২৭
চাঁদ ঢাকা পড়েছে মেঘের আস্তরণে। সন্ধে পেরিয়ে গড়াচ্ছে রাত।
মোরাদবাগ প্যালেস অভিমুখে তীব্র গতিতে ছুটে চলেছে কয়েকজন ঘোড়সওয়ার। এই দলের একেবারে মাঝের দুই সওয়ারি হলেন নিজামতের বর্তমান দেওয়ান রায়দুর্লভ এবং একদা ঘসেটি বেগমের দেওয়ান, বৈদ্যকুলপতি রাজবল্লভ সেন। এদের সামনে, পিছনে ও দুপাশে টগবগিয়ে ছুটছে দেহরক্ষীর দল।
সিরাজের আমলে কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন প্রবল উচ্চাকাঙ্ক্ষী রাজবল্লভ। ঘসেটি বেগমের সঙ্গে তিনিও বন্দি হয়েছিলেন চেহেল সেতুনে। নতুন জমানায় মুক্তি পেলেও তেমন গুরুত্বপূর্ণ কোনও পদ তাঁর কপালে জোটেনি। তার উপরে তাঁর চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে নবাবজাদা মিরন। দেওয়ান রায়দুর্লভও মিরনকে নিয়ে চিন্তিত।
নিজামতের রাশ এখন মিরনের হাতে। ক্ষমতার আস্বাদ পেয়ে দিনে দিনে সে বেপরোয়া, বেলাগাম হয়ে উঠছে। তার যথেচ্ছাচারের কহানি চকবাজারে কান পাতলেই শোনা যায়। নবাবের কাছে এ নিয়ে অভিযোগ জানিয়েও কোনও ফল হচ্ছে না। অরাজকতায় ও বিশৃঙ্খলার ঘূর্ণাবর্তে ডুবছে মুর্শিদাবাদ। মিরনের বিষ নজরে পড়েছেন দেওয়ান রায়দুর্লভ। ঘাতকবাহিনীর হাতে অচানক তিনি খুন না হয়ে যান, এই ভয়ে ইদানীং কাঁটা হয়ে রয়েছেন দেওয়ানজি। আলিবর্দি ও সিরাজদ্দৌলার জমানায় নিজামতের শাসন কাঠামোয় উপরের দিকে যাদের অবস্থান ছিল, তাদের হটিয়ে নিজের মোসাহেব, ইয়ারদোস্তদের বিভিন্ন পদে বসাতে চায় মিরন। সে চায়, সুবে বাংলার রাজনীতিতে নিজের একচ্ছত্র আধিপত্য। বুক ফুলিয়ে তার ইয়ারদোস্তদের কাছে হামেশাই সে কবুল করে—‘সব বুডডা শুয়ারগুলোকে কোতল করে ছাড়ব। জবরদস্ত রগড় হবে।’
মোরাদবাগ প্যালেসের সামনে এসে স্লথ হয় ঘোড়সওয়ারদের গতি।
সদর দরওয়াজার কপাট খুলে দেয় পাহারারত সেপাইরা।
প্যালেসের চৌহদ্দিতে প্রবেশ করলেন রায়দুর্লভ ও রাজবল্লভ।
এগিয়ে এসে তাঁদের অভ্যর্থনা জানালেন নবকৃষ্ণ।
উচ্চতায় মাঝারি। গায়ের রং শ্যামলা। কপালে চন্দনের প্রলেপ। কামানো মাথার পিছনে শিখায় বাধা রয়েছে ফুল। পরনের শান্তিপু্রী ধুতি গোড়ালি ছাড়িয়ে খানিকটা উপরে উঠে গিয়েছে। উদলা গা। গলায় জড়ানো ঘিয়ে রঙের রেশমের উত্তরীয়। মুখচোখের গড়ন খুবই সাধারণ। গড়পরতা গেঁয়ো লোকেদের মতো। তবুও এই নাকি এখন প্রবল প্রতাপশালী। ক্লাইভ সাহেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ চেয়ে সুবে বাংলার দেওয়ানকেও দরবার করতে হয় এঁর কাছে। অবাক চোখে নবকৃষ্ণকে দেখছিলেন রাজবল্লভ। তাঁর সঙ্গে নব মুনশির এই প্রথম মোলাকাত।
নবকৃষ্ণ বললেন, ‘অন্দরে আসুন হুজুর।’
‘আপনিই নবকৃষ্ণ?’ শুধোলেন রাজবল্লভ।
বিনয়ে গলে পড়ে নবকৃষ্ণ বললেন, ‘জি হুজুর। আসুন।’
দুই অতিথিকে নিয়ে প্যালেসের অন্দরে প্রবেশ করলেন নবকৃষ্ণ।
দেওয়ালগিরির আলো দেওয়ালে গাঁথা ছোট ছোট আরশি থেকে প্রতিফলিত হয়ে বেশ বড়সড় ঘরখানাকে ঔজ্জ্বল্যে ভরিয়ে তুলেছে। মাটিতে বিছানো রয়েছে নকশাদার কোমল গালিচা। ঘরের ঠিক মাঝখানে মাথার উপরে সিলিং থেকে ঝুলছে মস্ত ঝাড়বাতি। তার ঠিক নীচে রয়েছে মেহগিনি কাঠের বৃত্তাকার একটা টেবিল। তাকে ঘিরে বৃত্তাকারে সাজানো রয়েছে গদিআঁটা কয়েকটা কুরসি।
বসলেন রাজবল্লভ ও রায়দুর্লভ।
তাঁদের সমুখে বিনয়ের অবতারস্বরূপ জোড়হস্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন নবকৃষ্ণ।
রায়দুর্লভ খোশামুদে গলায় শুধোলেন, ‘কেমন আছেন মুনশিজি?’
‘আপনাদের রহেমে সহি সালামত, খুশ তবিয়ত আছি।’
রায়দুর্লভ বললেন, ‘এই অনওয়াক্তে ক্লাইভ সাহেবের দর্শন চেয়ে আপনাকে বোধহয় খুব তকলিফের মধ্যে ফেলেছিলাম।’
নবকৃষ্ণ ফের বিনয়ে গলে পড়ে বললেন, ‘আমার আবার তকলিফ কী? আপনার আর্জিটা শুধু পেশ করেছিলাম সাহেবের কানে। তিনি হলেন জগদীশ্বরের অবতারস্বরূপ। ভক্তিযোগে ডাকলেই সাড়া দেন। হে-হে।’
রায়দুর্লভ হেসে বললেন, ‘আপনি নিজেই বা কম কী? লোকে আতান্তরে পড়লে তো কৃষ্ণেরই স্মরণ নেয়। এই নয়া জমানায় আপনি হলেন কেষ্টঠাকুর।’
লম্বা জিভ কেটে নবকৃষ্ণ বললেন, ‘এ কী বলছেন হুজুর? আমি অতি নগন্য মানুষ।’
রায়দুর্লভ রসিকতার সুরে বললেন, ‘তা বললে মানব কেন? আপনার বিচারবুদ্ধির উপর ভরসা রাখেন ক্লাইভ সাহেব। এ কী কম কথা?’
রাজবল্লভের মুখ গম্ভীর। সাধারণ গেঁয়ো প্রজার মতো চেহারার মানুষটার সঙ্গে যেমন খোশামুদে ঢঙে কথা কইছেন সুবে বাংলার দেওয়ান, এটা তাঁর ঠিক পছন্দ হচ্ছে না। মহারাজ রাজবল্লভের আভিজাত্যে কোথায় যেন বাঁধছে। ষাট টাকা মাইনের কোম্পানির চাকুরে। ছোঃ! কিন্তু এঁকে উপেক্ষা করারও উপায় নেই। কথা কইছেন না বটে কিন্তু গভীর মনোযোগের সঙ্গে নবকৃষ্ণকে লক্ষ্য করে চলেছেন রাজবল্লভ। ক্লাইভের মুনশির কথা ইদানীং নিজামতের অন্দরে খুবই চর্চিত। মহারাজ রাজবল্লভ সেসব শুনেছেন। নবকৃষ্ণকে নিয়ে তাঁর কৌতূহলের শেষ নেই।
অনেকে বলে, কোনও ব্যাপারে কর্নেলের ‘না’ কে ‘হ্যাঁ’ করানোর ক্ষমতা রাখেন একমাত্র তাঁর মুনশি। এর প্রমাণ রাজবল্লভ ইতিমধ্যেই পেয়েছেন। মিরনের নজর এড়াতে রাতের দিকে কর্নেলের সাক্ষাৎ চেয়েছিলেন রায়দুর্লভ। ক্লাইভ প্রথমে সম্মতি দেননি। পরে রাজি হয়েছেন নব মুনশির অনুরোধে। এই সামান্য লোকটা এত ক্ষমতাধর, এটা যেন রাজবল্লভের ঠিক বিশ্বাস হচ্ছে না।
নবকৃষ্ণ বললেন, ‘আপনাদের কিয়ৎকাল অপেক্ষা করতে হবে। সাহেব ব্যস্ত রয়েছেন। স্ক্র্যাফটন ও হেস্টিংস সাহেবের সঙ্গে জরুরি মিটিং চলছে। তা আপনাদের শরাব চলবে তো?’
রায়দুর্লভ বললেন, ‘না এখন বরং—’
ফরসির নলটা টেনে নিয়ে রাজবল্লভ গম্ভীর গলায় বললেন, ‘থাক’।
নবকৃষ্ণ মুচকি হেসে বললেন, ‘ও রসে না মজলে এ সময়ে সাহেবের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করা কঠিন। এ সময়ে রসিক মানুষদের সঙ্গেই কথা কইতে ভালোবাসেন সাহেব। আপনাদের হাতে শরাবের পাত্র না দেখলে তিনি কূপিত হতে পারেন। শেষে আপনাদের আলোচনাই না অসম্পূর্ণ থেকে যায়।’
‘তাহলে বরং—’ একটু যেন শঙ্কিত হয়ে রাজবল্লভের মুখের দিকে তাকালেন রায়দুর্লভ।
রাজবল্লভ বললেন, ‘বেশ তো এক পাত্র না হয়—’
ডোরিতে টান দিলেন নবকৃষ্ণ। ছুটে এল একজন গোলাম।
নবকৃষ্ণ বললেন, ‘শরাব লে আও।’
খানিকবাদে একজন সাকি এসে দিয়ে গেল শরাবপূর্ণ বেলজিয়ান গ্লাসের পানপাত্র।
নবকৃষ্ণ বললেন, ‘ক্ল্যারেট। কর্নেলের খুব পছন্দের চিজ।’
‘কতক্ষণ বসতে হবে মুনশিজি?’ পানীয়ের পাত্র হাতে নিয়ে প্রশ্ন করলেন রায়দুর্লভ।
‘তা অনেকক্ষণ হল মিটিং চলছে। আপনারা আয়েশ করুন। আমি দেখছি।’ এই বলে ব্যস্তসমস্ত হয়ে কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলেন নবকৃষ্ণ।
কালান্তরের রেখাটা আজ যেন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন রাজবল্লভ। নবাব তো দূরের কথা, কিছুকাল আগেও মুর্শিদাবাদ দরবারের ছোটখাটো একজন ওমরাহের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে কালঘাম ছুটে যেত ইংরেজ বণিকদের। অনেক উৎকোচ, উপঢৌকন দেওয়ার পর দেখা করার অনুমতি মিলত। সিরাজদ্দৌলার মুসিবত এই চিত্রটাকে বদলে দিয়েছে। স্থান পরিবর্তন করেছে ক্ষমতার উৎসবিন্দু। আজ ক্লাইভের সঙ্গে সাক্ষাৎ চেয়ে মুনশি নবকৃষ্ণর কাছে জোড়হস্ত হতে হচ্ছে সুবে বাংলার দেওয়ানকে। নসিব বড় নিষ্ঠুর। শঙ্কায় বুক কেঁপে ওঠে রাজবল্লভের। পুরোনো মর্যাদা, গৌরব ফের কি আর ফিরে পাওয়া সম্ভব?
‘ওয়েলকাম টু দিস প্যারাডাইস।’
ক্লাইভকে ঘরে ঢুকতে দেখেই শশব্যস্ত হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে সেলাম জানালেন রায়দুর্লভ ও রাজবল্লভ। ক্লাইভের পিছন পিছন ঘরে ঢুকলেন হেস্টিংস, স্ক্র্যাফটন ও নবকৃষ্ণ।
‘প্লিজ সিট।’ এই বলে বসলেন ক্লাইভ।
কুরসিতে বসে রায়দুর্লভ বললেন, ‘এই অনওয়াক্তে আপনাকে তকলিফ দেওয়ার জন্য দুঃখিত।’
‘তকলিফের কিছু নেই। এটাই আমার কাজের সময়।’ পায়ের উপরে পা তুলে দিলেন ক্লাইভ। তাঁর পিছনে কয়েকটা কুরসি দখল করে বসলেন স্ক্র্যাফটন, হেস্টিংস ও নবকৃষ্ণ।
‘বলুন। আপনাদের তকলিফ কী আছে?’
‘হে হে সহি আন্দাজ করেছেন। তকলিফই বটে।’ হাত কচলে বললেন রায়দুর্লভ।
চেয়ারে দেহটাকে আর একটু এলিয়ে দিয়ে ক্লাইভ বললেন, ‘হাউ ক্যান আই হেল্প ইউ?’
রায়দুর্লভ বললেন, ‘শুনলাম আপনি কয়েকদিনের মধ্যেই কলকাতা ওয়াপস যাবেন।’
‘ইয়েস। আই অ্যাম ওয়েটিং ফর মেজর আয়ারকুট টু কাম ব্যাক ফ্রম পাটনা।’
‘আপনি ফিরে গেলে মুর্শিদাবাদের হাল যে ভয়ানক হয়ে উঠবে।’ গুজারেশ করলেন রাজবল্লভ।
ক্লাইভ বললেন, ‘কোম্পানি সওদা করতে এসেছে। আইন-কানুন সামলানো তো আমাদের কাজ নয়। নিজামত চলে নবাবের খায়েশে। আমি কী করতে পারি?’
রায়দুর্লভ বললেন, ‘গোলমাল যে একেবারে গোড়ায়।’
একদৃষ্টে রায়দুর্লভের মুখপানে চেয়ে রইলেন ক্লাইভ। কী বলতে চাইছেন দেওয়ানজি, তার আন্দাজ পাওয়ার কোশিশ করছেন।
রায়দুর্লভ বললেন, ‘নবাব নালায়েক। নবাবজাদা মিরন কাউকে মানে না।’
স্ক্র্যাফটন বলে উঠলেন, ‘হি ইজ অ্যা রাসকেল।’
সম্মতি জানালেন হেস্টিংস। ‘এক খতরনক ইনসান।’
স্ক্র্যাফটনের কথায় সম্মতি জানিয়ে রায়দুর্লভ বললেন, ‘সহি বাত বলেছেন সাহেব।’
‘নবাবজাদা তকলিফের কারণ হয়ে দাঁড়ালে রেসিডেন্টকে জানাবেন।’ এই বলে পানীয়ের পাত্র হাতে তুলে নিলেন ক্লাইভ।
‘নিজে অক্ষত থাকলে তো রেসিডেন্ট সাহেবকে জানানোর ফুরসত পাব হুজুর।’
রাজবল্লভ বললেন, ‘আপনার ভয়ে আপাতত সমঝে চলছে মিরন।’
রায়দুর্লভ যোগ করলেন, ‘আপনি চলে গেলে যে সে হাতে মাথা কাটবে সকলের।’
‘ডোন্ট ওয়ারি। আমি নবাবকে হুশিয়ার করে দিয়ে যাব।’
‘নবাব নিজেই তো ভয়ে কাবু। ছেলে বাপকে মানে না।’ বললেন রাজবল্লভ।
রায়দুর্লভ গুজারেশ করলেন, ‘ছোকরা নিজের বাপকেই না কোতল করে বসে।’
ক্লাইভ শুধোলেন, ‘তা কী চান আপনারা?’
‘মিরজাফর খাঁকে মসনদ থেকে সরিয়ে দিতে চাই। বাপ হটে গেলে ছোকরার আপসানি বন্ধ হবে। এতে তামাম মুর্শিদাবাদের ভালাই হবে।’
গোটা ঘর নিশ্চুপ। ঠোঁটে পাইপ গুঁজলেন ক্লাইভ। তার চোখের দৃষ্টি রায়দুর্লভ ও রাজবল্লভের মুখের উপরে স্থির হয়ে আছে। একজন দাখিলা এসে চকমকি পাথর ঠুকে পাইপটা ধরিয়ে দিয়ে গেল। ঘরের মধ্যে কুণ্ডলী পাকিয়ে উড়তে লাগল পাইপের ধোঁয়া। মনে মনে মুচকি হাসছেন ক্লাইভ। বাইরে অবশ্য তার কোনও প্রকাশ নেই। ভাবলেশহীন মুখ। সে মুখের ভাষা পড়ে তাঁর অন্তরের চিন্তাস্রোতের তল পাওয়া দ্বিতীয় কারও পক্ষে দুষ্কর। ক্লাইভ ভাবছেন, চমৎকার! এমনই তো আমি চেয়েছিলাম। আপনারা যত কলহ করবেন, তত দুর্বল হবেন নবাব। এতে তাঁকে তাঁবে রাখতে সুবিধা হবে কোম্পানির।
ঠোঁট থেকে পাইপটা হাতে নিয়ে ক্লাইভ শুধোলেন, ‘কাকে বসাতে চান মসনদে?’
‘মির্জা মেহেদিকে।’
একটু যেন চাঞ্চল্য প্রকাশ পেল ক্লাইভের মুখে। গদিমোড়া কুরসির গায়ে হেলানো দেহটাকে সোজা করে প্রশ্ন করলেন, ‘মির্জা মেহেদি– ইউ মিন ব্রাদার অফ সিরাজদ্দৌলা?’
‘জি হুজুর।’
ভুরু কুচকে ক্লাইভ বললেন, ‘হি ইজ টু ইয়ং—’
রাজবল্লভ বললেন, ‘তাতেই তো সুবিধে।’
‘কীসের সুবিধে?’
‘তাগদের রশি থাকবে আমাদের হাতে।’ বললেন রায়দুর্লভ।
‘আমরা বলতে? হোয়াট ডু ইউ মিন?’ প্রশ্ন করলেন ক্লাইভ।
রায়দুর্লভ জবাবে বললেন, ‘আমি, জগৎশেঠ মহাতপচাঁদ, মহারাজ রাজবল্লভ।’
‘আই সি।’
রাজবল্লভ বললেন, ‘এছাড়াও আছেন পাটনার নায়েব রামনারায়ণ, মেদিনীপুরের ফৌজদার রাজারাম। আপনি এই পরিকল্পনায় মদত দিলে হিন্দু জমিদারেরাও আমাদের পিছনে দাঁড়াবে।’
‘নবাবকে মসনদচ্যুত করার কী কারণ দেখাতে চান আপনারা?’
রায়দুর্লভ বললেন, ‘নিজামতের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে। নবাব ডুবে থাকছেন ভাঙ, শরাব, জেনানার নেশায়। নবাবজাদা চলছে তার খুশখেয়ালে। নিজের তাঁবের যত, ওছা, নালায়েক আদমিকে বিভিন্ন পদে বসাচ্ছে। ফের একবার ইনকিলাব হলে মুর্শিদাবাদের আমআদমি খুশ হবে।’
ভাবলেশহীন চোখমুখে রায়দুর্লভের মুখপানে চেয়ে রইলেন ক্লাইভ।
দেওয়ানজি বলে চললেন, ‘পলাশির কৃতিত্ব মিরজাফরের একার নয়।’
‘দ্যাটস ট্রু।’ এই বলে গম্ভীর মুখে পানীয়ের পাত্রে চুমুক দিলেন ক্লাইভ।
রাজবল্লভ বললেন, ‘সিরাজকে মসনদ থেকে সরিয়ে দেওয়ায় মানুষের মনে যে ক্ষোভ জমেছে, মির্জা মেহেদিকে মসনদে বসালে তা অনেকটাই দূর হয়ে যাবে। এতে খুশনাম হবে কোম্পানিরই।’
বাঃ! আপনারা দেখছি নিজেদের মধ্যে গোলমালটা ভালোই পাকিয়ে তুলেছেন। এক মাস যেতে না যেতেই দাঁত, নখ বের করে সবাই মিলে ঠোকরাতে শুরু করেছেন নবাবকে। এমনটাই তো চাই। দরবারে অন্তর্কলহ জোরদার হলে নিজেদের শর্তে কারবার চালাতে সুবিধে হবে আমাদেরই। কোম্পানির দিকে নজর দেওয়ার ফুরসতই পাবেন না নবাব। মনে মনে এসব ভাবলেও ক্লাইভ মুখে বললেন, ‘ঠিক আছে। আমি ভেবে দেখব।’
রায়দুর্লভ খোশামুদে হাসি হেসে বললেন, ‘আপনি ভেবে দেখবেন, এটাই বড় কথা। আপনিই বল-ভরসা আমাদের। আপনাকে সব কিছু খুলে বলতে পেরে অনেকটা নিশ্চিন্ত লাগছে। আরেকটা কথা সাহেব, মেদিনীপুরের ফৌজদার রাজারামকে বরবাদ করতে চাইছেন নবাব।’
‘হু ইজ রাজারাম?’ প্রশ্ন করলেন ক্লাইভ।
নবকৃষ্ণ পিছন থেকে চাপা গলায় বলে উঠলেন, ‘নারান সিং এর বড়ে ভাই।’
রায়দুর্লভ বললেন, ‘রাজারামের উপর হুকুম হয়েছে মুর্শিদাবাদে এসে হিসেব বোঝানোর। এটা একটা অছিলা। মুর্শিদাবাদে পা দিলেই রাজারামকে কয়েদ করা হবে। তাঁর ধনদৌলত দখল করতে চান নবাব। আপনি রাজারামকে বাঁচান।’
ক্লাইভ গম্ভীর। পাইপের ধোঁয়া উড়িয়ে চলেছেন।
রায়দুর্লভ বলে চললেন, ‘চিঠি লিখে রাজধানীতে আসতে তাঁকে নিষেধ করেছি আমি। আপনি কলকাতায় ফিরলে রাজারাম একবার আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চায়। মেদিনীপুরের ফৌজদারের পদে রাজারাম বহাল থাকলে আপনাদেরই সুবিধে হবে। রাজারাম তাগদবাজ আদমি। বর্গিরা হানা দিলে সে রুখতে পারবে তাদের। অন্যথায় বর্গিহাঙ্গামার তকলিফ পোহাতে হবে কোম্পানিকেই।
ঘাড় ঘুরিয়ে নবকৃষ্ণর দিকে একবার তাকালেন ক্লাইভ।
চোখের ইশারায় নবকৃষ্ণ বুঝিয়ে দিলেন রায়দুর্লভ যা বলছেন তা ঠিকই।
ক্লাইভ বললেন, ‘বেশ। রাজারামকে বলবেন কলকাতায় এসে দেখা করতে।’
রায়দুর্লভ খুশি ঝরা গলায় বললেন, ‘যাক। অনেকটা ভরসা পেলাম।’
কুরসি ছেড়ে উঠে পড়লেন ক্লাইভ। উঠে দাঁড়াতে যাচ্ছিলেন রায়দুর্লভ ও রাজবল্লভ।
ক্লাইভ মুচকি হেসে বললেন, ‘প্লিজ ফিনিশ ইওর ড্রিঙ্ক।’
জুতোর শব্দ তুলে ভিতরের ঘরে চলে গেলেন কর্নেল।
থতমত খেয়ে ধপ করে ফের কুরসিতে বসে পড়ে পানীয়ের পাত্র হাতে তুলে নিলেন রায়দুর্লভ ও রাজবল্লভ। এই দৃশ্য দেখে হাসি চাপতে অন্যদিকে মুখ ঘোরালেন নবকৃষ্ণ।
.
জ্ঞান ফিরতে ঈশ্বরী দেখে সে বিলাসবহুল এক পালঙ্কে শুয়ে আছে। তার মুখের উপরে ঝুঁকে রয়েছেন মেজর আয়ারকুট। খুশিতে ঈশ্বরী চোখের জলে আসে। ঠোঁট ফাঁক করে কিছু বলতে যায়। মেজর সাহেবের মাথাটা দ্রুত নেমে আসে আরো নীচে। প্রগাঢ় চুম্বনে ও আলিঙ্গনে ধরা দেয় ঈশ্বরী। হারিয়ে যায় তার কথা। ঈশ্বরী সুখদরিয়ায় ডুবে যায়।
পরেরদিন আয়ারকুটের চিঠি নিয়ে দূত ছোটে পাটনা দুর্গে।
‘…বহুত বহুত সুক্রিয়া। যে জেনানাকে আপনি গতকাল পাঠিয়েছিলেন, তাকে আমার চাই। আমি ওকে নিয়ে যেতে চাই কলকাতায়। আশা করি আমার এই আরমান আপনি মঞ্জুর করবেন। আর একটা খুশির খবর জানাই আপনাকে। গতকালই কর্নেল ক্লাইভের হুকুমত এসেছে। আমি ফিরে যাচ্ছি ফৌজ নিয়ে। কর্নেল লিখেছেন, পাটনার কুরসি আপনারই থাকছে। কর্নেল লিখেছেন মির কাজিমের নামে জারি হওয়া পাটনার নায়েবগিরির বাতিল করতে চলেছেন নবাব। সেই হুকুমত হয়তো আপনি কয়েকদিনের মধ্যেই পেয়ে যাবেন। আপনি খুশ তবিয়ত, সহি সালামত থাকুন…’
এই চিঠি পড়ে খুশিতে চেঁচিয়ে উঠলেন রামনারায়ণ। ‘জয় সিয়ারাম! কিস্তি মাৎ।’
রামনারায়ণের উত্তর নিয়ে ঘোড়া দাবড়ে ইংরেজ ছাউনি অভিমুখে ছুটল বচন সিং।
‘সেলাম সাহেব। হুজুর আপনার আরমান মঞ্জুর করেছেন। পিয়ারীকে নিয়ে যান।’
আয়ারকুট বললেন, ‘বহুত বহুত সুক্রিয়া। রামনারায়ণজিকে আমার সেলাম জানাবেন।’
আয়ারকুটের সঙ্গে মুর্শিদাবাদের পথে ভেসে চলল ঈশ্বরী। নসিবের কী বিচিত্র খেয়াল। বন্দিনী হওয়ার কথা ছিল জাফরাগঞ্জের হারেমে। ভাগ্য তাকে টেনে নিয়ে গেল পাটনায়। রামনারায়ণের হারেমে। সেখান থেকে ঝরা পাতার মতো ফের বাতাসে উড়ল ঈশ্বরী। এবারে খুশিতে।
আকাশে আজ একটুও মেঘ নেই। জোছনায় ভেসে যাচ্ছে নিস্তব্ধ চরাচর। কেবল কুলকুল শব্দে বয়ে চলেছে যৌবনাবতী গঙ্গা। রাজমহলের অদূরে নোঙর ফেলেছে মেজর আয়ারকুটের নৌবহর।
বজরার ছাতে ফরাসের উপরে শাহি মেজাজে খালি গায়ে শুয়ে আছেন মেজর আয়ারকুট। তার পেশীবহুল বাহুতে মাথা রেখে তার গায়ের সঙ্গে লেপটে রয়েছে ঈশ্বরী। সুখের পরশে শিহরিত। তবু ভারাক্রান্ত তার মন। সে জানে মেজর আয়ারকুটের সঙ্গে তার এই সম্পর্ক খুবই সাময়িক। এই সুখানুভূতি ক্ষণিকের। কিছুদিন পরেই সাহেব হয়তো চলে যাবেন দূরে কোথাও। ঈশ্বরীর চোখের কোণায় চিকচিক করে জল। সুখের সব রস সে আজ নিংড়ে নিতে চায়।
ঈশ্বরীর কাচুলির বাঁধন আলগা করেন আয়ারকুট। আলতো চুম্বন করেন স্তনবৃন্তে। কেঁপে উঠে চোখ বোজে ঈশ্বরী। আকড়ে ধরে আয়ারকুটকে। প্রশস্ত গঙ্গার বুকে ভরা জোছনায় মাখামাখি হয়ে রতিক্রিয়ার আদিম ছন্দে মেতে ওঠে দুই নর-নারী।
.
