৭৫
সন্ধে নেমেছে।
তুমুল মাথা ধরেছে। ঘরে আলো নিভিয়ে শুয়ে আছি। নিশি কেমন ঘ্যানঘ্যানে সুরে কেঁদে যাচ্ছে।
মাথা ধরা তাতে আরও বেড়ে যাচ্ছে।
মা ঘরে এসে আলো জ্বালল, ‘কী হল? শুয়ে আছিস যে?’
আমি বললাম, ‘আমি আর ও বাড়ি যাব না’।
মা বলল, ‘কেন?’
আমি বললাম, ‘আমার অনির্বাণদাকে সুস্থ বলে মনে হল না। কেমন কেমন যেন। জেঠু জেঠি ছিল না, অনির্বাণদা আমার পাশে এসে বসে পড়েছিল। আমার মনে হয় ওর বিয়ে এসব কোনওকারণেই ভেঙেছে। মাথায় গন্ডগোল আছে’।
মা বলল, ‘মানে? তোর সঙ্গে অসভ্যতা করেছে নাকি?’
আমি চুপ করে গেলাম।
মা বলল, ‘তুই বল। কোনরকম অসভ্যতা করলে আমি ওদের কাউকেই ছাড়ব না’।
আমি ক্লান্ত গলায় বললাম, ‘ছেড়ে দাও। এমনিই চলে যাবে। চলে যাক। জেঠু কিছু বললে বলে দিও আমি আর যাব না’।
মা শ্বাস ছাড়ল, ‘ভেবেছিলাম একটা ভালো কিছু হবে। এ ছেলেও এরকম হল? পড়াশুনোয় কত ভালো’।
আমি বললাম, ‘হবে হয়তো, পড়াশুনা বেশি করে মাথা খারাপ হয়ে গেছে। এরকম অনেকে আছে। বেশি বেশি পড়ে মেন্টাল হয়ে যায়। মেয়েদের চাকর টাকর ভাবে। ভাবে জুতো মেরে ঠিক করা যায়। কিছু বলার দরকার নেই কাউকে। কিন্তু আমাকে আর ও বাড়ি যেতে বোলো না’।
মা মাথা নিচু করে বসে থেকে বলল, ‘ক’দিন হল আমার মাথার মধ্যে একটা চিন্তা ঘুরচ্ছে। আমার কিছু হলে তুই কী করবি? তুই একা থাকবি ভাবলেই আমার কেমন একটা হচ্ছে। আমি মনে হয় পাগল হয়ে যাচ্ছি’।
আমি বললাম, ‘পাগল হবে কেন? তুমি অনেক কিছু সামলেছ। এমনভাবে সামলেছ, যা কখনওই চাপ বলে মনে হয়নি। হয়তো বয়েস বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সে সব চাপ এখন তোমার উপরে এসে পড়ছে। এ জন্যই তোমার এরকম হচ্ছে’।
মা বলল, ‘একটা লোক এসেছিল আজ। ভালো দাম দেবে। বাড়ি কিনে নেবে বলছে। আমি না বলিনি। তোর গ্র্যাজুয়েশনটা হলে মাস্টার্সটা তো কলকাতা থেকেই করবি। এখানকার পাট চুকোই। কী বলিস?’
আমি বুঝলাম, মা সত্যি ভেঙে পড়েছে। এই অভিশপ্ত পাড়া, এই বাড়ি, জীবন, সবকিছু মার মাথার উপরে চেপে বসেছে। আমি বললাম, ‘কিছু বিক্রি করতে হবে না। তুমি ভেবো না। সব ঠিক হয়ে যাবে’।
মা বলল, ‘একটা সময় ভেবেছি নিজের পায়ে দাঁড়ালেই একটা মেয়ের সবকিছু সম্পূর্ণ হয়ে যায়। এখন বুঝি, ব্যাপারটা তাও না। মানুষের জীবনে আসলে মানুষ দরকার। বেশি বেশি করে মানুষ দরকার, বন্ধু দরকার। যে মানুষ যত একা থাকে, সে তত অভাগা’।
আমি ফিক করে হেসে বললাম, ‘তাহলে তোমার সতীনকে নিয়ে এসো। মানুষই তো। ভালো হবে’।
মা বলল, ‘তুই বুঝতে পারছিস না। আমার যদি কোনওদিন কিছু হয়ে যায়, কখন ভুলেও এ কাজ করবি না। সম্পত্তি মানুষকে মানুষ রাখে না। ও খারাপ না। কিন্তু ওর ভাইরা ওর মাথায় বিষ ঢোকাতে শুরু করেছে। আমি না থাকলে ও তোকে দেখা গেল মেরে দিল। আমার এসব ভাবলেই বুক ঢিবঢিব করে। কী জ্বালা বলত, বেঁচে থাকলেও মরে যাবার কথা ভাবলে প্রেশার বেড়ে যাচ্ছে’।
আমি বললাম, ‘ভেবো না। মাথা থেকে সরাও। আমি কাউকে এ বাড়িতে ঢুকতে দেব না’।
মা বলল, ‘লোকটা বলল, এ বাড়িতে যা জায়গা জমি আছে, তাতে কলকাতায় ভালো একটা ফ্ল্যাট হয়ে যাবে’।
আমি বকলাম এবার, ‘তুমি ভেবো না বলছি তো। ভেবো না’।
মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। অনেকক্ষণ দুজনে চুপ করে রইলাম। একটা সময় মা বলল, ‘অনির্বাণ কত ভালো ছেলে ছিল। ছোটবেলায় যখন এ বাড়িতে আসত, তখন তোর খেলনা নিয়ে খেলে আবার জায়গার জিনিস জায়গায় রেখে তবে যেত। সে ছেলে এরকম হয়ে গেল!’
আমি বললাম, ‘ভেবো না বললাম তো’!
মা বলল, ‘তোর কি আমার উপর রাগ হয়? তোর কি মনে হয় হিমুকে আমি তোর থেকে দূরে নিয়ে গেছি?’
আমি দৃঢ় গলায় বললাম, ‘একেবারেই না। আমি হিমুকে কোনওকালেই ভালোবাসতে পারিনি। এর মধ্যে তুমি নেই। তবে তুমি যেভাবে আমাকে হিমুর ব্যাপারে গাইড করেছিলে, অনির্বাণদার ব্যাপারে কেন এগিয়ে দিয়েছিলে, আমি এখনও বুঝতে পারছি না’।
মা বলল, ‘ওই যে বললাম, ভয়। তোকে একা রেখে মরে যাবার ভয় পাচ্ছি আজকাল’।
আমি বললাম, ‘ছাড়ো। এসব নিয়ে ভেবো না’।
মা বলল, ‘তাহলে পড়তে বোস। ভালো রেজাল্ট কর।’
মা আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, কলিং বেল বাজল। মা বলল, ‘এখন আবার কে এল?’
আমি বললাম, ‘চলো দেখি’।
দুজনে বেরোলাম। দরজা খুলে দেখা গেল সমীরণমামা একজন নেতা গোছের লোক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নিশি একটু দূরে দাঁড়িয়ে।
মা বলল, ‘কী চাই?’
সমীরণমামা বলল, ‘এই বাড়িতে আমার বোনের অধিকার আছে। সেটা নিয়ে কথা বলা দরকার। আমি ভুবনদাকে নিয়ে এসেছি। সালিশি হোক’।
মা নেতাগোছের লোকটার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনি ভুবনদা?’
উনি ঘাড় নাড়লেন। মা বললেন, ‘অকারণ ঝামেলা করতে চাইছেন? কত টাকা চান?’
লোকটা রেগেমেগে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, এমন সময় একটা কাণ্ড হল।
নিশি দৌড়ে এসে সমীরণমামার হাতে কামড়ে দিল।
সমীরণমামা তিড়িং বিড়িং করে লাফাতে লাফাতে চিৎকার জুড়ল, ‘ষড়যন্ত্র, ষড়যন্ত্র! বাড়িতে পোষা পাগল রেখে দিয়েছে আমাকে কামড়াবে বলে, দেখুন ভুবনদা, কত বড় ষড়যন্ত্র’!
আর ভুবনদা! নিশির লাফঝাঁপ দেখে ভুবনদা রাস্তায় নেমে এমন একখানা দৌড় লাগালেন, দেখে মনে হচ্ছিল অলিম্পিকে গেলে দিব্যি দু’চারটে মেডেল নিয়ে চলে আসতে পারবেন।
৭৬
স্বপ্নে আজকাল চিলকার নৌকোভ্রমণটা আসে। জলের মাঝামাঝি একসময় হঠাৎ হিমু আমার গলা টিপে ধরে, আমার দমবন্ধ হয়ে যায়, আমি ছটফট করতে থাকি। হিমু আমাকে ঠেলে জলে ফেলে দেয়। মাঝরাতে উঠে বসি ঘামতে ঘামতে।
দিদা আমার দিকে চেয়ে থেকে ফিকফিক করে হাসে, ‘কীরে ছেমরি, ঘুম হয় না? বুঝোস ঘুম না হইলে কেমন জ্বালা? বুঝোস?’
রাতে ঘুম না আসার মতো বড় অভিশাপ আর কিছুতে নেই। শুয়ে থাকি, ঘড়ির কাঁটার শব্দ হয়, কুকুর ডাকে, কখনও নিশির বাচ্চা কেঁদে ওঠে। আমি জানলার ধারে গিয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকি। মাঝে মাঝে মনে হয় শেষমেশ কি আমি পাগল হয়ে যাব? আমার জীবনটা কি অভিশপ্ত হয়ে গেল?
আমরা বেঁচে থাকি কেন? বেঁচে থাকার কি সত্যিই কোনও মানে আছে? একদিন তো মরেই যেতে হবে। তাহলে এত যন্ত্রণা, এত নিরাপত্তাহীনতা সহ্য করে বেঁচে থাকব কেন?
খাটে শুয়ে শুয়ে কাঁদি, ভাবতে থাকি, মার কিছু হয়ে গেলে কী হবে আমার? কীভাবে আত্মহত্যা করব?
বেঁচে থাকার কোনও প্রয়োজনীয়তা নেই। কোনও দরকার নেই।
সকাল হয় নিয়মমতো।
সমীরণমামা বাড়ির বাইরে ঘোরাঘুরি করে। মানুষ কোনও বিষয় নিয়ে একবার লেগে পড়তে পারলেই হল, সবসময় সেটা নিয়েই পড়ে থাকবে। নিশির কামড় খাবার পর সমীরণমামা আসা থামায়নি, তবে নিশি কাছে পিঠে থাকলে আসে না।
সারারাত জেগে থেকে একসময় ভোর সাড়ে পাঁচটা বেজে গেছে, বাড়ির দরজা খুলে রাস্তায় গিয়ে দাঁড়িয়েছি, সমীরণমামা দেখলাম সাইকেল করে আসছে। আমাকে দেখে সাইকেল স্লো করল। দাঁত বের করে বলল, ‘কেমন আছিস মা?’
আমি বললাম, ‘ভালো আছি। তোমার হাত কেমন আছে?’
সমীরণমামা বলল, ‘ভালো থাকে? কী বাজেভাবে কামড়ে দিল’।
আমি বললাম, ‘তোমার কপাল ভালো, নিশি সেদিন মুডে ছিল না। ও আধলা নিয়ে ঘোরে। সেটা ছুঁড়লে আর দেখতে হবে না’।
সমীরণমামা সভয়ে বলল, ‘ওরে বাবা। কী সাংঘাতিক’!
আমি বললাম, ‘আমার ছোটমা কেমন আছে?’
সমীরণমামা বলল, ‘ভালো না। চিকিৎসার জন্য অনেক টাকা দরকার। ওই স্যাঁতস্যাঁতে বাড়িতে থাকে। তোর মাকে বোঝা, কী আছে? দুই বোনে থাকবে’।
আমি বললাম, ‘আমি তো তাই চাই’।
সমীরণমামা উৎসাহিত হয়ে বলল, ‘তুই তোর মাকে বোঝা’।
আমি বললাম, ‘আমার বাড়িটা ফাঁকা ফাঁকা লাগে। তোমরাও চলে এসো’।
সমীরণমামা আরও উৎসাহ পেল। চোখ চকচক করে উঠল। বলল, ‘ভাড়াবাড়িতে থাকি। ইচ্ছে তো করে বোনের বাড়িতে আসি। একা একা থাকে দুই বোন। তোর মা আমার দূর সম্পর্কের বোন হলেও কর্তব্য তো আছেই’।
আমি উনুনে আরও হাওয়া দিই, ‘ঠিকই তো। আমিও তাই চাই। মাকে বলব। ভেবো না’।
সমীরণমামা উৎসাহিত হয়ে চলে যায়। এভাবে একটা বেশ আশা ভরসার সম্পর্ক তৈরি হয়। পরদিন আবার আসে। আবার জিগ্যেস করে, ‘মাকে বললি?’
আমি বললাম, ‘বলব। মুড বুঝে। কোন স্টুডেন্ট অঙ্ক ভুল করেছে। খুব রেগে ছিল, বলিনি’।
সমীরণমামা একটু নিভে যায়। পরক্ষণে আবার তার মধ্যে রবার্ট ব্রুসের আত্মা ভর করে, ‘ঠিক আছে। তুই বলসি কিন্তু’।
আমি বলি, ‘নিশ্চয়ই’।
পরদিন আবার দেখা হয়। এদিন বলি, ‘বলেছি’।
সমীরণমামার চোখ চকচক করে, ‘কী বলল?’
বললাম, ‘কিছু বলেনি। শুনে গেছে’।
সমীরণমামার মুখ দেখার মতো হয়। বুঝতে পারি মামা বিশেষ কিছু করে না। কাজ নেই তেমন। ছেড়া জামা, খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি, সাইকেল নিয়ে আসাটা থামে না। অপরিসীম ধৈর্য নিয়ে তিনি তার ছোটবোনের অধিকার দেওয়ানোর নাম করে আসেন।
আমায় মা মা করে ডাকেন। একটা সময় সুখ দুঃখের কথাও বলতে শুরু করে দেন। ‘তোর মামির হার্টের রোগ। কত টাকা লাগে। যা হাতে পাই, সব চলে যায়, জানিস? তারপর বাড়ি ভাড়া। জিনিসপত্রের দাম দেখেছিস?’
আমি বুঝদারের মতো বলি, ‘তা তো ঠিকই। সব জিনিসের দাম হু-হু করে বেড়ে যাচ্ছে। গরিব মানুষ চালাবে কী করে?’
সমীরণমামা বলে, ‘মাকে বোঝাস। আমরা তো পর না’।
আমি বলি, ‘ঠিকই তো। আপনে তো আপনে হোতে হে’।
মামা খুশি হয়। পরদিন একটা কমদামি শাড়ির প্যাকেট নিয়ে এসে আমার হাতে দিয়ে বলে, ‘রাখ। পরিস। গরিব মামা, যতটুকু সামর্থ্য ততটুকু দেবে’।
ধান্দা লেগে থাকার কথা ছিল মামার চোখে, তা দেখতে পাই না। চোখের কোণে সত্যি জল দেখতে পাই। দুর্ভাগ্যবশত মাকে এমন দিনেই ভোরে উঠতে হল। মামা পালাল। মা শাড়িটা আমার হাতে দেখে বলল, ‘তোর কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে?’
আমি বললাম, ‘ভালোবেসেই দিয়েছে’।
মা বলল, ‘তুই কি গাধা? বুঝিস না কেন আসছে?’
আমি বললাম, ‘আসছে তো তাও। ধান্দায় হলেও আসে। আর কে আসে? সবাই তো আমাদের একা ফেলে রাখল, বলো?’
মা থতমত খেয়ে যায়। বুঝতে পারে না, আমার কী হল।
আমাকে বলল, ‘শাড়ি ফেরত দিয়ে দিস। কী জানি, এই নিয়ে আবার কী ঝামেলা করবে। ওদের সঙ্গে কোনওকালেই সেরকম সম্পর্ক নেই। তোকে শাড়ি দিল কেন বুঝলাম না’।
আমি বললাম, ‘মামাই তো। বাড়ির ভাগ নিতে এসে গল্প করে। কত গল্প। মামির হার্টের সমস্যা, সংসার চলে না…’
মা বলল, ‘হ্যাঁ, তা ঠিক, ওদের একটু টানাটানিই চলে। ঠিক আছে’।
সন্ধেয় মার সঙ্গে সমীরণমামার বাড়ি গেলাম। মামা আমাদের দেখে ভূত দেখার মতো চমকে উঠল। মা মিষ্টির প্যাকেট মামির হাতে দিয়ে বলে, ‘তোমাদের খোঁজ নিতে এলাম’।
গল্প হল। কত মরে যাওয়া চারাগাছের মতো সম্পর্ক জল পেয়ে আবার পুনরুজ্জীবন লাভ করে। একসময় মামা মার হাত ধরে হাউ মাউ করে কাঁদতে থাকে, ‘আমাকে ক্ষমা করে দে, অভাব মানুষকে অমানুষ করে দেয় রে বোন’।
আমরা কাঁদি, সবাই মিলে কাঁদি।
মানুষ এত একা, মানুষ চাইলে কোনওদিন একা থাকতে হত না তাদের।
৭৭
‘ছেমরি, এই ছেমরি’।
চোখ খুলে দেখি দিদা আমার মুখের দিকে চেয়ে আছে।
কিছু বললাম না।
দিদা ফিসফিস করে বলল, ‘বাইচা থাইকা কী করবি ছেমরি? মইরা যা। মরণ কঠিন কাম না। বড় সোজা। ছাদে গিয়া ঝাঁপ দে’।
আমার মার মুখটা মনে পড়ল। আমি চোখ বন্ধ করলাম। কানের কাছে সারারাত জুড়ে একই কথা শুনে গেলাম, ‘বাইচা থাইকা কোনও লাভ নাই। মইরা যা’।
কলেজের পরীক্ষা শেষ হয়ে গেছে। রেজাল্ট বেরোবে যে কোনওদিন। অনীশ মাঝে মাঝে একটা ছেলেকে নিয়ে বাইকে করে বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়ে চলে যায়। চোখে রাগ জ্বলজ্বল করে।
এত রাগের কারণ আমি বুঝতে পারি না। একটা আদর্শবাদী ছেলের কথা না শুনলে তার এত রাগ হতে পারে? বামপন্থা তো আর অন্য কোনও ধর্মীয় সংগঠনের মতো না। বামপন্থা মানুষকে মানুষের কাছে যেতে সাহায্য করে। অনীশের মতো কত ছেলে ঘুরে বেড়ায়, তাদের মুখেই বামপন্থা থাকে। কাজে অনীশের মতো হয়।
সমীরণমামা আর বেশি জ্বালাতন করেনি। মাঝে মাঝে আসে, চা খেয়ে চলে যায়। মা হয়তো সমীরণমামাকে কিছু টাকা দেয়। টাকা কত সমস্যার সমাধান করে। টাকা না থাকলে কি সত্যিই কিছু হত? হত না হয়তো। জীবনে টাকার দরকার আছে।
টাকা না থাকলে কী হয়? কিচ্ছু হয় না।
মা একদিন আমাকে বাড়ির দলিল বুঝিয়ে দিল। আমি বুঝতে চাইলাম না, তাও বোঝাল। ব্যাঙ্কের পাশবই বোঝাল, গয়না বোঝাল।
তারপর একদিন বলল, ‘তোকে কলকাতা যেতে হবে। একটা কম্পিউটার কোর্সে ভর্তি হ। বাড়িতে বসে থাকার দরকার নেই’।
আমি আঁতকে উঠলাম, ‘হারিয়ে যাব তো’।
মা বলল, ‘যাতে হারিয়ে যেতে না হয়, সেভাবে যাবি। শহরটাকে চিনবি। ঘরে বসে বসে জীবন কাটবে না। রবিবার অফিস টাইম থাকে না। আমার সঙ্গে যাবি। চিনিয়ে দিয়ে আসব। প্রতি রবিবার যাবি আসবি একা একা। এই কোর্স এখানেও করায়, তবু তুই কলকাতাতেই যাবি। এক কাজে দু’কাজ হয়ে যাবে’।
আমি ভয়ে ভয়ে মাথা নাড়লাম।
সত্যি সত্যিই মা একদিন নিয়ে গেল। কতটা রাস্তা! বাড়ি থেকে রিকশা করে স্টেশন। স্টেশন থেকে ট্রেনে উঠে শেয়ালদা। সেখান থেকে আবার বাসে করে কলেজ স্ট্রিটে কম্পিউটার সেন্টার। সারি সারি কম্পিউটার। কত ছেলেমেয়ে। আমাকে একটা কম্পিউটারে বসাল। প্রথম দিন কম্পিউটার জিনিসটা কী শেখাল। ফেরার পথে মা আমাকে হাঁটিয়ে হাঁটিয়ে ঘোরাল।
বইয়ের দোকান, ইউনিভার্সিটি, কত মানুষ! নিজেকে কুয়োর ব্যাং বলে মনে হচ্ছিল। একটা দোকানে ভাত খাওয়াল, স্বাধীন ভারত না কী নাম।
দিদা মুখ বেঁকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দূরে। আমি কলকাতা এসেছি বুড়ির একবারে পছন্দ হচ্ছে না, বুঝতে পারছি।
খেয়ে দেয়ে দুজনে আরেকটু ঘুরলাম, ভূতের গল্পের বই কিনলাম। মা বেশ কয়েকটা বই কিনল।
শেয়ালদায় এসে ট্রেনে উঠে মা বলল, ‘এবার একা একা আসতে পারবি তো?’
আমি বললাম, ‘আরেকদিন এসো’।
মা মাথা নাড়ল, ‘না। একাই আসতে হবে। একা চলাফেরা করার শিক্ষাটা দরকার। আর…’
এটুকু বলে মা চুপ করে গেল। আমি জিগ্যেস করলাম, ‘আর কী?’
মা বলল, ‘কিছু না’।
ট্রেনে যাওয়ার একটা নেশা আছে। জানলার পাশে বসেছি, ভিড় খুব বেশি নেই। হাওয়াটা মুখে এসে লাগছে। ভালো লাগছিল।
বাড়ি এসে মা বলল, ‘কয়েকটা চাকরির পরীক্ষা দিবি। প্রস্তুতি নেওয়া শুরু কর’।
কলেজ স্ট্রিট থেকে কিনে আনা কম্পিটিটিভ এক্সামের বইগুলো মা আমাকে দিল। বলল, ‘যতটা বুঝবি, বোঝার চেষ্টা কর। এরপরে একটা কোচিঙে ভর্তি করে দেব’।
আমি বললাম, ‘ঠিক আছে’।
বই পড়ি, অংক করি, আবার ভূতের বইও পড়ি। পড়তে খারাপ লাগে না। পড়তে পড়তেই শুনতে পাই, নিশি কখনও চিৎকার করছে, কাঁদছে। নিশির জন্য মাঝে মাঝে খুব খারাপ লাগে। পরক্ষণে নিশির কথা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করি। আমি দেখেছি যে কথায় আমাদের মন বেশি খারাপ হয়, আমাদের মাথা সে কথা স্মৃতি থেকে মুছে ফেলতে চেষ্টা করে। নিশিকে নিয়ে হয়তো বেশি ভাবতামও না। শুধু শব্দগুলো আমার ঘরে আসে বলে ভাবতে বাধ্য হই।
পরের রবিবার একাই গেলাম। কাগজে লিখে নিয়ে গেছিলাম বাসের নাম। চিনে চিনে ঠিক পৌঁছে গেলাম। আত্মবিশ্বাস হল। কম্পিউটারে অনেকক্ষণ ধরে টাইপ করাল। ক্লাসের পরে আলাপ হল পিউর সঙ্গে। পিউ কলকাতার মেয়ে।
ফুচকা খেলাম দুজনে।
আমাকে শেয়ালদা অবধি পৌঁছে দিল। বলল, ‘একটা বড় ফোন নে। আজকাল কেউ বিশ্বাসই করবে না তোর অ্যান্ড্রয়েড ফোন নেই।’
আমি বললাম, ‘নেবো’।
ও যে আমার সঙ্গে বিধাননগর অবধি চলে আসবে ভাবিনি। গল্প করতে করতে চলে এসেছিল। নেমে যাবার আগে ওই ফোন নেওয়ার কথাটাই বলে গেল। আমার মাথার মধ্যেও ঢুকে গেল।
বাড়ি ফিরে মাকে বললাম। মা বলল, ‘হুঁ, এটা ভাবছিলাম’।
রাতের মধ্যে ফোন চলে এল। পিউ নাম্বার দিয়ে দিয়েছিল। ওকেই প্রথম ফোন করলাম।
পিউ খুব খুশি। হোয়াটস অ্যাপ শিখতে শুরু করলাম। ওই শেখাল।
মাঝরাতে দেখি একটা বিরাট প্রেমের কোট পাঠাল। আমি ফোন করলাম, ‘এটা কি তোমার প্রেমিককে পাঠাতে গিয়ে আমাকে পাঠালে?’
পিউ হাসতে হাসতে বলল, ‘প্রেমিক আবার কী? আমার ছেলে ভাল্লাগে না। তোকে বেশ ভালো লাগল আজ। তোর মেয়েদের ভালো লাগে?’
আমি বললাম, ‘আমার কাউকে ভালো লাগে না। ছেলেদেরও না, মেয়েদেরও না’।
পিউ আরও হাসল। অনেকক্ষণ ধরে হাসল। আমি বুঝলাম, এই নতুন ফোন জিনিসটা জীবনে উৎপাত বাড়াবে। কমাবে না।
৭৮
ফোন না থাকলেই ভালো হত হয়তো। ঘর ভুলিয়ে দেয়, চারপাশ ভুলিয়ে দেয়, বাস্তবও ভুলিয়ে দেয়।
আগে একটা ফেসবুক অ্যাকাউন্ট করে দিয়েছিল নিশি। সেটা খুঁজে পেলাম না। নিজে থেকেই একটা ফেসবুক অ্যাকাউন্ট বানালাম একটু একটু করে। পিউ অ্যাড হল। জানলাম পিউর কিছুদিন আগে বিচ্ছেদ হয়েছে। ও একটা মেয়ের সঙ্গে সম্পর্কে ছিল।
ছেলে ছেলে, মেয়ে মেয়ে প্রেম হয় শুনেছিলাম। প্রথম দেখলাম কাউকে, যে সরাসরি বলে দেয় সে তার সমলিঙ্গের প্রতি আকর্ষিত হয়।
নিশি আমার বন্ধু ছিল। নিশির সঙ্গে এখন কথা বলা সম্ভব না। পিউ আমার বন্ধু হল। আজে বাজে বকে যাচ্ছে সারাদিন ধরে। কবে কোন মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল, বাড়িতে ওর মা রোজ ওকে বলে ডাক্তার দেখাতে। রাত হলে পিউ রোমান্টিক হবার চেষ্টা করে, ‘শোন না, তোর কোনওদিন কোনও মেয়েকে ভালো লাগেনি?’
আমি বললাম, ‘তোকে বলেছি তো, আমার ছেলে মেয়ে কাউকেই ভালো লাগে না। ভালো লাগার জন্য যে জিনিসটা দরকার, সেটাই নেই’।
পিউ হিহি করে হেসে বলে, ‘তোর জল পড়ে না? ওটা শক্ত হয় না?’
আমি ভাবতে বসি। এ কথা আমি ভাবিনি আগে। ভেবে দেখলাম পিউ ঠিক বলেছে। আমার কখনও সেক্স করতে ইচ্ছে হয় না। পিউকে বললাম, ‘না। এটা কি কোনও রোগ?’
পিউ বলল, ‘একবার ডাক্তার দেখা তাহলে’।
আমার মাথায় এবার অন্য চিন্তা এল। এই যে আমার কিছু হয় না, এই জন্যই কি আমি হিমুকে ঠেলে দিলাম? শরীরে যৌন আকাঙ্ক্ষা না এলে কি ভালোবাসা হয় না? তাই হবে হয়তো।
আরও দুটো রবিবার কোচিং সেন্টারে গেলাম, আরেকটু সড়গড় হতেই সেন্টার থেকে জানানো হল এবার থেকে সপ্তাহে তিনদিন যেতে হবে।
এতদিন রবিবার গেছি ট্রেনে, অসুবিধা হয়নি। মঙ্গলবার ট্রেনে উঠে বুঝলাম এ রবির ট্রেন না। এখানে ভয়াবহ ভিড় হয়। লেডিস কম্পার্টমেন্টে দম আটকে দাঁড়িয়ে আছি, মনে হচ্ছে যে-কোনও সময় আমি দম আটকে মরে যেতে পারি। এত ভিড় হতে পারে ট্রেনে? শেয়ালদা পৌঁছে হাঁফ ছাড়লাম। কোনওমতে স্টেশনে নেমে জোরে জোরে শ্বাস ফেলতে ফেলতে সেন্টারে পৌঁছলাম।
পিউ আসেনি। আসবে না বলেছিল। আমায় যেসব টাস্ক করতে দিয়েছিল, সেসব করে বেরোতে বেরোতে দুপুর হল। বিকেল হলে আবার ভয়াবহ অফিস টাইমের ভিড়ে আমার ফেরা মাথায় উঠবে ভেবে বেশ তাড়াহুড়ো করে হাঁটছিলাম। কলেজ স্কোয়ারে প্যারামাউন্টের ঠিক সামনে একটা ছেলের সঙ্গে ধাক্কা লাগল। হাতে একগাদা বই। চোখে রিমলেস চশমা।
খুব সুন্দর একটা পারফিউমের গন্ধও পেলাম। ছেলেটাকে রেগেমেগে বললাম, ‘দেখে চলতে পারেন না?’
ছেলেটা মুখ কাঁচুমাচু হয়ে বলল, ‘সরি। ভীষণ সরি। একটা দোকান খুঁজছি বুঝলেন? কিছুতেই পাচ্ছি না। বোন একটা বই আনতে দিয়েছে, ওই পাবলিশার ছাড়া কোথাও পাওয়া যাবে না’।
আমার কী হল কে জানে, বললাম, ‘কোন পাবলিশার?’ কিছুই চিনি না কলেজ স্ট্রিটের আমি। তবু কেন জিগ্যেস করলাম, আমি নিজেও জানি না।
ছেলেটা একটা চিরকুট আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘দেখুন’।
আমি চিরকুটটা হাতে নিয়ে বিজ্ঞের মতো বললাম, ‘চলুন’।
ছেলেটা ভাবল আমি বুঝি কলেজ স্ট্রিট বিশেষজ্ঞ। বলল, ‘খুব উপকার হল’।
অনেকগুলো দোকান বন্ধ। যেগুলো খোলা, তাদের কেউই ওই পাবলিশারের ঠিকানা ঠিক করে বলতে পারল না। আমার জেদ চেপে গেল, ভুলেও গেলাম বাড়ি ফিরতে হবে। সব দোকানে গিয়ে জিগ্যেস করা শুরু করলাম। সীতারাম মল্লিক স্ট্রিট, কোন এক অভিষেক দত্তের বই। লেখকের নামও প্রথম শুনলাম।
এদিক-সেদিক ঘুরে, অনেক হেঁটে অবশেষে উপরওয়ালা সদয় হলেন। একবারে উলটো দিকে চলে এসেছিলাম। আবার মাইল খানেক হেঁটে একটা সরু গলিতে ঢুকে অবশেষে একটা ছোট বাড়ির মধ্যে সেই পাবলিশারের হদিশ পাওয়া গেল। ছেলেটা বইগুলো কিনে খুব খুশি হয়ে বলল, ‘আপনি না থাকলে আমি কিছুতেই বইগুলো পেতাম না। এই বইগুলো না নিয়ে বাড়ি গেলে আমার কপালে দুঃখ ছিল’।
আমি বললাম, ‘এ কেমন লেখক? নামই শুনিনি!’
ছেলেটা বলল, ‘জানি না। বোন বলল কলেজ স্ট্রিট যাচ্ছিস যখন, নিয়ে আসবি। আমি কী করব? বাড়ি গিয়ে পড়ে দেখতে পারি। আপনাকে বরং একটা বই কিনে দিই। অনেক হেল্প করলেন। বই কিনে দেওয়াই যায়’।
আমি জোরে জোরে মাথা নাড়লাম, ‘না না, ওরকম হয় নাকি? বই কিনে দিতে হবে না। এসব অচেনা অজানা লোকের বই আমি পড়ি না’।
ছেলেটা বলল, ‘তাহলে নামি কারো বই কিনে দিই?’
আমি বললাম, ‘না। আমায় শেয়ালদা যেতে হবে। এরপর গেলে আর দেখতে হবে না’।
ছেলেটা বলল, ‘তাহলে চলুন ছেড়ে দিয়ে আসি। চলুন রিকশা ধরি’।
আমি আঁতকে উঠলাম, ‘না না, টানা-রিকশায় আমার খুব ভয় লাগে’।
ছেলেটা বলল, ‘আরে কিছু হবে না। চলুন না’।
আমি যতই না বলি, ছেলেটা শোনে না। জোর করে রিকশায় তুলল। উঠে বলল, ‘আপনি দেখি আমার মতোই পাগল। চিনি না জানি না ঠিকানা খুঁজতে লেগে গেলেন’।
আমি বললাম, ‘ওই যে পাওয়া যাবে না বলছিল দোকানদারেরা! তাতেই আমার জেদ চেপে গেল। পাওয়া যাবে না মানে কী? পৃথিবীতে কোন জিনিস পাওয়া যায় না?’
ছেলেটা বলল, ‘ঠিক বলেছেন। সব পাওয়া যায়। আপনি কোথায় থাকেন?’
আমি বললাম, ‘মফস্সলে। এখানে কম্পিউটার শিখতে আসি’।
ছেলেটা বলল, ‘কম্পিউটার কি শেখার জিনিস? আমি তো ছোটবেলা থেকেই জানি’।
আমি বললাম, ‘পরিবেশের উপর নির্ভর করে। আমি ওই পরিবেশে ছিলাম না বলেই হয়তো শিখিনি’।
ছেলেটা বলল, ‘তা ঠিক। ভালো বললেন। পরিবেশটা ইম্পরট্যান্ট। আপনি বই পড়েন না? নতুনদের লেখা পড়েনই না?’
আমি বললাম, ‘না। পড়ি না। কারো বইই পড়ি না আসলে’।
ছেলেটা বলল, ‘বাজে ব্যাপার। আপনি এই বইটা নিয়ে যান। তিনটের একটা। পরের দিন আপনার থেকে নিয়ে ফিডব্যাক নেব। তাহলে আমাদের আবার দেখা হবে’।
আমি বললাম, ‘দেখা হয়ে কী লাভ?’
ছেলেটা একটা অদ্ভুত কথা বলল, ‘আপনার মনে হয় না পৃথিবীতে প্রতিটা মানুষের সঙ্গে প্রতিটা মানুষের আবার দেখা হওয়া উচিত? কেন দেখা হবে না বলুন তো? মানুষ পৃথিবীতে এসেছে তো দেখা করার জন্যই’।
আমার যে কী হল, বললাম, ‘ঠিক আছে, দিন একটা বই। পড়ে ফেরত দেব। কীভাবে দেব?’
ছেলেটা বলল, ‘কবে আবার আসবেন বলুন। আজ যেখানে ধাক্কা খেলাম, পরের দিন না হয় সেখানেই আসবেন? একই সময়ে?’
আমার যে কী হল, আমি রাজি হয়ে গেলাম।
৭৯
এতদিন ঘরে থাকতাম। বাইরে বেরিয়ে দেখলাম মানুষের আরেকটা সংসার থাকে। কারো অফিসে থাকে, কারো ট্রেনে থাকে। ওই ভীষণ ভিড়ের মধ্যেও কথা বলার লোক পাওয়া যায়। একেকজনের একেকরকম কাজ। ট্রেনের ওই সময়টাও তারা তাদের মতো করে কাটায়। কেউ গল্প করে, কেউ করে ঝগড়া। লোকাল ট্রেনের ভিড়ে ঠেলা খেতে খেতেও একটা আলাদা পৃথিবী দেখা যায়।
কুয়োর ব্যাং ছিলাম। এই জীবনটাকে আমার দেখার দরকার ছিল। এই জন্যই হয়তো মা আমাকে কলকাতায় পাঠাল। ঘরে বসে থেকে অলস জীবন কাটালে বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করবে না, এটা স্বাভাবিক ঘটনা।
কোচিং থেকে বেরিয়ে ছেলেটার বই ফেরত দেওয়ার কথা। এদিকে পিউ এসেছে। পিউকে আমি বলিনি। কেন বলিনি আমি নিজেও জানি না। পিউ রোজ আমাকে শেয়ালদা পৌঁছে দেয়। এখন আমি যদি ওকে বলি তুই চলে যা, তাহলে আরেক ঝামেলা হবে।
আমার মাথায় এসব বুদ্ধি বেশি আসে না। কোচিং শেষ হতে আমি কোনও দিকে না তাকিয়ে কলেজ স্কোয়ারের দিকে হাঁটতে শুরু করে দিলাম। পেছন থেকে ছুটতে ছুটতে পিউ এল, ‘কী রে, তুই একা একা বেরিয়ে গেলি যে?’
আমি কিছু না ভেবেই বললাম, ‘আমায় এক রিলেটিভের সঙ্গে দেখা করতে হবে। তুই চলে যা’।
পিউ বলল, ‘কোথায় থাকে?’
আমি বললাম, ‘এখানেই। কাছেই’।
পিউ বলল, ‘কাছে মানে?’
পুলিশের জেরা যেন! বললাম, ‘ওই আর কী, তুই চলে যা’।
পিউ বলল, ‘ঠিক আছে। যা তাহলে’।
আমি উত্তর না দিয়ে হাঁটতে থাকলাম। পেছনে ফিরে দেখলাম না।
আগের দিনের জায়গায় গিয়ে দেখলাম ছেলেটা ঠিকই এসেছে। আমি বইটা ফেরত দিলাম। ছেলেটা বলল, ‘পড়লেন?’
আমি বললাম, ‘নাহ্। পড়া হল না। বাড়ি গিয়েই একগাদা কাজ পড়ে গেল’।
ছেলেটা বলল, ‘তাহলে আপনি বইটা রেখে দিন। পড়া হলে তবেই দেবেন’।
আমি বললাম, ‘না। তা কেন? আপনার বোনের পড়ার জন্য কেনা হয়েছে। বরং ও পড়ে নিক, তারপর আমি নেব।’
ছেলেটা বলল, ‘ও দুটো বই পড়ুক। তারপর নেব। নিন, রাখুন’।
একরকম জোর করে বইটা আমায় দিয়ে দিল ছেলেটা। বলল, ‘চলুন, আগেরদিন খুব দৌড় ঝাঁপ হয়েছিল, আজ একটু বসা যাক’।
আমি বললাম, ‘চলুন’।
একটা বেঞ্চিতে গিয়ে বসলাম। ছেলেটা বলল, ‘আপনার নাম কী?’
আমি নাম বললাম। ছেলেটা হেসে বলল, ‘এটা আবার কেমন নাম?’
আমি বললাম, ‘আমার বাবা দিয়েছিল। আপনার নাম কী?’
ছেলেটা বলল, ‘আমার নাম নিয়েও আমার কমপ্লেক্স আছে। দাদু দিয়েছিল। বাবা ভয়ে সে নাম পাল্টাতে পারেনি। আপনি বরং আমার ডাক নাম ধরেই ডাকবেন। আদি’।
আমি জোরে জোরে মাথা নাড়লাম, ‘না। ডাক নাম ধরে ডাকলেও আসল নাম বলতেই হবে। বলে ফেলুন শিগগিরি’।
ছেলেটা মাথা টাথা চুলকে বলল, ‘আদিনাথ’।
আমি বললাম, ‘কী এমন কঠিন নাম? হ্যাঁ, তবে পুরোনো নাম’।
আদি লাজুক হাসল, ‘কী বলব বলুন। সব জায়গায় এ কেমন নাম আর নামের মানে বলতে বলতে আমার হাল খারাপ হয়ে যায়। কপালটাই এমন। আচ্ছা আপনি খেয়েছেন?’
আমি বললাম, ‘আমি ভাত খেয়ে আসি। মা টিফিন দিয়ে দেয়’।
আদি বলল, ‘সরবত খাবেন? নাকি ফিশ ফ্রাই?’
আমি বললাম, ‘কিছু খাবো না। বাইরে খাই না বেশি’।
আমি বললাম, ‘নাহ্। আমার তেমন খাবারের প্রতি লোভ নেই’।
আদি বলল, ‘কিছু কিছু খাবার আছে, না খেলে পাপ লাগে জানেন তো। উপরওয়ালা যখন জিগ্যেস করবে, মর্ত্যে কী করে এলে, ফিস ফ্রাই খেলে না, মোগলাই খেলে না, পরোটা দিয়ে খাসির মাংস খেলে না, প্যারামাউন্টের কোকো মালাই খেলে না, তখন কী বলবেন?’
আমি হেসে ফেললাম, ‘আচ্ছা, খাব’।
আদি বলল, ‘তাহলে কোকো মালাইটা খাওয়া যাক’।
আমি বললাম, ‘আচ্ছা’।
দুজন মিলে প্যারামাউন্টের দিকে রওনা দিতে দেখি, পিউ দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে দেখে বলল, ‘ইনি তোর রিলেটিভ?’
আমি বললাম, ‘পরিচিত। কথা বলার জন্য এসেছি’।
পিউ রাগী মুখে আমার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে চলে গেল।
আদি বলল, ‘ইনি কে?’
আমি বললাম, ‘একই কোচিঙে আছে। ওকে বলিনি আপনার সঙ্গে দেখা করতে আসব। তাই রাগ করেছে হয়তো’।
আদি বলল, ‘না বলার কী আছে? বলে দিলেই পারতেন’।
আমি বললাম, ‘বললে হাজার প্রশ্ন করবে। এত প্রশ্নের উত্তর দেব কেন? নিজের মাকেই এত প্রশ্নের উত্তর দিইনি কোনওদিন’।
সরবত খেতে খেতে দেখলাম পিউ লম্বা মেসেজ করেছে, ‘তোকে আমি ভালোবাসি। তুই আমার সঙ্গে এটা করলি কেন? আমি তোকে এত ভালোবাসি, তুই আরেকজনের সঙ্গে চলে গেলি? আমার যদি কিছু হয়, তাহলে কী হবে?’
আমি বিষম খেয়ে গেলাম। সরবত খাওয়া মাথায় উঠল আমার।
