড। নিজের মর্জিমাফিক এক কহানি গড়ে নিয়ে আপনি মির্জা মেহেদিকে খতম করলেন?’

স্ক্র্যাফটন ঝাঁঝের সঙ্গে বললেন, ‘নট ফর এনি রেভোলিউশন। কর্নেল ইজ কামিং টু অ্যাসিস্ট নবাব ফর হিজ পূর্ণিয়া এক্সপিডিশন। এটা আপনি জানতেন না?’

দু’দিকে মাথা নেড়ে মিরন বলল, ‘না। আব্বাহুজুর কিছু বলেননি আমাকে।’

মিরনের যুক্তিতে একিন হল না হেস্টিংসের। শুধোলেন, ‘স্রেফ এক আন্দেশায় আপনি এই কাজ করে বসলেন? ইওর অ্যাকশনস হ্যাভ ডিসগ্রেসড কর্নেল ক্লাইভ। টারনিশিং দ্য ইমেজ অফ ইংলিশ মেন। এসব বোঝেন? নাউ টেল আস—নানি বেগম, আমিনা বেগম ও ঘসেটি বেগমকে খতম করলেন কেন?’

মিরন মুখ তুলে বলল, ‘ইয়ে ইলজাম ঝুটা।’

‘দেন হোয়্যার আর দে?’ চেঁচিয়ে উঠলেন হেস্টিংস।

‘আমি তাদের ঢাকায় পাঠিয়ে দিয়েছি।’

‘ঢাকায়?’ স্ক্র্যাফটন বিস্মিত।

‘জিঞ্জিরা প্যালেসে।‘

‘হোয়াই?’

মিরন নিরুত্তর।

‘আই ফিয়ার ফর ইওর ফিউচার। সব শুনে কর্নেল ক্লাইভ কী বলবেন আমি জানি না।’

এই বলে মিরনের সামনে থেকে সরে গিয়ে খোলা জানলার পাশে এসে দাঁড়ালেন স্ক্র্যাফটন।

মিরন কাঁচুমাচু মুখ করে বলল, ‘গোস্তাকি মাফ করবেন সাহেব।’

‘একটা কাজ করতে হবে আপনাকে।’ বাইরের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললেন স্ক্র্যাফটন। তারপর জানলার পাশে থেকে সরে এসে তিনি ফের মিরনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বললেন, ‘মির্জা মেহেদিকে দাফন করার জন্য জমকালো জানেজার আনজাম করতে হবে। শাহি কেতায় সারতে হবে সব রিচুয়াল। আপনাকে হাজির থাকতে হবে।’

‘আমাকে?’

‘হ্যাঁ। আপনাকে। খুদ হাজির থেকে মির্জা মেহেদিকে আপনি দাফন করবেন খোশবাগে।’

‘লেকিন সাহেব আমলোগ—’ আতঙ্ক ফুটে ওঠে মিরনের গলায়।

হেস্টিংস তচ্ছিল্যের মুচকি হাসি হেসে শুধোলেন, ‘আমলোগের নফরতিকে ভয়?’

‘জি সাহেব।’ সত্যি কথাই বলল মিরন।

‘এটা মির্জা মেহেদিকে খতম করার আগে ভাবা উচিত ছিল।’

হুকুমের সুরে স্ক্র্যাফটন বললেন, ‘আওয়ার সোলজার্স উইল এসকর্ট ইউ টু খোশবাগ।’

কথাটা মিরনের ঠিক মনঃপুত হল না। অসহায় ভাবে সে দাঁড়িয়ে রইল।

স্ক্র্যাফটন ফের বললেন, ‘ওয়ান মোর থিং। ইস্যু অ্যা মেমো টু ডেপুটি অফ নবাব অ্যাট ঢাকা।’

‘চিঠঠি?’

‘ইয়েস।’

‘নানি বেগম, আমিনা বেগম, ঘসেটি বেগমকে ঢাকায় যেন সহি সালামাত রাখা হয়। ইউ হ্যাভ টু ইস্যু দ্য লেটার রাইট নাউ।’ বললেন স্ক্র্যাফটন।

অগত্যা মুনশিকে ডেকে পাঠাল মিরন। চিঠির মুসাবিদা করতে বলল তুরন্ত।

খানিকবাদে নবাবজাদার সিলমোহর দেওয়া চিঠির একটা কপি নিয়ে জাফরাগঞ্জ প্যালেস থেকে বেরিয়ে এলেন স্ক্র্যাফটন ও হেস্টিংস।

দুই সাহেব চলে যেতেই ক্ষোভে ফেটে পড়ল মিরন।

নবাবজাদার আগুনে মেজাজের আঁচ পেয়ে তার সামনে থেকে সরে গেলেন রাজবল্লভ।

নফরতি। নফরতি। ইংরেজ সওদাগরদের উপর তার তীব্র নফরতি। তবুও তাকে বারবার বেইজ্জত হতে হচ্ছে ইংরেজদের কাছে। যখন-তখন তাকে ধমকাচ্ছেন রেসিডেন্ট সাহেব। কৈফিয়ৎ চাইছেন। কেন? কেন এমন হবে? সে নবাবজাদা। ভবিষ্যতে সুবে বাংলার মসনদের দাবিদার। যে কাজই করে থাকুক না কেন সে, তার জন্য কৈফিয়ৎ দিতে হবে একদল সওদাগরকে? তার প্যালেসে ঢুকে তারা তাকে চোখ রাঙিয়ে যাবে কেন?

মিরনের মনে হল, ইংরেজদের বিরোধিতা করে সঠিক কাজ করেছিলেন সিরাজ। মনে মনে ইংরেজদের সবক শেখানোর খোয়াব দেখতে লাগল সে। তার মাথায় চক্কর কাটতে লাগল এক আজগুবি ভাবনা। ফৌজ নিয়ে কলকাতার উপর সে ঝাঁপিয়ে পড়বে। চুরমার করে দেবে ইংরেজ বণিকের দেমাক। গুঁড়িয়ে দেবে কলকাতার কেল্লা। যেমন গুঁড়িয়ে দিয়ে এসেছিলেন সিরাজ। সুবে বাংলা থেকে সে ইংরেজদের তাড়িয়েই ছাড়বে।

নবাবজাদার হুঁশ নেই যে গত একবছরে বদলে গিয়েছে জমানা। বদলে গিয়েছে রাজনৈতিক সমীকরণ। পলাশি বদলে দিয়েছে সব কিছু। খরচ কমাতে অর্ধেকের বেশি ফৌজিদের ছেঁটে ফেলেছেন নবাব মিরজাফর খাঁ। নবাব নিজেই এখন গোরা পল্টনদের উপর নির্ভরশীল। নবাবসহ নিজামতের সব আমীর ওমরাহরা ক্লাইভের নাম শুনলেই ভয়ে কাঁপে। কাদের নিয়ে ইংরেজদের ঢিট করতে যাবে সে?

আর মিরন নিজে? স্ক্র্যাফটন, হেস্টিংসের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কথা বলতে গেলেই তার বুক শুকিয়ে যায়। ক্লাইভের সামনে গেলে ভয়ে হাঁটু কাঁপে। লড়াই করার কোনও অভিজ্ঞতা তার নেই। তম্বি-তড়পানি সবই ঘরের অন্দরে। সে যাবে ক্লাইভের বিরুদ্ধে লড়াই করতে?

দিমাগ খানিকটা ঠান্ডা হতে মিরন অনুভব করে তার নিজের অবচেতনই সায় দিচ্ছে না এই অলীক পরিকল্পনায়।

নাস্তা নিয়ে হাজির হল দাখিলা। পোর্সেলিনের বাটিতে দুধে ভেজানো খুরমা।

প্রবল হতাশা ও নিষ্ফল আক্রোশে দুধের পাত্র উলটে দেয় মিরন। পোর্সেলিনের সুদৃশ্য আধার মাটিতে পড়ে খণ্ড খণ্ড হয়ে যায়। উন্মাদের মতো লোহার একটা দণ্ড হাতে নিয়ে ঘরের জিনিসপত্র ভাঙচুর করতে থাকে মিরন। ভয় পেয়ে ছুটে পালায় গোলাম-দাখিলারা। বেশ কিছুক্ষণ তাণ্ডব চালিয়ে ক্ষান্ত হল মিরন। কুরসিতে বসে হাঁপাতে লাগল।

দরওয়াজায় এসে দাঁড়ালেন রাজবল্লভ। ‘হুজুর।’

মুখ তুলে রাজবল্লভের দিকে তাকাল মিরন।

রাজবল্লভ বললেন, ‘বজরা প্রস্তুত আছে হুজুর। গোরা পল্টনেরা দুয়ারে সঙিন হাতে খাড়া হয়ে আছে। খোশবাগের উদ্দেশে রওনা হওয়ার জন্য তাগাদা দিচ্ছে বারবার। কী বলব?’

হতাশায় দুহাতে মুখ ঢাকল মিরন।

.

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে শহরের বিভিন্ন জায়গায় গোরা পল্টনদের মোতায়েন করলেন স্ক্র্যাফটন। তারপর হেস্টিংসকে সঙ্গে নিয়ে ঘোড়া হাঁকিয়ে ছুটে চললেন রায়দুর্লভের হাভেলির উদ্দেশে। মির্জা মেহেদির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে মুর্শিদাবাদের আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছিল। গোলমাল পাকিয়ে ফায়দা লোটার জন্য প্রস্তুত হয়েছিল গুণ্ডা লুঠেরাদের দল। কড়া হাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনলেন স্ক্র্যাফটন।

গোলমাল আঁচ করে কোতোয়ালির যে সেপাইরা কাজ ছেড়ে গা ঢাকা দিয়েছিল, ফের ফিরে এসে কাজে যোগ দিল তারা। স্ক্র্যাফটনের নির্দেশে রায়দুর্লভ আগেই পথে মোতায়েন করেছেন তার ফৌজের ঘোড়সওয়ারদের। তারা এখন টহল দিয়ে বেড়াচ্ছে। জনতার ক্ষোভের আঁচ খানিকটা কমেছে। পথের দু’পাশে এখন সুশৃঙ্খল ভাবে দাঁড়িয়ে আছে অগণিত মানুষ। এরা মির্জা মেহেদির জানেজায় অংশ নিতে চায়।

রায়দুর্লভের হাভেলিতে এসে ঢুকলেন স্ক্র্যাফটন ও হেস্টিংস।

স্ক্র্যাফটনের নির্দেশে ফের একবার ঢোল শোহরতের আয়োজন করলেন দেওয়ান সাহেব। রাস্তায় জমায়েত আম-আদমিকে জানিয়ে দেওয়া হল– আলিবর্দির বেগম, আমিনা বেগম ও ঘসেটি বেগম জিন্দা আছেন, খুশ তবিয়ত আছেন। হাওয়াবদলের জন্য তাদের পাঠানো হয়েছে ঢাকার জিঞ্জিরা প্যালেসে। এই ঘোষণা মানুষের ক্ষোভকে আরও এক দফা প্রশমিত করল।

রায়দুর্লভের হাভেলির বুরুজে এসে দাঁড়ালেন স্ক্র্যাফটন ও হেস্টিংস। অনেক নীচে মির্জা মেহেদির দেহ নিয়ে তখন চলেছে শবযাত্রা। হাতির পিঠে পালঙ্কে শায়িত বালকের দেহ ফুলে ফুলে ঢাকা। পথ হাঁটছে শোকাহত অগণিত মানুষ। মানুষের মধ্যে কোনও উত্তেজনা নেই। লোকজন নিশ্চুপ। কোনও কোলাহল নেই। লোকে পথ হাঁটছে সুশৃঙ্খল ভাবে। শহর ঘুরে মির্জা মেহেদির দেহ নিয়ে যাওয়া হবে চেহেল সেতুনের নৌকোঘাটে। সেখান থেকে ভাগীরথী পেরিয়ে খোশবাগ।

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *