১৬
ডুম-ডুম-ডুম-ডুম! ডুম-ডুম-ডুম-ডুম! ঢাক-ঢোল-কাড়ানাকাড়ার শব্দে কেঁপে কেঁপে উঠছে মুর্শিদাবাদ। হাতের মুঠি শূন্যে ছুড়ে চুনিলাল ও মুন্নিলাল চেঁচিয়ে উঠল—
‘দেখো দেখো নবাবজাদার কামালিয়ত কুদরতি।
সিরাজদ্দৌলার লাশ নিয়ে চলে নিজামতের হাতি।
নবাবজাদা মিরন কামিল ই ইনসান
জহান্নামে আলিবর্দির খানদান।’
পথের দু’পাশে শুধু সারি সারি কালো মাথা। গলি দিয়ে পিল পিল করে বেরিয়ে আসছে লোকজন। তারা দাঁড়িয়ে পড়ছে মূল সড়কের পাশে। এ পথ চলে গিয়েছে নিজামত কেল্লার দিকে। হাতির পিঠে বসে এই বিপুল জমায়েত দেখে দারুণ খুশিতে নবাবজাদা মিরন মনে মনে সাবাশি দিচ্ছেন নিজেকে– ‘বেবাক আমআদমি দেখে যাও। মিরনের কেরামতি দুচোখ ভরে দেখো। মুর্শিদাবাদের কোনও নবাবের লাশ নিয়ে এমন জলুস কী দেখেছ কেউ কখনও? মনে রেখো, মিরন ভয়ানক, দানবের মতোই বীভৎস। শুধু দুশমনকে খতম করেই তার খুনজোশি শান্ত হয় না। সে চায় আরও বাড়তি কিছু।’
হঠাৎ পথের উপরে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল হাতি। মাহুত বিব্রত। বহুত কোশিশ করেও নড়ানো যাচ্ছে না হাতিটিকে। অঙ্কুশের ঘনঘন আঘাতেও সে অটল।
হাতি থমকে যাওয়ায় শোভাযাত্রার তাল কাটল। মিরনের যে উচ্ছৃঙ্খল ইয়ারদোস্তরা নাচতে নাচতে এগোচ্ছিল, তাদেরও দাঁড়িয়ে পড়তে হল। বাজনদারেরা বাজনা থামিয়ে দিয়েছে। ফূর্তিতে ব্যাঘাত ঘটায় রে রে করে মাহুতের উপরে হামলে পড়ল চুনিলাল ও মুন্নিলাল। ঘোড়া দাবড়ে পিছন থেকে ছুটে এল খাদিম হোসেন খাঁ।
‘এ উল্লুক! হুয়া কেয়া?’ এই বলে মাহুতের উদ্দেশে চাবুক চালাল খাদিম হোসেন।
সপাং শব্দে কাঁটাওয়ালা চাবুক মাহুতের পিঠে আছড়ে পড়ল। যন্ত্রণায় কাতরে উঠল মাহুত। দাগ বসে গেল তার পিঠে। খুন ঝরল।
শুঁড় উঁচিয়ে ভয়ানক কর্কশ স্বরে ডেকে উঠল পাহাড়ের মতো হাতিটা। রাগ প্রকাশ করে মাথাটা ঝাঁকাতে লাগল। যেন খাদিম হোসেনের আচরণের প্রতিবাদ জানিয়ে বলতে চাইল—‘মারছ কেন মাহুতকে? তার কসুর কী? আমার খায়েশ, তাই দাঁড়িয়ে পড়েছি। কেন যে দাঁড়িয়েছি, তা তোমরা বুঝবে না।’
হাতির আচরণ দেখে ভয় পেয়ে চিঁ-হি-হি-হি করে ডেকে উঠে খাদিম হোসেনের ইরানি ঘোড়া চকিতে সরে গেল কিছুটা দূরে। অশ্বের এলোমেলো পদবিক্ষেপে বেসামাল হয়ে গেল খাদিম হোসেন। সামনে ঝুঁকে কোনওরকমে সামলে নিল নিজেকে।
হাতির কাছাকাছি যে সৈন্যরা ছিল তারাও ভয়ে সরে গিয়েছে খানিকটা। বিস্ফারিত চোখে তারা দেখল হাতির পিঠে রাখা বস্তায় মোড়া সিরাজের মৃতদেহ থেকে পথের ধুলোয় ঝরে পড়ল কয়েক ফোঁটা রক্ত। কেউ কেউ চেঁচিয়ে উঠল, ‘খুন! খুন! খুন ঝরছে!’
এই রক্তক্ষরণ মনে করিয়ে দিল পুরোনো একটা ঘটনার কথা। সেই স্মৃতি এখনও অনেকের মনেই তরতাজা। খুব পুরোনো কিসসা তো নয়। মাত্র বছর দুয়েক আগের কথা। ওই যে দেখা যাচ্ছে হোসেনকুলি খাঁর হাভেলি। এই তো সেই জায়গা যেখানে একদা সিরাজের নির্দেশ একদল সেপাই হাভেলি থেকে টেনেহিঁচড়ে বের করে হোসেনকুলিকে নৃশংস ভাবে খুন করেছিল।
‘কী আশর্য! যেখানে পথের উপরে উপুড় হয়ে পড়েছিল হোসেনকুলির ছুরিবিদ্ধ রক্তাক্ত দেহটা, রক্তে ভেসে যাচ্ছিল রাজপথ ঠিক সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে রয়েছে হাতি…’ মানুষের এই সমবেত গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ল বাতাসে। হাতি কি তার মরহুম মনিবের হয়ে মাফি মাঙছে?
যে মাটি সিক্ত হয়েছিল হোসেনকুলির রক্তে সেই মাটি ফের ভিজল সিরাজের দেহ থেকে ঝরে পড়া ফোঁটা ফোঁটা রক্তে। মুর্শিদাবাদকে অলবিদা জানানোর প্রাক্কালে নিজের রক্ত ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে যেন সব গুনাহের কিম্মত চুকিয়ে দিয়ে গেলেন সিরাজদ্দৌলা। ফের সচল হল হাতি। শোভাযাত্রা এগোতে লাগল।
.
বাতাসে শুধু কান্না আর বিষাদের সুর। দীর্ঘশ্বাস ফেললেন শরফ উন্নেসা– আলিবর্দির বেগম। সিরাজের নানি বেগম। দেওয়ালের গায়ে ঠেস দিয়ে সামনের দিকে পা দুটো ছড়িয়ে বসে আছেন। উদাস দৃষ্টি কড়িকাঠ থেকে ঝুলে থাকা ঝাড়বাতিটার উপর নিবদ্ধ। নানি বেগম যেন বাহ্যজ্ঞানশূন্য। মৃতের মতো নিশ্চুপ। অভিব্যক্তিহীন।
সিরাজের গ্রেফতারির খবরটা গতকালই পেয়েছিলেন। তখনও আশা ছিল মনে। বন্দি করলেও সিরাজকে হয়তো বাঁচিয়ে রাখবেন মিরজাফর খাঁ। যদি মৃত্যুদণ্ডাদেশ হয় তবে কর্নেল ক্লাইভের পা জড়িয়ে ধরে তিনি সিরাজের জীবন ভিক্ষা চাইবেন নানি বেগম। এমনই ছিল ইরাদা। কিন্তু আজ সকালে ঘুম থেকে উঠতেই খাস গোলাম-বাঁদিদের মুখে শুনলেন সেই মর্মান্তিক সংবাদ—সিরাজ নেই। গত রাতে জাফরাগঞ্জ প্রাসাদে তাঁকে কোতল করা হয়েছে। বেহেস্তবাসী হয়েও নিষ্কৃতি পায়নি সিরাজ। সিরাজের খণ্ডিত দেহ নিয়ে শোভাযাত্রা বেরিয়েছে রাজপথে। উল্লাসে মেতেছে মিরন ও তাঁর ইয়ারদোস্তরা। এসব শুনে থরথর করে কেঁপে উঠে মূর্ছা গিয়েছিলেন শরফ উন্নেসা। দুই বাঁদি জাপটে ধরে না ফেললে আছড়ে পড়তেন মাটিতে।
জ্ঞান ফেরার পর থেকে শরফ উন্নেসা একেবারে বোবা হয়ে গিয়েছেন। ঘোলাটে দৃষ্টিতে কেবল চেয়ে রয়েছেন আসমানের দিকে। প্রভুপুত্র সরফরাজ খাঁকে হত্যা করে মসনদে বসেছিলেন আলিবর্দি। পুত্রশোকে কাতর জেনেতুন্নেসার করুণ আর্তনাদ এখনও কানে বাজে শরফ উন্নেসার। এই বেইমানি, গুনাহের কিম্মত আলিবর্দির হয়ে তাকেই মিটিয়ে যেতে হবে। এন্তেকাল হওয়ায় রেহাই পেয়েছেন আলিবর্দি। কিন্তু তাঁর মুক্তি নেই। জিঞ্জির, জহমত, আর এই জিগরপস্তানি সবই মুখ বুজে সহ্য করতে হবে তাঁকে। দু’চোখে একফোঁটাও জল নেই। বোবা কান্না আটকে আছে নানিবেগমের গলার কাছে।
নবাব মিরজাফরের প্রতি বাড়াবাড়ি রকমের আনুগত্য দেখাতে নিজামত কেল্লার দারোগা আলিবর্দির বেগম ও বেটিদের একটা ঘুপচি অপরিসর ঘরে জানোয়ারের মতো কয়েদ করে রেখেছিল। কিন্তু ক্লাইভের পরামর্শে দেওয়ান রায়দুর্লভ জিন্দানখানার অন্দরের দুঃসহ জীবনযাপন থেকে তাঁদের অব্যাহতি দিয়েছেন। নিজামত কেল্লারই এক প্রান্তে প্রশস্ত এক মহলে আপাতত তারা নজরবন্দি। জীবনের স্বাভাবিক আরাম-আয়েস থেকে আলিবর্দির রিশতেদারদের বঞ্চিত করেননি রায়দুর্লভ। আলিবর্দি খাঁর কৃপাতেই তো মুর্শিদাবাদের দরবার রাজনীতির অলিন্দে রায়দুর্লভের উত্থান। পুরোনো মনিবের খানদানের প্রতি অতটা নির্দয় হতে পারেননি নিজামতের নতুন দেওয়ান সাহেব। আলিবর্দির বেগম ও দুই বেটির জন্য বরাদ্দ হয়েছে তিনটি পৃথক কক্ষ। খিদমত খাটার জন্য নিযুক্ত হয়েছে গোলাম-বাঁদিরাও। যদিও এই ব্যবস্থার কথা শুনে মোটেই খুশি নন মিরন। শিকায়ত জানিয়েছেন নবাব মিরজাফরের কাছে। এ প্রসঙ্গে নবাব অবশ্য নিশ্চুপ।
শরাবের নেশায় বেহুঁশ আমিনা বেগম নিজের কক্ষে গালিচার উপরে লুটিয়ে পড়ে আছেন। এই গরদিশ, খেজালত, দিগদারি ভুলতে শরাবকেই অব্যর্থ ইলাজ হিসেবে আঁকড়ে ধরেছেন সিরাজ-জননী। সকালে যখন চোখ মেললেন, তখন অনেকটা বেলা হয়ে গিয়েছে। জাফরির ফাঁক দিয়ে চড়া আলো এসে পড়েছে তাঁর মুখের উপরে। আলোর ঝলকানিতে আমিনা বেগমের চোখ কুঁচকে যায়। ভার হয়ে আছে মাথা। গোটা শরীর জুড়ে গভীর অবসাদ। জাফরাগঞ্জের কয়েদখানায় মামুলি এক কয়েদির মতো বন্দি হয়ে আছে তাঁর আদরের পুত্র, এ কথা মনে পড়তেই আমিনা বেগম চিৎকার করে কেঁদে ওঠেন।
খাস বাঁদি কোয়েল ছুটে আসে।
‘বেগম সাহেবা।’
কোয়েলের গলা শুনে কান্না থামিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকান আমিনা বেগম। আঁসু মুছে ব্যস্ত গলায় বলেন, ‘সিরাজের কোনও খবর জানিস কোয়েল?’
কোয়েল নিশ্চুপ।
‘চুপ করে আছিস কেন?’
‘চিলুমচিতে পানি নিয়ে আসি। হাতমুখ ধুয়ে নিন। অনেক বেলা হয়ে গেছে। এখনও যে নাস্তা সারা হয়নি আপনার।’
আমিনা বেগম শুধোলেন, ‘কাল রাতে ওরা আমার মির্জাকে খেতে দিয়েছে কিছু? জানিস? কোমরে দড়ি বেঁধে কতটা পথ হাঁটিয়ে এনেছে মির্জাকে। বল তো কত কষ্ট হয়েছে ওর! একবার যদি দেখা করতে পারতাম মির্জার সঙ্গে? চিরকুটটা পাঠিয়েছিলি দেওয়ান সাহেবের কাছে?’
‘আপনার গুজারেশ নামঞ্জুর হয়েছে।’ কোয়েল জবাব দেয়।
‘কেন ওরা আমাকে মির্জার সঙ্গে একবার দেখা করতে দেবে না?’ আমিনা বেগম চিৎকার করে ওঠেন।
জল ছলছলে চোখে বেগম সাহেবার দিকে অসহায় ভাবে চেয়ে থাকে কোয়েল।
‘তুই জানিস না কিছু? কেমন আছে আমার মির্জা?’ ব্যাকুল হয়ে পড়েন আমিনা বেগম।
কোয়েল আনত চোখে চেয়ে থাকে মেঝের দিকে।
‘বোবা হয়ে গেলি যে? কাল যে একমুঠো আশরফি দিলাম, কী করলি? জাফরাগঞ্জ থেকে খবর আনতে পারিসনি? সেপাই পেয়াদাদের সওগাত দিলেই তো কাজ হাসিল হয়ে যায়। কিছুই কি পারিস না তুই?’
‘এনে দেব খবর। হাতমুখ ধুয়ে নিন। চিলুমচি নিয়ে আসি।’ এই বলে কোয়েল চলে যায়।
সহসা বাইরে থেকে তুমুল শোরগোলের আওয়াজ ভেসে আসে। ঢাক-ঢোল-দিগর-পণবের শব্দে কেঁপে ওঠে গোটা নিজামত কেল্লা। কীসের আওয়াজ? এত হইচই কেন? উঠে দাঁড়িয়ে জানলার কাছে ছুটে যান আমিনা বেগম।
জাফরির ফাঁক দিয়ে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে রাজপথ। বিশাল জমায়েত পথের দুপাশে। পথ দিয়ে চলেছে এক শোভাযাত্রা। মাঝখানে একটা হাতিকে ঘিরে রেখেছে সেপাই-পেয়াদারা। আমিনা বেগম চিনতে পারেন হাতিটিকে। স্তম্ভিত হয়ে যান বেগম সাহেবা। এ তো সিরাজেরই হাতি। হাতির পিঠে গাদেলায় একটা বস্তা। খুনের রঙের ছোপ ছোপ দাগ বস্তার গায়ে। কী আছে ওতে? একদল উচ্ছৃঙ্খল যুবক উন্মত্তের মতো লাফাচ্ছে আর মুঠো মুঠো গুলাল উড়িয়ে দিচ্ছে হাওয়ায়। কেন? কোন খুশিতে?
সহসা নীচ থেকে ভেসে আসে উচ্ছৃঙ্খল যুবকদের সমবেত হর্ষধ্বনি।
‘দেখো দেখো নবাবজাদার কামালিয়ত কুদরতি।
সিরাজদ্দৌলার লাশ নিয়ে চলে বেহেদর হাতি।
তামাম দুনিয়ার আশরত
সিরাজদ্দৌলার মওত।’
নিমেষে বুঝে গেলেন আমিনা বেগম, কেন এই শোভাযাত্রা। ‘মি-র-র-র-জা!’ তীব্র আর্তনাদ করে উঠলেন তিনি। তারপরেই পাগলিনীর মতো কক্ষ থেকে ছুটে বেরিয়ে এলেন। জলভর্তি চিলুমচি হাতে তার কক্ষের দিকে আসছিল কোয়েল। ধাক্কা খেয়ে ছিটকে পড়ে সে। পাথরের মেঝের উপর দিয়ে গড়িয়ে গেল রুপোর চিলুমচি। অলিন্দ দিয়ে পাগলিনীর মতো ছুটে চলেছেন আমিনা বেগম। হুলুস্থূল পড়ে গেল নিজামত কেল্লায়। সিরাজ-জননী ঝড়ের গতিতে সিঁড়ি ভেঙে নীচে নেমে আসেন। পরনে ঘাগরা ও চোলি। মাথার চুল অবিন্যস্ত। গলায় উড়নি নেই। পায়ে নেই পয়জার। চোখের নিমেষে সদর দেউড়ি পার হয়ে পথে নেমে ছুটতে লাগলেন আমিনা বেগম।
‘মি-র-র-র-জা! মি-র-র-র-জা! মি-র-র-র-জা!’
এই মর্মন্তুদ আর্তনাদ শুনে সচকিত হয়ে উঠল পথে জমায়েত লোকজন। অগণিত মানুষের ব্যূহ ভেদ করে সড়কের উপরে এসে দাঁড়ালেন সিরাজদ্দৌলার আম্মিজান।
শোভাযাত্রায় সামিল সেপাই-পেয়াদারা ভেবেছিল কোনও মিশকিন আওরাত বোধ হয় খয়রাতির আশায় আচমকা পথের উপরে ছুটে এসেছে। কোড়া হাঁকাতে গিয়ে থমকে গেল পেয়াদা। বিসমিল্লা। ইনি যে আলিবর্দির বেটি। সিরাজদ্দৌলার জননী। আমিনা বেগমকে দেখে পথের উপরে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল হাতি। পাগলিনীর মতো রক্তে ভেজা বস্তাটার উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন পুত্রহারা মা। ভেঙে পড়লেন হাহাকারের কান্নায়।
পুত্রশোকে কাতর মায়ের এই করুণ কান্না শুনে কারও চোখের জল বাধ মানল না। সেপাই-পেয়াদারা মাথা ঝুঁকিয়ে কাঠের পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে। জল তাদের চোখেও।
বস্তার ভিতরে দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন সিরাজের মাথাটা দেখে তীব্র আর্তনাদ করে উঠলেন আমিনা বেগম। ছেলের মাথাটা বুকের মধ্যে চেপে ধরে কাঁদতে কাঁদতে লুটিয়ে পড়লেন ধুলোয়। ছেলের রক্ত ভেজা চুলে, দুই গালে, চোখের পাতায় বারবার চুমো খেতে লাগলেন মা। তারপর সংজ্ঞা হারিয়ে নিস্তেজ হয়ে পথের ধুলোতেই পড়ে রইলেন।
ভিড়ে দাঁড়িয়ে থাকা আলিবর্দির অনুগত অনেক সেপাই পেয়াদা ওমরাহ চঞ্চল হয়ে উঠল। নবাব আলিবর্দি খাঁর খানদানের একী ঘোর বেইজ্জতি! আলিবর্দির ছোটি বেটি জনসমক্ষে এভাবে ধুলোয় পড়ে আছেন? রোষে ফুঁসে উঠল জনগণ। তাদের মারমুখী মেজাজ সামাল দিতে গিয়ে মিরনের সেপাই-পেয়াদাদের হিমসিম অবস্থা। সহসা ঘোড়া দাবড়ে সামনে এগিয়ে এলেন খাদিম হোসেন খাঁ। লাফ দিয়ে নামলেন ঘোড়া থেকে। তারপর আমিনা বেগমের চুলের মুঠি ধরে তাঁকে টেনে হিচড়ে নিয়ে গেল নিজামত কেল্লার অন্দরে।
এই বর্বর আচরণের প্রতিবাদে উত্তেজিত জনতা শোভাযাত্রার পথ আটকে দাঁড়িয়ে পড়ল। তাদের সঙ্গে মিরন ও তার বাহিনীর খণ্ডযুদ্ধ বেধে যাওয়ার উপক্রম। এমন সময় শোনা গেল ঘোড়ার খুরের টগবগ শব্দ। ধুলো উড়িয়ে ছুটে আসছে একদল ঘোড়সওয়ার। একেবারে সামনের দুই ঘোড়সওয়ারের হাতে ধরা রয়েছে কোম্পানির নিশান। পতপত করে উড়ছে হাওয়ায়।
আওয়াজ উঠল, ‘কোম্পানির ফৌজ! কোম্পানির ফৌজ!’
রাশ টেনে মিরনের হাতির পাশে ঘোড়া দাঁড় করালেন ক্যাপটেন আয়ারকুট। তাঁর দুপাশে হেস্টিংস ও লাশিংটন।
আয়ারকুট গর্জন করে উঠলেন, ‘স্টপ দিস প্রসেশন ইমিডিয়েটলি।’
হাতির পিঠ থেকে নেমে এল মিরন। নিজামতের সেপাই-পেয়াদারা বেয়নেটধারী গোরা পল্টনদের দেখে ভয়ে কাঁপছে।
আয়ারকুটের উদ্দেশে মিরন হাসিমুখেই বলল, ‘মালুম হচ্ছে জনাব খুব পরেশানির মধ্যে রয়েছেন?’
‘প্রসেশন বন্ধ করুন।’ মেজর আয়ারকুট ভয়ানক উত্তেজিত।
মিরন মুচকি হেসে বলে, ‘নবাবজাদার কসুর হয়েছে বলতে চান?’
আয়ারকুট চেচিয়ে উঠলেন, ‘আপনি কি উন্মাদ হয়ে গেছেন? কী করছেন এসব?’
‘মওত হয়েছে দুশমনের। একটু ফূর্তি হবে না?’
মিরজাফরের দস্তখত করা চিরকুটটা মিরনের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বিরক্তির সঙ্গে হেস্টিংস বললেন, ‘বন্ধ করুন এই ক্রুয়েলটি। নবাবের হুকুমত।’
কপালে ভাঁজ পড়ল মিরনের। চিরকুটের লেখাটা পড়ে তার চোয়াল শক্ত হল। এই আমোদ বন্ধ করতে বলা যে ইংরেজদেরই কারসাজি সেটা বুঝতে পারল মিরন। রাগে গা জ্বলে গেল তার। প্রতিমুহূর্তে চোখ রাঙাচ্ছে ইংরেজরা। দূর থেকে সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করছেন কর্নেল ক্লাইভ। তাঁর ভয়ে তটস্থ হয়ে আছেন নবাব মিরজাফর খাঁ। আব্বাহুজুরের উপরেও ভয়ানক রাগ হল মিরনের। ইংরেজরা যা বলছে তাই তিনি মেনে নিচ্ছেন। মাঝের থেকে ইয়ারদোস্তদের কাছে বার বার বেইজ্জত হতে হচ্ছে তাকে। সুবে বাংলার নবাব চলবেন নিজের খুশখেয়ালে। তিনি ইংরেজ বণিকদের মর্জির গোলাম হবেন কেন? ক্লাইভই যদি সর্বেসর্বা হন, তবে নবাব সেজে মসনদে বসে থেকে লাভ কী?
ওয়ারেন হেস্টিংস বললেন, ‘সিরাজের দেহটা দাফন করার আনজাম করুন।’
আয়ারকুট বললেন, ‘আস্ক ইওর পারসনস টু ডিসপার্স।’
ফারসিতে কথাটার অর্থ বুঝিয়ে দিলেন ওয়ারেন হেস্টিংস।
ভয়ংকর হিংস্র হয়ে উঠল মিরনের চোখদুটো। আয়ারকুটের মুখের উপর দৃষ্টি স্থির রেখে সে বলল, ‘জরুর। লেকিন সিরাজের দেহ দাফন করার দায় আমার নয়। আপনারা তার আনজাম করুন। আমি নবাবের হুকুম তামিল করছি। বন্ধ্ করছি এই জানেজা।’
পিঠের উপরে মনিবের লাশ নিয়ে এখনও মাটিতে বসে আছে সিরাজের হাতি। মিরনের নির্দেশে চুনিলাল ও মুন্নিলাল বস্তার ভিতর থেকে সিরাজের দেহের খণ্ড খণ্ড অংশগুলো তীব্র ঘৃণায় ছুড়ে ছুড়ে ফেলতে লাগল পথে। বীভৎস, নারকীয় দৃশ্য। শিউরে উঠল জমায়েত হওয়া লোকজন। আয়ারকুট, হেস্টিংস ও লাশিংটন স্তম্ভিত।
জলুস ভেঙে দিয়ে উচ্ছৃঙ্খল ইয়ারদোস্তদের নিয়ে ফিরে চলল মিরন। রাস্তার পাশে ভিড় করে থাকা আমআদমি ঘটনার অভিঘাতে বাক্যহারা। পথের উপরে পড়ে রয়েছে সিরাজের মাথা ও দেহের বিভিন্ন অংশ। সকলের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে একটাই প্রশ্ন—এ দোজখ, না মুর্শিদাবাদের রাজপথ?
সহসা ভিড়ের মধ্যে থেকে এগিয়ে এল জনৈক এক ব্যক্তি। খোশবাগে আলিবর্দির সমাধির দেখভাল করে সে। অনেক যত্ন করে গুলাব ফোটায় খোশবাগের বাগিচায়। হররোজ কবরের উপরে ছড়িয়ে দেয় লাল গুলাবের পাপড়ি। সন্ধেবেলা চিরাগ জ্বেলে দেয়। ধূপ জ্বালায়।
সিরাজের দেহখণ্ডগুলো মাটি থেকে কুড়িয়ে নিয়ে সে জড়ো করল এক জায়গায়। হঠাৎই কয়েকজন মানুষ এনে হাজির করল মেহগিনি কাঠের তৈরি একটি পালঙ্ক। সিরাজের দেহখণ্ডগুলোকে তার উপরে সাজিয়ে দিল লোকটি। ভিড়ের মধ্যে থেকে কেউ একজন এগিয়ে দিল তরন্দাম মসলিনের একখানা শাদা কাপড়। লোকটি সেই কাপড় দিয়ে সিরাজের দেহকে আচ্ছাদিত করল। এবারে একে একে এগিয়ে এল জমায়েত মানুষজন। তারা আচ্ছাদনের উপরে ঢেলে দিল গুলাব জল ও দামি আতর। সুগন্ধে ম ম করে উঠল চারিদিক। তারপর রাশি রাশি গুলাব ফুলে, বেল, জুঁই-এর মালায় ঢাকা পড়ল সিরাজের দেহ। মেহগিনি কাঠের পালঙ্কটা আমজনতাই ধরাধরি করে চাপিয়ে দিল হাতির পিঠে।
অপরিণত কিশোর সিরাজের খুশখেয়াল একসময় যাদের সিদ্দতের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল, যারা চেয়েছিল সিরাজদ্দৌলার বরবাদি তারাও আজ চোখের জল ফেলল সিরাজের করুণ পরিণতি দেখে। মিরনের নৃশংসতা, হৃদয়হীন, বর্বর আচরণ সিরাজের সব কলঙ্ক, অপযশ এক লহমায় মুছে দিয়ে মানুষের হৃদয়ের মসনদে তাঁকে চিরস্থায়ী করে দিল। ক্লাইভ ভেবেছিলেন, সিরাজদ্দৌলাকে খলনায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে নিজের পাপের দায় ঝেড়ে ফেলবেন। কিন্তু সিরাজের প্রতি সহানুভূতির খরস্রোতে তাঁর এই কৌশল ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেল।
সিরাজের দেহখণ্ডগুলোকে যে মানুষটি পথ থেকে তুলে নিয়ে যত্ন করে সাজিয়ে দিল পালঙ্কের উপরে, সেই লোকটিকে অবাক চোখে এতক্ষণ দেখছিলেন মেজর আয়ারকুট। এবারে হাতের ইশারায় তাকে ডাকলেন।
এগিয়ে এসে মেজর সাহেবকে তসলিম জানাল লোকটি।
‘কী নাম তোমার?’
‘জয়নাল আবেদিন। খোশবাগে নবাব আলিবর্দি খাঁর সমাধির দেখভাল করি। একসময়ে নবাব আলিবর্দি খাঁর গোলাম ছিলাম। এখনও তাঁর গোলামি করি।’
ওয়ারেন হেস্টিংস শুধোলেন, ‘কোথায় দাফন করবে সিরাজের দেহ?’
‘খোশবাগে হুজুর। তাঁর খানদানের সকলের সমাধির জন্য ওই জায়গাটি বাছাই করে গিয়েছেন স্বয়ং আলিবর্দি খাঁ।’
খানিকবাদে সিরাজের দেহ নিয়ে মানুষের শোভাযাত্রা এগিয়ে চলল নিজামত কেল্লার নৌকোঘাটের দিকে। হাতির পিঠে গাদেলায় ফুলে ফুলে ঢাকা সিরাজের দেহ। হাতির সামনে ও পিছনে চুপচাপ হেঁটে চলেছে অগণিত মানুষজন। এদের পিছনে ঘোড়ার পিঠে চেপে ধীর গতিতে এগিয়ে চললেন আয়ারকুট, হেস্টিংস ও লাশিংটন। একেবারে পিছনে গোরা পল্টনেরা।
বজরায় চাপিয়ে নদীর ওপারে খোশবাগে নিয়ে যাওয়া হল সিরাজের দেহ। সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে। সন্ধের মুখে সিরাজকে সমাহিত করা হল আলিবর্দির সমাধির ঠিক পাশে। অবশেষে পরম নিশ্চিন্তে ঘুমোনোর অবকাশ পেলেন বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজদ্দৌলা।
.
