১৯
এক গোলামকে ডেকে রকমারি মাংসের পদ নিয়ে আসার হুকুম করলেন নবকৃষ্ণ।
মুনির খাঁ লাজুক গলায় বলে, ‘বহুদিন খাইনি। দিল চাইছে। থোড়া শরাব মিলবে বাবুজি?’
নবকৃষ্ণ বলেন, ‘মিলবে না মানে? আলবত মিলবে।’
রামচাঁদ প্রশ্ন করেন, ‘বিলিতি শরাব চেখে দেখেছ কখনও?’
মুনির খাঁর চোখ দুটো চকচক করে ওঠে। ‘বিলাইতি? আছে আপনাদের কাছে?’
‘জরুর আছে। তুমি ছিলে নবাবের খাস গোলাম। তোমার কেতা-তরবিয়ত আর পাঁচ জন হেঁজিপেজি লোকের থেকে আলগ তো হবেই। দিশি মদে কি আর তোমার পিয়াসা মিটতে পারে?’ এই বলে পিরানের জেবের ভিতরে হাত চালিয়ে বিলিতি মদের একটা বোতল বের করে নবকৃষ্ণ।
সুদৃশ্য কাঁচের বোতলটা দেখেই মুনির খাঁ চঞ্চল হয়ে ওঠে। জিভ দিয়ে ঠোঁট চাটে।
নবকৃষ্ণ বললেন, ‘এর নাম ক্ল্যারেট। শুনেছি অতি উৎকৃষ্ট বস্তু। মৌতাত জবরদস্ত হয়। খোদ ক্লাইভ সাহেবের পছন্দের চিজ।’
বেহায়ার মতো নব মুনশির হাত থেকে বোতলটা প্রায় ছিনিয়ে নেয় মুনির খাঁ। ছিপি খুলে ঢকঢক করে বেশ খানিকটা গলায় ঢেলে বলে, ‘বহুত আচ্ছা। বহুত বহুত সুক্রিয়া বাবুজি।’
রামচাঁদ বলেন, ‘আয়েশ করে পান করো মুনির ভায়া। অঢেল আছে।’
‘আপলোগ শরিফ আদমি। আল্লা আপনাদের ভালাই করুন।’
‘তা তুমি এতদিন ছিলে কোথায় ভায়া?’ প্রশ্ন করেন নবকৃষ্ণ।
‘পলাশির ময়দান থেকে ভেগে গিয়ে মাদিপুরের জঙ্গলে ঠাঁই নিয়েছিলাম। সে বহুত তকলিফ কি বাত। সিপাহীলোগ মুঝে ঢুন্ড রহে থে। নয়া জমানায় আমি খুন হয়ে যেতাম। ধরা পড়লে গর্দান যেত। মাদিপুরের জঙ্গলেও হানা দিয়েছিল একদল সেপাই। আমি আরও গভীর জঙ্গলে ঘুসে যাই। বহুত পরেশানি হয়েছে বাবুজি। তিনদিন ভুখা ছিলাম। বুখার ভি থা। উসকে উপার ফির খতরনক জানয়ার কা ডর। শেরের আওয়াজ ভি শুনেছি। মালুম হচ্ছিল শেরের হাতেই খতম হয়ে যাব।’
‘বল কী হে? তারপর?’ চোখ গোল্লা করে প্রশ্ন করেন রামচাঁদ।
‘শেরের শিকার হতে কারই বা আরজু হয় বাবুজি? নসিবে যা আছে তাই হবে অ্যায়সা শোচকর জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসি। নদীর কিনারে পৌঁছে একখানা ছিপনৌকোর কাছি খুলে ভেসে পড়ি জলে। শরীর আর চলছিল না বাবুজি। হাত দু’খানা অবশ হয়ে আসছিল। অচানকই দূর থেকে বজরাটা দেখতে পাই আমি। তখনও আলো পুরো মরেনি। কোম্পানির নিশানটা নজরে আসে। নিজামতের সেপাইদের হাতে পড়লে নির্ঘাত জান যাবে। আর ইংরেজলোগের পায়ের পাকড়ে ধরলে হয়তো বেঁচে যাব, অ্যায়সা শোচকর কর্নেল সাহেবের বজরায় কোনওরকমে উঠে পড়ি।’
রামচাঁদ বললেন, ‘তুমি তো দেখছি বাহাদুর আদমি।’
নবকৃষ্ণ বললেন, ‘নসিব তোমার খাসা মুনিরজি। ক্লাইভ সাহেবের পায়ে এসে পড়লে বলে বেঁচে গেলে। সাহেব দয়ার সাগর। শুধু কথাটা তোমার মনিব বুঝলে না। তাই তাঁর এই মুসিবত।’
ক্ল্যারেটের দ্বিতীয় বোতলটা খালি করে মুনির খাঁ বলে, ‘বহুত আচ্ছা চিজ! থোড়া আউর মিলবে কি বাবুজি?’
নবকৃষ্ণের হুকুমে এক আর্দালি খানিকবাদে একটা রুপোর রেকাবির উপরে সাজানো অনেকগুলো মদের বোতল রেখে যায়।
মুনির খাঁ চোখ কপালে তুলে বলে, ‘ইয়ে তো বড়িয়া আনজাম।’
নবকৃষ্ণ বলেন, ‘আমাদের শাস্ত্রে বলে অতিথির সেবা করলে পুণ্য হয়।’
রেকাবি থেকে দ্রুত একটা মদের বোতল তুলে নিয়ে মুনির খাঁ বলে, ‘আপ শরাব নেহি পিতে?’
নবকৃষ্ণ বলেন, ‘মুনিরজি। তোমার দেহে আফগানি খুন বইছে। তুমি বিলিতি শরাবের রসিক হতে পার। আমরা হলাম গিয়ে যাকে বলে কলকেতার ভেতো বাঙালি। এ আমাদের পেটে সইবে না। তুমি খাও।’
লাজুক হাসি হাসে মুনির খাঁ।
একজন গোলাম এসে রেকাবি বোঝাই করা কাবাব, দুনিয়াজা, রোস্ট ও রকমারি শুকনো ফল রেখে যায়।
মুনির খাঁ বলে, ‘বহুত বহুত সুক্রিয়া।’
একের পর এক মদের বোতল খালি করে দিতে থাকে মুনির খাঁ। সেই সঙ্গে পেটে চালান করতে থাকে মাংস ও শুকনো ফল। কিছুক্ষণ পর ঢুলুঢুলু হয়ে আসে তার চোখদুটো। জমাট মৌতাতে শাহি মেজাজ বেশ জাঁকিয়ে বসে। জড়ানো গলায় সে বলে, ‘আপলোগ বহুত আচ্ছা আদমি। আমি আপনাদের ইনাম দেব।’
রামচাঁদ বলে ওঠেন, ‘সে তো আমাদের খুশনসিব। তা কী ইনাম দেবে মুনির ভায়া?’
চাপা গলায় মুনির খাঁ বলে, ‘ইয়ে বাত নিজের মধ্যেই রাখবেন বাবুজি। পলাশিতে আমার মনিবের মুসিবত হল। উনি পালিয়ে গেলেন। লুঠপাট শুরু হয়ে গেল ছাউনিতে। আমিও সেই তালে নবাবের ফরসি আর গলার একছড়া মুক্তোমালা নিয়ে ভেগে গেলাম। সঙ্গেই আছে। আমার খরিতায়। বহুত কিমতি চিজ। আপনাদের দেব।’
রামচাঁদের মুখপানে চেয়ে চোখ টিপে হাসি মুখে নবকৃষ্ণ বললেন, ‘বুঝলে ভায়া রামচাঁদ আগেই বলেকয়ে নিচ্ছি। পরে যেন ভুল বোঝাবুঝি না হয়। ফরসি আমার। মুক্তোমালা তোমার।’
প্রত্যুত্তরে রামচাঁদ বলেন, ‘আপনি আমার অগ্রজ। যা হুকুম করবেন তাই হবে। লেকিন এ তো মামুলি তোফা। এতে তো আমার মন ভরবে না। আপনার ভরবে কি?’
মাথা নেড়ে নবকৃষ্ণ বলেন, ‘হক কথাই বলেছ। মুনির খাঁ আর একটু দরাজ দিল হলে আমাদের নসিবের চাকা ঘুরতে পারে।’
‘শরাব! আউর থোড়া শরাব।’ জড়ানো গলায় বলে মুনির খাঁ।
ক্ল্যারেটের আরও একটা বোতলের ছিপি খুলে মুনির খাঁর হাতে ধরিয়ে দেন রামচাঁদ।
নবকৃষ্ণ বলেন, ‘শুনেছি নবাবের ধনদৌলতের খতেন রাখতে তুমি। কথাটা সত্যি নাকি হে?’
‘সহি বাতই শুনেছেন।’
রামচাঁদ শুধোলেন, ‘হিরাঝিল প্রাসাদে কোথায় ছুপিয়ে রাখা আছে তোমার মনিবের দৌলত?’
গলায় মদ ঢালতে গিয়ে ক্ষণিকের জন্য থমকে যায় মুনির খাঁ। ঢুলু ঢুলু চোখে রামচাঁদ ও নবকৃষ্ণকে একবার জরিপ করে।
রামচাঁদের দিকে চেয়ে চোখ টিপে নবকৃষ্ণ বলেন, ‘আরে এসব কী বলছ ভায়া রামচাঁদ? শুনেছিলাম তো সিরাজদ্দৌলা বেদৌলত হয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর ধনদৌলত হিরাঝিল প্রাসাদে গোপনে গচ্ছিত থাকতে পারে কি? আর যদি থেকেও থাকে তা এতক্ষণে মিরজাফর খাঁ সাহেবের হস্তগত হয়েছে।’
বোতলের তলানিটুকু গলায় উপুড় করে দিয়ে মুনির খাঁ বলে, ‘ইয়ে ঝুট বাত। আপনারা কিচ্ছু জানেন না।’
কৌতূহলের সঙ্গে মুনির খাঁর মুখের উপরে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে নবকৃষ্ণ ও রামচাঁদ। ক্ষণিকের জন্য ছেদ পড়ে সংলাপে। নীচ থেকে ভসে আসছে ডিনার পার্টির হইহুল্লোড়ের শব্দ।
শূন্য বোতলটা ঠক করে মাটিতে নামিয়ে রেখে মুনির খাঁ জড়ানো গলায় বলে, ‘গোটা হিরাঝিল তজবিজ করলেও আমার মনিবের খাজানার হদিশ পাওয়া মিরজাফর খাঁর পক্ষে সম্ভব নয়।’
‘ধনদৌলত তাহলে আছে বলছ?’ প্রশ্নটা ছুড়ে দিয়ে গভীর মনোযোগের সঙ্গে মুনির খাঁর মুখপানে চেয়ে থাকেন নবকৃষ্ণ। তাঁর চোখের পলক পড়ে না।
‘বেশক আছে।’
‘কী করে এত জোর দিয়ে বলছ ভায়া? পক্ষকাল হয়ে গেল ওই প্রাসাদের দখল নিয়েছেন মিরজাফর খাঁ। গোটা প্রাসাদের প্রতিটা পাথরের ফাঁকফোকর তজবিজ করে দেখা নবাবের পক্ষে কী এমন মুশকিলের ব্যাপার?’
‘মুশকিল তো বটেই। আমি মদত না দিলে ও দৌলতের হদিশ পাওয়া অসম্ভব।’
‘নেশার ঘোরে ফালতু বকছ না তো?’ প্রশ্ন করেন নবকৃষ্ণ।
মুনির খাঁ বেশ জোরের সঙ্গে বলে, ‘বিলকুল নেহি। ভুলভুলাইয়ার অন্দরে কোথায় সরাতে হবে ছোট্ট একটা পাথরের ফলক তা কী করে মালুম পাবে আনপঢ় আদমি? আর শুধু পাথর সরালেই তো হল না। দেওয়ালের গায়ে দেখা যাবে একটা চাবি ঢোকানোর ছিদ্র। তারপর খুঁজে বের করতে হবে চাবিটা। সে চাবি রাখা আছে ভুলভুলাইয়ার ভিতরে। অন্য একটা পাথরের আড়ালে। এসব কথা জানতেন নবাব সিরাজদ্দৌলা আর জানি আমি।’
নবকৃষ্ণ ও রামচাঁদ মুখ চাওয়াচাওয়ি করেন। দু’জনের মুখেই খেলে যায় চওড়া হাসি।
মুনির খাঁ এবারে গলা খাটো করে বলে, ‘লেকিন ইয়ে বাত আপনাদের মধ্যেই রাখবেন বাবুজি। আর কেউ যেন না জানতে পারে। ভুলভুলাইয়ার অন্দরে রয়েছে করিব চার কোটি টাকা।’
‘সাবাশ।’
অচানকই শূন্য ছাতের উপরে পিছন থেকে গম্ভীর গলার আওয়াজ শুনে চমকে ঘুরে তাকায় তিনজনেই। রামচাঁদ ও নবকৃষ্ণ ত্রস্ত হয়ে ওঠে। মুনির খাঁ হতবাক। ছাতের দরজায় এসে দাঁড়িয়ে আছেন ক্লাইভ। হাত দুটো কোমরে রাখা। ঠোঁটে গোঁজা পাইপ। সেই পরিচিত উদ্ধত ভঙ্গিমা।
রামচাঁদ ও নবকৃষ্ণ দ্রুত ছুটে যান ক্লাইভের কাছে।
ক্লাইভ বলেন, ‘ওয়েলডান নবকিসেন। ওয়েলডান রামচাঁদ। আমি সব শুনেছি।’
ছাতে জ্বলতে থাকা মশালের আলোয় নবকৃষ্ণ ও রামচাঁদের চোখে পড়ে, খুশিতে ঝলমল করছে ক্লাইভের মুখটা। তাঁর দিকে কেমন যেন বোধশূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে মুনির খাঁ। ধীরে ধীরে হেঁটে এসে তার মুখোমুখি দাঁড়ালেন ক্লাইভ। কর্নেলের মুখে লেগে আছে মৃদু হাসি। চোখের দৃষ্টি ধারালো ছুরির মতো তীক্ষ্ণ। কোমরের একদিকে ঝুলছে তলোয়ার, আরেকদিক থেকে ঝুলছে পিস্তল।
মুনির খাঁ ভয়ে কাঁপতে থাকে। মদের নেশা তার ছুটে গিয়েছে। সে বিলকুল মালুম পাচ্ছে নেশার ঘোরে গোপন কথা বলে ফেলে ফাঁদে পড়েছে।
ক্লাইভ বললেন, ‘ডরো মাত। তোমাকে আমি জিন্দা ছেড়ে দেব। চাও তো কলকাতায় গিয়ে খুশ তবিয়তে থাকতে পার। লেকিন এক বাত। হিরাঝিল প্যালেসে কোথায় ছুপানো আছে দৌলত সেটা তুমি আমাকে দেখিয়ে দেবে।’
‘জি হুজুর।’
.
ক্লাইভের চিঠিটা ভাঁজ করে পাশে রাখা শ্বেতপাথরের চৌপাইয়ের উপর রাখলেন নবাব মিরজাফর খাঁ। মুখটা ভয়ানক গম্ভীর। উলটোদিকে কুরসিতে মুখোমুখি বসে ওমর বেগ চেয়ে আছেন তাঁর মুখের দিকে। নবাবের মনের গতির আন্দাজ পাওয়ার কোশিশ করছেন। তুরন্ত জবাব চান কর্নেল ক্লাইভ। কী জবাব দেবেন মিরজাফর খাঁ? ঝড় বইছে ওমর বেগের মনে। কেননা বিষয়টায় জড়িয়ে আছে তারও স্বার্থ। খুশনসিবির হাতছানি। অর্থ প্রাপ্তির তামান্না। তবে ওমর বেগের মনের উমিদ এই যে কর্নেল ক্লাইভের প্রস্তাব ইনকার করার হিম্মত হবে না নবাবের।
মিরজাফরের কপালে ভাঁজ। নজর ভূমির দিকে। মনের মধ্যে ভয়ানক আফশোস। হিরাঝিল প্রাসাদের ভিতরেই লুক্কায়িত রয়েছে চার কোটি টাকা। সিরাজের ব্যক্তিগত ধনদৌলত। কোষাগারের হিসেবের জাবেদা খাতার বাইরের টাকা। পুরোটাই আত্মসাৎ করতে পারতেন মিরজাফর, অথচ তিনি এর হদিশই পেলেন না।
টাকার অভাবে ইদানীং চোখে অন্ধকার দেখছেন নবাব। ইংরেজদের দাবি অনুযায়ী প্রথম কিস্তি মিটিয়ে হাতে যা থাকবে, তা দিয়ে কী করে চলবে রাজ্যপাট, সৈন্যদের বকেয়া মেটাবেন কোথা থেকে? এ চিন্তায় মিরজাফর খাঁর ঘুম উড়েছে। ফৌজিরা বেতন না পেয়ে ক্ষোভে ফুঁসছে।
ওদিকে পাটনায় বসে বহাল তবিয়তে রাজ্যপাট চালাচ্ছেন নায়েব রামনারায়ণ। সিরাজদ্দৌলার অনুগত। মিরজাফর মসনদে বসলেন, অথচ রামনারায়ণ এখনও তাঁর প্রতি আনুগত্য জানালেন না। পাঠাননি নজরানা। রামনারায়ণের শক্তি কম নয়। ওদিককার জমিদারেরা সবাই তারই পক্ষে। রামনারায়ণকে ঢিট করার জন্য বড়সড় এক ফৌজ পাঠানোর দরকার পাটনায়। সেপাই-পেয়াদা-আহেদিদের পাওনাগণ্ডা না মিটিয়ে ফের পাটনা অভিযানের কথা তুললেই হয়তো তারা হল্লা করবে। বাগিপনা দেখাবে। তাদের এই বাগিপনায় মদত দেওয়ার জন্য অনেক বড় বড় মাথার যে অভাব হবে না, সেটা মিরজাফর ভালোই জানেন।
বেহাল কোষাগারের জন্য টান পড়ছে নবাবের ফূর্তি-আশরতেও। হারেমের খুবসুরতিদের শখ-শৌখিনতা, আহ্লাদ-আবদার মেটাতেও মোটা টাকার প্রয়োজন। এই খরচে রাশ টানতে বলেছেন দেওয়ান রায়দুর্লভ। মিরজাফর অসহায়। নবাবের হালত দেখে আড়ালে টিপ্পনী কাটছে হারেম-সুন্দরীরাও—নবাব হয়েছেন, অথচ নবাবগিরি ফলানোর মুরোদ নেই।
অথচ ঘরের মধ্যেই লুকোনো রয়েছে চার কোটি টাকা। আফশোস। ভয়ানক আফশোস। হিরাঝিলে লুকোনো খাজানার কথা কানাঘুষোয় শুনেছিলেন মিরজাফর। সিরাজের কাছ থেকে হয়তো জানা যেত এর হদিশ। অথচ তার সুযোগ কোথায় পেলেন তিনি। নির্বোধ মিরন তাঁর অজান্তেই কোতল করে বসল সিরাজকে। হিরাঝিল প্রাসাদের লুকোনো সম্পদের কথা আর জানত মুনির খাঁ। নিজামতের অপদার্থ কাসিদরা সারা বাংলা তজবিজ করেও খুজে পেল না লোকটাকে। অথচ তার সন্ধান পেয়ে গেলেন ক্লাইভ।
একেই বলে বদ কিসমতি। যে দৌলতের সবটা তারই প্রাপ্য ছিল, সে দৌলত এখন ভাগ করে নিতে হবে ক্লাইভের সঙ্গে। ওমর বেগের সঙ্গে। তাঁর নিজের ভাগে কতটুকুই বা পড়বে। তবে সান্ত্বনা একটাই এই যে কোম্পানির বকেয়া বাবদ পুরো টাকাটাই দাবি করেননি ক্লাইভ।
যাই হোক, ক্লাইভের সঙ্গে টাকা ভাগ করে নেওয়াটা তবুও না হয় মেনে নেওয়া যায় কিন্তু টাকার ভাগ কেন দিতে হবে ওমর বেগকে? মন মানতে চাইছে না এই বন্দোবস্ত। কিন্তু কী করবেন মিরজাফর? প্রস্তাব দিয়েছেন স্বয়ং ক্লাইভ।
ওমর বেগের সঙ্গে ক্লাইভের সুসম্পর্কটা খুবই অল্প দিনের। এই মানুষটির প্রতি ক্লাইভের কৃতজ্ঞতা কম নয়। পলাশির যুদ্ধের আগে এক সংকটজনক মুহূর্তে মিরজাফরের সাক্ষর করা চুক্তিপত্র জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ওমর বেগই চন্দননগরে পৌঁছে দিয়েছিলেন ক্লাইভের কাছে। তারপরই ইংরেজবাহিনী চন্দননগর ছেড়ে পলাশির দিকে এগিয়ে যায়।
মোরাদবাগ প্যালেসে বসে ক্লাইভের মুখ থেকে নিজের অর্থপ্রাপ্তির কথা শুনে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন ওমর বেগ। কর্নেলের হাতদুটো পাকড়ে ধরে আনন্দে কেঁদে উঠে বলেছিলেন, ‘হুজুর আপনি খোশ-আখেলাক আশরফ আদমি। আল্লা আপনার ভালাই করুন।’
মুচকি হেসে ক্লাইভ বলেছিলেন, ‘আমি আপনাকে বাড়তি কিছু দিচ্ছি না। ইউ ডিসার্ভ দিস।’
এরপর চিঠিটা ওমর বেগের হাতে দিয়ে ক্লাইভ বলেন, ‘আই ওয়ান্ট কুইক রিপ্লাই।’
‘বেশক। আমি আজই নবাবের জবাব আপনাকে পৌঁছে দেব।’
‘হুশিয়ার থাকবেন। নবাব ছাড়া আর কেউ যেন এ ব্যাপারে কিছু জানতে না পারে।’
‘জি হুজুর।’
‘আর নবাবের উপর একটু নজর রাখবেন। তিনি নিজে যেন খাজানা তজবিজের আনজাম না করেন।’
মাথা ঝুকিয়ে ওমর বেগ ফের বলেন, ‘জি হুজুর।’
খুশিতে ভাসতে ভাসতে তড়িৎ গতিতে বিদায় নেন ওমর বেগ। পাইপ মুখে ঘরের মধ্যে দিয়ে পায়চারি করতে করতে মুচকি হাসির রেখা ফুটে ওঠে ক্লাইভের মুখে। ওমর বেগকে টাকার লোভ দেখিয়ে দুটো কাজ এক সঙ্গে হাসিল করে নিলেন তিনি।
মিরজাফরকে না জানিয়ে তার প্রাসাদে তস্করের মতো ঢোকা যায় না। কেন যেতে চান হিরাঝিল প্যালেসে সেটা প্যালেসের মালিককে জানানো দরকার। তাছাড়া গভীর রাতে হিরাঝিল প্যালেসে প্রবেশ করার পিছনে তাঁর যে অন্য কোনও ফন্দি নেই সেটা স্পষ্ট করে দিলেন ক্লাইভ। নবাব যেন অন্য কিছু সন্দেহ না করেন।
চিঠিটা ক্লাইভ পাঠালেন ওমর বেগের হাত দিয়ে। হালফিলে মিরজাফরের বিশ্বস্ত লোক ওমর বেগ। তাঁকে প্রলুব্ধ করলেন গুপ্তধনের লোভ দেখিয়ে। নিজের স্বার্থেই কথাটা পাঁচ কান করবেন না ওমর বেগ। এটাই স্বাভাবিক। আর এই একই কারণে তিনি নজর রাখবেন মিরজাফরের উপরে, যাতে লুকোনো সম্পদ একাই আত্মসাৎ করার কোশিশ না করতে পারেন নবাব।
আরও একটা বিষয়ে ক্লাইভ নিশ্চিত এই যে, নবাব মিরজাফর খাঁ, এসব কথা কোনওমতেই অন্য কারও কাছে ফাঁস করবেন না। তাহলে উমেদারের সংখ্যা বেড়ে যাবে।
নীরবতা ভেঙে ওমর বেগের মুখপানে চেয়ে মিরজাফর শুধোলেন, ‘কী করা যায় এখন?’
ওমর বেগ বললেন, ‘কর্নেল ক্লাইভ তুরন্ত জবাব চেয়েছেন।’
‘গদ্দার মুনির খাঁ।’ অসহায় আস্ফালন করে উঠলেন মিরজাফর।
ওমর বেগ বললেন, ‘ইয়ে সহি বাত। মুনির খাঁর জবান যদি সচ হয়, আউর করিব চার কোটি টাকা সচমুচ যদি পাওয়া যায়, তাহলে আপনার হাতেও আসবে সেই টাকার মোটা একটা অংশ। বকেয়া হিসেবে পুরোটাই চাইতে পারতেন কর্নেল। আপনি খারিজ করতে পারতেন না। ইকরারনামা মোতাবেক ইংরেজদের দাবি মেটাতে আপনি বাধ্য। কর্নেল আপনাকে ইমান দিয়েছেন। সিরাজদৌল্লার দৌলতের একটা ভাগ দিতে চাইছেন। এ বন্দোবস্ত মেনে নেওয়াই ভালো।’
ওমর বেগের কথায় মাথা নাড়িয়ে সায় দিলেন মিরজাফর। একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘বেশ কর্নেলকে জানিয়ে দিন। তিনি যা চাইছেন তাই হবে।’
.
জায়গায় জায়গায় বাতিদানে জ্বলছে অভ্রের আলো। আলোছায়ায় ঢাকা আঁকাবাঁকা পথ। কখনও সরু, কখনও প্রশস্ত। সে পথের অসংখ্য শাখা-প্রশাখা শিরা-উপশিরার মতো ছড়িয়ে পড়েছে চারিদিকে। এ হল হিরাঝিল প্রাসাদের ভুলভুলাইয়া। এর অন্দরের নকশাটা মাথায় না থাকলে একবার ভিতরে ঢুকে বেরিয়ে আসা প্রায় দুঃসাধ্য।
রাত গভীর। সিরাজের তৈরি এই ভুলভুলাইয়ার অন্দরে পথ দেখাচ্ছে মুনির খাঁ। তার পিছনে নবাব মিরজাফর খাঁ ও ওমর বেগ। এঁদের পিছনে হেঁটে চলেছেন কর্নেল ক্লাইভ। তাঁর দুপাশে কোম্পানিরই অতি বিশ্বস্ত দুই দেশি কর্মচারী–মুনশি নবকৃষ্ণ ও দেওয়ান রামচাঁদ।
আলোআঁধারিতে মোড়া সর্পিল পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে কেমন যেন গা ছমছম করছে ক্লাইভের। অচানক কোনও বিপদ এসে হাজির হবে না তো? তিনি কি বড্ড বেশি ঝুঁকি নিয়ে ফেললেন না? ভুলভুলাইয়ার অন্দরে লুকিয়ে থাকা ঘাতকবাহিনী যদি অতর্কিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে? না না। এতটা দুঃসাহস মিরজাফরের হবে না। মনকে প্রবোধ দেন কর্নেল। মানুষ চিনতে তাঁর ভুল হয় না। তবুও সাবধানের মার নেই। সতর্ক থাকাই ভালো। কোমরে ঝোলানো চামড়ার খাপ থেকে পিস্তলটা হাতে নিলেন ক্লাইভ।
পথ এমন ভাবে এঁকেবেঁকে ঘুরছে যে ক্লাইভের মনে হচ্ছে তিনি যেন একই জায়গায় ঘুরপাক খাচ্ছেন। বেশ কিছুক্ষণ পর সরু একটা পথের উপরে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল মুনির খাঁ।
.
