1 of 2

পলাশির পরে – ৩৪

৩৪

চিড় ধরেছে নবাব ও দেওয়ানের সম্পর্কে। নবাব মিরজাফর খাঁর বিরুদ্ধে ঘুঁটি সাজাচ্ছেন দেওয়ান রায়দুর্লভ—এই নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই কানাকানি-ফিসফাস চলছে দরবারের অলিন্দে। সেই খবর উড়তে উড়তে চকবাজারের অলিগলিতেও ছড়িয়ে পড়েছে।

পলাশির ইনকিলাব যারা মেনে নিতে পারেননি, তারা এখন আড়ালে মুখ টিপে হাসছেন। চকবাজারে গুলতানি চলছে, ‘দ্যাখো কাণ্ড! সিরাজকে মসনদ থেকে হটানোর জন্য যারা জিগরি দোস্ত বনেছিলেন, কয়েকমাস যেতে না যেতেই পেয়ার-মহব্বত ভুলে দুই হুজুরে কাজিয়া বাঁধিয়েছেন।’

‘সে তো হবেই। পলাশির সাজিশিতে লাভ হয়েছে নবাবের। রায়দুর্লভ যে কিছুই পেলেন না।’

এ সবই এতদিন ছিল হাওয়ায় ওড়া খবরের ভিত্তিতে গরমাগরম গুলতানি। সাবুত কিছু ছিল না। এবারে সব কিছু প্রকাশ্যে এল। সাতসকালে ঘুম থেকে উঠে চোখ কচলে তাজ্জব বনে গেল সকলে। ফৌজিদের কাড়ানাকাড়ার শব্দে, ঘোড়ার খুরের আওয়াজে ফের কেঁপে উঠল মুর্শিদাবাদ। হাতিয়ার হাতে নবাবের সেপাই-পেয়াদারা এত ব্যস্ত-সমস্ত হয়ে চলেছে কোথায়? বর্গিরা ফের এসে পড়ল নাকি? মুসিবতের আন্দেশায় হুড়ুম-দুড়ুম করে দোকানের ঝাঁপ ফেলল চকবাজারের সওদাগরেরা। ঘরের দরজায় আগল দিল সাধারণ মানুষ। তবে তাদের ভুল ভাঙল অচিরেই। এ তো বর্গিদের মোকাবিলার জন্য বিরাট বড়সড় আনজাম নয়। হাতি-ঘোড়া-কামানসহ মাত্র শ’পাচেক সেপাই-আহেদি নিয়ে দেওয়ান রায়দুর্লভের প্যালেসের অভিমুখে চলেছে মিরন। সঙ্গে তার দেওয়ান রাজবল্লভ। এমন অভিযান অভূতপূর্ব। নবাবে-দেওয়ানে প্রকাশ্য সংঘাত কখনও দেখেনি মুর্শিদাবাদ।

প্যালেসের অতি উচ্চ এক বুরুজে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা দেখে রায়দুর্লভ নিজেও চমকে উঠলেন। ফৌজ নিয়ে তাঁর হাভেলির দিকে ধেয়ে আসছে মিরন। তার সঙ্গে ঘোড়সওয়ার, পদাতিক, বন্দুকচি, ধানুকি, হাতি, কামান সবই আছে। রায়দুর্লভ চোখে অন্ধকার দেখলেন। হাতে সময় খুব অল্প। এই সময়ের মধ্যে এই হামলা রোখার জন্য নিজের রিসালাকে প্রস্তুত করে তোলা যাবে না।

ভয়ে কাঁপতে লাগলেন রায়দুর্লভ। গোটা প্যালেস জুড়ে হুলুস্থূল পড়ে গেল। ক্রন্দনরোল উঠল জেনানামহলে। তড়িঘড়ি প্যালেসের সমস্ত জানালা দরওয়াজা বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন দেওয়ানজি। সদর দরজায় মোতায়েন করলেন সশস্ত্র রক্ষীদের। সেই সঙ্গে খিড়কি দরজা দিয়ে অতি গোপনে দূত পাঠালেন কাশিমবাজারের ইংরেজ ছাউনিতে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই দেওয়ানের প্যালেস ঘিরে ফেলল মিরনের বাহিনী। প্যালেসের রক্ষীরা মিরনের বাহিনীর তুলনায় সংখ্যায় নিতান্তই কম। নিমেষেই আত্মসমর্পণ করে বন্দি হল তারা। প্যালেসের অন্দরে বসে মিরনের বাহিনীর সেপাইদের আপসানি ও অস্ত্রের ঝনঝনানি শুনে ইষ্টনাম জপ করতে লাগলেন রায়দুর্লভ।

.

বেলা হয়ে গিয়েছে অনেকটাই। ঘুম ভাঙল মিরজাফরের।

হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন মণি বেগম। জবাবদিহি চাওয়ার ঢঙে বেগম সাহেবা প্রশ্ন করলেন, ‘আপনার জমানায় এসব কী হচ্ছে সরতাজ?’

মণি বেগমের মেজাজের আঁচে চমকে গিয়ে দ্রুত বিস্তরখানা থেকে নেমে এলেন নবাব। ত্রস্ত গলায় শুধোলেন, ‘কী হয়েছে বেগম?’

‘নবাবজাদা ফৌজ নিয়ে ঘেরাও করেছে দেওয়ানসাহেবের হাভেলি।’

‘কী বলছ?’ হতচকিত হয়ে গেলেন নবাব।

রায়দুর্লভের সঙ্গে সম্পর্ক যতই খারাপ হোক না কেন, এমনটা মোটেই চাননি মিরজাফর খাঁ। প্রকাশ্যে নবাবের সঙ্গে দেওয়ানের কাজিয়া ক্লাইভের বিরক্তি উদ্রেক করবে ভেবে শঙ্কিত হয়ে পড়লেন নবাব। এই ঘটনা তো ইংরেজদেরই একপ্রকার বেইজ্জতি। সিরাজকে হঠাতে মিরজাফর-রায়দুর্লভের সঙ্গে তারা হাত মিলিয়েছিল। নয়া জমানায় সুশাসন মিলবে। নবাব ও দেওয়ান এক জবরদস্ত জোড়ি। দরবারে দাঁড়িয়ে ওয়াদা করেছিলেন ক্লাইভ। সত্যিই যদি রায়দুর্লভকে কোতল করে বসে মিরন, তারপরে কী হবে তা ভাবতে গিয়ে ঘেমে উঠলেন নবাব। এমন কোনও কদম যেন না ওঠায়, এ জন্য সেদিন বারবার তিনি নিষেধ করেছিলেন মিরনকে। কিন্তু সে অবাধ্য। নিজের খুশখেয়ালে চলে। শোনে না কোনও কথা। কী করবেন নবাব?

মণি বেগম ঝঙ্কার দিয়ে উঠলেন, ‘এখনও চুপ করে দাঁড়িয়ে আছেন আপনি?’

‘আমি কী করব মণি?’

বিস্মিত গলায় মণি বেগম বলেন, ‘আজিব বাত। আপনি তো নবাব। কেউ গলত কাজ করলে তাকে শাসন করতে পারবেন না? বাধা দিতে পারবেন না?’

‘মিরন মানবে না আমার হুকুমত।’ ভয়ানক এক অসহায়তা ফুটে ওঠে মিরজাফরের গলায়।

‘বাঃ চমৎকার! দেওয়ানজি খুন হলে আপনি যে মুসিবতের মধ্যে পড়বেন। কর্নেল ক্লাইভ আপনার উপরে খুনের ইলজাম আনবেন। বুঝতে পারছেন না আপনি? এখনই বেরিয়ে পড়ুন ফৌজ নিয়ে। থামান মিরনকে।’

স্থানুবৎ দাঁড়িয়ে রইলেন নবাব। ডুবছেন হতাশায়, অবসাদে।

‘তবে শরাবের নেশায় বুঁদ হয়ে বসে থাকুন আপনি। আমিই ফৌজ নিয়ে যাচ্ছি।’

‘মণি শোনো। শুনে যাও।’

আর দাঁড়ালেন না মণি বেগম। দ্রুত বেরিয়ে গেলেন কক্ষ থেকে।

.

রায়দুর্লভের প্যালেসের সদর দরজায় সমানে ঘন ঘন করাঘাত করে চলেছে সেপাইরা।

প্যালেসের অন্দরমহল অদ্ভুতরকম নিশ্চুপ। ভিতর থেকে কোনও সাড়াশব্দ নেই।

প্রতিরোধের কোনও আনজাম-আয়োজনও নেই।

যাই হোক না কেন, রায়দুর্লভ সুবে বাংলার দেওয়ান, তার প্যালেসের সদর দেউড়ি ভেঙে ফেলে অন্দরে প্রবেশ করতে ইতস্তত করছে সেনারা। কাজটা ভয়ানক। সেটা বুঝছে সবাই। এ নিয়ে নবাবের তো কোনও পরোয়ানা নেই। শুধুমাত্র হঠকারী নবাবজাদার মৌখিক নির্দেশে এমন চূড়ান্ত পদক্ষেপ কি নেওয়া যায়? দেওয়ানের হাভেলিতে হামলা কোঁড়ার জন্য মিরনকে উত্তেজিত করেছিলেন রাজবল্লভ। এখন তিনিও ফ্যাসাদে পড়েছেন।

এদিকে ক্রমশ ধৈর্যচ্যুতি ঘটছে মিরনের। সে ভেবেছিল, তার আগমন সংবাদ শুনেই ছুটে আসবেন রায়দুর্লভ। জোড়হস্ত হয়ে প্রাণভিক্ষা চাইবেন। এসব তো ঘটলই না, উলটে দেউড়িতে নবাবজাদার উপস্থিতি অগ্রাহ্য করে দরজায় খিল তুলে বসে আছেন দেওয়ান।

অস্থির হয়ে পড়ে মিরন হুকুম করল, ‘দরওয়াজা তোড়ো। তোপ দাগো দরওয়াজার উপরে।’

এই হুকুম শুনে শিউরে উঠলেন রাজবল্লভ। আর যাই হোক, তিনি বেওকুফ নন। ভেবেছিলেন, সৈন্যসামন্ত নিয়ে গিয়ে তম্বি-তারাজ মারফত দেওয়ানের কাছ থেকে কিছু নগদ টাকা আদায় করে ফিরে আসবেন নবাবজাদা। কিন্তু ঘটনা যে দিকে গড়াচ্ছে, তার চূড়ান্ত পরিণতি ভয়ানক হতে পারে। কাশিমবাজার থেকে গোরাপল্টনেরা যদি ছুটে আসে তখন কী হবে?

রাজবল্লভ বললেন ‘এখনই তোপ দাগার মতো কড়া কদম ওঠানো সহি হবে না হুজুর। বাইরে এসে আপনার সঙ্গে মোলাকাত করার জন্য দেওয়ান সাহেবকে চিঠি পাঠান। আমার ধারণা উনি আপনার হুকুমতের ইজ্জত রাখবেন।’

ক্ষণিক ভেবে এই পরামর্শ মেনে নিল মিরন।

আপাতত হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন রাজবল্লভ।

.

দুরন্ত গতিতে ঘোড়া হাঁকিয়ে মুর্শিদাবাদের দিকে ছুটে চলেছেন স্ক্র্যাফটন ও হেস্টিংস। সঙ্গে শতখানেক গোরা পল্টন।

হেস্টিংসের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ। চিন্তা অবশ্য মুর্শিদাবাদের হাল-হকিকত নিয়ে নয়। পারিবারিক একটি বিষয় নিয়ে তিনি খুবই উৎকণ্ঠায় রয়েছেন।

ফলতার উদ্বাস্তু শিবিরে ক্যাপটেন জন বুকাননের বিধবা পত্নী মেরি বুকাননের সঙ্গে ভালোবাসার বন্ধনে বাঁধা পড়েছিলেন কোম্পানির সুদর্শন ছোকরা কেরানি ওয়ারেন হেস্টিংস। ভালোবাসা থেকে বিয়ে। কলকাতা পুনরুদ্ধারের পর কেল্লার পাশেই ওয়াটস সাহেবের বাংলোতে ঘটা করে রিসেপশন হয়েছিল। পলাশির যুদ্ধের পর থেকে হেস্টিংস দম্পতি কাশিমবাজারের বাসিন্দা।

কাশিমবাজার কুঠির চৌহদ্দির ভিতরেই চমৎকার এক বাংলোতে নবদম্পতির নতুন সংসার। মেরির পছন্দ ছিল বাগানওয়ালা ছিমছাম একটা বাংলো। ঠিক অমনই একটা বাংলো বরাদ্দ হয়েছে মিস্টার ও মিসেস হেস্টিংসের জন্য। একসময় এই বাংলোতে কিছুদিন কাটিয়েছিলেন উইলিয়াম ওয়াটস। কতকটা নিজের হাতে, কতকটা আবদার, দাখিলাদের নির্দেশ দিয়ে বাংলোটাকে একেবারে মনের মতো করে সাজিয়ে গুছিয়ে নিয়েছেন মেরি।

পত্নীর বর্তমান শারীরিক অবস্থা নিয়েই হেস্টিংসের ঘোর দুশ্চিন্তা ও উৎকণ্ঠা। মেরি সন্তানসম্ভবা। প্রসবকাল আসন্ন। গত কয়েকদিন যাবৎ নিজেকে গৃহবন্দি করে হেস্টিংস বাংলোতেই মেরির সঙ্গে দিন কাটাচ্ছিলেন। আজও বেরোনোর ইচ্ছে ছিল না মোটেই। নসিবের ফের। সাতসকালে স্ক্র্যাফটন সাহেবের খাস আর্দালি একটা চিরকুট নিয়ে হাজির হল। চিরকুটে চোখ বুলিয়ে চমকে উঠলেন হেস্টিংস।

স্ক্র্যাফটন লিখেছেন, ‘…উই হ্যাভ টু মুভ টুয়ার্ডস মুর্শিদাবাদ ইমিডিয়েটলি। উইথ অ্যা বিগ কনটিনজেন্ট। সিচুয়েশন ইজ গ্রেভ। নবাবজাদা অ্যাটাকড দেওয়ানস হাভেলি।…’

অগত্যা বাংলো ছেড়ে বেরোতেই হল হেস্টিংসকে।

ঝড়ের গতিতে ছুটে চলেছে একপাল শাদা ওয়েলার ঘোড়া।

স্ক্র্যাফটন খুবই বিচলিত। এই গোলমালের খবর ক্লাইভের কানে গেলে খুবই বিরক্ত হবেন তিনি। মুর্শিদাবাদ ছেড়ে যাওয়ার আগে বারবার তিনি মিরনের মতিগতি নিয়ে সতর্ক করে গিয়েছিলেন তাঁকে। কিন্তু আহাম্মক ছোকরা যে এমন একটা কান্ড করে বসবে তা কল্পনাই করতে পারেননি স্ক্র্যাফটন। মুর্শিদাবাদ থেকে আসা দূতের মুখ থেকে খবরটা শুনে তিনি চমকে উঠেছিলেন। তারপর এক মুহূর্তও দেরি না করে ফৌজ নিয়ে বেরিয়ে পড়েছেন।

ইদানীং রায়দুর্লভের সঙ্গে স্ক্র্যাফটনের অত্যন্ত মধুর একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। মুর্শিদাবাদের অদূরেই বিরাট এলাকার জমি স্ক্র্যাফটনকে উপহার দিয়েছেন সুবে বাংলার দেওয়ান। আয়তনে সে এলাকা প্রায় ছোটখাটো একটা তালুকদারির সমান। নবাব এ বিষয়ে কিছুই জানেন না। সেই জমি বেনামে নথিভুক্ত করে স্থানীয় জমিদারদের কাছে বিক্রি করে রাতারাতি প্রচুর টাকা উপায় করেছেন স্ক্র্যাফটন। এমন উপকারী বন্ধুকে বাঁচানোর জন্য মরিয়া হয়ে ছুটে চলেছেন রেসিডেন্ট সাহেব।

.

চিঠির উত্তর এল না প্যালেসের অন্দর থেকে। ভয়ানক ক্ষিপ্ত হয়ে দেওয়ান রাজবল্লভকে ফের ডেকে পাঠালেন মিরন। নবাবজাদার আগুনে মেজাজের আঁচ পেয়ে রাজবল্লভ ভয়ে কাঁপতে লাগলেন। সামনে এসে কুর্নিশ জানিয়ে বললেন, ‘ফরমাইয়ে হুজুর।’

মিরন চিৎকার করে উঠল, ‘তোপ দাগুন। দরওয়াজা ভাঙুন। বুডঢা খরিশের ইতনা হিম্মত যে আমার হুকুমত ইনকার করে?’

সন্ত্রস্ত হয়ে রাজবল্লভ বললেন, ‘আর কয়েক পল ইন্তেজার করি হুজুর।’

‘নেহি।’ মিরনের চিৎকারে কেঁপে উঠলেন রাজবল্লভ।

মিরন গর্জন করে বলল, ‘তোপ দাগুন। জলদি।’

হঠাৎ দূর থেকে ভেসে আসল কাড়ানাকাড়ার শব্দ।

চমকে ঘুরে তাকালেন মিরন ও রাজবল্লভ দু’জনেই। দূরে দেখা যাচ্ছে ধুলোর ঝড়।

রায়দুর্লভের প্যালেসের পাশ দিয়ে গঙ্গার ধার বরাবর চলে গিয়েছে লম্বা একটা পথ। সেই পথ ধরে এগিয়ে আসছে বিরাট এক কাফেলা। নবাব মিরজাফর খাঁ রয়েছেন এই কাফেলার কেন্দ্রে। গাদেলার উপরে রুপোলি চাঁদোয়ার আচ্ছাদন সূর্যের আলোয় ঝকঝক করছে।

উত্তুরে হাওয়ায় পতপত করে উড়ছে নিজামতের নিশান।

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *