২
পলাশির প্রান্তরে নবাব সিরাজদ্দৌলার পরাজয় হয়েছে। জয় হয়েছে ইংরেজদের। সিরাজদ্দৌলা পলাতক। এ খবর ছড়িয়ে পড়েছে মুর্শিদাবাদের সর্বত্র। উত্তেজনায় কাঁপছে সুবে বাংলার রাজধানী। নিজামত কেল্লা লাগোয়া চকবাজার সুনসান। দোকানপাট বন্ধ। পথঘাট ফাঁকা।
নবাব বদলের আঁচে ঝলসে যাওয়ার আতঙ্কে আম-আতরফ মানুষের কেউ কেউ রাজধানী ছেড়ে পালিয়েছে। যারা পালিয়েছে তারা বেঁচেছে। যারা শহরেই রয়ে গিয়েছে, তারা দরজার আগল তুলে গৃহবন্দি করে রেখেছে নিজেদের। তবুও রেহাই নেই। দরওয়াজা উপড়ে ঘরে ঘরে ঢুকে তাণ্ডব চালাচ্ছে লুঠেরার দল।
সিরাজদ্দৌলার অনুগত—এই অজুহাতে বহু মানুষকে ঘর থেকে টেনে বের করে খুন করা হচ্ছে প্রকাশ্য রাস্তায়। জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে তাদের ঘরবাড়ি। এমনই হুকুম দিয়েছেন নতুন নয়া নবাবজাদা মিরন। সেই হুকুম অক্ষরে অক্ষরে তামিল করতে উঠে পড়ে লেগেছে চুনিলাল ও মুন্নিলাল–মিরনের দুই জঘন্য সহচর। খন্নাসিতে এদের জুড়ি মেলা ভার।
কোনও কোনও হাভেলির অন্দরমহল থেকে ভেসে আসছে নারীকণ্ঠের করুণ আর্তনাদ। জেনানাদের ইজ্জত লুঠছে শয়তানেরা। কোনও খুবসুরত লেড়কি বা আওরত নজরে পড়লে তাদের জোর করে তুলে নিয়ে গিয়ে চালান করছে জাফরাগঞ্জ প্যালেসে। মিরনের হারেমের জলুস বাড়ছে রোজই। কোন কিসিমের জেনানা নতুন নবাবজাদার মনে রং ধরাবে তা চুনিলাল ও মুন্নিলাল হারগিজ জানে। প্রায় রোজই তারা নতুন নতুন মেয়েমানুষ লুঠ করে হাজির করছে মিরনের সামনে। নবাবজাদার চোখে কদরদারির ভাষা দেখে তারা আহ্লাদে আটখানা হয়ে পড়ে। মিরজাফরের বয়স হয়েছে। তিনি মসনদে বসলেও আগামী দিনে মিরনই হবেন দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। ইজফা, খেলাত, খেতাব, আবদার মঞ্জুর-নামঞ্জুরের মালিক। একথা চুনিলাল ও মুন্নিলাল বোঝে। তাই জুতসই তোফার আশায় বাড়াবাড়ি রকমের আনুগত্য দেখাতে তারা মরিয়া।
এদের ভয়ে মুখ লুকিয়েছে কোতোয়াল। নগর সুরক্ষার দায়িত্ব থেকে হাত গুটিয়ে নিয়েছে কোতোয়ালির সেপাইরা। চুনিলাল ও মুন্নিলাল মিরনের জিগরি দোস্ত, কাজেই এদের বাধা দেওয়ার মুরোদ সেপাই-কোতোয়ালের নেই।
গোটা রাজধানী শহরজুড়ে ঘোর অরাজকতা। নিরীহ মানুষের রক্তে ভাসছে রাজপথ। পথের উপর মুখ থুবড়ে পড়ে আছে লাশ। আগুনে জ্বলতে থাকা চকবাজারের দোকানপাট থেকে উড়ছে কালো ধোঁয়া। নিজামত কেল্লার ঝরোকায় দাঁড়িয়ে এই ধ্বংসলীলা দেখছিলেন শরফ উন্নেসা—আলিবর্দির বেগম, সিরাজের নানি বেগম। ঝরোকায় দাঁড়ালে শহরটা অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়। শরফ উন্নেসা দেখছেন জায়গায় জায়গায় দাউদাউ করে জ্বলছে আগুন। খেয়ালি বাতাসে মানুষের কপাল পোড়ানো আগুনের ধোঁয়া হামলা চালাচ্ছে চেহেল সেতুনের অন্দরে।
ধোঁয়ায় চোখ জ্বালা করছে শরফ উন্নেসার। পোড়া ইট, কাঠ, কাপড়ের গন্ধে নানিবেগমের দম বন্ধ হয়ে আসছে। কী আলিবর্দির সময়ে, কী সিরাজের সময়ে নিজামতের শাসন সংক্রান্ত অনেক বিষয়েই শরফ উন্নেসার মতামতই ছিল শেষ কথা। একদা দোর্দণ্ডপ্রতাপ সিরাজের নানি বেগম আজ চেতনাহীন কাঠের পুতুলের মতোই স্থবির। লবেজান, মাজুর এক জেনানা।
চেহেল সেতুনের চারপাশে জমায়েত হয়েছে মিরজাফরের সেনারা। আলিবর্দির খানদানের বরবাদির বার্তা প্রতিধ্বনিত হচ্ছে তাদের হর্ষে-উল্লাসে, কাড়ানাকাড়ার শব্দে। এভাবেই একদা বরবাদ হয়ে গিয়েছিল মুর্শিদকুলির খানদান। সেদিন আলিবর্দির কুদরতি আতশবাজির রোশনির মতো ঝরে পড়েছিল। গিরিয়ার ময়দান থেকে সরফরাজ খাঁর নিথর দেহ নিয়ে শাহি হাতি ফিরে এসেছিল এই চেহেল সেতুনে।
বহুত পুরোনো কিসসা তো নয়। সেদিন এই মুর্শিদাবাদ নগরী, আঁধারে নিমজ্জিত আজকের এই চেহেল সেতুন বেহেস্ত হিসেবে প্রতিভাত হয়েছিল নানি বেগমের চোখে। আজ সেই প্রাসাদ যেন তাঁর কাছে এক দোজখ। শরফ উন্নেসার ইচ্ছে করছে সিরাজের মতোই পালিয়ে যেতে। দূরে কোথাও। কিন্তু সে উপায় নেই। পলাশির যুদ্ধের হকিকত মুর্শিদাবাদে এসে পৌঁছনোর সঙ্গে সঙ্গে মিরজাফরের সেনারা এসে জড়ো হয়েছে চেহেল সেতুনের সদর দরওয়াজায়। নানি বেগম গৃহবন্দি। এর পরে নসিবে কী আছে জানা নেই। শরফ উন্নেসার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যায়। গলা বুজে আসে কান্নায়।
বিকেলের আলো মরে এসেছে। বড় বড় থামগুলোর লম্বা ছায়া পড়েছে অলিন্দে। অন্দরমহলে আঁধার ঘনিয়ে এসেছে। এই সময় কাজে লেগে যায় বাতিকরের দল। আলোয় আলোয় ছয়লাপ হয়ে ওঠে গোটা প্রাসাদ। আজ কাজে ঢিল দিয়েছে বাতিকরেরা। কাজ ফেলে সহবতের তোয়াক্কা না করে জায়গায় জায়গায় জড়ো হয়ে গুলতানি করছে গোলাম, বান্দা, বাঁদিরা। বদলে গিয়েছে তাদের চোখের ও দেহের ভাষা। নানি বেগমকে আর ঘন ঘন তসলিম, কুর্নিশ জানাচ্ছে না কেউ। এদের চোখে নানি বেগম এখন যেন আজনবী এক জেনানা। বিনা অধিকারে তিনি যেন বিলাসবহুল মহলখানা এখনও দখল করে আছেন। যার সামান্য অনুগ্রহের জন্য গোলাম-বাঁদিরা এতকাল মুখিয়ে থেকেছে, সেই শরফ উন্নেসাই যেন তাদের কাছে এখন অনুগ্রহ, উপহাসের পাত্র।
নানি বেগমের হুকুম তুরন্ত তামিল করতে কেউ আর ব্যস্ত নয়। শরফ উন্নেসার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসে। বুকের কাছে কেমন যেন একটা চাপ অনুভূত হয়। এই পাষাণপুরী থেকে থেকে পালিয়ে যেতে পারলে তিনি যেন সব অবসাদ থেকে নিস্তার পেতেন। কিন্তু মিরজাফরের হুকুম ছাড়া আপাতত কোথাও নড়ার উপায় নেই। অলিন্দ দিয়ে স্খলিত পদক্ষেপে হেঁটে এসে নিজের মহলে প্রবেশ করেন নানি বেগম।
‘আম্মিজান।’
ছোটি বেটি আমিনা বেগমের গলা শুনে ঘুরে তাকান শরফ উন্নেসা।
আমিনা বেগমের চোখেমুখে ঘোর আতঙ্কের ছাপ। বাইরে থেকে ভেসে আসছে চেহেল সেতুন ঘিরে ফেলা মিরজাফরের ফৌজের সেপাইদের উল্লাস। শরফ উন্নেসার দিকে দ্রুত পায়ে এগিয়ে আসেন আমিনা।
‘আম্মিজান! মেরা বেটা–মির্জা–’ কথা আটকে যায়। মায়ের বুকে মাথা রেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন আমিনা বেগম।
মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দেন শরফ উন্নেসা। বলেন, ‘মনে ভরসা রাখ বেটি।’
‘আমাদের ওরা বাঁচতে দেবে না। আমার মির্জাকে ওরা মেরে ফেলবে।’
‘এসব কথা মনে আনিস না বেটি। সিরাজ পাটনায় পৌঁছে গেলে আর ভাবনা নেই। ওখানে রামনারায়ণ আছেন। ল-সাহেব আছেন। ফরাসি ফৌজ আছে।’
‘আমার ভীষণ ভয় করছে আম্মিজান। শুনলাম কাসিম আলি বিরাট ফৌজ নিয়ে ধাওয়া করেছে সিরাজের পিছনে।’
‘মনে সাহস আন আমিনা। তুই দেখে নিস সিরাজ ফের কামিয়াবি ইনসানের মতো ফিরে আসবে। ফের কুর্শি দখল করবে।’
মেয়েকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য কথাগুলো বললেও মনের মধ্যে যেন কোনও জোশ পান না শরফ উন্নেসা। অভিজ্ঞ শরফ উন্নেসা বোঝেন, এ অবস্থায় নসিবের চাকা ঘোরানো বড় শক্ত কাজ।
আমিনা বেগম বলেন, ‘আমার বেটা যেন জিন্দা থাকে। স্রেফ এইটুকুই। আমি আর কিচ্ছু চাই না আম্মিজান। চলো আমরা ক্লাইভ সাহেবের পা ধরে সিরাজের জীবন ভিখ মাঙি।’
অচানকই নারীকণ্ঠের খল অট্টহাসির শব্দ শুনে চমকে ওঠেন মা ও বেটি। তাঁদের নাকে ভেসে আসে জরদা ও আতরের উগ্র গন্ধ। শরফ উন্নেসার মহলের দরজায় এসে দাড়িয়েছেন ঘসেটি বেগম। পরনে জরি বসানো ঝকমকে মসলিনের ঘাঘরা ও কুর্তি। মুখে উগ্র প্রসাধনের চিহ্ন। মাথার চুল বাহারি নকশায় চুড়ো করে বাধা। গা ভর্তি দামি পাথর বসানো হিরের গয়না। ঠোঁট তাম্বুলরাঙা। দুই চোখে সুরমা। পাশে দাঁড়ানো বাঁদির সাজসজ্জাও রংদার। তার হাতে রুপোর পিকদান।
ঘসেটি বেগম বলেন, ‘লেকিন ক্লাইভ সাহেব কি তোমাদের মির্জাকে জিন্দা ছাড়বে? ইংরেজরা কি এতই বেওকুফ? তাজা দুম্বার মতো কুরবানি হবে তোমাদের মির্জা।’
‘ঘসেটি!’ শরফ উন্নেসার গলা চড়ে যায়।
‘বাপরে! এখনও এতো খুনজোশি?’ এই বলে পিচিক করে পিকদানে পানের পিক ফেললেন ঘসেটি বেগম। তারপরে বলেন, ‘বলছিলাম ক্লাইভ সাহেবের পা ধরে ভিখ মেঙে কোনও সুরাহা হবে কি? কেউটের বাচ্ছাকে কেউ কি জিন্দা ছেড়ে দেয়? মরবে। তোমার পেয়ারের নাতি মরবে।’
‘চুপ কর ঘসেটি। চুপ কর।’ চিৎকার করে ওঠেন শরফ উন্নেসা।
তাঁর চোখের দিকে তাকিয়ে ঘসেটি বেগম বলে ওঠেন, ‘এখনও তেজ মরেনি দেখছি। জেনে রেখো তোমার কপালেও মওত নাচছে।’
পিচিক করে রুপোর পিকদানে ফের পানের পিক ফেলেন ঘসেটি বেগম।
আমিনা বেগম বলে ওঠেন, ‘আম্মিজানকে এসব তুমি কী বলছ বড়ে বহেন?’
‘দূর হয়ে যা আমার চোখের সামনে থেকে।’ গর্জন করে উঠে বড় মেয়ের দিকে কয়েক পা এগিয়ে যান শরফ উন্নেসা।
‘উরিব্বাস! মারবে নাকি? এত গুমানি কিসের? আমি ফালতু বকবক করছি না। তোমাদের বরবাদি দেখে আজ খুশি মানাবে ঘসেটি বেগম। একদিন ঘসেটির তাগদ জোশ সব কেড়ে নিয়েছিল তোমার সিরাজ। সেদিন তোমরা হেসেছিলে। আজ ঘসেটি হাসবে।’
কাতর গলায় আমিনা বেগম বলে ওঠেন, ‘আমার বেটাকে রহেম করো বড়ে বহেন। তার জন্য দোয়া মাঙো।’
দেহ দুলিয়ে হেসে ওঠেন ঘসেটি বেগম।
রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে শরফ উন্নেসা বলেন, ‘তোর বেতমিজি বরদাস্ত করেও সিরাজ তোকে জিন্দা রেখেছে, ইমানদারির সঙ্গে তোর জিন্দেগি গুজরানের বন্দোবস্ত করেছে। আজ তুই তার মওত চাইছিস?’
‘আমি থোড়ি চাইছি। চাইছেন নবাব মিরজাফর খাঁ, ক্লাইভ সাহেব, মুর্শিদাবাদের বেবাক আমআদমি। সবাই চাইছে আলিবর্দির খানদানের বরবাদি। বদলা নেওয়ার আগুন জ্বলছে সকলের চোখে।’
‘তুইও যে সেই আগুনে পুড়ে মরবি।’
সজোরে হেসে উঠে ঘসেটি বেগম বলেন, ‘তোমার দিমাগ ঠিক নেই নানি বেগম। ঘসেটি ইংরেজদের দোস্ত। মিরজাফরের মদতদার। সিরাজের দুশমন। সে নয়া জমানায় তাজা গুলাবের মতো সৌগন্ধ ছড়াবে। জিন্দা থাকবে। মরবে তুমি, আমিনা আর তোমার পেয়ারের নাতি।’
সহসা অলিন্দ থেকে ভেসে আসে তুমুল কোলাহলের শব্দ। ঝড়ের গতিতে শরফ উন্নেসার মহলে প্রবেশ করে একদল সৈন্য। এদের সঙ্গে রয়েছে হারেমের দারোগা খুশিবানু ও তার বাহিনী। ভয় পেয়ে মাকে জড়িয়ে ধরেন আমিনা বেগম।
শরফ উন্নেসা শুধোন, ‘কী ব্যাপার?’
খুশিবানু বলে, ‘আপনাকে গ্রেফতার করতে এসেছি বেগম সাহেবা। পরোয়ানা আছে।’
দীর্ঘশ্বাস ফেলে শরফ উন্নেসা বলেন, ‘চলো।’
ঘসেটি বেগম ফের হেসে উঠে বলেন, ‘এই তোমার বরবাদির শুরুয়াত নানি বেগম।’
খুশিবানুর দলের কয়েকজন মহিলা সেপাই এগিয়ে এসে শক্ত করে দুপাশ থেকে ধরতে যায় নানি বেগমকে।
শরফ উন্নেসা সহসা ক্ষোভে ফেটে পড়েন। ‘খামোশ! এতকাল আলিবর্দির খানদানের নিমক খেয়েছ খুশিবানু। এখন তাঁদের ইজ্জতটুকু অন্তত বজায় রাখো। মামুলি এক কয়েদির মতো আমাদের গ্রেফতারির প্রয়োজন নেই। আমরা বাধা দেব না। কোথায় নিয়ে যাবে চলো।’
সম্ভ্রম দেখিয়ে সরে দাঁড়ায় মহিলা সেপাইরা। শরফ উন্নেসা ও আমিনা বেগম মহল ছেড়ে বেরিয়ে যান।
সজোরে হেসে ওঠেন ঘসেটি বেগম। তারপর বলেন, ‘সাবাশ খুশিবানু। ইনাম মিলবে। লেকিন থোড়া কম। এদের কোমরে দড়ি বেঁধে মামুলি কয়েদির মতোই নিয়ে যাওয়া উচিত ছিল।’
এবারে ঘসেটি বেগমের সামনে এসে দাঁড়িয়ে খুশিবানু বলে, ‘আপনিও চলুন বেগম সাহেবা।’
খুশিবানুর প্রশ্নের ভঙ্গিমায় চমকে উঠে বিস্ফারিত চোখে শুধোন, ‘কোথায়?’
‘আপনাকেও কয়েদ করার হুকুম আছে।’
‘তুমি ঝুট বলছ।’ ঘসেটি বেগম চেঁচিয়ে ওঠেন।
শান্ত গলায় খুশিবানু বলে, ‘পরোয়ানা আছে আমার সঙ্গে।’
‘নেহি। ইয়ে নেহি হো সাকতা।’ প্রায় আর্তনাদ করে ওঠেন ঘসেটি বেগম।
‘নবাবজাদা মিরনের দস্তখত করা পরোয়ানা আমার কাছে আছে মালকিন।’
‘ঘসেটি বেগম সিরাজের দুশমন। এই দুশমনি বহুত দিনের। এই নয়া জমানায় সে কয়েদ হতে পারে না। তুমি ঝুট বলছ খুশিবানু।’
এই বলে প্রবল আক্রোশে খুশিবানুর উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন ঘসেটি বেগম।
মুহূর্তের মধ্যে কয়েকজন মহিলা সেপাই এসে ঘসেটি বেগমকে জাপটে ধরে মহল থেকে বের করে নিয়ে যায়। এদের সঙ্গে রীতিমতো ধস্তাধস্তি বেধে যায় আলিবর্দির বড়ি বেটির। মহিলা সেপাইরা বলপ্রয়োগ করে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে যেতে থাকে ঘসেটি বেগমকে।
ঘসেটি বেগম চিৎকার করতে থাকেন, ‘ছাড়ো আমাকে। ছেড়ে দাও। একবার অন্তত মিরজাফর খাঁর সঙ্গে কথা বলতে দাও।’
মহিলা সেপাইরা এসব কথায় কর্ণপাত করে না। কারাকক্ষে নিক্ষেপিতা হন ঘসেটি বেগম। লোহার দরওয়াজা সশব্দে বন্ধ হয়। প্রবল হতাশায় গরাদ ধরে ঝাঁকিয়ে চিৎকার করতে থাকেন ঘসেটি বেগম। ‘রহেম করো আমাকে। ছেড়ে দাও।’
.
অন্ধকার কারাকক্ষের অভ্যন্তরে কালো পাথরের মেঝেতে পাতা ছেড়া বনাতের উপর হাঁটুতে মুখ গুঁজে বসেছিল নিজামুদ্দিন। মাত্র সাত দিনেই তার শরীরটা শুকিয়ে গিয়েছে অনেকখানি।
দেওয়ান মোহনলালের উপর হামলা করার দায়ে অভিযুক্ত নিজামুদ্দিন। এ কোনও ঝুটা ইলজাম নয়। চকবাজারে আমজনতার চোখের সামনেই ঘটেছিল ঘটনাটা। অনেকেই দেখেছে। অকুস্থলেই নিজামুদ্দিন ধরা পড়ে। আসলে নিজামতের বদশাসনের উপর, নবাব সিরাজদ্দৌলার উপর, মোহনলালের উপর বহুদিনের আক্রোশ চকবাজারের আতরের কারবারি নিজামুদ্দিনের।
বেশ পুরোনো কহানি। তখন সুবে বাংলার মসনদে আসীন আলিবর্দি খাঁ। নবাবের আদরের নাতি সিরাজ ও তার দোস্তদের বেনজির জুলুমে সাধারণ মানুষ জেরবার। গঙ্গার উপর যাত্রীবোঝাই নৌকো উলটে দিয়ে মজা লুটত সিরাজ ও তার দোস্তের দল। ডুবন্ত মানুষের অসহায় আর্তনাদ দেখে পৈশাচিক উল্লাসে ফেটে পড়ত তারা। এসব কাজে সিরাজের অন্যতম দোসর ছিল মোহনলাল ও মেহেদি নিসার খাঁ। এই মজা লোটার খেলায় বহু মানুষ তাদের প্রিয়জনকে হারিয়েছে। নিজামুদ্দিন হারিয়েছিল তার পেয়ারের বিবিকে।
সেদিন শ্বশুরালে যাচ্ছিল নিজামুদ্দিন। নৌকো ছিল যাত্রীতে ঠাসা। সেই নৌকোর দিকে ধেয়ে এসে ধাক্কা মারে সিরাজের বজরা। নৌকো উলটে যায়। বর্ষায় ফুলে ওঠা নদীতে হাবুডুবু খেতে থাকে মানুষগুলো। নিজামুদ্দিনের বিবির গর্ভে বেড়ে উঠছিল একটা ছোট্ট প্রাণ। নিজামুদ্দিনের রক্তের উত্তরাধিকার। বাঁচার প্রবল আকুতিতে জলের উপরে প্রসারিত বিবিজানের মেহেন্দি রাঙানো হাতখানা নিজামুদ্দিন চোখ বুজলেই দেখতে পায়। প্রাণপণে সাঁতার দিয়ে কাছে গিয়েও বিবির হাতখানা সে ধরতে পারেনি। চোখের সামনেই তলিয়ে যায় তার বিবি। তখন সিরাজের বজরা থেকে ভেসে আসছিল হাসির হররা।
এই শারারতির কোনও সুবিচার পায়নি নিজামুদ্দিন। কোতোয়ালিতে নালিশ জানাতে গিয়েছিল। আঁতকে উঠেছিল দারোগা। নবাবের নাতির বিরুদ্ধে ইলজাম আনতে চায় মামুলি এক আদমি! চাবুক মেরে নিজামুদ্দিনকে কোতোয়ালির কাছারি থেকে বের করে দেয় দারোগা। কোতোয়ালি থেকে বেরিয়ে এসে রক্তাক্ত দেহে ফুঁসতে থাকে নিজামুদ্দিন। দুচোখে ধকধক করে জ্বলতে থাকে প্রতিশোধের আগুন। সেই আগুন বহুদিন ধরে বুকের মধ্যে জ্বালিয়ে রেখেছিল নিজামুদ্দিন। আলিবর্দির মওত হল। মসনদে বসলেন সিরাজদ্দৌলা। দেওয়ান হলেন মোহনলাল। যারা নিজামুদ্দিনের সুখের জীবনটাকে বরবাদ করল তারা হয়ে উঠল দেশের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। হায় রে দুনিয়াদারের খায়েশ!
দিন সাতেক আগে ফৌজ নিয়ে পলাশির পথে চলেছিলেন মোহনলাল। সঙ্গে হাতি, ঘোড়া, উট, লোকলস্কর, সেপাই-পেয়াদা। কাড়ানাকাড়া বাজিয়ে চলেছে বিরাট বাহিনী। পলাশির প্রান্তরে নাকি নবাবের সঙ্গে ইংরেজদের লড়াই বাধতে চলেছে। চকবাজারের পথের ধারে ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা দেখছিল নিজামুদ্দিন। শাহি হাতির পিঠে নবাবি কেতায় মোহনলালকে বসে থাকতে দেখে হঠাৎই নিজামুদ্দিনের মাথায় আগুন জ্বলে উঠল। মনের মধ্যে দীর্ঘ দিন পুষে রাখা আক্রোশের বিস্ফোরণ ঘটল সহসা। পথের পাশ থেকে একটা পাথর কুড়িয়ে নিয়ে সে মোহনলালের মাথা লক্ষ্য করে ছুড়ে মেরেছিল নিজামুদ্দিন। অল্পের জন্য পাথর লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। কিন্তু কোতোয়ালির সেপাইদের হাতে নিজামুদ্দিন ধরা পড়ে যায়। তারপর কয়েদ হয় নিজামত কেল্লার। এখনও সে বন্দি।
নবাব যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ায় এখনও বিচার শুরু হয়নি। সুবে বাংলার সর্বশক্তিমান দেওয়ানজির উপরে হামলার ফরিয়াদ তার নামে। নিজামতের কানুনে এমন অপরাধের একমাত্র সাজা হল মওত। তাই নিজামুদ্দিন কারাকক্ষে বসে মৃত্যুর দিন গুণে চলেছে। কয়েদখানার অভ্যন্তরে সবসময়ই জমাট আঁধার। কখন দিন হয়, কখন রাত নামে তা টের পাওয়া যায় না। বাইরের খবর কয়েদখানার পাথরের দেওয়াল ভেদ করে ভিতরে আসে না। পলাশির প্রান্তরে কী ঘটে গিয়েছে, নিজামুদ্দিনের জানা নেই।
সহসা সচকিত হয়ে ওঠে নিজামুদ্দিন। অনেকজোড়া পায়ের শব্দ এগিয়ে আসছে কারাকক্ষের দিকে। পায়ের শব্দের সঙ্গে ভেসে আসছে একটা কোলাহলের শব্দ। সে শব্দ যেন উল্লাসের। কীসের কোলাহল? কীসের উল্লাস? কারা অভ্যন্তরে তো কয়েদিদের আর্তনাদ ও কান্না ছাড়া আর কোনও শব্দ শুনতে পাওয়া যায় না। কৌতূহলী হয়ে মোটা গরাদ দেওয়া দরওয়াজার দিকে ছুটে যেতে চায় নিজামুদ্দিন। পায়ে যে লোহার বেড়ি বাঁধা রয়েছে খেয়াল নেই। নিজামুদ্দিন হুমড়ি খেয়ে পড়ে পাথরের মেঝের উপরে। কপাল ফেটে রক্ত ঝরতে থাকে।
কারাকক্ষের সামনে এসে দাঁড়ায় একদল সেপাই। মুখ তুলে তাকায় নিজামুদ্দিন। অন্তিমক্ষণ কী উপস্থিত? সেপাইরা কি তার মওতের পরোয়ানা নিয়ে এসেছে?
সশব্দে দরজার হুড়কো খোলে সেপাইরা। দুজন এগিয়ে এসে তার পায়ের বেড়ি খুলে দেয়।
একজন বলে ওঠে, ‘ভাগ জলদি। খালাস।’
খালাস? নিজের কানদুটোকে বিশ্বাস হয় না নিজামুদ্দিনের। তাকে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকতে দেখে এক সেপাই বলে, ‘নবাব মিরজাফর খাঁ সাহেব নিজামত কেল্লার সব কয়েদিকে খালাস করে দেওয়ার পরোয়ানা দিয়েছেন। বহুত খুশনসিব তোর।’
‘নবাব মিরজাফর খাঁ! তার মানে?’ নিজামুদ্দিন বিস্মিত গলায় প্রশ্ন করে।
‘আরে বেওকুফ পলাশির লড়াই হাসিল করেছে ইংরেজরা। বরবাদ হয়ে গেছেন নবাব সিরাজদ্দৌলা। মুর্শিদাবাদ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন। মিরমদনের মওত হয়েছে। মোহনলালও ভেগেছে।’
নিজামুদ্দিনের মুখটা খুশিতে ঝলমল করে ওঠে। পয়গম্বরের উদ্দেশে সে বহুত বহুত সুক্রিয়া জানায়। এতকাল সে মনে মনে যা চেয়ে এসেছে, তা সত্যি হয়েছে। খোদাতালা মুখ তুলে চেয়েছেন। ইনসাফ মিলেছে। বরবাদ হয়েছে আলিবর্দির খানদান। সিরাজদ্দৌলা মসনদ ছেড়ে পালিয়েছেন। ভেগেছেন মোহনলাল। এবারে তার বিবির আত্মা শান্তি পাবে। আনন্দে নিজামুদ্দিনের দু’চোখ পানিতে ভাসে।
সূর্য ডুবেছে খানিক আগে। আকাশের বুকে অস্তরাগের লালিমা। আঁধার এসে আঁচল বিছিয়ে বসবে খানিক বাদেই। নিজামুদ্দিনের মনে আশা নতুন জমানায় আমলোগ সুশাসন পাবে। বন্ধ হবে জুলমাত। চকবাজারের পথ ধরে এগোতে থাকে নিজামুদ্দিন। নয়া জমানায় সে নিজের মতো করে খুশি মানাতে চায়। নিজামুদ্দিন মনে মনে ঠিক করে, কাল সে বিনি পয়সায় মিঠাই খাওয়াবে সব খদ্দেরকে। ফুল, লতাপাতায় সাজিয়ে তুলবে দোকানটাকে। এই পার্থিব জগতে চকবাজারের ওই দোকানটাই তো তার অকালে চলে যাওয়া বিবির তসবির। দোকানের নাম জিনাত মঞ্জিল। বিবির নামে নাম।
অনেকদিন বন্ধ পড়ে আছে দোকানটা। এখনই গিয়ে দোকান খুলে সাফসুতরো করতে হবে। কাঠের তাকে ঠাসা রয়েছে আতর, গুলাব জলের শিশি। ওসবে এতদিনে ধুলো পড়েছে নিশ্চয়ই। কাঁচের বোয়েমে ঠাসা ছিল শুকনো ফল, মোরব্বা। সে সবের কী অবস্থা কে জানে। তবকে মোড়া লাড্ডুগুলো কি চুহার পেটে গেল? এসব নানা কথা ভাবতে ভাবতে হাঁটার গতি বাড়ায় নিজামুদ্দিন।
.
