৩২
পিছন থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে আসছে তির। সামনে ঝুঁকে পড়ে ঘোড়ার পিঠের সঙ্গে প্রায় মিশে গেলেন মোহনলাল। বিপদ বুঝল ঘোড়াও। ছোটার গতি আরও বাড়িয়ে দিল। তিরের নিশানা থেকে বাঁচতে ক্রমাগত ডাইনে-বায়ে ঘোড়াকে চালনা করছেন মোহনলাল। এঁকেবেঁকে চলেছে ঘোড়া। ছুটছে প্রাণপণে। নিজের সাধ্যকে যেন অতিক্রম করে যেতে চাইছে চারপেয়ে অবলা জীবটি।
এদিকে মোহনলালের পিছনে ধাবমান ঘোড়সওয়াররা এগিয়ে আসছে ঝড়ের গতিতে। ক্রমশ জোরালো হচ্ছে ঘোড়ার খুরের শব্দ। বোকাইনগরের পোড়ো দুর্গ সংলগ্ন জঙ্গল খুব দূরে নয়। মোহনলাল সমানে চাপড় মারতে লাগলেন ঘোড়ার গায়ে। দিনের আলো ফুরিয়ে আসছে। একবার জঙ্গলের মধ্যে প্রবেশ করতে পারলে আত্মরক্ষার কোনও একটা উপায় মিলবে। গহীন বনের অন্দরে কালচে সবুজের মধ্যে গা-ঢাকা দেওয়া সহজ হবে।
চলাচলের সুগম সড়ক ছেড়ে দ্রুত অরণ্যে প্রবেশের জন্য দুর্গম পাথুরে পথ ধরলেন মোহনলাল। খাড়াই বিপজ্জনক পথ। কিছুক্ষণের মধ্যেই মোহনলালকে নিয়ে জঙ্গলের প্রায় কিনারায় এসে পড়ল বাহাদুর তুর্কি ঘোড়া। আর সামান্য পথ।
‘জোরে ছোট বেটা। আরও জোরে।’
উত্তেজিত মোহনলাল সমানে ঘোড়ার পেটে চাপড় মেরে চলেছেন। কিন্তু শেষরক্ষা হল না।
একটা তির এসে বিঁধল ঘোড়ার দাবনায়। চিঁ-হি-হি-হি! চি-হি-হি-হি! ঘোড়ার পরিত্রাহী চিৎকারে কেঁপে উঠল শান্ত, স্তব্ধ বনভূমি। মাটিতে লুটিয়ে পড়ল তিরবিদ্ধ ঘোড়া।
মোহনলাল ছিটকে পড়লেন পাথুরে জমির উপরে। তীব্র আঘাত লেগেছে কোমরে, কপাল কেটে গিয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে, তবুও বাঁচার তাগিদে চকিতে উঠে দাঁড়ালেন মোহললাল। তখনই আরেকটা তীর এসে বিঁধল তাঁর ডান উরুর ঠিক উপরে।
‘আঃ!’ আর্তনাদ করে উঠে মোহনলাল। সংজ্ঞা হারালেন। ঘাসের উপরে হুমড়ি খেয়ে পড়লেন
নিমেষের মধ্যে পাঁচজন ঘোড়সওয়ার এসে হাজির হল অকুস্থলে। রায়দুর্লভের কাসিদ বাহিনী। এদের দলপতি রাজপুত আহেদি লগন সিং। ঘোড়া থেকে সবাই লাফিয়ে নামল।
সামনে ঝুঁকে পড়ে মোহনলালকে দেখে লগন সিং বলল, ‘জিন্দা হ্যায়। লেকিন বেহোশ। আমার আন্দাজ ইনিই মোহনলাল। মিশকিনের জালসাজিস নিয়েছেন।’
মাটিতে পড়ে থাকা মানুষটাকে ভালো করে নজর করতে থাকে লগন সিং। জোব্বার লম্বা হাতা সরিয়ে ডান হাতের বাজুতে বাঁধা কবচটা দেখে সে হেসে উঠে বলে, ‘সহি আন্দাজ। এমন কবচের কথাই বলেছিলেন রায়দুর্লভজি। লেখা আছে শিবো শম্ভু। সেই সঙ্গে খোদাই করা আছে নিজামতের নিশান। আর কোনও সন্দেহ নেই। ইনিই মোহনলাল। জয় শিবো শম্ভু! আঃ…’
অস্ফূট আর্তনাদ করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল লগন সিং। নিমেষে নিথর হয়ে গেল তার দেহ। চোখ দুটো খোলা। যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। বাঁশের কঞ্চির মাথায় লাগানো লোহার সূচলো ফলা বিদ্ধ হয়েছে বুকে।
শিউরে উঠল লগন সিং- এর সঙ্গী চার সেপাই। নির্ঘাত বিষ মাখানো তির। জঙ্গলবাসী জনজাতির লোকেরা এ ধরনের তির ব্যবহার করে। ত্রস্ত চোখে এদিক ওদিক তাকিয়ে আততায়ীর সন্ধান করতে লাগল সেপাইরা।
‘আঃ!’ লুটিয়ে পড়ল আরেকজন। আরেকটি বিষাক্ত তির এসে বিঁধেছে তার ঘাড়ে।
বাঁচার তাগিদে বাকি তিনজন ঘোড়াগুলো ফেলে রেখে টিলার ঢাল বেয়ে ঝোপজঙ্গল ভেদ করে চোখের নিমেষে গড়িয়ে গেল নীচের দিকে।
চিঁ-হি-হি-হি! চিঁ-হি-হি-হি! যন্ত্রণায় কাতর মোহনলালের ঘোড়াটা সমানে চিৎকার করে চলেছে। কাসিদদের ফেলে যাওয়া ঘোড়াগুলো এগিয়ে এসে ঘিরে ধরল জখম ঘোড়াটিকে। ব্যথায় কাতর তাদের স্বজাতিরই তো একজন!
সহসা জঙ্গল ভেদ করে বেরিয়ে এল চার-পাঁচজন মেচ জনজাতির মানুষ। উদলা গা। নিম্নাঙ্গে জড়ানো শুধু গাছের বাকল। কাঁধে ধনুক। পিঠে আড়াআড়ি করে বাঁধা বাঁশের বাখারির তূণীর বোঝাই হয়ে আছে তিরে। প্রতিটি ফলার মাথায় মাখানো আছে ভয়ানক বিষ। এ বিষ রক্তে মিশলে চোখের নিমেষে মৃত্যু অবধারিত।
মোহনলালের কপাল, পা থেকে খুন ঝরছে। ক্ষতস্থানে ভেষজের প্রলেপ লাগিয়ে গাছের বাকল দিয়ে বেঁধে দিল একজন। দু’জন লেগে পড়ল ঘোড়ার পরিচর্যায়। দাবনা থেকে তিরটি টেনে বের করে, ক্ষতস্থান পট্টি বেঁধে দিয়ে ফের তারা দাঁড় করাল ঘোড়াটিকে। তারপর নিজেদের মাতৃভাষায় পরস্পরের মধ্যে কিছু আলোচনা সেরে নিয়ে সংজ্ঞাহীন মোহনলালকে কাঁধে তুলে নিয়ে হাঁটতে শুরু করল একজন। বাকিরা লাগাম ধরে ঘোড়াগুলিকে টেনে নিয়ে চলল তার পিছু পিছু।
.
ফোর্ট উইলিয়াম থেকে চিৎপুর রোড ধরে সুতানুটির দিকে চলেছে বিরাট এক শোভাযাত্রা। এ শোভাযাত্রার মধ্যমণি রবার্ট ক্লাইভ। বসে আছেন হাতির পিঠে গাদেলায়। নবাব বাদশাদের মতোই তাঁর মাথার উপরে রয়েছে ছাতা। ক্লাইভের পিছনে ঘোড়ার পিঠে চড়ে দুলকি চালে চলেছেন ওয়ালশ, ওয়াটস ও ফোর্ট উইলিয়ামের আরও কয়েকজন হোমরা-চোমরা সাহেব।
ক্লাইভের সামনে এবং ওয়ালশ ও ওয়াটসের পিছনে কোম্পানির নিশান উচিয়ে বন্দুক কাঁধে চলেছে সব মিলিয়ে জনা পঞ্চাশ গোরা পল্টন। একেবারে পিছনে রয়েছে ফৌজি ব্যান্ড। তারা রুল ব্রিটানিয়ার সুর বাজাতে বাজাতে চলেছে। না এ কোনও যুদ্ধযাত্রা নয় বা কোনও যুদ্ধে জয়লাভ নিমিত্ত বিজয়ীর আনন্দের সাড়ম্বর বহিঃপ্রকাশও নয়। আজ শারদ দুর্গোৎসবের মহাষ্টমী। সুতানুটিতে মুনশি নবকৃষ্ণের গৃহে নিমন্ত্রণ রক্ষায় ক্লাইভ চলেছেন সপারিষদে।
কয়েকদিন আগে আগে ফোর্ট উইলিয়ামে নিমন্ত্রণ করতে এসে নবকৃষ্ণ পুজোর যে সাড়ম্বর আয়োজনের কথা জানিয়ে গিয়েছিলেন, তা শুনে বেশ অবাক হয়েছিলেন ক্লাইভ। এই স্বল্প সময়ের মধ্যে এত আয়োজন-আনজাম যে বাস্তবে সম্ভব তা ছিল তাঁর কল্পনারও অতীত।
চিৎপুর রোড দিয়ে যেতে যেতে ক্লাইভ দেখলেন, গোটা পথ জুড়ে মানুষের ঢল নেমেছে। কালীঘাট, কলকাতা, গোবিন্দপুরের দিশি পাড়া থেকে দলে দলে মানুষ চলেছে নব মুনশির পুজো দেখতে। ভিড়ে ঠাসা রাস্তা দিয়ে এগিয়ে চলা শোভাযাত্রার পথ করে দিতে হিমসিম খাচ্ছে সেপাই-বরকন্দাজ-কোতোয়াল।
দেশি লোকেরাও তাজ্জব বনে গিয়েছে। দুর্গাপুজো কলকাতায় নতুন নয়। গোবিন্দপুরের অদূরে বড়িষার সাবর্ণ চৌধুরীদের বাড়িতে বহুকাল যাবৎ এ পুজো হয়ে আসছে। সুতানুটির ধনকুবের লক্ষ্মী ধরের বাড়ির পুজোও বেশ পুরোনো। কিন্তু সেসব পুজোয় আমজনতার প্রবেশাধিকার ছিল না। তবে দূর থেকে দেখলেও, সাবর্ণ চৌধুরী বা নকু ধরের বাড়ির পুজোকে কেন্দ্র করে এমন ঘটার কথা কেউ শোনেনি।
বাইনাচ, আখড়াই গান, কবিগান, বিদ্যাসুন্দর যাত্রা, কেষ্ট যাত্রা, ভাঁড় নাচ, পুতুলনাচ, আতশবাজির রোশনাই আর ঢালাও খাওয়া-দাওয়ার আনজাম—নবকৃষ্ণ সত্যিই বিরাট শোরগোল ফেলে দিয়েছেন। বিত্তবান থেকে হতদরিদ্র মানুষ—নবকৃষ্ণের বাড়িতে নিমন্ত্রণ সকলেরই। রীতিমতো ঢোল-শোহরৎ করে জানানো হয়েছে সে কথা। নবকেষ্টর কেরামতি দেখে হাঁ হয়ে গিয়েছেন লক্ষ্মী ধর, গোবিন্দরাম মিত্তির, শোভারাম বসাক-সহ সুতানুটি-কলকাতার তাবড় তাবড় কেষ্ট-বিষ্টুরা।
এগিয়ে চলেছে শোভাযাত্রা। রবার্ট ক্লাইভকে একঝলক দেখার জন্য ঠেলাঠেলি পড়ে গিয়েছে লোকজনের মধ্যে। এ যেন রাজদর্শনের উল্লাস, থেকে থেকে ক্লাইভের কানে ভেসে আসছে মানুষের উত্তেজিত কণ্ঠস্বর—‘ওই যে ক্লাইভ! ক্লাইভ! রবার্ট ক্লাইভ। ওই যে হাতির পিঠে বসে আছেন।’
কেউ কেউ চেঁচিয়ে উঠছে তারস্বরে ‘জয় কোম্পানির জয়! জয় ক্লাইভ বাহাদুরের জয়! জয় রাজা নবকৃষ্ণ দেবের জয়।’
নবকৃষ্ণ তৃপ্ত, তুষ্ট। এমনই তো তিনি চেয়েছিলেন—একদিন অঢেল বিত্তের অধিকারী হয়ে উঠবেন, সাধারণ মানুষের চোখে হয়ে উঠবেন কলকাতার অলিখিত রাজা।
বার্তাবাহক আগাম খবর নিয়ে এসেছে, কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে পড়বেন ক্লাইভ। নবকৃষ্ণর চোখেমুখে ঝলকাচ্ছে খুশি। পায়ে খড়ম, কপালে চন্দনের প্রলেপ, পরনে উৎকৃষ্ট মসলিনের ধুতি। গলায় জড়ানো মিহি সুতোয় বোনা সুতীর উত্তরীয় দু’পাশ দিয়ে লোমশ বুকের উপর এসে পড়েছে। চাকর কান্ত ছাতা ধরে আছে মাথার উপরে। নাটমন্দির প্রাঙ্গণের দেউড়িতে দাঁড়িয়ে কর্নেল ক্লাইভের শুভাগমনের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন নবকৃষ্ণ। তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পারিষদবর্গের মধ্যে রয়েছেন গোবিন্দরাম মিত্তির, শোভারাম বসাক, নীলমণি মিত্র, নয়নচাঁদ মল্লিক, শুকদেব মল্লিক প্রমুখ বিত্তবানেরাও। তাঁরা সকলেই যেন আজ নিষ্প্রভ নব মুনশির ব্যক্তিত্ব ও দাপটের কাছে।
আবদার করে কর্নেল ক্লাইভের কাছ থেকে পলাশির যুদ্ধে ব্যবহৃত একটি ফিল্ড পিস কামান চেয়ে নিয়েছেন নবকৃষ্ণ। নাটমন্দিরের সদর দেউড়ির পাশেই গাড়িসমেত তোপটি স্থাপন করা হয়েছে। যে কামান গর্জন করেছিল পলাশির আমবাগানে, সেই কামান দেগেই নবকৃষ্ণ আজ নিজ গৃহে স্বাগত জানাতে চান রবার্ট ক্লাইভকে।
ক্লাইভ লক্ষ করলেন, যত তিনি এগোচ্ছেন ভিড় তত বাড়ছে। হুগলি নদীর বুকে অজস্র নৌকো। সবগুলোই লোকে বোঝাই। নৌকোগুলোর অভিমুখ সুতানুটির ঘাটের দিকে। সেখানে থিকথিকে ভিড়। মেঠো পথ ধরে পিলপিল করে অজস্র মানুষ হেঁটে চলেছে নবকৃষ্ণর বাসগৃহের দিকে।
চিৎপুর রোড ছেড়ে বাঁ দিকে বাঁক নিয়েই চমকে গেলেন ক্লাইভ। বিস্ময়ে ছানাবড়া হয়ে গেল চোখ। এ কাকে দেখছেন চোখের সামনে? মুখের অবয়ব যে অনেকটা তাঁরই মতো। পথের পাশে বিরাট এক মৃৎমূর্তি। ঘোড়ার পিঠে বসে আছেন এক ইংরেজ সেনানী। বিজয় গর্বে মুষ্টিবদ্ধ ডান হাত ছুড়ছেন শূন্যে। বাঁ-হাতে ধরা রয়েছে লাগাম। চেহারার মধ্যে রয়েছে দুরন্ত ঔদ্ধত্য। উদ্ধত ঘোড়ার ভঙ্গিমাও। কর্নেলকে দেখেননি কৃষ্ণনগরের মৃৎশিল্পী। নবকৃষ্ণের মুখে ক্লাইভের চেহারার বর্ণনা শুনে মূর্তি গড়েছেন তিনি। কাউকে বলে বোঝানোর প্রয়োজন নেই যে এ মূর্তি ক্লাইভেরই। তিনি নিজেই চিনতে পারছেন নিজেকে। নবকৃষ্ণের এই ছেলেমানুষি খেয়ালে খুশি হয়ে হাতির পিঠে গাদেলায় বসে আপনমনেই হেসে উঠলেন ক্লাইভ।
দুম! সহসা গর্জন করে উঠল নাটমন্দিরের তোপ। মহাষ্টমীর সকালে চমকে উঠল গোটা সুতানুটি। ওই তো দেখা যাচ্ছে শোভাযাত্রা। এসে পড়েছেন ক্লাইভ। চারিদিকে একেবারে হুড়োহুড়ি পড়ে গেল। হাতি এসে থামল নাটমন্দিরের দেউড়িতে। হাতির পিঠ থেকে নেমে এলেন ক্লাইভ।
নবকৃষ্ণ এগিয়ে এসে জোড় হস্ত হয়ে তার সামনে প্রায় নুয়ে পড়ে বললেন, ‘এ আমার পরম সৌভাগ্যি হুজুর। আপনার লেগ ডাস্ট পড়ল এই গোলামের গৃহে।’
ক্লাইভ হাসি মুখে বললেন, ‘আমি বহুত খুশি হয়েছি নবকিসেন। স্প্লেনডিড অ্যারেঞ্জমেন্ট।’
জোড়হস্তে নবকৃষ্ণ বলেন, ‘সবই আপনার ব্লেসিংস হুজুর।’
‘আই হার্ড মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র অলসো অ্যারেঞ্জড অ্যা গ্র্যান্ড কার্নিভ্যাল।’
গোবিন্দরাম মিত্তির পাশ থেকে গদগদ মুখে ফস করে বলে উঠলেন, ‘ও তো শিবহীন যগ্যি। যে পুজোয় আপনি হাজির নেই সে পুজোয় যতই জাঁক হক না কেন, এ পুজোর কাছে তার সব জলুস ফিকে হতে বাধ্য। আমাদের নবকেষ্টর কাছে হেরে ভূত নদিয়ার কেষ্টচন্দ্র।’
এই বলে নিজের কথায় নিজেই হেসে উঠলেন গোবিন্দরাম। সে হাসিতে যোগ দিল না কেউ। কথাটা গোবিন্দরাম বলেছিলেন ক্লাইভকে খুশি করার জন্য কিন্তু সে কথায় কোনও প্রতিক্রিয়া জানালেন না ক্লাইভ। রীতিমতো অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন গোবিন্দরাম। সুতানুটি-কলকাতার যে সব কেউকেটা লোকেরা ক্লাইভের সঙ্গে অন্তত একবার চাক্ষুষ দৃষ্টি বিনিময়ের জন্য এতক্ষণ অপেক্ষা করেছিলেন, তাঁদের ভালো করে নজর করে দেখলেনই না ক্লাইভ। নবকৃষ্ণের সঙ্গে কথা বলতে বলতে হাঁটতে লাগলেন লাল গালিচার উপর দিয়ে।
অপ্রস্তুত গোবিন্দরাম মিত্তির, শোভারাম বসাক প্রমুখেরা এদিক ওদিক তাকিয়ে আগত সাহেবদের মধ্যে পরিচিত রজার ড্রেক ও হলওয়েলকে খোঁজার চেষ্টা করলেন। এই দুই সাহেব আসেননি। ক্লাইভের অনুরোধে তারা নদিয়ায় গিয়েছেন কৃষ্ণচন্দ্রের নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে।
শোভারাম বসাক, গোবিন্দরাম মিত্র, নীলমণি মিত্র, নয়নচাঁদ মল্লিক, শুকদেব মল্লিক—এদের যে ক্লাইভ একেবারেই চেনেন না তা নয়, কতকটা ইচ্ছে করেই এদের উপেক্ষা করে ক্লাইভ বুঝিয়ে দিলেন, আগামী দিনে সুতানুটি-কলকাতা-গোবিন্দপুরের হিন্দুসমাজের প্রধান মুরুব্বি হিসেবে তিনি নবকৃষ্ণকেই দেখতে চান।
নাটমন্দির প্রাঙ্গণে দুর্গামূর্তির সামনে এসে দাঁড়ালেন কর্নেল। দুর্গার রূপ দেখে ক্লাইভ বিস্ময়ে একেবারে অভিভূত। একচালা মূর্তি। ঘোড়ামুখো সিংহের পিঠে দাঁড়িয়ে দেবী দুর্গা অসুর নিধনে রত। দু’পাশে রয়েছে তাঁর ছেলেমেয়েরা গণেশ, কার্তিক, লক্ষ্মী ও সরস্বতী। ফলতার এক মন্দিরে কালীমূর্তি দেখেছিলেন ক্লাইভ। সেই দেবীমূর্তি এমন জাঁকের নয়।
নবকৃষ্ণ বললেন, ‘মা দুর্গার দশ হাত হুজুর। দশ হাতে দশটি অস্ত্র। ওই দেখুন এক হাতে একটা টিনের তৈরি নকলি রাইফেলও ধারণ করে আছেন। অনেকটা কোম্পানির ফ্লিন্টলক রাইফেলের মতো দেখতে। এ ভাবনা আমার।’
তারিফির দৃষ্টিতে নবকৃষ্ণর মুখপানে চেয়ে ক্লাইভ বললেন, ‘ব্রিলিয়ান্ট আইডিয়া মুনশি।’
ঘোড়ামুখো সিংহ দেখে ক্লাইভ শুধোলেন, ‘হোয়াই ইজ দ্য লায়ন হর্সফেসড?’
নবকৃষ্ণ বললেন, ‘কারণ জানি না। আমরা বৈষ্ণব। বৈষ্ণববাড়ির এইরকম রীতি বলে শুনেছি।’
ক্লাইভ বললেন, ‘তোমাদের রিলিজিয়ন ভেরি কমপ্লেক্স। কিছুই বুঝতে পারি না।’
নবকৃষ্ণ হেসে বলেন, ‘হেস্টিংস সাহেবের আবার এসব বিষয়ে খুব আগ্রহ। ফারসি তো দিব্যি শিখেছেন। এখন সংস্কৃত ভাষা আয়ত্ত করার কোশিশ করছেন।’
ক্লাইভ মনে মনে বললেন, ‘ওয়ারেন ইজ টু ইনটেলিজেন্ট। এদেশের শাসক হয়ে উঠতে হলে সব কিছুই খুব ভালো করে জানা দরকার। পুরোপুরি শাসক হয়ে উঠতে এখনও অনেকদিন অপেক্ষা করতে হবে কোম্পানিকে। ততদিন পর্যন্ত আমি থাকব না এদেশে। ওয়ারেন থাকতে পারে। ভাবীকাল হয়তো সে দেখতে পাচ্ছে, তাই হয়তো আগে থেকেই সে সেরে রাখছে প্রস্তুতি ।
ক্লাইভকে অন্যমনস্ক দেখে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন নবকৃষ্ণ। তার আগেই ক্লাইভ বলে উঠলেন, ‘আমি পুজো দিতে চাই। তোমার গডেস কি আমার পুজো নেবে?’
নবকৃষ্ণ ব্যস্ত হয়ে বলেন, ‘কেন নেবে না হুজুর? আপনি বাম হস্তে একটি ফুল ছুড়ে দিলেও মা আশীর্বাদ করবেন আপনাকে। হুজুর আপনিই তো আমার গোবিন্দ। আপনার জন্যেই তো আজ এই সব কিছু। এত রওশন, এত খুশি, জগজ্জননী মায়ের অধিষ্ঠান আমার গৃহে।’
আবেগে জল এসে যায় নবকৃষ্ণর চোখে। উত্তরীয় দিয়ে চোখের জল মোছেন তিনি।
ক্লাইভের ইশারায় এগিয়ে আসেন বেশ কয়েকজন ব্রাহ্মণ। এরা ক্লাইভের সঙ্গেই এসেছেন। ঘাড়ে করে বয়ে এনেছেন ধামা ধামা ফলমূল।
নবকৃষ্ণ নিজেই ছুটে গিয়ে নিয়ে এলেন একধামা উৎকৃষ্ট চাল। ক্লাইভের সামনে ধামাটি ধরে বললেন, ‘পুজো দেওয়ার সময় রুপোর টাকায় নজরানা দেওয়ার রেওয়াজ আছে হুজুর।’
কোটের জেবের ভিতরে হাত ঢুকিয়ে একটা কাপড়ের খেরিয়া বের করলেন কর্নেল। সেটা উপুড় করে দিলেন ধামার উপরে। চালের উপরে ছড়িয়ে পড়ল একশো একটি রুপোর সিক্কা টাকা।
ধামাটি কপালে ঠেকিয়ে নবকৃষ্ণ বললেন, ‘আমার দুর্গাপুজোর আয়োজন সার্থক।’
‘মে গড ব্লেস ইউ।’
নাটমন্দিরে উঠে দেবী দুর্গার চরণে চালের ধামাটি নামিয়ে পুরোহিতের উদ্দেশে নবকৃষ্ণ বললেন, ‘এবারে এই ডালাটিকে দেবীর চরণে নিবেদন করুন তর্কসিদ্ধান্তমশায়।’
দুর্গামূর্তির সামনে জোড়হস্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন ক্লাইভ।
স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে ঢাকিরা। জুলজুলে চোখে তারা দেখছে সাহেবের দেবীভজনা।
ঢাকিদের উদ্দেশে হেঁকে উঠলেন নবকৃষ্ণ, ‘ওরে? থামলি কেন সব? বাজা বাজা বাজা।’
ডুম-ডুমাডুম-ডুম-ডুম-ডুম…! বেজে উঠল পঁচিশজোড়া জয়ঢাক।
চকিতে দুহাতে দুটো ধুনচি তুলে নিয়ে প্রবল আবেগে নাচতে লাগলেন নবকৃষ্ণ।
.
