২৪
জাতিতে কায়স্থ, পদবী শ্রীবাস্তব, রামনারায়ণের বাবা রঙ্গলাল ছিলেন আলিবর্দির আমলে পাটনা দরবারের এক সামান্য কর্মচারী। বাবার সুপারিশেই নিজামতের চাকরিতে প্রবেশ ফারসিতে সুপণ্ডিত রামনারায়ণের। মাইনে ছিল মাসে পাঁচ টাকা। সিরাজদ্দৌলার পিতা জৈনুদ্দিন আহমেদ আফগানদের হাতে নিহত হওয়ার পর পাটনার নায়েবের পদে নিযুক্ত হন জানকীরাম। কিছুদিনের মধ্যেই রামনারায়ণ হয়ে ওঠেন তাঁর পেশকার এবং অতি বিশ্বস্ত একজন কর্মচারী। রামনারায়ণের দক্ষতার উপর জানকীরাম এতটাই ভরসা করতেন যে, তাঁর মৃত্যুর আগে নবাব আলিবর্দিকে এক চিঠিতে তিনি লিখে যান, পাটনার কুরসিতে যেন রামনারায়ণকে বসানো হয়। তাঁর নিজের পুত্র রায়দুর্লভের চেয়ে রামনারায়ণ ওই পদের জন্য অনেক যোগ্যতম ব্যক্তি। কথা রেখেছিলেন আলিবর্দি খাঁ। ১৭৫৩ সালে জানকীরামের মৃত্যুর পর পাটনার নায়েবের পদে নিযুক্ত হন রামনারায়ণ। এখনও তিনি সেই পদে বহাল।
সিরাজদ্দৌলাকে মদত দেওয়ার জন্য পাটনা থেকে তেলিয়াগড়ি পর্যন্ত এগিয়েও বিফল মনোরথে ফিরে এসেছিলেন জাঁ ল। তাঁর কাছ থেকেই রামনারায়ণ জেনেছিলেন, পলাশিতে সিরাজদ্দৌলার মুসিবত হয়েছে। সুবে বাংলার মসনদে বসেছেন মিরজাফর খাঁ। মুসাফিরের জালসাজিসে মুর্শিদাবাদ থেকে পালিয়ে পাটনার দিকে আসছিলেন পরাজিত নবাব। পথে গ্রেফতার হয়েছেন রাজমহলের কাছে।
এই খবর শুনে ভাঁজ পড়েছিল রামনারায়ণের কপালে। কারণ তিনি ছিলেন সিরাজদ্দৌলার প্রিয়পাত্র। নয়া জমানায় তাঁর অবস্থা যে টালমাটাল হবে সেটাই স্বাভাবিক।
সিরাজদ্দৌলা মসনদে বসার পর থেকেই রামনারায়ণ শুনে আসছিলেন, ঘসেটি বেগম, জগৎশেঠ, মিরজাফর, রায়দুর্লভ এরা নাকি সিরাজকে বরবাদ করার জন্য সাজিসিতে মেতেছেন। এসবে বড় একটা আমল দেননি তিনি। কারণ তিনি মনে করতেন আলিবর্দির নাতিকে মুর্শিদাবাদের কুরসি থেকে হটানো কোনও মামুলি বাত নয়। পরে রামনারায়ণ যখন শুনলেন, নবাবের সঙ্গে ইংরেজ কোম্পানির লড়াইটা অনিবার্য হয়ে পড়েছে, ফৌজ নিয়ে ক্লাইভ মুর্শিদাবাদের দিকে আসছেন, তখনও তাঁর ধারণা হয়েছিল এই লড়াইতে গালেব হবেন সিরাজদ্দৌলা। একদল বিদেশি বেনিয়া কিছুতেই নবাবের বিরাট ফৌজের সঙ্গে এঁটে উঠতে পারবে না।
রামনারায়ণ মনে প্রাণে চেয়েছিলেন সিরাজের কামেয়াবি। এই শুভকামনা কতকটা তার নিজের স্বার্থেও। কারণ সিরাজ মসনদে থাকলে অটুট থাকবে তাঁর কুরসি, তাগদ, দৌলত।
পাটনা দুর্গের খাস দরবারে ফরাসের উপরে বসে সিরাজের মুসিবতের কাহিনি রামনারায়ণকে শোনাচ্ছিলেন জাঁ ল। তাঁর দেহের অভিব্যক্তিতে ফুটে উঠছিল স্বপ্নভঙ্গের বেদনা। কৃপাপ্রার্থী হয়ে ল-সাহেব সেদিন এসেছিলেন পাটনা দুর্গে। ইংরেজদের উপরে পালটা আঘাত হানতে হলে নায়েবজির মদত চাই। কিন্তু ল-এর মনে সংশয়। এই পরিস্থিতিতে তিনি কি ফরাসিদের পাশে দাঁড়াবেন?
ইংরেজদের চক্রান্তে ও কূটনৈতিক চাপে পলাশির যুদ্ধের ঠিক আগে আগে ল-সাহেব ও তাঁর বাহিনীকে কাশিমবাজার থেকে বিতাড়িত করে পাটনায় পাঠাতে বাধ্য হয়েছিলেন সিরাজদ্দৌলা। পাটনায় ল-সাহেব ও তাঁর ফৌজের খোশ-আমদেদ, খাতির-যত্নের আনজামে যেন কোনও গলতি না হয় সেটা নবাব চিঠি লিখে নায়েবজিকে স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছিলেন। মনিবের সেই নির্দেশ এতদিন অক্ষরে অক্ষরে পালন করে এসেছেন রামনারায়ণ। কিন্তু আজ পরিস্থিতি ভিন্ন। ফরাসিরা ইংরেজদের দুশমন। কাজেই নয়া নবাবেরও দুশমন। ফরাসিদের গ্রেফতার করে মুর্শিদাবাদে চালান করে দিয়ে নিজের গদিকে মজবুত করা যায়। মিরজাফরের প্রতি ও ইংরেজদের প্রতি আনুগত্য দেখানো যায়। কিন্তু আখেরে তাতে খুব কিছু লাভ হবে কি? ফরসির নল মুখে দিয়ে মনে মনে রাজনীতির ঘুঁটিগুলো নাড়াচাড়া করতে করতে ভাবীকালের ছবিটা চোখের সামনে ভাসানোর কোশিশ করছিলেন কুশলী রামনারায়ণ।
অধীর হয়ে ল-সাহেব বলে উঠেছিলেন, ‘ফৌজদারের তাড়া খেয়ে রাজমহল থেকে কোনওরকমে আমরা ওয়াপস আসতে পেরেছি হুজুর। আমি জানি, ইংরেজরা সহজে আমাদের ছেড়ে দেবে না। আমাদের গ্রেফতারির জন্য ইংরেজ ফৌজও পাটনা পর্যন্ত ধাওয়া করে আসবে। এই ওয়াক্তে আপনিই ভরসা।’
‘কী মদত চান আপনারা?’ নীরবতা ভাঙলেন রামনারায়ণ।
‘আপনিই পারেন আমাদের বাঁচাতে।’
‘আমি তো আপনাদের হয়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারব না।’
ল-সাহেব ব্যস্ত হয়ে বলে ওঠেন, ‘না না। আমি তা বলছি না। আপাতত কর্মনাশা নদী পেরিয়ে বারাণসীতে রাজা বলবন্ত সিং-এর কাছে আমরা আশ্রয় নিতে চাই। আমি দূত পাঠিয়ে এ বিষয়ে তার কাছে ইবাদত করেছিলাম। বলবন্ত সিং তা মঞ্জুর করেছেন। লেকিন ফৌজ নিয়ে বারাণসী পর্যন্ত যাওয়ার মতো রসদ আমার নেই।’
‘বুঝলাম।’ এই বলে ফরসির নল ছুড়ে দিয়ে উঠে বসে ঘন্টির ডোরিতে টান দিলেন নায়েবজি। ডেকে পাঠালেন দেওয়ান সাহেবকে। তখনই মঞ্জুর করে দিলেন ফরাসিদের বারাণসী যাত্রার রাহাখরচ। রামনারায়ণকে সেলাম জানিয়ে বিদায় নিলেন জাঁ ল।
দেওয়ান বলেছিলেন, ‘এ কী করছেন হুজুর? ফরাসিদের গ্রেফতার করে মুর্শিদাবাদে পাঠিয়ে দিলেই তো আপনার মঙ্গল হত।’
এ কথার জবাব না দিয়ে রুপোর খাসদান থেকে একটা পান তুলে নিয়ে মুখে ফেলে চোখ বুজে চিবোতে চিবোতে মুচকি হেসেছিলেন রামনারায়ণ। এই অস্থির সময়ে দেশের হালহকিকত কখন কী ভাবে বদলাবে কেউ বলতে পারে না। নায়েবজির মাথায় তখন ঘুরছিল অন্য এক রাজনৈতিক কৌশল। আর এই কৌশল রূপায়িত করতে জাঁ ল তাঁর বাজি।
পাটনার অদূরে কর্মনাশা নদী পেরোলেই অযোধ্যার নবাব সুজাউদ্দৌলার রাজত্ব। হিন্দুস্থানের রাজনীতিতে সুজাউদ্দৌলা এখন খুবই শক্তিশালী। পাটনা থেকে বারানসি খুব দূরে নয়। সুজাউদ্দৌলার অধীনস্থ সামন্তপ্রভু বারাণসীর রাজা বলবন্ত সিং-ও যথেষ্ট তাগদবাজ। জাঁ ল-এর মাধ্যমে এঁদের সঙ্গে যদি একটা সুসম্পর্ক গড়ে তোলা যায় তো মন্দ কী? এই রিসতেদারি ভাবীকালে কাজে আসতে পারে। নিজামতের শাসন ব্যবস্থায় একেবারে নিচুতলা থেকে ধাপে ধাপে উপরে উঠেছেন রামনারায়ণ। তিনি আজ অঢেল সম্পত্তির মালিক। আপাতত অর্জিত সম্পদ রক্ষা করাই আশু কর্তব্য বলে স্থির করলেন রামনারায়ণ। তিনি নিশ্চিত তাঁকে বেদৌলত করার কোশিশ করবেন মিরজাফর খাঁ। নবাবকে চাপে রাখতে হলে সুজাউদ্দৌলার শিবিরের সঙ্গে রিশতেদারি গড়ে তোলাটা জরুরি।
.
ফরাসিরা পাটনা থেকে বিদায় নিতেই ফৌজ নিয়ে ধেয়ে এলেন মেজর আয়ারকুট।
পাটনার দিকে কোম্পানির ফৌজের আসার সংবাদ শুনেই মুঙ্গেরের কেল্লাদারকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন রামনারায়ণ। প্রবল ঝড়জলে ফৌজ নিয়ে বিপাকে পড়ে মুঙ্গের দুর্গে সাময়িক আশ্রয় চেয়েছিলেন আয়ারকুট। শত অনুরোধ সত্ত্বেও কেল্লাদার দুর্গের দরজা খুলল না। অগত্যা কেল্লার বাইরে তাঁবু খাটাতে বাধ্য হলেন আয়ারকুট। তাঁর সব রাগ গিয়ে পড়ল রামনারায়ণের উপর। ক্লাইভকে লেখা চিঠিতে রামনারায়ণের বিরুদ্ধে মনের সব আক্রোশ উগরে দিলেন মেজর সাহেব।
ক্লাইভের উত্তর এল, ‘ফার্স্ট অ্যারেস্ট জাঁ ল অ্যান্ড দেন রুইন দ্য ওল্ড ফক্স রামনারায়ণ।’
পাটনায় এসে আয়ারকুট শুনলেন জাঁ ল পালিয়ে গিয়েছেন ছাপরার দিকে। এদিকে মেজর আয়ারকুটের সঙ্গে নিজের ভাই মিরকাজিম ও মহম্মদ আমিনকে পাটনায় পাঠিয়েছেন নবাব মিরজাফর খাঁ। মির কাজিমের নামে জারি হয়েছে পাটনার নায়েবগিরির পরোয়ানা। রামনারায়ণের উপর হুকুম হয়েছে অবিলম্বে মির কাজিমকে পাটনার দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে মুর্শিদাবাদে যেতে হবে।
মিরকাজিমের আর তর সইছিল না। তিনি চাইছিলেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, পাটনার কুরসিতে বসে পড়তে। কিন্তু পাটনা দুর্গে ঢুকতে গিয়েই ধাক্কা খেলেন। কেল্লার দরওয়াজা খুলল না প্রহরীরা।
রামনারায়ণ অত সহজে গদি ছেড়ে দেওয়ার বান্দা নন। কেল্লার সব দরজা বন্ধ করে দিয়ে তিনি পরিস্থিতির উপরে কড়া নজর রাখতে লাগলেন।
মুঙ্গের দুর্গে আশ্রয় না পেয়ে রামনারায়ণের উপরে বেশ চটেছিলেন আয়ারকুট, তার উপরে পাটনায় পৌছনোর পর তাঁকে ওয়েলকাম জানানোর জন্য কোনও প্রতিনিধিকে পাঠাননি রামনারায়ণ। এই সব নিয়ে আয়ারকুটের মেজাজ তখন ভয়ানক গরম। তাঁকে আরও একটু উত্তেজিত করে তোলার জন্য মিরকাজিম বললেন, ‘বেতমিজ নায়েবের তাকাব্বুরি দেখুন সাহেব। নিজে তো এলই না, আপনার খোশ আমদেদের জন্য কাউকে পাঠালও না। কেল্লার উপরে এখনই হামলা করুন।’
‘এই মামলার ফয়সালা পরে হবে। ফার্স্ট উই হ্যাভ টু অ্যারেস্ট জাঁ ল।’
‘ও চিড়িয়া তো উড়ে গেছে।’
‘উই মাস্ট চেজ হিম।’
মিরকাজিমের উত্তেজনা নিমেষে স্তিমিত হয়ে পড়ল। মুর্শিদাবাদ থেকে পাটনা আসার ধকলেই তাঁর হাঁফ ধরেছে। ফের ছুটোছুটি করতে হবে শুনে তাঁর মুখ শুকিয়ে গেল।
দু’দিন পরে, পাটনা দুর্গের সামনে দিয়ে খুব বাড়াবাড়ি রকমের শব্দে ব্যান্ড বাজিয়ে কোম্পানির বিরাট বিরাট নিশান উড়িয়ে ছাপরার দিকে এগিয়ে চললেন আয়ারকুট। যেন রামনারায়ণকে বার্তা দিয়ে বলতে চাইলেন, অপেক্ষা করুন নায়েবজি, ফিরে এসে আপনার সঙ্গে বোঝাপড়াটা সারছি।
পাটনা দুর্গের কঙ্গুরায় দাঁড়িয়ে রামনারায়ণ সবই দেখলেন কিন্তু মুখে টুঁ শব্দটি করলেন না।
.
জাঁ-ল এর নাগাল পেলেন না আয়ারকুট। কর্মনাশা নদীর তীরে এসে তাঁকে থমকে দাঁড়িয়ে পড়তে হল। নদী পেরিয়ে আগেই সুজাউদ্দৌলার রাজত্বে ঢুকে পড়েছেন ল সাহেব।
মিরকাজিম বিরক্তির সঙ্গে বললেন, ‘ফালতু ছুটোছুটি সার হল। ওই বুড্ডা বেতমিজ রামনারায়ণের জন্যেই পরেশানি। উনিই তো রাহাখরচ জুগিয়ে ফরাসিদের মদত দিয়েছেন।’
ফের পাটনায় ফিরে এলেন আয়ারকুট। কেল্লার সমুখে এসে দেখলেন দরজা বন্ধ। আয়ারকুটের তর্জন গর্জন সত্ত্বেও প্রহরীরা দরওয়াজা খুলল না।
মিরকাজিম বললেন, ‘তোপ দাগুন সাহেব। তোপ দাগুন।’
ছাপরায় বসে কিছুদিন সোরার ব্যাবসা করে বেশ দু’পয়সা কামিয়ে আয়ারকুটের আগেকার গরম মেজাজটা তখন অনেক ঠান্ডা হয়েছে। যুদ্ধে অভিজ্ঞ মেজর সাহেব বুঝলেন, মাত্র দু’খানা তোপের ভরসায় আড়েবহরে বিশাল পাটনা দুর্গকে কবজা করা সম্ভব নয়। শুধু শুধু বেইজ্জত হতে হবে। রামনারায়ণকে সবক শেখাতে হলে আরও ফৌজের প্রয়োজন। চিঠিতে ক্লাইভকে এসব কথা জানিয়ে তাঁর পরবর্তী নির্দেশের অপেক্ষায় পাটনা দুর্গের অদূরে ছাউনি ফেললেন আয়ারকুট।
এবারে আর উপেক্ষা করা নয়, মেজর সাহেবের ভজনায় মন দিলেন চতুর রামনারায়ণ। কসিদের হাত দিয়ে পাঠালেন একটা চিঠি। ‘…হুজুর আমি আপনার গোলাম। আপনি পাটনায় এসেছেন শুনে আমি খুবই খুশি হয়েছি। আপনার খোশ আমদেদের জন্য কখন কী প্রয়োজন, জানাবেন। আপনার সেবা করতে পারলে এই বান্দা খুশি হবে…’ এই চিঠি পেয়ে আয়ারকুট খানিকটা নরম হলেন।
ইংরেজ ছাউনিতে গোপনে ভেট পাঠাতে শুরু করলেন নায়েবজি। কামিনী-কাঞ্চন দুইই।
ওদিকে রাজধানীর হালহকিকত সরেজমিনে সমঝবুঝ করে আসার জন্য রামনারায়ণ তাঁর বিশ্বস্ত কর্মচারী বচন সিংকে পাঠিয়ে দিলেন মুর্শিদাবাদে। তাঁর হাত দিয়ে দেওয়ান রায়দুর্লভের কাছে পাঠালেন একটা চিঠি। ‘…হুজুর আমি আপনার পিতার একান্ত অনুগত ছিলাম। তাঁরই খুশকামনায় আমি আজও পাটনার নায়েব। আমাকে বরখাস্ত করে মির কাজিমের নামে পাটনার নায়েবগিরির পরোয়ানা জারি করেছেন নবাব। এই হুকুমত আমি ইনকার করেছি। নবাবের নয়, বান্দা আপনার অনুগত। আপনি যা হুকুম করবেন, বান্দা তাই মেনে চলবে। এখন আপনিই জানান পাটনার কুরসিতে কে থাকবে?…’
.
কিছুদিন পরে মুর্শিদাবাদ থেকে ফিরে এল বচন সিং।
রামনারায়ণ ব্যস্ত হয়ে শুধোলেন, ‘খবর কী?’
‘পয়গাম শুভ। কুরসি ছাড়তে আপনাকে নিষেধ করেছেন দেওয়ানজি।’
রামনারায়ণের চোখদুটো চকচক করে উঠল। বললেন, ‘বহুত আচ্ছা। এমনই আন্দাজ করেছিলাম আমি। রাজধানীর খাসখবর আর কী আছে?’
‘দেওয়ানজি দহসতে রয়েছেন। অচানক নবাবজাদার হাতে খুন না হয়ে যান।’
‘নবাব মিরজাফর খাঁ কেমন আছেন?’
‘সহি সালামত, খুশ তবিয়ত আছেন, তবে নাম কিনেছেন কর্নেল ক্লাইভের মদ্দা গর্ধভ। বাকিটা আপনি সমঝে নিন।’
সজোরে হেসে উঠলেন রামনারায়ণ।
বচন সিং বলল, ‘ক্লাইভ সাহেব সহায় হলে কোনও মুসিবত হবে না আপনার…লেকিন—’
বচন সিং-এর চিন্তিত মুখ দেখে রামনারায়ণ ব্যস্ত হয়ে শুধোলেন, ‘লেকিন?’
‘ক্লাইভ সাহেব চাইছেন আপনার বরবাদি।’
রামনারায়ণের কপালে ফের চিন্তার ভাঁজ পড়ল।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বচন সিং বলল, ‘আপনার ইজাজত ছাড়াই এক কাম আমি করে এসেছি। মুনশি নবকৃষ্ণকে বুঝিয়ে এসেছি, কেন আপনার পাটনায় থাকা দরকার। নজরানা ভি গুঁজে দিয়েছি মুনশিজির হাতে। কর্নেলকে সমঝানোর কোশিশ উনি করবেন।’
উচ্ছ্বসিত হয়ে রামনারায়ণ বলে উঠলেন, ‘সাবাস বচন সিং।’
মুনশিজি বললেন, ‘আয়ারকুট সাহেবকে খুশ রাখতে হবে।’
রামনারায়ণ মুচকি হেসে বললেন, ‘এর শুরুয়াত হয়েছে। খেরিয়া ও জেনানা দুই পাঠাচ্ছি ইংরেজ ছাউনিতে। সাহেব রঙ্গিলা আদমি।’
‘রামজিকি কৃপা। আয়ারকুট সাহেবের জন্য নিয়ে এসেছি বহুত কিমতি এক তোফা।’
অবাক হয়ে বচন সিং-এর মুখের দিকে তাকালেন রামনারায়ণ।
বচন সিং মুচকি হেসে বলল, ‘গুলবদন এক জেনানা।’
.
পাহারারত দেশি সেপাই ও গোরা পল্টনদের বেষ্টনী টপকে পর্দা ঢাকা ডুলি নিয়ে বচন সিং ঢুকে পড়ে সেনাছাউনির মধ্যে। চারিদিকে সারি সারি অজস্র তাঁবু। তার মধ্যে দিয়ে এঁকেবেঁকে এগিয়েছে সরু পথ। ডুলিবাহকরা এগিয়ে চলে। এ পথ তাদের খুবই চেনা। হররোজই রামনারায়ণের হুকুমে কোনও না কোনও জেনানাকে তাদের পৌঁছে দিতে হয় আয়ারকুটের তাঁবুতে।
ডুলির মধ্যে বসে ঈশ্বরী ভাবছিল তার নিজের কথা। ঝড়ে ঝরে পড়া গাছের পাতার মতো তার জীবনটা। ঝরে পড়া পাতা, কোনও নির্দিষ্ট জায়গায় ঠাঁই পায় না। খেয়ালি হাওয়ায় শুধু এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় উড়িয়ে নিয়ে যায়। তেমনই বাঁশবেড়িয়ার বৃন্দা সমাজচ্যুত হয়ে উড়েই চলেছে। বাঁশবেড়িয়া থেকে বরানগর। সেখান থেকে পাটনা। কোনও কিছু আঁকড়ে ধরে থিতু হওয়া তার নসিবে নেই।
শান্তিপুরের রাসের মেলায় হারিয়ে গিয়ে দালাল রতু সরকারের খপ্পরে পড়ে ঠাঁই মিলল বরানগরের বাড়িতে। কিছুদিন পরে একটা ঘরের মধ্যে তাকে জোর করে ঠেলে ঢুকিয়ে দরজার আগল টেনে দিয়েছিল বিদ্যামাসি। কুপির আলোয় সেই ঘরের মধ্যে কুরসিতে লালমুখো এক সাহেবকে বসে থাকতে দেখে ভূত দেখার মতো চমকে উঠেছিল ঈশ্বরী।
সহসা কুরসি থেকে উঠে এসে দৈত্যাকার চেহারার সেই লালমুখো সাহেব এক ঝটকায় তাকে পাঁজা কোলে করে তুলে নেয়। ভয়ে চিৎকার করে উঠেছিল ঈশ্বরী।
সেই শুরু। তারপর নিত্য সাহেবদের আনাগোনা শুরু হল তার ঘরে। তাদের মন ভরানোর রংঢং ঈশ্বরী সবই শিখল। রোজ রাতে, চেকনাই বসনে, প্রসাধনে নিজেকে মোহিনী করে তুলে ভালোবাসার অভিনয় করা, রাত পোহালে গভীর ক্লান্তি, অবসাদে ডুবে যাওয়া। এভাবেই চলছিল। হঠাৎই একদিন মনে রং ধরিয়ে গেল এক সাহেব। তার নাম ছিল আয়ারকুট।
রতু সরকার বলেছিল, ‘আমার মান রাখিস রে ঈশ্বরী। আজ তোর নাগর হল কোম্পানির ফৌজের এক বড় সাহেব। কী সৌভাগ্যি!’
কী জাদু ছিল সেই সাহেবের মধ্যে ঈশ্বরী জানে না। সে মজল ভালোবাসায়।
বিদ্যামাসি বলেছিল, ‘ওরে সব্বনাশী মেয়ে, এ কারবারে নেমে কাউকে মন বাঁধা দিতে নেই। তাতে তোরই লোকসান।’
কিন্তু রাধিকার মন কবে কার অনুশাসন মেনেছে। কেষ্ট ঠাকুরটি হয়ে আয়ারকুটও কিছুদিন মেতে রইলেন ঈশ্বরীকে নিয়ে। তারপর একদিন বন্ধ হল বরানগরের বাড়িতে আয়ারকুটের অভিসার। রতু সরকার বলল, ‘সাহেবে-নবাবে লড়াই বাঁধতে চলেছে। এখন কি তোকে নিয়ে আদিখ্যেতা করার সময় আছে তার?’
ঈশ্বরী বন্ধ করল কারবার। সারাদিন মন খারাপ করে শুয়ে থাকত ঘরে।
একদিন বিদ্যা বলল, ‘চল রে ঈশ্বরী, কাশী ঘুরে আসি।’
ফের ঝড়ের হাওয়ায় উড়ল ঈশ্বরী। কাশী যাওয়ার পথে বজরায় হামলা করল লুঠেরার দল। রতু সরকার ও বিদ্যামাসির কী হল তা সে জানে না। বর্ষার উত্তাল গঙ্গায় ছিটকে পড়ে বাঁচার কথা ছিল না, তবুও বাঁচল ঈশ্বরী। জল থেকে তাকে উদ্ধার করল বচন সিং। পাটনায় এক হাভেলিতে ঠাঁই হল ঈশ্বরীর।
বিরাট উঁচু পাচিল ঘেরা বিলাসবহুল এক হাভেলি। দিনের বেলাতেও সেখানে আঁধার। দিবারাত্র ঘরে জ্বলে দেওয়ালগিরির আলো। বন্দিনী ঈশ্বরীর দেখভাল করে কয়েকজন বাঁদি। এই হাভেলির বাইরে পা রাখার হুকুম নেই, উপায়ও নেই। সদর দরওয়াজার মুখে দিনরাত পাহারা দিচ্ছে ভোজপুরী সেপাই। কয়েকদিনেই এই বন্দি জীবন অসহ্য হয়ে উঠল ঈশ্বরীর কাছে। দিনরাত বিছানায় চুপ করে শুয়ে সে ভাবত কী করে পালানো যায় এই কয়েদখানা থেকে।
একদিন ঈশ্বরী শুনল কোনও এক মেহমানকে খুশি করার জন্য ভেট হিসেবে পাঠানো হবে তাকে। যথা সময়ে পর্দা ঢাকা ডুলি এল। সঙ্গে পাহারাদার ভোজপুরী সেপাই ও বচন সিং। বিনা বাক্য ব্যায়ে ডুলিতে চেপে বসল ঈশ্বরী। তার মনের মধ্যে তখন উঁকি মারছে এক চিলতে আশা। হাভেলি থেকে বেরোনোর সুযোগ পাওয়া গেল। নিয়তি কি ফের ঝড়ের হাওয়ায় তাকে উড়িয়ে নিয়ে যাবে অন্য কোথাও?
.
ফরাসের উপর শাহি মেজাজে কাত হয়ে শুয়েছিলেন মেজর আয়ারকুট। সামনে সাজানো রয়েছে পানীয়ের বোতল। তার সমুখে এসে সেলাম জানাল বচন সিং।
বচন সিং-কে দেখেই পানপাত্র হাতে রঙিন মেজাজে আয়ারকুট বললেন, ‘আইয়ে বাবু।’
বচন সিং এগিয়ে এসে মিনা করা মেহগিনি কাঠের একটা বাক্স তুলে দিল আয়ারকুটের হাতে।
বাক্স খুলতেই চোখ ঝলসে গেল আয়ারকুটের। হিরে-মুক্তো-চুনি-পান্নার বহুমূল্যবান অলংকার ঠাসা রয়েছে বাক্সে।
খোশামুদে হাসি হেসে বচন সিং বলল, ‘রামনারায়ণজি পাঠিয়েছেন। আপনার নজর।’
বাক্সটা বন্ধ করে খোশমেজাজে মেজরসাহেব বললেন, ‘বহুত আচ্ছা। নায়েবজিকে আমার সেলাম জানাবেন।’
‘আউর এক তোফা আছে হুজুর। খুবসুরত এক লেড়কি।’
‘ভেরি গুড।’
‘ডুলি ভিতরে নিয়ে আসতে বলি?’
‘জরুর।’
বচন সিং চলে যায়।
ডুলিবাহকেরা ডুলি নিয়ে প্রবেশ করে আয়ারকুটের তাঁবুর অন্দরে। পর্দা ঢাকা ডুলিটা মাটিতে নামিয়ে রেখে তারা চলে যায় নিঃশব্দে।
পর্দার আগল ঠেলে বেরিয়ে এসে মেজর আয়ারকুটকে দেখে ভয়ানক চমকে ওঠে ঈশ্বরী।
আয়ারকুট স্তম্ভিত। ফরাস থেকে উঠে ছুটে এলেন, ‘এ কী? ডার্লিং তুমি?’
বিস্ময়ে, আবেগে, তীব্র উত্তেজনায় ঈশ্বরীর মাথার মধ্যে কেমন যেন চক্কর দিয়ে উঠল। বেসামাল হয়ে মাটিতে টলে পড়ে যাচ্ছিল সে। আয়ারকুট ধরে ফেললেন তাঁকে।
আয়ারকুটের বাহুবন্ধনে সংজ্ঞা হারাল ঈশ্বরী।
.
