২১
মহানন্দ স্বামীর প্রশ্নের জবাবে কৃষ্ণকিশোর বললেন, ‘আমার কনিষ্ঠ ভ্রাতা কৃষ্ণগোপালের দু-দু’বার বিবাহ হয়েছে। কিন্তু কী বলব, বলুন—অদৃষ্টের পরিহাস। কোনও পক্ষেই কৃষ্ণগোপালের কোনও সন্তানাদি হয়নি। আমার মাতৃদেবী খুবই দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। আমার ভ্রাতার মনেও কোনও সুখ নেই। আমার দুই কন্যা। কোনও পুত্রসন্তান নেই। বংশের উত্তরাধিকার কে অক্ষুণ্ণ রাখবে এই প্রশ্নে আমরা সকলে বর্তমানে খুবই বিচলিত।’
মহানন্দ বললেন, ‘পরমেশ্বর করুণাময়। এ বোধ করি তাঁরই ইচ্ছা। তাই তোমাদের এই পারিবারিক সংকটের কালে সমাধানসূত্র নিয়ে আমার এখানে হাজির হওয়া। জয় শিবো শম্ভু।’
কৃষ্ণকিশোর উচ্ছ্বসিত গলায় বলে ওঠেন, ‘নিশ্চিত তাই। আপনার যদি অমত না থাকে তো আমার ভ্রাতা কৃষ্ণগোপাল বালকটিকে দত্তক নিতে পারে।’
‘বাঃ চমৎকার!’
‘কত বয়স হবে বালকটির?’ শুধোলেন কৃষ্ণকিশোর।
‘বছর পাঁচেক।’
কৃষ্ণকিশোর প্রবল উৎসাহের সঙ্গে বলেন, ‘আমার মাতৃদেবীকে বিষয়টি অবিলম্বে জানানো দরকার। তিনি খুবই খুশি হবেন।’
‘তোমার ভ্রাতা কৃষ্ণগোপাল নারাজ হবেন না তো?’
‘সে আমাকে পিতার ন্যায় মান্য করে। আমার সিদ্ধান্তে কখনোই সে অমত করবে না।’
মহানন্দ স্বামী খুশি হয়ে বললেন, ‘আমাকে তুমি পরম আশ্বস্ত করলে বাবা। পরমেশ্বর তোমাকে আশীর্বাদ করুন। বিনোদের বড়ই উপকার হল। তেমন আতান্তরে না পড়লে নিজপুত্রকে দত্তক হিসেবে অন্যের হাতে কেউ তুলে দিতে চায়? বিনোদ বড় সৎ চরিত্রের মানুষ। সাত্ত্বিক ব্রাহ্মণ। ওর পরিবারটিকে তুমি দেখো।’
কৃষ্ণকিশোর করজোড়ে বলেন, ‘আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন। এখন থেকে বিনোদ রায় ও তাঁর পরিবারের দেখভালের দায় আমার। আমি কালই আমার ভ্রাতাকে সঙ্গে নিয়ে আমহাটির উদ্দেশে রওনা হব। সাড়ম্বরে বালকটিকে নিয়ে আসব রাজবাটিতে। আগামী ঝুলনযাত্রার দিন দত্তক গ্রহণের অনুষ্ঠান হতে পারে।’
‘অতি উত্তম।’
‘তাহলে আপনি আজ এখানেই নিশিযাপন করুন। কাল আমাদের সঙ্গেই না হয় আমহাটি যাবেন। বিনোদ রায়ের গৃহটি চিনিয়ে দেবেন। তাঁর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবেন।’
মহানন্দ দৃঢ়তার সঙ্গে বললেন, ‘না বাবা। তা সম্ভব নয়। আমি এখনই বিদায় নেব। আমার কার্য সমাপ্ত হয়েছে। আমার উপস্থিতি এখন নিষ্প্রয়োজন। আমার এক শিষ্য বসন্তলাল আগামীকাল প্রত্যুষে এখানে আসবে। সেও বিনোদের পরিচিত। সেই তোমাকে আমহাটিতে বিনোদ রায়ের গৃহে নিয়ে যাবে। তাঁর সঙ্গে তোমার পরিচয় করিয়ে দেবে।’
কৃষ্ণকিশোর তবু মরিয়া হয়ে বলেন, ‘কোনওভাবেই কি একটি রাত এখানে কাটানো আপনার পক্ষে সম্ভব নয়? আপনার সেবা করার কোনও সুযোগই তো দিলেন না।’
‘আমার প্রস্তাবে তুমি রাজি হয়েছ এতেই আমি পরম তুষ্ট। আসলে কোনও গৃহীর গৃহে নিশিযাপনের বিষয়ে আমার গুরুর নিষেধ আছে।’ এই বলে সন্ন্যাসী উঠে দাঁড়ালেন।
কৃষ্ণকিশোরও শশব্যস্ত হয়ে গাত্রোত্থান করে বললেন, ‘আপনি সাধক মানুষ। আপনাকে ধরে রাখার সাধ্য আমার নেই। নিশ্চয়ই ভবিষ্যতে আপনার দর্শন পাব।’
‘সে বিষয়ে নিশ্চিত করে কথা দিতে পারি না।’
‘সে কী? দত্তক-গ্রহণ অনুষ্ঠানের দিন আপনি আসবেন না?’
মৃদু হেসে নিরাসক্ত গলায় মহানন্দ স্বামী বললেন, ‘পরমেশ্বর যদি ইচ্ছে করেন তো আসব।’
আবদারের সুরে কৃষ্ণকিশোর বললেন, ‘সেদিন কিন্তু আসতেই হবে আপনাকে। কোনও ওজর-আপত্তি শুনব না। আমার ভ্রাতুষ্পুত্রকে আশীর্বাদ করে যাবেন।’
‘বললাম তো, পরমেশ্বর যদি ইচ্ছে করেন তবে আসব। তবে একটা কথা জেনে রেখো, আমি আসি বা না আসি, বালক শ্রীমন্তের প্রতি আমার স্নেহাশীর্বাদ আজীবন থাকবে। গৃহত্যাগী সাধক মহানন্দ স্বামীকে যে বালক মায়ায় আচ্ছন্ন করতে পারে সে তো সামান্য কেউ নয়।’
এই বলে দৃঢ় পদক্ষেপে কৃষ্ণকিশোরের সেরেস্তা থেকে বেরিয়ে গেলেন মহানন্দ স্বামী। সেদিকে ভক্তিপূর্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে অস্ফুট স্বরে কৃষ্ণকিশোর বলে উঠলেন, ‘জয় শিবো শম্ভু।’
.
চারিদিকে বড় বড় গাছপালা মাথা তুলে আছে। জমিতে বুনো ঘাস, লতাগুল্ম ও কাঁটাঝোপের উচ্ছৃঙ্খল বিস্তার। সূর্যের আলো এখানে পাতার ফাঁকফোকর দিয়ে চুরি করে ঢোকে। ঘন সবুজের বুক চিরে সরু একফালি পাথুরে পথ জঙ্গলের ভিতর দিয়ে এঁকেবেঁকে গিয়েছে। তবে মাঝেমধ্যেই সে পথের উপরে হুমড়ি খেয়ে পড়ে অবরোধ তুলেছে কোমর সমান লম্বা ঘাস। ওই পথে চলাচল করা কষ্টসাধ্য। তার উপরে আছে বুনো জন্তুর ভয়। কৃষ্ণপুর সংলগ্ন এই গভীর অরণ্যে মানুষ সচরাচর প্রবেশ করে না।
এই অরণ্যের মধ্যে পাশাপাশি দু’টি অশ্বত্থ গাছের নীচে খানিকটা এলাকা জুড়ে ঝোপঝাড় কেটে পরিষ্কার করেছে কেউ। মাটিতে দৃশ্যমান আগুনের দাগ। একদিকে রয়েছে কিছু পোড়া কাঠ, পাথরের খণ্ড পাশাপাশি সাজিয়ে তৈরি করা একটি চুলা। চুলার পাশে পড়ে আছে স্তূপীকৃত সদ্য কেটে আনা গাছের ডালপালা। ভবিষ্যতে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হবে। এর খানিকটা দূরে রয়েছে শুকনো পাতায় ছাওয়া ছোট্ট একটি ঝুপড়ি। অশ্বত্থ গাছের গুঁড়ির সঙ্গে বেঁধে রাখা দু’টি ইরানি ঘোড়া নাগালের মধ্যে থাকা লতাগুল্ম সাবাড় করে চলেছে।
ঝুপড়ির ভিতর থেকে বেরিয়ে আসে বাসুদেব। তার কোমর বন্ধনী থেকে ঝুলছে ছোরা। হাতে ধরা বল্লমটা অশ্বত্থ গাছের গোড়ায় মাটিতে গেঁথে রেখে দ্রুত গাছের মাথায় উঠে পড়ে বাসুদেব। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দূরে। সবুজের আড়াল ঠেলে খুব বেশি দূর বাসুদেবের চোখে দৃশ্যমান হয় না। তবুও যতটা দেখা যায়, সেদিকে চেয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়ে বাসুদেব। দিনের আলো ফুরিয়ে আসছে। এখনও মানুষটার দেখা নেই। কোনও বিপদে পড়লেন না তো?
হঠাৎ একটা শব্দ শুনে নীচের দিকে তাকিয়ে বাসুদেবের হাড় হিম হয়ে যায়। বিরাট একটা গোখরো সাপ শুকনো পাতার উপর দিয়ে এঁকেবেঁকে চলেছে ঘোড়া দুটোর দিকে। একেবারে সাক্ষাৎ মৃত্যুদূত। শিউরে ওঠে বাসুদেব। বাঁধা রয়েছে ঘোড়া দুটি। এই ভয়ংকর সরীসৃপের নাগাল এড়িয়ে দ্রুত সরে যেতে পারবে না। এ সাপের এক ছোবলে মৃত্যু অবধারিত।
বাসুদেব ব্যস্ততার সঙ্গে দ্রুত গাছ থেকে নামতে থাকে।
ঘোড়া দুটি নিবিষ্ট মনে মাথা ঝুঁকিয়ে ঘাস খেয়ে চলেছে। সাপটা এগোচ্ছে শম্বুক গতিতে। সহসা চঞ্চল হয়ে ওঠে ঘোড়া দু’টি। বিপদের আঁচ পেয়ে চিঁ-হি-হি-হি করে ডেকে ওঠে তারা। একটি ঘোড়া সামনের পা দুটি তুলে দু’পায়ের উপরে দাঁড়িয়ে পড়ে।
লাফ দিয়ে নীচে নেমে বাসুদেবের দুই চোখ বিস্ফারিত হয়ে ওঠে। ফণা তুলেছে সাপটি। পা তুলে দাঁড়িয়ে পড়া ঘোড়াটির পিছনের একটি পা ফণার প্রায় নাগালের মধ্যে। নিমেষে বল্লমটা তুলে নেয় বাসুদেব। ঠিক তখনই এই গহীন অরণ্যের নিস্তব্ধতা খান খান হয়ে যায় পিস্তলের আওয়াজে।
গুড়ুম!
একেবারেই অপ্রত্যাশিত এই গুলির আওয়াজে ভয়ানক চমকে ওঠে বাসুদেব। হাত থেকে বল্লম খসে যায়। চমকিত হয়ে গাছের নিশ্চিন্ত আশ্রয় ছেড়ে ডানা ঝটপটিয়ে আকাশে উড়তে থাকে একগাদা পাখি। গুলির শব্দে ত্রস্ত ঘোড়া দুটি চেঁচিয়ে ফের ডেকে ওঠে– চিঁ-হি-হি-হি। বুনোফুলের সুবাসে ভরা বাতাস সহসা বারুদের গন্ধে ভারী হয়ে ওঠে।
বাসুদেব স্তম্ভিত। অব্যর্থ লক্ষভেদ। গুলিটা লেগেছে ঠিক সাপের মাথায়। নিষ্পন্দ হয়ে পড়ে রয়েছে সরীসৃপটি। গুড়িয়ে গিয়েছে মাথা। কে ছুড়ল গুলি? এদিকে ওদিকে অবাক চোখে তাকিয়ে মানুষটিকে খুঁজতে থাকে ত্রস্ত বাসুদেব।
সহসা বুনো ঝোপের আগল ঠেলে বেরিয়ে আসেন মহানন্দ স্বামী। হাতে পিস্তল।
পরম স্বস্তির শ্বাস ছেড়ে বাসুদেব বলে, ‘হুজুর আপনি! আমি ভাবলাম অন্য কেউ বোধ হয় এই আস্তানার হদিশ জেনে ফেলেছে।’
মহানন্দ স্বামী নামে সন্ন্যাসীর বেশধারী এই মানুষটি হলেন, সুবে বাংলার ভূতপূর্ব দেওয়ান মোহনলাল। সিরাজদ্দৌলার জিগরি দোস্ত। জিন্দা যাঁকে গ্রেফতার করতে পারলে স্বস্তি পাবেন রবার্ট ক্লাইভ। গ্রেফতারকারীকে মোটা ইনাম দেবেন মিরজাফর। মোহনলালের মাথার দাম এখন অনেক। বর্তমানে তার খোঁজে উত্তর থেকে দক্ষিণ, গোটা বাংলা তোলপাড় করে বেড়াচ্ছে নিজামতের কাসিদরা।
.
পলাশির প্রান্তর থেকে পালিয়ে এসে নিজামতের গুপ্তচরদের চোখে ধুলো দিয়ে সুবে বাংলার বিভিন্ন জায়গা ঘুরতে ঘুরতে বোকাইনগরের কাছে কৃষ্ণপুরের এই জঙ্গলে আশ্রয় নিয়েছেন মোহনলাল ও তাঁর বিশ্বস্ত অনুচর বাসুদেব।
মুর্শিদাবাদ থেকে পালিয়ে আসার সময় মোহনলাল তার বহেন হিরা ও সিরাজদ্দৌলার অবৈধ পুত্রসন্তান শ্রীমন্তলালকে সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন। পুত্রকে কোলছাড়া করতে বুক ফেটে গিয়েছিল হিরার।
মাত্র কয়েকজন ছাড়া তামাম দুনিয়া অবশ্য মোহনলালের সন্তান হিসেবেই শ্রীমন্তলালকে জানে। শ্রীমন্তলালও তাই জানে। সে মোহনলালের পুত্র। হিরা, তার মা নয়, বুয়া। এছাড়া শ্রীমন্তলাল আরও শুনেছে, তার জন্মের সময় মৃত্যু হয়েছে তার মায়ের। হিরাবুয়াই বুকভরা ভালোবাসা দিয়ে তাকে লালন করেছে।
পাঁচ বছরের একটি বালককে সঙ্গে নিয়ে বনেজঙ্গলে দীর্ঘকাল আত্মগোপন করে থাকা সম্ভব নয়। এই কঠিন জীবনযাপনের ধকল কী করে সইবে একটি শিশু! বোকাইনগরের পরিত্যক্ত দুর্গ থেকে শ্রীমন্তলালকে নিয়ে আমহাটি গ্রামে পালিয়ে যায় বাসুদেব। বাসুদেব ও মোহনলালের পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী শ্রীমন্তলাল আশ্রয় পায় বাসুদেবের কাকা বিনোদ রায়ের গৃহে।
সাত্ত্বিক ব্রাহ্মণ বিনোদ রায় শুধিয়েছিলেন, ‘কে এই বালক? কী তার পরিচয়?’
বাসুদেব অকম্পিত কণ্ঠে জবাব দেয়, ‘ব্রাহ্মণ ঘরের সন্তান। অনাথ বালক। নদীর ঘাটে ভিক্ষা করছিল। মায়া লাগল। নিয়ে এলাম।’
কিছুটা দূরে বসতবাটি সংলগ্ন আমবাগানে একটি ছাগশিশুকে নিয়ে খেলায় ব্যস্ত শ্রীমন্তলালের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে আবেগজড়িত গলায় বিনোদ রায় বলে ওঠেন, ‘এই বালককের চোখদুটির দিকে তাকালে মায়া হওয়াই স্বাভাবিক। অবিকল যেন যশোদানন্দন। সেই মুখ। সেই চোখ।’
‘যথার্থ বলেছেন। আপনার গৃহে কিছুদিন বালকটিকে আশ্রয় দিতে হবে খুড়োমশায়।’
বিনোদ রায় একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেছিলেন, ‘বলছ ব্রাহ্মণ ঘরের সন্তান– আমার সঙ্গতি থাকলে বালকটিকে আমি দত্তক নিতাম। কিন্তু তুমি তো জান, আমার অভাবের সংসার। নিজেদেরই নিত্যদিন ভালোমতো আহার জোটে না। এই বালকের দায়ভার বহন করা আমার পক্ষে কি—।’
খুড়োমশায়কে বাধা দিয়ে মরিয়া গলায় বাসুদেব বলে, ‘আপনি অনুগ্রহ করে কিছুকালের জন্য আশ্রয় দিন। কোনও সহৃদয় মানুষ যাতে ছেলেটিকে দত্তক নেয় আমি সেই প্রচেষ্টা করছি।’
‘কিন্তু কের এর বাপ–মা? কোথায় এর নিবাস? এসব কিছুই কি তোমার জানা নেই?’
‘না খুড়োমশায়। তা যদি জানা থাকত তো আপনার কাছে গোপন করব কেন? শুধু বালকটির গলায় পইতে দেখে বুঝেছি ব্রাহ্মণ ঘরের সন্তান।’
‘বেশ। ওকে রেখে যাও এখানে। তুমি আমার সন্তানতুল্য। তোমার আবদার উপেক্ষা করি কী করে?’
‘আর একটা কথা খুড়োমশায়। আর পাঁচজনের কাছে বালকটিকে আপনার সন্তান হিসেবেই পরিচয় দেবেন।’
একথা শুনে অবাক চোখে বাসুদেবের মুখপানে চাইলেন বিনোদ রায়।
মাথা ঝুঁকিয়ে মৃদু কণ্ঠে বাসুদেব বলে, ‘আমার অপরাধ মার্জনা করবেন খুড়োমশায়। উপযুক্ত বংশ-পরিচয় না থাকলে ছেলেটিকে কোনও বড় বংশের কেউ দত্তক নিতে চাইবে না। বালকটির ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে আমার এই অনুরোধটাও কিন্তু আপনাকে রাখতে হবে।’
‘এ যে বড় কঠিন পরীক্ষার মধ্যে আমাকে ফেললে হে।’
জেবের ভিতরে হাত ঢুকিয়ে গোটা পাঁচেক মোহর বের করে বিনোদ রায়ের হাতে দিয়ে বাসুদেব বলে, ‘এগুলো রাখুন। আপনার অর্থের প্রয়োজন হবে।’
বিনোদ রায় মৃদু হেসে বলেন, ‘ওসব তোমার কাছেই রেখে দাও। যাকে যশোদানন্দনের আসনে বসিয়েছি তার সেবায় তোমার এই দরিদ্র খুড়োমশায়ের কোনও ত্রুটি হবে না। রাজভোগ না পারি ছেলেটির জন্য দু’বেলা দু’মুঠো শাকান্নের সংস্থান নিশ্চই আমি করতে পারব।’
‘আমার ঔদ্ধত্য মার্জনা করবেন।’ লজ্জিত হয়ে খুড়োমশায়ের চরণধুলি নিয়ে মাথায় ঠেকিয়েছিল বাসুদেব।
শ্রীমন্তলালের কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার সময় বাসুদেবের দু’চোখে জল ছলছল করে উঠেছিল।
বাসুদেব বলে, ‘আমি আসি শ্রীমন্ত। ভালো হয়ে থেকো।’
শ্রীমন্তলাল করুণ গলায় প্রশ্ন করে, ‘বাবামশায় কোথায়? আসবেন না এখানে?’
বাসুদেবের বুকের মধ্যে একটা কষ্ট মোচড় দিয়ে ওঠে। শ্রীমন্তের সামনে ঝুঁকে পড়ে সে বলে, ‘কিছুদিন এখানে থাকো। তারপরে বাবামশায় এসে তোমাকে নিয়ে যাবেন।’
‘আমি হিরাবুয়ার কাছে যাব।’
শ্রীমন্তর মাথায় হাত বুলিয়ে বাসুদেব বলে, ‘নিশ্চই যাবে।’
‘বাবামশায় আমাকে এখানে রেখে যাচ্ছেন কেন?’
‘সে তোমার ভালোর জন্য শ্রীমন্ত। তোমার তো অনেক বুদ্ধি। সব কিছু তো শুনেছ তুমি। তোমার বাবামশায় ও নবাব সিরাজদ্দৌলার দুশমন ইংরেজদের জিত হয়েছে পলাশিতে। তোমাকে নিয়ে তোমার বাবামশায়, আমি পালিয়ে বেড়াচ্ছি। পথে কত কষ্ট। তুমি ছোট ছেলে। এই ধকল কি তুমি সইতে পার?’
চুপ করে মাটির দিকে চেয়ে থাকে শ্রীমন্তলাল। তারপর বলে, ‘আচ্ছা চাচা, দুশমনেরা হিরাবুয়াকে তকলিফ দেয়নি তো?’
‘না না। তোমার হিরাবুয়া ভালো আছে।’
এরপর শ্রীমন্ত্র কানের কাছে মুখ এনে বাসুদেব বলেছিল, ‘কাউকে কিন্তু বোলো না যে তোমার বাবামশাইয়ের নাম মোহনলাল। তাহলে কিন্তু তার খুব বিপদ হবে।’
‘আচ্ছা। ঘাড় নাড়ে শ্রীমন্তলাল।’ একটু ভেবে সে বলে, ‘কেউ যদি জিগ্যেস করে কে তোমার বাবামশায়? কী বলব?’
এমন সময় বাটির ভিতর থেকে ভেসে আসে বিনোদ রায়ের কণ্ঠস্বর। ‘শ্রীমন্ত! শ্রীমন্ত! কোথায় গেলে?’
শ্রীমন্তর চিবুক ছুঁয়ে আদর করে বাসুদেব বলে, ‘যাও ঘরে যাও। বাবামশায় ডাকছেন।’
‘বাবামশায়?’
‘এখন উনিই তোমার বাবামশায়। বাইরের কেউ শুধোলে বলবে, আমার বাবামশায়ের নাম বিনোদ রায়। মনে থাকবে তো?’
ঘাড় নাড়ে শ্রীমন্তলাল। হঠাৎ প্রশ্ন করে, ‘এটা একটা খেলা। না চাচা?’
‘হ্যাঁ বাবা। যাও। তুমি ভিতরে যাও। ক’দিন পরে আমি এসে তোমাকে দেখে যাব।’
‘সেদিন বাবামশায়কে সঙ্গে করে নিয়ে এসো বাসুদেবচাচা।’
‘নিয়ে আসব। যাও ঘরে যাও।’
আর কথা না বাড়িয়ে লাফ দিয়ে ঘোড়ার পিঠে চেপে বসেছিল বাসুদেব। তিরবেগে কৃষ্ণপুরের অরণ্য অভিমুখে ছুটে চলে ঘোড়া। চোখের জলে বাসুদেবের দৃষ্টি সেদিন ঝাপসা হয়ে গিয়েছিল।
.
পিস্তলটা কোমরে গুঁজে কাছে গিয়ে ঘোড়াদুটির গায়ে হাত বুলিয়ে দিলেন মোহনলাল। মনিবের হাতের স্পর্শ পেয়ে শান্ত হল ঘোড়াদুটো। পা দিয়ে ঠেলে মৃত সাপটিকে দূরে সরিয়ে দিয়ে বাসুদেবের উদ্দেশে মোহনলাল শুধোলেন, ‘ছিলে কোথায়? আর একটু হলে ছোবল মেরে দিত। কী সর্বনাশ হতো বল তো?’
অপরাধীর মতো মাথা ঝুঁকিয়ে বাসুদেব বলে, ‘আপনার আসতে দেরি হচ্ছে দেখে গাছে উঠে পথের দিকটা দেখছিলাম।’
‘মিরজাফরের কাসিদরা চারিদিকে ঘুরছে। তাদের নজর এড়াতে ঘুর পথে এলাম।’
‘কাজ হয়েছে হুজুর?’
‘শ্রীকৃষ্ণ চৌধুরী গত হয়েছেন।’
হতাশ গলায় বাসুদেব শুধোয়, ‘তাহলে উপায়?’
‘উপায় একটা করে এসেছি। শ্রীমন্তকে দত্তক নেবে শ্রীকৃষ্ণ চৌধুরীর কনিষ্ঠ পুত্র কৃষ্ণগোপাল। কৃষ্ণপুরের বর্তমান জমিদার চৌধুরী মশায়ের জ্যেষ্ঠপুত্র কৃষ্ণকিশোরের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে।’
‘যাক নিশ্চিন্ত হওয়া গেল।’
‘না বাসুদেব। এখনই নিশ্চিন্ত হওয়ার কিছু নেই। যতক্ষণ না শ্রীমন্তকে নিরাপদে চৌধুরী বাড়িতে পৌঁছে দিতে পারছি, ততক্ষণ খুবই সতর্ক থাকতে হবে। একটু জল দাও! বড্ড তেষ্টা পেয়েছে।’
অশ্বত্থ গাছের গায়ে হেলান দিয়ে পা ছড়িয়ে বসেন মোহনলাল। দুর্গম দীর্ঘ পথ হেটে আসার ধকলে তিনি ক্লান্ত। বাসুদেব দ্রুত ঝুপড়ির ভিতরে ছুটে গিয়ে একটা মাটির মালসায় জল নিয়ে আসে। জল পান করলেন মোহনলাল। অন্ধকার হয়ে আসছে। খানিকবাদেই শুরু হবে বুনো জন্তুদের অবাধ বিচরণ। শুকনো ডালপালা জড়ো করে আগুন জ্বালানোর আয়োজন করতে থাকে বাসুদেব।
মোহনলাল বলেন, ‘এবারে তোমাকে একটা গুরুদায়িত্ব নিতে হবে বাসুদেব।’
‘ফরমায়েস করুন হুজুর।’
‘কাল প্রত্যুষে তোমাকে কৃষ্ণকিশোরের গৃহে যেতে হবে। ভোর রাতের দিকে ঘোড়ায় চেপে এই আস্তানা ছেড়ে তুমি রওনা দেবে। কালই কৃষ্ণকিশোর শ্রীমন্তকে নিয়ে আসার জন্য আমহাটির উদ্দেশে রওনা দিতে চান। তুমিও যাবে ওঁর সঙ্গে। তোমার কাকা বিনোদ রায়ের সঙ্গে কৃষ্ণকিশোরের পরিচয় করিয়ে দেবে।’
‘যে আজ্ঞে।’
‘দত্তক গ্রহণের অনুষ্ঠান হবে ঝুলনযাত্রার দিন।’
‘তাহলে আর ভাবনা কীসের? সব ব্যবস্থাই তো আপনি চূড়ান্ত করে এসেছেন হুজুর।’
‘তবুও ভয় হয় বাসুদেব। কোনও ভাবে যদি প্রকাশ পায় শ্রীমন্তের আসল পরিচয়। সে ব্রাহ্মণ সন্তান নয়। সিরাজ ও হিরার অবৈধ সন্তান? তাহলে?
‘ও কেউ টের পাবে না। আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন।’
আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে মোহনলালের মুখোমুখি এসে বসে বাসুদেব।
মোহনলাল বলেন, ‘বুঝলে বাসুদেব, আজ মনটা বড় ভারাক্রান্ত হয়ে আছে। এতদিন ভেবেছি চৌধুরী বংশে দত্তক পুত্র হিসেবে শ্রীমন্ত যদি ঠাঁই পায়, তবে ওর বিষয়ে আমি নিশ্চিন্ত হতে পারি। আজ সব কিছুর মীমাংসা হয়ে যাওয়ার পর মনে হচ্ছে শ্রীমন্তকে এ ভাবে দূরে ঠেলে না দিলেই ভালো হত।’
‘জানি শ্রীমন্ত আপনার কাছে প্রাণের চেয়ে প্রিয়। কিন্তু এসব ভাবছেন কেন আপনি? যা হল তা তো ভালোই হল। যা ঘটতে যাচ্ছে তা শ্রীমন্তের পক্ষে ভালোই হবে।’
দীর্ঘশ্বাস ফেলে মোহলনলাল বলেন, ‘সে তো ঠিকই। অন্য পরিচয় নিয়ে বেঁচে থাকবে শ্রীমন্ত। বেঁচে থাকবে সিরাজ ও হিরার রক্তের উত্তরাধিকার। শ্রীমন্তর আসল পরিচয় প্রকাশ পেলে নিজামতের জহ্লাদরা যে এই নাবালককেও রেয়াত করবে না, সে আমি জানি। তবুও যে মন মানে না বাসুদেব।’
মোহনলালের চোখদুটো জলে ভরে ওঠে। চোখের জল গোপন করতে উঠে দাঁড়ালেন তিনি।
বাসুদেব মাথা ঝুঁকিয়ে চুপ করে বসে রয়েছে। বিষাদ ঘন পরিবেশ। অন্ধকারে বুনো ঝোপের মধ্যে নেচে বেড়াচ্ছে জোনাকি। কাছেই ডেকে উঠল একটা হুতোম প্যাঁচা।
নীরবতা ভেঙে বাসুদেব বলল, ‘কুটিরে চলুন হুজুর বিশ্রাম করবেন।’
‘বাসুদেব।’
‘হুজুর।’ বাসুদেব উঠে দাঁড়ায়।
‘কতদিন জিন্দা থাকব জানি না। আমার হয়ে একটা গুরুদায়িত্ব নিতে হবে তোমাকে।’
মোহনলালের কাছে গিয়ে বাসুদেব বলে, ‘ফরমায়েশ করুন হুজুর।’
কোমরবন্ধনী থেকে একটা গোটানো কাগজ বের করে বাসুদেবের হাতে দিয়ে মোহনলাল বলেন, ‘শ্রীমন্ত বড় হয়ে উঠলে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এই কাগজটা তার হাতে দিও।’
‘কী এটা?’
‘শ্রীমন্তের উদ্দেশে লেখা আমার একটা চিঠি। এ থেকে শ্রীমন্ত তার জন্মকাহিনি ও আসল পরিচয় জানতে পারবে। এ তার জানা উচিত।’
কাগজটা হাতে নিয়ে মোহনলালের মুখপানে চাইল বাসুদেব। মোহনলাল অন্যমনস্ক। শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে আছেন আগুনের শিখার দিকে। ছলছল করছে চোখদুটো।
বাসুদেব মৃদু গলায় ফের বলে, ‘কুটিরে চলুন হুজুর।’
‘জানো বাসুদেব, ফেরার পথে ক্ষণেক বিশ্রামের জন্য একটা চটিতে ঢুকেছিলাম। মুর্শিদাবাদ থেকে আগত এক মুসাফিরের মুখে কী শুনলাম জান? সিরাজ নেই। গ্রেফতারির পর জাফরাগঞ্জ প্যালেসে তাঁকে কোতল করেছে মিরন।
আবেগকে আর বশে রাখতে পারলেন না মোহনলাল। কান্নায় ভেঙে পড়লেন। বুকের মধ্যে যে কষ্টটা এতক্ষণ তিনি চেপে রেখেছিলেন, তা অর্গলমুক্ত হল।
.
