৩৫
ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছলেন নবাব। তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে দ্রুত হাতির পিঠ থেকে নেমে এল মিরন। নবাবও ব্যস্তসমস্ত হয়ে গাদেলা থেকে নেমে এলেন নীচে। ত্রস্ত গলায় শুধোলেন, ‘ইয়ে কেয়া হো রাহা হ্যায়? লড়াইয়ের এই আনজাম কেন বেটা?’
মেজাজ হারিয়ে চিৎকার করে উঠে মিরন বলল, ‘বুডঢা দেওয়ানকে আজ কোতল করব।’
মিরজাফর শিউরে উঠে বললেন, ‘জবানে লাগাম লাগাও বেটা। অ্যায়সা মাত শোচো।’
মিরন ফুঁসে উঠে বলল, ‘আমি সাদেক আলি। ডরপোক, বুজদিল নই। এই বুডঢা শয়তান মদত দিচ্ছে, পূর্ণিয়ার বাগি অচল সিংকে। মদত দিচ্ছে বুডঢা খরিশ রামনারায়ণজিকে। সাজিশির কারবার চালাচ্ছে ইংরেজদের সঙ্গেও। দেওয়ানজি আপনার হুকুমত ছাড়াই রেসিডেন্ট সাহেবকে সওগাত দিয়েছেন কাশিমবাজারের নজদিকে গোটা একটা তালুকদারি। পতা হ্যায় আপকো?’
মিরজাফর বিস্মিত হলেন। ‘বলছ কী?’
‘আপনি সিদাসাধা লোক, তাই বরদাস্ত করে চলেছেন দেওয়ানের বেয়াদপি। পহেলে দেওয়ানের কোঠি লুঠ করব। তারপর বুডঢা শয়তানকে কোতল করে ঘর ওয়াপস যাব।’
‘শান্ত হও বেটা, শান্ত হও।’
ফের তড়পে ওঠে মিরন, ‘বেতমিজ দেওয়ানজির তাকাব্বুরি দেখুন আব্বাহুজুর, দেউড়িতে খাড়া নবাবজাদা সাদেক আলি, ফির দরওয়াজা বন্ধ রেখেছেন? আমি চিঠি ভেজলাম অন্দরে, এত্তেলা দিলাম, তবু নবাবজাদার খোশ-আমদেদের কোনও আনজাম করলেন না?’
‘দিমাগ ঠান্ডা রাখ বেটা। গুসসা মাত করো।’
মিরন বিষ উগরেই চলে—‘দেওয়ানখানার সব তনখা ছুপিয়ে রেখেছেন দেওয়ান। আপনাকে মুসিবতের মধ্যে ফেলার জন্যই সেপাইদের পাওনা মেটাননি। দেওয়ানজিকে কোতল করে লাশ ঝুলিয়ে দেব ত্রিপোলিয়া দরওয়াজায়। জানুক আমলোগ—সাদেক আলি বেতমিজি বরদাস্ত করে না।’
হঠাৎ হইহই করে উঠল রায়দুর্লভের হাভেলির সদর দেউড়িতে মজুত হওয়া সেনারা।
হাভেলির অন্দর থেকে বেরিয়ে এলেন রায়দুর্লভ। শশব্যস্ত হয়ে ছুটে এসে নবাবকে তসলিম জানিয়ে বললেন, ‘অচানক এই হামলা কেন হুজুর? কী তকসীর আমার?’
মিরন উত্তেজিত হয়ে বললেন, ‘আপনি গদ্দার। নবাবের বরবাদি চান।’
রায়দুর্লভ বললেন, ‘ইয়ে তহমত ঝুটা।’
‘ঝুট নয় সচ। অচল সিংকে বাগি হতে মদত দিচ্ছেন আপনি।’
‘ইয়ে ঝুটা ইলজাম।’
‘খামোশ।’
‘ইয়ে সচ বাত। এতকাল নবাবের নিমক খেয়েছি। আমি বেইমানি করতে পারি না।’
‘নবাবের হুকুমত কী করে ইনকার করে রাজারাম? আপনার ওফাদার রামনারায়ণজি। এদের গুমরাহী হতে মদত দিচ্ছেন আপনি।’ মিরন গর্জন করে ওঠে।
নবাবের উদ্দেশে গুজারেশ করেন রায়দুর্লভ, ‘আমার কসুর কোথায় হুজুর? রামনারায়ণজি যদি আপনার হুকুমত ইনকার করে তার জন্য কি আমার নামে ইলজাম ওঠানো যায়?’
‘আপনি স্রেফ বেওকুফ বানাচ্ছেন নবাবকে।’
‘সেপাইদের মাহিনা বাকি কেন?’ শুধোলেন নবাব।
‘এতে আমার গলতি কোথায় হুজুর?’
‘গলতি নয়? সেপাইদের বেতন তো বরাবর দেওয়ানই মিটিয়ে এসেছেন।’
‘ইয়ে সহি বাত। এই জিম্মেদারি আমি গরকবুল করছি না। লেকিন–’
‘লেকিন?’ প্রশ্ন করেন মিরজাফর।
‘টাকা কোথায় পাব? তোশাখানায় যা ছিল, তার সবই তো কোম্পানিকে দিতে হয়েছে।’
মিরন ফের গর্জন করে ওঠে, ‘ইয়ে ঝুট বাত। তোশাখানার দৌলত তছরুপ করছেন আপনি।’
গুড়ুম! গুড়ুম! গুড়ুম! সহসা দূর থেকে ভেসে এল গুলির শব্দ।
চমকে উঠল সকলে। ছেদ পড়ল বাক-বিতণ্ডায়।
মিরজাফর খাঁ ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলেন, দূরের আকাশে ধুলোর ঝড়। বর্গি এল নাকি?
এই আশঙ্কা আরও গুরুতর করে তুলল একদল সেপাই। চেঁচিয়ে উঠল, ‘বর্গি আসছে, বর্গি’।
মুহূর্তের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল চারিদিকে। অস্ত্রসস্ত্র ফেলে রেখে দৌড়তে শুরু করল সেপাইরা। মেদবহুল শরীরটা নিয়ে হাঁসফাঁস করতে করতে হাতির পিঠে চেপে বসলেন নবাব।
নবাবজাদাও আফসানি, তড়পানি ছেড়ে ছুটলেন নিজের হাতির দিকে।
‘পালাও পালাও! বর্গি আসছে।’ সেপাই-পেয়াদারা ছুটছে। চারিদিকে চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলা।
ঘটনার আকস্মিকতায় থতমত খেয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন রায়দুর্লভ। ওদিকে ক্রমশ এগিয়ে আসছে ঘোড়ার খুরের শব্দ। বর্গির ভয় বড় ভয়ানক চিজ। প্রাণ ভয়ে সবাই ছুটে পালাচ্ছে আর তিনি বেওকুফের মতো দাঁড়িয়ে আছেন কেন? সম্বিৎ ফিরল দেওয়ানজির। পড়িমরি করে নিজের হাভেলির উদ্দেশে ছুটলেন রায়দুর্লভ। অতীতে মারাঠাদের হাতে একবার তিনি নাকাল হয়েছিলেন। বর্গিরা তাকে বন্দি করে নাগপুরে নিয়ে গিয়েছিল। অবশেষে তাঁর পিতা, পাটনার নায়েব জানকীরাম বহু টাকা নজরানা দিয়ে পুত্রকে মুক্ত করেন। সে এক দুঃস্বপ্নের স্মৃতি।
ধাবমান ঘোড়সওয়ারেরা অনেকটা এগিয়ে এসেছে। ধুলোর আস্তরণ ভেদ করে এবারে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে আকাশে উড্ডীন কোম্পানির নিশান। বর্গি নয়, কোম্পানির ফৌজ!
একদল সেপাই চেঁচিয়ে উঠল, ‘গোরা পল্টন! গোরা পল্টন!’
হাভেলির দেউড়িতে পৌঁছে এই চিৎকার শুনে ঘুরে তাকালেন রায়দুর্লভ। বলছে কী এরা? গোরা পল্টন? হ্যাঁ সত্যিই তো। সওয়ারিদের পরনে লাল কুর্তা। আকাশে উড়ছে ইউনিয়ন জ্যাক।
আতঙ্কের প্রহর শেষে স্বস্তির হাসি ফুটল রায়দুর্লভের মুখে।
এগিয়ে আসছে ইংরেজ বাহিনী।
পরমানন্দে উদ্বাহু হয়ে সেদিকে ছুটে গেলেন রায়দুর্লভ। জয় গোবিন্দ। রাখে হরি, মারে কে?
অকুস্থলে হাজির হয়েছেন স্ক্র্যাফটন সাহেব। এসেছেন তাঁর ডেপুটি ওয়ারেন হেস্টিংসও। হাতির পিঠ থেকে দ্রুত নেমে এলেন মিরজাফর।
রায়দুর্লভ চাপমুক্ত, হাসি ফুটেছে মুখে। ওদিকে ভয়ানক অস্বস্তিতে পড়লেন নবাব।
ঘোড়া থেকে নেমেই মিরনকে দেখে স্ক্র্যাফটন চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘এসব কী করছেন আপনি? এগেইন ট্রায়িং টু ডিসটার্ব দ্য পিস অফ দ্য টাউন?’
রেসিডেন্ট সাহেবের আগুনে মেজাজের সামনে পড়ে মিরন বেসামাল। মুখে কথা জোগাচ্ছে না।
রায়দুর্লভ এগিয়ে এসে রেসিডেন্ট সাহেবকে সেলাম ঠুকে বললেন, ‘বহুত বহুত সুক্রিয়া।’
ছুটোছুটির ধকলে একদিকে হেলে যাওয়া মাথার উষ্ণীষ ঠিকঠাক করতে করতে হন্তদন্ত হয়ে স্ক্র্যাফটনের সামনে হাজির হলেন নবাব।
হেস্টিংস প্রশ্ন করলেন, ‘হোয়াট ডু ইউ ওয়ান্ট?
রায়দুর্লভ গুজারেশ করলেন, ‘এ ভাবে পথে দাঁড়িয়ে বাতচিত করা নবাবের পক্ষে বেসহবত কাণ্ড। সকলে হাভেলির অন্দরে চলুন। ওখানেই কথা হবে।’
রায়দুর্লভের প্যালেসের দরবার ঘরে আলোচনায় বসলেন, স্ক্র্যাফটন, হেস্টিংস, নবাব মিরজাফর খাঁ, মিরন ও রায়দুর্লভ। মিরজাফরের সঙ্গে রয়েছেন খাদিম হোসেন খাঁ। একে একেবারেই পছন্দ করে না মিরন।
মিরজাফর খাঁর এক ভগিনীপতির রক্ষিতার গর্ভে খাদিম হোসেনের জন্ম। সেই সূত্রে মিরজাফরকে তিনি মামু বলে ডাকেন। খাদিম হোসেন বয়সে মিরজাফরের থেকে সামান্য ছোট। নবাবের ছেলেবেলার সঙ্গী। মিরজাফর মসনদে বসার পর থেকে দু’জনের সম্পর্ক গাঢ়তর হয়েছে।
স্ক্র্যাফটন বললেন, ‘হোয়াই আর ইউ ফাইটিং অ্যামাঙ্গ ইওরসেলভস? হোয়াট দ্য জেনারেল পিপল উইল থিংক অ্যাবাউট ইউ?’
মিরজাফর বললেন, ‘পূর্ণিয়ায় বাগি হয়েছেন অচল সিং। তাঁকে শায়েস্তা করা দরকার।’
হেস্টিংস অবাক গলায় প্রশ্ন করলেন, ‘হাউ দিস ইন্সিডেন্ট ইজ রিলেটেড উইথ দ্যাট?’
মিরজাফর খাঁ নিশ্চুপ।
মিরন ক্ষুব্ধ গলায় বলে ওঠে, ‘সিপাহীদের মাহিনা মেটাননি দেওয়ান। তারা পূর্ণিয়ায় লড়াই করতে যেতে রাজি নয়। দেওয়ানজি গদ্দারি করছেন।’
রায়দুর্লভ ব্যস্ত গলায় বলে ওঠেন, ‘ইয়ে ঝুটা ইলজাম। তোশাখানায় টাকা নেই।’
স্ক্র্যাফটন বিরক্তির সঙ্গে বলে উঠলেন, ‘দেওয়ানকে কোতল করলে কি টাকা মিলবে?’
মিরন নিরুত্তর।
ক্ষোভের সঙ্গে স্ক্র্যাফটন বললেন, ‘ইউ ক্যাননট গো অ্যাজ ইউ প্লিজ।’
মিরজাফর বলে উঠলেন, ‘দেওয়ানের উপর হামলা করার কোনও মনসুবা আমার ছিল না। এ কাজ করে গোস্তাকি করেছে নবাবজাদা। আমি তার হয়ে মাফ চাইছি।’
মিরনের উদ্দেশে কড়া গলায় স্ক্র্যাফটন বললেন, ‘ইউ মাস্ট অ্যাপোলোজাইস টু দেওয়ান।’
এই হুকুম তামিল করল মিরন। বলল, ‘গোস্তাকি মাফ করবেন দেওয়ানজি।’
রায়দুর্লভ হেসে বললেন, ‘নিজামত এক বিরাট বড় খানদান। আমরা সবাই সেই খানদানে বড় হয়ে ওঠা মানুষ। আমাদের রিসতেদারির মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি হতেই পারে। নবাবজাদার বয়স কম। নয়া যুবক। একটা গলত কাম না হয় তিনি করেই ফেলেছেন। এ নিয়ে আমার আর কোনও খেদ নেই। আমি এই কাজিয়াটা মিটিয়ে নিতে চাই।’
‘আমারও দেওয়ান সাহেবের উপর কোনও আখেজ নেই।’ এই বলে কুরসি ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন মিরজাফর। উঠে দাঁড়ালেন রায়দুর্লভও। কোলাকুলি সেরে নিলেন দু’জনে।
হাততালি দিয়ে উঠলেন স্ক্র্যাফটন ও হেস্টিংস।
স্ক্র্যাফটন বললেন, ‘আপনাদের উপরে ভরসা আছে কর্নেলের। ফরগেটিং অল রাইভালরি, ইউ মাস্ট ওয়ার্ক টুগেদার। ডোন্ট গিভ ট্রাবল টু আস। ফর নাথিং আমাদের পরেশান করবেন না।’
এতক্ষণ পান চিবোতে চিবোতে সব আলোচনা শুনছিলেন খাদিম হোসেন। ভাঙের নেশায় চোখদুটো আধবোজা। হঠাৎই তিনি বলে উঠলেন, ‘পূর্ণিয়ার মামলার তো কোনও ফয়সালা হল না।’
মিরন বলল, ‘ইয়ে সহি বাত। অচল সিং-এর বেয়াদপি বরদাস্ত করলে সারা দেশে বাগিপনাহ বেড়ে যাবে। আশা করি এই লড়াইয়ের টাকা মঞ্জুর করবেন দেওয়ান সাহেব।’
রায়দুর্লভ অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে বললেন, ‘আমি তো আগেই বলেছি টাকা নেই তোশাখানায়।’
মিরজাফরের মুখপানে চেয়ে খাদিম হোসেন বললেন, ‘পূর্ণিয়ায় গিয়ে লড়াই করার জন্য নিজামতের টাকার প্রয়োজন হবে না মামু।’
একথা শুনে সকলে অবাক চোখে খাদিম হোসেনের দিকে তাকাল।
খাদেম হোসেনের ঠোঁটের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে পানের রস। এ নিয়ে তার কোনও হেলদোল নেই। পান চিবিয়েই চলেছেন। মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। কথা বেশ জড়ানো। মৌতাত জমাট। দু’পা তুলে বেহুদা আনপঢ় আদমির মতো বসে আছেন কুরসিতে। দছমালে ঠোঁটের দুই কোণ মুছে নড়ে চড়ে বসলেন খাদেম হোসেন। হাতের ইশারায় এক দাখিলাকে ডাকলেন। পিচিক করে পানের রস ফেললেন পিকদানে।
উটকো এই লোকটাকে দেখে গা-পিত্তি জ্বলে যাচ্ছে স্ক্র্যাফটনের। ‘হু আর ইউ?’
রেসিডেন্ট সাহেবের প্রশ্নের জবাবে মিরজাফর খাঁ বললেন, ‘আমার রিশতেদার।’
খাদেম হোসেন বললেন, ‘অচল সিং-কে আমি ঢিট করে ছাড়ব মামু। আপনি ইজাজত দিলে রিসালা নিয়ে আমি পূর্ণিয়া যেতে রাজি আছি। খরচ আমার।’
হাঁ হয়ে গেলেন স্ক্র্যাফটন ও হেস্টিংস। এই লোকটাকে দেখে তো মোটেই যুদ্ধবাজ বলে মনে হয় না। শিথিল, মেদবহুল দেহের গড়ন। এ লোক লড়াইয়ের ঝক্কি পোহাবে কী করে?
ফের পিচিক করে পানের পিক ফেলে খাদিম হোসেন বললেন, ‘আপনি চিন্তা করবেন না মামু, অচল সিংকে জিন্দা ধরে আনব। এই লড়াই-হাঙ্গামার কড়ি মেটাব আমি। লেকিন এক বাত। পূর্ণিয়ার ফৌজদারের নোকরিটা আমার চাই।’
মিরনের মুখের ভঙ্গিমা দেখে মনে হল, সে খুব বিরক্ত। এই প্রস্তাবে তার মোটেই সায় নেই।
রায়দুর্লভ বললেন, ‘এ তো ভালো কথা। খাদেমজি দিলওয়ার আদমি।’
নবাব খুশি ঝরা গলায় বললেন, ‘আমার একিন অচল সিং-সহ পূর্ণিয়ার বাগি জমিদারদের ঢিট করতে পারবে খাদেম। আভি আমি তার নামে পূর্ণিয়ার ফৌজদারির পরোয়ানা লিখে দিচ্ছি।’
লাফিয়ে উঠে কুরসির উপরে দাঁড়িয়ে খাদিম হোসেন বলে উঠলেন, ‘মামু বহুত মেহেরবান।’
.
