নীপাদের বাড়ি – ৫০

৫০

‘বাবা। ও বাবা’।

বাবার জ্বর হয়েছে। অনেক জ্বর।

আমি বাবাকে ডাকছি।

নতুন মার পেটটা কত বড়। ক্লান্ত মুখে বসে আছে। আমি দেখছি না আর সেসব। আমি বাবাকে দেখছি। বাবা কাতরাচ্ছে। শুনতে পাচ্ছে না মনে হয় আমি ডাকছি।

নতুন মা বলল, ‘জ্বর এসেছে এখন। ডাকিস না। শুনতে পাচ্ছে না। জ্বর কমলে আবার স্বাভাবিক হবে’।

আমি হতভম্ব গলায় বললাম, ‘এত খারাপ অবস্থা কী করে হল?’

নতুন মা বলল, ‘ঠান্ডা লেগেছিল। চিকিৎসা করায়নি। শুধু কাশত। কত করে বলেছি ডাক্তার দেখাও। শোনেনি। টাকা ছিল না তো’।

আমি কেঁদে ফেলেই সামলে নিলাম। বললাম, ‘বাবাকে ও বাড়ি নিয়ে যেতে হবে। এখানে থাকলে সমস্যা বাড়বে বলে মনে হচ্ছে। স্যাঁতস্যাঁতে ঘর তো’।

নতুন মা বলল, ‘অপেক্ষা কর। তোর বাবার জ্ঞান ফিরুক। যা বলবে তাই করিস’।

আমি বললাম, ‘বাঁচবে না তো। ও বাড়িতে নিজের ঘরে থাকবে অন্তত’।

নতুন মা শূন্য চোখে ছাদের দিকে তাকিয়ে বসে রইল। আমি কান্না চেপে রাখতে পারছিলাম না। বললাম, ‘তুমি কেমন আছ?’

নতুন মা বলল, ‘ঠিক আছি’।

বললাম, ‘ডেট কবে?’

নতুন মা বলল, ‘পরশু’।

আমি বললাম, ‘বাবার এই অবস্থায়, তোমার এই অবস্থায় তুমি এখানে থাকবে?’

নতুন মা এত দুঃখেও হেসে ফেলল, ‘আমার তো আর কোথাও যাবার জায়গা নেই রে। তুই তোর বাবাকে নিয়ে যা বরং। আমি সেরকম হলে আজ থেকেই হাসপাতালে গিয়ে ভর্তি হয়ে যাচ্ছি’।

আমি বাবার কপালে হাত রাখলাম। সত্যিই অনেক জ্বর। ভেতরটা ভেঙে যাচ্ছে আমার। এই লোকটাকে আমি সব থেকে বেশি ভালোবাসতাম। সব থেকে বেশি ঘেন্না করতাম।

এখন এই লোকটা আমার থেকে দূরে থাকে। অনেক দূরে। কিন্তু আমার আর কিছু মনে পড়ছে না। আমার কষ্ট হচ্ছে। সে কষ্টের সীমা পরিসীমা নেই। আমার বুক ফেটে যাচ্ছে।

কতক্ষণ বসে ছিলাম জানি না, যেন সময় থমকে দাঁড়িয়ে ছিল।

একটা সময় বাবার জ্ঞান ফিরল। বাবা চোখ খুলে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কখন এলি মা?’

আমি বাবার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়লাম, ‘তুমি বাড়ি চলো বাবা। এখানে থাকলে তুমি মরে যাবে’।

বাবা উত্তর দিল না। এই তো। এই বাবাকে আমি চিনি না। শুধু বুঝলাম বড় করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

আমি সামলে নিলাম। উঠে বসে বললাম, ‘তোমরা দুজনে এই সময়টা ও বাড়ি গিয়ে থাকো বরং’।

বাবা নতুন মাকে বলল, ‘কিছু আছে? ওকে খাওয়াও। ডিম আছে না? ডিম ভাজা করো’।

আমি বললাম, ‘না না। আমি কিছু খাব না। তুমি ডাক্তার দেখাবে না?’

বাবা বলল, ‘হ্যাঁ। দেখাব। পরশু দেখাব’।

আমি বুঝলাম বাবা মিথ্যে বলছে। কতক্ষণ আর এভাবে সহ্য করা যায়? আমার বাবা আমাকে অম্লানবদনে মিথ্যে বলে যাচ্ছে। আজ থেকে না। চিরকাল বলছে। যে মেয়েকে পরীক্ষার দিন ছেড়ে চলে যেতে পারে, সে লোক সব পারে। আমি রেগে মেগে উঠে দাঁড়ালাম, ‘ঠিক আছে। আমি আসি আজ’।

বাবা বলল, ‘যা। সাবধানে যা’।

আমি আর দাঁড়ালাম না।

পাথরের মতো মুখ করে রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলাম, কখন অনীশ চলে এসেছে জানি না। আমাকে ফলো করছিল নাকি, তাও জানি না। বাইক দাঁড় করিয়ে বলল, ‘কোথায় যাবি? চল নামিয়ে দিচ্ছি’।

বললাম, ‘তুই চলে যা’।

অনীশ আমার কাঁদো কাঁদো মুখ দেখে বুঝল কিছু একটা হয়েছে। এবার জোর করল, ‘তুই চল। হাঁটতে হবে না। বাইকেই যাবি। চল চল’।

আমি আর বাধা দিলাম না। অনীশের বাইকে উঠলাম। অনীশ খানিকটা যাবার পর বিধানদার চায়ের দোকানে বাইক দাঁড় করিয়ে বলল, ‘আয়, চা খা’।

চা খেলাম। দোকানের সবাই আমার দিকে কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আমি কাউকে চিনি না। শুধু চা খেয়ে গেলাম।

চা খাওয়া হলে অনীশ খানিকটা যাবার পর বাইক দাঁড় করিয়ে বলল, ‘তোর কষ্ট দেখে খারাপ লাগছে রে নীপা। আমি মনে হয় তোকে ভালোবেসে ফেলেছি’।

আমি চমকালাম না। শুধু বললাম, ‘রাত হচ্ছে। বাড়ি দিয়ে আয়’।

৫১

‘কী কইসিলাম তোরে? ও ছ্যামরা তোর সঙ্গে শুইতে চায়। বুঝছস?’

দিদা কানের কাছে ঘ্যান ঘ্যান করে যাচ্ছে। আমার মাথা কাজ করছে না। আউলে গেছে। অনীশ এরকম কথা বলবে আমি হয়তো জানতাম ঠিকই।

কিন্তু বাবাকে দেখে আসার পর এ কথায় রাগ বেশি হচ্ছে।

নিশি বিশ্রীভাবে চিৎকার করে যাচ্ছে। নিশির বাবা নাকি নিশিকে ঝাড়াবে। নিশিকে নাকি ভূতে ধরেছে। এক ওঝা আছে, নিশিকে সর্ষে পোড়া দেবে।

মানুষের রোগ ওঝায় সারিয়ে দেবে। তাও ঝাঁটা মেরে। নিশি হয়তো খোলা চুলে রাতের বেলা বেরিয়েছিল, তখন কোনও পেতনি ওর শরীরে আশ্রয় নিয়েছে।

মা চুপ করে বসে আছে। মাকে বাবার কথা বলিনি। মাকে বললাম, ‘ওঝা আসবে, কেউ কিছু বলবে না?’

মা কেমন যেন চমকে উঠল, ‘ওসব মাথায় নিস না। ওরা যা পারে করুক’।

আমি বললাম, ‘তুমি এ কথা বলছ?’

মা ক্লান্ত মুখে বসে রইল। আমি বুঝতে পারলাম মার ভেতরটা তোলপাড় করছে। কতক্ষণ আর কেউ অভিনয় করে শক্ত হয়ে থাকতে পারে? সব শক্ত পাথরই একসময় ভেঙে যায়। আমি আর মার সামনে বসে থাকতে পারলাম না। আমার ঘরে চলে এলাম। দিদা পেছন পেছন এসে বলল, ‘তোর কাছে ও ছ্যামড়া আসে ক্যান জানোস? হাতকাটা পইরা থাকলে তর বগল দেখা যায়। ওই দ্যাখতে আসে। বুঝছস? চোখের আরাম করে’।

আমার মাথা দপদপ করতে শুরু করল। বললাম, ‘তুমি চুপ করবে?’

দিদা খিলখিল করে হাসে। আবার বলে, ‘ওই ছ্যামরার লগে একদিন শুইয়া ল। আর আইব না। আর ভালোবাসব না। ভালোবাসে না কেউ। সব শুইবার ধান্দা। কাম শেষ হইলেই অন্য মাইয়া দেখব। বুঝস না তুই? তোর বাপেরে দ্যাখসস না?’

আমার বমি উঠে এল। ছুটে গিয়ে বমি করলাম। দিদা বলেই যাচ্ছে, ‘ওই দেখো! বমি কইরা কী হইব? এমনি এমনি বমি করে নাকি রে মাগি? পেট বান্ধা। পেটে বাইন্ধাইয়া বমি কর মাগি’।

আমি তুলো নিয়ে কানে গুঁজলাম। দিদা সামনে বসে বকে যায়, আমি আটকাতে পারছি না! সব কথা কানে এসে যাচ্ছে, ‘ছেলেরা কী চায় বুঝস? আরাম চায়। তুই আরাম দিবি। তারপর তুই বাচ্চা দিবি, পেট ফুলবে, বাচ্চা বাইরাবার পর তর পেটে চর্বি হইবে, সেলাই পরবে। তখন তরে আর ওগো ভাল্লাগবো না। অন্য মাইয়া পাইয়া শুইতে যাইব’।

আমি চিৎকার করে উঠলাম, ‘তুমি চুপ করবে?’

দিদা বিশ্রীভাবে হেসে যেতে লাগল। আমার চিৎকার শুনে মা চলে এল, বিস্মিতমুখে বলল, ‘কীরে, কী হয়েছে?’

আমি থরথর করে কাঁপছি, কোনওরকমে বললাম, ‘কিছু না’।

মা আমার কপালে হাত দিয়ে বলল, ‘জ্বর নেই তো। তাহলে কি অন্য কিছু হয়েছে?’

আমি মাথা নাড়লাম, ‘না না। কী আর হবে? সেরকম কিছু হয়নি’।

মা বলল, ‘বল না, কী হয়েছে? এরকম চিৎকার করে উঠলি কেন? জানলা থেকে কেউ উঁকি দিয়েছে? দেখি!’

মা জানলার কাছে গিয়ে বাইরের দিকে তাকাল। কাউকে না দেখে বলল, ‘তুই আমার সঙ্গে গিয়ে বসবি চল। ভয় পেয়েছিস মনে হয়’।

আমি জোরে জোরে শ্বাস ফেলছিলাম। মার কথা শুনলাম। দিদা হেসেই যাচ্ছে। বলছে, ‘নিজের বররে আটকাইয়া রাখতে পারলি না। লজ্জা লাগে না তর? তরে ফালাইয়া চইলা গেল। তোর মায়া কাইটা গেসে ওর। এবার অন্য কাউরে লাগাইবে’।

আমি মাকে জড়িয়ে ধরলাম। মা মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল, ‘আয়। এখানে বোস’।

খাটে বসলাম। মা বলল, ‘বাবার জন্য কষ্ট হচ্ছে?’

আমি জোরে জোরে মাথা নাড়লাম, ‘না, হচ্ছে না’।

মা বলল, ‘তাহলে কী হচ্ছে?’

আমি বললাম, ‘কিছু না’।

মা বলল, ‘ঘুরতে যাবি কোথাও? চল দুদিনের জন্য দার্জিলিং ঘুরে আসি’।

আমি শূন্য দৃষ্টিতে মাকে বললাম, ‘বাবা যে খুব অসুস্থ! কীভাবে ঘুরব বলো তো?’

মা ফ্যাকাসে মুখে বলল, ‘কতটা?’

আমি বললাম, ‘খুব। জ্ঞান চলে যাচ্ছে মাঝে মাঝে। কাউকেই চিনতে পারছে না’।

মা আমার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে বলল, ‘একবারে চিনতে পারছে না?’

আমি বললাম, ‘না’।

মা একটু কালো হয়ে গিয়ে এবার হাসার চেষ্টা করল, ‘যাক গে। আমি এটা নিয়ে ভেবে কী করব? আমি চা করি বরং’।

কলিং বেল বাজছে। দরজা খুলে দেখি অনীশ দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে দেখেই বলল, ‘সরি রে। কিছু মনে করিস না। মাথা কাজ করছিল না আমার। কী বলতে কী বলে দিলাম’।

আমি শান্ত গলায় বললাম, ‘সে বুঝেছি। আয় ভেতরে। মা চা করছে। চা খেয়ে যা’।

অনীশ ঘরের ভেতরে এসে বসল। মাথা নিচু করে আছে।

আমি বললাম, ‘মাথা ঠান্ডা হয়েছে?’

অনীশ বলল, ‘তোর মা ভেতরে?’

আমি বললাম, ‘হ্যাঁ’।

অনীশ বলল, ‘তুই কিছু মনে করিসনি তো?’

আমি বললাম, ‘বললাম তো, আমার মাথা কাজ করছে না। মনে করার থাকলেও কী করতে হবে জানি না’।

অনীশ চুপ করে বসে রইল। আর কোনও কথা বলল না।

৫২

কেমন একটা ঘোরের মধ্যে জীবন কেটে যায়।

কেউ কখনও কানে কানে এসে বলে দেয় না কেন যে, জীবন একটাই। কেন খামোখা নষ্ট করছ?

বিয়ের জন্য রাজি হয়েছিলাম কেন? কেন অত সমস্যা তৈরি হল আর কেনই বা এখন আমি কিছুই জানি না, কী করব!

অদ্ভুত একটা সময় কাটিয়ে ফেলছি যেন।

অনীশের সঙ্গে স্বাভাবিক মেলামেশাটাই কেমন যেন হয়ে গেছে আজকাল। কলেজে গেলে বুঝতে পারি দূর থেকে দেখছে। আমার অস্বস্তি হয়।

কোনও মানুষ হঠাৎ পাল্টে গেলে অদ্ভুত লাগারই কথা। আমার সেটাই লাগে।

ক্লাস করে বেরোচ্ছি, হঠাৎ বাইক নিয়ে এসে বলল, ‘চল তোকে দিয়ে আসি’।

আমি মাথা নাড়লাম, ‘না না। তুই তোর কাজ কর। আমি একা একাই ফিরতে পারব’।

অনীশ নাছোড়বান্দা, ‘চল, দিয়ে আসি’।

বেশি আটকেই বা কী করব? হাল ছেড়ে দিয়ে বাইকে উঠে বসি।

পাড়ার কাকিমারা দেখে। নিশি উকুন বাছতে বাছতে দেখে। আমাকে দেখে দাঁত বের করে। আমার নিশিকে দেখে কেমন ভয় ভয় লাগে। মেয়েটা মনে হয় বেশি দিন বাঁচবে না। আমি আগেই বুঝেছিলাম নিশি মকবুলকে ভালোবাসত।

ভালোবাসার কোনও যুক্তি হয় না। কোনও পূর্ব নির্দিষ্ট কারণ থাকে না। ও এমনি এমনি হয়ে যায়। যখন হয়, সব কিছু ভাসিয়ে নিয়ে চলে যায়। যখন পালিয়েছিল, নিশি অত বুঝে পালায়নি। কিন্তু হুট করে মকবুলকে সরিয়ে নেওয়ার চাপটা নিশি নিতে পারেনি। আমার আজকাল নিশির উপরেও হিংসা হয়। নিশি কী সুন্দর মকবুলকে ভালোবাসতে পারল।

মনে হয় না, আমি আর কাউকে কোনওদিন ভালোবাসতে পারব। আমার সেই অনুভূতিটাই নষ্ট হয়ে গেছে।

বাড়িতে নামতে গিয়ে মনে হল বাবাকে দেখে আসি। আবার সারা পাড়ার সামনে বাইকে উঠে বসলাম। বাবার কাছে গিয়ে দেখি বাবা অঘোরে ঘুমোচ্ছে। নতুন মা কী একটা শাক দিয়ে ভাত খাচ্ছে। আমি বললাম, ‘এটা কী খাচ্ছ?’

নতুন মা থালা লুকোতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল, ‘বোস বোস। ডিম ভেজে দেব?’

আমি কেমন একটা ধর্মসংকটে পড়ে যাই মাঝে মাঝে। আমি ঠিক কী করব? আমি নতুন মাকে দেখতে পারি না। কিন্তু যে মহিলার ডেলিভারির সময় এসে গেছে সে প্রায় এরকম না খেয়ে থাকবে? আমার কি খুশি হওয়া উচিত? আমার মাধ্যমিকের অংক পরীক্ষার দিন যে মহিলার জন্য আমার সব কিছু উজাড় হয়ে গেল, সে মহিলা শুধু শাক দিয়ে ভাত খাবেন, আমি কী করব? আনন্দ করব?

আনন্দ হচ্ছে না। প্রবল কষ্ট হচ্ছে। কাউকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে পারলে ভালো লাগত হয়ত। কিন্তু কাকে জড়িয়ে ধরব? কে আছে আমার? বাবা কেমন বাচ্চাদের মতো ঘুমোচ্ছে। বাবার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলাম। নতুন মা বাসন রেখে এসে বলল, ‘আমি কাল অ্যাডমিট হয়ে যাব নীপা। বাবাকে এসে দেখিস তখন। পারবি?’

আমি বললাম, ‘ঠিক আছে। কখন ভর্তি হবে?’

নতুন মা বলল, ‘সকাল দশটায়’।

আমি বললাম, ‘চলে আসব ন’টার সময়। তোমাকে নিয়ে যাব’।

নতুন মা কেঁদে ফেলল। কী বিষণ্ণ সে কান্না। আমারও কান্না পেল। আমি দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়াচ্ছি, পারছি না, হু-হু করে কান্না চলে আসছে। চোখ ভাসিয়ে জল আমার দু’চোখ বেয়ে পড়ে যাচ্ছে। কোনও দূরের কতদিনের দুঃখ যেন আজকের দিনের জন্য অপেক্ষা করে ছিল। আমি কেঁপে কেঁপে উঠছি। নতুন মা মুখ লুকিয়ে অন্য ঘরে চলে গেল।

কতক্ষণ কেঁদেছি আমি নিজেও জানি না।

একসময় বাবার ঘুম ভাঙল। আমাকে দেখে চিনতে পারল। খুশি মুখে বলল, ‘আমি কি স্বপ্ন দেখছি রে মা? আমাকে একটা চিমটি কাটত’।

আমার বাবার এই এক মুদ্রাদোষ। কিছু হলেই বলত চিমটি কাট। কতদিনের অভ্যাস। আমি বাবার হাতে খুব আলতো করে একটা চিমটি কাটলাম। বাবা খুশি হয়ে বলল, ‘ভালো আছিস তুই?’

আমি বললাম, ‘হ্যাঁ। আছি। তুমি কেমন আছ?’

বাবা বলল, ‘সেরে যাব। শিগগিরি সেরে যাব। চিন্তা করিস না তুই। তোর চোখ মুখ ফোলা কেন? কেঁদেছিস নাকি?’

আমি জোরে জোরে মাথা নাড়লাম, ‘না। কাঁদিনি। তুমি ভেবো না। নিজের খেয়াল রাখো’।

বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আমি কথা খুঁজে পাচ্ছি না। অগত্যা উঠে দাঁড়ালাম, ‘আসি তবে। কাল এসে না হয় আমি হাসপাতালে নিয়ে যাব’।

বাবা মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। আর কিছু বলল না।

আমি বেরিয়ে রাস্তায় এলাম। অনীশ বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

এতক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছে, আমাকে নিয়ে ফিরবে বলে!

৫৩

এক একটা রাত কাটতে চায় না। মাথা ভার হয়ে থাকে। একটার পর একটা চিন্তা মাথায় আসতে শুরু করে। রাত বারোটা নাগাদ চোখ খুলে দেখি দিদা বসে আছে খাটের পাশে। মুচকি হাসতে হাসতে বলল, ‘আমারে মাইরা কী লাভ পাইলি ছেমরি? কেমন লাগে এখন?’

আমি বললাম, ‘যাও। ভালো লাগছে না’।

দিদা বলল, ‘তোর বাবা আরও দূরে চলে যাইব কাল থেকে। তারপর কী করবি?’

আমি চিৎকার করতে গিয়েও চুপ করে গেলাম।

বুড়ির কাজ আমাকে রাগিয়ে দেওয়া। চোখ বন্ধ করলাম। বিভিন্ন দৃশ্য ভেসে উঠছে চোখের সামনে। বাবা আমাকে মেলায় নিয়ে যাচ্ছে। মা আর বাবার সঙ্গে হাত ধরে ঘুরছি। সমুদ্রের ধারে বসে আছি আমরা। সবাই মিলে কত আনন্দ করে স্নান করছি।

স্মৃতিরা চাইলেও দূরে থাকে না। না চাইতেও জোর করে চোখের সামনে ফুটে ওঠে। আমার যদি এই অবস্থা হয়, তাহলে মার কী হবে? মাঝে মাঝে ভাবি মা বেঁচে আছে কী করে?

রাতে সব নিস্তব্ধ হয়ে আসে। চারদিকে কোনও শব্দ নেই। মাঝে মাঝে কোনও কুকুর কেঁদে ওঠে।

মাথাটা টালমাটাল করতে থাকে।

এক একটা রাত পেরোনো কত কঠিন কাজ।

একবার মনে হয়, মার কাছে গিয়ে শোব? তারপর ভাবি, না থাক। মা শুয়ে থাকুক মার মতন। আমি গেলে আবার টেনশন করবে।

একটা সময় চোখ বুঁজলাম, ঘুম দরকার। মাথায় হিসেব হতে শুরু হল, কাল অনেক কাজ। নতুন মাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। ওই সময় আবার বাবাকেও দেখতে হবে। মা কেন দেখবে? আমাকেই সামলাতে হবে।

ভাবতে-ভাবতেই ঘুমিয়ে পড়লাম কখন যেন।

ঘুম ভাঙল মার ডাকে, ‘নীপা, এই নীপা’।

ধড়মড় করে উঠে বসলাম, ‘কী হয়েছে?’

মা কোনওমতে বলল, ‘তোর বাবা আর নেই’।

আমার শ্বাস বন্ধ হয়ে এল! দম নিতে পারছি না। চারদিক কেমন কালো হয়ে যাচ্ছে।

মা আমাকে শক্ত করে ধরে রইল।

বাইরে সকাল হয়েছে। রোজ যেমন হয়। পাড়ার লোকেদের হাঁকডাক শোনা যাচ্ছে। অথচ আমার কানে কোনওটাই স্পষ্ট হয়ে আসছে না।

বাবা যেদিন চলে গেছিল, সেদিনটা মা যেভাবে সামলেছিল, আজ আর সেটা পারল না। মা কেমন ফুঁপিয়ে উঠছে। দু’চোখ দিয়ে জলের ধারা পড়ে যাচ্ছে।

কখন জানি না, তবে অনেকক্ষণ পরে সামলে নিয়ে বললাম, ‘কী করে হল মা?’

মা বলল, ‘ফোন করেছিল বোন। ভোর রাতে শ্বাস উঠল। ওই অবস্থাতেই সব শেষ হয়ে গেল’।

আমি মাকে জড়িয়ে ধরে বললাম, ‘হাসপাতালে নিয়ে যাবার কথা আছে আমার। কী হবে এবার?’

মা বলল, ‘তুই নিয়ে যা। যেতে তো হবেই। একটা গাড়ির ব্যবস্থা করছি’।

আমার হাত পা থর থর করে কাঁপতে শুরু করল। আমি আবার খাটে শুয়ে পড়লাম। উঠতে পারছি না। আমারও কেমন দম আটকে আসছে। বুকে ব্যথা করছে। সারা শরীরে মনে হয় কেউ আলপিন ফুটিয়ে যাচ্ছে।

মা অনেকক্ষণ ধরে আমাকে সামলাল। একটা সময় আমি খানিকটা স্বাভাবিক হলাম।

মা আমাকে বলল, ‘চল। আমিও যাব’।

আমি বললাম, ‘তুমি যাবে?’

মা বলল, ‘হ্যাঁ। যেতে তো হবে। চল’।

আমাকে ধরে ধরে মা রাস্তায় নিয়ে এল। পাড়ার কাকুরা খবর পেয়েছে। তারা ভিড় করেছে। সবাই মিলেই ও বাড়ি যাওয়া হল।

ডাক্তার এসেছেন। ডেথ সার্টিফিকেটের কথা হচ্ছে। নতুন মা পাথরের মতো বসে আছে।

মা গিয়ে বলল, ‘তুই চল। আমার সঙ্গে চল। এখানে বসে থাকলে হবে না’।

নতুন মা কেমন লজ্জায় মিশে যাচ্ছে। পাড়াভর্তি লোক অবাক হয়ে দেখছে মা তার বরের সঙ্গে পালিয়ে যাওয়া বোনকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে নিয়ে যাচ্ছে।

আমি বাবাকে দেখছি। এই লোকটা আমার সব কিছু শেষ করে দিয়ে কেমন নিশ্চিন্তে চোখ বুজে আছে এখন।

ছোটবেলায় রাগ হলে আমি জিনিসপত্র ছুঁড়ে মারতাম। এখন সেরকম রাগ হচ্ছে। কত লোক এসেছে। ফিসফিস করে নিজেদের মধ্যে কথা বলছে। কেউ ভালো কথা বলবে না। আমি সেই মাধ্যমিকের বছর থেকেই এরকম দেখে অভ্যস্ত। লোকজন আমাকে দেখলেই চুপ করে যায়। নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে কথা বলে।

এখনও তাই চলছে। এমন রসালো বিষয় কে ছাড়ে?

দিদা বাবার মাথার কাছে বসে হাসছে। শরীর দুলিয়ে হাসছে, ‘কেমন লাগে রে ছেমরি? কেমন লাগে?’

৫৪

একটা দিন কী করে দুঃস্বপ্নের মতো হয়ে যায়, তার সাক্ষী হয়ে থাকতে হল আমায়।

এক জীবনে কত কিছু করার থাকে। আমার বাবা সংসার করল, আমাদের ছেড়ে চলে গেল, ব্যবসা ডোবাল, মরার আগে নিজের আরেকটা সংসারটাকেও সামলে যেতে পারল না।

আগুনে পুড়তে পুড়তে দেহটা মিলিয়ে যাচ্ছে আকাশে, পাড়ার লোকরা একটু দূরে মদ খেয়ে আনন্দ করছে, যেন কেউ মরলে মদ খেতেই হবে, আমি একা একা দাঁড়িয়ে বাবার পুড়ে যাওয়া দেখে থাকলাম। একটা মানুষের জীবন, যার কোলে করে বড় হলাম, যে লোকটার মৃত্যুও চেয়েছি হয়তো প্রাণপণে, সে লোকটা আর আমার জীবনে থাকল না। অনেকদিন আগেই মরে গেছিল আমাদের জন্য। এবার সত্যিকারের মৃত্যু হল।

অনীশ গোটা সময়টা ছিল, বাইকে বাড়ি নামিয়ে দিতে এল। আমার কান্না পাচ্ছিল না, আমি পাথর হয়ে গেছি। মা ফেরেনি। বাইরে নিশি অদ্ভুত একটা চিৎকার করে যাচ্ছে। নিশির বাচ্চা কেঁদে যাচ্ছে।

দরজা বন্ধ করে অনীশ আমাকে বলল, ‘স্নান করবি?’

আমি মাথা নাড়লাম, ‘না। বসি’।

অনীশ বলল, ‘বোস’।

আমি চুপ করে বসে রইলাম। কোনওদিকে তাকাতে পারছি না। এ বাড়ির সর্বত্র বাবার স্মৃতি। তাকালেই সব কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। আমি কিছুতেই মনে করতে চাইছি না। সেটা সম্ভব না। মনে করার দরকারও নেই।

অনীশ উশখুশ করে উঠে আমার পাশে এসে হঠাৎ আমার পিঠে হাত রেখে বলল, ‘শোন না। মন খারাপ করিস না। সব ঠিক হয়ে যাবে’।

আমি অনীশের স্পর্শটা বুঝতে পারিনি। সাড়া দিলাম না। অনীশ সে অবস্থাতেই আমায় হঠাৎ কাছে টেনে চুমু খেল। অনীশের শীতল ঠোঁট, সিগারেট টেনেছিল শ্মশানে, সে সিগারেটের গন্ধ, দিদার খিলখিল করে হাসি শুরু করে দেওয়া, আমাকে যেন একটা নরকে ফেলে দিল। আমি শরীরের সমস্ত শক্তি দিতে অনীশকে ধাক্কা মারলাম।

অনীশ টাল সামলাতে পারল না, মেঝেতে পড়ে গেল।

আমার মাথা কাজ করছিল না! শুধু তীব্র রাগে ছুটে গিয়ে অনীশকে লাথি মারলাম। একটা, দুটো, পর পর লাথি মেরে যেতে লাগলাম। অনীশ কোনমতে সরে গেল, তারপর উঠে দরজা খুলে পালিয়ে গেল।

আমার মাথায় রক্ত উঠে গেছে, আমি আর পারলাম না। কান্নায় ভেঙে পড়লাম। কেঁদেই যাচ্ছি। সে কী তীব্র কান্না আমার! ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছি। কেঁদেই যাচ্ছি।

মা ঘরে ঢুকে আমাকে দেখামাত্র জড়িয়ে ধরল। মা ভেবেছে আমি বাবার জন্য কাঁদছি। আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল, ‘কাঁদিস না মা, একদিন না একদিন সবাইকেই চলে যেতে হয়। কেঁদে কি কিছু হয়?’

আমি মাকে জড়িয়ে আরও জোরে কাঁদতে শুরু করলাম।

অনেক পরে সামলে উঠে জানতে পারলাম, নতুন মায়ের ছেলে হয়েছে।

কিছুক্ষণ মার সঙ্গে চুপ করে বসে থেকে আমি ঘরে ফিরলাম।

খাটে শুতেই দিদা আবার হাসতে শুরু করে দিল, ‘কীরে, কইসিলাম না?’

আমার অনীশের চুমুর কথা মনে পড়ে গেল। বাথরুমে গিয়ে কল চালিয়ে বার বার মুখে জল দিতে থাকলাম। ভীষণ ঘেন্না হচ্ছে। ভালোবাসাহীন, প্রেমহীন শুধু শারীরিক আকর্ষণের চুমুর স্বাদ এত জঘন্য হয় জানা ছিল না। হিমু কেমন প্রভুভক্ত কুকুরের মতো বসে থাকত। ফুলসজ্জার রাত ছাড়া কখনও অসভ্যতা করেনি। অনীশ এমন একটা দিনে এটা করল, ভাবলেই আমার প্রবল ঘেন্না হচ্ছে। প্রথমে বেশ কয়েকবার জোরে জোরে শ্বাস নিলাম। কিছু হল না। শোক ছাড়িয়ে বমি হয়ে গেল।

বমি করছি আর দিদা হাসছে। সেই একই কথা, ‘তোরে কইসিলাম না? দেখসিস? দেখসিস? আমি তো ছ্যামরারে দেইখাই তোরে কইসিলাম। ছ্যামরা শুইতে আইসে। তুই বুঝস নাই ক্যান মাগি? তুইও শুইতে চাইসিলি, তাই না? সত্যি কইরা ক’।

আমি বাথরুমেই বসে পড়লাম।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *