১৫
কয়েক ধাপ নেমে এসে একটা চাতালের উপরে থমকে দাঁড়ালেন মেজর কিলপ্যাট্রিক। কর্নেল ক্লাইভের ডেপুটি। দোর্দণ্ডপ্রতাপ এই সেনানায়কের মুখোমুখি এসে দাঁড়ালেন হেস্টিংস ও লাশিংটন। খুব দ্রুত সিড়ি ভেঙে উপরে উঠে আসার ধকলে দুজনেই হাঁপাচ্ছেন। এরা যে কোনও সুসংবাদ বহন করে আনেননি, তা আন্দাজ করতে পারছেন কিলপ্যাট্রিক। মেজরসাহেবের কপালের ভাঁজ বেশ স্পষ্ট হয়ে উঠল। প্রবল উৎকণ্ঠার সঙ্গে হেস্টিংসের উদ্দেশে শুধোলেন, ‘হোয়াট হ্যাপেনড?’
ক্লাইভ ও কিলপ্যাট্রিক ফৌজের বড় একটা অংশ নিয়ে মোরাদবাগ প্যালেসে ঘাঁটি গাড়লেও, ক্লাইভের নির্দেশে মেজর আয়ারকুট রয়েছেন ভাগীরথীর ওপারে। আয়ারকুটের সঙ্গে রয়েছেন হেস্টিংস, লাশিংটন এবং শতখানেক গোরাপল্টন। এঁরা উঠেছেন নিজামত কেল্লার কাছেই বিলাসবহুল এক অতিথিনিবাসে।
পলাশির যুদ্ধের পর ইংরেজদের কী চোখে দেখছে মুর্শিদাবাদের আমআতরফ আদমি, তা নিয়ে কর্নেলের দুশ্চিন্তা এখনও দূর হয়নি। এপারে মোরাদবাগ প্যালেসে বসে নদীর ওপারে কী ঘটছে তা জানা সম্ভব নয়। তাই মেজর আয়ারকুটের উপর ক্লাইভের কড়া নির্দেশ—ওপারে কোনও গোলমালের আঁচ পেলে মোরাদবাগে যেন তুরন্ত খবর পাঠানো হয়। জাফরাগঞ্জের উপরে কড়া নজর রাখাই ক্লাইভের মূল উদ্দেশ্য। বেআক্কেলে, বেওকুফ, সঙ্গদিল মিরনকে তাঁর বিশ্বাস নেই। বেহুদা কোনও হুজ্জুতি পাকিয়ে ইংরেজদের না কোনও মুসিবতের মধ্যে ফেলে।
কিলপ্যাট্রিকের প্রশ্নের জবাবে হেস্টিংস বললেন, ‘সিচুয়েশন ইজ ভেরি গ্রেভ স্যার।’
‘হোয়াট? গ্রেভ মানে? হোয়াট হ্যাপেনড?’
‘লাস্ট নাইট মিরন কিলড সিরাজদ্দৌলা।’ কথা গুলো কেটে কেটে বললেন লাশিংটন।
ভয়ানক চমকে উঠে কিলপ্যাট্রিক বললেন, ‘বলছ কী? মিরজাফর খাঁ ওয়াদা করেছিলেন হেসটিলি সিরাজদ্দৌলার বিষয়ে কোনও ডিসিশন নেবেন না। ইন স্পাইট অফ দ্যাট–’ থমকে গেলেন কিলপ্যাট্রিক। চোয়াল শক্ত হল।
হেস্টিংস বললেন, ‘মিরজাফর খাঁ এমন হুকুম করেছিলেন বলে আমার মনে হয় না। সবই ওই স্কাউনড্রেল মিরন ছোকরার ব্রেন চাইল্ড! ছোকরা আরও কী করেছে শুনলে আপনি আঁতকে উঠবেন। দ্যাট ভেনচার মে রুইন আওয়ার ফরচুন।’
‘হোয়াট আর ইউ সেয়িং? হোয়াট এলস হ্যাজ হি ডান?’ বিস্ফারিত হয়ে উঠল কিলপ্যাট্রিকের চোখদুটো। মেজর সাহেব ভয়ানক উত্তেজিত হয়ে পড়লেন।
দূরে কালচে সবুজ গাছপালার ফাঁক দিয়ে দৃশ্যমান জাফরাগঞ্জ প্যালেসের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে হেস্টিংস বললেন, ‘মিরন অ্যারেঞ্জড অ্যা গর্জিয়াস প্রসেশন উইথ দ্য হিউম্যান রিমেইনস অফ সিরাজদ্দৌলা।’
আঁতকে উঠে কিলপ্যাট্রিক বলে উঠলেন, ‘ও মাই গড! হাউ ডেঞ্জারাস! দ্যাট উইল ইনফিউরিয়েট দ্য মব।’
লাশিংটন বললেন, ‘রাইট স্যার। দ্য প্রসেশন ইজ নাউ পাসিং থ্রু দ্য সিটি।’
নদীর দিকে তাকিয়ে ওয়ারেন হেস্টিংস বললেন, ‘সি দ্য বোটস স্যার। অল ওভারপ্যাকড। এপার থেকে আমআদমি ওপারে যাচ্ছে। টু পে হোমেজ টু দ্য নবাব।’
‘স্টুপিড! রেকলেস ফেলো।’ গর্জন করে উঠলেন কিলপ্যাট্রিক।
‘বাজনার শব্দ শুনতে পাচ্ছেন স্যার?’ হেস্টিংস শুধোলেন।
ঢাক, ঢোল, কাড়ানাকাড়া, দিগর, পণবের আওয়াজ নদীর ব্যবধান টপকে ওপার থেকে এপারে ভেসে আসছে।
‘ইয়েস। ইয়েস। দ্যাট ইজ কানট্রি ব্যান্ড।’
‘দ্য ব্যান্ড লিডস দ্য প্রসেশন।’
প্রবল বিরক্তির সঙ্গে বাঁ হাতের মুষ্ঠি দিয়ে ডান হাতের তালুতে ঘুষি মারলেন কিলপ্যাট্রিক।
হেস্টিংস বললেন, ‘দ্য ইডিয়ট প্রিন্স মেড দ্য সিচুয়েশন ভেরি কমপ্লেক্স ফর আস। আমরা পলাশিতে ইনকিলাব ঘটিয়েছি। সাচ ডিসপ্লে অফ নবাবস করপস ইন দ্য ক্রাউড মে এনরেজ দেম এগেইনস্ট আস।’
লাশিংটন বললেন, ‘ইন ফ্যাক্ট উই উইটনেসড মেনি অ্যাংরি ফেসেস অন দ্য রোড।’
হেস্টিংস যোগ করলেন, ‘আউট অফ হেটরেড এরা যদি একটা করে পাথর আমাদের দিকে ছুড়ে মারতে শুরু করে তাহলে পালানোর পথ থাকবে না। উই উইল বি ইন অ্যা ডিপ স্যুপ।’
‘কাম উইথ মি।’ এই বলে হেস্টিংস ও লাশিংটনের প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষা না করে কিলপ্যাট্রিক হনহন করে হাঁটতে শুরু করলেন মোরাদবাগ প্যালেসের সদর দেউড়ি অভিমুখে।
তাঁর পিছু নিলেন হেস্টিংস ও লাশিংটন।
.
জাফরির ফাঁক দিয়ে ঘরে এসে পড়া সকালের নরম আলো বাহারি ফুলে নকশা এঁকেছে মেঝেতে। বিলাসবহুল বিছানায় খানিক আগে ঘুম ভেঙেছে কর্নেল ক্লাইভের। তবে এখনও বিছানা ছেড়ে ওঠেননি। বেহেস্তের মতো সুন্দর মোরাদবাগ প্যালেসের বাগান থেকে ভেসে আসছে পাখির কলতান। এই শিরিন আওয়াজ বেশ ভালো লাগছে কর্নেলের।
জানলা থেকে ঝোলানো তনসুখ কাপড়ের পর্দা এলোমেলো ভাবে উড়ছে হাওয়ায়। ভাগীরথীর বুক ছুঁয়ে ছুটে আসা বাতাস এখনও বেশ শীতল। তবে বেলা বাড়লেই গরম বাড়বে। এদেশে জুন-জুলাই মাসে, বিশেষত, ভরা বর্ষার মরশুমে ভ্যাপসা ভিজে গরমটা খুবই অস্বস্তিকর। শরীর হাঁসফাঁস করে। ক্লাইভ ফলতায় এসে পৌঁছেছিলেন গত বছর ডিসেম্বরে। শীতের মরশুমে। কাজেই সুবে বাংলার সামারের সঙ্গে এবারেই তাঁর প্রথম মোলাকাত। বিশ্রি ভিজে গরম আর কালান্তক জ্বর—এই দুই উৎপাত বাদ দিলে ক্লাইভের চোখে সুবে বাংলা বেশ খাসা জায়গা বলেই প্রতিভাত হয়েছে। এদেশের রং, রোশনি, জলুসে তিনি সম্মোহিত। কী যে জাদু আছে বাংলার মাটিতে কে জানে! মজেছিলেন জোব চার্নক। মজলেন ক্লাইভও।
পলাশিতে জিত হাসিলের কথা ক’দিন আগে লিখে পাঠিয়েছেন মাদ্রাজে। কর্নেল জানেন, এবার মাদ্রাজ থেকে তাগাদা আসবে– তুরন্ত ফিরে এসো।
কিন্তু কর্নেলের অভিপ্রায় অন্য। পলাশির যুদ্ধে জয়লাভ হয়েছে ঠিকই তবে এদেশের মাটিতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য আরও অনেক কাজ বাকি—এই কথা আগেভাগেই চিঠিতে তিনি জানিয়ে দিয়েছেন মাদ্রাজের বড় কর্তাদের। বাংলা ছেড়ে এখনই যাতে মাদ্রাজে পাড়ি দিতে না-হয়, তার জন্য গৌরচন্দ্রিকা সেরে রেখেছেন। ক্লাইভের দু’চোখে ভাসছে বিরাট বড় এক স্বপ্ন। ভবিষ্যৎ তিনি দেখতে পাচ্ছেন। মামুলি এক চাকুরিজীবী হয়ে থাকতে চান না কর্নেল। তিনি ইতিহাস গড়বেন।
মাথার কাছে রুপোলি ডোরিতে টান দিলেন কর্নেল ক্লাইভ। রুপোর রেকাবির উপরে রাখা কফি ভর্তি সুদৃশ্য চিনেমাটির পট ও পেয়ালা নিয়ে ঘরে প্রবেশ করল অর্ডারলি। রেকাবি রেখে দিয়ে বেরিয়ে গেল নিঃশব্দে। বিছানায় কাত হয়ে কর্নেল নিজেই পট থেকে কাপে কফি ঢেলে নিলেন। তারপর চুমুক দিলেন আয়েশ করে।
কর্নেলের মেজাজ এখন বেশ শরিফ। নবাব মিরজাফরের কাছ থেকে প্রাপ্য টাকার প্রথম কিস্তি আদায় হয়েছে। নৌকো বোঝাই হচ্ছে আশরফি, মোহর ও হরকিসিমের বেহেতেরিন কিমতি চিজে। কম নয়, প্রায় শ’দুয়েক নৌকা। কোম্পানির প্রাপ্য বুঝে নিতে কয়েকজন দিশি কর্মচারীকে নিয়ে দু’দিন আগে কলকাতা থেকে মুর্শিদাবাদে এসে হাজির হয়েছে কোম্পানির দেওয়ান রামচাঁদ রায়।
অল্প কিছুদিন আগে কোম্পানির নোকরি নিয়ে হুগলিতে উকিলের পদে যোগ দিয়েছিলেন রামচাঁদ। উদ্যমী যুবক। পৈতৃক ভদ্রাসন আন্দুলে। ক্লাইভের সুনজরে এসে তাঁর পদোন্নতি হল। হুগলি কাছারির উকিল থেকে ফোর্ট উইলিয়ামের দেওয়ান। কর্নেলের জবানে কঠিন কাজ সহজে হাসিল করতে নব মুনশির মতোই রামচাঁদও তুখোড়। সাহেবদের অনেকে বলে কর্নেল ক্লাইভ চতুর্ভুজ। নিজের দুই হাত তো আছেই। বাকি দুই হাত হল নবকৃষ্ণ ও রামচাঁদ। সম্প্রতি এই দু’জনকে একটা গোপন কাজে লাগিয়েছেন ক্লাইভ। অ্যাডমিরাল ওয়াটসন ও ফৌজের অন্যান্য মেজর ক্যাপটেনরা এ বিষয়ে বিন্দুবিসর্গও জানেন না। কর্নেলের স্থির বিশ্বাস পারলে নবকৃষ্ণ ও রামচাঁদই পারবে কাজটা উদ্ধার করতে। সেক্ষেত্রে খুশনসিবির জলোয়ায় ফের একবার ঝলমল করে উঠবেন তিনি।
কফি শেষ করে বিছানা থেকে নেমে এলেন ক্লাইভ। খোলা জানলার পাশে এসে দাঁড়ালেন। চকমকি পাথর ঠুকে পাইপ ধরিয়ে বেশ তৃপ্তির সঙ্গে ধোঁয়া ছাড়লেন।
দোতলার জানলা দিয়ে দূরে দেখা যাচ্ছে নৌকোঘাট। ঘাটের কাছে জড়ো হয়ে আছে সারি সারি নৌকো। কুলি-মজুরে, লোকে-লস্করে ছয়লাপ নৌকোঘাট। মাল বোঝাই চলছে পুরোদমে। মাঝ নদীতে নোঙর ফেলে দাঁড়িয়ে আছে যুদ্ধজাহাজ কেন্ট। মোরাদবাগ প্যালেসে এসে ওঠেননি অ্যাডমিরাল ওয়াটসন। আপাতত কেন্ট জাহাজই তাঁর আস্তানা। তিনি কলকাতায় ফেরার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। এ নিয়ে ওয়াটসনের সঙ্গে গতকাল ক্লাইভের একপ্রস্থ আলোচনা হয়েছে। ঠিক হয়েছে সামনে ও পিছনে যুদ্ধজাহাজের পাহারায় মূল্যবান সামগ্রীতে বোঝাই দু’শো নৌকোর কনভয় নিয়ে দিন দুয়েকের মধ্যেই কলকাতায় পাড়ি দেবেন অ্যাডমিরাল।
দৃশ্যটা ভাবতে ভালো লাগছে ক্লাইভের। গণিমতে বোঝাই শদুয়েক নৌকা। প্রত্যেকটার মাথায় মাথায় উড়ছে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পতাকা। ভাগীরথীর জল কেটে ছুটে চলেছে কলকাতার দিকে। নৌকোগুলোর সামনে ও পিছনে পাহারাদার যুদ্ধজাহাজ। জাহাজের ডেকে ফৌজি ব্যান্ডে বাজছে রুল ব্রিটানিয়া। নদীর দুপাড়ে দাঁড়িয়ে তামাম বাংলার প্রজারা বিস্মিত চোখে দেখছে ইংরেজদের কুদরতি। মুর্শিদাবাদের জলুস চালান হয়ে যাচ্ছে কলকাতায়।
নদীর ওপারে জাফরাগঞ্জ প্যালেসের কয়েকটা মিনার সবুজের আড়াল টপকে মাথা তুলে আছে। সেদিকে নজর পড়তেই ক্লাইভের মনে পড়ে গেল সিরাজের কথা। গতকাল সন্ধেবেলা মিরজাফরের পাঠানো চিরকুটে পলাতক নবাবের গ্রেফতারির খবরটা জেনে খুশিতে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছিলেন কর্নেল।
ফরাসিদের সঙ্গে মোলাকাত হওয়ার আগেই ধরা পড়েছেন সিরাজদ্দৌলা। ল-এর নেতৃত্বে ফরাসিরা তেলিয়াগড়ি পৌঁছে গিয়েছিল। সিরাজদ্দৌলার কিসমত জানার পর তারা পিছু হটে পাটনার দিকে ফিরে চলেছে। সময়ের সামান্য হেরফের হলেই হয়তো ফরাসিদের হেফাজতে চলে যেতেন সিরাজদ্দৌলা। সেক্ষেত্রে পরিস্থিতি ঘোরালো হয়ে উঠত। মোরাদবাগ প্যালেসের আরাম-আয়েস ছেড়ে আবার লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিতে হত। আকাশের দিকে মুখ তুলে ভাগ্যদেবীকে ফের একবার সুক্রিয়া জানালেন ক্লাইভ।
তবে জাঁ ল এখনও কর্নেলের মনের মধ্যে অশান্তির এক কাঁটা হয়ে বিঁধে আছে। ল ও তার বাহিনীকে গ্রেফতার করতে না পারলে ফরাসি শক্তিকে সুবে বাংলা থেকে পুরোপুরি উৎখাত করা যাবে না। হিন্দুস্তানের পরিস্থিতি ভালো নয়। তাগদ হারিয়ে ঢোঁড়া সাপে পরিণত হয়েছেন মোগল বাদশা। এই সুযোগে মাথা তুলছে প্রাদেশিক নবাব ও রাজা-রাজড়ারা। কর্মনাশা নদী পেরিয়ে ল যদি সুজাউদ্দৌলার রাজত্বে ঢুকে যান, তাহলে তাকে গ্রেফতার করা মুশকিল হয়ে দাঁড়াবে। সুজাউদ্দৌলা বেশ শক্তিশালী। তাঁর সঙ্গে আঁতাত করে ইংরেজদের বেকায়দায় ফেলতে ফরাসিরা হানা দিতে পারে বাংলায়।
এখনই ল-এর পিছনে ক্লাইভ ফৌজ পাঠাতে চান। এ জন্য নবাবের শীলমোহর প্রয়োজন। এই বিষয়টা নিয়ে একটা হেস্তনেস্ত করে তবে সিরাজকে নিয়ে ভাবতে চান কর্নেল। আপাতত তাঁর ইচ্ছে সিরাজকে রাজকীয় মর্যাদায় কোনও প্যালেসে গৃহবন্দি করে রাখা হোক।
‘…দরবারের অনেকেই চাইছে তাঁকে হত্যা করতে। কী করা যায়? জনাব আপনার ইরাদা কী জানাবেন।…’ মিরজাফরের কাছ থেকে জরুরি চিঠি পেয়ে কাল রাতেই উত্তর দিয়েছেন ক্লাইভ–
‘…ধৈর্য ধরুন হুজুর। এখনই গুরুতর কিছু করে বসবেন না।…’
ওয়াশরুম থেকে হাতমুখ ধুয়ে বেরোতেই ঝড়ের গতিতে ক্লাইভের ঘরে ঢুকলেন কিলপ্যাট্রিক। তাঁর সঙ্গে ওয়ারেন হেস্টিংস ও লাশিংটন। কিলপ্যাট্রিক রাগে ফুঁসছেন। ক্লাইভের সামনে এসেই ক্ষোভ উগরে দিলেন তিনি। ‘স্যার, দ্য ইডিয়টিক অ্যাকশন অফ মিরন মে পুট আস ইন পেরিল।’
কিলপ্যাট্রিক, লাশিংটন ও হেস্টিংসের সহসা এই নাটকীয় প্রবেশে ও কিলপ্যাট্রিকের প্রতিক্রিয়ায় চিন্তিত মুখে ক্লাইভ শুধোলেন, ‘কী হয়েছে মেজর?’
‘মিরন কিলড সিরাজদ্দৌলা লাস্ট নাইট। মি. হেস্টিংস অ্যান্ড মি. লাশিংটন ব্রট দিস নিউজ।’
কথাটা শুনে একেবারে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন ক্লাইভ। মুখে জমাট বাঁধল রক্ত। ঝড়ের আভাস পেলেন হেস্টিংস ও লাশিংটন।
কিলপ্যাট্রিক ফের বললেন, ‘দ্য স্টুপিড ফেলো অলসো অ্যারেঞ্জড অ্যা গরজিয়াস প্রসেশন উইথ দ্য হিউম্যান রিমেইন্স অফ সিরাজদ্দৌলা। থাউজ্যান্ডস অফ পিপল অ্যাসেম্বলড বিসাইড দ্য রোড টু পে হোমেজ। অল আর এজিটেটেড।’
কিলপ্যাট্রিকের কথার কোনও জবাব না দিয়ে গটমট করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন ক্লাইভ।
.
মুর্শিদাবাদের আকাশে-বাতাসে বিষাদের হাহাকার। সিরাজ নেই।
গতকাল রাতে জাফরাগঞ্জ প্রাসাদের কারাকক্ষে নৃশংস ভাবে হত্যা করা হয়েছে সুবে বাংলার প্রাক্তন নবাব আলিবর্দির দৌহিত্রকে। তাঁর নশ্বর, নিষ্প্রাণ দেহটা নিয়ে শোভাযাত্রার আয়োজন করেছে নবাবজাদা মিরন ও তার ইয়ারদোস্তরা—একথা জানতে পেরে ঘর থেকে বেরিয়ে পথে নেমে আসছে শয় শয় মানুষ। দৃশ্যটা দেখে সকলে স্তম্ভিত। মৃত নবাবের দেহ নিয়ে এমন জমকালো শোভাযাত্রা হতে পারে?
সিরাজের দেহটা শায়িত আছে তারই প্রিয় হাতির পিঠে গাদেলায়। অসম্মানে, অবহেলায়। চটের বস্তাবন্দি দেহটাকে অযত্নে ফেলে রাখা হয়েছে। সিরাজের দেহের উপরে ফুল ছড়িয়ে দেয়নি কেউ, কাফনও বিছিয়ে দেয়নি। মৃতদেহ থেকে চুইয়ে পড়া রক্তে ভিজে উঠেছে বস্তাটা। কয়েক ফোঁটা রক্ত হাতির পিঠে পড়ে গড়িয়ে গিয়েছে। রক্তের দাগ স্পষ্ট হয়ে আছে হাতির মসৃণ চামড়ার উপরে। তাগদের নৃশংস, কুৎসিত, বীভৎস প্রদর্শনী।
শোভাযাত্রার একেবারে সামনে বাজনা বাজাতে বাজাতে চলেছে একদল বাজনদার। কাড়ানাকাড়া, ঢাক, ঢোল, দিগর, পণবের আওয়াজে ভয়ানক উন্মত্ততা। কানে তালা ধরিয়ে দিচ্ছে শব্দ। শরাবের নেশায় মত্ত বাজনদারেরা নাচতে নাচতে চলেছে। থেকে থেকে লাফ দিয়ে উঠছে। ঢোলে চাটি মেরে শূন্যে পাক খাচ্ছে ঢোলবাদক। তাদের পিছনে কলের পুতুলের মতো হেঁটে চলেছে একদল সেপাই। হুকুমের দাস। তাদের হাতে ঝকঝক করছে উন্মুক্ত তরোয়াল।
এদের পিছনে সিরাজদ্দৌলার দেহটাকে বয়ে নিয়ে চলেছে হাতি। তার চোখদুটো বড় করুণ। মনিব যে আর ইহলোকে নেই তা নিশ্চয়ই সে টের পেয়েছে। মাহুতের নির্দেশ মেনে ধীর পায়ে হেঁটে চলেছে। হাতির দুপাশে ও পিছনেও রয়েছে সশস্ত্র সেপাই-পেয়াদা। এদের পিছনে অসভ্যের মতো দু’হাত তুলে লাফাচ্ছে একদল যুবক। এরা প্রবল হর্ষে আকাশের দিকে ছুড়ে দিচ্ছে মুঠো মুঠো রং-বেরঙের আবির। এদের মধ্যমণি চুনিলাল ও মুন্নিলাল। মিরনের দুই জঘন্য শাগরেদ। এই দুই শয়তান অশ্লীল ভঙ্গিতে কোমর দুলিয়ে দুলিয়ে ভাঁড়ের মতো নাচতে নাচতে চলেছে।
এই দলের পিছনে ঘোড়ার পিঠে চলেছে নবাব মিরজাফরের ভাগনে খাদিম হোসেন খাঁ। একেবারে পিছনে হাতির পিঠে চড়ে তামাশা দেখতে দেখতে এগোচ্ছেন মিরন। চুনিলাল ও মুন্নিলালের নাচ দেখে আমোদে হেসে খুন। মিরনকে ঘিরে রেখেছে বিরাট নিরাপত্তা বাহিনী।
পথঘাট সুনসান। রাস্তার দুপাশে জমাট ভিড়, পথের দুপাশের হাভেলিগুলোর ছাতে, অলিন্দে থিকথিক করছে মানুষজন। কুরসিবদল আমআদমি মেনে নিয়েছে। সিরাজদ্দৌলা অতীত, মিরজাফর বর্তমান একথাও মেনে নিতে কারও তকলিফ নেই। নবাবি রিয়াসতে এমন তো হয়ে থাকে। কিন্তু প্রাক্তন নবাবের মৃতদেহ নিয়ে এই কদর্য শোভাযাত্রা মেনে নিতে পারছে না প্রায় কেউই। অনেকেই ক্ষোভে ফুঁসছে। কেউ কেউ এই করুণ দৃশ্য দেখে ডুকরে কেঁদে উঠছে। বুক চাপড়ে হাহাকার করছে। কারও কারও মন চাইছে—এখনই এই শয়তানদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে সিরাজদ্দৌলার দেহটা ছিনিয়ে নেয়। মর্যাদার সঙ্গে দাফন করে আলিবর্দির দৌহিত্রকে। শুধু সেপাইদের হাতে ধরে রাখা উদ্যত তরবারির ভয়ে মনের ইচ্ছাকে দমিয়ে রেখেছে এরা। তবে ভিড়ের মধ্যে থেকে উড়ে আসছে মিরন ও মিরজাফরের উদ্দেশে কটুবাক্য ও গালিগালাজ। ‘মিরজাফর নিমকহারাম! নবাবজাদা মিরন নিমকহারাম!’ মিরজাফরকে মসনদে বসানোর জন্য কেউ কেউ ইংরেজদেরও দুষছে।
নিজামত কেল্লার কাছেই অতিথিনিবাসে অলিন্দে দাঁড়িয়ে এই শোভাযাত্রা দেখছিলেন মেজর আয়ারকুট। মানুষের ক্ষোভের উত্তাপে তিনি ত্রস্ত। সিরাজের মুসিবতের জন্য ইংরেজদের দায়ী করে এই সমবেত জনতা সত্যিই যদি পথের পাশ থেকে একটা করে নুড়ি কুড়িয়ে ছুড়ে মারতে শুরু করে তাহলে মাত্র হাজার দুই সেনা দিয়ে তাদের থামানো যাবে না। মুর্শিদাবাদে বসেই মরতে হবে ইংরেজদের। পলাশির যুদ্ধ জয় বিফলে যাবে।
উত্তেজনায় অস্থির হয়ে পায়চারি করতে লাগলেন আয়ারকুট। কর্নেল ক্লাইভের কাছ থেকে কী নির্দেশ আসে তার অপেক্ষায় রয়েছেন তিনি। হেস্টিংস ও লাশিংটনের প্রত্যাগমনের জন্য উতলা হয়ে পড়েছেন। নিজের ফৌজকে প্রস্তুত করে রেখেছেন। থেকে থেকেই দৃষ্টি নিক্ষেপ করছেন নদীর দিকে। চোখ রাখছেন দূরবিনে। না, কোম্পানির বজরাটা মেজর আয়ারকুটের চোখে পড়ছে না।
.
মিরজাফরকে দরবার ঘরে ঢুকতে দেখেই কোনও ভূমিকা ছাড়াই গর্জন করে উঠলেন ক্লাইভ। ‘ডু ইউ নো হোয়াট মিরন ডিড?’
এই কথা চালাচালির মধ্যে দোভাষীর কাজে লেগে পড়লেন নবকৃষ্ণ।
নির্বোধের মতো ক্লাইভের দিকে চেয়ে রইলেন মিরজাফর। সত্যিই তিনি কিছু জানেন না। জানার অবকাশই বা তাঁর কোথায়? সিরাজকে মিরনের হাতে সঁপে দিয়ে হারেমে ফূর্তি করছিলেন তিনি। ক্লাইভের আগমন সংবাদ পেয়ে তড়িঘড়ি ছুটে এসেছেন দরবার ঘরে। মাথার চুল উসকোখুসকো। পিরানের সব কটা ফিতে বেঁধে ওঠার সময় পাননি। পায়জামার দড়িটাও ভালো করা বাঁধা হয়নি।
‘কিছু জানেন না আপনি?’ ক্লাইভের মুখচোখ দিয়ে যেন আগুন ঠিকরে বেরোচ্ছে। মুখে জমাট বেঁধেছে রক্ত। ক্লাইভ যে কেন এত ক্ষিপ্ত তার আন্দাজ পাচ্ছেন না মিরজাফর। কর্নেলের আগুনে মেজাজের সামনে পড়ে ভয়ে কাঁপছেন তিনি। দরদর করে ঘামছেন। কিলপ্যাট্রিক, লাশিংটন ও হেস্টিংসের মুখের দিকে তাকিয়ে উত্তর হাতড়াতে থাকেন নবাব—কেন হঠাৎ এমন রুষ্ট হয়ে উঠলেন কর্নেল? কী এমন ঘটল?
ক্লাইভ চড়া গলায় বললেন, ‘লাস্ট নাইট মিরন কিলড সিরাজদ্দৌলা। ডু ইউ নো?’
এ কথা শুনে ভয়ানক চমকে উঠলেন মিরজাফর। ভাং-আফিমের নেশায় ও অনিয়ন্ত্রিত ইন্দ্রিয়বিলাসে শিথিল হয়েছে স্নায়ু। হাত কাঁপছে মিরজাফরের। মৃদু গলায় বললেন, ‘হুকুম দিয়েছিলাম, সিরাজকে কয়েদ করে রাখা হোক। তার উপরে কোনও জুলমাত যেন না হয়। বিচার পরে হবে।’
‘কেমন নবাব আপনি? আপনার হুকুম তামিল হয় না?’
ক্লাইভের ধমক খেয়ে অপরাধীর মতো চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন মিরজাফর।
ফের বিস্ফোরণ ঘটালেন ক্লাইভ। ‘নবাবজাদা আরও কী করেছে জানেন? অ্যারেঞ্জড অ্যা প্রসেশন উইথ দ্য হিউম্যান রিমেইনস অফ সিরাজদ্দৌলা। খুশি মানাচ্ছে। হাজার হাজার লোক জমায়েত হয়েছে পথে। দে আর অ্যাংরি উইথ ইউ। অ্যাংরি উইথ আস। পলাশিতে ইনকিলাব ঘটিয়েছি আমরা। আপনাকে মসনদে বসিয়েছি। পিপল উইল ব্লেম আস ফর সিরাজ’স ডেথ। আগর ইতনা আদমি জুদাই-জহমতে বেচ্যায়েন হয়ে উঠলে তার জিম্মেদারি কে নেবে? কে সামাল দেবে তাদের তফরানি?’
মিরজাফর অনুনয় করেন, ‘আপনি শান্ত হোন জনাব।’
‘আপনারা বেইজ্জত করছেন কোম্পানিকে। এখনই পরোয়ানা লিখে দিন। প্লিজ ইস্যু অর্ডার টু স্টপ দ্য প্রসেশন।’
ব্যস্ত গলায় মিরজাফর বললেন, ‘জরুর জনাব। এখনই লিখে দিচ্ছি।’
খাস মুনশিকে তলব করলেন মিরজাফর। কী লিখতে হবে তা বলে দিলেন ক্লাইভ। আদেশনামা দ্রুত মুসাবিদা করে ফেলল মুনশি। তাতে একবার চোখ বুলিয়ে দস্তখত করে দিলেন মিরজাফর। সেটা নবাবের হাত থেকে প্রায় ছিনিয়ে নিলেন লাশিংটন। তারপর তিনি ও হেস্টিংস দ্রুত নৌকোঘাটে এসে বজরায় চড়ে বসলেন।
.
