1 of 2

পলাশির পরে – ৩৭

৩৭

দুপুরের পর থেকে জাফরাগঞ্জ প্যালেসে বাতিকরদের দম ফেলার ফুরসত থাকে না। মিরনের হুকুম—প্যালেসের অন্দরে ক্কোথাও যেন আঁধারের এতটুকু কালি নজরে না আসে। এই হুকুম অক্ষরে অক্ষরে তামিল করতে দিনের আলো ফুরিয়ে আসার অনেক আগে থেকেই বাতিকরদের তৎপর হতে হয়। সামান্য গলতি হলে রেহাই নেই। গর্দান যাবে। বাতিকরের দল হুঁশিয়ার হয়ে থাকে। সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে প্যালেসের ঘরগুলো তো বটেই এমনকি সিঁড়ি, অলিন্দ, চলাচলের সরু পথ সর্বত্রই ঝলমল করে ওঠে শয়ে শয়ে দেওয়ালগিরি, ঝাড়বাতি, চিরাগ, নানা নকশার আধারে অভ্রের পাতজ্বলা উজ্জ্বল আলোয়। অন্ধকারকে ভয় পায় মিরন। তাই এত আনজাম। মিরনের ভয় হরেককিসিমের। ভয় গুপ্তঘাতকের, ভূত-প্রেত, অশুভ আত্মার।

পুড়ছে অভ্রের পাত। কাঁপছে আগুনের শিখা। তার উপরে উড়ে এসে পড়ছে পতঙ্গ। নিমেষে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। দরজার পাশে রাখা বাতিদানের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে রয়েছে মিরন। নবাব রাজধানীতে নেই। পূর্ণিয়া অভিযানে বেরিয়ে গিরিয়ায় তাঁবু ফেলেছেন।

মিরনের মন তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে নানারকম দুশ্চিন্তায়। এর সূত্রপাত কয়েকদিন আগে পাওয়া একটা উড়ো চিঠি থেকে। তাতে লেখা ছিল, ‘…সব জুলমাতের হিসেব চোকানোর জন্য তৈয়ার হও। দুনিয়াদার তোমার মওতের দিনক্ষণ চূড়ান্ত করেছেন। বেহেস্ত নয়, তোমার ঠাঁই হবে দোজখে।…’

কে পাঠাল এই চিঠি, তার কোনও আন্দাজ পায়নি মিরন। প্রথমে বিষয়টাকে হালকা চালে নিলেও নবাবজাদার মনে ভয় ঢুকেছে। হঠাৎ কার যেন ছায়া পড়ল ঘরে। চমকে গিয়ে ঘুরে তাকিয়ে কোমর থেকে ঝোলানো খঞ্জর খাপ থেকে দ্রুত উন্মোচিত করল মিরন।

অদূরে দাঁড়িয়ে আছে অতি বিশ্বস্ত গোলাম কাদির শেখ। তার হাতে রুপোর রেকাবিতে সাজানো রয়েছে শরাবের বোতল, বেলজিয়ান কাট গ্লাসের পানপাত্র।

খঞ্জর হাতে আক্রমণোদ্যত মনিবকে দেখে কাদিরের ভিরমি খাওয়ার জোগাড়। কাঁপছে তার হাত। কাঁপছে হাতে ধরা রেকাবি। খঞ্জরের ধারালো ফলা অভ্রের আলোয় ঝকঝক করছে।

‘কোনও গুস্তাকি হয়ে থাকলে মাফ করবেন হুজুর।’

মিরন অস্ত্রটা খাপের মধ্যে ফের ঢুকিয়ে রাখে। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে কাদির।

‘ভয় পেয়েছিলি বুঝি?’ হেসে পরিস্থিতি সহজ করার কোশিশ করে মিরন।

‘জি হুজুর।’ রুপোর রেকাবিটা চৌপাইয়ের উপর নামিয়ে রেখে দ্রুত পায়ে কাদির চলে যায়।

গুপ্তঘাতকের ভয়ে মিরন ইদানীং ত্রস্ত হয়ে থাকে। রাত নামলে এই ভয়টা বড় বেশি জাঁকিয়ে বসে মনের মধ্যে। নিজামতের অন্দরে তার দুশমন কম নয়। রায়দুর্লভ, মণি বেগম, মিরকাশিম এরা তো আছেনই। সেই সঙ্গে রয়েছে ধূর্ত ইংরেজ বণিক।

সিরাজদ্দৌলার ভাই মির্জা মেহেদিকে মসনদে বসিয়ে নিজামতের রাশ নিজের হাতে রাখতে চান রায়দুর্লভ। মণি বেগম বুঝে নিতে চান মসনদের উপর তার দুই পুত্র সইফউদ্দৌলা ও নজমুদ্দৌলার অধিকার। তিনি সুবহসাম মিরনের বিরুদ্ধে নবাবের কানে বিষ ঢেলে চলেছেন। এর পাশাপাশি চিঠি লিখে তার কার্যকলাপ নিয়ে শিকায়ত জানাচ্ছেন ক্লাইভের কাছে।

পশ্চিম দেশ থেকে আসা আজনবি এক নাচনেওয়ালি রূপের ছলাকলায় আব্বাহুজুরকে ভেড়া বানিয়ে বেগম হয়েছেন। তিনি ছড়ি ঘোরাবেন তার উপরে? মণি বেগমকে খতম করতে চায় মিরন। কিন্তু তিনি যে ভাবে সুবহসাম দেহরক্ষী পরিবৃত হয়ে থাকেন, তাতে মিরনের ঘাতকবাহিনীর পক্ষে তাঁর নাগাল পাওয়া দুষ্কর। ওদিকে আবার মণি বেগমের নামে কোনও নালিশই শুনতে চান না নবাব। হেসে উড়িয়ে দেন বেগমসাহেবার নামে মিরনের আনা যাবতীয় ইলজাম।

শুধু মণি বেগম নন, আরও অনেককেই মিরন এই দুনিয়া থেকে চিরতরে সরিয়ে দিতে চায়। নামগুলো লেখা আছে ছোট্ট একটা খাতায়। মিরন বলে কাতিলনামা। রায়দুর্লভ, মণি বেগম, মিরকাশিম, এমনকি মিরজাফরের ঔরসজাত মণি বেগমের দুইপুত্র নজমউদ্দৌলা ও সইফউদ্দৌলাসহ সিরাজের ওফাদার বলে পরিচিত বহু মানুষের নাম নথিভুক্ত হয়ে আছে খতমের তালিকায়।

মিরনের নয়া অশান্তির কারণ মিরকাশিম। তাঁর নজর যে মসনদের উপরে রয়েছে, মিরন তা বুঝতে না পারার মতো বেওকুফ নয়। নিজের দামাদকে ভয় পান নবাব মিরজাফর খাঁও। দামাদ তাঁর পড়ালিখা করা বুজুর্গ আদমি। সিরাজদ্দৌলাকে গ্রেফতার করার পর থেকে ইংরেজদের সঙ্গে তার দোস্তি, দহরমমহরম জোরদার হয়েছে। কাশিমবাজার ও কলকাতার প্রভাব থেকে দূরে রাখতে মিরকাশিমকে রংপুরের ফৌজদারের পদে নিযুক্ত করেছিলেন মিরজাফর। এখন আবার বিপদে পড়ে টাকা চেয়ে দামাদেরই হাত পাকড়ে ধরেছেন নবাব। এই মওকায় দরবার রাজনীতিতে নিজের অবস্থান মজবুত করতে চাইবেন তার জিজাজি। মিরন বোঝে। তাই ভবিষ্যতের কথা ভেবে জিজাজিকেও সে দুনিয়া থেকে চিরতরে সরিয়ে দিতে চায়।

পলাশির যুদ্ধের পর সিরাজদ্দৌলা-সহ বহু মানুষের মওত হয়েছে মিরনের ইশারায়। নবাবজাদার কুসংস্কারাচ্ছন্ন মন বিশ্বাস করে, অপঘাতে মরা মানুষ প্রেত হয়ে এই দুনিয়াতেই থেকে যায়। ঘাতকের আশেপাশে ঘুরে বেড়ায়, বদলা নিতে চায়। রাতের বেলায় দেওয়ালে নিজের ছায়া দেখেও মাঝে মাঝে প্রেত ভেবে চমকে ওঠে মিরন। ভূত-প্রেত, অশুভ আত্মার ভয় দূর করতে এক ফকিরের পরামর্শে সে একটি তাবিজ ধারণ করেছে। সেই সঙ্গে ফকির সাহেব দিয়েছেন একটা মন্ত্রপূত লৌহদণ্ড। ফকির সাহেবের বিধান—এই লৌহদণ্ডটি সঙ্গে থাকলে অশুভ আত্মা ক্ষতি করতে পারবে না। এই লৌহদণ্ডটি কোমর থেকে ঝোলানো একটি চামড়ার খাপে পুরে সঙ্গে রাখে মিরন। রাতে ঘুমোনোর সময় লৌহদণ্ডটি রেখে দেয় বালিশের নীচে।

‘কে? কে ওখানে?’

মিরন দেখে অদূরে দাঁড়িয়ে এক রাজপুরুষ তার দিকে স্থির চোখে চেয়ে রয়েছে। ভয়ে নবাবজাদার রোমকূপ খাড়া হয়ে ওঠে। কে ওই রাজপুরুষ? পরনের পোশাক নবাব-বাদশার মতো। মাথায় উষ্ণীষ। তবে কি সি-রা-জের বিদেহী আত্মা–

‘সি-রা-জ!’

শরাবের নেশায় মিরন প্রায় বেসামাল। সামনের দিকে কয়েক পা এগোতে গিয়ে সে দেখে সেই রাজপুরুষও এগিয়ে আসছে তার দিকে। মিরন প্রাণ ভয়ে কোমরবন্ধনী থেকে মন্ত্রপূত লৌহদণ্ডটি বের করে ছুড়ে মারে ওই রাজপুরুষের দিকে। ঝনঝন শব্দে কাঁচ ভাঙে। নেশার ঘোরে আরশিতে নিজের প্রতিবিম্বকেই সিরাজ ভেবে ভয় পেয়েছে মিরন।

কাদির এসে তসলিম জানিয়ে বলে, ‘কাসিদ খবর এনেছে হুজুর।’

‘কী খবর? গোরা পল্টনেরা এখন কোথায়?’ উৎকণ্ঠার সঙ্গে প্রশ্ন করে মিরন।

‘দাউদপুরে ছাউনি ফেলেছে।’

মিরন বলে, ‘চুনিলাল-মুন্নিলালকে খবর দাও। তুরন্ত।’

‘জি হুজুর।’ কাদির চলে যায়।

উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় দমবন্ধ হয়ে আসছে মিরনের। নবাবজাদার অপরিণত মস্তিষ্ক অনেক সময় রাজনৈতিক বাতাবরণের সহি আন্দাজ পায় না। তার বেতাব দিল উৎকণ্ঠা, উদ্বেগ খুব বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারে না। বুদ্ধি ঘুলিয়ে যায়। এই সময় শয়তান ভর করে তার মাথায়।

দাউদপুরে ছাউনি ফেলেছেন ক্লাইভ। মুর্শিদাবাদ মাত্র একদিনের পথ। হাতে সময় বড় কম। অস্থির হয়ে পদচারণা করতে থাকে মিরন। তার সন্দিগ্ধ মনে উঁকি দিচ্ছে নানারকমের শঙ্কার মেঘ। দেওয়ান রায়দুর্লভ তার হাভেলিতে সেই হামলার পর থেকে নিজেকে ঘরবন্দি করে রেখেছেন। এই মুহূর্তে আব্বাহুজুর রাজধানীতে নেই। তাহলে কি দেওয়ানসাহেব এই মওকার ইন্তেজারে ছিলেন? তিনিই কর্নেল ক্লাইভকে ডেকে নিয়ে আসছেন মুর্শিদাবাদে?

মিরন জানে না ক্লাইভ আসছেন নবাবের চিঠি পেয়ে। এই চিঠির কথা পুত্রের কাছে গোপন রেখেছিলেন নবাব। কারণ ইংরেজদের প্রতি মিরনের নফরতি। ইংরেজ বণিকেরা কেন চোখ রাঙাবে? কেন সে নবাবজাদা হয়েও চলতে পারবে না নিজের খুশখেয়ালে, মর্জিতে? তার ইয়ারদোস্তরা, ঘরবাড়ি লুঠতরাজ করুক, আগুন জ্বালাক কোনও রইস আদমির ঘরের আওরাতকে তুলে নিয়ে এসে ফূর্তি মানাক বা সিরাজের ওফাদারদের খতম করুক, তাতে ইংরেজদের শিরদর্দ কেন? ভাবীকালে মসনদের হকদার সে। কোন অধিকারে তাকে ধমক দেয় আয়ারকুট, স্ক্র্যাফটন, হেস্টিংস? এই কথাগুলো অনেকবার ক্লাইভ সাহেবকে শুনিয়ে চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে হয়েছে মিরনের কিন্তু সে বলে উঠতে পারেনি। তার আব্বাহুজুরের মতোই ক্লাইভের মুখোমুখি হলে সেও ভয়ে কাঁপতে থাকে। কর্নেলের চোখের দিকে তাকালে মুখের ভাষা হারিয়ে যায়। কেন এই দহসত? মিরন উত্তর হাতড়ে বেড়ায়। হতাশা দমন করতে না পেরে ইয়ারবকশিদের নিয়ে মজলিশে বসে কর্নেল ক্লাইভের নামে সে নোংরা গালিগালাজ করে। গোলাম, দাখিলারা মিরজাফরের কাছে পৌঁছে দেয় এসব কথা। নবাব শিউরে ওঠেন।

দুশ্চিন্তায় স্থির হয়ে এক জায়গায় দাঁড়াতে পারছে না মিরন। ক্লাইভ তো একা আসছেন না সঙ্গে আছে কামান ও বেশ বড়সড় ফৌজ। ফের কি ইনকিলাব ঘটতে চলেছে মুর্শিদাবাদে? ইংরেজদের সাহায্য নিয়ে সিরাজদ্দৌলার ভাই মির্জা মেহেদিকে মসনদে বসাতে চান রায়দুর্লভ? মুসিবত হতে চলেছে তার আব্বাহুজুরের? সিরাজদ্দৌলার মতোই বরবাদ হয়ে যাবেন তিনি? বেসাহারা, বেদলৌত হবেন নবাব মিরজাফর খাঁ? বন্দি হবেন হাবুজখানায়? মিরনের রংদার জিন্দেগি শুরুয়াতেই বেরং হয়ে যাবে?

ডোরিতে টান দিয়ে ঘন্টি বাজায় মিরন। কাদির অন্দরে এসে তসলিম জানায়।

‘কালি আউর কলম।’

ছুটে গিয়ে নিয়ে মুহূর্তের মধ্যে কালি ও কলম নিয়ে আসে কাদির।

ঘরের এক কোণায় তেকোণা টেবিলের সামনে কুরসিতে এসে বসে মিরন। তার কাতিলনামা খুলে পাতা ওলটাতে থাকে। এক জায়গায় এসে থমকে দাঁড়ায় মিরন। গোটা পাতায় লেখা রয়েছে একটাই নাম। মির্জা মেহেদি। কলম কালিতে ডুবিয়ে মির্জা মেহেদির নামের পাশে ঢ্যাঁড়া দেয় মিরন।

ঠিক তখনই পিছন থেকে শোনা যায় একজোড়া গলার আওয়াজ, ‘হুজুর?’

চমকে গিয়ে ঘুরে তাকায় মিরন। হাতের অসতর্ক ধাক্কায় খাতার উপরে উলটে যায় কালির আধার। গোটা পাতাটাই কালো হয়ে যায়। টেবিলের উপর দিয়ে কালি গড়িয়ে গিয়ে টপ টপ করে পড়তে থাকে গালিচার উপরে।

দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে চুনিলাল ও মুন্নিলাল।

.

চেহেল সেতুনের ঘড়িয়াল ঘণ্টা পিটিয়ে জানান দেয় রাতের মেয়াদ আর কতখানি। রাতে বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করেন শরফ উন্নেসা। ঘুম আসে না। সিরাজের নানি বেগম অন্ধকারে হাতড়ে বেড়ান অতীতের আলোয় ভরা দিনগুলো।

মিরনের খায়েশে আর পাঁচজন সাধারণ কয়েদির মতো প্রায়ান্ধকার এক কারাকক্ষে প্রথমে কয়েদ হয়েছিলেন। পরে ক্লাইভের হুকুমে সেখান থেকে মুক্তি পেয়ে ঠাই পেয়েছেন চেহেল সেতুনেরই অন্দরে মস্ত এক হাভেলিতে। আলিবর্দির খানদানের বাকি সদস্যেরাও এখানে গৃহবন্দি হয়ে আছেন।

সিরাজকে হারিয়ে মির্জা মেহেদিকে বুকে আঁকড়ে ধরেছেন নানি বেগম। তেরো বছরের বালক মির্জা রাতে তার দিদিমার কাছেই ঘুমোয়। পাশের ঘরে থাকেন তার আম্মিজান আমিনা বেগম। অবসাদে দিনরাত তিনি আফিমের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকেন।

অঘোরে ঘুমোচ্ছে মির্জা। বড় সুন্দর নিষ্পাপ মুখখানা। জাফরির ফাঁক দিয়ে নকশাকাটা চাঁদের আলো এসে পড়েছে মির্জার মুখে উপরে। মুগ্ধচোখে দৌহিত্রের মুখপানে চেয়ে থাকেন নানি বেগম। চোখের কোণায় চিকচিক করে পানি। মির্জার গায়ে তিনি হাত বুলিয়ে দেন পরম মমতায়। আলিবর্দির খানদানের খুন বইছে এই বালকের দেহে। কে বলতে পারে নসিবের চাকা কোনওদিন ঘুরবে না। হঠাৎই কিছুদিন দেওয়ান রায়দুর্লভের চিঠি এসে পৌঁছোয় নানি বেগমের হাতে। সেই চিঠি উসকে দিয়েছে তাঁর আশাকে। ফির ইনকিলাব হতে পারে মুর্শিদাবাদে। বদলাতে পারে কিসমত।

দেওয়ানজি লিখেছিলেন, ‘…হুজুরাইন, পলাশিতে সিরাজের মুসিবতের অন্যতম প্রধান কারণ ছিলাম আমি। বহুকাল আলিবর্দি খাঁর নিমক খেয়ে যে গুনাহের কাজ আমি করেছি, তার জন্য মাফ চাইছি আপনার কাছে। আমি প্রায়শ্চিত্ত করতে চাই। মিরজাফরের জমানায় আমলোগ বড় তকলিফের মধ্যে আছে। তার প্রধান কারণ মিরন। তার মদতে জুলুম চলছে নিরীহ প্রজাদের উপর। মিরন ভয়ংকর। সে আমাদের সকলকেই দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে চায়। ইংরেজ কোম্পানিও মিরনের উপরে বিরক্ত। আমি মির্জা মেহেদিকে মসনদে বসানোর জন্য ঘুঁটি সাজাচ্ছি। মিরজাফর খাঁর জমানার অবসান ঘটাতে চাই। আশা করি আমার এই প্রস্তাব আপনি মঞ্জুর করবেন।…’

আশায় দুলে উঠেছিল শরফ উন্নেসার মন। সেই সঙ্গে বুক কেঁপে উঠেছিল শঙ্কায়। চিঠিটা পুড়িয়ে ফেলেছিলেন নানি বেগম। এ চিঠি মির্জার প্রাণ সংশয়ের কারণ হতে পারে।

ঘুমের ঘোরে পাশ ফিরে শুয়ে নানি বেগমকে জড়িয়ে ধরে মির্জা মেহেদি। তাঁর কপালে চুমু খেলেন শরফ উন্নেসা। ঠিক তখনই বাইরে থেকে ভেসে আসে দরজার উপরে প্রবল করাঘাতের আওয়াজ। ঘরের বাইরে একগাদা লোকের গলার আওয়াজ। কান খাড়া করে থাকেন শরফ উন্নেসা। কথার ভঙ্গিতে বোঝা যায়, লোকগুলো মদ্যপ ও উত্তেজিত। মিরনের অতি জঘন্য দুই শাগরেদ চুনিলাল ও মুন্নিলালের গলার আওয়াজ চিনতে পারলেন নানি বেগম। তাঁর বুক কেঁপে উঠল। এত রাতে মিরনের অনুচরদের এখানে হানা দেওয়ার কী উদ্দেশ্য?

শয়তানেরা দরজা ভাঙার উপক্রম করছে। এখনও ঘুমে অচেতন মির্জা মেহেদি।

শরফ উন্নেসা বুকের মধ্যে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন দৌহিত্রকে।

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *