1 of 2

পলাশির পরে – ১৪

১৪

কয়েদখানার লোহার দরজার নীচ দিয়ে গলগল করে বাইরের অন্ধ অলিন্দে বেরিয়ে আসে উষ্ণ রক্তস্রোত। পাথুরে মেঝের ঢাল বেয়ে নদীর মতো এঁকেবেঁকে, সর্পিল গতিতে গড়িয়ে যায়। এ রক্ত সিরাজদ্দৌলার। বাংলার শেষ স্বাধীন নবাবের মওতের সাবুৎ। এ রক্ত কালান্তরের নিশান।

দেওয়ালগিরির আলো লক্ষ্য করে ছুটে যাওয়া একটা ক্ষুদ্র পতঙ্গ সহসা দিকভ্রষ্ট হয়ে পাথুরে দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে আছড়ে পড়ে রক্তস্রোতের মধ্যে। আহত, অসহায় পতঙ্গটা ফরফর শব্দে পাখা নাড়িয়ে ফের ওড়ার চেষ্টা করে। আঁঠালো রক্তে পড়ে ভারী হয়ে গিয়েছে তার দেহ। পতঙ্গটা আর উড়তে পারে না। খানিকবাদে নিষ্পন্দ হয়ে যায়।

কয়েদখানার ভিতর থেকে বিধ্বস্ত চেহারায় বেরিয়ে আসে মহম্মদী বেগ। খঞ্জরবিদ্ধ সিরাজের কলিজা থেকে ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে আসা রক্তে সে চিত্রিত। তার পোশাকে রক্ত, হাতে রক্ত, মুখে রক্ত। রক্তের দাগ লেগেছে তার মাথার শিরপেচেও।

মহম্মদী অপ্রকৃতিস্থ, ভূতগ্রস্তের মতো তার দশা। চোখ দুটো বিস্ফারিত। যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। মহম্মদীর মনে হচ্ছে কেউ যেন তার মাথায়, বুকে পাষাণভার চাপিয়ে দিয়েছে। টলছে মাথা। থরথর করে কাঁপছে হাত-পা। পদচালনা অসংলগ্ন। টলমলে পায়ে এগিয়ে চলে মহম্মদী। তার মনকে সহসা আচ্ছন্ন করেছে পাহাড়প্রমাণ অপরাধবোধ। অনুশোচনায় সে দগ্ধ। সে সিরাজের ঘাতক—একথা ভাবলে মহম্মদী নিজেই বিস্মিত হচ্ছে। কেবলই উন্মাদের মতো অস্ফুটস্বরে সে বলে চলেছে, ‘হায় আল্লা! এ আমি কী করলাম। কেন করলাম?’

পিছন থেকে ধেয়ে আসা রক্তের স্রোত মহম্মদীর পা ছুঁয়ে সামনে বয়ে যায়। সেদিকে চোখ পড়তেই ভয়ে আর্তনাদ করে ওঠে মহম্মদী। ‘রক্ত! রক্ত! সিরাজের রক্ত!’ ছুটে পালাতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে পাথরের মেঝেতে আছড়ে পড়ে মহম্মদী। হাঁটুতে আঘাত লাগে। ফের সে আর্তনাদ করে উঠে বলে, ‘আস্তাগফেরুল্লাহ!’

মহম্মদীর আর্তনাদ জাফরাগঞ্জের প্রাসাদের পাথরের দেওয়ালে দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে বারবার প্রতিধ্বনিত হয়। মনহুশ সে আওয়াজ গোঙানির মতো শোনায়। ঠিক এই সময় ঘণ্টা পিটিয়ে রাত চার প্রহরের সমাপ্তি ঘোষণা করে জাফরাগঞ্জ প্রাসাদের ঘড়িয়াল। ভোর হল বলে! মসজিদ থেকে ভেসে আসে ফজরের নামাজের আজান।

.

গতকাল সন্ধ্যায় হিরাঝিল থেকে জাফরাগঞ্জে ফিরে এসেই বেশ কয়েকজনকে ডেকে পাঠিয়েছিল মিরন। মহম্মদী বেগও নবাবজাদার ডাক পেয়ে উৎসাহে ছুটে গিয়েছিল।

জাফরাগঞ্জ প্যালেসের রংমহলে মিরনের মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়ায় সকলে। খানিক আগেই মুজরো সেরে বিদায় নিয়েছে বাইজি। ফরাসের উপর গিরদায় ভর দিয়ে কাত হয়ে শুয়েছিল মিরন। হাতে ধরা শরাবের পাত্র প্রায় শূন্য। তখনও গোটা রংমহলে ম-ম করছিল শরাব ও ভাজা মাংসের উগ্র গন্ধ। সেই গন্ধে মহম্মদীর দম যেন আটকে আসছিল।

কেন নবাবজাদার এই জরুরি তলব, কেউ জানে না। সকলেরই চোখে বিস্ময়ের ঘোর। সেই সঙ্গে ভয়, দহসত। কোনও কসুর হল কী?

মাথা ঝুঁকিয়ে নবাবজাদাকে তসলিম জানায় সকলে।

মহম্মদী বলে, ‘হুজুর সহি সালামত।’

মৃদু হেসে মিরন শুধোয়, ‘কেমন আছ মহম্মদী? খুশ তবিয়ত তো?’

‘জি হুজুর।’

মিরনের অদূরে ফরাসের উপর হাঁটু মুড়ে বসেছিল তার জিগরি দোস্ত চুনিলাল। তার হাতে চামড়ার একটা খেরিয়া। বেশ মোটা। খেরিয়াটা ইচ্ছে করেই দোলায় চুনিলাল। ঝনঝন শব্দে বেজে ওঠে একগাদা আশরফি।

মিরন বলে ওঠে, ‘হাজার আশরফি ইনাম।’

একজন চমকে উঠে বিস্ফারিত চোখে বলে ওঠে, ‘হা-জা-র আ-শ-র-ফি!’

মুচকি হেসে মিরন বলে, ‘নেহায়েত কম নয়। যে কাজটা হাসিল করতে পারবে, সে পাবে।’

একজন শুধোয়, ‘লেকিন হজরত কাম কী আছে?’

মিরন হেসে বলে, ‘ছোটি সি এক কাম। মেহনত জেয়াদা নেই। ইনাম জেয়াদা।’

সরু গোঁফের একপ্রান্ত হাত দিয়ে পাকাতে থাকে মিরন। মুখে খল হাসির রেশ। চুনিলাল ধুয়ো ধরে, ‘সহি বাত। ইনাম জেয়াদা। পরেশানি ভি নেই।’

অবাক হয় প্রায় সকলেই। কম মেহনতের কী এমন ছোট কাজ, যার জন্য হাজার আশরফি ইনাম ঘোষণা করছেন স্বয়ং নবাবজাদা?

‘হাসিল করতে পারবে কাজটা?’ এই বলে চোখ ঘুরিয়ে সকলের মুখগুলো ইয়াদদস্ত করতে থাকে মিরন।

মহম্মদী গুজারেশ করে, ‘আপনি হুকুম করুন হুজুর। এই বান্দা বেশক তামিল করবে।’

মিরন বলে, ‘বেশ। সিরাজদ্দৌলার গ্রেফতারির খবরটা শুনেছ?’

‘জি হুজুর।’ সকলে প্রায় একসঙ্গে বলে ওঠে।

চুনিলাল বলে, ‘সিরাজ এখন হুজুরের হেফাজতে। জিন্দানখানায় কয়েদ হয়ে আছে। এই হাভেলিতে। সব খন্নাসি খতম।’

মিরন বলে ওঠে, ‘সিরাজকে কোতল করতে হবে। এখনই। আজ রাতেই। এই হল কাজ।’

রংমহলে সহসা যেন বাজ পড়ল। স্তম্ভিত হয়ে গেল মহম্মদী বেগ সহ সকলে।

শরাবের পাত্রে রাখা তলানিটুকু গলায় ঢেলে মিরন বলে, ‘চ্যায়েন সে শোচো। হাজার আশরফি ইনাম। কোয়ি মামুলি তোফা নয়। সেই সঙ্গে নিজামতের নোকরি।’

আলিবর্দির দৌহিত্র, কয়েকদিন আগেও যিনি ছিলেন সুবে বাংলার নবাব, মনসুর-উল-মুলক—সিরাজদ্দৌলা-শাহকুলি খাঁ—মিরজা মহম্মদ—হায়বৎজঙ্গ বাহাদুর! তাঁকে কোতল করতে হবে? এখনই? মহম্মদী ছাড়া বাকি সকলেরই বুক কেঁপে ওঠে ভয়ে। বর্গির হাত থেকে মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষা করার জন্য আলিবর্দিকে এখনও পয়গম্বরের মতো শ্রদ্ধা করে মুর্শিদাবাদের হর আদমি। তাঁর দৌহিত্র, নবাব সিরাজদ্দৌলাকে হত্যা করলে মানুষের সব রোষ হয়তো এসে পড়বে ঘাতকের উপর। পথে বেরোলে ক্ষিপ্ত জনতা হয়তো প্রবল ঘৃণায় পাথর ছুড়ে মেরে ফেলবে। এই ভেবে নারাজ হল মহম্মদী ছাড়া আর সকলেই। ফিরে গেল তারা। জাফরাগঞ্জ থেকে বেরিয়ে এসে বুক ভরে শ্বাস নিয়ে বাঁচল।

শুধু মিরনের সামনে অটল হয়ে দাঁড়িয়ে রইল মহম্মদী বেগ। একেবারে নিশ্চুপ। ভাবলেশহীন মুখ। তার চোখের দৃষ্টি মিরনের মুখের উপরে স্থির হয়ে আছে। হা-জা-র আ-শ-র-ফি! সুখস্বপ্নে মহম্মদী তখন বিভোর। নিজের বিবি-বাচ্চার জন্য সুখ খরিদ করতে চায় সে। এমন মওকা আর আসবে কি?

চুনিলাল বলে, ‘সব বেওকুফের দল। বুজদিল কাঁহিকা। মোটা ইনাম হেলায় হারাল।’

‘তুমিও কী নারাজ মহম্মদী?’ হিমশীতল গলায় প্রশ্ন করে মিরন।

‘না হজরত। বান্দা আপনার হুকুম তামিল করবে।’

আনন্দে প্রায় লাফিয়ে উঠে সোজা হয়ে বসে মিরন বলে, ‘বহুত খুব। সহি আন্দাজ ছিল আমার। বলেছিলাম না চুনিলাল, আর সব লোক বেওকুফ হতে পারে, লেকিন মহম্মদী বেওকুফ নয় হুশিয়ার, আকলমন্দ আদমি।’

মহম্মদীর মুখচোখ পাথরের মতো শক্ত। তার মুখের দিকে চেয়ে মুখে খল একটা হাসির রেশ ঝুলিয়ে মিরন বলে, ‘পহেলে হাজার আশরফি ইনাম। বাদমে থোড়া আউর কুছ। ইয়ানে নিজামতের নোকরি। জিন্দেগির রং বদলে নাও মহম্মদী। হরপল মিশকিনের মতো দিন গুজার করবে কেন? কাজটা হাসিল করো। খুশনসিবির জলোয়ায় জিন্দেগি মালামাল হয়ে যাবে।’

ফরাস ছেড়ে উঠে এসে মহম্মদীর হাতে একটা খঞ্জর ধরিয়ে দেয় চুনিলাল।

মিরন প্রশ্ন করে, ‘কোই বরখেলাপ- গড়বড় হবে না তো?’

‘না হুজুর। বান্দা আপনাকে বেইজ্জত করবে না।’

‘ইয়ে বহুত খুশি কি বাত। এই বলে ডোরি টেনে ঘন্টি বাজায় মিরন। দু’জন দাখিলা এসে তসলিম জানায় তাকে। তাদের উদ্দেশে মিরন বলে, ‘মহম্মদীকে কয়েদখানায় নিয়ে যাও।’

চুনিলাল বলে, ‘তুরন্ত কাম হাসিল করা চাই। নবাবজাদা জানাজার আনজাম করে রেখেছেন।’

মিরন বলে ওঠে, ‘সিরাজের মুণ্ডুটা ধড় থেকে আলাদা করে দিও।’

মিরনকে তসলিম জানাতে জানাতে দরজার দিকে পিছিয়ে যায় মহম্মদী বেগ।

.

বাতাসে মিলিয়ে যায় আজানের সুর। ফজরের নামাজ শুরু হল।

হাঁটুর চোট সামলে উঠে দাঁড়ায় মহম্মদী। জীবনকে সম্ভোগ করতে চেয়েছিল সে। চেয়েছিল নিজের বিবি-বাচ্চাকে সুখে রাখতে। সিরাজকে কোতল করে সুখ খরিদ করতে।

হাজার আশরফি কম তো নয়। গোলাম-বাঁদি সহ একটা হাভেলির সংস্থান হয়ে যাবে। গোলাম এসে ফরসির নল ধরিয়ে দিয়ে যাবে হাতে—অম্বুরি তামাকের সুবাসে ম-ম করবে চারিদিক। নিজামতের নোকরি– বাঁধা মাসমাইনে সেই সঙ্গে উপরি আয়—রিসওয়াত। কারাগারে বন্দি অসহায় একটা মানুষকে খুন করা কীই বা এমন মুশকিলের কাজ? মওতই তো লেখা আছে সিরাজদ্দৌলার কিসমতে। তিনি কিছুতেই বাঁচতে পারেন না।

শাহি রিয়াসতে কুরসি বদল হলে পরাজিত নবাব-বাদশাকে কেউ জিন্দা ছাড়ে না। রেহাই পাননি মুর্শিদকুলির দৌহিত্র সরফরাজ খাঁ। রেহাই পাবে না সিরাজদ্দৌলাও। সে নারাজ হলে অন্য কেউ কোতল করবে সিরাজকে। সে তো নিমিত্তমাত্র। খুশনসিবি খরিদের এই মওকা হাতছাড়া করা মস্ত বেওকুফি হয়ে যাবে—এমনই ভেবেছিল মহম্মদী। চুনিলালের হাতে ধরা খেরিয়ার ভিতরে আশরফির ঝনঝন শব্দ মহম্মদীর কানে মশহুর এক নাচনেওয়ালির পায়ে বাঁধা নুপুরের শিরিন আওয়াজের মতো বাজছিল।

কিন্তু এখন সব গোলমাল হয়ে যাচ্ছে কেন? জশন নয়, জহমতে কেন ভরে উঠছে দিল? সুখ কিনতে এসে কেন এই পর্বতপ্রমাণ আফশোশ? মহম্মদী জানে না, মানুষের মনের গতি বড় বিচিত্র। তার সহি আন্দাজ পায় না কেউই।

মনের মধ্যে গড়ে তোলা স্বপ্নসৌধের মিনার থেকে কে যেন ধাক্কা মারল মহম্মদীকে। অতলে তলিয়ে যাচ্ছে সে। পাপবোধে তার অন্তর ক্ষতবিক্ষত। চোখের পর্দায় ভেসে উঠছে নবাব আলিবর্দি খাঁ ও বেগম শরফ উন্নেসার তসবির। তাঁরা যেন জবাব চাইছে মহম্মদীর কাছে—‘এ তুমি কী করলে মহম্মদী? আমরা তোমাকে পথ থেকে তুলে এনে প্রতিষ্ঠা দিলাম জীবনে, সেই তুমি খুন করলে আমাদের সিরাজকে? মাত্র হাজার আশরফির লোভে নিজের ইমানদারিকে কুরবানি দিলে তুমি? যে সুখ খরিদ করতে চেয়েছিলে, সেই সুখের নাগাল কি তুমি পাবে এই জীবনে?’

মহম্মদীর মনশ্চক্ষে ভেসে উঠছে আরও অনেক অনেক মুখ। তারা ক্ষিপ্ত। উত্তেজিত। মারমুখী। চেঁচিয়ে যেন বলছে, ‘মহম্মদী তুমি নিমকহারাম! তোমার ক্ষমা নেই।’

দু’হাতে নিজের মুখ ঢেকে মহম্মদী ফের চেচিয়ে ওঠে, ‘আস্তাগফেরুল্লাহ। খোদাতালা রহেম করুন আমাকে।’

এগিয়ে আসছে কয়েকজোড়া পায়ের শব্দ। থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে মহম্মদী। চোখে ভয়ার্ত দৃষ্টি।

মহম্মদীর মুখোমুখি এসে দাঁড়ায় মিরন। সঙ্গে চুনিলাল ও মুন্নিলাল। মিরনের কাঁধে বসে আছে তার পোষা বাজপাখি। মহম্মদীকে দেখে সজোরে হেসে উঠে মিরন বলে, ‘সাবাশ মহম্মদী। কাম হাসিল? তোমার এই কামালিয়তে খোদ নবাবজাদা আজ খুশি মানাবে।’

চুনিলাল ধুয়ো ধরে, ‘বান্দা বহুত জলদি হুকুম তামিল করেছে হুজুর।’

মুন্নিলাল হেসে বলে, ‘ইয়ে বান্দা কামিল–ই-ইনসান।’

মিরনের পায়ের সামনে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ে ডুকরে কেঁদে ওঠে মহম্মদী বেগ।

মিরন ভাবে মহম্মদীর এই কান্না কামেয়াবির খুশিতে। মহম্মদীর পিঠ চাপড়ে দিয়ে সে বলে, ‘সাবাশ বান্দা। তুজুক তোমাকে ইয়াদ রাখবে।’

তাজা রক্তের গন্ধ পেয়ে চঞ্চল হয়ে ওঠে মিরনের পোষা বাজপাখি। গায়ে হাত বুলিয়ে তাকে শান্ত করে মিরন।

‘আস্তাগফেরুল্লাহ।’ হঠাৎই মর্মন্তুদ আর্তনাদ করে ওঠে মহম্মদী। তারপর পাগলের মতো নিজের বুক চাপড়াতে থাকে।

উন্মাদের মতো মহম্মদী বেগের এই আচরণ দেখে অবাক হয় মিরন। চুনিলালের দিকে চেয়ে বলে, ‘আরে দোস্ত হুয়া কেয়া? অ্যায়সা কিউ কর রাহা হ্যায়?’

চুনিলাল মুচকি হেসে বলে, ‘লাগতা হ্যায়, হাজার আশরফির খোয়াবে দিমাগ বিগড়ে গেছে।’

‘জরুর মিলবে ইনাম। হাজার আশরফি।’ এই বলে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক গোলামের হাত থেকে চামড়ার খেরিয়া নিয়ে মহম্মদীর মুখের সামনে ঝাঁকায় মিরন। ঝনঝন শব্দে বাজে আশরফি।

মহম্মদী পাগলের মতো চিৎকার করে ওঠে, ‘না-না-না। আশরফি চাই না।’

‘নারাজ কেন? এ তো তোমার কামেয়াবির কিম্মত। হকের পাওনা।’

‘মাফ করুন হজরত। আমি নিমকহারাম। দোজখেও ঠাঁই হবে না আমার। এই বদিয়তির মাফ নেই। আলিবর্দির নিমক খেয়ে আমি বড় হয়েছি। সেই আমি কি না সিরাজদ্দৌলাকে কোতল করলাম! আমি বেইমান। নিমকহারাম।’

মিরনের চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে, মহম্মদীর চুলের মুঠি শক্ত করে চেপে ধরে বলে, ‘কী বললি বেতমিজ?’

বুক চাপড়ে মহম্মদী বলে, ‘হুজুর আমি নিমকহারাম। নিজের জন্য সুখ খরিদ করতে গিয়ে খুন করেছি সিরাজদ্দৌলাকে। বেইমানি করেছি আলিবর্দির খানদানের সঙ্গে। দোজখেও যে আমার ঠাঁই হবে না। আমার জন্য একটু দোয়া মাঙুন হুজুর।’

‘বেতমিজ কাঁহিকা! আলিবর্দিকা কুত্তা!’ এই বলে মহম্মদীকে প্রচণ্ড জোরে এক লাথি মারে মিরন। মহম্মদী মুখ থুবড়ে পড়ে। বয়ে যাওয়া রক্তস্রোতে মাখামাখি হয়ে যায়।

মুন্নিলাল বলে, ‘হারামি বলে কিনা দোজখেও ঠাই হবে না। আসলে বলতে চায় আপনারও দোজখে ঠাঁই হবে না হুজুর।’

পা দিয়ে মহম্মদীর গলাটা চেপে ধরে মিরন। মহম্মদী হতচকিত হয়ে যায়। একদলা থুতু মহম্মদীর দিকে ছুড়ে দিয়ে বলে, ‘ইবলিশের বাচ্চা! তোকে আজ দোজখেই পাঠাব।’

প্রাণভয়ে মহম্মদী বলে ওঠে, ‘রহেম করুন হুজুর। রহেম করুন।’

আসুরিক শক্তিতে পা দিয়ে মহম্মদীর গলায় চাপ দিতে থাকে মিরন। দম বন্ধ হয়ে আসে মহম্মদীর। চোখ দুটো ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চায়। জিভ বেরিয়ে আসে। থরথর করে কেঁপে ওঠে তার দেহ। খানিকবাদে নিথর হয়ে যায় ।

মহম্মদীর নিষ্প্রাণ দেহটাকে প্রবল আক্রোশে লাথি মারতে মারতে হাঁপিয়ে পড়ে মিরন। হাঁপাতে হাঁপাতে কপালের ঘাম মুছে বলে, ‘আলিবর্দি আর সিরাজের প্রতি হামদর্দি যে দেখাবে, তাকে এভাবেই জাহান্নমে পাঠাব চুনিলাল।’

চুনিলাল বলে, ‘হুজুরের তাগদ দেখে তাজ্জব বনে গেলাম।’

মুন্নিলাল বলে, ‘হাজার আশরফি বেঁচে গেল। বহুত ফূর্তি হবে।’

মিরন বলে, ‘জরুর হবে। তবে এখন বহুত কাম বাকি। মহম্মদীর দেহটা বস্তায় মুড়ে হাভেলির বাইরে নিয়ে গিয়ে কুয়োয় ফেলে দেওয়ার আনজাম করো মুন্নিলাল। হারামির জেবের ভিতরে শরাবের বোতল ঢুকিয়ে দাও। আমলোগের একিন হবে, শরাব পিয়ে বেএক্তিয়ার মহম্মদীর মওত হয়েছে কুয়োয় পড়ে।’

মিরনের হুকুম তামিলে ব্যস্ত হয়ে পড়ে মুন্নিলাল।

চুনিলালকে সঙ্গে নিয়ে মিরন এগিয়ে যায় সামনে। পাথুরে মেঝের উপর বুকে খঞ্জরবিদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে সিরাজের নিথর দেহ। মিরন ও চুনিলাল কারাকক্ষের দরজায় এসে দাঁড়ায়।

ভুরু কুঁচকে বিরক্তির সঙ্গে মিরন বলে, ‘বেতমিজ মহম্মদী কামচোর। বলেছিলাম মুণ্ডুটা ধড় থেকে আলগ করে দিতে। হুকুম তামিল করেনি।’

চুনিলাল বলে, ‘হুজুরের হুকুম তামিল না হলে সাজা পেতেই হবে। ঠিকই হয়েছে। ইবলিশের বাচ্চা জাহান্নমে গেছে।’

‘বাকি কাজ তোমাকে খতম করতে হবে চুনিলাল।’

‘জি হুজুর। ইয়ে তো বান্দার খুশনসিবি।’

কোমরবন্ধনী থেকে ঝুলতে থাকা চামড়ার খাপের ভিতর থেকে শমশের বের করে কারাকক্ষের ভিতরে প্রবেশ করে চুনিলাল। কোমরে হাত দিয়ে আয়েশ করে দরজার মুখে দাঁড়ায় মিরন। দ্বিখণ্ডিত হবে সিরাজের দেহ। এদৃশ্য প্রত্যক্ষ করে সে সুখদরিয়ায় ডুব দিতে চায়।

.

মোরাদবাগ প্যালেসের নৌকাঘাটে ছয়কোণা একটা বিরাট চওড়া রানার উপরে দাঁড়িয়ে রয়েছেন মেজর কিলপ্যাট্রিক। রানার পাথরে বাঁধানো দেওয়াল উঠেছে জলের ভিতর থেকে। অনেক নীচে পাথুরে দেওয়ালের গায়ে ছলাৎ ছলাৎ করে ধাক্কা খাচ্ছে ভাগীরথীর ঘোলাটে জলরাশি।

সারি সারি নৌকোর ভিড় ঘাটে। উপর থেকে সেগুলোকে সব যেন মোচার খোলার মতো দেখাচ্ছে। মৃদুমন্দ দুলছে জলের ঢেউয়ে। কিলপ্যাট্রিকের কানে ভেসে আসছে কুলি-মজুরদের কোলাহল। গত দু’দিন ধরে এই নৌকোঘাটে চলছে তুমুল ব্যস্ততা। শ’দুয়েক নৌকোয় চাপানো হচ্ছে, আশরফি, সিক্কা টাকার খেরিয়া, সেই সঙ্গে হরেক কিসিমের মাহেঙ্গা চিজ। চুক্তি অনুযায়ী মিরজাফর খাঁ মিটিয়ে দিয়েছেন ইংরেজদের প্রাপ্য প্রথম কিস্তি। পলাশির কিম্মত। সেসব নৌকায় তোলা হচ্ছে। দিন কয়েকের মধ্যেই নৌকোগুলো পাড়ি দেবে কলকাতার উদ্দেশে।

এই মাল বোঝাইয়ের কাজ তদারক করতে সাত সকালে ঘাটের রানায় এসে দাঁড়িয়েছেন কিলপ্যাট্রিক। ভোরের আলো এসে পড়েছে তার মুখে। সে আলোর রং কাঁচা সোনার মতো। আকাশ আজ বেশ পরিষ্কার। ঘন নীল আকাশের বুকে গুমরাহী রাহগিরের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে আষাঢ়ের ছেঁড়া ছেঁড়া ছাইরঙা মেঘ। ধারাবর্ষণের উমিদ তাতে নেই।

সকালের মিঠে আলো কিলপ্যাট্রিকের বেশ ভালো লাগছিল। তিনি ভাবছিলেন, আহা কী সুন্দর এই সুবে বাংলা। কত আলো, সবুজের কত সমারোহ। ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে বাইরের দিকে তাকালেই দিল খুশ হয়ে যায়। তার নিজের দেশে তো বছরের অনেকটা সময় মুখ ভার করে থাকে আকাশ। সকালে চোখ মেলে বাইরের দিকে তাকালেই মন খারাপ হয়ে যায়।

বছর খানেক আগে মাদ্রাজ থেকে বাংলায় আসার কথা শুনে বিরক্ত লেগেছিল মেজর কিলপ্যাট্রিকের। মন চাইছিল না আসতে। তিনি শুনেছিলেন, বাংলা হল স্যাঁতসেঁতে বিচ্ছিরি এক জায়গা। সেখানকার এক জ্বর খুবই কুখ্যাত। মানুষের জীবন কেড়ে নেয়। কিন্তু একজন ফৌজির জীবনে নিজের ইচ্ছা-অনিচ্ছা বলে তো কিছু থাকে না, শুধু উপরওয়ালাদের হুকুম তামিল করতে হয়। তাই কিলপ্যাট্রিককেও আসতে হয়েছিল বাংলায়। আড়াইশো ফৌজিকে সঙ্গে নিয়ে মাদ্রাজ থেকে ফলতার উদ্বাস্তু শিবিরে এসে তিনি পৌঁছেছিলেন। সে ছিল ইংরেজদের কাছে ঘোর দুঃসময়।

তারপর কেটে গেল একটা বছর। বাংলায় ইংরেজরা এখন সুপ্রতিষ্ঠিত। এখন তাদের সুখের সময়। বাংলায় আসার জন্য কিলপ্যাট্রিকের মনে এখন অবশ্য কোনও খেদ নেই। বরং বাংলায় না এলে অনেক পার্থিব সুখ থেকে তিনি বঞ্চিত হতেন। ভাগ্যিস এসেছিলেন—আজ এমনই মনে হচ্ছে মেজরসাহেবের।

ইংরেজ মেজর, ক্যাপটেনদের খুশি করতে শুধু তো তাদের পায়ে আশরফি, সিক্কা টাকা আর হরেক মাহেঙ্গা চিজ উজাড় করে দেননি মিরজাফর। দিয়েছেন বাড়তি আরও কিছু। রতিসুখের সন্ধান। সিরাজদ্দৌলার হারেম থেকে বাছাই করে খুব সুরত জেনানাদের তুলে দিয়েছেন ইংরেজ সাহেবদের হাতে। গতকাল সারারাত ভাগীরথীর বুকে বজরায় সিরাজেরই এক পিয়ারিকে নিয়ে ফূর্তি করেছেন কিলপ্যাট্রিক। অনেকদিন পর নারী শরীরের গন্ধে, স্পর্শে মাতাল হয়ে গিয়েছিলেন মেজরসাহেব।

রানার উপরে দাঁড়িয়ে কিলপ্যাট্রিক দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন দূরে। নদীর ওপারে গাছপালার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিচ্ছে জাফরাগঞ্জ প্যালেস। ওদিক থেকে ভেসে আসছে ঢাক, ঢোল, কাড়া-নাকাড়ার শব্দ। গ্রেফতার হয়েছেন সিরাজদ্দৌলা। নিশ্চয়ই খুশি মানাচ্ছে জাফরাগঞ্জ।

হঠাৎ কিলপ্যাট্রিকের নজরে পড়ল, যাত্রী বোঝাই অনেকগুলো দিশি নৌকো এপারের বিভিন্ন জায়গা থেকে ছুটে যাচ্ছে নিজামত কেল্লার পাশের নৌকোঘাটের দিকে। এত লোক এই সাতসকালে চলেছে কোথায়? খটকা লাগে কিলপ্যাট্রিকের মনে। এমন দৃশ্য তো আগের কয়েকদিনে তাঁর চোখে পড়েনি। খুব দ্রুত দাঁড় বাইছে মাঝিরা। অগুনতি নৌকো। সবই যাত্রীতে বোঝাই। আজ নেটিভদের কোনও পরব আছে নাকি?

মোরাদবাগ প্যালেসের ঘাটের দিকে দ্রুত এগিয়ে আসছে একটা বজরা। তার মাথায় উড়ছে কোম্পানির নিশান।

দূরবীনে চোখ রাখলেন মেজর সাহেব। দেখলেন, পাটাতনের উপরে দাঁড়িয়ে আছেন ওয়ারেন হেস্টিংস ও লাশিংটন। দু’জনেরই মুখ থমথমে ও গম্ভীর।

ঘাটে এসে ভিড়ল বজরা। কাঠের পাটাতন বেয়ে দ্রুত নেমে এলেন হেস্টিংস ও লাশিংটন। দু’জনেই দেখতে পেয়েছেন কিলপ্যাট্রিককে। মেজর সাহেব হাত নাড়েন তাদের উদ্দেশে। খুবই দ্রুততার সঙ্গে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগলেন ওয়ারেন হেস্টিংস ও লাশিংটন।

কিলপ্যাট্রিকের কপালে ভাঁজ পড়ল। ঘাটের রানা থেকে তিনি তড়িঘড়ি নেমে আসতে লাগলেন নীচের দিকে। কোনও একটা গোলমালের গন্ধ পাচ্ছেন অভিজ্ঞ মেজর সাহেব।

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *