1 of 2

পলাশির পরে – ১১

১১

অশান্তির মেঘ জমছে উমিচাঁদের মনে। হিসেবে সব কেমন যেন গরমিল হয়ে যাচ্ছে। বেশ বুঝতে পারছেন, পলাশি-উত্তর পরিস্থিতিতে ধীরে ধীরে কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন তিনি। পলাশির ষড়যন্ত্রে মদতদারির তোফা হিসেবে প্রাপ্য টাকার দর কষাকষি করতে গিয়ে ইংরেজদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের তাল কেটেছে। নতুন নবাব মিরজাফরের সঙ্গে দোস্তিও তেমন নেই। সব মিলিয়ে উমিচাঁদ নয়া জমানায় বেশ বেকায়দায় পড়েছেন।

একদিকে নবাব সিরাজদ্দৌলা, আরেকদিকে ইংরেজ—একসময়ে যুযুধান দু’পক্ষকেই ইচ্ছে মতো নাচিয়েছেন উমিচাঁদ। ইংরেজদের কথা নবাবের কানে, নবাবের কথা ইংরেজদের কানে তুলে দু’দিক থেকেই ফায়দা লুটেছেন। কিন্তু চিরকাল কি সবার একইরকম যায়? রাজনীতি, কূটনীতির পথ বড় পিচ্ছিল। এখানে ধুরন্ধর মানুষও মাঝে মধ্যে পিছলে পড়েন। উমিচাঁদের হয়েছে সেই দশা।

পলাশির ষড়যন্ত্র রূপায়ণের চাবিকাঠি নিজের হাতে রাখতে চেয়েছিলেন উমিচাঁদ। তাঁর তাঁবেদার, দু’হাজারি মনসবদার ইয়ারলতিফ খানকে সিরাজের পরিবর্তে মসনদে বসানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কর্নেল ক্লাইভ সেই প্রস্তাব খারিজ করে দেওয়ার পর থেকে দরবার রাজনীতিতে উমিচাঁদ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েন।

পলাশির ষড়যন্ত্রটা চূড়ান্ত রূপ পায় উমিচাঁদের অগোচরে। তিনি সব কিছু যখন জানলেন, তখন মিরজাফরের সঙ্গে ইংরেজদের আলোচনা চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছে। শুধু টাকাকড়ির লেনদেন সংক্রান্ত চুক্তিপত্রটা সই হতে বাকি। ভয়ানক দুশ্চিন্তায় পড়েছিলেন উমিচাঁদ। টাকাকড়ির ভাগ-বাটোয়ারা থেকে তিনি না শেষে বাদ পড়ে যান।

উমিচাঁদ তো বেওকুফ নন, তাই তিনি আগেভাগেই মিরজাফরের কাছ থেকে ইংরেজদের প্রাপ্য টাকার উপর পাঁচ শতাংশ দাবি করে বসেন।

এই থেকে ইংরেজদের সঙ্গে উমিচাঁদের মন কষাকষির শুরু। ইংরেজদের মনে হয় ধূর্ত এই বণিকের লোভ বড্ড বেশি। তিনি আকাশের চাঁদ ধরতে চাইছেন। মনে মনে বিরক্ত হলেও নিজেদের মনের ভাব গোপন রাখে ইংরেজরা। উমিচাঁদকে বশে রাখতে তার দাবি মেনে নিয়ে তারা লাল কাগজে একটা চুক্তি সম্পাদন করে। তার পাওনা বিশ লাখ টাকা—একথা লিপিবদ্ধ হয় চুক্তিতে। উমিচাঁদ খুশি হন।

তবুও উমিচাঁদকে বিশ্বাস করেনি ইংরেজরা। যদি তিনি ষড়যন্ত্রের কথা সিরাজদ্দৌলার কাছে ফাঁস করে দেন, তাহলে ইংরেজদের সমস্ত পরিকল্পনা মাঠে মারা যাবে, এই ভয়ে পলাশির যুদ্ধের আগে তাঁকে মুর্শিদাবাদ থেকে দূরে রাখতে ইংরেজরা সচেষ্ট হয়। লিউক স্ক্র্যাফটন উমিচাঁদকে ভুলিয়ে কলকাতা নিয়ে আসেন।

ইংরেজদের এই পরিকল্পনা পরে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল উমিচাঁদের কাছে। কিন্তু তখন তিনি ইংরেজ শিবিরে নজরবন্দি।

ইংরেজরা তাঁকে এখন আর বিশ্বাস করছে না টের পেরে উমিচাঁদ বড়ই ভাবনায় পড়েছেন। উমিচাঁদ জানেন যে ইংরেজরা মিরজাফরের সঙ্গে সাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী নিজেদের প্রাপ্য টাকা আদায় করে ছাড়বে। ভালোয় ভালোয় আদায় না হলে, মিরজাফরকে ধমকে চমকে ঠিক আদায় করে নেবে। কিন্তু যে টাকা ইংরেজরা তাকে দেবে বলে কবুল করেছে তা তিনি পাবেন তো? যদি তা না হয়, তিনি তো আর ধমকে চমকে ইংরেজদের কাছ থেকে নিজের প্রাপ্য আদায় করতে পারবেন না। কী হবে তখন? হকের পাওনা ফসকে যাবে?

তবে এখনও ইংরেজরা তাঁর প্রাপ্য টাকা দিতে অস্বীকার করেনি। এই যা আশার কথা। কিন্তু এই আশার আড়ালে হতাশার সুরটিও প্রচ্ছন্ন রয়েছে। পলাশির যুদ্ধ হয়ে মিটে গেল। সিরাজদ্দৌলা পলাতক। মসনদে বসেছেন মিরজাফর। উমিচাঁদের পাওনা নিয়ে ইংরেজরা মুখে রা কাড়ছে না কেন? নিজের পাওনার বিষয়টা ঝালিয়ে নিতে কর্নেল ক্লাইভের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চেয়েছিলেন উমিচাঁদ। দু-দু’বার কোশিশ করেও ক্লাইভের সঙ্গে দেখা করার অনুমতি পাননি। তাকে হাঁকিয়ে দিয়েছেন ক্লাইভের সেক্রেটারি ওয়ালশ সাহেব। ক্লাইভ তাঁর বিষয়ে এখন এত উদাসীন কেন? তাহলে কি তিনি যা আশঙ্কা করছেন সেটাই সত্যি হবে? নাঃ! সব মিলিয়ে উমিচাঁদ মোটেই স্বস্তিতে নেই।

অভিজ্ঞ উমিচাঁদ বুঝতে পারছেন, পলাশির যুদ্ধ বাংলার রাজনীতির সমীকরণ বদলে দিয়েছে। আগে নবাব ছিলেন শক্তিশালী। এখন শক্তিশালী ইংরেজরা। মিরজাফর খাঁ ইংরেজদের হাতের পুতুল। কর্নেল ক্লাইভের ভয়ে তিনি তটস্থ। ক্লাইভই এখন সুবে বাংলার ভাগ্যনিয়ন্ত্রক। তিনি যা চাইবেন তাই হবে। তাঁর ইচ্ছেই এখন শেষ কথা।

আলিবর্দি খাঁ বা সিরাজদ্দৌলার জমানা হলে চুক্তির টাকা অনাদায়ী হলে নবাবের কাছে গিয়ে ইংরেজদের নামে নালিশ ঠুকতে পারতেন উমিচাঁদ। এখন ক্লাইভ যদি তাঁর প্রাপ্য দিতে না চান, তাহলে কার কাছে গিয়ে উমিচাঁদ ক্লাইভের নামে শিকায়ত করবেন?

পালকিতে বসে ফের একবার লাল কাগজের চুক্তিতে লেখা শর্তগুলো চোখের সামনে ভাসিয়ে তোলার কোশিশ করতে লাগলেন উমিচাঁদ। স্পষ্ট যেন দেখতে পাচ্ছেন অক্ষরগুলো। তাঁর প্রাপ্য বিশ লাখ টাকা। লাল কাগজের উপর কালো কালিতে লেখা ছিল। শর্তগুলোর নীচে ক্লাইভের উজ্বল সইটাও বেশ স্পষ্ট বলে প্রতিভাত হল তাঁর মানসচক্ষে।

বড্ড কি নেতিবাচক ভাবনা ভাবছেন না তিনি? ইংরেজরা যে তাঁকে তাঁর প্রাপ্য দিতে ইনকার করবে তা কেন মনে করছেন তিনি? আগে তো কখনও ইংরেজরা কথার খেলাপ করেনি।

তবুও উমিচাঁদের মন মানে না। কিন্তু কেন তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন না ক্লাইভ? উমিচাঁদ মনকে বোঝান, হয়তো যুদ্ধের ধকলে বড্ড ক্লান্ত ছিলেন কর্নেল। তাই সাক্ষাৎ করতে চাননি। ইংরেজরা ইমানদার জাত। আর যাই হোক, চুক্তি খেলাপ করে তাঁকে ধোঁকা দেবে না নিশ্চয়ই।

মনে মনে হাসলেন উমিচাঁদ। বয়স তো তার কম হয়নি। পঞ্চাশ পেরিয়ে গিয়েছেন। পাক ধরেছে চুলে। বয়স হলে মানুষ বোধ হয় বেশি ভাবে। যেয়াদা দুশ্চিন্তা করে। ফালতু ভাবনায় জেরবার হয়।

পালকি এসে থামল জগৎশেঠের হাভেলির দেউড়িতে। থলথলে শরীরটাকে বাঁকিয়েচুরিয়ে পালকি থেকে বেরিয়ে এলেন উমিচাঁদ। মোটা শরীর নিয়ে পালকির মধ্যে ভাঁজ হয়ে বসে থাকা বেশ কষ্টকর।

উমিচাঁদকে দেখে এগিয়ে এলেন জগৎশেঠের দেওয়ান রণজিৎ রায়। উচ্ছ্বসিত গলায় তিনি বলে উঠলেন, ‘সুস্বাগতম উমিচাঁদজি। আসুন। আসুন।’

জগৎশেঠের দেওয়ান, ক্ষুরধার বুদ্ধিসম্পন্ন এই রণজিৎ রায় লোকটিকে মোটেই পছন্দ করেন না উমিচাঁদ। আজ তিনি যে খানিকটা বেকায়দায় পড়েছেন তার জন্যে এই লোকটির অবদান কম নয়। ১৭৫৬ সালের জুন মাসে সিরাজদ্দৌলা যখন কলকাতা তছনছ করে দিলেন, তখন আসরে নেমে মধ্যস্থতা করে নবাবের সঙ্গে ইংরেজদের ঝামেলাটা মিটিয়ে দিয়ে উমিচাঁদ নাম কিনেছিলেন।

কয়েক মাস পরে ১৭৫৭ সালের গোড়ায় কলকাতার হালসিবাগানে নবাবের সঙ্গে ইংরেজদের লড়াইয়ের পর ফের দু’পক্ষের ঝামেলাটা মেটানোর কৃতিত্ব নিতে চেয়েছিলেন উমিচাঁদ। কিন্তু রণজিৎ রায়ের কূট চালে সব ভেস্তে গেল। উমিচাঁদকে ছেড়ে জগৎশেঠকে মুরুব্বি ঠাওরালেন কর্নেল ক্লাইভ। আসরে নেমে বাজিমাত করে বেরিয়ে গেলেন জগৎশেঠ। ইংরেজদের অনুকূলে আলিনগরের সুলেনামা সাক্ষরিত হওয়ার মূল কৃতিত্ব জগৎশেঠেরই। এরপর পলাশির ষড়যন্ত্রের রূপরেখা চূড়ান্ত করতে জগৎশেঠের উপরেই বেশি ভরসা করল ইংরেজরা। উমিচাঁদ পিছিয়ে পড়লেন।

যাই হোক মুখে একটি যান্ত্রিক হাসি ঝুলিয়ে উমিচাঁদ বললেন, ‘হে হে রায়মোশায়! খুশ তবিয়ত আছেন তো?’

‘ওই একরকম আছি। কিন্তু আপনার কী ব্যাপার বলুন তো? অনেকদিন দেখাসাক্ষাৎ নেই। হাওয়া হয়ে গিয়েছিলেন কোথায়?’

‘কলকাতায় গিয়েছিলাম।’ দায়সারা ভাবে জবাব দিলেন উমিচাঁদ।

রসিকতা করে রণজিৎ রায় বললেন, ‘সে কী? এদিকে ইনকিলাব ঘটে গেল। নয়া জমানার শুরুয়াত হল, কত কী ঘটে যাচ্ছে রাজধানীতে, আপনি কলকাতায় পড়ে রইলেন?’

মুখে খানিকটা গাম্ভীর্য এনে উমিচাঁদ বললেন, ‘ইংরেজদের সঙ্গে কিছু বোঝাপড়ার বিষয় ছিল। তবে কলকাতা থেকে ফিরেছি যুদ্ধের আগেই। ইংরেজদের ছাউনিতে ছিলাম।’

হাসলেন রণজিৎ রায়। ‘তাই বলুন। এদিকে উমিচাঁদজি গেলেন কোথায় ভেবে ভেবে আমি হয়রান। আমারই আহাম্মকি মশাই। আগেই বোঝা উচিত ছিল, আপনি পাকা মাথার মানুষ। এখন তো কর্নেল ক্লাইভই হর্তাকর্তা, আর আপনি আগেভাগেই ইংরেজ ছাউনিতে বসে থেকে কর্নেলের সঙ্গে সম্পর্কটা ঝালিয়ে নিলেন। নয়া জমানায় বিপদে আপদে আমাদের একটু দেখবেন মশাই।’

মোরাম বিছানো পথ ধরে সদর দেউড়ি থেকে জগৎশেঠের হাভেলির দরবার ঘরের দিকে আসতে আসতে কথা হচ্ছিল উমিচাঁদ ও রণজিৎ রায়ের। দরবার ঘরের বাইরে মজুত প্রচুর গোরা পল্টন। হাতে সঙিন।

আজ জগৎশেঠের বাটিতে পাওনাগন্ডা নিয়ে ইংরেজদের সঙ্গে নবাব মিরজাফরের চূড়ান্ত ফয়সালা হওয়ার কথা। সে বৈঠকে উমিচাঁদ অবশ্য আমন্ত্রিত নন। তিনি এসেছেন নিজের তাগিদে। আজ যে ভাবেই হোক কর্নেলকে ধরে নিজের পাওনার বিষয়টা বুঝে নিতে।

রণজিৎ রায়ের কথার আড়ালে ঠাট্টার সুরটা উমিচাঁদের পছন্দ হচ্ছে না। প্রসঙ্গ পালটানোর জন্য তিনি শুধোলেন, ‘কর্নেল ক্লাইভ এসে পড়েছেন বুঝি?’

‘হুঁ। ভিতরে দরবার চলছে।’

‘আপনি বাইরে যে?’

‘নবাবের সঙ্গে ইংরেজদের বোঝাপড়া। এ মামলার ভিতরে আমি থেকে কী করব বলুন? আমি সামান্য মানুষ।’

রসিকতার ঢঙে উমিচাঁদ এবারে বললেন, ‘কে বলে আপনি সামান্য? জগৎশেঠজির কুদরতির পিছনে আপনার মদত কি কম?’

রণজিৎ রায় হেসে বলেন, ‘আরে এ কী কথা বলছেন? পাঁচজনে শুনে ফেললে আমার নোকরি যাবে। জগৎশেঠজি আমার মনিব।’

‘নোকরি গেলেই বা ক্ষতি কি? আপনার মতো লোকের কি নোকরির অভাব হবে?’

রণজিৎ রায় জিভ কেটে বললেন, ‘দিব্যি সুখে আছি। জগৎশেঠজি তো কোনও অভাব রাখেননি আমার। খামোখা নোকরিটা খোয়াতে যাব কেন বলতে পারেন?’

‘আজ কিন্তু আমার একটা উপকার করতে হবে রায়মোশায়।’

‘ফরমায়েশ করুন। আপনার সেবায় বান্দা হাজির।’

‘দরবারের পর কর্নেলের সঙ্গে কিন্তু একবার মোলাকাত করিয়ে দিতে হবে।’

‘সে হবেখন। এখন ভিতরে চলুন তো। আয়েশ করুন। পান-শরবত-মিঠাই খান।’

রণজিৎ রায়ের নির্দেশে দুজন খিদমতদার এসে উমিচাঁদকে ভিতরে নিয়ে যায়।

.

রুদ্ধদ্বার বৈঠক চলছে জগৎশেঠের দরবার ঘরে। বড় একটা শ্বেতপাথরের টেবিলের একদিকে বসে রয়েছেন ক্লাইভ, স্ক্র্যাফটন, ওয়াটস, ওয়ালস, আয়ারকুট, কিলপ্যাট্রিক, ওয়ারেন হেস্টিংস প্রমুখ। আরেকদিকে মিরজাফর, জগৎশেঠ মহাতপচাঁদ, রায়দুর্লভ ও মিরন।

টেবিলের উপরে পরিবেশন করা আছে নানারকম সুখাদ্য। সেসবে ইংরেজদের রুচি নেই। ক্লাইভের মুখটা থমথমে। মুখ দেখে মনে হচ্ছে তিনি বেশ বিরক্ত। উলটো দিক থেকে বারবার ক্লাইভের মুখের দিকে তাকিয়ে ক্লাইভের মেজাজটা জরিপ করার চেষ্টা করছেন মিরজাফর। নবাবের পক্ষ নিয়ে ইংরেজদের সঙ্গে কথা চালাচালি করছেন জগৎশেঠ।

ক্লাইভ গম্ভীর গলায় বললেন, ‘এমন তো কথা ছিল না।’

মহাতপচাঁদ বললেন, ‘সে কথা আমরা মানছি জনাব। তোশাখানা তো আপনার সমুখেই খোলা হয়েছে। সবই তো আপনি নিজের চোখেই দেখেছেন।’

ক্লাইভ চোখদুটো টেবিলের উপর রেখে, ভুর কুঁচকে ধোঁয়া টানতে লাগলেন।

নিঃশব্দতা ভেঙে জগৎশেঠ বলে ওঠেন, ‘আমি যা গুজারেশ করেছি ওটাই সহি তরিকা। আপাতত নবাব আপনাদের দাবির অর্ধেক মিটিয়ে দেবেন। এর দুইয়ের তিন ভাগ টাকায়। বাকিটা হিরে, জহরত আউর বহুত কিমতি সামানো কে সাথ। আপনাদের পাওনা বাকি অর্ধেক টাকা তিন কিস্তিতে তিন সালের মধ্যে নবাব মিটিয়ে দেবেন।’

গুম মেরে বসে রইলেন ক্লাইভ। থমথম করছে গোটা ঘর।

ক্লাইভকে নিশ্চুপ দেখে মরিয়া গলায় মিরজাফর বলে উঠলেন, ‘এই বাত আপনি মেনে নিন জনাব। পুরোনো নবাবের আমল থেকে ফৌজিদের বেতন বাবদ অনেক টাকা বকেয়া পড়ে আছে। তাদের দাবিও মেটাতে হবে।’

ক্লাইভ নির্বোধ নন। মুর্শিদাবাদের হাঁড়ির হাল এই ক’দিনে বুঝে নিয়েছেন। সত্যিই নবাবকে কোতল করে ফেলার হুমকি দিলেও সব দিক বাঁচিয়ে ইংরেজদের দাবি এক ধাক্কায় মিটিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা তাঁর নেই। তা ছাড়া ক্লাইভ আশাও করেননি যে মাত্র তিন বছরের মধ্যে ইংরেজদের দাবি মতো সব টাকা মিটিয়ে দিতে রাজি হবেন মিরজাফর। তবুও ক্লাইভের মুখ গোমড়া। মুখে অখুশির ভাব। ডিপ্লোম্যাসিতে চোস্ত ক্লাইভ জানেন কী করে চাপ তৈরি করতে হয়।

মিরজাফর ফের বললেন, ‘আল্লার কসম খেয়ে বলছি শেঠজি যা ওয়াদা করলেন তা আমরা ইস্তেমাল করব।’

ক্লাইভের উদ্দেশে জগৎশেঠ বললেন, ‘দিল্লির বাদশার কাছে দরবার করে আপনাদের নামে নতুন পরোয়ানা আমি আনিয়ে দেব, যাতে অন্যান্য সওদাগরদের তুলনায় আপনাদের কম শুল্ক দিতে হয়।’

গম্ভীর মুখে ক্লাইভ বললেন, ‘ওকে। অলরাইট। আই অ্যাকসেপ্ট ইওর প্রোপোসাল।’

ক্লাইভের এই কথায় দরবারের গুমোট ভাবটা কেটে গেল। হাসি ফুটল মিরজাফরের মুখে।

এমন সময় রণজিৎ রায় দরবার ঘরে প্রবেশ করে জগৎশেঠের পাশে গিয়ে কিছু একটা বললেন। জগৎশেঠের মুখে ফুটে উঠল বিরক্তি। মনের ভাব দমন করে ক্লাইভের উদ্দেশে জগৎশেঠ বললেন, ‘জনাব উমিচাঁদজি একবার আপনার সাক্ষাৎ চাইছে।’

ক্লাইভের গোমড়া মুখে এবার হাসি ফুটল। বললেন, ‘উমিচাঁদ! দ্য ক্লেভার ফক্স!’

‘ইন্তেজার করতে বলব?’

‘নো নো। আওয়ার মিটিং ইজ ওভার। প্লিজ কল হিম।’

রণজিৎ রায় চলে গেলেন। খানিকবাদে হাসি হাসি মুখ করে ঘরে ঢুকলেন উমিচাঁদ। জোড়হাত হয়ে ক্লাইভের দিকে এগিয়ে এসে বললেন, ‘অনওয়াক্তে এসে পড়লাম বোধহয়।’

ক্লাইভ হেসে বললেন, ‘ইটস ওকে। মিটিং ইস ওভার। হাউ আর ইউ মি. উমিচাঁদ?’

উমিচাঁদ খোশামুদে হাসি হেসে বললেন, ‘হে-হে আপনার ফয়েজে খুশ তবিয়ত আছি।’

‘প্লিজ সিট।’ অদূরে একটা কুরসিতে উমিচাঁদকে বসতে বললেন ক্লাইভ। তারপর বললেন, ‘ফরমাইয়ে। আপনার তকলিফ কী আছে?’

‘হে-হে। তকলিফ আর আমার কোথায়? তকলিফ হল তো আপনাদের। এত বড় একটা লড়াইয়ের ধকল গেল!’

মুখে মৃদু হাসি ঝুলিয়ে একদৃষ্টে উমিচাঁদের দিকে চেয়ে রইলেন ক্লাইভ।

খানিকটা ইতস্তত করে উমিচাঁদ বললেন, ‘আমার পাওনার ব্যাপারটা যদি একটু তাড়াতাড়ি!’

ভারি অবাক হওয়ার মতো মুখচোখ করে ক্লাইভ শুধোলেন, ‘কিসের পাওনা?’

‘বিশ লাখ রুপেয়া। আপনাদের সঙ্গে চুক্তি হয়েছিল।’

‘ও মাই গড! বিশ লাখ? কিন্তু আমি তো এ ব্যাপারে কিছু জানি না। ফর হোয়াট সেক ইউ আর ডিমান্ডিং টুয়েন্টি লাখস?’

উত্তেজিত হয়ে উমিচাঁদ বলেন, ‘লাল কাগজের চুক্তি।’

‘লাল কাগজ?’ আরও অবাক হওয়ার ভান করেন ক্লাইভ।

উমিচাঁদ ব্যস্ত হয়ে বলে ওঠেন, ‘পলাশির যুদ্ধের পর কে কত তোফা পাবে সে সব কথা লেখা ছিল ওই চুক্তিতে। আমার নামে লেখা ছিল বিশ লাখ টাকা। আমি নিজের চোখে দেখেছি। শর্তগুলোর নীচে আপনার দস্তখত ছিল। স্ক্র্যাফটন সাহেব আমাকে দেখিয়েছিলেন।’

ভারি আশ্চর্য হওয়ার অভিনয় করে স্ক্র্যাফটনের দিকে তাকালেন ক্লাইভ।

স্ক্র্যাফটন বললেন, ‘আই কান্ট আন্ডারস্ট্যান্ড এনিথিং।’

উমিচাঁদ ফোঁস করে উঠলেন। ‘নোটঙ্কি মাত করুন স্ক্র্যাফটন সাহেব। আমি বেওকুফ নই।’

ক্লাইভ শান্ত গলায় বললেন, ‘মি. উমিচাঁদ। আমার মনে হচ্ছে কোথাও ভুল হচ্ছে আপনার।’

‘আমি বিলকুল ঠিক বলছি জনাব।’ উমিচাঁদ বেশ জোরেই বলে উঠলেন কথাটা।

ক্লাইভ শান্ত গলায় বললেন, ‘লেকিন আমি তো একটাই এগ্রিমেন্টের কথা জানি। লড়াইয়ের আগে তাতে দস্তখত করেছিলেন নবাব মিরজাফর খাঁ।’

উত্তেজনায় কুরসি ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে উমিচাঁদ বললেন, ‘হাঁ হাঁ হাঁ! আমি ওই কথাই বলছি।’

ক্লাইভ এবার হুকুমের সুরে বললেন, ‘মি. স্ক্র্যাফটন।’

‘ইয়েস স্যার।’

‘কাগজটা বের করো। প্লিজ শো হিম দ্য ট্রিটি ইনফ্রন্ট অফ এভরিবডি।’

স্ক্র্যাফটন একটা গোটানো শাদা কাগজ টানটান করে টেবিলের উপর মেলে ধরলেন।

উমিচাঁদ ঝুঁকে পড়ে বললেন, ‘এ কী? এ তো শাদা কাগজ!’

ওয়াটস বলে ওঠেন, ‘এটাই তো অরিজিনাল ট্রিটি। আমাদের কথায় আপনার যদি একিন না হয় তো নবাব মিরজাফর খাঁ, জগৎশেঠজিকে জিজ্ঞেস করুন।’

জগৎশেঠ বলে ওঠেন, ‘আপনার দিমাগ ঠিক আছে তো উমিচাঁদজি? একটাই তো চুক্তি হয়েছিল। সকলের সাক্ষরও রয়েছে এতে। লাল কাগজ আপনি কোথায় পেলেন?’

উমিচাঁদ হতভম্ব।

স্ক্র্যাফটনের উদ্দেশে হুকুমের সুরে ক্লাইভ বললেন, ‘প্লিজ রিড আউট দ্য কন্ডিশনস স্পেসিফায়েড ইন দ্য ট্রিটি।’

স্ক্র্যাফটন উঠে দাঁড়িয়ে চুক্তির শর্তগুলো পরপর পড়ে গেলেন। গোটা চুক্তিতে উমিচাঁদের নামের কোনও উল্লেখই নেই। তার বিশ লাখ টাকা পাওনার কথা লিপিবদ্ধ থাকা তো অলীক কল্পনা।

পাইপটা ঠোঁটের ফাকে গুঁজে ক্লাইভ বললেন, ‘এবারে আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন যে ইওর ডিম্যান্ড ইজ ফিকটিশাস।’

উত্তেজনায় দরবারের আদব-কায়দা ভুলে, নবাবের উপস্থিতিকে উপেক্ষা করে উমিচাঁদ চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘ইয়ে ঝুটা কাগজ। জাল দলিল। লাল কাগজটা কোথায়? লাল কাগজ? লাল কাগ…’ কথা শেষ করতে পারলেন না উমিচাঁদ। জ্ঞান হারিয়ে টলে পড়ে যাচ্ছিলেন। তাকে জাপটে ধরে ফেললেন স্ক্র্যাফটন।

ধূর্ত উমিচাদকে ঠকানোর জন্য যে পরিকল্পনা করেছিলেন ক্লাইভ, তা সফল ভাবে রূপায়িত হল। পলাশির যুদ্ধের আগে নিজের পাওনা নিয়ে ইংরেজদের সঙ্গে দরকষাকষি করতে গিয়েছিলেন উমিচাঁদ। দাবিমতো পাওনা না পেলে নবাব সিরাজদ্দৌলার কাছে ষড়যন্ত্রের কথা ফাঁস করে দেবেন বলে ইংরেজদের প্রচ্ছন্ন হুমকিও দিয়েছিলেন।

উমিচাঁদের এই আচরণে খুব বিরক্ত হয়েছিলেন ক্লাইভ। তবে তখন উমিচাঁদকে গুড হিউমারে রাখতে একটা মোক্ষম চাল চেলেছিলেন তিনি। দু’টি চুক্তি তৈরি হয়েছিল। একটা লাল কাগজে আরেকটা শাদা কাগজে। লাল কাগজের চুক্তিটা জাল। তাতে উমিচাঁদের কথা মতো তাঁর বিশ লাখ টাকা পাওনার কথা লেখা ছিল। শাদা কাগজে লেখা চুক্তিতে উমিচাঁদের কোনও উল্লেখই ছিল না। উমিচাঁদকে বাগে রাখতে ক্লাইভের পরিকল্পনা মতো দুটি কাগজেই সই করেছিলেন মিরজাফর, রায়দুর্লভ, জগৎশেঠ ও ক্লাইভ। ওয়াটসন জাল কাগজে সই করতে চাননি। ওতে ওয়াটসনের সই নকল করেছিলেন লাশিংটন।

দরবারের সকলে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। ক্লাইভ অচঞ্চল। এক মনে পাইপের ধোঁয়া ছেড়ে চলেছেন।

জগৎশেঠের হুকুমে ছুটে এল গোলাম-বান্দারা। উমিচাঁদকে ধরাধরি করে নিয়ে গিয়ে পাশের কক্ষে বিছানায় শুইয়ে দিল তারা। বেশ কিছুক্ষণ ধরে চোখেমুখে জলের ঝাপটা দেওয়ার পর চোখ খুললেন উমিচাঁদ। চোখ খুলেই কেঁপে উঠলেন থরথর করে।

তার মুখের উপর ঝুঁকে রয়েছেন স্ক্র্যাফটন ও ওয়াটস। তাদের মুখদুটো উমিচাঁদের চোখে কেমন যেন বীভৎস ঠেকল। আতঙ্কে চিৎকার করে উঠলেন উমিচাঁদ। দুটো হাত বাড়িয়ে স্ক্র্যাফটনের গলাটা চেপে ধরে চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘লাল কাগজ? কাঁহা হ্যায়? আভি নিকালো।’

যুবক স্ক্র্যাফটনের সঙ্গে গায়ের জোরে পেরে উঠবেন কেন উমিচাঁদ? স্ক্র্যাফটন এক ঝটকায় নিজের গলা থেকে উমিচাঁদের হাতদুটো ছাড়িয়ে নিলেন। নিস্তেজ হয়ে পড়ে উমিচাঁদ বিড়বিড় করতে লাগলেন, ‘লাল কাগজ! লাল কাগজ! লাল কাগজ!…’

বিছানার পাশে এসে দাঁড়ালেন কর্নেল ক্লাইভ। সামনে ঝুঁকে পড়ে বললেন, ‘মি. উমিচাঁদ আপনার তবিয়ত বোধ হয় ঠিক নেই। ভিজিট দ্য হোলি প্লেসেস। কিছুদিন ঘুরে আসুন। সব ঠিক হয়ে যাবে।’

ঘোলাটে চোখে উমিচাঁদ তখনও বিড়বিড় করে চলেছেন, ‘লাল কাগজ! লাল কাগজ!…

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *