২৬
মসনদে বসেই নবাব মিরজাফর খাঁ যে টাকা ইংরেজদের দিয়েছিলেন তাতে ক্লাইভের ভাগে পড়েছিল একুশ লাখ। যদিও তখন মিরজাফরের মনে হয়েছিল ক্লাইভের কুদরতি বা প্রতিভার অনুপাতে এই টাকা পরিমাণে খুবই কম। রবার্ট ক্লাইভের নাম মাহাত্ম্যে মিরজাফর খাঁ তখন সম্মোহিত। ক্লাইভ সাহেবকে খুশি করার জন্য তিনি অস্থির হয়ে পড়েছেন। কৃতজ্ঞতায়, ভক্তিতে, দুর্দান্ত আবেগে, জল ছলছল চোখে কেবলই ভাবছেন, কর্নেল ক্লাইভ তাঁর জন্যে যা করলেন, কোনও কিছুর বিনিময়েই তার কিম্মত মেটানো যায় না।
মসনদে বসার পর মিরজাফরের মনে হয়েছিল, তিনি যেন বেহেস্তের সুখদরিয়ায় ভেসে চলেছেন। জিন্দেগি তার কাছে আগে কখনও এমন রংদার, খুশবুদার, সুনহারি একখণ্ড খোয়াব হয়ে ওঠেনি। যা ছিল অলীক স্বপ্ন, তা সত্যি হয়েছে ক্লাইভের কুদরতিতে।
না না না! মাত্র একুশ লাখ টাকা কিছুতেই ক্লাইভের হেকমতির কিম্মত হতে পারে না। তার প্রাপ্য আরও বেশি। দেওয়ান রায়দুর্লভের সঙ্গে আলোচনা করে কর্নেল ক্লাইভকে আরও দেড়লাখ টাকা বখশিস দিয়েছিলেন মিরজাফর খাঁ। সেই সঙ্গে দিয়েছিলেন রত্নখচিত উষ্ণীষ, রাজপোশাক, তরবারি, একটা হাতি, দুটো সফেদ ইরানি ঘোড়া। সেই সঙ্গে সালাবৎজঙ্গ উপাধি।
ক্লাইভের চোখেমুখে উপচে পড়ল খুশি।
এত দিয়েও মিরজাফরের আশ মেটেনি। কলকাতা সংলগ্ন চব্বিশ পরগনার জমিদারি ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির নামে লিখে দিলেন মিরজাফর খাঁ। তাঁর কাছে ক্লাইভ মানেই কোম্পানি আর কোম্পানি মানেই ক্লাইভ।
নবাবকে তসলিম জানিয়ে ধূর্ত রবার্ট ক্লাইভ বলেছিলেন, ‘বহুত বহুত সুক্রিয়া জনাব। আমাদের রিশতেদারি জিন্দেগিভর অটুট থাকুক।’
মিরজাফর বলেছিলেন, ‘আপনি খুশ তবিয়ত, সহি সালামত থাকুন।’
এই অবধি সব ঠিকই ছিল। কিন্তু তারপর থেকে ধীরে ধীরে ক্লাইভ ও ইংরেজদের কদর্য, কুৎসিত, লোভী চেহারাটা মিরজাফরের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠতে লাগল। খোয়াবের দুনিয়া থেকে বাস্তবের মাটিতে আছড়ে পড়লেন মিরজাফর খাঁ। মোহভঙ্গ হল অচিরেই।
সেই রাতের স্মৃতি মিরজাফরের কাছে এক দুঃস্বপ্নের মতো।
মুনশি নবকৃষ্ণ ও দেওয়ান রামচাঁদকে সঙ্গে নিয়ে গোপনে হিরাঝিল প্রাসাদে এসে সিরাজের দৌলত লুঠ করে নিয়ে গেলেন রবার্ট ক্লাইভ। সেদিন কর্নেলের চোখেমুখের লোভ ও লালসার ভয়ানক আপসানি দেখে শিউরে উঠেছিলেন মিরজাফর। যাঁকে তিনি অন্তরে প্রায় পয়গম্বরের আসনে বসিয়েছিলেন, তাঁর বেসরম ডাকাইতি দেখে মিরজাফরের সুখস্বপ্ন ভেঙে খানখান হয়ে গিয়েছিল। সেদিন কর্নেল ক্লাইভকে দেখে মনে হয়েছিল দোজখের এক অশুভ প্রেতাত্মা দৌলতের লালচে হাজির হয়েছে হিরাঝিল প্রাসাদের চোরাকুঠরিতে।
ক্লাইভের ওই আচরণ মন থেকে মেনে নিতে না পারলেও তাঁর মুখের উপরে বলতে পারেননি—‘আপনি এ কাজ করতে পারেন না জনাব। আমি সুবে বাংলার নবাব মিরজাফর খাঁ। আর যাই হোক না কেন, নিজের জবানের ওজন বুঝি। ইকরারনামায় যে টাকা আপনাদের দেব বলে কবুল করেছিলাম, তা আমি কড়ায়গণ্ডায় মিটিয়ে দেব। এর বরখেলাপ হবে না। প্রথম কিস্তি আপনারা পেয়েছেন, আর দুই কিস্তিও সময়মতো পাবেন। ভেবে দেখবেন, চুক্তির বাইরেও আরও অনেক কিছু আপনাকে আমি দিয়েছি। খুশি হয়েই দিয়েছি। দিয়েছি বাড়তি দেড় লাখ টাকা। এছাড়াও চব্বিশ পরগনার জমিদারি দিয়েছি কোম্পানিকে। আর কত চাই আপনার? আপনি ইমানদার আদমি। আমার মেহমান। আপনাকে প্রায় পয়গম্বরের আসনে বসিয়েছিলাম। নবাবের অন্দরমহলে ঢুকে আপনি ডাকাইতি করতে পারেন না।’
এসব কথা কেন সেদিন বলতে পারেননি নবাব? কারণটা হল ভয়– দহসত। ভয়টা মসনদ হারানোর। কর্নেল ক্লাইভ হাত ধরে তাঁকে মসনদে বসিয়েছেন। তিনি পাশ থেকে সরে গেলে মসনদও টলমল করে উঠবে—এই আন্দেশা থেকেই ভীতি। তাই ক্লাইভের সব আবদার মুখ বুজে মেনে নেওয়াটাই দস্তুর করে তুলেছেন নবাব। ক্লাইভ সাহেবের খায়েশের গোলাম হয়ে উঠেছেন তিনি।
‘হা-হা-হা-হা!’ কেউ যেন অট্টহাস্য করে উঠল মহাশূন্য থেকে।
‘কে?’ চমকে উঠে প্রশ্ন করেন মিরজাফর।
‘আমি আলিবর্দি খাঁ। সিরাজের সঙ্গে গদ্দারি করে তুমি কতটা সুখ খরিদ করেছ?’
‘আমাকে মাফ করুন জাঁহাপনা।’
‘মসনদের মালিক এখন তুমি। পারবে তো এর ইজ্জত রাখতে? একটা কথা ইয়াদ রেখো, কারও তাঁবে থেকে মসনদের মালিক হওয়া যায় না। মসনদ চায় তাগদ। যার তাগদ নেই, মসনদ তাকে ছুড়ে ফেলে দেয়।’
মিলিয়ে যায় নবাব আলিবর্দি খাঁ’র কণ্ঠস্বর। বিস্মিত, বিহ্বল দৃষ্টিতে শূন্য পানে চেয়ে থাকেন নবাব। তাঁর চোখের পর্দায় কাঁপছে হিরাঝিল প্যালেসের সেতুন, খিলান, চকমিলানো মেঝে। কাঁপছে ছাতের গুলবাগিচা। সহসা ফের চমকে ওঠেন নবাব। তাঁর দিকে এগিয়ে আসছে এক ছায়ামূর্তি। যদিও অস্পষ্ট অবয়ব, তবু তাঁর চলনের ভঙ্গিমা খুবই পরিচিত। সামনে এসে দাঁড়ায় এক যুবক।
নবাব শিউরে ওঠেন।
খুন ঝরছে সেই যুবকের বুক থেকে। রক্তে ভেজা তাঁর গায়ের সদরিয়া। চোখদুটো কোটরাগত। মুখে অযত্নে বেড়ে ওঠা দাড়ি। তাঁর মাথায় উষ্ণীষ। তার গায়ে সুতো দিয়ে গাঁথা বহুমূল্যবান একখানা হিরকখণ্ড জ্বলজ্বল করছে।
‘চিনতে পারছেন জনাব?’
‘সি-রা-জ?’ ভয়ে কাঁপতে থাকেন মিরজাফর।
‘কেমন আছেন নবাব?’ সিরাজের মুখে লেগে আছে হাসির রেশ।
কাঁপা গলায় মিরজাফর খাঁ শুধোলেন, ‘কী চান হুজুর আপনি?’
‘কিছু না জনাব। স্রেফ একবার দেখতে এলাম আপনাকে।’
ভয়ার্ত দৃষ্টিতে সিরাজের মুখের দিকে চেয়ে থাকেন মিরজাফর।
‘দেখছেন কী অমন করে?’ শুধোলেন সিরাজ।
‘খুন ঝরছে আপনার কলিজা থেকে।’
‘খুন নয় জনাব। তাজা গুলাব। মহম্মদীর পেয়ার।’
‘খুব কষ্ট হয়েছিল না আপনার?’
‘ইয়াদ নেই। আখিরাতে আমি ডুব দিয়েছি বেহেস্তের কওসরে।’
‘আমাকে মাফ করুন হুজুর।’
‘আপনি নিমিত্তমাত্র। আমি বদ কিসমতির শিকার। থাক ওসব কথা। কেমন আছেন আপনি?’
ডুকরে কেঁদে উঠে মিরজাফর বলেন, ‘আমি ভালো নেই হুজুর।’
‘চোখের পানি নবাবের জন্য নয়। নিজেকে বেইজ্জত করবেন না।’
‘বেইজ্জত হওয়ার জন্যই যে আমি মসনদে বসেছি হুজুর। আপনি ছিলেন আজাদ। আমি আজাদ নই। আমি ইংরেজদের হাতের পুতুল।’
‘ইংরেজ কাঁটা আপনি উপড়ে ফেলুন তুরন্ত।’
‘আমি পারব না। আমি বেওকুফ, বুজদিল আদমি।’
‘এখনও সময় আছে। নিজেকে শক্ত করুন।’
সিরাজের ছায়ামূর্তি মিরজাফরের চোখের সামনে আবছা হয়ে আসতে থাকে।
নবাব চেঁচিয়ে ওঠেন, ‘আপনার সঙ্গে গদ্দারি করে আমি গুনাহের কাজ করেছি। আমাকে রহেম করুন হুজুর। রহেম করুন। আস্তাগফেরুল্লাহ।’
নিজের চিৎকার শুনে নিজেই চমকে ওঠেন মিরজাফর খাঁ। গিরদায় হেলান দেওয়া অবস্থা থেকে ধড়ফড় করে উঠে বসেন। নবাবের গলার আওয়াজ শুনে ছুটে আসে কয়েকজন গোলাম-বাঁদি। হাতের ইশারায় প্রবল বিরক্তির সঙ্গে তাদের চলে যেতে ইঙ্গিত করেন নবাব।
সন্ধে নামছে। হিরাঝিলকে ঘিরে ধরা গাছগাছালি থেকে ভেসে আসছে পাখির কলকাকলি। নহবতখানা থেকে ভেসে আসছে সানাইয়ের সুর। জোর একপশলা বৃষ্টি হয়ে গিয়েছে ক্ষণিক আগে। হিরাঝিলের উপর দিয়ে ভেসে আসছে শীতল বাতাস। ছাতের বাগানে, পোর্সেলিনের টবে বেড়ে ওঠা জুঁই, বেলফুল সুবাসে আমোদিত করছে চারিদিক।
দরদর করে ঘামছেন মিরজাফর খাঁ। চোখের দৃষ্টি ঘোলাটে। শরাবের ঘোরে এতক্ষণ জেগে জেগে কি খোয়াব দেখছিলেন? নবাব আলিবর্দি খাঁ, সিরাজদ্দৌলা কেমন করে ফিরে আসবেন এই দুনিয়ায়? তাহলে তিনি কি কথা কইছিলেন নিজের সঙ্গে? তাঁর অবচেতন মন কি কথা কইছিল রক্তমাংসের মানুষটার সঙ্গে?
শূন্য পানপাত্র কাত হয়ে পড়ে আছে ফরাসের উপরে। সেদিকে চোখ গেল নবাবের। ঘন্টির ডোরিতে টান দিয়ে চেচিয়ে উঠলেন, ‘শরাব! শরাব! শরাব দিয়ে যা বেতমিজ।’
ত্রস্ত হয়ে সাকি ছুটে আসে। শূন্য পাত্র পূর্ণ করে দিয়ে চলে গেল দ্রুত।
পাত্রটা হাতে তুলে নিয়ে এক চুমুকে পাত্রের সবটুকু শরাব খতম করে দিলেন নবাব। অবশ হয়ে আসতে থাকে তাঁর চেতনা। শরাব সব জহমত, তকলিফের একমাত্র ইলাজ।
‘সরতাজ?’
‘কে?’ চমকে উঠে ঘুরে তাকিয়ে জড়ানো গলায় প্রশ্ন করেন নবাব। বেগমকে দেখে মুখে এক চিলতে হাসি এনে মিরজাফর বলেন, ‘ও তুমি! এসো বেগম।’
নবাবের পাশে এসে বসেন মণি বেগম। আজ বড় সুন্দর করে সেজেছেন বেগম। পরনে জামদানি কুর্তা ও শাদা পেশোয়াজ। জরির ফিতে দিয়ে চুড়ো করে বাঁধা মাথার চুল। চোখে কাজল, সুরমা। আনারদানার রঙের নরম গাল দুটোতে চিকচিক করছে আঁফসাচূর্ণ। কপালে বিন্দিয়া। ঠোঁট তাম্বুলরাঙা। গলায় জড়োয়ার নেকলেস। অনামিকায় ঝলকাচ্ছে হিরের আংটি।
মণি বেগম হাসলেন। সে হাসিতে যেন মুক্তো ঝরে পড়ল। অন্তরের সব জ্বালাযন্ত্রণা ভুলে ক্ষণেকের জন্য বেগমসাহেবার মুখপানে মুখের দিকে চেয়ে রইলেন মিরজাফর খাঁ। মণি বেগম কাছে এলে তাঁর মনে হয়, এই বুঝি আসমান থেকে যেন চাঁদ নেমে এল মাটির দুনিয়ায়।
‘তোমাকে অপূর্ব দেখাচ্ছে মণি।’
‘আজকের দিনটা মনে পড়ে নবাব?’
‘আজকের দিন?’ নবাব প্রশ্ন করেন।
মণি বেগম কপট অভিমানের সঙ্গে বলেন, ‘ইয়াদ নেই আপনার?’
নবাব মৃদু হেসে বলেন, ‘বয়স হয়েছে তো বেগম। সব কিছু মনে থাকে না।’
‘মসনদে বসে হল কী আপনার? ক’দিন পরে আমাকেও ভুলে যাবেন।’
‘ও কথা বলো না বেগম। আর সব কিছু ভুলে গেলেও আসমানের চাঁদকে কি ভোলা যায়?’
মণি বেগম হেসে বলেন, ‘এই দিনে আমাদের পহেলা মোলাকাত হয়েছিল।’
‘কতকালের কথা। তুমি সেই একই রকম আছ বেগম। আমি বোধ হয় অনেক বুড্ডা হয়েছি।’
অন্যমনস্ক হয়ে পড়েন নবাব। চেয়ে থাকেন আঁধারের কালিতে মোড়া আসমানের পানে। গভীর চিন্তায় মগ্ন। মেঘে ছাওয়া আকাশে আজ নক্ষত্রের দেখা নেই।
‘কী হয়েছে? আপনাকে বড় চিন্তিত মনে হচ্ছে?’ মণি বেগম প্রশ্ন করেন।
‘শরীরে বড় ক্লান্তি বেগম। আমি ঠকে গিয়েছি।’
‘চলুন আমরা হিরাঝিলের ঘাটে গিয়ে বসি। ঠান্ডা বাতাসে শরীর জুড়িয়ে যাবে।’
নবাব হঠাৎ ব্যাকুল কণ্ঠে বলে ওঠেন, ‘আমি বোধহয় সুবে বাংলার মসনদে বসার মতো কামিল-ই-ইনসান নই বেগম।’
‘কেন বলছেন এ কথা?’
‘মুর্শিদকুলি, সুজাউদ্দীন, আলিবর্দি, সিরাজদ্দৌলা এঁরা আজাদ ছিলেন, আর আমি? কোম্পানির হাতের পুতুল।’
প্রায় আসমান সমান ঠেলে ওঠা এক অসহায়তা যেন হাহাকার করে উঠল।
নবাবের চোখে জল। মণি বেগম শুধোলেন, ‘এসব কী ভাবছেন আপনি?’
‘একদল ভিনদেশি কারবারি কখনও নবাবের দোস্ত হতে পারে না। একথা মুর্শিদকুলি বুঝেছিলেন, আলিবর্দি বুঝেছিলেন, সিরাজও বুঝেছিল। আমি বেওকুফ। তাদের দোস্ত হতে গিয়ে গোলাম হয়েছি।’
একটা রাতচরা পাখি ডেকে উঠল। বড় মনহুস আওয়াজ। মণি বেগম কেঁপে উঠলেন।
মিরজাফর জড়ানো গলায় বলে চললেন, ‘আমি নামেই নবাব। নিজামতের রাশ ধীরে ধীরে হাতে নিচ্ছে ইংরেজ। আমি বোধ হয় ভুল করেছি বেগম। নিমকহারামি, গদ্দারির শর্তে মসনদ দখল এক বদিয়তি। যে গুণাহগারির কাজ আমি করেছি তার কিম্মত চোকাতে হবে আমাকে। একটু একটু করে দেখতে হবে নিজামতের বরবাদি।’
‘না-আ-আ।’ প্রবল আতঙ্কে কথাটা যেন ছিটকে বেরিয়ে আসে বেগম সাহেবার গলা থেকে। কোনও প্রতিক্রিয়া জানালেন না নবাব। মদের ঘোরে তিনি প্রায় বেহুঁশ হয়ে পড়লেন।
না-না-না। অস্থির হয়ে ওঠেন মণি বেগম। বরবাদ হয়ে যাওয়ার কথা তিনি ভাবতেই পারেন না। চোখের সামনে দেখেছেন, লুৎফুন্নেসা, শরফ উন্নেসা, আমিনা বেগম, ঘসেটি বেগমের পরিণতি। তাগদ হারানোর জহমত, যন্ত্রণা যে কী ভয়ানক, কী মর্মান্তিক, মণি বেগম এঁদের দেখে বুঝেছেন। দুই পুত্র নজম ও সইফের মুখটা তাঁর মনে পড়ে যায়। মণির চোখের তারায় কত স্বপ্নের আনাগোনা এই দুই পুত্রকে ঘিরে। সব কি শেষ হয়ে যাবে অচানকই?
ফরাসের উপরে গিরদা আকড়ে প্রায় নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছেন মিরজাফর খাঁ। শরাবের নেশায় এখনও বেহুঁশ। আজকাল সুবহশাম নেশাগ্রস্ত হয়ে ঝিম মেরে পড়ে থাকেন নবাব। মাদকদ্রব্যের মাত্রাতিরিক্ত প্রয়োগ দিনে দিনে নবাবের স্নায়ুকে দুর্বল থেকে দুর্বলতর করে তুলছে। অবসাদ তাঁকে নিমজ্জিত করছে অতলে।
মণি বেগমের সব আক্রোশ গিয়ে পড়ে সুরাপাত্রের উপর। বেলজিয়াম কাট গ্লাসের শূন্য পাত্রটা কাত হয়ে পড়ে আছে ফরাসের উপরে। সেটা হাতে তুলে নিয়ে প্রবল বেগে মেঝেতে আছড়ে ফেলেন বেগমসাহেবা। ঝনঝন শব্দে কাঁচ ভাঙে।
মণি বেগম ভেঙে পড়েন কান্নায়।
.
