৯০
রাতে আমি আর মা পাশাপাশি শুয়েছি। আজ ইচ্ছে হল মার কাছে শুই। অদ্ভুতভাবে মা যেন আমার মনের কথাটা জেনেই বলল, ‘তুই আমার কাছে শো’।
আদিদের বাড়ি থেকে খাবার বেঁধেছেদেও দিয়েছিল। রাতে আর রান্না করতে হয়নি। দুজনে চুপ করে শুয়ে আছি। আমার ঘুম আসছে না। ভেবেছিলাম মা ঘুমিয়ে পড়েছে। অনেকক্ষণ পর মা বলল, ‘ওরা ভদ্র সভ্য স্বাভাবিক মানুষ। আশা করি তোর সমস্যা হবে না’।
আমি কী বলব, বুঝতে পারলাম না। শুধু বললাম, ‘হুঁ’।
আমার মা আছে। মার আমি। আমাদের আর কেউ নেই। মাকে ছেড়ে থাকতে হবে ভেবে ভেতর থেকে একটা কান্না আসছে। বহু কষ্টে সে কান্না চেপে রেখেছি।
মা বলল, ‘তুই এখনও চাকরি করিস না। হয়তো করবিও না। তার মানে তুই হাউস ওয়াইফ হবি। সবার আগে চেষ্টা করবি, বাড়ির সবার সঙ্গে মিলে মিশে থাকতে। প্রত্যেকের কথা শুনবি। ওরা তোকে গুরুত্ব দেবে। তুইও সবার সঙ্গে ভালোভাবে থাকবি। ভিলেন হতে যাস না। সংসারে কেউ ভিলেন পছন্দ করে না। তুই একটু লাজুক। সবার সঙ্গে কথা বলিস না। ওদের বাড়িতে ওর বাবা কিংবা মার বাড়ি থেকে অনেক লোক আসবে। ইচ্ছে না থাকলেও সবার সঙ্গে কথা বলবি। ওরা কেউ তোর বাবা কিংবা আগের বিয়ে নিয়ে খোঁটা দিয়ে কথা বললে ঝগড়া করতে যাস না। মাথা গরম করবি না’।
আমি বললাম, ‘মোদ্দা কথা হল সেই রাতেই যাতে আমাকে আবার বাড়ি দিয়ে না যায়, তাই বলতে চাইছ তো?’
মা শ্বাস ছাড়ল, ‘তাতেও অসুবিধে নেই। যদি তোর আত্মসম্মানে কোনওরকম সমস্যা হয়, তুই নিশ্চিন্তে চলে আসবি। আমি আছি’।
আমি বললাম, ‘ঠিক আছে’।
মা বলল, ‘তবে ওদের বাড়ির লোক হিমুদের বাড়ির মতো না। ওরা অতটা নীচতা প্রকাশ করবেন না, এটুকু আমি বুঝেছি’।
আমি বললাম, ‘আবার সবকিছু কী করে সামলাবে?’
মা বলল, ‘ওরা কোর্ট ম্যারেজ চাইছেন। অত খরচ করতে চাইছেন না। আমিও সেটাই চাই। আদি বলেছে বিয়েতে অত খরচার পক্ষপাতী ও না। একটা জয়েন্ট রিসেপশন হবে, আমরা সে রিসেপশনের খরচ ভাগাভাগি করে দেব’।
আমি বললাম, ‘ঠিক আছে। সবাই যা ভালো বোঝে তাই হোক। আমারও আর সং সাজতে ভালো লাগছে না’।
মা বলল, ‘বাড়ির জন্য বলেছি। দু-তিন দিনের মধ্যেই লোক দেখতে আসবে। আমি আদির বাবা মাকেও জানিয়েছি আমার সিদ্ধান্তের কথা। ওরাও খুশি হয়েছেন এই সিদ্ধান্তে’।
আমি বললাম, ‘তোমরা এত কিছু আলোচনা করে ফেলেছ?’
মা বলল, ‘করতে হবে। আলোচনা না করলে বিয়ে হয় না। ট্রান্সপারেন্সি থাকা দরকার। আমি যেমন আদি সম্পর্কেও শুনলাম এর আগে ওর একটা সম্পর্ক ছিল। বিয়ের কথা হবার সময় কেটে গেছিল’।
আমি চমকালাম। আদি তো আমাকে এই কথা বলেনি। মাকে সে কথা বলতে বলল, ‘তোদের সম্পর্ক সেভাবে দানা বাঁধেনি বলেই বলেনি। আরেকটা কথা মনে রাখবি, বর্তমান সম্পর্কে অযথা অতীতকে টেনে এনে কোনও লাভ হয় না। তুই বা আদি, কেউ যদি একে অপরের অতীত টানতে থাকিস, তাহলে তোরা কেউই ভালো থাকবি না’।
আমি বললাম, ‘তাও একবার কথায় কথায় বলতে পারত’।
মা বলল, ‘গোপন করেনি। ওর বাবা তো বলেছেন। ও গুরুত্বপূর্ণ মনে করেনি হয়তো’।
আমি বললাম, ‘ঠিক আছে। পরে সে এক্স এসে ঝামেলা না করলেই হল’।
মা বলল, ‘পরের কথা ভেবে মাথা খারাপ না করে যাতে বিয়ের পরেও নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারিস, সে চেষ্টা কর। তোর বাবা চলে যাবার পরেও আমার সমস্যা হয়নি, চাকরি করতাম বলে’।
আমি বললাম, ‘চাকরি পাওয়া এত সোজা?’
মা বলল, ‘কিছুই সোজা না জীবনে। একটা ঠিকঠাক মানুষ খুঁজে পাওয়াও ভীষণ কঠিন। তাও চেষ্টা চালানোটাই বড় কথা। পড়াশুনা কর, চেষ্টা কর, সম্পর্কে সৎ থাক। তারপর যা হবার হবে’।
ঘুম আসতে বেশিক্ষণ লাগল না।
অনেক বেলা অবধি ঘুমালাম। ঘুম থেকে উঠে দেখি বসার ঘরে দুজন অচেনা লোক বসে আছে।
জমি বাড়ির দালাল।
৯১
বাড়ি দেখতে আসে লোক। ঘরে যায়, বাথরুম দেখে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে। কত প্রশ্ন তাদের। কেউ কেউ এসে জিগ্যেস করে, ‘বাড়িতে প্রেতাত্মার কোনও লক্ষণ নেই তো?’
দিদা বসে বসে হাসে। ভাগ্যিস বাবার ভাই বোন নেই। তাহলে অনেক সমস্যা হত। মা বলেছে, সেরকম ঠিকঠাক টাকা পেলে নতুনমাকে কিছুটা দেবে। সংসার তো মাকেই চালাতে হয়।
নিশি আমার কাছে আসে। আমার বিয়ের খবর শুনে বলল, ‘এবার ঠিক হবে তো? তুই আবার চলে আসবি না তো?’
আমি বললাম, ‘জানি না। যা হবে, দেখা যাবে। আচ্ছা তুই কি সত্যিই পাগল হয়ে গেছিলি, না নাটক করছিলি? আমাকে বল না প্লিজ’।
নিশি বলল, ‘আমার মনে নেই, বিশ্বাস কর। জানিস, আমারও বিয়ে করতে ইচ্ছে করছে। বাবা বলেছে, আমাকে ভালো স্বধর্মের ছেলে দেখে বিয়ে দেবে। রাজি হয়ে গেছি। বাচ্চাটাকে বোর্ডিং-এ দিয়ে দেবে বলেছে বাবা’।
আমি বললাম, ‘তোর কষ্ট হবে না?’
নিশি বলল, ‘ধুর। অত ভাবি না। বাবার কথা শুনে চলব। যা হবে দেখা যাবে’।
আমি নিশিকে বুঝতে পারি না। নিশিকে বোঝা অসম্ভব। অহেতুক বুঝে লাভ নেই ভেবে হাল ছেড়ে দিলাম।
আদি আমাকে ওর আগের সম্পর্কটা নিয়ে বলেছে। খুব সিরিয়াস ছিল। মেয়েটা শেষ মুহূর্তে বেঁকে বসেছিল। বিয়ে করবে না। আদি নাকি জানে না মেয়েটা কেন বেঁকে বসেছিল। আমি বেশি খোঁচাইনি। জানার থাকলে পরে জানা যাবে। আদি আমাদের নিয়ে বেশি উৎসাহিত। বিয়ের পরে আদি অরুণাচল যেতে চায়। আমি বলেছি, অত দূর যাওয়া অভ্যাস নেই। যদি বমি করে দিই? আদি বলেছে, সামলে নেবে।
আদি অনেক কথা বলে। আমি শুনি। শুনতে ভালো লাগে। ব্যবসায় চেষ্টা করছে, আরও ভালো হতে হবে। তারপরেই খাওয়া দাওয়ায় চলে যায়। আমাকে নিয়ে একদিন ফুড ওয়াক করবে। কলকাতার ভালো ভালো রেস্তরাঁয় খাবে। আমি হাসি, হাসতে হাসতে বলি, ঠিক আছে।
খেতে ভালোবাসে ছেলেটা। মায়া জন্মায়। মায়া বড় বাজে বস্তু। আগে বুঝিনি। এখন বুঝতে পারি। রাতে ঘুম ভাঙলে দিদা ফিক ফিক করে হাসতে হাসতে বলে, ‘কীরে মাগি, ছ্যামরাডারে কইবি না?’
আমার বুকটা ধুক করে ওঠে, জিগ্যেস করি, ‘কী বলব?’
দিদা বলে, ‘তুই যে আমারে মারসিলি, কইবি না?’
আমার গলা শুকিয়ে যায়। উঠে বসি। অনেকটা জল খাই।
আদি যদি জানে আমি দিদাকে মেরেছিলাম, নিশ্চয়ই বিয়েটা ভেঙে দেবে। কিন্তু কেউ তো জানে না সে কথা। তা সত্ত্বেও আমার বুকের মধ্যে কাঁটার মতো বিঁধে থাকে সবটা। উৎকণ্ঠা, বিয়ের দিন গোনার মধ্যে ভুলতে চাইলেও দিদা ভুলতে দেয় না।
সেদিন কলকাতা যাইনি। মা ব্যাঙ্কে যাবে। আমাকে বলল, ‘চল, তোকে লকারে নিয়ে যাব। ভালো করে দেখে নে’।
আমি যেতে চাইছিলাম না। মা বলল, ‘দেখে নে। আমার জন্য না, তোর জন্যই যাওয়া দরকার। ক’দিন আছি, কবে চলে যাব, আমি নিজেও তো জানি না। চল’।
এরপর আর কোনও কথা বলা যায়? অগত্যা যেতে হল। গোটা পদ্ধতিটা ছোট থেকে কতবার দেখেছি, তবু ভুলে যাই। মা আবার দেখিয়ে দিল। গয়না গুণে গুণে মিলিয়ে নিল মা।
লকার থেকে বেরিয়ে মা বলল, ‘তুই বাড়ি চলে যা। আমি পরে যাচ্ছি। আরও কিছু কাজ আছে’।
মা রিকশা ভাড়াও দিয়ে দিল। কিন্তু কপালে থাকলে যা হয়!
ব্যাঙ্ক থেকে বেরোতেই অপ্রত্যাশিতভাবে হিমুর সামনে পড়ে গেলাম। হিমু আমাকে দেখেই এগিয়ে এল, ‘কেমন আছ?’
আমি ঘাড় নাড়লাম, ‘ভালো। তুমি কবে এলে?’
হিমু বলল, ‘কাল। বেশ কিছু কাজ আছে, সেরে চলে যাব। তোমার কী খবর?’
আমি বললাম, ‘চলছে’।
রোদ উঠেছে বাজেরকম। খুব গরম পড়েছে। আমি বুঝতে পারছিলাম না, আমার অস্বস্তি হচ্ছে কেন? গরমের জন্য না হিমুর জন্য?
হিমু বলল, ‘আমি বিয়ে করিনি। তোমার জন্য অপেক্ষা করছি এখনও। তুমি হয়তো ভেবে থাকবে মার জন্য আমি তোমার উপর রাগ করে আছি, ব্যাপারটা তা নয়। আমি তোমার দিকটা বোঝার চেষ্টা করে বুঝেছি, তোমার কোনও দোষ ছিল না। ওই সময়টা তোমার পাশে দাঁড়ানো উচিত ছিল আমার। পারলাম না। অফিসের ডাকে চলেও যেতে হল’।
আমি বললাম, ‘আমি কিছু মনে করিনি। ভালো থাকো’।
হিমু বলল, ‘এটুকুই? আর কিছু বলবে না? তোমার তো আর বিয়ে হবে না নীপা, তুমি এখনও আমাকে কেন মেনে নিতে পারছ না?’
আমি বললাম, ‘কে বলেছে আমার আর বিয়ে হবে না?’
হিমু দৃঢ়স্বরে বললে, ‘তুমি নিজেই করতে পারবে না। তোমার মধ্যে অনেক ডিলেমা কাজ করে, আমি জানি’।
আমি বললাম, ‘আমি একজনকে ভালোবাসি। সম্পর্কে আছি। এখন আর এসব কথা না বলাই ভালো’।
হিমু প্রথমে বড় বড় চোখ করল। পরক্ষণেই হেসে ফেলল, ‘কেন এসব বলছ? আমাকে কাটাতে চাও তো? সে আমি এমনিই কেটে গেছি। আলাদা করে বলার দরকার নেই’।
আমি বললাম, ‘মিথ্যে বলছি না। সত্যি বলছি। আমি একটা সম্পর্কে আছি। আসি। ভালো থেকো’।
তাড়াতাড়ি একটা রিকশায় উঠে পড়লাম। হিমু একইভাবে দাঁড়িয়ে আছে। যেন কেউ ওকে খুব জোরে ঝাঁকিয়ে গেছে। আমার একদিনের বিয়ে করা বর। মাথা ঘুরিয়ে আর দেখলাম না। সামনের দিকে তাকালাম।
ঘণ্টাখানেক বাদে বাড়িতে স্নান সেরে একটু বসেছি, কলিং বেল বাজতে দরজা খুলে দেখি, হিমু দাঁড়িয়ে আছে। ভয়াবহ বিধ্বস্ত চেহারা। আমাকে দেখে কথা বলতে পারল না। আমি বললাম, ‘কিছু বলবে?’
হিমু বলল, ‘তোমার কথাটা শোনার পর থেকে মনে হচ্ছে আমি পাগল হয়ে যাব’।
৯২
আমার জীবনে হিমু ফিরে আসবে না, এটা হতেই পারে না। হিমু না ফিরলেই বোধহয় আমি অবাক হতাম। তবে আমার ধারণা ছিল আমার ভূত হিমুর উপর থেকে অনেকটা নেমেছে। অথচ এখন ওর চোখদুটো কিছুতেই সে কথা বলছে না। বললাম, ‘ভেতরে এসো’।
হিমু ঘরের ভিতরে এসে বসল। আমার অসহায় লাগছিল। মা থাকলে সমস্যা হত না। মা ঠিক হিমুকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে পাঠিয়ে দিত। এমনভাবে এসেছে, আমার ভয় ভয় লাগছিল।
হিমু বলল, ‘ছেলেটা কে?’
আমি বললাম, ‘চিনবে না’।
হিমু বলল, ‘এলাকার?’
আমি মাথা নাড়লাম।
হিমু রুমাল বের করে কপাল মুছল। উঠে দাঁড়িয়ে অস্থিরভাবে ঘরের মধ্যে পায়চারি করা শুরু করে দিল। আমি বললাম, ‘কী হল? এরকম করছ কেন?’
হিমু বলল, ‘তুমি আমার বিয়ে করা বউ। তুমি কেন অন্য লোকের সঙ্গে বিয়ে করবে?’
আমি চুপ করে রইলাম।
হিমু হিংস্রভাবে এসে আমার কাঁধে ধাক্কা মারল। আমি মেঝেতে পড়ে গেলাম। হিমু সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে এসে আমাকে ধরল, ‘এ বাবা, আমি এক্সট্রিমলি সরি নীপা, ছি-ছি, এটা আমি কী করলাম’।
আমি হিমুর হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বললাম, ‘তুমি চলে যাও’।
আমার অসহ্য ব্যথা হচ্ছিল কাঁধে। হিমু আমাকে ধরতে গেল।
আমি সরে গিয়ে বললাম, ‘তুমি যাও’।
হিমু গেল না। কাঁদতে শুরু করল।
দিদা ফিক ফিক করে হাসছে, ‘কেমন লাগে ছেমরি? আমারে জালাইসোস তুই, এহন দেখ কেমন লাগে’।
আমি বললাম, ‘তুমি প্লিজ যাও। তোমার তো এখানে থাকার কথা না। তোমার মা মারা যাবার পর তোমার বাড়ির লোক আমাকে যা নয় তাই বলেছে। তারপরে তুমি আমার সঙ্গে আর কোনওরকম যোগাযোগ করনি। এখন অহেতুক সময় নষ্ট করছ’।
হিমু বলল, ‘তুমি আমাকে একটা সুযোগ দিতে পারতে নীপা’।
আমি বললাম, ‘আমার নিজেকে সুযোগ দেওয়ার দরকার ছিল। আমি অনেক চেষ্টা করেছি। আমি তোমাকে ভালোবাসি না। কেন ভালোবাসতে পারিনি, আমি জানি না। কিন্তু অকারণে জোর করে কাউকে ভালোবাসা আমার পক্ষে সম্ভব না। তুমি যাও’।
হিমু বলল, ‘আইনত তুমি আমার স্ত্রী’।
আমি বললাম, ‘না। আমাদের বিয়ে ভেঙে গেছে। তাছাড়া ধরো আমি তোমার স্ত্রী হলামও, কিন্তু আমি তো তোমার সঙ্গে থাকতে চাই না। অকারণ জোর করে কোনও কিছু টিকিয়ে রাখার কি কোনও মানে আছে?’
হিমু বলল, ‘আমি তোমার জন্য কত কিছু করেছি নীপা। তোমাদের বাড়িতে থেকেও গেছি। তোমার কি আমার প্রতি একটুও দয়ামায়া জন্মায়নি?’
আমি বললাম, ‘দয়া মায়া থাকলেও একসঙ্গে থাকা যায় না’।
হিমু কাতর গলায় বলল, ‘তুমি তো চেষ্টাই করতে চাওনি কোনওদিন। আমি এত ভালোবাসলাম তোমাকে, তুমি কী করলে? আমি অন্তত এটুকু জানতাম, তুমি কোনওদিন বিয়ে করবে না। বাড়িতেই থাকবে। আমি মাঝে মাঝে এসে তোমাকে দেখব। সেটা তো হল না। তুমি অন্য কাউকে ভালোবেসে ফেললে। এ যে কতটা যন্ত্রণার, তা আমি তোমাকে কী করে বোঝাব?’
আমি বললাম, ‘পৃথিবীতে অনেক মেয়ে আছে হিমু। যাকে খুশি বিয়ে করে আমাকে মুক্তি দাও’।
হিমু বলল, ‘কেন যাকে খুশি বিয়ে করতে যাব? আমি তোমাকে ভালোবাসি’।
আমি বললাম, ‘না, ভালোবাসো না। এটা তোমার একটা রোগ। তুমি যথেষ্ট শিক্ষিত একজন মানুষ। ভালো ডাক্তার দেখাও। নিজেই বুঝতে পারবে তুমি রোগে ভুগছ। ভুল কোরো না। নিজের চিকিৎসা করাও। নিজে বাঁচো, আমাকে বাঁচতে দাও’।
হিমু বলল, ‘ছেলেটাকে দেখাও’।
আমি বললাম, ‘না’।
হিমু বলল, ‘প্লিজ দেখাও। আমি দেখে চলে যাব’।
আমি বললাম, ‘না আমি দেখাতে পারব না’।
তাকে একটা কাঁচি ছিল। হিমু উঠে সেই কাঁচিটা নিয়ে নিজের গলায় ধরে বলল, ‘আমায় দেখাও নীপা। নইলে আমি নিজেকে শেষ করে ফেলব’।
শরীরে প্রবল ব্যথা হচ্ছিল, তার উপরে হিমুর এই পাগলামি। বললাম, ‘তুমি বুঝতে পারছ, কী করছ? একবার ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখো। তুমি এত বড় চাকরি করো, একজন এন আর আই। তোমার যা টাকা, তা দিয়ে তুমি পৃথিবীর যে-কোনও জায়গায় গিয়ে থাকতে পারো, যা খুশি করতে পারো। তার জায়গায় তুমি কী করছ? একবার ভেবে দেখো তো!’
হিমু চোখ মুখ শক্ত করে বলল, ‘ছেলেটাকে দেখাও। আমি চলে যাব’।
আমি এই পরিস্থিতি থেকে বাঁচাবার জন্যই ফোন থেকে আদির হোয়াটস অ্যাপ ডিপিটা বের করে ফোনটা হিমুর দিকে এগিয়ে দিলাম।
হিমু ফোনটা হাতে নিয়ে খুট খুট করতে করতে আদির নাম্বারটা দু’চার বার বলে ফোনটা সোফার উপর রেখে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
৯৩
প্রচণ্ড ভয় পেলে কী করে মানুষ? আমি জানতাম না, এতটা ভয় কোনওদিন পেতে পারি। আদির সঙ্গে আমার বিরাট কোনও পরিচয় হয়নি, বিরাট কোনও রসায়ন গড়ে ওঠেনি, তবু হিমু যেই মুহূর্তে আদির নাম্বার নিয়ে বেরিয়ে গেল, আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল। আমার মনে হল হিমু আদিকে আমার থেকে দূরে সরিয়ে দেবে।
আমি সঙ্গে সঙ্গে আদিকে ফোন করলাম। একবার রিং হতেই আদি ফোন ধরল। আমরা আপনি থেকে তুমিতে গেছি একদিন হল। ফোন ধরেই আদি বলল, ‘বলো’।
আদি বলল, ‘কী? সেই মেয়েটা বিরক্ত করছে নাকি?’
আমি বললাম, ‘না। মেয়েটা না। ছেলেটা। যার সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল’।
হিমু যা যা করেছে সব বললাম।
আদি বলল, ‘বেশ তো, ফোন করুক। যা খুশি করুক। আমিই তো রিসিভ করব, ভয়ের কিছু নেই। তুমি অহেতুক ভয় পাচ্ছো কেন?’
আদির গলায় যেন জাদু আছে। আমার বুকের ভেতরের সমস্ত উৎকণ্ঠা এক কথায় কমে গেল। আমি বললাম, ‘ভয় পাব না?’
আদি বলল, ‘না। ভয় পেও না। আমি আছি তো। নিশ্চিন্ত থাকো’।
আমি চুপ করে রইলাম। বাবা চলে গেল, মা ছাড়া তো কেউ ছিল না। হঠাৎ করে মনে হল আদিকেই যেন আমি আজীবন খুঁজছিলাম। আদি বলল, ‘নীপা’।
বললাম, ‘বলো’।
আদি বলল, ‘তুমি চিন্তা কোরো না। পৃথিবীর কোনও শক্তিকে নিয়েই কোনওরকম চিন্তা কোরো না। এক কাজ করো, একটু ঘুমাও’।
আমি বললাম, ‘এখন ঘুমাব? এই পরিস্থিতিতে?’
আদি বলল, ‘আমি তাই করি। খুব টেনশন হলে ঘুমিয়ে পড়ি। আমার প্রাক্তন যখন আমাকে একদিন সব জায়গা থেকে ব্লক করে দিয়েছিল, আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। তুমি শুনতে চাও ওর কথা?’
আমি বললাম, ‘না। আমার কারো কথা শোনার ইচ্ছে নেই। হিমু তোমাকে বেশি না জ্বালাক, তাহলেই আমি খুশি’।
আদি বলল, ‘তুমি শোও। চিন্তা কোরো না’।
আমি ফোন রাখলাম। মা এল কিছুক্ষণ পরে। আমাকে বিধ্বস্ত অবস্থায় বসে থাকতে দেখে বলল, ‘কী হল?’
আমি বললাম, ‘হিমু এসেছিল। আদির নম্বর নিয়ে গেছে’।
মা শান্ত মুখে ব্যাগ রেখে দরজা বন্ধ করে বলল, ‘এসব হতে পারে, তুই ভাবিসনি? আমি তো ভেবেছিলাম। আমার মনে হয়েছিল এমন হতে পারে। এ জন্যই আমি বাড়ি বিক্রির কথা ভেবেছিলাম’।
আমি বললাম, ‘এভাবে পালিয়ে যাওয়া যায় নাকি? হিমু ঠিক খুঁজে বের করত’।
মা বলল, ‘তাও ঠিক। হিমুর মধ্যে না পাওয়ার পাগলামি আছে। তুই আদিকে বলেছিস?’
আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, সব বলেছি। আদি চিন্তা করতে বারণ করেছে। বলেছে সামলে নেবে’।
মা বলল, ‘হ্যাঁ, আদিকেও দায়িত্ব নিতে হবে। ভালো করেছিস বলেছিস। ও বুঝে নেবে’।
আমি বললাম, ‘আমার কেমন অস্বস্তি হচ্ছে, বুঝতে পারছ না?’
মা বলল, ‘স্নান করিসনি তো? স্নান কর গিয়ে। চিন্তা করিস না। কিচ্ছু করতে পারবে না’।
আমি স্নানে গেলাম। দিদা হাসছে, ‘দেখসস পুঙ্গায় কেমন আগুন লাগসে? দেখ! পাপ করসস তুই, পাপের শাস্তি এভাবেই পাবি!’
আমি শাওয়ার ছেড়ে দিলাম। জলের ধারায় চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলাম। আদিকে কত বাজে কথা বলতে পারে হিমু? আদি কী মনে করবে? ওদের বাড়িতে আমাকে থাকতে হবে। এর মধ্যে হিমুর কথাগুলো কি একটুও প্রভাব ফেলবে না? স্নানের মধ্যেই আমার বুক ধড়ফড় করতে শুরু করল। ঘাম হচ্ছে। আমি মেঝেতে বসে পড়লাম। দম বন্ধ হয়ে আসছে। মনে হচ্ছে যেন আমি মরে যাচ্ছি। কীভাবে যে শাওয়ার বন্ধ করে বাথরুম থেকে বেরোলাম, আমিই জানি। বেরিয়ে বিছানার চাদরটাই ভেজা গায়ে জড়িয়ে ‘মা, ও মা’ বলে ডাকতে শুরু করলাম।
মা ছুটে এসে আমাকে ধরল। ‘কী হয়েছে?’
আমি শ্বাস নিতে নিতে বললাম, ‘শরীর খারাপ লাগছে’।
কাঁদতে শুরু করলাম। মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, ‘কিছু হবে না। কিছু হবে না’।
৯৪
শুয়ে ছিলাম। আদি ফোন করে বলল, ‘হিমাংশু ফোন করেছিল। খুব কান্নাকাটি করল। তোমাকে খুব ভালোবাসে এসব বলল’।
আমি কী বলব বুঝতে পারলাম না। এরকম শরীর খারাপ আমার অনেকদিন হয়নি। শুধু মানসিক চাপে যে এত শরীর খারাপ হতে পারে, স্বপ্নেও ভাবিনি। বললাম, ‘তুমি কী বললে?’
আদি বলল, ‘তোমার গলাটা এরকম লাগছে কেন?’
আমি বললাম, ‘আমি টেনশনে অসুস্থ হয়ে পড়েছি’।
আদি বলল, ‘অসুস্থ হবার কিছু নেই তো। ওসব নিয়ে ভেবো না। আমি আসব? বিকেলের মধ্যে পৌঁছে যাব’।
আমি বললাম, ‘না না, তোমার কষ্ট হবে। এত কষ্ট করে আসার দরকার নেই’।
আদি বলল, ‘ঠিক আছে, যাব না। কিন্তু তুমি হিমাংশুকে নিয়ে অকারণ ভয় পাচ্ছ কেন?’
আমি বললাম, ‘জানি না। আমি কী নিয়ে ভয় পাচ্ছি, আমি নিজেই জানি না’।
আদি বলল, ‘ভয় পেও না। মাথা থেকে সব চিন্তা বের করে দাও। অহেতুক অকারণ চিন্তা করার দরকার নেই। দেখো, আমাকে যে কেউ এসে আজেবাজে কিছু বলে গেলেও আমি তোমাকেই বিয়ে করব। বুঝেছ?’
আমি বললাম, ‘হ্যাঁ। বুঝেছি। তোমাকে আসতে হবে না। তুমি ঠিক থাকো’।
আদি বলল, ‘আমি হিমুকে বুঝিয়েছি, দ্যাখো ভাই, প্রত্যেকটা মানুষের জীবনে আরেকটা লোক আসে। একজন প্রাক্তন হয়। এটা নতুন কিছু না। তুমিও নতুন জীবন শুরু করো। আমি আর নীপা পরস্পরকে ভালোবাসি। তুমি এটা নিয়ে ভেবো না আর’।
আমি বললাম, ‘কোনও লাভ নেই। হিমুর এসব বোঝানোতে কিচ্ছু আসে যায় না। হিমু আবার তোমাকে জ্বালাবে’।
আদি বলল, ‘জ্বালাক। এটা খুব সামান্য বিষয় নীপা। এটা নিয়ে ভেবো না। ঠিক আছে?’
আমি বললাম, ‘ঠিক আছে। পারলে ওকে ব্লক করে দিও’।
আদি বলল, ‘আচ্ছা, তাই করব’।
আমি ফোন রাখলাম। বাইরে নিশির গলার স্বর পাওয়া যাচ্ছে। বাবার সঙ্গে ঝগড়া করছে। দিদা এখন কথা বলছে না। শুধু ফিকফিক করে হাসছে। দিদাকে দেখলেই আমার অস্বস্তি হচ্ছে।
মা ডাব নিয়ে এসে বলল, ‘এক চুমুকে খেয়ে নে। বাইরে বেরিয়ে রোদটাও লেগেছে। পেট ঠান্ডা হোক’।
আমি ডাবের জল খেয়ে বললাম, ‘হিমু ফোন করেছিল আদিকে’।
মা বলল, ‘আদি বুঝিয়েছে?’
আমি মাথা নাড়লাম।
মা বলল, ‘আদির হিমুর সঙ্গে বেশি কথা না বলাই ভালো। যত কম কথা হবে, তত ভালো’।
আমি বললাম, ‘আমিও তাই বলেছি। ব্লক করতে বলেছি’।
মা কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল, ‘সব কিছুর মধ্যে সব থেকে খারাপ দিকটা ভাববি। এখন খুব খারাপ হলে কী আর হবে? বিয়েটা হবে না, তাই তো? হবে না। কী সমস্যা?’
আমি বললাম, ‘আমার ওখানেই সমস্যা হচ্ছে। আমি জানি না কেন, আমার মনে হচ্ছে আদির সঙ্গে বিয়ে না হলে খুব খারাপ হবে’।
মা বলল, ‘কিচ্ছু খারাপ হবে না। পৃথিবীতে একজনের পছন্দের মানুষের সঙ্গে কারো বিয়ে না হলে ওখানেই সব কিছু শেষ হয়ে যায় না। তুই ওয়ার্স্টটাই ভাব। যা হবে হবে’।
আমি কিছু বললাম না।
মা বলল, ‘তুই নিজের পড়াশুনাটা ঠিক করে করবি। তোকে নিজের পায়ে দাঁড়াতেই হবে। কারো উপর নির্ভরশীল হবি না। আমি আদির বাবা মার সঙ্গে কথা বলেছি। তুই চাকরি করবি বিয়ের পরে। যে কোনও সম্মানজনক চাকরি, যা পাবি তাই করবি। মাইনে কম হোক। টাকার জন্য যেন কারো কাছে হাত পাততে না হয়। অর্থনৈতিক স্বাধীনতাটা দরকার সবার আগে। ভালোবাসা ইত্যাদি কিচ্ছু ম্যাটার করে না। তোকে আমি সব সময় একটা কথাই বলে এসেছি। মেয়েরা ঘরের কাজ করবে, রান্না করবে, বাসন মাজবে, ঝাট দেবে, সব ওরা সিস্টেমের অংশ বলে ভেবে নেবে। যেন সেটাই মেয়েদের কর্তব্য। তখন থেকেই ওরা তোকে টেকেন ফর গ্র্যান্টেড ভাবতে শুরু করে দেবে। সেটা তো করতে দেওয়া যাবে না। তোকে চাকরি করতে হবে’।
আমি বললাম, ‘করব’।
মা মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে শুরু করল।
কলিং বেল বাজল। জানলা দিয়ে দেখলাম, হিমু বাইরে দাঁড়িয়ে আছে।
মা বলল, ‘আমি দেখছি, তুই বোস’।
আমি কাঁটা হয়ে বসে রইলাম।
কিছুক্ষণ পর মা কাঁপতে কাঁপতে এসে বলল, ‘আমার ফোনটা কি এই ঘরে রেখে গেছিলাম?’
মার গলা কাঁপছিল। আমি বললাম, ‘কেন? কী হল?’
মা বলল, ‘হিমু একগাদা ঘুমের ওষুধ খেয়ে এসেছে’।
