1 of 2

পলাশির পরে – ২২

২২

সকাল থেকে মোরাদবাগ প্যালেসের নৌকোঘাটে দারুণ ব্যস্ততা। মাঝিমাল্লা মুটে-মজুরদের কোলাহলে চারিদিক মুখর। কোন নৌকোতে কী কী মাল উঠল, তা তালিকা ধরে মিলিয়ে নিতে হিমসিম খাচ্ছেন দেওয়ান রামচাঁদ ও কোম্পানির ছোকরা রাইটার লাশিংটন। কম তো নয়, ছোটবড় মিলিয়ে প্রায় আড়াইশো নৌকো।

চুক্তিমতো ইংরেজদের দাবির প্রথম কিস্তি মিটিয়ে দিয়েছেন মিরজাফর। চামড়ার খেরিয়ায় ঠাসা রুপোর টাকা, মোহর তো আছেই। সেই সঙ্গে আছে পারস্যের গালিচা, মেহগিনি কাঠ ও শ্বেতপাথরের আসবাবপত্র, বেলজিয়াম কাঁচের তৈরি অজস্র ঝাড়বাতি, গাঁট গাঁট আবরোয়ান, তরন্দাম, নয়নসুখ মসলিন। এছাড়াও আছে চিনামাটির বাসনপত্র, ঘর সাজানোর নানারকম শৌখিন দ্রব্য, বিরাট বিরাট আকারের বেলজিয়াম কাঁচের আরশি, সোনা, রুপো, হিরে, চুনি, পান্নার গয়না আর সেই সঙ্গে বস্তা বস্তা উৎকৃষ্ট সোরা—বারুদ তৈরির উপাদান। মুফতে পাওয়া। যার বাজারদর অনেক। এই সব জিনিসপত্রে বোঝাই হয়ে আছে নৌকোগুলো। পলাশির গনিমত, মসনদের কিম্মত, মুর্শিদাবাদের জলুস পাড়ি দিচ্ছে কলকাতায়।

মাঝ নদীতে নোঙর ফেলে আছে অ্যাডমিরাল ওয়াটসনের জাহাজ কেন্ট। কিছু দূরে দাঁড়িয়ে আছে আরেকটি জাহাজ টাইগার। কেন্ট জাহাজের পিছনে গিয়ে নৌকোগুলিকে পরপর দাঁড় করাচ্ছে মাঝিমাল্লারা। নদীর বুকে নৌকোর মিছিল। নদীর দুই তিরে অজস্র মানুষের ভিড়। লোকে বুঝছে এ এক প্রকার লুঠ। লুঠের মাল সাড়ম্বরে এভাবে কলকাতায় নিয়ে যাওয়ার আয়োজন দেখে অনেকেই বিস্মিত।

কলকাতাগামী এই নৌবহরের সমুখে পাইলট হিসেবে থাকবে টাইগার। তার পিছনে কেন্ট। তার পিছনে থাকবে মালপত্রে বোঝাই প্রায় আড়াইশো নৌকো। একেবারে পিছনে থাকবে বাকি তিনটি জাহাজ—কামবারল্যান্ড, সলিসবেরি ও ব্রিজওয়াটার। এমনই নির্দেশ দিয়েছেন কর্নেল ক্লাইভ। কড়া পাহারায় নৌকোগুলোকে নিয়ে যেতে হবে কলকাতায়। তাই প্রত্যেকটা জাহাজেই ফ্লিন্টলক রাইফেল হাতে প্রস্তুত হয়ে আছে গোরা পল্টন। জাহাজগুলিতে ঘুলঘুলি পথে বেরিয়ে আছে কামানের নল। প্রস্তুত গোলন্দাজ বাহিনীও। নিরাপত্তার বিষয়ে কর্নেল ক্লাইভ কোনও ঝুঁকি নিতে চান না।

কেন্ট জাহাজে চড়ে আজই ওয়াটসন রওনা দেবেন কলকাতায়। ক্লাইভ আরও কিছুদিন থাকবেন মুর্শিদাবাদে। নদীর বুকে মালবোঝাই নৌকোর মিছিল দেখে ক্লাইভ ও ওয়াটসন খুব খুশি। মাদ্রাজ থেকে বাংলায় আসার পথে বাংলা লুঠের যে পরিকল্পনা দু’জনে করেছিলেন, আজ তা পরিপূর্ণ হতে চলেছে। নৌকোঘাটে দাঁড়িয়ে লঘু চিত্তে এসবই আলোচনা করছিলেন দুই যুদ্ধবাজ।

এখনই বজরায় চেপে কেন্ট জাহাজের উদ্দেশে রওনা হলেন অ্যাডমিরাল ওয়াটসন। কর্নেলের সঙ্গে করমর্দন সেরে বললেন, ‘নাউ আওয়ার মিশন ইজ কমপ্লিট।’

ক্লাইভ বললেন, ‘গুড বাই ডিয়ার। উই উইল মিট সুন ইন ক্যালকাটা।’

ওয়াটসনও হাসি মুখে হাত নেড়ে বললেন, ‘টেক কেয়ার অফ ইওর হেলথ।’

ক্লাইভ হেসে বললেন, ‘সেম টু ইউ। বাই বাই।’

বজরায় উঠলেন ওয়াটসন। অ্যাডমিরাল সাহেব আজ যেন খুশিতে বড় বেশি রকমের উচ্ছল। বজরার গলুইয়ে দাঁড়িয়ে গলা ছেড়ে গাইতে লাগলেন রুল ব্রিটানিয়া।

প্রত্যেকটা নৌকো ও জাহাজের মাথায় উড়ছে ইউনিয়ন জ্যাক। এলোমেলো হাওয়ায় ঔদ্ধত্যের সঙ্গে উড়ছে কোম্পানির পতাকা। এ দৃশ্য দেখে গর্বে বুক ফুলে উঠছে ক্লাইভের। উড্ডীন নিশানগুলো যেন একযোগে ক্লাইভের কুদরতিকে কুর্নিশ জানাচ্ছে।

সত্যিই এ এক গৌরবময় প্রত্যাবর্তন। গত বছরের ডিসেম্বরে যেদিন ফলতায় এসে পৌঁছেছিলেন কর্নেল, সেই দিন ও আজকের এই দিন, মাঝে মাত্র সাড়ে ছ’মাসের ব্যবধান—কিন্তু কত তফাত দুটো দিনের মধ্যে। ফলতার উদ্বাস্তু শিবিরে বসে সেদিন মৃত্যুর প্রহর গুনছিল ইংরেজরা, সুবে বাংলা থেকে উৎখাত হয়েছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। আর আজ? সেই ইংরেজরাই ফের প্রবল ভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। নৌকো বোঝাই করে নবাবের দৌলত নিয়ে যাচ্ছে কলকাতায়। চোরের মতো চুপিসারে নয়, রীতিমতো সাড়ম্বরে। এমন দস্যুবৃত্তি অতীতে কেউ কি দেখেছে এই সুবে বাংলায়? এসব ভাবতে ভাবতে আপন মনে মুচকি হাসলেন ক্লাইভ। লং কোটের পকেটে হাত চালিয়ে পাইপটা বের করে ঠোঁটে গোঁজার পর খেয়াল হল, চকমকি পাথরের খণ্ডদুটো ফেলে এসেছেন ঘরে। ঠিক তখনই পাশ থেকে একজন এগিয়ে দিল চকমকি পাথর।

ক্লাইভ ঘুরে তাকিয়ে দেখলেন মুনশি নবকৃষ্ণ। তাঁর মুখে লেগে আছে মিটিমিটি হাসি।

‘গুড মর্নিং মুনশি।’

‘ভেরি গুড মর্নিং স্যার।’

পাইপ ধরিয়ে ক্লাইভ বললেন, ‘আমার প্রয়োজনটা তোমার মতো কেউ বোঝে না।’

হাসলেন নবকৃষ্ণ।

‘ইজ এভরিথিং রেডি?’ ধোঁয়া ছেড়ে প্রশ্ন করলেন ক্লাইভ।

‘বিলকুল হুজুর।’ ক্লাইভের পাশে আর একটু সরে এসে গলা খাটো করে নবকৃষ্ণ বললেন, ‘শুধু আপনার মদ্দা গর্ধভটি এসে পড়লেই হল।’

 ‘আর ইউ টকিং অ্যাবাউট নবাব?’ ক্লাইভের মুখে দুষ্টুমির হাসি।

‘গুস্তাকি মাফ করবেন হুজুর। এ আমার কথা নয়, মুর্শিদাবাদ দরবারের ক্লাউন মির্জা শামসুদ্দিন কথাটা চাউর করেছে। তামাম চকবাজারও জানে।’

‘এমন নবাব থাকলেই তো সওদা করে সুখ। কী বল?’ ফের মুচকি হাসলেন ক্লাইভ।

‘আপনাকে যত দেখছি তত তাজ্জব বনে যাচ্ছি হুজুর।’

ভুর কুঁচকে নবকৃষ্ণর দিকে তাকিয়ে ক্লাইভ বললেন, ‘অ্যাম আই রং?’

নবকৃষ্ণ বললেন, ‘না না। রং কোথায়? ভুল কি আপনার হতে পারে? কী মোক্ষম চালই না চাললেন। যাঁর দৌলত ছেঁচে নিয়ে যাচ্ছেন কলকাতায়, তিনিই এসে কিনা নিশান উড়িয়ে যাত্রা শুরুর হুকুমত দেবেন।’

ধোঁয়া উড়িয়ে হাসলেন ক্লাইভ। কর্নেলের মেজাজটা আজ একেবারে রঙিন হয়ে আছে।

‘পোষ্যের জন্য আবার লাল গালিচার আনজামও করে রেখেছেন!’ এই বলে ফিক করে ফিচেল হাসি হাসলেন নবকৃষ্ণ।

‘বুঝলে মুনশি এ হল এক কৌশল।’

‘সে তো বিলক্ষণ বুঝতে পারছি। এত সব কিমতি চিজ মুর্শিদাবাদ থেকে কলকাতায় যাচ্ছে। প্রজারা ভাবতে পারে ইংরেজরা লুঠেরা। নবাব এসে খুশি মনে নিশান ওড়ালে তেমনটা কারও আর মনে হবে না।’

ক্লাইভ মজা করে বললেন, ‘তুমি একটি বিচ্ছু। অ্যা ডেঞ্জারাস ফেলো। বিটুইন দ্য লাইনস চট করে পড়ে ফেলো।’

নবকৃষ্ণ হাত কছলে বলেন, ‘সবই তো আপনাকে দেখে শেখা হুজুর।’

নবকৃষ্ণের পিঠে হাত রেখে ক্লাইভ বললেন, ‘শিখতে সবাই পারে না মুনশি। ইউ আর টু ইন্টেলিজেন্ট।’

নবকৃষ্ণ বিনয়ে গলে পড়ে জোড়হাত হয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে বলে, ‘আপনার তারিফি আমার সরতাজ হুজুর। গত কয়েকদিন থেকে একটা কথা বলব ভাবছি। যদি অনুমতি করেন তো বলি।’

ক্লাইভ নবকৃষ্ণর মুখপানে চেয়ে ভুরু কুঁচকে শুধোলেন, ‘আর ইউ সেনসিং সামথিং রং?’

‘ল-সাহেব তো শুনলাম পালিয়ে গিয়েছেন অযোধ্যার নবাব সুজাউদ্দৌলার এলাকায়।’

ক্লাইভ মাথা নেড়ে বললেন, ‘ইটস অ্যা ম্যাটার অফ কনসার্ন। ল মে ইনস্টিগেট সুজাউদ্দৌলা টু অ্যাটাক বেঙ্গল।’

হাত কচলে নবকৃষ্ণ বললেন, ‘বলছিলাম কী হুজুর– মেজর আয়ারকুটের ফৌজ নিয়ে পাটনায় বসে থাকার আর কোনও দরকার আছে কি?’

‘হোয়াই আর ইউ সেইং সো?’

‘শুনলাম নবাব মিরজাফর খাঁ চান পাটনার নায়েব রামনারায়ণকে বরবাদ করতে।’

‘আই থিংক ইট ইজ অ্যা গুড ডিসিশন।’

‘আপনি ভালো বলছেন?’

‘ইয়েস। আই অলসো ওয়ান্ট টু রুইন দ্যাট ওল্ড ফক্স রামনারায়ণ। ল’কে পালিয়ে যেতে মদত দিয়েছে।’

‘হয়তো খানিকটা না বুঝেই কাজটা করে ফেলেছেন।’

ক্লাইভ ভুরু কুঁচকে শুধোলেন, ‘কী বলতে চাইছ মুনশি?’

‘বলছিলাম, রামনারায়ণ অনেকদিন পাটনার নায়েবের পদে বহাল আছেন। তাগদই বলুন আর দৌলতই বলুন, কোনওটাই তার কম নয়। তার উপরে পাকা মাথার লোক। রামনারায়ণকে সরিয়ে নিজের ভাই মির কাজিমকে পাটনার কুরসিতে বসাতে চান মিরজাফর। নবাবের মতো তার ভাইও ষাঁড়ের গোবর, আই মিন ওয়ার্থলেস। তিনি পাটনার শাসক হলে কোম্পানিরই যে তকলিফ হবে হুজুর।’

নব মুনশির বিচারবুদ্ধির উপরে যথেষ্ট আস্থা আছে ক্লাইভের। এ কথা শুনে তিনি খানিকটা চিন্তিত হয়ে বললেন, ‘কেন বলছ এ কথা?’

‘সুজাউদ্দৌলা বাংলার দিকে ধেয়ে এলে পাটনায় তাকে রোখার কেউ থাকবে না। মির কাজিম বুজদিল, নালায়েক আদমি। অযোধ্যার ফৌজ এলে ল্যাজ তুলে পালাবে। বরং লড়তে পারবেন রামনারায়ণ। ওদিককার জমিদারেরা সবাই ওর বশ। আপনি মানুষটাকে তাঁবে রাখতে পারলে কোম্পানিরই লাভ।’

ক্লাইভ মাটির দিকে চেয়ে আছেন। ঠোটে গোঁজা পাইপ। কপালে চিন্তার ভাঁজ। মন দিয়ে শুনছেন নব মুনশির কথা।

‘আপনি যদি রামনারায়ণকে মদত দেন তো জিন্দেগিভর সে আপনার গোলাম হয়ে থাকবে।’

মুখ তুলে ক্লাইভ বললেন, ‘ইউ আর রাইট মুনশি। আই ডিড নট থিংক ইন দিস ওয়ে। ইউ ওপেন মাই আইজ। আই উড রাইট টু আয়ারকুট। উড আস্ক হিম টু কাম ব্যাক।’

ঠিক এই সময় হিরাঝিলের দিক থেকে ভেসে এল তোপের আওয়াজ।

‘এইবার আপনার গর্ধভটি আসছে।’ মুচকি হেসে কথাটা বলে ক্লাইভের পাশ থেকে সরে গেলেন নবকৃষ্ণ।

পথের উপরে বিছানো রয়েছে লাল গালিচা। দুপাশে সঙিন হাতে দাঁড়িয়ে রয়েছে গোরা পল্টনেরা। এগিয়ে আসছেন নবাব। গোরা পল্টনেরা মাথা ঝুঁকিয়ে কুর্নিশ জানাচ্ছে। কর্নেল ক্লাইভ এগিয়ে গিয়ে অভিবাদন জানালেন নবাবকে। পাশ থেকে ওমর বেগ নবাবের হাতে তুলে দিলেন নিজামতের নিশান। নিশান ওড়ালেন নবাব মিরজাফর।

ক্লাইভ, কিলপ্যাট্রিক-সহ ইংরেজ সেনাবাহিনীর অন্যান্য অফিসারেরা হাততালি দিয়ে উঠলেন।

দুম! দুম! দুম! গর্জন করল টাইগার জাহাজের তোপ। চলতে শুরু করল গোটা নৌবহর।

মুর্শিদাবাদ থেকে কলকাতা। জলুস-জাঁকজমকের স্থানবদলের সেই শুরুয়াত।

.

ভাগীরথীর বুকে চলমান সারিসারি নৌকো। সেগুলোর সামনে ও পিছনে ইংরেজদের জাহাজ। খানিকবাদে হারিয়ে যাবে চোখের নজর থেকে। হিরাঝিলের ছাতে দাঁড়িয়ে দূরবিন চোখে দৃশ্যটা দেখছিলেন মণি বেগম। চলমান বাতাস বেগম সাহেবার কানে পৌঁছে দিচ্ছে মিলিটারি ব্যান্ডে বাজতে থাকা রুল ব্রিটানিয়ার সুর। সেই সুর তামাম মুর্শিদাবাদকে যেন বিষাদে, জহমতে ডুবিয়ে দিয়ে চলে যাচ্ছে দূরে।

ইংরেজ জাহাজের তোপধ্বনি শুনে থমকে গিয়েছিল হিরাঝিল প্রাসাদের নহবতের সানাই। ফিরে আসছেন নবাব। স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন মণি বেগম। নবাবকে স্বাগত জানাতেই বোধ হয় ফের বেজে উঠল সানাই। মণি বেগমের মনে হল, তামাম মুর্শিদাবাদ যেন কেঁদে উঠল।

দূরবিন থেকে চোখ সরিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন বেগম সাহেবা।

মণি বেগম ভাবতে থাকেন, নসিবের কী আজিব খেয়াল। নবাবের চোখের সামনেই ইংরেজরা একরকম লুঠ করে নিয়ে গেল তাঁর দৌলত। শুধু তাই নয়, কর্নেল ক্লাইভের খায়েশে নবাবকেই নিশান উড়িয়ে লুঠের মালে বোঝাই নৌকোগুলোকে কলকাতার উদ্দেশে রওনা করাতে হল।

মণি বেগম শুধিয়েছিলেন, ‘আপনারই দৌলত লুঠ করে কলকাতায় নিয়ে যাচ্ছে ইংরেজরা। আপনাকে কেন খেয়াঘাটে গিয়ে নিশান ওড়াতে হবে?’

‘লুঠ বলছ কেন মণি?’

‘লুঠ নয়?’

‘চুক্তির কড়ি। মসনদের কিম্মত। আমিই যে দস্তখত করে কড়ার করেছি। চোকাতে হবেই।’

‘তা না হয় মানলাম। কিন্তু আপনাকে খেয়াঘাটে গিয়ে নিশান ওড়াতে হবে কেন?’

মিরজাফর হেসে বলেছিলেন, ‘কর্নেলের আবদার। কী করে ইনকার করি বলো? আর যাই হোক ওই মানুষটার জন্যেই তো মসনদ আজ আমার। আমি সুবে বাংলার নবাব।’

‘আমি সুবে বাংলার নবাব’—কথাটা শুনে কেঁপে উঠেছিলেন মণি বেগম। হতাশা ও বিষাদের সুর প্রচ্ছন্ন ছিল নবাবের গলায়। সিরাজদ্দৌলার মুসিবতের পর মিরজাফর খাঁর দেহভঙ্গিতে যে খুনজোশি প্রত্যক্ষ করেছিলেন বেগমসাহেবা, পক্ষকাল কাটতে না কাটতেই তা যেন অনেকটা জুড়িয়ে গিয়েছে।

নবাববেগম হয়ে মণি বেগমেরও তো মনে হয়েছিল বেহেস্তের কওসরে যেন ডুব দিয়ে উঠলেন। আজ তিনি নিজেও কি স্বস্তিতে আছেন? আসমানের চাঁদ হাতে পেয়ে হিরাঝিল প্যালেসের নয়া মালকিন প্রথম প্রথম খুশিতে যেন আজাদ চিড়িয়ার মতো ডানা মেলে উড়ছিলেন। সেই খুশির রং খুব দ্রুত কেন বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছে?

সিরাজদ্দৌলার শাদিতে মুজরো করতে এসে অচানকই মিরজাফরের নজরে পড়া, তারপরেই শাদি এবং বাঁদি থেকে মণির বেগম হয়ে ওঠা। মণি বাইকে নয়, প্রৌঢ় মিরজাফর চেয়েছিলেন তাঁর শরীরটাকে। নিজের দেহটাকে মিরজাফরের হাতে সঁপে দিয়ে মণি বাই চেয়েছিল জীবনে তাগদ, রওশন, সুখ খরিদ করতে। এই রিস্তেদারির শুরুয়াতে মেদবহুল থলথলে চেহারার প্রৌঢ় মানুষটার বেলাগাম কুৎসিত রতিসম্ভোগের চাহিদা অসহ্য লাগত মণির। তবুও সব মেনে নিয়ে কলের পুতুলের মতো বিছানায় মিরজাফর খাঁকে সুখ দিয়ে গিয়েছে মণি, শুধু নিজের সুখ খরিদের নেশায়। কিন্তু মানুষটাকে সে ভাবে কখনোই ভালোবাসতে পারেননি মণি বেগম।

কিন্তু আজ? আজ যেন বৃদ্ধ, বেওকুফ মানুষটাকে বড় ভালোবাসতে ইচ্ছে করছে মণির। সত্যিই মানুষটা বড় অসহায়। ধূর্ত ইংরেজদের হাত থেকে কী করে নিজেকে বাঁচাবেন নবাব, কী করে কায়েম রাখবেন মসনদের উপরে তার অধিকার, মণি বেগম এখন সেই চিন্তায় বিভোর হয়ে আছেন। মনের মধ্যে জমাট বেঁধেছে শঙ্কার মেঘ। ভাবীকালের গর্ভে কী আছে কেউ জানে না। নসিব কখন যে কী ভাবে ঘর বদলাবে তা কেউ বলতে পারে না। মণি বেগম এখন দু’হাত দিয়ে আগলে রাখতে চান তার খসম, বৃদ্ধ নবাবকে। যতদিন এই মানুষটা মসনদে আসীন থাকবেন, ততদিন মণি বেগমের জীবনে থাকবে তাগদের জোশ, সুখের ফোয়ারা, জলুসের ঝিকিমিকি। যা পাওয়ার ছিল না, তাই জীবনে অর্জন করেছেন মণি। যা পেয়েছেন তা হারাতে চান না চট করে। কিন্তু এই রঙিন জীবনের শুরুয়াতেই বরবাদির অশুভ ছায়া যেন চোখে পড়ছে মণি বেগমের। সেই ছায়ার নাম ইংরেজ বণিক।

মিরজাফরের ঔরসে মণি বেগম জন্ম দিয়েছেন দুই পুত্রের। নজম ও সইফ। ফুলের মতো সুন্দর দুটি শিশু। এদের ভবিষ্যৎত-ভাবনা মণি বেগমকে আজ অস্থির করে তুলেছে।

গোটা হিরাঝিল প্যালেস জুড়ে ছুটোছুটি করে খেলা করছিল দুই ভাই—নজম ও সইফ। সহসা ছাতে এসে উপস্থিত হল তারা।

‘আম্মিজান! আম্মিজান! ছুটে এল দুজনে।

 দুই ছেলেকে দুই বাহু দিয়ে বুকে টেনে নিয়ে তাদের মাথায়, কপালে ঘন ঘন চুমু খেতে লাগলেন মণি বেগম। তাঁর দুই গাল বেয়ে নেমে এল জলের ধারা। খুশি, শঙ্কা, অপত্য স্নেহ সব কিছুই মণি বেগমের চোখের জলে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল।

.

ফরাসি গোলন্দাজ সিনফ্রে পালিয়ে গিয়েছেন দক্ষিণ ভারতে। যোগ দিয়েছেন জেনারেল ব্যুসির সঙ্গে। একথা শুনে হতাশ হয়েছিলেন ক্লাইভ। প্রায় একই সময় খবর পেলেন জাঁ লকে গ্রেফতার করা যায়নি। রাজমহলের ফৌজদার মির দাউদের প্রায় নাকের ডগা দিয়ে ফৌজসহ ফরাসি সেনাপতি পালিয়ে গিয়েছেন পাটনার দিকে। এই সংবাদ শুনে বিরক্ত হয়ে মেজর আয়ারকুটকে পাটনা অভিযানে পাঠালেন ক্লাইভ।

মেজর আয়ারকুটের সঙ্গে পাটনায় গেলেন মিরজাফরের ভাই মির কাজিম ও মহম্মদ আমিন। মির কাজিমের নামে পাটনার ডেপুটি সুবাদার পদের পরোয়ানা জারি করেছেন নবাব মিরজাফর খাঁ। বহুদিনযাবত ও পদের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন সিরাজদ্দৌলার অনুগত রামনারায়ণ। তাঁর উদ্দেশে মিরজাফর হুকুমত জারি করলেন, ‘…পাটনার দায়িত্ব মির কাজেমকে বুঝিয়ে দিয়ে তুরন্ত মুর্শিদাবাদে চলে আসুন।…’ বহুদিন পাটনার ডেপুটি সুবাদার পদে বহাল থেকে প্রচুর অর্থ সঞ্চয় করেছেন রামনারায়ণ। নবাব মিরজাফরের উদ্দেশ্য সেসব দখল করা।

পাটনায় এসে জাঁ ল-এর নাগাল পেলেন না আয়ারকুট। পালিয়ে গিয়েছেন ল। তাঁর পিছনে ধাওয়া করে এসে কর্মনাশা নদীর তীরে থমকে দাঁড়িয়ে পড়তে হল আয়ারকুটকে। কর্মনাশা সুবে বাংলার সীমারেখা। এপারে সুবে বাংলা, ওপারে অযোধ্যার নবাব সুজাউদ্দৌলার এলাকা। আয়ারকুট শুনলেন, জাঁ ল নদী পেরিয়ে বারাণসীর সামন্তপ্রভু বলবন্ত সিং-এর কাছে আশ্রয় নিয়েছেন।

ক্লাইভকে চিঠি লিখে এ কথা জানালেন আয়ারকুট। উত্তর এল, ‘…ডোন্ট ক্রস দ্যাট রিভার। নবাব সুজাউদ্দৌলা ইজ টু পাওয়ারফুল। প্লিজ কাম ব্যাক টু পাটনা অ্যান্ড রুইন দ্য ওল্ড ফক্স রামনারায়ণ।…’ সিরাজদ্দৌলার অনুগত এবং ফরাসি সেনাপতি জাঁ ল’কে সুজাউদ্দৌলার রাজত্বে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছেন—এই কারণে ক্লাইভ তখন রামনারায়ণের উপরে খুবই রুষ্ট।

ফৌজ নিয়ে পাটনায় ফিরে এলেন আয়ারকুট। সঙ্গে আড়াইশো গোরা পল্টন তিনশো দেশি সেপাই ও দুটো কামান। রামনারায়ণের শক্তির তুলনায় এই ফৌজ নগণ্য। তবু সংঘাতের পথে গেলেন না রামনারায়ণ। তিনি পাটনা দুর্গের সব দরজা বন্ধ করে দিয়ে পরিস্থিতির উপরে নজর রাখতে লাগলেন।

 ‘…ইট ইজ নট পসিবল টু রুইন রামনারায়ণ উইথ দ্য কনটিনজেন্ট আই হ্যাভ। প্লিজ সেন্ড মোর ট্রুপস।…’ ক্লাইভকে একথা চিঠি লিখে জানিয়ে পাটনা দুর্গের অদূরে ছাউনি ফেলে অপেক্ষা করতে লাগলেন আয়ারকুট। বিলাসে গা ভাসালেন মেজর সাহেব। মদ ও মেয়েমানুষ দুটোতেই তাঁর প্রবল আসক্তি।

এদিকে ভালো ফ্যাসাদে পড়লেন মিরকাজিম। হাতে পাটনার ডেপুটি সুবেদারির পরোয়ানা। ওদিকে কেল্লায় ঢুকতে পারছেন না। নবাবের পরোয়ানা-হুকুমত এসবকে কোনও গুরুত্বই দিচ্ছেন না রামনারায়ণ। এখন ভরসা মেজর আয়ারকুট ও ইংরেজবাহিনী। কিন্তু মুশকিল হল দুর্গের উপরে হামলা করার বিষয়ে মেজর সাহেবের কোনও গা নেই। অপেক্ষা করতে করতে মিরকাজিম অধৈর্য হয়ে পড়েছেন। সম্প্রতি কসিদের মুখে একটা খবর শুনে ঘুম উড়েছে তাঁর। মেয়েমানুষ জুগিয়ে রামনারায়ণ নাকি মেজর সাহেবকে প্রায় বশ করে ফেলেছেন।

কসিদের আনা খবরটা সত্যি কি না তার আঁচ পেতে সন্ধের মুখে একদিন ইংরেজদের ছাউনিতে এসে হাজির হলেন দুই ভাই– মিরকাজিম ও মহম্মদ আমিন।

দু’জনের পথ আটকাল সেনাছাউনির দেউড়িতে পাহারারত দেশি সেপাইরা।

‘পথ ছাড়ো। মেজর সাহেবের সঙ্গে দেখা করব।’

‘মেজর সাহেব আরাম করছেন। এখন দেখা করার হুকুম নেই।’ একজন সেপাই উত্তর দেয়।

মির কাজিম ঝাঁঝের সঙ্গে বলে ওঠেন, ‘আরে উজবুকের দল, আমি পাটনার ডেপুটি সুবাদার। মেজর সাহেবকে গিয়ে বলো, আমি দেখা করতে এসেছি। জরুরি দরকার।’

সেপাই ফের বললে, ‘মাফ করবেন হুজুর। এখন তাঁকে বিরক্ত করলে গর্দান যাবে।’

উত্তেজিত মির কাজিম ঠাস করে সেপাইকে একটা চড় কষিয়ে বললেন, ‘চুপ রহো বেতমিজ।’

গোলমাল শুনে গোরা পল্টনেরা বন্দুক হাতে ছুটে এল। সঙিন উঁচিয়ে একজন বললে, ‘সরি। ইট ইজ নট দ্য টাইম টু মিট মেজর স্যার।’

বেয়নেটের সম্মুখে আর কথা বাড়ানোর সাহস করলেন না মির কাজিম।

ঠিক তখনই একটা পর্দা ঢাকা ডুলি সেনা ছাউনির প্রবেশ দ্বারে এসে হাজির হল। ডুলির সামনে পিছনে রয়েছে রাজপুত লেঠেল। আরও একজন আছেন এই দলের সঙ্গে। রামনারায়ণের অতি বিশ্বস্ত কর্মচারী বচন সিং। পূর্বে কিছুদিন পাটনায় থাকার সুবাদে মিরকাজিম একে চেনেন।

বিস্মিত চোখে মিরকাজিম দেখলেন গোরা পল্টনেরা বহুত খাতির করে বচন সিং-কে অন্দরে নিয়ে গেল। ডুলিবাহকেরা ডুলিটা নিয়ে ঢুকে পড়ল সেনাছাউনির চৌহদ্দিতে। শুধু রাজপুত লেঠেলরা দাঁড়িয়ে রইল বাইরে।

রাগে, অপমানে গা জ্বলে গেল মিরকাজিম ও মহম্মদ আমিনের। ভিতরে ভিতরে কী খেলা চলছে তা আর বুঝতে বাকি রইল না তাদের।

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *