নীপাদের বাড়ি – ১০

১০

আমার একটা জিনিস দেখার ইচ্ছে ছিল। সেটা যে এত তাড়াতাড়ি সম্ভব হবে বুঝিনি। মা না থাকলে ভেবেছিলাম বাবা একবার আমাকে দেখতে আসবে। আমি রাস্তার মোড়ে বাবাকে আসতে দেখেই তাড়াতাড়ি সরে গেছি। বাবা এসে কলিং বেল বাজাল। দুবার বাজানোর পর হিমুর ঘুম ভাঙল এবং ও দরজা খুলে দেখল ওর পালিয়ে যাওয়া শ্বশুরমশাই দরজায় দাঁড়িয়ে। বাবা, পালিয়ে যাওয়া মেয়ের জামাইকে দেখে কী বলবে বুঝতে না পেরে বলল, ‘নীপা আছে?’

হিমু বিহ্বল হয়ে চারদিকে দেখল, ‘ছিল তো। আপনি আসুন না’।

বাবা বসার ঘরে গিয়ে বসল। আমি পা টিপে টিপে জানলার কাছে গিয়ে শুনতে চেষ্টা করলাম এই দুই চূড়ান্ত জুটিতে কী কথা হচ্ছে।

প্রথম দু’মিনিট বাবা গলা খাঁকড়িয়ে গেল। দু’মিনিট এক সেকেন্ডের মাথায় বাবা বলল, ‘ও প্রেগন্যান্ট’।

হিমু বলল, ‘কে?’

বাবা বলল, ‘নীপার নতুন মা’।

হিমু বলল, ‘নতুন মা? বুঝলাম না’।

ছোটবেলায় সিডি খারাপ হয়ে গেলে এক শব্দ হয়ে যেত। এ বাড়িতে এলেই বাবার সিডি আটকে যায়। যে কথা বলারই থাক, নতুন মায়ের কথাই বলতে থাকবে। বাবা কাশতে শুরু করল।

এবার হিমু খাপ খুলল, ‘মদ খাওয়া ভালো না জানেন তো। ফুলশয্যার দিন বন্ধুরা আমাকে জোর করে মদ খাইয়ে দিয়ে বলল যা, এবার তুই বাঘ। বাঘ হতে গিয়ে নীপা চলে এলো। আজ আবার মা বলছে সুইসাইড করবে’।

বাবা সিরিয়াস গলায় বলল, ‘তোমার মা মদ খেয়ে সুইসাইড করবেন?’

হিমু জোরে জোরে মাথা নাড়ল, ‘না না। তা না। আমি মদ খেয়েছিলাম বলেই তো এসব হল?’

বাবা বলল, ‘না বাবা, মদ খেয়েছ বলেই যে এরকম হয়েছে তা ভাবার কোনও কারণ নেই। এসব আগে থেকে ঠিক হয়ে আছে। সব পূর্ব নির্দিষ্ট’।

হিমু বলল, ‘নীপা আমাকে এ বাড়িতে থাকতে বলছে। ঘর জামাই’।

বাবা বলল, ‘ভালো তো। থাকো’।

আমি আর দেরি করলাম না। হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকে বললাম, ‘বাবা, কখন এলে?’

বাবা বলল, ‘এই তো। জামাইয়ের সঙ্গে কথা বলছিলাম। ও কি এখানে থাকবে’?

আমি বললাম, ‘ওর তেমনই ইচ্ছা’।

হিমু মৃদু প্রতিবাদ করার চেষ্টা করল, ‘মানে নীপা চাইছে আর কী…’

আমি বললাম, ‘ওই আর কী। হিমুর মা খুব ঝামেলা করছে। হয়তো এখানে ওর থাকা হবে না। হয় মা, নয় বউমার মধ্যে সব সময় চিরঞ্জিত জেতে বাবা’।

বাবা বলল, ‘মানে?’

আমি বললাম, ‘সে বুঝে লাভ নেই। মার আসার সময় হয়ে গেল বাবা। তুমি কি থাকবে?’

বাবা বলল, ‘আমি তো তোর মার কাছে আসিনি। তোকে দেখতে এলাম। তোকে নিয়ে আমার চিন্তা হয়’।

আমি বললাম, ‘আমার মাধ্যমিকের সময় পালিয়ে বিয়ে করেছিলে। তখন চিন্তা করতে পারতে তো। কাজের কাজ হত। মা ছিল বলে কানের পাশ দিয়ে গেছে। যদি সকালে জানতে পারতাম তুমি ভেগেছ, তাহলে কী পরীক্ষা দিতে পারতাম?’

বাবা কুঁকড়ে গেল। কথাগুলো বলে আমারই খারাপ লাগল। আমার মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে বোধ হয়। কাকে কী বলছি বুঝতে পারছি না। নিজের বাবাকে এই কথাগুলো বলা ঠিক না।

দিদার খিলখিল করে হাসিটা শুনতে পেলাম।

শ্বাস ছাড়লাম। বুড়ি জ্বালাবে। পিণ্ডি না কী দিতে হয়, তাতে কি আদৌ এসব পাবলিক যায়? গেলে বাঁচি। এভাবে পাশে বসে সব কিছুতে ইংরেজি সিরিজের মতো হাসাহাসি করলে তো ভারি বিপদ।

বাড়ির বাইরে বড় গাড়ি এসে দাঁড়াল। হিমুর মামা এসেছে। হিমু আমাকে বলল, ‘আবার চাপ দিতে এলো’।

আমি বললাম, ‘আমার মামারা চলে গেছে। তোমার মামা থেকে গেছে। এটাই তোমার নৈতিক জয়’।

বাবা উঠে দাঁড়াল, ‘আমি বরং যাই’।

আমি বললাম, ‘তুমি থাকো। তুমি কেন যাবে? এই মামার লক্ষণ ভালো না। তুমি না থাকলে সমস্যা’।

বাবা বলল, ‘মানে?’

আমি বললাম, ‘থাকো তো। অত বোঝাতে পারব না’।

হিমুর মামা এসে মিহি গলায় ডাকলেন, ‘নীপা মা’।

আমি বললাম, ‘আসুন’।

মামা ঘরে ঢুকে নাটকীয় গলায় বললেন, ‘আমাদের ছেলেকে ওর মায়ের কাছে পৌঁছে দাও মা। ছেলে বিপথে চলে গেছে’।

বাবাকে মামা চিনতে পারেননি। বললেন, ‘আপনাকে তো ঠিক…’

দিদা আমার কানে কানে বলল, ‘ও অনেক আগেই বিপথে চলে গেছে’।

১১

আমি দেখেছি কোনও পরীক্ষায় বাস্তব কোনও বিষয় নিয়ে প্রশ্ন আসে না। নইলে উচ্চমাধ্যমিকের বাংলা রচনায় প্রশ্ন আসা উচিত ছিল, ‘বিবাহে ফটোগ্রাফারের ভূমিকা লইয়া টীকা লিখ’।

আমি ফটোগ্রাফারকে ভুললাম কেন? তাকে তো ভোলা উচিত হয়নি। বউভাতে হিমু একজন ফটোগ্রাফারকে নিয়ে এসেছিল।

আমি দেখছি ঘরের ভেতরে ছাতা খুলে কীসব করছে। হিমুর এক মেসোমশাই তো বলেই বসলেন, ‘কী হে, তুমি কী রেইন সিকোয়েন্স শুটিং করবে নাকি?’

ফটোগ্রাফার গম্ভীর হয়ে বলল, ‘অশিক্ষিতের মতো কথা বলবেন না’।

বিয়েতে ফটোগ্রাফার যে কতরকমভাবে লড়াই চালিয়ে যায়, তা না দেখলে বিশ্বাস করা যাবে না। হিমু আমার ডানদিকে দাঁড়িয়েছে। বলা হল বাঁদিকে দাঁড়াতে। ফটো উঠতেই বলল, হাঁটু গেড়ে বসে পড়। বেচারি হাঁটু গেড়ে বসেছে।

আমার হাসি পাচ্ছে। আমি হাসতে পারছি না। প্রবল হাসি এলে আমি চোখ বন্ধ করে হিমুর মায়ের চোপা প্রাণপণে মনে করার চেষ্টা করে যাচ্ছি। ভদ্রমহিলার মুখ মনে পড়লে হাসি বন্ধ হয়ে যাওয়া উচিত। বাংলা সিরিয়ালে যে সব দজ্জাল শাশুড়িদের দেখায়, তারা সকাল বিকেল হিমুর মায়ের কাছে কোর্স করতে আসতে পারেন।

হিমুর মামাকে দেখতে দেখতে কল্পনা করছিলাম, এখানে একজন ফটোগ্রাফার থাকলে কী হত। হিমুর মামা কিছু বলতে যাচ্ছেন, ফটোগ্রাফার থাকলে নিশ্চয়ই বলত, ‘দাদা আপনি একটু বগলটা তুলে দাঁড়ান। এই অ্যাঙ্গেলটা ভালো লাগবে’।

আমার বাবা তো গোটা বিয়েতে ছিলই না। বাবাকে কী বলতে পারত? মাথায় এসব চিন্তা আসতে আসতেই মা চলে এল। ঘরে ঢুকে সব কিছু দেখে আমায় জিগ্যেস করল, ‘কী হয়েছে?’

আমি বললাম, ‘হিমুকে বলেছিলাম এ বাড়িতে থাকতে। ও সত্যি সত্যি এখানে চলে এসেছে। হিমুর মা বলেছেন হিমু না ফিরলে বিষ খাবেন’।

মা বলল, ‘তাহলে হিমু ফিরে যাক। আমার মেয়ের জন্য কারো জীবন সংশয় হোক, তা আমি চাই না’।

হিমুর মামা বললেন, ‘কিন্তু ম্যাডাম, আমাদের বউমাকেও তো দরকার। বাড়ির লক্ষ্মী বলে কথা’।

মা বলল, ‘লক্ষ্মী না কী আমি জানি না, তবে আমার মেয়ের ইচ্ছে না থাকলে জোর করে ওকে ও বাড়িতে পাঠানোর কোনও প্রশ্নই আসে না। আপনারা আপাতত হিমুকে নিয়ে যান। আর যেহেতু আমার মেয়ে আর ও বাড়ি যাবে না, ওর যা গয়না আছে, সেগুলো অনুগ্রহ করে ফিরিয়ে দেবার ব্যবস্থা করবেন’।

মামা বললেন, ‘আমি চেক লিখে দিচ্ছি। ওসব ঝামেলায় যাচ্ছেন কেন? আপনি কিনে নিন না। আবার দিদিকে বলব, দিদি আবার কত ঝামেলা করবে, তার থেকে আপনি কিনে নিন’।

মা বলল, ‘টাকা দিয়ে সব কিছু কি কেনা যায়? কেনা গেলে তো অত সমস্যা হত না তাই না? আপনি ওগুলোই ফেরানোর ব্যবস্থা করুন। সেটা আপনাদের জন্যও ভালো হবে। দেশে আইনকানুন আছে। একজন মেয়েকে তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে জোর করে কাবু করতে না পেরে আপনারা ওকে মাঝরাতে এ বাড়িতে ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। ব্যাপারটা খুব একটা ভালো দিকে যাবে না বুঝতে পারছেন হয়তো। আপনারা ভাবতে পারেন আমার স্বামী নেই বলে আমি দুর্বল, তাহলে ভুল ভাববেন। আমি বা আমার মেয়ে কেউই দুর্বল নই’।

বাবা মিন মিন করে বলার চেষ্টা করল, ‘আমি নেই মানে? আমি তো বেঁচে আছি এখনও’।

মা বাবার কথা কানেই তুলল না। হিমু কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল, ‘আমি যে থাকতে এসেছিলাম। আমাকে নীপা বলেছিল, সে কথা শুনে আমি চলে এসেছি। আমি এখন কোথায় যাব?’

মা বলল, ‘বাড়ি যাও। বাড়িতে বোঝাও। তোমার মা যদি তোমাকে থাকতে দেন, তবেই থাকতে এসো। নইলে আসার দরকার নেই। নীপা তোমাকে এ বাড়িতে থাকতে বলেছে, তুমি থাকতে এসেছ খুব ভালো কথা। তবু দেখো তোমার জন্য তোমাদের বাড়িতে কারো কোনও ক্ষতি না হয়’।

হিমু বলল, ‘তাহলে নীপাকে নিয়ে যাই?’

মা বলল, ‘সেক্ষেত্রে যারা ওকে এবাড়িতে ফেরত পাঠিয়েছে তাদের আসতে হবে। ক্ষমা চাইতে হবে। তারপরে যদি নীপার ফিরতে ইচ্ছে হয়ে, তাহলেই ও ফিরবে। নইলে এসব কথা বলে কোনও লাভ নেই’।

মামা অনেক কিছু বোঝানোর চেষ্টা করে গেলেন মাকে। মা কোনও কথাই কানে তুলল না। শেষ অবধি হিমুকে নিয়ে হিমুর মামা ফিরে গেলেন। মন খারাপ হয়ে গেল।

হিমুর জন্য না। রাত হলে হিমুকে ঘাবড়ে দেবার জন্য কিছু ‘ইস্পেশাল’ প্ল্যান করে রেখেছিলাম, সেগুলো ভেস্তে গেল বলে।

ওরা চলে গেলে বাবা মাকে বলল, ‘আগে জানতাম না যে তোমার এত পার্সোনালিটি!’

মা বলল, ‘এখন জানতে পারলে তো? তাহলেই হবে’।

বাবা বুঝল এখন কথা বলতে গেলেই ঝামেলা হবে। মা বেশ গরম হয়ে আছে। বাবা হালকা করে কেটে পড়ল।

ঘর ফাঁকা হলে মা বলল, ‘তুই নিশ্চিত তো ওই বাড়িতে ফিরবি না?’

আমি বললাম, ‘একদম নিশ্চিত’।

মা বলল, ‘যাক, তাহলে ঠিক আছে। জোর করে কিছু করিস না’।

আমি মাকে জড়িয়ে ধরলাম, ‘করব না’।

১২

অমলকান্তি রোদ্দুর হতে চেয়েছিল।

দিদা ভূত হয়ে ভয় দেখাতে চেয়েছিল। পারেনি। রাতের খাওয়া সেরে এসে দেখলাম আমার খাটে ঠ্যাঙের উপর ঠ্যাং তুলে বসে আছে। আমি ঝাঁটা নিয়ে খাটের উপর দু-চারটে বাড়ি মারলাম। দিদা রেগে গিয়ে বলল, ‘লজ্জা লাগে না নিজের দিদারে ঝাঁট দিয়া সরায় দিস?’

আমি বললাম, ‘ভালো লাগছে না। এখান থেকে সরো। তোমার সঙ্গে কথা বলার কোনও ইচ্ছে নেই আমার’।

দিদা আরও কিছু বলার চেষ্টা করছিল হয়তো। আমি আরও বেশি করে ঝাঁটা চালিয়ে দিলাম। বুড়িকে আর দেখা গেল না।

চোখ বন্ধ করে শুয়ে পড়লাম।

হিসেব করে দেখলে এই মুহূর্তে আমার জীবনের বারোটা বেজে গেছে। তবু খারাপ লাগছে না। হিমুর মার কথা মনে পড়ছে। হিমু এখানে থাকলে ভদ্রমহিলা আত্মহত্যা করবেন বলেছিলেন। একসময় ইনিই আমাকে বাজারে দেখে পছন্দ করেছিলেন। ভদ্র সভ্য ঝকঝকে চেহারার মানুষ, অথচ মনের মধ্যে কত বিষ ভরে ঘুরে বেড়ান! আমি তো কিছুই লোক চিনি না। কারো দুটো ভালো কথা শুনলে আমার মন গলে যায়। ঠিক করলাম পরের দিন থেকে কলেজ যাব। বাড়িতে থাকলে আমার সমস্যা হবে। সারাক্ষণ উদ্ভট চিন্তা করে করে আমি আরও উল্টোপাল্টা কাজ করে ফেলতে পারি। এসব ক্ষেত্রে আমি বরাবরই সেরা। নইলে দিদাকে বাথরুমে ফেলে দেবার জন্য কেউ সাবান গোলা জল দিত? কপাল ভালো, কেউ বুঝতে পারেনি। পুলিশও আসেনি। বয়স হয়েছিল, পড়ে মারা গেছে ভেবেছিল সবাই। ধরলে কী হত আমার? জেলে নাকি মেয়েরাই মেয়েদের…ওরে বাবারে…

ঘুম এসেছিল ভালো করেই, ভাঙল জানলার শব্দে। জানলায় কেমন একটা ঠক ঠক করে শব্দ হচ্ছে। আমি চিৎকার করলাম, ‘কে?’

জানলাটা যেন উৎসাহ পেয়ে আরও বেশি করে শব্দ করা শুরু করল। বিরক্ত হয়ে উঠে জানলা খুলে দেখি হিমু দাঁড়িয়ে আছে এই শীতের মধ্যে। আমি বললাম, ‘কী হল? এত রাতে কী করছ তুমি?’

হিমু বলল, ‘পালিয়ে এসেছি। মা ঘুমিয়ে পড়েছে। আর সুইসাইড করবে না। দরজা খোল না। ভেতরে আসি’।

উফ! এই এক সমস্যা হল। আমার এক বন্ধু আমাকে নীপা ভাইরাস বলে ডাকে। আমি নাকি ভাইরাসের মতো। আমাকে দেখলেই নাকি সবাই ভালোবেসে ফেলে। হিমু কি আমার ভাইরাসে আক্রান্ত হল নাকি? কী সর্বনাশ? ভালোবাসা মানেই তো ঝামেলা। সব ভালোবাসার পরিণতি হল বিয়ে। আর বিয়ে মানে আবার হিমুর মা মাসি মানুষদের সামনে গিয়ে হাজির হওয়া। তা তো সম্ভব না। আমি বললাম, ‘সকালে এসো। এত রাতে কারো বাড়ি আসতে নেই। তুমি যাও’।

হিমু বলল, ‘এরকম করো না নীপা, তুমি আমার বিয়ে করা বউ’।

আমি বললাম, ‘নাহ, বিয়ে করা বউ না। সিঁদুর ধুয়ে দিয়েছি। শাঁখা পলা খুলে ফেলেছি। তুমি আরেকটা বিয়ে করে ফেলো। আমার দরজায় খিল দিয়েছি, তুমি আরেকটা বিয়ে করে হও বর, অন্য কারো সঙ্গে বেঁধো ঘর। ভালো থাকো। ভালো থাকতে দাও’।

হিমু কাতর গলায় বলল, ‘খোল না’।

আমি বললাম, ‘খুলব না বলেই তো তাড়িয়ে দিলে। এখন আবার আমার জানলায় এসে একই রিকোয়েস্ট করছ কেন? কেটে পড়। ভাল্লাগছে না। রাত হয়েছে, এত রাতে নাটক করো না’।

হিমু বলল, ‘চলেই যখন আসবে, তখন বিয়েতে রাজি হয়েছিলে কেন?’

আমি বললাম, ‘আমি তো জানতাম না বিয়ের পর তোমার মা কাকিমারা ওরকম করে কথা বলবে। কী ভেবেছিল ওরা, বিয়ে করে ফেলেছ বলে যা খুশি বলার লাইসেন্স পেয়ে গেছে? এখানে সময় নষ্ট করো না। অফিসে যাওয়া শুরু করো। তোমাদের কথা মেনে শোনার মতো মেয়ে দেখে বিয়ে করো। ঝামেলা করো না’।

দিদা হিমুর পেছনে দাঁড়িয়ে মাথা নাড়িয়ে নাড়িয়ে হাসছে। আমার মাথা গরম হয়ে গেল। আমি জানলাটা বন্ধ করে দিলাম।

১৩

সিঁদুর মুছে, শাঁখা পলা খুলে কলেজ করার ব্যাপারটা…

মজার। বেশ মজার। আমার বিয়েতে অনেকের নেমন্তন্ন ছিল। রোজের পোশাকে কলেজে যেতে দেখে সবাই অবাক হয়ে গেল। শ্রিয়া যেমন আমাকে দেখেই চোখ কপালে তুলল, ‘কীরে? কী হল?’

আমি বললাম, ‘কী হবে?’

শ্রিয়া বলল, ‘সিঁদুর কই তোর? কচি মেয়ের মতো কলেজে চলে এলি যে?’

আমার মজা লাগল। সিঁদুর না পরলেই লোকে কচি মেয়ে বলে দেয়? আর সিঁদুর পরলে সে মেয়ে বড় হয়ে গেল? মজার তো ব্যাপারটা? আমাদের এক কাজের মাসি তার মেয়েকে তেরো বছর বয়সে বিয়ে দিয়ে দিয়েছিল। সে মেয়ে সিঁদুর পরে গম্ভীর হয়ে ঘুরত বটে। তাকে দেখে বয়স্ক কখনওই মনে হয়নি।

শ্রিয়াকে বললাম, ‘অ্যাইসে হি, সেক্সি লাগল। বিয়ে টিয়ে আমার দ্বারা হবে না বুঝলি?’

শ্রিয়া কৌতূহলে প্রায় আমার মুখের কাছে ঝুঁকে পড়ল, ‘কী হয়েছিল?’

আমি বললাম, ‘তোর কি পাইরিয়া আছে? মুখে খুব গন্ধ। কিছু মনে করিস না’।

শ্রিয়া সঙ্গে সঙ্গে সরে গিয়ে বলল, ‘না তো। হতে পারে, মা আজকে জোর করে রসুন খাইয়েছে, তার গন্ধ হবে’।

আমি বললাম, ‘ও। এখন দূরে থাক’।

শ্রিয়া দূরে সরে গেল।

এই ঘটনার দুটো ফলাফল হতে পারে—

১) শ্রিয়া এই ঘটনাটা নিয়ে আর উচ্চবাচ্য করবে না।

২) আমি ওর মুখে গন্ধ আছে বলায় ব্যাপক রেগে গিয়ে আমার নামে মশলা মাখিয়ে আরও আজে বাজে কথা বলে যাবে।

শ্রিয়াকে নিয়ে আরও ভাবাই যেত। সমস্যা হল, আমি দেখতে পেলাম আমার ক্লাসের বাইরেও হিমু চলে এসেছে। টেন্সড মুখ নিয়ে পায়চারি করছে ক্লাসের বাইরে।

আমি বাইরে বেরিয়ে বললাম, ‘কলেজে আবার ভর্তি হয়েছ নাকি?’

হিমু বিহ্বল গলায় বলল, ‘তা না। আমি তোমার সঙ্গে দেখা করতে গেছিলাম। তোমার পাশের বাড়ির কাকিমা বললেন তুমি কলেজে গেছ’।

আমি বুঝলাম পম্পার মা। কাকিমা যে এতটা পরোপকারী আমি আগে বুঝিনি। মানুষের জন্য সবাই করতে পারে না। আমাদের পাড়ার নেতা জগাইদাকে আমি এরপর ধরে বলব, পম্পার মার উপর নজর রেখো। যে হারে পরোপকার শুরু করেছে, যে কোনওদিন তোমার বিরুদ্ধে ভোটে দাঁড়িয়ে যাবে। তারপর তোমার রাজনৈতিক কেরিয়রটাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে দেবে।

হিমুর কথা শুনে আমি বললাম, ‘ভালো তো। তুমি ক্লাস করবে আমার সঙ্গে?’

হিমু কী বুঝল কে জানে। সত্যি সত্যি ক্লাসে ঢুকে আমার পাশে বসে গেল। ক্লাসের সবাই আমাদের দেখছে। স্যার ঢুকলেন। হিমুকে দেখে ভ্রূ কুঁচকে বললেন, ‘একী? নতুন অ্যাডমিশন নাকি?’

হিমু বলল, ‘না স্যার। আমি নীপার বর’।

স্যার বিষম খেলেন, ‘মানে? বর বলে ক্লাসে ঢুকে পড়বেন নাকি?’

গোটা ক্লাস বিচ্ছিরিভাবে হাসছে। সে কেমন একটা হাসি। মনে হচ্ছে ভুশণ্ডির মাঠে চলে এসেছি। চারদিকে ব্রহ্মদত্যি, রাক্ষস, মামদোরা হাসছে। ক্লাসের ছেলেমেয়েগুলো এত অসভ্য যে কহতব্য নয়। হিমু যদি কিছু করে বসে, কে দায়িত্ব নেবে?

হিমু বলল, ‘স্যার একটা দরকারে এসছিলাম। আপনি ক্লাস নিন না। আমি বসি?’

স্যার বললেন, ‘প্লিজ লিভ। আর নীপবন, তোমাদের কথা থাকলে তুমি ক্লাসের বাইরে বেরিয়ে কথা বলে এসো। ক্লাসের তো একটা ডিসিপ্লিন আছে নাকি?’

আমি বলতে যাচ্ছিলাম কী ডিসিপ্লিন আছে স্যার? ইউনিয়নের ছেলেগুলো ক্লাসের মধ্যে ঢুকে ক্লাস নিতে শুরু করে। আপনি আবার ডিসিপ্লিন দেখাচ্ছেন? বললাম না, কারণ হিমুকে তাড়ানোর এই সুযোগ। আমি হিমুকে বললাম, ‘তুমি বাইরে অপেক্ষা করো। আমি ক্লাস করব’।

হিমু বেরিয়ে গেল। ক্যাসাবিয়াঙ্কার মতো বাইরে দাঁড়িয়ে রইল। স্যার একবার করে পড়াচ্ছেন, আর হিমুকে দেখে আমার দিকে বিরক্তি সহকারে তাকাচ্ছেন। আমি ভাবলেশহীন মুখে বসে রইলাম। ক্লাস শেষ হলে ক্লাসের ছেলেমেয়েগুলো হিমুকে ‘জামাইবাবু কমলালেবু’ ইত্যাদি বলতে শুরু করল।

হিমু দিশেহারা হয়ে আমায় বলল, ‘কথা ছিল’।

আমি বললাম, ‘চলো’।

বাইরে একটা জায়গায় গিয়ে দাঁড়ালাম।

হিমু বলল, ‘আমি তোমাকে ভুলতে পারছি না নীপা’।

আমি বললাম, ‘তোমার মাকে বলো সেটা। আমাকে বলে কী হবে?’

হিমু বলল, ‘মা বলছে তোমাদের বাড়ি থাকাটা আমার জন্য অপমানজনক হবে’।

আমি বললাম, ‘আমার বাবার নামে সব লোকের সামনে বলাটা অপমানজনক ছিল না?’

হিমু বলল, ‘আর বলবে না। আমি বলে দেব। তাহলে চলো?’

আমি বললাম, ‘দেখছি। ক্লাস করেনি’।

হিমু বলল, ‘ঠিক আছে। তাহলে কলেজ শেষে আমাদের বাড়ি যাবে?’

আমি বললাম, ‘দেখছি। আমি ক্লাসে গেলাম’।

হিমু বলল, ‘ঠিক আছে, আমি কলেজ ছুটির সময় তোমাকে নিতে আসছি’।

আমি বললাম, ‘ঠিক আছে’।

হিমু বেরোতেই আমি কলেজ পালালাম।

অনেকদিন নতুন মায়ের বাড়ি যাওয়া হয় না…

১৪

বন্ধুরা কারো কিছু হলে বলে, ‘ভাই হয়েছে’। আমি যখন গিয়ে দেখি আমার নতুন মায়ের ‘বাচ্চা হবে’, তখন কি আমার কিছু বলা উচিত?

আমাকে দেখে নতুন মা খুশি হল। অপ্রস্তুতও হল। বলতে গেছিল, ‘তুই এখানে?’

সেটা না বলে বলল, ‘আয় আয়’।

আমায় যত্ন করে ঘরের ভেতরে বসিয়ে নতুন মা বলল, ‘তোর বাবা তোকে নিয়ে খুব চিন্তায় পড়ে গেছিল’।

আমি বললাম, ‘বলো কী? খুব চিন্তা করছিল?’

নতুন মা বলল, ‘হ্যাঁ রে। খুব চিন্তা করছিল। ঘরে এসে কান্নাকাটি করল কিছুক্ষণ। বলছে সব আমার জন্য হচ্ছে। আমার দোষেই মেয়েটা বুঝতে পারছে না কী করতে হবে’।

আমার আবার একটা বোবা কান্না উঠে এল গলা জুড়ে। কাঁদা যাবে না অথচ টুক করে গিলে নিতে হবে এমন একটা কান্না। কান্না জিনিসটা অদ্ভুত। সব জায়গায় চোখে জল আনা যায় না। জল এলে কেউ হাসে, কেউ বলে বেশি আবেগ, কেউ বলে ন্যাকামি। অথচ কাঁদতে পারলে কত ভালো থাকা যায়।

জিগ্যেস করলাম, ‘বাবা কোথায়?’

নতুন মা বলল, ‘একটা নতুন দোকানে কর্মচারীর কাজ নিয়েছে। আগে নিজের দোকান ছিল। এখন কর্মচারী’।

আমার বুকটা ধক করে উঠল। বাবা কাজ করছে অন্যের দোকানে? আজকালকার দিনে পাঁচ হাজার টাকায় কিচ্ছু হয় না। মার কাছে হাত পেতে টাকা নিতে হয়। অন্য জায়গায় কাজ করতে হয়। লোকটা এত বোকা কেন? সব কিছু শেষ করে দিল নিজের হাতে।

নিজের সঙ্গে আমাকেও শেষ করে দিয়ে গেল।

নতুন মা বলল, ‘তুই কি সত্যিই ও বাড়ি আর যাবি না?’

আমি বললাম, ‘জানি না। আমি কিছুই জানি না। ইচ্ছে হলে যাব, না ইচ্ছে হলে যাব না’।

নতুন মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল, ‘যা করবি ভেবেচিন্তে করিস মা। আমরা কেউ ভেবে কিছু করি না। করি না বলেই আমাদের এত দুর্ভোগ পোহাতে হয়। পরে যখন বুঝতে পারি কী করেছি, তখন হা হুতাশ করা ছাড়া আর কোনও পথ থাকে না। যে সময়টা চলে যায়, সেটা আর ফেরে না’।

আমি বললাম, ‘তারপর সবাই একদিন মরে ভূত হয়ে যায়। তাই অত চিন্তা করে লাভ নেই, বুঝলে?’

নতুন মা বলল, ‘বেঁচে থাকাটাই কত দুর্ভোগের বল তো। বেঁচে থাকতে ইচ্ছে না করলেও জোর করে বেঁচে থাকতে হয়। আমরা সবাই শেষ অবধি দেখতে চাই। ইচ্ছে না করলেও বেঁচে থাকতে হবে’।

আমি বললাম, ‘তা তো ঠিকই। বাবা যেদিন চলে গেছিল আমারও মনে হয়েছিল মরে যাই। এত লজ্জা নিয়ে বেঁচে থাকব কী করে’?

নতুন মা মাথা নিচু করল, ‘তোর বাবা কেমন অস্থির হয়ে গেছিল সেদিন। বারবার পায়চারি করছে। আমাকে বলছে ঠিক করলাম না, তাই না? আমি কী বলব বুঝতে পারছি না’।

আমি বললাম, ‘তুমি এই নিয়ে কোনও কথা বোলো না। আমি শুনতেও চাই না, আমার বাবা তার নতুন বউকে নিয়ে পালিয়ে গিয়ে কোন কথা বলেছে। এরকম হলে কিন্তু আমি আর এই বাড়িতে আসব না’।

নতুন মা ব্যস্ত হয়ে বলল, ‘থাক থাক। এই নিয়ে আর কোনও কথা হবে না। তুই রাগ করিস না মা’।

আমি বললাম, ‘রাগ করিনি, তবে ভীষণ অস্বস্তি হয়। তুমি বুঝবে না অস্বস্তিটা কেমন। বুঝলে পালাতে না’।

নতুন মা চুপ করে গেল। আমি বুঝলাম, না চাইতেও আমি আঘাত দিয়ে ফেলেছি। কে জানে, হয়তো এই সময় আঘাত দেওয়াটা ঠিক না। বাবারই ভোগান্তি হবে কিছু হলে। কথা ঘোরাতে বললাম, ‘দুপুরে কী রান্না করেছ?’

নতুন মা বলল, ‘তরকারি করেছি। পেঁপে দিয়ে’।

আমি বললাম ‘বাবা পেঁপে খাচ্ছে?’

নতুন মা বলল, ‘হ্যাঁ। খায় তো’।

একথা আমার কাছে নতুন। কত কথা নতুন জানি আমরা। আমি রান্না নিয়েই অনেকক্ষণ গল্প করে উঠলাম। বাড়ি যাওয়ার কথা ছিল। গেলাম না। সরাসরি হিমুদের বাড়ি চলে গেলাম। হিমুর মা দরজা খুলে আমাকে দেখেই কেমন একটা শক মতো খেয়ে গেলেন। পড়েই যাচ্ছিলেন, আমি তাড়াতাড়ি ধরলাম। মাথা দোলাতে দোলাতে বলছেন, ‘তু…তু…তু…’

আমি বললাম, ‘ভালো আছেন?’

ভদ্রমহিলা এবারে পাঁচমাথার মোড়ের নেতাজির স্ট্যাচুর মতো আঙুল তুলে আমাকে বেরিয়ে যাওয়ার ইশারা করতে শুরু করলেন। আমি ঘরের ভেতর গলা তুলে বললাম, ‘জল আনুন কেউ। না পেলে দমকল ডাকুন অন্তত’।

হিমুর মা হ্যাং করে গেলেন…

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *