নীপাদের বাড়ি – ২৫

২৫

আমাদের এ বাড়িটা তো আমার বাবার বাড়ি। মার বাড়ি না। বাবার বাবা মা থাকত। সে বাড়িতে এখন আমি আর মা থাকি। বাবার বাবা মা বেঁচে থাকলে কী করতেন তারা? আমি মাঝে-মাঝেই সেসব ভাবি। অবশ্য ও কথা ভাবার আগে আমাকে অন্য বিষয় নিয়ে বেশি করে ভাবতে হবে।

জুয়া বিষয়ক। পাবলিকের মধ্যে ফিসফাস চলছিল, ও বাড়ি থেকে গয়না ফিরবে নাকি তা নিয়ে। এলাকার ডাকাতরাও নাকি ডন বৈঠক শুরু করে দিয়েছিল। দুটো মাত্র মহিলা থাকে যে বাড়িতে, সে বাড়িতে অত গয়না এলে সে বাড়িতে লুঠতে না গেলে তাদের ডাকাত পূর্বপুরুষরা যে রাগ করবেন, সে রাগ তারা দমাবেন কী করে?

রাত একটা বাজে। মা সোফায় ঘুমিয়ে পড়েছে। হিমুর মা’র গলার স্বর পাচ্ছি না। হিমুর মামা অদ্ভুত একটা শব্দে নাক ডেকে চলেছেন। শুরু হচ্ছে সানাই দিয়ে, ‘পুউউউউউউউউউ’…তারপর সানাইটা যেন ব্রেক ডান্স করছে, ‘ফুসফুসফুসফুস’ করে, শেষ হচ্ছে ড্রামের শব্দ দিয়ে, ‘ভ্রু ভ্রু ভ্রু ভ্রু ড্রাম’ টাইপ একটা শব্দ।

প্রতি মিনিটে এরকম একটা শব্দ ঘরে ঘোরা ফেরা করছে। পাঁচিলে দাঁড়িয়ে থাকা জুয়াড়িরা পাঁচিলেই মাথা দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। নিশির ছেলের চিৎকারের শব্দ আসছে নিশিদের বাড়ি থেকে। খুব সম্ভবত এত রাতেই ছেলেটার বাপের কথা মনে পড়েছে। আমি দিব্যি বুঝতে পারছি নিশি এখানে বেশিদিন থাকবে না। কেউ যাকে ভালোবাসে, তাকে বেশিদিন ছেড়ে থাকতে পারে না। নিশি মকবুলকে হেব্বি ভালোবাসে। ও এখন থেকেই কেমন ছটফট করছে। যে কোনও সময় আবার বিহারের ট্রেন ধরে পালাবে।

জীবনে সব মিথ্যা ভালোবাসা ছাড়া। ভালোবাসা না থাকলে জীবনটাই মিথ্যা। যার বাবা ওভাবে চলে গেছে, অন্য মহিলাকে যার সামনে তার বাবা অত আদর যত্ন করবে, সে কী করে বুঝবে ভালোবাসা কী? সে তো চাইবেই একটা বিস্ফোরণে সব ধ্বংস হয়ে যাক। সে ভালোবাসা পেলেও সেটা কিছুতেই বুঝতে চাইবে না।

টাকাও লাগে। ফতুর লোককে কেউ পাত্তা দেয় না। একবুক ভালোবাসা নিয়ে কিছু হয় না যদি পকেটে টাকা না থাকে। চাকরিটা আছে বলে আমার মা সামলে নিতে পেরেছে। বাবাকে দেখতে পারছে। মার চাকরিটা না থাকলে আমি কী করতাম? সেই মা যখন গয়না নিয়ে এতটা ক্ষেপে গেছে, বুঝতে হবে বাবা চলে গেছিল বলে মা বিন্দুমাত্র বিচলিত হয়নি। এই গয়না চলে যাওয়া নিয়ে মা অনেক বেশি চিন্তিত। যে বাড়িতে মেয়ের বিয়ে দিয়েছে, সে বাড়িতে মেয়ে কোনওদিন না ফিরলে অকারণে কেন গয়না রেখে দিয়ে আসবে? মানুষের পরিশ্রম, চোখের জল কি এত সস্তা নাকি?

এত লোকজনের মধ্যে এত রাতে আমিই জেগে আছি। গুপী গাইন বাঘা বাইন পারফর্ম করলে সবাই চুপ হয়ে যেত। আমাদের বাড়িতে যেন নিঃশব্দে ওরাই পারফর্ম করছেন। নাক ডাকার শব্দ ছাড়া আর কিছুই আসছে না। হিমু কি ঘুমোল? হিমুর তো ঘুমোবার কথা না! ও নিশাচর প্রাণী। আমি নিঃশব্দে ওদের ঘরের দরজা খুলে দেখলাম হিমু ছাদের দিকে তাকিয়ে চোখ বড় বড় করে কী যেন ভাবছে।

ওকে ইশারা করলাম। হিমু আমাকে দেখতে পেল না। এগিয়ে গিয়ে গালে একটা চড় মারলাম। চমকে উঠে ও চিৎকার করে ওঠার আগেই ওর মুখে হাত দিয়ে চুপ করে ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে বললাম। হিমু আমার সঙ্গে বেরোল। আমি দরজা বন্ধ করে দিলাম আবার। হিমুকে নিয়ে আমার ঘরে এলাম। হিমু কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, ‘আমি তো তোমাকে নিয়ে যেতে চাই। খামোখা এসব কেন হচ্ছে?’

আমি ঠ্যাং দোলাতে দোলাতে বললাম, ‘আমি যাব না বলে’।

হিমু বলল, ‘কেন যাবে না?’

আমি বললাম, ‘অকারণ নাটক ভালো লাগে না। যাক গে, তুমি বালিশটা নিয়ে শোও। আমি আসছি’।

হিমু বলল, ‘শোব?’

আমি বললাম, ‘হ্যাঁ। শোও’।

হিমু যেন আমার আদেশের অপেক্ষাতেই ছিল। ঘুমাতে বলা মাত্র ঘুমিয়ে পড়ল।

উঠল একবারে সকালে। ভোর পাঁচটার সময় হিমুর মাকে জানলা দিয়ে ডাকলাম, ‘শুনছেন, রাতে আপনার ছেলেকে আমার ঘরে নিয়ে গেছিলাম। ভালোই শুয়েছে’।

হিমুর মা কী বুঝলেন কে জানে? ‘আমি যে তোমার তুমি যে আমার’ টাইপের মঞ্জুলিকা সুলভ চিৎকার জুড়লেন। হিমুর মামার ঘুম সে চিৎকারে ভেঙে গেল। ভদ্রলোক আতঙ্কিত গলায় বললেন, ‘সর্বনাশ হয়েছে, আমার জোর বাথরুম পেয়েছে! ব্লাডার ফেটে যাবে! এবারে, এখন কী হবে? ও দিদি, তোর পায়নি?’

২৬

দু-চারটে চকলেট বোম যে পাড়ায় লুকনো ছিল বুঝিনি। ভোরবেলা গয়না এল আমাদের বাড়িতে। বাজি জেতার আনন্দে বাজি ফাটতে শুরু করল। নিশি খুশি খুশি মুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

শুধু কারো পেচ্ছাপ পায়খানা আটকে রাখার ব্যবস্থা করলে যে কত বড় যুদ্ধ জেতা যায়, তা মা না থাকলে দেখতে পারতাম না। হিমুর মা অবশ্য ভাঙলেও মচকাননি।

ছোটবেলায় বেপাড়ায় চলে গেলে মা যেমন কানে ধরে হিড় হিড় করে টানতে টানতে নিয়ে আসত, হিমুর মা সেভাবে হিমুর কান ধরে নিয়ে গেছেন, ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলে গেছেন, ‘দে…দেখে নেব…’

হিমুর মামা গড়াতে গড়াতে চলে গেলেন।

ভোর সাড়ে ছ’টা নাগাদ বাড়িতে শান্তি নেমে এল।

মা গয়নাগুলো ভালো করে দেখে নিয়ে আলমারিতে তুলে দিয়ে বলল, ‘আজকেই ব্যাঙ্কের লকারে দিয়ে আসতে হবে। নইলে আর দেখতে হবে না’।

আমি হাই তুললাম, ‘স্কুল যাবে না?’

মা বলল, ‘না। আজ আর পারব না। ক্লান্ত লাগছে’।

আমি বললাম, ‘তাহলে আমিও আজ কলেজ যাব না। মাংস রান্না হোক’।

মা বলল, ‘ঠিক আছে খাস। এখন ঘুমা’।

আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। রাতে ঘুম আসছিল না। ভোরে দিব্যি ঘুম চলে এল। আমার মতো মেয়েদের, যাদের সব শেষ হয়ে গেছে, তাদের এত ভালো ঘুম আসা মানায় নাকি কে জানে? আমার তো দিব্যি লাগল ঘুমাতে। কতক্ষণ ঘুমালাম কে জানে, ঘুম ভেঙে দেখি নিশি খাটে বসে নিবিষ্টমনে আমাকে দেখছে। আমি চোখ পিটপিট করে বললাম, ‘কী হল?’

নিশি বলল, ‘তুই ফেসবুকে নেই কেন? অ্যাকাউন্ট বানাসনি?’

আমি বললাম, ‘সেটা কোন ব্যাঙ্ক?’

নিশি হেসে কুটিপাটি, ‘সত্যি, লোকজনকে বলিস না তুই ফেসবুক কী জানিস না। তোকে রাস্তা ঘাটে বেরোতে দেবে না’।

আমি উঠে বসলাম, ‘আমি সত্যিই জানি না রে। কী এটা?’

নিশি বলল, ‘মজার জিনিস। তোর ফোন কই?’

আমি বললাম, ‘আমার ফোন নেই। মার ফোনটাই আমার ফোন’।

নিশি মাথা চাপড়ে বলল, ‘তোর ফোনই নেই? এরকম হয় নাকি?’

আমি বললাম, ‘হয়েছে। তুই জ্বালাতন করিস না তো। ঘুমাতে দে’।

নিশি বলল, ‘জ্বালাতন করছি কোথায়? তুই কোন যুগে পড়ে আছিস বল তো?’

আমি ওকে পাত্তা না দিয়ে বললাম, ‘ওসব বাদ দে। তার আগে বল তুই কত পেলি?’

নিশি বলল, ‘তিনশো ভাই। তিনশো। কে দেবে এই বাজারে তিনশো টাকা?’

আমি হাঁ হয়ে গিয়ে বললাম, ‘তিনশো টাকা? এত টাকা নিয়ে তুই কী করবি?’

নিশি বলল, ‘সে দেখা যাবে, কিছু না কিছু করতে হবে। আবার ফিস্ট করব আজ। মুরগি রান্না হবে’।

আমি বললাম, ‘সে তো আমাদের বাড়িতেই হবে। তুই বরং এখানে খেয়ে নিস’।

নিশি খুশি হল। পরমুহূর্তে দুঃখিত হয়ে বলল, ‘কিন্তু কাকিমা রাগ করবে না তো?’

আমি বললাম, ‘মা আবার কবে রাগ করল? তোর ছানাটা কোথায়?’

নিশি বলল, ‘আমার মার কাছে রেখে এসেছি। ওর এখানে পোষাচ্ছে না’।

আমি বললাম, ‘তোর পোষাচ্ছে?’

নিশি ঠোঁট ফোলাল, ‘জানি না। আমার না পোষালে কী করব? কে আমাকে আর বাড়ি নিয়ে যেতে আসছে?’

আমি বললাম, ‘কেন তোর মকবুল কই?’

নিশি বলল, ‘আছে কোথাও একটা। আমি জানি না’।

আমি বললাম, ‘আসবে না?’

নিশি বলল, ‘বাবা বলেছে এলে খবর হয়ে যাবে। বাবা আবার কাদের বলে রেখেছে যেন। ওর না আসাই ভালো’।

আমি অবাক হলাম, ‘মানে? কাদের বলেছে?’

নিশি বলল, ‘আছে। কতরকম লোক আসছে আজকাল’।

আমি বললাম, ‘তাহলে তুই পালা। যেখান থেকে এসেছিস, সেখানে চলে যা’।

নিশি মাথা নাড়ল, ‘না। আমি যাব না। আমার ওখানেও থাকতে ইচ্ছে করে না, এখানেও থাকতে ইচ্ছে করে না। আমি অন্য কোথাও চলে যাব। কিন্তু যেখানেই যাই, যাওয়ার আগে তোর ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলে দেব’।

আমি বুঝলাম, এই অ্যাকাউন্ট না খোলা অবধি ও শান্তি পাবে না। হাল ছেড়ে দিলাম, ‘খোল, যা করবি কর’।

২৭

আমাদের এখানে মেলা হয়। কত মানুষ আসে। কত ভিড়। গিজগিজ করতে থাকে। কেউ পাঁপড় খাচ্ছে, কেউ নাগরদোলায় চড়ে এন্তার বমি করছে, কেউ চপ খাচ্ছে, কেউ পান খাচ্ছে, কেউ হরেক মাল পাঁচটাকার দোকানেও দরাদরি করছে। লোক, লোক আর লোক।

নিশি আমাকে অ্যাকাউন্টটা না করে দিলে আমি বুঝতে পারতাম না ফেসবুক এরকমই একটা জায়গা।

আর কে নেই? আমার কলেজের সব বন্ধুরা তো ছেড়ে দিলাম, কলেজের ক্লার্ক, স্যার, ম্যাডাম, এমনকি সিকিউরিটি গার্ডদাদাও ফেসবুকে আছে। সবাই! সব্বাই!

নিশি আমাকে ওর ফোনে যা দেখাল, তাতেই আমার মাথা খারাপ হয়ে গেল। আমি নিশিকে বললাম, ‘এত সব কিছু ছিল, অথচ আমিই জানতাম না?’

নিশি বলল, ‘এত কিছু জেনে তুই কী করবি? তোকে অ্যাকাউন্ট করে দিলাম। তুই এখন আমার ফেসবুক বন্ধু’।

আমি বললাম, ‘আমরা তো এমনিই বন্ধু’।

নিশি মাথা নাড়ল, ‘ওরম না। এমনি বন্ধু আর ফেসবুক বন্ধু হওয়া আলাদা’।

আমি বললাম, ‘মকবুল তোর ফেসবুক বন্ধু?’

নিশি বলল, ‘হ্যাঁ। আছে তো’।

আমি বললাম, ‘তো তুই ওখানে ওর সঙ্গে কথা বলছিস না?’

নিশি বলল, ‘এখন ব্লক করে দিয়েছি। রেগে গেছি তো’।

আমি বললাম, ‘ব্লক মানে?’

নিশি বলল, ‘যাকে পোষাবে না, ফেসবুকে তুই তাকে নাও দেখতে পারিস’।

আমি বললাম, ‘ইশ, হিমুর মাকে এরকম সত্যি সত্যি জীবন থেকে ব্লক করতে পারলে ভারি ভালো হত রে’।

নিশি হেসেই কুটিপাটি।

দিদা আমার কানে কানে বলল, ‘এই মাগি, এইডা কী জিনিস? ফেসবুকটা কী?’

আমি ঝাঁঝিয়ে উঠলাম, ‘যা তো বুড়ি। কাজ নেই, সারাক্ষণ বিরক্ত করতে আসে। তাও কাজের সময় দেখতে পাই না’।

নিশি অবাক হয়ে বলল, ‘কী হল? আমাকে বুড়ি বলছিস কেন? রেগে যাচ্ছিস কেন?’

আমি জিভ কেটে বললাম, ‘তোকে বলিনি। আছে একটা ব্যাপার। পরে বলব’।

নিশি বলল, ‘তোরও কি আমার মতো মাথা খারাপ হয়ে গেছে? আমিও এরকম একা একা মকবুলের সঙ্গে ঝগড়া করি। মনে হয় মকবুল আমার সঙ্গেই আছে। আমার মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে জানিস তো! ওর মা আমাকে পাগলই বলত’।

আমি বললাম, ‘তুই মকবুলকে দেখতে পাস? ও তোর সঙ্গে কথা বলে যখন দেখতে পাস?’

নিশি বলল, ‘হ্যাঁ। কথা বলে। তুই কাকে দেখিস?’

আমি উঠে দাঁড়ালাম, ‘আমি কাউকে দেখি না। দাঁড়া, মা বাজার গেছে নাকি দেখি’।

নিশিকে কাটিয়ে দিলাম। নইলে ঠিক বলে দিতাম আমি দিদাকে দেখি। দিদা আমার চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে আর খিলখিল করে হাসছে। কেমিক্যাল লোচা বলে একটা জিনিস আছে, সঞ্জয় দত্তর সিনেমায় দেখেছিলাম। আমার নির্ঘাত সেরকমই কিছু হয়েছে। কিন্তু দিদা সম্পর্কে কিছু না জেনেও হিমু দিদাকে দেখেছে। এটাকে কী বলা যায়?

আমি একটা জায়গায় পড়েছিলাম তুলা হালকা রাশি। এই রাশির পাবলিকদের ভূত মালুম হয়। কিন্তু দিদা ভূত না আমার কল্পনা, সেটা না জানলে আমি কী করে বুঝব হিমু দিদাকে কী করে দেখল? ব্যাপার বড়ই জটিল।

বাইরে বেরিয়ে দেখলাম কুকুরের ল্যাজ আবার বেঁকে গেছে। হিমু বসার ঘরে বসে আছে। ভালো ছেলেদের আত্মসম্মান থাকতে নেই? হিমুকে দেখে তো সেরকমই লাগছে। বিন্দুমাত্র আত্মসম্মান থাকলে ও আজ এ বাড়িতে আসত না। ওর মা ওকে ওরকম কান ধরে নিয়ে গেল, তারপরেও চলে এল!

আমি বললাম, ‘কী হল? আবার চলে এলে?’

হিমু বলল, ‘এই মাত্র অফিস থেকে ফোন এসেছিল। আমাকে চেন্নাই চলে যেতে হবে। তোমার সঙ্গে দেখা করতে এলাম’।

আমি বললাম, ‘চেন্নাই চলে যাবে? আর আসবে না?’

হিমু বলল, ‘তুমি যেতে চাইলে যেতে পারো। ওখানে আমার মা থাকবে না’।

আমি বললাম, ‘চেন্নাই মানে ধোসা? সারাক্ষণ ওই ধোসা খেতে হবে? আমার নারকেল তেলের রান্না সহ্যও হয় না’।

হিমু বলল, ‘নারকেল তেলে রান্না করে না সবাই। অনেক ভুল ধারণা আছে’।

দিদা কানের পাশে বলল, ‘হারামজাদা ঢপ মারে। তোরে চেন্নাই নিয়া গিয়া বেইচা দিব নে’।

আমি দিদাকে পাত্তা দিলাম না, হিমুকে বললাম, ‘ওসব জায়গায় আমি যাব না’।

হিমু বলল, ‘তেমন হলে বলো, আমি চাকরি ছেড়ে দিয়ে তোমাদের বাড়িতে থাকব’।

আমি খুব অবাক হলাম। এত ভালো ছেলে আমার জন্য সব ছেড়ে এখানে এসে থাকবে? এও পাগল। নির্ঘাত পাগল। কোমরে হাত দিয়ে ঘাড় বাঁকিয়ে বললাম, ‘তা তুমি কাকে দেখো?’

হিমু বলল, ‘মানে?’

আমি বললাম, ‘তুমি তো দেখছি পাগল’।

হিমু বলল, ‘তা বটে’।

আমি বললাম, ‘না না। যাও। চাকরি করো। ভালো থাকো। যাও যাও’।

হিমু ঘাড় নেড়ে বলল, ‘আচ্ছা। যাচ্ছি’।

তারপর আমার দিকে তাকিয়ে হাসল, চোখে জল।

আমার বুকটা হঠাৎ কেমন হয়ে গেল। ভীষণ গরমের পর কালবৈশাখী এলে যেমন হয়, তেমন। আমি ভাবলাম একবার বলে ফেলি, ‘ছেড়ে দাও, থাক। তোমায় যেতে হবে না। এ বাড়িতেই থেকে যাও’।

বলতে পারলাম না…।

২৮

হিমু চলে গেল। যাওয়ার আগে মাকে প্রণাম করতে এসেছিল। ভুলে আমাকেও প্রণাম করতে যাচ্ছিল। অনেক কষ্টে বেঁচেছি। কান্নাকাটি করছিল গাড়িতে উঠে। মেয়েরা বিয়ের পর যেমন কাঁদে, তেমন। মজার ব্যাপার হল হিমুদের বাড়ি যাওয়ার সময় আমি একটুও কাঁদিনি। পাড়ার সিসিটিভি কাকিমারা কনুই দিয়ে একে অপরের মাদার ডেয়ারির থলিতে মেরে বলেছিল, ‘দেখেছ বেহায়া মাইয়া কাঁদে নাই’!

কলেজ একটা অদ্ভুত জায়গা। এখানে পড়লে সবাই সব ভুলে যেতে পারে। দুঃখ কষ্ট ব্যথা সব। আমি বুঝি আমার কলেজটা যাওয়া কতটা দরকার। নিশি বুঝল না, কলেজের মজা। পালিয়ে বিয়ে করে অকালে বুড়ি হয়ে গেল।

আমি বুড়ি হতে চাই না। এখন আরও বেশি করে বুঝতে পারি কলেজে পড়াটা আমার কতটা দরকার ছিল।

শ্রিয়া যদিও আমার সঙ্গে কথা বলছে না। মুখটা গম্ভীর করে রেখেছে। মানুষের পাইরিয়া আছে বললে মানুষ এত রেগে যেতে পারে আমি বুঝিনি। শ্রিয়া রেগে যায়। এই রাগটা আর কারো আছে নাকি দেখতে হবে।

তবে শ্রিয়া রেগেই যায়নি শুধু। আমার নামে অনেককে অনেক কিছু বলেওছে। অনিন্দিতা যেমন অফ পিরিয়ডে আমাকে দেখে সাইডে নিয়ে গিয়ে বলল, ‘তোর নাকি অনেক প্রেম ছিল বলে শ্বশুরবাড়ি থেকে তোকে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে?’

আমি মজা পেলাম। ফিক ফিক করে হাসতে হাসতে বললাম, ‘কে বলেছে রে?’

অনিন্দিতা বলল, ‘শ্রিয়া বলছিল’।

আগে হলে আমি হাত-পা ছাড়িয়ে কাঁদতে বসতাম। মানে আমার বাবা পালানোর আগে। এখন আমি সেয়ানা হয়েছি। একটুও কাঁদলাম না। বললাম, ‘তুই জানিস না?’

অনিন্দিতা চোখ বড় বড় করে বলল, ‘কী?’

আমি বললাম, ‘শ্রিয়ার বাবার সঙ্গেও প্রেম করতাম তো!’

অনিন্দিতা আমার দিকে রসগোল্লা চোখে তাকিয়ে বলল, ‘অ্যাঁ? ওর বাবার টাক দেখেছিস? ইডেনে বৃষ্টি হলে ওই টাকে ভারত পাকিস্তান ম্যাচ হতে পারে’।

আমি বললাম, ‘দেখিনি। এক কাজ কর না। শ্রিয়াকে জিগ্যেস কর’।

অনিন্দিতা সত্যি সত্যিই শ্রিয়ার কাছে গিয়ে কথাটা বলে এল। শ্রিয়া সঙ্গে সঙ্গে দাপাতে দাপাতে আমার কাছে এল, নাক দিয়ে ড্রাগনের মতো আগুন বেরোচ্ছে। গ্যাস ধরিয়ে নেওয়া যাবে।

‘তুই কী বলেছিস আমার বাবার নামে?’

আমি ভালো মানুষের মতো মুখ করে বললাম, ‘আমি? কই, কিছু বলিনি তো!’

শ্রিয়া বলল, ‘না, তুই বলেছিস। তুই বলেছিস আমার বাবার সঙ্গে প্রেম করতিস’।

আমি বললাম, ‘তুইও তো নাকি কীসব বলেছিস আমার নামে? আমি অনেকের সঙ্গে প্রেম করেছি তাই আমাকে শ্বশুরবাড়ি থেকে পাঠিয়ে দিয়েছে? ঠিক কত লোকের সঙ্গে প্রেম করেছি, এত লোকের হিসেব তো করিনি। তাই এই লিস্টে হয়তো তোর বাবাও আছে। তাই বললাম’।

শ্রিয়া আমাকে প্রাণপণে কামড়াতে চাইছে, বুঝতে পারলাম। জোরে জোরে শ্বাস ফেলছে। আমি হাই তুলে বললাম, ‘দূরে থাক। তোর মুখে খুব গন্ধ’। বলে সরে গেলাম।

আমি শুনতে পাচ্ছি কেমন একটা শব্দ করছে শ্রিয়া। এরকম শব্দ হিমুর মা করছিলেন। দুজনের মধ্যে ভারি মিল আছে তো! আমার মনে হল শ্রিয়া ভারি সুন্দর শাশুড়ি হবে। এখন থেকেই শ্রিয়ার মধ্যে একটা শাশুড়ি শাশুড়ি ব্যাপার আছে। একজন টিপিকাল ভিলেন শাশুড়ির বৈশিষ্ট্য লিখলে কী কী পয়েন্ট হবে?

১) খুঁচিয়ে কথা বলতে জানতে হবে। যেগুলো ব্যথার জায়গা, সেখানেই তাক করে খোঁচাতে হবে।

২) নিজের পেছনে যত গু থাকুক, লোকের গু ঘেঁটে আসতে হবে।

৩) অন্যের মেয়ে মানে তার মান সম্মান নেই, রাগ অভিমান নেই বাই ডিফল্ট বুঝে নিতে হবে।

তবে শ্রিয়া পারবে। শ্রিয়ার উপরে আমার সে ভরসা আছে।

ক্লাস শুরু হবার পরেও শ্রিয়া আমাকে ড্রাগন দৃষ্টি নিয়ে দেখছিল। যে কোনও সময় ছাই করে দিতে পারে। ক্লাস শেষ হবার পরে আমি কেটে পড়লাম। বাবার বাড়ি যাওয়া যায় ভেবেও গেলাম না।

জীবনে সব সহ্য করা যায়, নিজের বাবা অন্য একটা মহিলার সঙ্গে আদিখ্যেতা করবে, কিছুতেই সহ্য করা যায় না।

তারপর ভাবলাম হিমুদের বাড়ি যাই। হিমুর মার খোঁজ নেওয়া দরকার। হিমু নেই। আমারও তো একটা দায়িত্ব আছে। খানিকটা রাস্তা গিয়েই হাই তুললাম।

নাহ। বাড়ি যাই। ঘুমাই। ঘুমের বড় দরকার।

বাড়ি গিয়ে দেখি হিমু হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে, ‘আমি ঠিক করে নিয়েছি বুঝলে, মুদির দোকান দেব তোমার বাড়ির সামনে। চাকরি করে কী লাভ?’

২৯

পাগল কুকুরের ওষুধ আছে, পাগল মানুষের ওষুধ আছে, কিন্তু কুকুরের লেজের মতো মানুষ সোজা করার ওষুধ কী আছে? যে পাগল চলে গেছে জানি, সে আবার আমার বাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়ে আছে!

আমি হিমুকে বললাম, ‘তুমি যাওনি?’

হিমু মাথা নাড়ল, ‘না, যাইনি’।

আমি বললাম, ‘কেন যাওনি?’

হিমু বলল, ‘তোমার জন্য যাইনি। আমি তোমার কাছে থাকব’।

আমি শ্বাস ছাড়লাম। মা এখনও আসেনি। চাবি খুলে বাড়ির ভেতর ঢুকে বললাম, ‘চা খাবে?’

হিমু বলল, ‘হ্যাঁ। খাব। চা করো’।

আমি বললাম, ‘বসো’।

হিমুকে বসিয়ে চায়ের জল গরম করতে দিলাম। নিশি জানলার বাইরে এসে দাঁড়িয়েছে, ‘কীরে, তোর পাগল বর চলে এল তো’।

আমি বললাম, ‘হ্যাঁ। কী করব বল তো?’

নিশি বলল, ‘কী আর করবি? খুলে দে। তুই এখনও খুলিসনি বলে ও যায়নি। সব দিয়ে দিবি, পুরুষ মানুষ তো, তারপর তোকে আর পাত্তা দেবে না’।

আমি বললাম, ‘কেন? মকবুল তোকে আর পাত্তা দিচ্ছে না?’

নিশি মুখ বাঁকাল, ‘আমাকে পাত্তা না দিয়ে যাবে কোথায়? ঠ্যাং ভেঙে দেব না?’

আমি বললাম, ‘সে তুই যা ভাঙিস ভাঙ, তুই মকবুলকে ভালোবেসে করেছিস’।

নিশি বলল, ‘আর তুই হিমুকে ভালোবাসিস না?’

আমি মাথা নাড়লাম, ‘একবারে না’।

নিশি বলল, ‘তাহলে বিয়ে করলি কেন?’

আমি বললাম, ‘ওই খোলার জায়গাটা আসবে আগে বুঝিনি তো! বিয়েটা তো ভালোই লাগে, গয়না ফয়না দেবে, ছোটখাটো îûÄyগিং হবে, সবই মেনে নেওয়া যায়। তারপর মদ খেয়ে এসে বলবে, খুলে ফেলো। কেন ভাই? কেন খুলব? আমি কি আলিবাবা চল্লিশ চোরের গুহা? চিচিং ফাঁক বললেই ফাক করতে দেব?’

নিশি হেসে গড়াগড়ি খেতে শুরু করল, ‘আমি জানি না তুই কী করবি। হিমুকে তাড়াতে না পারলে তোর কপালে দুঃখ আছে’।

আমি বললাম, ‘সে বোঝাই যাচ্ছে দুঃখ আছে। আরও মজার ব্যাপার হল সব মেনে নেওয়ার পরে যদি আমি হিমুর সঙ্গে সংসার করেও ফেলি, তারপর কোনও গ্যারান্টি আছে হিমুও আমার বাবার মতো ভেগে যাবে না?’

নিশি বলল, ‘তা নেই। ওভাবে গ্যারান্টি বলে কিছু হয় না’।

আমার চা হয়ে গেছিল। আমি বললাম, ‘পরে কথা বলছি। চা খাইয়ে আসি’।

নিশি বলল, ‘যা, পদ সেবা কর’।

আমার মটকা গরম হয়ে গেছিল। ওকে আর পাত্তা না দিয়ে চা নিয়ে হিমুর কাছে গেলাম। হিমুর পেছনে দিদা উবু হয়ে বসে আমাকে দেখছে আর হাসছে। চা টেবিলে নামিয়ে রাখলাম। হিমু বলল, ‘হাওড়া থেকে সাঁতরাগাছি অবধি গিয়ে ট্রেন থেকে নেমে পড়লাম, বুঝলে? মনে হল ভালোবাসাকে ফেলে রাজ্য ছেড়ে যাওয়ার মানে হয় না। হৃদয় ফেলে রেখে কি মানুষ বেশি দূর যেতে পারে?’

আমি বললাম, ‘আর তোমার মাথা কোথায় গড়াগড়ি খাচ্ছে সেটাও দেখতে পারতে একবার। মাথাটা তো একবারেই গেছে’।

হিমু বলল, ‘তুমি বুঝছ না নীপা। মাকে দেখানোর দরকার ছিল আমি চেন্নাই চলে যাচ্ছি। মা এখন সেটাই জানবে। এর মধ্যে আমি ক’দিন তোমাদের বাড়িতে থেকে যাব। তাহলে মা আর ঝামেলা করবে না।’

উরিস্‌সালা। এর তো হেবি বুদ্ধি! পুরো চেঙ্গিস খাঁ। দিদা বলল, ‘পুটকির ক্ষমতা দ্যাখসস নাতিন? ওই ফুটার জন্য কীভাবে চইলা আইসে দেখ খালি’।

আমি বললাম, ‘তুমি এখানে থাকবে, তোমার মা তো ঠিক জানবে। তখন আরও সমস্যা হবে’।

হিমু বলল, ‘অজ্ঞাতবাসে থাকব। বেরোব না। ঘাপটি মেরে থাকব’।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *