1 of 2

পলাশির পরে – ১৮

১৮

ওমর বেগের মুখ থেকে কথাটা শুনেই চমকে উঠেছিলেন মিরজাফর। ক্লাইভ আসতে চাইছেন হিরাঝিল পালেসে। মুনশি নবকৃষ্ণ ও দেওয়ান রামচাঁদকে সঙ্গে নিয়ে, গভীর রাতে অত্যন্ত গোপনে। কিন্তু কেন?

মিরজাফরের দিকে ওমর বেগ এগিয়ে দিলেন ক্লাইভের লেখা ছোট্ট চিঠিটা। তাতে চোখ বুলিয়ে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন নবাব। তাঁর হাতে ধরা চিঠিখানা বাঁশপাতার মতো কাঁপতে লাগল।

ক্লাইভ লিখেছেন, ‘…সিরাজদ্দৌলার অর্জিত অঢেল সম্পদ অতিগোপনে গচ্ছিত আছে হিরাঝিল প্যালেসের অন্দরে। এর মূল্য করিব চার কোটি টাকা…’ কোথায় লুকোনো আছে এই বিপুল অর্থ? সে ইঙ্গিত অবশ্য দেননি কর্নেল। শুধু বলেছেন, ‘…জনাব গুপ্তধনের হদিশ আমি পেয়েছি। এই দৌলত আপনার ও জনাব ওমর বেগের সঙ্গে আমি ভাগ করে নিতে চাই। হুঁশিয়ার থাকবেন। আর কেউ যেন এ বিষয়ে কিছু জানতে না পারে। আপনি রাজি থাকলে আগামীকাল গভীর রাতে এই দৌলতের তলাশে আমি হিরাঝিল প্রাসাদে আসব। অতি গোপনে। এ বিষয়ে আপনার মতামত তুরন্ত জানাবেন।…’

মিরজাফরের মাথাটা কেমন যেন চক্কর দিয়ে উঠল। কী আশ্চর্য ব্যাপার! হিরাঝিল প্যালেসের অন্দরে লুকোনো আছে করিব চার কোটি টাকা! এই প্রাসাদের দখল নেওয়ার পর থেকে গোপনে রক্ষিত সিরাজদ্দৌলার ধনসম্পদের সন্ধানে কম খানাতল্লাশি করেননি মিরজাফর। লেকিন তন্ন তন্ন করে খুঁজেও কানাকড়ির খোঁজ তিনি পাননি।

মিরজাফরের মনের মধ্যে উঁকি দেয় সন্দেহ। কী করে ক্লাইভ জানলেন গুপ্তধনের কথা? যা তিনি লিখেছেন, এসব কি সত্যি? নাকি এই চিঠি একটা কৌশল। কর্নেল ক্লাইভ গভীর রাতে অতি গোপনে হিরাঝিল প্রাসাদে আসতে চাইছেন অন্য কোনও মতলবে। বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন মিরজাফর। ওমর বেগের মুখপানে চেয়ে শুধোলেন, ‘কর্নেল যা লিখেছেন, তা সব সত্যি?’

ওমর বেগ মাথা ঝুঁকিয়ে বলে, ‘আন্দাজ সহি না হলে কর্নেল খোদ আসতেন না।’

‘লেকিন খাজানার কথা কী করে জানলেন কর্নেল?’

‘সন্ধান দিয়েছে মুনির খাঁ।’ চাপা গলায় বললেন ওমর বেগ।

‘মুনির খাঁ! সিরাজের খাস গোলাম?’ মিরজাফর বিস্মিত।

‘জি হুজুর।’

‘বলছেন কী জনাব? মুনির খাঁ জিন্দা আছে?’ হতচকিত নবাবের গলা থেকে ছিটকে বেরোয় কথাগুলো।

‘বিলকুল। খুশ তবিয়ত আছে। সহি সালামত আছে।’ ওমর বেগ জবাব দেন।

‘কোথায় সে? কোথায় ছুপিয়ে রেখেছে নিজেকে।’

‘মুনির খাঁ এখন কর্নেল ক্লাইভের হেফাজতে।’

একেবারে হাঁ হয়ে যান মিরজাফর। বিস্ময়ের পর বিস্ময়। গোটা হিরাঝিল প্রাসাদ ঢুঁড়েও কানাকড়ির হদিশ না পেয়ে মুনির খাঁর অনেক খোঁজ করেছিলেন তিনি। সন্ধান মেলেনি। রায়দুর্লভ, জগৎশেঠসহ অনেকেই বলেছিলেন– হিরাঝিল প্রাসাদে কোনও গোপন জায়গায় সিরাজের খাস দৌলত ছুপানো আছে। বেশক আছে। এর সন্ধান একমাত্র মুনির খাঁই দিতে পারে। সেই তো সামলাত সিরাজের বিষয়-আশয়। কিন্তু পলাশির যুদ্ধের পর থেকে মুনির খাঁ নিখোঁজ।

নিজামতের কাসিদরা গোটা বাংলা ঢুঁড়েও যার সন্ধান পেল না, কর্নেল ক্লাইভ কী করে তার হদিশ পেলেন? মিরজাফরের মাথা ভোঁ ভোঁ করতে লাগল। হাঁ-মুখ করে তিনি ওমর বেগের দিকে চেয়ে রইলেন।

.

দিন কয়েক আগের কথা। সেদিন ছিল পূর্ণিমা।

গঙ্গাবক্ষে বজরার ছাতে আরামকেদারায় গা এলিয়ে বিশ্রাম করছিলেন ক্লাইভ। হাতে ফরসির নল। খুবই ধীর গতিতে নদীর বুকে ভেসে চলেছে বজরাটা। অদূরে দৃশ্যমান মোরাদবাগ প্যালেস। সারি সারি চিরাগবাতির আলোয় স্পষ্ট তার অবয়ব। এর খানিকটা উত্তরে অন্ধকার ভেদ করে অত্যুজ্জ্বল হিরাঝিল প্রাসাদের আলোকমালা। হিরাঝিলের নহবতখানা থেকে সানাইয়ে ভেসে আসছে মারুবেহাগের সুর। মাথার উপর ঝকঝকে উন্মুক্ত আকাশে জেগে রয়েছে আধখানা চাঁদ। কালো আকাশের বুকে হিরককুচির মতো জ্বলজ্বল করছে অজস্র নক্ষত্র।

কর্নেলের মেজাজটা আজ বিশেষ শরিফ নেই। নবাব মিরজাফর খাঁ ইংরেজদের পাওনা মেটাবেন তিন কিস্তিতে, তিন বছরে। তাও প্রথম কিস্তি পাওয়া যাবে অর্ধেক টাকায়, বাকি অর্ধেক বহুত কিমতি চিজে। জগৎশেঠের হাভেলিতে বসে লম্বা আলোচনার পর একপ্রকার নিরুপায় হয়েই ক্লাইভকে মেনে নিতে হয়েছে এই বন্দোবস্ত। এ ছাড়া অন্য উপায় ছিল না। নবাবের দৌলতখানা তজবিজ করে কর্নেল বুঝেছেন, সত্যিই ইংরেজদের দাবি মেটানোর মতো নগদ টাকা নেই নবাবের।

কোম্পানির পাওনা আদায়ের পাশাপাশি মোটা অংকের একটা টাকা নিজের পকেটে পোরার খোয়াব দেখেছিলেন ক্লাইভ। আপাতত তাঁর সেই স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছে। কর্নেলের আফশোস এই যে– পলাশির যুদ্ধের এত বড় ঝুঁকিটা কাঁধে নিয়ে, সসম্মানে কোম্পানিকে উতরে দিয়েও ব্যক্তিগত মুনাফা হল খুবই সামান্য। যা পেয়েছেন তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি আদায়-উশুলের উমিদ ছিল তাঁর। মাদ্রাজে বসে সুবে বাংলার নবাবের দৌলতের কহানি শুনে লোভ-লালসা উপচে পড়েছিল ক্লাইভের চোখেমুখে। নৌবহরসহ বাংলায় আসার পথেই ওয়াটসনের সঙ্গে আলোচনা করে লুঠতরাজের খসড়া পরিকল্পনা ছকে ফেলেছিলেন কর্নেল ক্লাইভ। কিন্তু কোথায় দৌলত? বাংলার জলুসের রংদার কহানির সঙ্গে বাস্তবের মিল কোথায়? পলাশির যুদ্ধের গনিমত আদায় হল খুব সামান্যই। তবে একটা কথা ক্লাইভ মানছেন—নবাবের জাঁকজমক, জলোয়ার অনেকটাই শুষে নিয়ে গিয়েছে বর্গিরা।

ক্লাইভের চোখেমুখে বিরক্তি। চুপচাপ ফরসির নলে টান দিয়ে চলেছেন কর্নেল। অম্বুরি তামাকের গন্ধে গঙ্গাবক্ষের বাতাস আমোদিত। অদূরে নিচু দুটো চৌপাইয়ের উপর পাশাপাশি বসে আছেন মুনশি নবকৃষ্ণ ও কোম্পানির দেওয়ান রামচাঁদ। প্রথম কিস্তির পাওনা নৌকো বোঝাই করে কী করে পাঠাতে হবে কলকাতায় তা নিয়ে আলোচনার জন্য নবকৃষ্ণ ও রামচাঁদকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন ক্লাইভ। প্রায় শদুয়েক নৌকোয় মালপত্র চাপিয়ে নৌকোগুলোকে সারিবদ্ধ ভাবে নিয়ে যেতে হবে কলকাতায়। এ কাজের দায়িত্ব মূলত দেওয়ান রামচাঁদের ঘাড়ে। নবকৃষ্ণ সাহায্য করছেন তাঁকে। কর্নেলের আদেশ-হুকুমের অপেক্ষায় বসে আছেন দু’জনে। আধঘণ্টাখানেক হয়ে গেল। ক্লাইভ নিশ্চুপ। জগৎশেঠের হাভেলি থেকে ফেরার পর থেকে তাঁর মেজাজটা কেমন যেন খিঁচড়ে রয়েছে। পলাশিতে ইনকিলাবের কিম্মত আদায় হবে তিন কিস্তিতে, তিন বছর ধরে—এটা মন থেকে মেনে নিতে পারছেন না কর্নেল। তিনি নগদ আদায়ে বিশ্বাসী।

হঠাৎ নীচ থেকে একটা শোরগোলের শব্দ ভেসে এল। সচকিত হয়ে উঠলেন ক্লাইভ। নবকৃষ্ণ ও রামচাঁদ সিড়ি বেয়ে দ্রুত নেমে গেলেন নীচে।

আরামকেদারা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন ক্লাইভ। কীসের গোলমাল?

খানিকবাদে একটা লোককে টেনে হিচড়ে সেপাইরা নিয়ে এল বজরার ছাতে। তাদের পিছনে নবকৃষ্ণ ও রামচাঁদ। দু’জনেই উত্তেজিত।

নবকৃষ্ণ বললেন, ‘হুজুর লোকটা একটা ছিপ নৌকো নিয়ে বজরার কাছে এসে বজরায় উঠে পড়তে চাইছিল। সেপাইরা একে পাকড়াও করেছে।’

একদৃষ্টে লোকটাকে ইয়াদদস্ত করতে লাগলেন ক্লাইভ। দেখে মালুম হচ্ছে, লোকটা বেজায় ক্লান্ত ও অবসন্ন। চোখদুটো কোটরে ঢোকা। টলমল করছে তার পা দুটো। সোজা হয়ে দাঁড়ানোর শক্তি যেন তার নেই। ডান পায়ে গভীর ক্ষত। সেখান থেকে রক্ত চুইয়ে পড়ছে। পোশাক ময়লা, জীর্ণ। কাঁধ থেকে ঝুলছে চামড়ার একটা খরিতা। তার মুখচোখ দেখে মনে হচ্ছে ভয় পেয়েছে সে।

লোকটাকে শক্ত করে ধরেছিল দুই সেপাই। তাদের চলে যেতে বললেন ক্লাইভ। সেপাইরা লোকটাকে ছেড়ে দিতেই কাটা কলা গাছের মতো সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। অবসন্ন, ক্লান্ত গলায় কোনওরকমে বলল, ‘হুজুর আমার জান বাঁচান। আমি মুনির খাঁ।’

মুনির খাঁ! রামচাঁদ ও নবকৃষ্ণ স্তম্ভিত। বিস্ফারিত হয়ে উঠল তাদের চোখগুলো।

ক্লাইভ বিচলিত। তার সামনে লুটিয়ে পড়ে আছে লোকটা। অচৈতন্য। তার উপরে ঝুঁকে পড়ল নবকৃষ্ণ ও রামচাঁদ।

ক্লাইভ ব্যস্ত গলায় শুধোলেন, ‘ইজ দ্য ম্যান ডেড?’

নবকৃষ্ণ বললেন, ‘না হুজুর। জিন্দা আছে। বেহুঁশ হয়ে গেছে। শ্বাস পড়ছে।’

‘হু ইজ দ্যাট ম্যান? চেনো?’

নবকৃষ্ণ জবাব দেন, ‘সিরাজদ্দৌলার খাস গোলাম হুজুর। মুনির খাঁ।’

রামচাঁদের হাঁকডাকে ছুটে এল কয়েকজন সেপাই।

ক্লাইভ হুকুম করলেন, ‘একে অন্দরে নিয়ে যাও। ইলাজ করাও।’

সেপাইরা মুনির খাঁকে ধরাধরি করে নীচে নামিয়ে নিয়ে যাওয়ার পর নবকৃষ্ণ বললেন, ‘এ মনে হচ্ছে আপনার খুশনসিব হুজুর।’

‘হোয়াট ডু ইউ মিন মুনশি?’

‘খুশনসিব নয়? মুনির খাঁ নিজে এসে ধরা দিল আপনার কাছে।’

‘সো হোয়াট?’

উৎসাহের সঙ্গে নবকৃষ্ণ বলেন, ‘নিজামতের কাসিদরা বহুত তলাশ করে লোকটার হদিশ পায়নি।’

অবাক চোখে নবকৃষ্ণর দিকে তাকালেন ক্লাইভ।

নবকৃষ্ণ বললেন, ‘সিরাজদ্দৌলার বহুত পেয়ারের আদমি ছিল মুনির খাঁ। হিরাঝিলের অন্দরের অনেক গোপন কথা জানে। আরও শুনেছি সিরাজদ্দৌলা একে খুব বিশ্বাস করতেন।’

রামচাঁদ যোগ করলেন, ‘শুধু তাই নয় হুজুর, শোনা যায় সিরাজদ্দৌলার দৌলতের খতেন রাখত মুনির খাঁ।’

এ কথা শুনে চকচক করে উঠল ক্লাইভের চোখদুটো। অবসন্ন স্নায়ু সতেজ হয়ে উঠল নিমেষে। তিনি বললেন, ‘আই থিংক, নবাবের পারসোনাল ট্রেজার হিরাঝিল প্রাসাদে যদি কোথাও হিডেন থাকে তো সেটা নিশ্চয়ই মুনির খাঁ জানবে।’

নবকৃষ্ণ বললেন, ‘একেবারে মোক্ষম আন্দাজ করেছেন হুজুর।’

ক্লাইভ বললেন, ‘তোমাদের আমি মুনির খাঁর জিম্মাদার করলাম। লোকটাকে ভালো করে খাতির করো। ইলাজ করাও। ওর কাছ থেকে গোপন কথাটা টেনে বের করার চেষ্টা করো। আমি জানি, তোমরা পারবে। এ বিষয়ে আর কেউ যেন কোনও কিছু জানতে না পারে।’

রামচাঁদ ও নবকৃষ্ণ প্রায় একসঙ্গে বলে ওঠেন, ‘আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন হুজুর।’

এবারে বেশ আবেগ জড়িত গলায় ক্লাইভ বললেন, ‘ইউ টু আর ভেরি ডিয়ার টু মি। তোমরা আমাকে যা মদত দিয়েছ সেটা আমি ভুলতে পারি না।’

নবকৃষ্ণ বললেন, ‘ও কী কথা বলছেন হুজুর? আমরা আপনার দাস। ওবিডিয়েন্ট সারভেন্ট।’

‘আই ট্রাস্ট ইউ মোর দ্যান এনি ইংলিশম্যান।’

নবকৃষ্ণ হাত কচলে বলে, ‘সে আমাদের পরম সৌভাগ্যি হুজুর।’

‘মাই ফিলোজফি ইজ এফিসিয়েন্ট পারসনস মাস্ট বি রেমুনারেটেড। কোম্পানির জন্য তো তোমরা কম করোনি। সামান্য মাইনে ছাড়া আর কী পেলে তোমরা? কী দিয়েছে তোমাদের কোম্পানি?’

ক্লাইভের কথার সুরে যেন মধু ঝরে পড়ে নবকৃষ্ণ ও রামচাঁদের কানে। ইঙ্গিতটা দু’জনের কাছেই খুব স্পষ্ট। তাঁরা সঠিক আন্দাজ করতে পেরেছিলেন ইংরেজরাই দেশের ভবিষ্যৎ। তাই পরিবার পরিজন ভুলে একনিষ্ঠ ভাবে দু’জনেই মদত দিয়ে গিয়েছেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে। কর্নেল ক্লাইভকে। ইংরেজদের চরম বিপদের দিনেও তাদের পাশ থেকে এঁরা সরে যাননি। পলাশির যুদ্ধের পর লুঠ হচ্ছে মুর্শিদাবাদ। ইংরেজ সাহেবরা যে যার দাবি মতো টাকা ভরছে পকেটে। আদায় করছে গনিমত। দস্যুর মতো গায়ের জোরে নয়। ভদ্রবেশে। কৌশলে। কর্নেল যাকে বলেন স্ট্র্যাটেজি। কিন্তু নবকৃষ্ণ বা রামচাঁদের কথা ভাবছে কে? ঝুঁকির বিনিয়োগে মোটা মুনাফা– এই তত্ত্বে বিশ্বাসী নবকৃষ্ণ ও রামচাঁদ মনে মনে প্রত্যাশা করেছেন মোটা ইনাম, কিন্তু মনের কথা প্রকাশ করেননি কারও কাছে। সে কথা আজ ভাবছেন স্বয়ং কর্নেল ক্লাইভ। কথাই তো আছে, সবুরে মেওয়া ফলে।

নবকৃষ্ণ বললেন, ‘কোম্পানি নাই বা আমাদের কথা ভাবল, আমরা যে আপনার সেবা করতে পেরেছি, এতেই আমরা ধন্য।’

‘আই ক্যান নট ফরগেট ইওর ডেডিকেটেড সারভিস টু কোম্পানি। কোম্পানি তোমাদের কথা ভাববে না আমি জানি। কিন্তু আমি ভাবছি। যদি সিরাজদ্দৌলার পারসোনাল ট্রেজার ট্রেস আউট করা যায়, সে কথা আমি কোম্পানিকে বা আমার কোনও ইংলিশ কলিগকে জানাতে চাই না। হাতে যা আসবে তা থেকে, তোমাদের আমি মোটা ইনাম দেব। মুনির খাঁর কাছ থেকে কথা আদায় করো। দেয়ার মাস্ট বি হিডেন ট্রেসারস ইন হিরাঝিল ক্যাম্পাস।’

নবকৃষ্ণ বলে উঠলেন, ‘জয় গোবিন্দ।’

রামচাঁদ বলে উঠলেন, ‘করুণাসিন্ধু রাধামাধব।’

রামচাঁদের মুখপানে চেয়ে ক্লাইভ শুধোলেন, ‘নবকিসেনের গোবিন্দকে আমি জানি। বাট হু ইজ রাধামাধব?’

রামচাঁদ বললেন, ‘আমাদের মাইথোলজিতে যেই গোবিন্দ, সেই রাধামাধব। একই দেবতা। হরেক নাম।’

ক্লাইভ দুহাতে দুজনের পিঠে চাপড় মেরে বললেন, ‘ভেরি কনফিউজিং।’

নবকৃষ্ণ বললেন, ‘হুজুর আপনিই আমাদের গোবিন্দ। আপনিই রাধামাধব।’

ক্লাইভ হাসলেন। তারপর জেবের ভিতর থেকে পাইপটা বের করে ঠোটে গুঁজলেন। দুটো চকমকি পাথর হাতে দ্রুত এগিয়ে এলেন নবকৃষ্ণ। পাথর ঘষে আগুন ধরিয়ে দিলেন পাইপে। একটা লম্বা সুখটান দিয়ে ধোয়ার কুণ্ডলী বাতাসে উড়িয়ে দিলেন ক্লাইভ। তারপর বললেন, ‘নাউ লেট আস ফোকাস অন মুনির খাঁ অ্যান্ড টু অ্যাচিভ আওয়ার মিশন।’

.

নবকৃষ্ণ ও রামচাঁদের তত্ত্বাবধানে দিনকয়েকের মধ্যেই সুস্থ হয়ে উঠল মুনির খাঁ।

সেদিন সন্ধেবেলা মোরাদবাগ প্যালেসের ছাতে বসে মুনির খাঁর সঙ্গে আলাপ করছিল দু’জনে। নীচের প্রশস্ত লনে তখন সাহেবদের ডিনার পার্টি চলছে।

এই গোরা সাহেবদের সব কিছুই ভালো লাগে নবকৃষ্ণ ও রামচাঁদের। পছন্দ হয় না শুধু খানাপিনার নামে এই হুল্লোড়বাজি। ফূর্তির আসুরিক বহিঃপ্রকাশ। এদেশি নবাব-বাদশাদের মতো ঝিম মেরে খুশইলহান বাইজির সঙ্গীতসুধা উপভোগ করা নয়, রীতিমতো দামালপনা। বেহেড মাতাল হয়ে কলহ, বিবাদ, এমনকি হাতাহাতি। আড্ডা, গুলতানির মাঝে মাঝে হেড়ে গলায় পিলে চমকে দেওয়া অট্টহাস্য। বাড়াবাড়ি রকমের কিছু একটা না হলে সাহেবদের সেলিব্রেশন জমে না।

ছুতো পেলেই ডিনার পার্টি লাগিয়ে দেয় সাহেবরা। মুর্শিদাবাদ থেকে ধনদৌলত ছেঁচে নিয়ে কলকাতা রওনা দেবে দুশো নৌকো। সেই খুশিতে আজকের এই সেলিব্রেশন। মোরাদবাগ প্যালেসের লনে টেবিলের উপরে সাজানো রয়েছে রকমারি মদের বোতল—শ্যাম্পেন, ক্লারেট, ওয়াইন, বিয়ার। আরেকদিকে চাঁদোয়ার নীচে টেবিলের উপর রুপোর রেকাবিতে সাজানো হয়েছে মাংসের হরেকরকম মসল্লাদার পদ। দমপোক্ত, দুনিয়াজা, গোস্তের সুরুয়া, তন্দুরি। মোগলাই খানায় মজেছে সাহেবরা। স্বাদু গন্ধে ম-ম করছে গোটা মোরাদবাগ প্যালেস।

নীচ থেকে ভেসে আসছে মেজর আয়ারকুটের চিৎকার। পাশাপাশি শোনা যাচ্ছে উইলিয়াম ওয়াটসের হেঁড়ে গলা। মদের নেশায় বেসামাল হয়ে কাজিয়া বাঁধিয়েছেন দু’জনে। সাহেবদের পার্টিগুলোতে এই এক উৎপাত। নেশা একটু চড়তে না চড়তেই সকলে দামাল হয়ে ওঠে। এ ওকে গালিগালাজ করে। হাতাহাতি বাধিয়ে দেয়। কেউ কেউ মৌতাতে মাটিতে লুটোয়। ডুয়েল লড়ার জন্য কখনও সখনও বেরিয়ে পড়ে বন্দুক। তুলনামূলকভাবে প্রকৃতিস্থ যারা, তারা ছুটে এসে দুপক্ষকে শান্ত করে। গোলমাল ঝামেলা মেটায়। আজও তার ব্যতিক্রম নেই। ঘুষি বাগিয়ে ওয়াটসের দিকে ছুটে যেতে চাইছেন আয়ারকুট। ওয়াটসও আস্তিন গোটাচ্ছেন। আয়ারকুটের কোমর জাপটে ধরে তাকে সামলানোর কোশিশ করছেন লাশিংটন ও স্ক্র্যাফটন।

নীচ থেকে ভেসে আসা অশ্রাব্য ইংরেজি গালিগালাজের শব্দ শুনে ঘাবড়ে যায় মুনির খাঁ। শুধোয়, ‘কাজিয়া কীসের বাবুজি? কী বাত বলছে এরা?’

নবকৃষ্ণ হেসে বলেন, ‘কাজিয়া কোথায়? একে অপরের সুখ্যাতি করছে।’

রামচাঁদ বলেন, ‘শরাবের মৌতাতে সবারই মেজাজ এখন বেশ শরিফ। তাই এই খুনজোশি।’

মুনির খাঁ ঘাবড়ে যাওয়া গলায় বলে, ‘লেকিন মালুম হচ্ছে লড়াই বাধবে।’

নবকৃষ্ণ বলেন, ‘না না ওসব কিছু নয়। স্রেফ ফূর্তি। এ তুমি বুঝবে না। সাহেবদের বোলচাল, কেতা, আদব-কায়দা সবই আলগ।’

রামচাঁদ শুধোলেন, ‘শরাব তোমার চলে?’

লাজুক হাসি হাসে মুনির খাঁ।

নবকৃষ্ণ বলেন, ‘বুঝেছি। তুমি রসিক আদমি। দাঁড়াও তোমার আমোদ-আশরতের আনজাম করছি।’

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *