নীপাদের বাড়ি – ১৫

১৫

মানুষ কত রকমের হয়? আমি জানি না। জানার চেষ্টাও করি না।

কিন্তু হিমুর মাকে দেখলে আমি একটা টাইপ বুঝতে পারি। ছেলেকে বড় করেছেন, ছেলে ভালো চাকরি পেয়েছে, ভালো পড়াশুনা করে, ভীষণ ফিল গুড ব্যাপার। সবাই ওকে রত্নগর্ভা বলবে।

তা বলে উনি অন্যের মেয়ের সম্পর্কে এতটা অসংবেদনশীল কী করে হন?

একটু সুস্থির হয়েই উনি বাড়ি মাথায় করা শুরু করে দিলেন, ‘এই মেয়ে এই বাড়িতে কেন? কেন কেন কেন কেন কেন? বের করে দে। এই মেয়েকে রাখা যাবে না’।

জোরে জোরে মাথা নেড়ে যাচ্ছেন কুড়ি হাজার লোকের কনসার্টে গান গেয়ে যাওয়া রূপম ইসলামের মতো। আমাদের কলেজে রূপম এসেছিলেন। ‘চক্রব্যুহে আজওওওও’ বলে রূপম মাথা নাড়ছেন। সবাই মাথা নাড়ছে, এমন একটা পরিবেশ তৈরি হয়ে যাচ্ছে যেন রূপমই আমাদের ভগবান। উনি যদি বলেন তোমরা এখন কলেজের পুকুরে সবাই মিলে ঝাঁপ দাও, আমরা তাই দিয়ে দেব। সম্মোহনের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে যাওয়া যাকে বলে।

পার্থক্যটা হল, হিমুর মা কাউকে সম্মোহিত করতে পারছেন না। হিমুর দুষ্টু মামা দূরে বসে হাই তুলছেন। কাকি মামিরা দূর থেকে ড্রোন ক্যামেরা আর সিসিটিভির মতো দেখে যাচ্ছেন। কারো কোনও নড়চড় নেই। আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। কেন কেন কেন কেন কেন…বলে এক সময় ওঁর হাঁফ উঠল, আমি ইন্ডিয়ান আইডলের জাজের মতো শান্ত গলায় বললাম, ‘আমি আরেকটা তত্ত্ব পাঠাব বুঝলেন? একটা হারমোনিয়াম। আপনি সকালে উঠে কেন কেন কেনটা সা আর পা একসঙ্গে টিপে গলা সেধে যান। আপনার হবে। তবে দমের ঘাটতি আছে। গলায় একটা যষ্টিমধু রাখবেন। তাহলে খানিকটা রেহাই মিলবে’।

হিমুর মা মাথা দুলিয়ে বললেন, ‘বেশ্যা মাগি, তোর লজ্জা লাগে না, তুই এ বাড়িতে এসেছিস? তোকে আমরা লাত্থি মেরে তাড়িয়েছি, তারপরও তুই এসেছিস? কেন এসেছিস? কেন কেন কেন কেন কেন?’

জীবনে প্রথম কেউ আমাকে বেশ্যা বলল। শব্দটা মনে হয় সব মেয়েকেই জীবনে একবার না একবার শুনতে হয়। কাছে পিঠে হিমুও নেই যে এসে বলে যাবে, ‘আমার নীপা বেশ্যা নয়’! পুরোই স্যাড লাইফ।

আমি চেয়ার নিয়ে বসে বললাম, ‘আহ, তু তু তু তু’।

হিমুর মা লাফাতে শুরু করলেন। ভোরে টিভিতে এক ভদ্রলোক প্রথমে প্রাণায়ম দিয়ে শুরু করেছিলেন, এখন জিনিস বেচেন। হয়তো ভোটেও দাঁড়িয়ে পড়বেন কোনওদিন।

আমার বাবাও করত। ফোঁৎ ফোঁৎ করে শ্বাস ছাড়ত। ওই সব প্রাণায়ামের জন্যই হয়তো জীবনে বেশি যৌবন চলে আসায় বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গেছিল। তীর্থে যাবার বয়সে দ্বিতীয় বউয়ের পুচকে বাচ্চাকে কোলে নিয়ে চাঁদমামা দেখিয়ে বলবে, ‘আয় আয় টি দিয়ে যা’।

হুট করে ফুটে গেলে সে সংসারটাও আমার মা দেখবে। কোনও সমস্যা নেই কারো।

হিমুর মাকে দেখে মনে হচ্ছে কোনও ব্যায়াম টিচার গুরুদেব এভাবেই ওকে অদৃশ্য কোনও সুতো দিয়ে লাফানোর নির্দেশ দিচ্ছেন, আর উনি নেচে যাচ্ছেন।

আবার অপেক্ষা। উনি থামলে আমি বললাম, ‘আহা, এত তাড়াতাড়ি রেস্ট নিলে হবে না। আবার শুরু করুন, ওয়ান টু থ্রি…’

হিমুর মা আমার হাত ধরে টেনে ঘর থেকে বের করে দিতে গেলেন। লাভের লাভ হল উনি স্লিপ করে মেঝেয় পড়লেন। আমার হাতে তো শাখা পলা নেই যে ওতে আটকাবে। পড়ে গিয়ে ‘উউউউউউউউউউ’ করে কাঁদতে শুরু করলেন। এবার হিমুর বুলডোজার মামা উঠে দাঁড়ালেন। ‘দিদি দিদি’ করতে করতে আসছেন।

আমি বললাম, ‘দিদিকে বলুন ছেলেকে সামলে রাখতে। আমি শখ করে এ বাড়িতে আসছি না। হিমু সকাল বিকেল রাত, একবার আমার বাড়ি আর একবার কলেজ করে যাচ্ছে। আমি আসতে চাই না। আপনাদের ছেলেকে আপনারা সামলান’।

এই সময়েই চ্যালেঞ্জ সিনেমায় দেবের এন্ট্রির মতো হিমুর এন্ট্রি হল। ঘরে ঢুকে আমাকে দেখে আবেগে আনন্দাশ্রু ধরে রাখতে পারল না। ‘তু তু তুমি এসেছ?’

আমি বললাম, ‘বউ গেলে বউ পাবি রে পাগলা, মা গেলে পাবি না। যা মাকে সামলা’।

হিমু মাকে দেখে খাবি খেল।

১৬

কোথাও আগুন লেগে গেলে সেখানে বেশিক্ষণ থাকার নিয়ম নেই। কত্থক, ক্ল্যাসিকাল আর ব্রেক ডান্স একসঙ্গে দেখার সৌভাগ্য সব লোকের হয় না। আমার হয়েছে। আমি হিমুর মায়ের মধ্যে এই তিন নাচের ত্রিবেণী সঙ্গম দেখে হিমুদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলাম। মাকে ফেলে হিমু আমার পেছনে আসতে পারল না।

আমি পা চালিয়ে বাড়ি চলে এলাম। মা স্কুল থেকে চলে এসেছিল। আমাকে দেখে বলল, ‘আমার মনে হয় তুই এখানে থাকিস না। তুই এখানে থাকলে ওই ছেলেটা বার বার আসবে। কিছুদিন তুই ছোটমামার বাড়িতে থেকে আয়। হিমুর ছুটি শেষ হলে ফিরে আসবি’।

আমি জোরে জোরে মাথা নাড়লাম, ‘একদম না। আমি ছোটমামার বাড়ি গিয়ে ছোটমামিকে সামলাতে পারব না। তার থেকে হিমুকে সামলানো সোজা’।

মা আর কিছু বলল না। আমি আমার ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ে ছাদ দেখতে শুরু করলাম। ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করা দরকার এটাই সবাই বলে। আমাকেও চিন্তা করতে হবে।

মামিরা বলেছে, আমি একজন মেয়ে। একজন মেয়ের কাজ হল সব সময় মাথা নিচু করে থাকা। মাথা উঁচু করলে নাকি সে মেয়ে খারাপ হয়ে যায়। বাস্তবে ব্যাপারটা তাই না। মামি মাথা নিচু করে থেকে থেকে ছোটমামাকে এমন রোগা করে দিয়েছে, ইস…আমি কিন্তু অন্য কিছু বলতে চাইনি। না চাইলেও ব্যাপারটা সেদিকে ইঙ্গিত করছে। না না, সেটা বলিনি। তবে আমার ছোটমামার ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং করার ব্যাপারটা নিয়ে গবেষণা হওয়া উচিত। একজন রুগ্ন মানুষ কী করে এসব করতে পারে? অপুষ্টি অনাহারে ভুগতে ভুগতে যে কোনওদিন ত্রাণ তহবিলে লোকটাকে জমা করে দিতে পারে পাড়ার লোকজন।

‘তুই মরবি। তোরে কেউ বাঁচাইতে পারব না’।

দিদা এসে গেছে। আমি পাত্তা দিলাম না। বকে যাক বুড়ি।

পা দোলাতে থাকলাম। বুড়ি বলে চলল, ‘তুই হলি শয়তান মাগি। নিজের ছাড়া কিছুই বোঝোস না। ছ্যামরাটা এতবার কইরা আইতাসে, তুই ওরে ভাগায় দিতাসোস কেন?’

আমি এবারেও উত্তর দিলাম না। হতে পারে এই প্রশ্নটা বুড়ির না। আমারই অবচেতন মনের। মনের ভেতরে আমার এই কথাগুলোই ঘুরপাক খেতে থাকে। কত শক্ত আমাদের মন? যতই প্রতিরোধ আসুক, হিমু এভাবে বার বার আসছে, মনের দুর্গের পতন হওয়া আশ্চর্যের নয়।

আমি অন্য কথা ভাবতে লাগলাম। দুপুরবেলা ঘুম ভাঙলে আমি বুঝতাম না সেটা ভোর না বিকেল। আমি উঠে বসে থাকতাম। ভীষণ মন খারাপ করত দুপুরে ঘুমোলে। বাবা আমাকে সাইকেলে করে বাজারে নিয়ে যেত। ফুচকা খাওয়াত। পুতুল কিনে দিত। আমি সেই সময়টার কথা ভাবতে লাগলাম। পালানো দরকার। নিজের থেকেই পালানো দরকার। নইলে যে বিষয়টা নিয়ে ভাবাই উচিত না, সে বিষয়টাই মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকবে। আমি পাগল হতে থাকব। কিছুতেই পাগল হওয়া যাবে না। একা একা বসে থাকব, বিড় বিড় করব, দেওয়ালে মাথা কুটব, এসব কিচ্ছু করা যাবে না।

মা’র কথা ভাবা দরকার। মা একা হাতে সব সামলাচ্ছে। কত টাকা লোন নিয়ে আমার বিয়ে দিয়েছে। গয়না কিনে দিয়েছে। সে গয়নাও উদ্ধার করে আনতে হবে। সরাসরি না দিলে থানায় ডায়েরি করতে হবে। মা কি এত দূর ভেবেছে? নিশ্চয়ই ভেবেছে। না ভেবে মা থাকতে পারে না। এত শক্ত মনের মানুষ আমি খুব কম দেখেছি। অন্য কেউ হলে এতদিনে…নাহ, আবার আজেবাজে ভাবছি। আমি কেমন পাগল পাগল হয়ে যাচ্ছি। কিছুতেই পাগল হওয়া যাবে না। কিছুতেই না। কলিং বেল বেজে উঠল।

আমার কেন জানি না মনে হল, এই কলিং বেলটা আমার জন্যই বেজেছে। তাড়াতাড়ি বাইরে বেরিয়ে দরজা খুলে দেখলাম বাবা ভীষণ ঘামছে। জোরে জোরে শ্বাস ফেলছে। মাও কলিং বেলের শব্দ শুনে এসেছে। দুজনে একসঙ্গেই জিগ্যেস করলাম, ‘কী হয়েছে?’

বাবা জানাল, নতুন মা বাথরুমে সাবান জলে স্লিপ খেয়ে পড়ে

গেছে। মাথায় ভীষণ লেগেছে। দোকান থেকে এসে দেখেছে মেঝেতেই পড়ে আছে…

১৭

হাসপাতাল, শ্মশান বা কবরস্থান, থানা, আদালত।

এই জায়গাগুলো আমি যমের মতো ভয় পাই। অথচ না চাইতেও যেতে হয়।

বাবা কাঁপছে, হাঁফাচ্ছে, অসহায়ের মতো বাবার দু’চোখ দিয়ে জল পড়ে যাচ্ছে। নতুন মাকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে দেখেছে, সিট নেই। নার্সিং হোমে রেখে এসেছে। অত টাকা কোত্থেকে পাবে? মার কাছে চলে এসেছে।

মা বলল, ‘ঠিক আছে। চিন্তা করো না। আমি টাকার ব্যবস্থা করছি। তুমি সীমার কাছে যাও। নীপাকেও নিয়ে যাও। একা যেও না। পারবে না। নীপা, বাবাকে একা ছাড়বি না। তুই আমার এটিএম কার্ডটা রাখ। যা বিল আসে, দিয়ে দিস’।

বাবা সত্যিই কেমন করছে। টোটো ডেকে নার্সিং হোমে গিয়ে আবার

আমি অসুস্থ হয়ে পড়লাম। আমার বুক ধড়ফড় করতে শুরু করল। ছোটবেলায় যেভাবে বাবার হাত চেপে ধরতাম, সেভাবে হাত চেপে ধরে বললাম, ‘বাবা, বাড়ি চলো’।

বাবা বলল, ‘ভয় পাস না। আমি আছি তো। আমি গেলে কী করে হবে বল?’

বুঝলাম আমি স্বার্থপর হয়ে যাচ্ছি। ধীরে ধীরে হাত ছেড়ে বসলাম। দিদার ক্ষেত্রে যা হয়েছিল, নতুন মার ক্ষেত্রে সেটা হল না কেন? একেক জনের জন্য একেকরকম কেন হবে? সাবান জলে আছাড় খেয়ে পড়লে মাথার পেছনে লাগবে। আচমকা ওই জায়গায় লাগলে অনেকেই বাঁচে না। নতুন মা বেঁচে গেছে। কপাল ভালো। অবশ্য কপাল ভালো না হলে কি আর বাবাকে বিয়ে করে?

ভয়, হতাশা, বাবার জন্য দুঃখ সব কিছু কেমন তালগোল পাকিয়ে গেল। আমি দেখছি বাবা কেমন দৌড়ে দৌড়ে যাচ্ছে। ডাক্তারদের সঙ্গে কথা বলছে।

আরও রাগ হয়ে যাচ্ছে আমার।

কিছুক্ষণ পর বাবার মুখে হাসি ফিরল। আমার কাছে এসে বসে বলল, ‘যাক। বাচ্চা আর মা দুজনেই সুস্থ আছে। ঠিক সময়ে নিয়ে আসা হয়েছিল’।

আমি স্বস্তির ভাব করলাম, ‘যাক’।

বাবা বলল, ‘তুই ও বাড়ি গেছিলি?’

আমি বললাম, ‘হ্যাঁ। দুপুরে ছিলামও তো। আমি থাকলে কি আর এসব হত?’

বাবা বলল, ‘কপাল। তোর মার কতগুলো টাকা চলে গেল। আমি যে কী করে এই টাকাগুলো ফেরত দেব, আমি নিজেই জানি না’।

আমি কিছু বললাম না আর। বাবা ছটফট করছিল। কিছুক্ষণ পর নতুন মার সঙ্গে দেখা করতে গেল।

‘ঠিক আছে সব?’

কোত্থেকে হিমু চলে এসেছে বুঝতে পারিনি। চমকালাম খানিকটা। যারা ফলো করে, তারা কি এভাবেই ফলো করে? নার্সিং হোমেও আসতে হবে? এরপর শ্বশুরের দ্বিতীয় পক্ষের সন্তানকে কি করবে? কোলে নিয়ে ঘুরে

বেড়াবে?

আমি বললাম, ‘তুমি এখানে কী করছ? মজা দেখতে এসেছ?’

হিমু বলল, ‘তোমাদের বাড়ি গেছিলাম। তোমার মা বললেন, তুমি এখানে। আমি চলে এলাম। সব ঠিক আছে?’

আমি বললাম, ‘কিচ্ছু ঠিক নেই। তুমি এখানে থাকলে সব কিছু আরও খারাপ হয়ে যাবে। তুমি যাও’।

হিমু বলল, ‘চলে যাব। আমি তো তোমাকে সাপোর্ট দিতে এলাম’।

আমি শ্বাস ছাড়লাম। এ ছেলের পিছু ছাড়ানো ভীষণ কঠিন। যেখানেই যাব, ভোদাফোনের কুকুরের মতো আমার পেছন পেছন ঠিক চলে আসবে। ওর জানা উচিত ওকে আমি বিন্দুমাত্র পছন্দ করছি না, ভালোবাসার প্রশ্নই নেই, কেন বিয়ে করেছি তাও জানি না, তবু এঁটুলির মতো লেগে থাকবে।

আমি বললাম, ‘তোমার মা জানেন তুমি এখানে এসেছ?’

হিমু কুঁকড়ে গেল, ‘না। মাকে বলিনি। মাকে বলার দরকার নেই’।

বাবা এসে অসহায় গলায় বলল, ‘মা নীপা, ওষুধের জন্য হাজার পাঁচেক টাকা চাইছে। এটিএম-টা আছে না তোর কাছে?’

আমি ব্যাগ হাতড়াতে গেলাম, হিমু বলে উঠল, ‘আমি দিয়ে দিচ্ছি। চলুন চলুন’।

বাবা যেন হাতে চাঁদ পেল। হিমুকে নিয়ে ওষুধের কাউন্টারের দিকে দৌড়ল।

অভাব মানুষকে কতটা নির্লজ্জ আর অসহায় করে দেয়, বাবাকে না দেখলে আমি জানতে পারতাম না।

১৮

চেনা লোকগুলো হঠাৎ করে অচেনা হয়ে গেলে যে কষ্ট হয়, তার তুল্য আর কিছু হয় না বোধ হয়। যে বাবা আমি পড়তে গেলে আধঘণ্টা আগে থেকে স্যারেদের বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে থাকত, সে লোক নতুন মাকে নিয়ে এত

ব্যস্ত হয়ে গেল যে নার্সিং হোম থেকে নতুন মা ছাড়া পাবার পর আমি যে ছিলাম সেটাই ভুলে গেল। রাতের বেলায় দিব্যি নতুন মাকে নিয়ে বাড়ি ফিরে গেল।

আমার মনে হল এর থেকে বাবা মরে গেলে ভালো হত। বেঁচে থেকে তার অনাদরে থাকার থেকে সে লোক মরে গেলে ভালো।

হিমু নার্সিং হোমের বাইরে আমাকে দেখে বলল, ‘আর কোনও চিন্তা নেই। চলো তোমাকে বাড়ি দিয়ে আসি’।

আমি বললাম, ‘দরকার নেই। তুমি কেটে পড়। আমি চলে যাব’।

হিমু জোরে জোরে মাথা নাড়ল, ‘না না। আমি যাব না। তুমি বুঝতে পারছ না, এ জায়গাটা ভালো না’।

আমি আমাদের বাড়ির রুটের বাস পেয়ে গেলাম। বাসে উঠে পড়লাম। পেছন পেছন হিমুও উঠল। বাস ফাঁকাই ছিল। সিটও পেলাম। হিমু আমার পাশে বসতে গিয়েও বসল না। আমি জানলার বাইরে তাকালাম। এবার চোখে জল চলে এল বাবার কথা ভেবে। বাবা যেন সব কিছুতে আমাকে হারিয়ে দিয়ে চলে গেল। আর কাউকে আমি বিশ্বাস করতে পারব না। লোকটা একটা ছোট বাচ্চাকে কোলে নিয়ে আহ্লাদ করবে, আমার থেকে অনেক বেশি ভালোবাসবে ভাবলেই মাথায় আগুন জ্বলে যাচ্ছিল।

‘বাদাম খাবে?’

হিমু দাঁড়িয়ে ছিল। ওর হঠাৎ মনে হয়েছে আমার বাদাম খাওয়া দরকার। মনে পড়ল আমি অনেকক্ষণ না খেয়ে আছি। কিন্তু হিমুকে হ্যাঁ বললে ও

প্রশ্রয় পেয়ে যাবে। ঘ্যান ঘ্যান করতে শুরু করে দেবে। আমি মাথা নাড়লাম, ‘না’।

হিমু বাদাম কিনে নিজেই খেতে শুরু করল।

একটা স্টপ পরেই আমার নামার কথা। উঠে দরজার কাছে গেলাম, হিমু পেছন পেছন এল। আমি ফিরে বললাম, ‘তুমি চলে যাও। আমি চলে যাচ্ছি’।

হিমু বলল, ‘না না। কতক্ষণ আর লাগবে’।

আমি এবার ভীষণ রেগে গেলাম, ‘ন্যাকামো হচ্ছে? আমি কি বাচ্চা নাকি? চলে যাব। যাও, ভেতরে গিয়ে বসো’।

হিমু থতমত খেয়ে একটা সিটে বসে পড়ল।

বাস থামার একটু আগেই আমার মনে পড়ল অশ্বত্থতলার পাশ দিয়ে যেতে আমার ভয় লাগবে। আমি ভূতের ভয় পাই না। কিন্তু ওখানে কেমন একটা ভয় লাগে। ভূতের ভয় ছাড়াও আমি আরেকটা জিনিসের খুব ভয় পাই। অন্ধকারে একটা ঘিনঘিনে হাত এসে আমার মুখ চেপে নিয়ে যাবে ভাবলেই বমি পায়। আমি ঘামতে শুরু করি। প্রবল কান্না পায়।

হিমু অন্য দিকে মুখ করে আছে। আমি ডাকলাম, ‘চলো’।

হিমু লাফিয়ে চলে এল। বাস থামলে আমার সঙ্গে নেমে বলল, ‘রেগে গেলে কেন হঠাৎ করে?’

আমি বললাম, ‘ও কিছু না। চলো’।

হিমু বাদাম খেতে খেতে হাঁটছে। আমি ওর থেকে দুটো বাদাম নিলাম। হিমু পিটপিট করে আমায় দেখছে। বুঝতে পারছে না আমার হঠাৎ কী হল।

অশ্বত্থতলা পেরোনোর পর বললাম, ‘এবার তুমি যেতে পারো। আর চিন্তা নেই’।

হিমু বলল, ‘আমি আজ তোমাদের বাড়ি থেকে যাই। রাত হয়ে গেছে। আবার বাড়ি যাব?’

আমি বললাম, ‘তোমার মাকে সামলানো যাবে না তাহলে। ওই ঝুঁকি নেওয়া যাবে না। যাও’।

হিমু বলল, ‘তুমি তো আমার বউ। মাকে সামলানোর তো কিছু নেই’।

আমি বললাম, ‘আমি কারো বউ না’।

হিমু মাথা চুলকে বলল, ‘তাহলে আমি তোমার বউ। তুমি আমার বর’।

আমি হেসে ফেললাম এবার, ‘তোমার মাথাটা গেছে’।

হিমু গেল না। পেছন পেছন আমার বাড়ি অবধি এল। আমি ঘরে ঢুকলে তারপর ফেরার পথ ধরল। মা ড্রইং রুমেই বসে ছিল। আমাকে দেখে বলল, ‘ঠিক আছে সব?’

আমি আর বললাম না, বাবা আমাকে ফেলে রেখেই চলে গেছিল। শুধু বললাম, ‘হ্যাঁ। ঠিক আছে। তুমি খেয়েছ?’

মা বলল, ‘না। চল একসঙ্গে বসি’।

মা উঠতেই আমি মাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললাম। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করলাম। মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। একটাও কথা বলল না…

১৯

‘কী রে, কেমন লাগে? তোর বাবা তোরে লাত্থি মাইরা ওই মাইয়ারে নিয়ে চইল্যা গেল। ভাল্লাগসে?’ খিলখিল করে হেসে যাচ্ছে দিদা। আমি পাত্তা দিচ্ছি না। ঘরের মধ্যে আনন্দে নেচে যাচ্ছে।

আমি দেখেছি, কাউকে একটু পাত্তা দিলেই সে এমনভাবে মাথায় উঠে নাচতে শুরু করে যে তারপরে আর সামাল দেওয়া যায় না। আমার উচিত হয়নি হিমুকে ডাকা। এর ফলে ও নিশ্চয়ই ভেবে নেবে আমি চাইছিলাম ও আমার সঙ্গে আসুক। খুব ভুল হয়েছে। যে ছেলের মা আমার সঙ্গে ওরকম ব্যবহার করেছে, তার ছেলের সঙ্গে আমার কথা বলাই উচিত না।

ঘুমিয়ে পড়লাম কখন যেন। ভোরে ঘুম ভেঙে গেল। আগে ভোরে ঘুম ভাঙলে হাঁটতে বেরোতাম। একদিন বেরিয়ে দেখলাম একটা লোক আমায় দেখে প্যান্টের চেন নামিয়ে দিল। তারপর থেকে আমি আর বেরোই না। আমার অনেক শিক্ষা হয়েছে।

এই লোকগুলো আমাদের চারপাশেই থাকে। সুন্দর সংসার করে। রবিবারে মাংসের দোকানে লাইন দেয়। ছুটির চারমাস আগে ট্রেনের টিকিট কাটে। বউ বাচ্চা নিয়ে হই হই করে পুরীতে গিয়ে সমুদ্রে স্নান করে। মন্দিরে পুজো দেয়। পাড়ায় ভদ্রলোকের মতো দুর্গাপুজোর সময় প্যান্ডেলে গিয়ে বসে। অঞ্জলি দেয়। মেয়ের বিয়েতে সম্প্রদান করে।

আবার এই লোকগুলোই আলাদা হলে পুরুষাঙ্গ উঁচিয়ে বাসে বসা মেয়েদের ধাক্কা মারে। দাঁড়িয়ে থাকলে পেছন দিয়ে ঠেলবে। এত উচ্চশ্রেণীর খানকিগুলো এত ভদ্রভাবে রাস্তায় ঘুরে বেড়ায় যে কেউ কিছু বুঝতে পারে না। মেয়েরা বোঝে। শুরুর দিকে উত্তেজিত হয়। চিৎকার করে। পরের দিকে কিছু বলে না। ক্লান্ত চোখে তাকিয়ে থাকে। কর, কত করবি কর।

এসব লোকের জন্য বেরোনো হয় না। চেয়ার নিয়ে বারান্দায় বসে রইলাম। খানিকক্ষণ বসে থেকে মনে হল আজ বরং আমি রান্না করি। মা’র কাজ খানিকটা হলেও কমবে। রান্নাঘরে গিয়ে ভাত বসিয়ে দিলাম। মা ভাত আগে করে। আমিও তাই করলাম। ভাতের ফ্যান গালাটা একটু কঠিন হতে পারে। সেটা দেখতে হবে। হাড়ি ওল্টাতে গিয়ে একবার সিংকের মধ্যে সব ভাত ফেলে দিয়েছিলাম।

আমার কিছু একটা আছে। হাত দুর্বল হয়ে যায় হঠাৎ করে। হাতে কিছু একটা ধরে আছি হয়তো। ফেলে দিলাম কখন যেন নিজের অজান্তেই।

ফ্রিজের মধ্যে কাতলা মাছ আছে। মাছ বের করে জলে দিলাম। মিনিট পাঁচেক পরে আর রান্না করতে ইচ্ছে হল না। হাত ধুয়ে আবার সামনের ঘরে গিয়ে বসলাম। শুধু খেয়াল রাখতে হবে ভাতটা কখন হয়েছে। মাকে ফুল সারপ্রাইজ দেওয়া গেল না। শুধু ভাত সারপ্রাইজ দেওয়া হবে।

তাই হোক।

হিমুকে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। রাস্তায় ঘুরঘুর করছে। আমি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। এই ছেলেকে সহজে ঘাড় থেকে নামানো যাবে না। দরজা খুলে বাইরে এসে হাত নেড়ে ডাকলাম। হিমু এসে বলল, ‘মর্নিং ওয়াক করছি বুঝলে নীপা। ওয়াকিং ইজ গুড ফর হেলথ। আমি ফিট হতে চাই। ফিট হওয়াটা খুব দরকারি’।

আমি বললাম, ‘এ পাড়াতেই হাঁটতে আসতে হল?’

হিমু বলল, ‘হ্যাঁ। তোমাদের পাড়ায় অক্সিজেন বেশি। তুমি আছ তো। তোমার কাছাকাছি এলে আমার ফুসফুস বেশি অক্সিজেন নিতে পারে। দেখো, আমি পালস অক্সিমিটার নিয়ে ঘুরছি। এই দেখো আমি তোমার থেকে দূরে গিয়ে আমার শরীরের অক্সিজেন মাপছি’।

এ কী? সত্যি সত্যিই পালস অক্সিমিটার নিয়ে কে ঘোরে?

হিমু আমার থেকে চার পা পিছিয়ে তর্জনীটা পালস অক্সিমিটারে দিয়ে বলল, ‘এই দেখো, ৯৬’। এবার আমার কাছে এসে বলল, ‘এই দেখো। ৯৯ হয়ে গেছে। তোমার মধ্যে জাদু আছে। বউ বলেই তুমি এখন গাছ হয়ে গেছ। অক্সিজেন দিচ্ছ বেশি বেশি’।

ছেলেটা একবারেই আউট অফ অর্ডার হয়ে গেছে। আমি বললাম, ‘এসো। চা খাও’।

হিমু সাগ্রহে ঘরের ভেতর এল। চা করলাম, খেলো। ভাত হয়ে এসেছে বুঝতে পারলাম। হিমুকে বললাম, ‘এসো। ভাতের হাড়িটা উলটে দাও’।

হিমু আরও উৎসাহ নিয়ে হাড়িটা ওল্টাতে গিয়ে আমার মতো সিংকে সব ভাত ফেলে দিল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *