নীপাদের বাড়ি – ৯৫

৯৫

‘এই মা আর মেয়ে তো মধুচক্র চালায়। ছেলেদের মাথা খায় এরা। ভালো ছেলেটাকে নষ্ট করে দিল। ছি ছি ছি। লজ্জা লাগে না? থু!’

আমি আর মা হাসপাতালে দাঁড়িয়ে থরথর করে কাঁপছি। কীভাবে দাঁড়িয়ে আছি, বুঝতে পারছিলাম না। আমার মনে হচ্ছিল যে কোনও সময় আমার হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাবে। দম বন্ধ হয়ে এখানেই আমি মরে পড়ে যাব।

অল্প শোকে কাতর হয় মানুষ, অধিক শোকে পাথর।

আমি ঠিক কী হব, তা বুঝতে বুঝতেই একটা বেলা কেটে গেল।

ঝড়ের মতো গোটা দিনটা কেটে গেল। হিমুকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া, ভর্তি করা, সব কিছুর পরে যখন হিমুর পাড়ার লোকেরা আমাকে ঘিরে ধরল, তখন বুঝলাম আমি এখনও বেঁচে আছি।

অকথ্য গালিগালাজ, ‘এই মেয়েটাই হিমুকে শেষ করল’, ‘লজ্জা লাগে না? নির্লজ্জ মেয়ে কোথাকার!’

হিমুর আত্মীয়রাও এসেছে। মাকে এক মহিলা জোরে ধাক্কা দিয়েছে। আমি মাকে না ধরলে মা হাসপাতালের মেঝেতেই পড়ে যেত।

দেবদূতের মতো এসে বাঁচাল সেই ছেলেটা, যে হিমুদের পাড়ায় থাকে, আমার সঙ্গে দেখা করতে আমার কলেজ অবধি এসেছিল। এসেই চিৎকার জুড়ে দিল, ‘সরুন, সরো সবাই। এখানে নাটক করতে শুরু করেছ? তোমরা জানো না হিমুর মা মেয়েটাকে বিয়ের রাতে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিল? তারপর কী হত? মেয়েটা বসে বসে পুজো করত? বিষ খেলেই কি সে ভগবান হয়ে যায় নাকি? সরো’।

চিৎকার করতে করতে রীতিমতো মারমুখী ভঙ্গিতে ছেলেটা এসে আমাদের উদ্ধার করল।

আমি আর মা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁপছি। ছেলেটা বলল, ‘আপনারা বাড়ি চলে যান। হিমুর কিছু হয়নি, আমি ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলেছি। ও বেঁচে যাবে। এখানে থাকলে ঝামেলা কমবে না, বরং বাড়বে’।

একটা রিকশা ডেকে আমাদের সেটায় তুলে দিল। ওদের পাড়ার দুয়েকজন কিছু বলতে এসেছিল, ছেলেটা চিৎকার করে তাদের দূরে সরিয়ে দিল।

আমার জ্বর এসেছে বুঝতে পারছি। মা আমার হাত শক্ত করে ধরে বলল, ‘চিন্তা করিস না, হিমু বেঁচে যাবে’।

আমি নিঃশব্দে কাঁদছিলাম। দিদা খিলখিল করে হাসতে হাসতে বলল, ‘তুই একটা ডাইনি মাগি। বুঝছোস? তুই হইলি ডাইনি। তোর জন্য তোর বাবা পালায়, তুই আমারে খাইলি, হিমুর মারে খাইলি, হিমুরে খাইলি, এবার আদিরে খাইবি। সব শেষ কইরা দিবি তুই’।

সত্যিই তাই। আমি নিজেই সবাইকে খেয়ে ফেলছি।

পাড়ার লোকেদের বাঁকা দৃষ্টির সামনে ঘরে ঢুকে আমি কান্নায় ভেঙে পড়লাম। মা আমাকে জড়িয়ে ধরেছে। আমি বললাম, ‘কাল কলকাতা চলে যাব আমরা। দালালের সঙ্গে কথা বলে নাও, যা দাম পাওয়া যায়, বিক্রি করে দাও। এই বাড়িতে আর থাকতে পারব না মা’।

মা হতাশ গলায় বলল, ‘এখন আর সেটা সম্ভব না। চলে গেলেই ঝামেলা হবে। সবাই বলবে পালিয়েছে। ফেরার বলে দাগিয়ে দেবে। সব মিটিয়েই যেতে হবে’।

আমি বললাম, ‘ওদের পাড়ার লোক যদি আবার আসে?’

মা বলল, ‘আর আসবে না। হিমু ঠিক হচ্ছে, ভাবিস না। ও অনেকটা বমি করে দিয়েছিল ভয় পেয়ে। ওরা বলল তো, চিন্তা কিছু নেই। অবজারভেশনে রাখা হয়েছে’।

আদি ফোন করছে। আদিকে আগেই জানিয়েছিলাম। অনেকক্ষণ ধরেই ফোন করেছে, হাসপাতালের মধ্যে আমি ফোন ধরতে পারিনি। এখন ধরলাম। আদির উৎকণ্ঠিত হয়ে বলল, ‘ঠিক আছে তো সব? ফোন ধরছিলে না কেন?’

আমি বললাম, ‘ওদের পাড়ার লোকেরা ঘিরে ধরে খুব ঝামেলা করছিল। তাই ফোন ধরতে পারিনি’।

কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে আদি বলল, ‘তুমি ঠিক আছ?’

আমি বললাম, ‘জানি না’।

আদি বলল, ‘আমি কাল যাচ্ছি’।

আমি বললাম, ‘এসো না। এই ঝামেলার মধ্যে তুমি এলে আবার যদি ঝামেলা বেড়ে যায়?’

আদি বলল, ‘আমি এখানে থেকেই বা কী করব? ভেবো না, আমি একটা গাড়ির ব্যবস্থা করেছি’।

আমি কী বলব? বারণ তো করা যায় না। বললাম, ‘ঠিক আছে’।

ফোন রেখে মাকে বললাম, ‘কাল আদি আসছে!’

মা বলল, ‘আসুক। তোকে ডাক্তার দেখানো দরকার। আমার মনে হচ্ছে তোর প্যানিক অ্যাটাক হচ্ছে’।

দিদা তখন থেকে ফিকফিক করে হেসেই যাচ্ছে। হেসেই যাচ্ছে…

৯৬

মধুচক্র চালাই আমি আর মা?

তখন লোকগুলো বলে গেছে, শুনে গেছি। শব্দটা রাতে যে এভাবে মাথায় হাতুড়ির মতো ধাক্কা মারতে শুরু করবে, বুঝতে পারিনি। খেতে পারিনি কিছুই। একটু মুড়ি খেয়ে শুয়েছিলাম। হঠাৎ মনে পড়ল কথাটা। ‘মা মেয়ে মধুচক্র চালায়’।

এত বড় কথা বলল? বাড়িতে বাবা না থাকলে, বাবাই যদি কালপ্রিট হয়, তারপরেও বাড়ির মেয়েদেরই এই কথা শুনতে হবে?

উঠে বসে রইলাম।

দিদা বলল, ‘পাপ করসস, শাস্তি তুই পাবি। ভাবছস পালাইয়া বাঁচবি?’

আমি বললাম, ‘পালাতে চাই না তো। তুমি ফালতু বকছ কেন?’

দিদা বলল, ‘আমি ফালতু বকি? তুই আমায় মারছোস না? তার শাস্তি পাইতেই হবে তোকে’।

আমি অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে শুলাম। হেড ফোন কানে দিয়ে গান চালালাম। খুব জোরে গান শুনতে শুরু করলাম। তার মধ্যেও শব্দটা আমার মাথায় বাড়ি মেরে যেতে থাকল। মধুচক্র। মধুচক্র…

মেয়েদের ছোট দেখানোর অস্ত্র তাহলে তার চরিত্র খারাপ করে দেখানো? এরকম কথা নিশ্চয়ই হিমুদের বাড়ি থেকেই বেরিয়েছে। কী কুক্ষণে ওই বিয়েটায় রাজি হয়েছিলাম!

মা একটা ঘুমের ওষুধের অর্ধেক দিয়েছিল। তার প্রভাবেই হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ঘুম ভাঙতে মা সামনের ঘরে ডেকে পাঠাল। পুলিশ এসেছে। কোনও মহিলা পুলিশ নেই। লোকটা আমাকে আপাদমস্তক দেখে বলল, ‘আপনিই নীপবন?’

আমি বললাম, ‘হ্যাঁ’।

লোকটা বলল, ‘আপনি কী এমন বলেছিলেন যে হিমাংশুবাবু ঘুমের ওষুধ খেলেন?’

আমার হাত পা কাঁপছিল। তবু যথাসম্ভব স্বাভাবিকভাবে বললাম, ‘আমি কিছু বলিনি। আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে জানার পরে ও এসেছিল। বারবার বিয়ে করতে বারণ করেছে। দেখুন আমাকে ওবাড়ি থেকে বিয়ের দিনই বের করে দিয়েছিল ওরা’।

লোকটা বলল, ‘হুঁ। উনি বেঁচে গেছেন। সেটা একটা ভালো দিক। তবু চেষ্টা করবেন, ওকে কিছু না বলার’।

আমি বললাম, ‘আমি কিছু বলিনি। ওই বারবার আসছে’।

মা বলল, ‘হ্যাঁ, আমরা তো হিমাংশুকে ডাকছি না। ও বার বার চলে আসছে। এখানে আমাদের কী করার আছে বলুন তো’।

জানলা দিয়ে দেখলাম, পুলিশের জিপ দেখে বাড়ির বাইরে লোক জড়ো হচ্ছে। সবাই মজা পাচ্ছে।

লোকটা উঠে দাঁড়াল, ‘ও চাইলে ওর সঙ্গেই সংসার করুক’।

মা কঠিন গলায় বলল, ‘আমার মেয়েকে আমি জীবন্ত অবস্থায় চিতায় তুলে দেব কিন্তু ওই ছেলের সঙ্গে আর বিয়ে দেব না’।

লোকটা বলল, ‘ঠিক আছে। কিন্তু আইনি সমস্যা হতে পারে, আপনি মেয়ের অন্যত্র বিয়ে দিতে যাচ্ছেন’।

মা বলল, ‘কীরকম আইনি সমস্যা বলুন। আমারও আত্মীয় স্বজন আছে। ছেলে মেয়ে এক সঙ্গে থাকে না, ছেলের বাড়ি থেকেই মেয়েকে তাড়িয়ে দিয়েছিল, আর কীরকম আইনি সমস্যার কথা আপনি বলছেন?’

লোকটা খুক খুক করে কেশে বলল, ‘হতে পারে। কংক্রিট এভিডেন্স দেখাতে হবে যে একসঙ্গে থাকে না’।

মা বললেন, ‘দেখিয়ে দেব। আর কিছু?’

লোকটা সুবিধা করতে না পেরে চলে গেল। মা দরজা বন্ধ করে বলল, ‘একদম ভয় পাবি না। এরা সব ভয় দেখাতে আসে। নিশ্চয়ই হিমুদের বাড়ি থেকে পাঠিয়েছে’।

আমি বললাম, ‘আমার অস্বস্তি হচ্ছে মা। ওরা এখন আবার বিয়ে নিয়ে ঝামেলা শুরু করবে নাকি?’

মা বলল, ‘সুবিধা করতে পারবে না। কিন্তু আমাদের এ জায়গা ছাড়তে হবে। একটু ঠান্ডা হোক, ধীরে ধীরে কলকাতায় শিফট হয়ে যেতে হবে। এ বাড়ি…’

মা চুপ করে গেল।

মাথার পেছনটা কেমন দপ দপ করছে। বাড়িতে পুলিশ আসবে কোনওদিন ভাবতে পারিনি। ঘরে গিয়ে বসতেই দিদা বলল, ‘কীরে ছেমরি, পুলিশরে কইলি না তুই আমারে খুন করসস?’

আমি উত্তর দিলাম না। জানলা খুলে দিলাম। নিশি কলতলায় দাঁত মাজছে। আমাকে দেখে বলল, ‘পিকনিক করবি?’

আমি ম্লান হাসলাম।

নিশি বলল, ‘ডিম ভাত। আমি রাঁধব’।

আমি বললাম, ‘হবে না রে, আজ একজন আসবে’।

নিশি বলল, ‘কে?’

আমি বললাম, ‘চিনবি না। কলকাতায় থাকে’।

নিশি বলল, ‘বিয়ে করবি?’

আমি বললাম, ‘হ্যাঁ’।

নিশি ফিক ফিক করে হাসল। ওকে ঠিক সুস্থ মনে হল না আমার। আবার আগের মতো হয়ে যাবে না তো? নাকি আমিই ওর মতো হয়ে যাব?

৯৭

যে বাড়িতে বড় হয়ে উঠেছি, যে ঘরগুলোর প্রতিটা অণু পরমাণুর সঙ্গে আমার অস্তিত্ব জড়িয়ে আছে, সে বাড়ি ছেড়ে যাওয়া কি এতই সোজা? আমি তো আসলে ঘরকুনো একটা মেয়ে। সারাক্ষণ ঘরে শুয়ে আছি। পাড়ার লোক অন্য নজরে দেখছে, রাস্তাঘাটে লোকজন বাজে কথা বলছে, এরকম একটা কুয়ো থেকে কলকাতার সমুদ্র হয়তো আমাকে উদ্ধার করতে পারে, কিন্তু আমার শিকড়টাই যে উচ্ছেদ হয়ে যাবে! যতবার ভাবছি, ততবার অস্বস্তি বেড়ে চলেছে।

আদি এগারোটার মধ্যে চলে এল। উৎকণ্ঠিত হয়েছিল। আমাকে দেখে স্বাভাবিক হল কিছুটা। মা চা বসাল।

আদি বলল, ‘ছেলেটার সমস্যাটা কী? আমাকে ফোন করে কান্নাকাটি করল। ওষুধ খেয়ে ফেলল। এরকম কেন?’

মা বলল, ‘সমস্যা তো আছেই। এ বাড়ির সামনে দিয়ে সাইকেল নিয়ে যাতায়াত করত। দরজায় এসে দাঁড়িয়ে থাকত। নীপা ওর কাছে কিছুতেই ফিরে গেল না, হিমু সেটা মানতে পারল না’।

আদি বলল, ‘এবার কী করব আমরা? হিমু কী করবে, তা দেখার জন্য বসে থাকব?’

মা বলল, ‘না। সব শান্ত হলে আমি এবার বাড়ি ঘর বেচে চলে যাব। আর থাকব না’।

আদি বলল, ‘সেটাই ঠিক বলে মনে হচ্ছে। আমার এক পরিচিত লোক আছে, দালালি করে। কথা বলব?’

মা ঘাড় নাড়ল, ‘বলো, ঠিকঠাক দাম পাওয়াটাও দরকার। কলকাতাতেও একটা মাথা গোঁজার ঠাই তো দরকার’।

আদি বলল, ‘এখন বাড়ি ছেড়ে যাওয়াটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। বাড়ি দখল হয়ে যেতে পারে’।

মা বলল, ‘হ্যাঁ। আগে সব ব্যবস্থা হোক, তারপর দেখা যাবে। আসলে একটা সমস্যা দেখা দিয়েছে। হিমুদের বাড়ি থেকে পুলিশ পাঠিয়েছিল। যা বুঝলাম ওরা বিয়েটা নিয়ে কিছু একটা ঝামেলা করতে চাইছে’।

আদি বলল, ‘কিচ্ছু করতে পারবে না, নিশ্চিন্ত থাকুন। আমার মেসো বড় পোস্টে আছে। সামলে নেবে। স্থানীয়ভাবে ঝামেলা করে সুবিধা করতে পারবে না। এগুলো কোনও সমস্যা না। আসল সমস্যা হল, ছেলেটা। এরকম সুইসাইডাল টেন্ডেন্সি চিন্তার কারণ’।

মা বলল, ‘বাড়ির লোকও তো সেরকম। আমাদের বিরুদ্ধে লোক লেলিয়ে দিচ্ছে। নেওয়া যাচ্ছে না আর। বসো চা নিয়ে আসি’।

আদি বলল, ‘ঠিক হয়ে যাবে আশা করি আজকের মধ্যেই। এইধরনের কেসগুলো খুব জটিল হয়। মানুষ বুঝতে চাইবে না কনসেন্ট ছাড়া কিছু হয় না। তুমি যে ওর সঙ্গে থাকতে চাইছ না, সেটা কেউ মানতে চাইবে না। যে বিষ খাবে, জনমত তার দিকে চলে যাবে’।

আমি বললাম, ‘তাহলে এর সলিউশন কী? আমিও বিষ খাব?’

আদি বলল, ‘সেসব কথা ভুলেও ভাববে না। প্রশ্নই আসে না। তুমি তোমার অতীত ভুলে সুখে থাকবে। থাকতেই হবে’।

দিদা ফিক ফিক করে হাসতে হাসতে বলল, ‘বলসিস? বল। বল। তুই আমারে খুন করসিস বল’।

আমার বুকটা কেঁপে উঠল। দিদা এখন আমায় দিয়ে এই কথাটা আদিকে বলাবে?

আমার বন্ধু ইপ্সিতার মা একদিন বলেছিল, মেয়েদের শ্বশুরবাড়িতে সব কথা বলতে নেই। অনেক কথা পেটে রাখতে হয়। দুর্বলতাগুলো সারাজীবন খোঁটা শোনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আদিকে আমি যদি বলি বাথরুমে সাবান গোলা জল ফেলে রেখেছিলাম, তার ফলে দিদা মরে গেল, এই কথা বলার পর যদি ও আমাকে বিয়ে না করে, তাহলে কী হবে?

আমার মধ্যে সেই সব হারিয়ে ফেলা ভয়টা ফিরে এল আবার।

মা চা নিয়ে এল। আদি চা খেতে খেতে বলল, ‘সব ঠিক হয়ে যাবে। চিন্তা করার কিছু নেই’।

মা বলল, ‘ছোট জায়গা তো, পরিচিত মানুষ সবাই। কয়েকটা লোক ক্রমাগত উল্টোপাল্টা বলে গেলে খারাপ লাগবেই। বিয়েটা তো কোনও বেড়াল পার করার ব্যাপার না, আমার একমাত্র মেয়ে। আমি সারাজীবনের কথা ভাবছি। আর পারছি না। অনেক তো হল’।

মার কথা শুনে আমার কান্না পেল। মা এভাবে কোনওদিন কথা বলে না।

৯৮

ব্যাগ গোছানো শুরু হয়েছে। জামা কাপড়গুলো এক জায়গায় গুছিয়ে রাখা হচ্ছে। গয়নাগাটি লকারে আছে। কলকাতার ব্যাঙ্কে লকার নিয়ে একদিন গাড়ি করে এসে সেগুলো নিয়ে যাওয়া হবে।

এখানকার পাট আমাদের চুকবে এবার। আদির গাড়িতে দুটো ব্যাগ চলে যাবে। পরে সব ঠান্ডা হলে আমি আর মা বাড়ির একটা ব্যবস্থা করে কলকাতা চলে যাব।

আদি আমার ঘরে এসে বসল।

আমাকে গোছাতে দেখে বলল, ‘তুমি কী সুন্দর জামা ভাঁজ করতে পারো নীপা। আমি একদম পারি না’।

আমি হাসলাম, ‘ধুস, ওটা কোনও কাজ হল? শিখে যাবে’।

আদি বলল, ‘তোমার মন খারাপ করছে, তাই না?’

আমি বললাম, ‘হ্যাঁ। বাপের বাড়ি বলে আর কিছু রইল না। থাকবে কী করে? আমি মানুষটাই অভিশপ্ত’।

আদি মাথা নাড়ল, ‘একদম বাজে কথা! এইধরনের কথা বোলো না। মাথাতেও এনো না। কেউ ওভাবে অভিশপ্ত হয় না। আবার এও হতে পারে, একটা সময় পরে অভিশাপ শেষ হয়। মহাভারত পড়োনি? মহাভারতে তো বলাই আছে, কেউ কম পাপ করলে তাকে আগে নরক ভোগ করতে হয়, পরে সে স্বর্গ ভোগ করে। তোমার বাকি জীবনটা ভালো কাটবে। নরক ভোগ করে নিয়েছ তুমি’।

আমি বললাম, ‘শুনতে তো ভালোই লাগে। আজকাল মনে হয়, আমি হিমুর সঙ্গেও ঠিক করলাম না’।

আদি বলল, ‘কেন? কী করলে ঠিক করা হত? তুমি যাকে ভালোবাসো না, তার সঙ্গে জোর করে থাকতে যাবেই বা কেন? ঠিক করেছ তুমি, দ্বিধায় থেকো না। তাতে কষ্ট বাড়ে’।

আমি বললাম, ‘সেটাও ঠিক। আর কত স্পষ্টভাবে বলতাম বলো তো? আর পারছিলাম না। একটা সময় যন্ত্রণা মনে হতে শুরু হল’।

আদি বলল, ‘স্বাভাবিক। আমার জীবনটাও খুব একটা ভালো ছিল না নীপা। আমাকেও অনেক যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছে। আমি বলতে চাই, তুমি…’

আমি বাধা দিলাম, ‘না। থাক। পরে শুনব। আমার যদি কষ্ট হয়? হিংসাও হতে পারে’।

আদি হেসে ফেলল, ‘এই সমস্ত কষ্ট হিংসার পরেই একটা ফ্রেশ স্টার্ট করতে চাইছি। পারব নাকি সেটাই দেখার’।

কলিং বেল বাজল। মা এসে বলল, ‘আদি, তুমি ঘরে থাকো, বেরিও না। নীপা আরেকবার চল। পুলিশ আবার এসেছে, কী বলছে দেখে আসি’।

আদি বলল, ‘আমি যাব না?’

মা বলল, ‘না, জল ঘোলা করতে এসেছে। তোমাকে দেখলে খামোখা ঝামেলা বাড়বে’।

আদি বলল, ‘ঠিক আছে। আমি বসছি’।

বাইরের ঘরে গেলাম। সেই অফিসার আমাকে দেখে বলল, ‘পেশেন্টের জ্ঞান ফিরেছে। আপনাদের সঙ্গে দেখা করতে চাইছে’।

আমি মার দিকে তাকালাম।

মা বলল, ‘দেখুন অফিসার, পেশেন্ট ভালো থাকুক, সুস্থ থাকুক। আমরা পেশেন্টের সঙ্গে কোনওরকম যোগাযোগ রাখতে চাই না। এরপরে আবার যদি এরকম কিছু সমস্যা তৈরি করে, তখন কী হবে?’

অফিসার বলল, ‘আইনত উনি পেশেন্টের স্ত্রী। দেখা করতেই হবে’।

মা বলল, ‘তাই নাকি? তা কোন আইনে এরকম কথা লেখা আছে দেখান তো। আপনার কি মনে হয় না আপনি অতিরিক্ত কাজ করছেন?’

অফিসার থতমত হয়ে গেল। এবার সুর নরম করে বলল, ‘না মানে মানবিকতার খাতিরেও তো দেখা করা উচিত, তাই না? আমি না হয় আপনাদের সিকিউরিটির ব্যবস্থা করব’।

মা কড়া গলায় বলল, ‘মানবিকতার খাতিরে আপনার এই সব উল্টোপাল্টা কথার জন্য এখনও উপরতলায় কমপ্লেইন করিনি, এরপরে করতে বাধ্য হব। আমাদের যে আপনি রীতিমতো হ্যারাস করেছেন, সেটা বুঝতে পারছেন তো?’

অফিসার বললেন, ‘আমি তো আপনাদের শুধু ইনফর্ম করতে এসেছিলাম পেশেন্টের জ্ঞান ফিরেছে, জোর তো করিনি’।

মা বলল, ‘করেছেন। আমরা এমনিতেই মানসিকভাবে বিধ্বস্ত, তারপরেও ক্রমাগত হ্যারাস করে চলেছেন। এরপরে আমি স্টেপ নিতে বাধ্য হব’।

অফিসার কয়েক সেকেন্ড মাকে দেখে বলল, ‘বড় গাছে খুঁটি বাঁধা আছে মনে হচ্ছে’।

মা বলল, ‘দেখবেন?’

অফিসার দু-তিনবার মাথা নেড়ে একপ্রকার পালিয়ে গেল। মা সোফায় বসে বলল, ‘অসভ্য ইতর ছোটলোক একটা। ভেবেছে যা ইচ্ছা তাই বলে যাবে’।

৯৯

‘কীরে ছেমরি, আদিরে কইবি না? তুই কী কী কুকাম করসিস, না বইলা বিয়া কইরা ফ্যালাবি? তারপর জানতে পারলে কী হইব? বুঝোস না?’

দিদা আবার ঘ্যান ঘ্যান শুরু করেছে কানের কাছে। আদি খেয়ে উঠেছে। বিকেলে রওনা দেবে। ব্যাগ গুছিয়ে রাখা হয়েছে। আদি খাটে আধশোয়া।

নিশি এসেছিল। ফিসফিস করে জিগ্যেস করছে, ‘এই ছেলেটা?’

আমি বললাম, ‘হ্যাঁ’।

নিশি বলল, ‘ভালো হয়েছে। কলকাতায় চলে যাবি বল নীপা? আর কোনওদিন দেখা হবে না?’

আমার বুকটা মুচড়ে উঠল। বললাম, ‘না মনে হয়। আর দেখা হবে না’।

নিশি বলল, ‘কতবার করে পুলিশ আসছে তোদের বাড়ি’।

আমি বললাম, ‘আসুক। বাদ দে’।

নিশি বলল, ‘আমার বাচ্চার বাবাটা আর আসবে না বল?’

নিশির মুখে হঠাৎ এই কথা শুনে আমার বুকটা কেমন করে উঠল। নিশি আবার ওই কথাগুলো ভাবতে শুরু করে দিয়েছে?

বললাম, ‘আসবে দেখিস। এটা নিয়ে আর চিন্তা করিস না’।

নিশি বলল, ‘বাবা বিয়ে দিতে চাইছে। কত ছেলে দেখছে। টাকা দেবে। একটা জমি ছিল, সেটা বেচে যা টাকা আসবে, সব দিয়ে দেবে’।

আমি বললাম, ‘আর বাচ্চাকে হোস্টেলে দিয়ে দেবে?’

নিশি ঘাড় নাড়ল, ‘বিড়াল পার হলেই তো হল বল? আমাকে সারাদিন কথা শোনায় তুই পাগল হয়ে গেছিলি, তখন তোকে চিকিৎসা করিয়েছি’।

আমি অবাক হলাম। কোনও চিকিৎসা তো করায়নি! নিশি বাড়ির বারান্দায় শুয়েই কত রাত কাটিয়ে দিয়েছে। কিন্তু কিছু বললাম না। নিশিকে ভরসা নেই, অতিরিক্ত রেগে গিয়ে যদি আবার আগের মতো হয়ে যায়?

বললাম, ‘তুই ভাবিস না, দেখিস সব ঠিক হয়ে যাবে’।

নিশি মাথা নাড়ল, ‘আর ঠিক হবে না কিছু। ছোটবেলাটাই ভালো ছিল বল? সব কিছু কত ভালো ছিল’!

ঠিকই বলেছে নিশি। কত ভালো ছিলাম আমরা। মেলায় যেতাম, বাবার কাঁধে চড়ে ঘুরতাম, কত খেলেছি সারাদিন ধরে। ছোটবেলাটা এত তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যায় কেন?

দুজনে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে চোখের জল ফেললাম। আর কীই বা করতে পারতাম?

নিশি চলে গেলে চোখ টোখ মুছে ঘরে এসে দেখি আদি বই পড়ছে। আমাকে দেখে বলল, ‘ঠিক আছ এখন?’

আমি বললাম, ‘হ্যাঁ’।

আদি বলল, ‘আমি মেসোকে ফোন করে বলেছি সব। লোকাল থানার উপদ্রবটা বন্ধ হবে, ভেবো না। হিমু আবার কী বলতে চাইছিল, কে জানে’।

আমি বললাম, ‘ভাবছি না। আবার একই কথা বলত। একই লুপে ঘুরছে সবটা। আমি ক্লান্ত হয়ে গেছি’।

আদি বলল, ‘কত বড় সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয় মানুষ, তাই না? একজনকে না পাবার জন্য ঘুমের ওষুধ খেয়ে ফেলছে’।

আমি ক্লান্ত গলায় বললাম, ‘ছাড়ো। এই নিয়ে আর কথা বলে লাভ নেই’।

আদি বলল, ‘বলব না। কিন্তু এড়িয়ে গিয়ে বা বিষয়টাকে গুরুত্ব না দিলে সমস্যা আরও বাড়বে। সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়’।

আমি বললাম, ‘হব’।

দিদা খিলখিল করতে করতে বলল, ‘বল, বল, বইলা দে, তারপর তোরে কেমন ভালোবাসে আমিও দেখুম’।

আদি বলল, ‘একটা জয়েন্ট রিসেপশন হোক। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব হোক। আমরা বিয়েটা করে ফেলি। এখানে আর থাকতে হবে না তোমাকে’।

আমি ঘাড় নাড়লাম, ‘যা বলবে’।

টেবিলে আমার ছোটবেলার অ্যালবামটা আছে। আদি সে অ্যালবামটা খুলে দেখতে শুরু করল। বাবা অনেক যত্ন নিয়ে আমার ছোটবেলায় ছবিগুলো তুলেছিল। আমার খুব মন খারাপ হলে এই অ্যালবামটা দেখি।

অ্যালবামটা দেখতে দেখতে আদির ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল, ‘কী সুন্দর উঠেছে ফটোগুলো’।

দিদা এক কথা ঘ্যানঘ্যান করতে শুরু করল আবার, ‘বল বল মাগি, বইলা দে। তারপর দেখ তোরে কেমন ভালোবাসে। এক লগে থাকবি? থাকব না তো ও তর লগে। দেখবি কেমন লাগে’।

আমি না, আমার মুখ দিয়ে যেন কেউ বলিয়ে উঠল, ‘তোমাকে একটা কথা বলার ছিল। সেটা বলার পরে সিদ্ধান্ত নাও তুমি বিয়েটা করবে নাকি’।

আদি অ্যালবামটা রেখে দিয়ে বলল, ‘কী বলার ছিল আবার? হিমুর ব্যাপারে? থাক না, আমি বুঝে গেছি যা বোঝার’।

আমার হাত পা থর থর করে কাঁপতে শুরু করল হঠাৎ করে! আমি বুঝতে পারলাম, দিদার কথাটা না বললে আমি কিছুতেই শান্তি পাব না। আদির জানা দরকার! বলে দিই।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *