৫
আমি জানতাম না বিয়ের পর ‘মেয়েদের কথা’ বলে শ্বশুরবাড়িতে একটা এপিসোড হয়। সেখানে শুধু মেয়েরা থাকে। শাশুড়ি, ননদ ইত্যাদি। তারা যেসব বলে, সে কথা শুনলে অনেক সময় বেঁচে থাকার ইচ্ছে চলে যেতে পারে।
আমাদের বাড়ি থেকে হিমাংশুদের বাড়ি আসার পরে আমাকে একটা ঘরে রাখা হল। হিমুর মা, মামি, কাকিমা, জেঠিমা, বোন, দিদি আরও কারা কারা এল। হিমুর মামি আমার থুতনি নাড়িয়ে বললেন, ‘আমাদের ছেলে এই মেয়ের জন্য কুত্তা হয়ে গেছিল, হ্যাঁ?’
একটু দূর থেকে হাসির শব্দ এল। এক মহিলা কণ্ঠ বলল, ‘সত্যিই কুত্তা বলে কুত্তা। লজ্জা শরম সব খেয়ে বসে আছে হিমু। এত ভালো ছেলে, অথচ অবস্থা দেখো! সে ছেলে নাকি আবার ফার্স্ট হত’।
‘গন্ধ, গন্ধ বোঝ? মেয়েমানুষের গন্ধ…?’
কথাগুলো আমার শাশুড়ির ভালো লাগল না। রেগে গেলেন, ‘বাজে কথা বলিস না। হিমু কী করেছে সেটা তোদের বুঝতে হবে না। মেয়ের গন্ধ সবার লাগে, এই মেয়ের বাপেরও লেগেছে’।
এ কথাটা শোনামাত্র আমার চোখে জল এল। আমার চোখে এরকমই জল আসে। হয়তো কোথাও ঘুরে বেড়াচ্ছি, হঠাৎ দেখলাম আমার বাবার মতো দেখতে একটা লোক সাইকেল করে যাচ্ছে। আমার কান্না চলে আসে। বাবা কী ছিল, ঘরে যতদিন ছিল বুঝিনি। যাওয়ার পরে বুঝেছি। একটা গোটা মানুষ চলে গেছে। সে লোকটা ঘরে থাকত, ঘুরত, ফিরত, কথা বলত, বাজার করত।
সে নেই। তার উপর আমি নেই। মা একা হয়ে গেল। প্রথমে বাবা, পরক্ষণে মার কথা মনে পড়ল। আমি কেঁদে ফেললাম।
হিমু উঁকিঝুঁকি মারা শুরু করেছে। জানি না হিমু স্কুলে কলেজে কেমন ছাত্র ছিল, কিন্তু ওর এই উঁকি ঝুঁকিটা আমার ভারি অদ্ভুত লাগে। বাড়িতে যখন থাকতাম, অত্যন্ত অস্বস্তির সঙ্গে দেখতাম হিমু রাস্তায় ঘুরঘুর করছে।
বিয়ের তিন দিন আগে মা বাইরে গিয়ে ওকে ডেকে নিয়ে এসে বসালো।
হিমু অপ্রস্তুত মুখে বসল। মা বলল, ‘তুমি বাইরে ঘুরছিলে কেন? নীপার সঙ্গে কথা বলবে? ওকে ডেকে দেব?’
হিমু পারলে দৌড়ে পালায়। আমি দরজার আড়াল থেকে দেখছি ও ঘামছে। রুমাল বের করে কপাল মুছে টুছে বলল, ‘আমার কাজ আছে। পরে আসব আন্টি’।
হিমু বেরোতে মা কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল। আমি যেতে বলল, ‘এই ধরনের ছেলের লক্ষণ ভালো না। যতক্ষণ না তুই ওর হবি, ততক্ষণ পাগল হয়ে যাবে। তোর জন্য এমন সব কাজ করবে, তুই নিজেই অবাক হয়ে যাবি। এরপর যখন তুই ওর হয়ে যাবি, তখন আর তোকে পাত্তা দেবে না। তখন অন্য খেলনা নিয়ে মেতে উঠবে। হয় সেটা অন্য মেয়েমানুষ, নয় অন্য কিছু। বুঝতে পারছি না আমি তাড়াহুড়ো করে ফেললাম নাকি’।
আমি মাকে জড়িয়ে ধরে বসে রইলাম। দুজনের কেউ কোনও কথা বললাম না।
আমাদের বাড়িতে আত্মীয়-স্বজন আসা শুরু হয়েছিল। যেন বিয়ে খেতে না, শ্রাদ্ধে আসছে। সবাই জানে বাবা কোথায় আছে, কিন্তু সবাই জানে ও প্রসঙ্গ তোলা যাবে না। বাবা অবশ্য এসেছিল। বিয়ের সময় ভিড়ের মধ্যে বাবাকে আমি দেখেছিলাম। কখন এসে লুকিয়ে দেখে পালিয়েছে।
হিমুর কাকিমা হিমুকে তাড়িয়ে দিল। আমাকে বলল, ‘কী জাদু করলে? খুলে টুলে দেখিয়েছিলে নাকি?’
আমার কান লাল হয়ে গেল। মেয়েরা খিলখিল করে হাসছে। আমি মাথা নিচু করে বসে আছি। আমার দু’চোখ দিয়ে জল পড়েই চলেছে। কতক্ষণ ওভাবে বসে থাকলাম আমি ভুলে গেছি। আবার যেন ঘুমের মধ্যে চলে গেছিলাম। ফুলশয্যার রাতে হিমু ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করল।
লাজুক মুখে আমার সামনে এসে বসে বলল, ‘ভালো লাগছে আমাদের বাড়ি?’
আমি মাথা নাড়লাম।
হিমু বলল, ‘খোল না। গরম লাগছে না?’
আমি বললাম, ‘শীত লাগছে’।
হিমু আমাকে জড়িয়ে ধরল। কেমন অস্বস্তিকর একটা জড়ানো। আমি ওকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে বললাম, ‘দূরে থাকুন’।
হিমু বলল, ‘তোমার বাড়ির লোক শেখায়নি কিছু? আজ কী করে?’
আমি বললাম, ‘না। দূরে থাকুন’।
হিমু মেঝেতে পা দাপাল। ভীষণ রেগে গিয়ে বলল, ‘এসব কী? আমি তোমার বর। জানো না?’
আমি এবার অবাক হলাম। এ কী করে সেই লাজুক ছেলেটা হতে পারে?
কিন্তু আমিও কম না। বললাম, ‘জানার দরকার নেই। আপনি আমাকে ছোঁবেন না। ব্যস’।
হিমু রেগেমেগে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। মিনিট দুয়েকের মধ্যে ওর মা এসে এ ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে বলল, ‘কী হয়েছে?’
আমি চুপ করে রইলাম।
হিমুর মা বলল, ‘এরকম হলে কিন্তু এ বাড়িতে থাকা যাবে না। একদম বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেব তোমায়’।
আমি শান্ত স্বরে বললাম, ‘পাঠিয়ে দিন। এ বাড়িতে থাকার ইচ্ছে আমারও নেই’।
হিমুর মা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন। ভেবেছিলেন ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ করেছেন। এবার অন্যভাবে চেষ্টা করলেন, নরম গলায় বললেন, ‘হিমু তোমাকে কত ভালোবাসে তুমি বোঝোনি?’
মাঝরাতে আমাকে সত্যি সত্যি আমার বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হল।
৬
আমার দিদাকে আমার দুই মামির কেউই দেখতে পারত না।
এটাই তাদের মধ্যে একমাত্র মিল।
এমনিতে দুজন একে অপরের মুখ দেখে না। আমার বিয়ে উপলক্ষ্যে দুজনেই এসেছিল। একজন উত্তরের ঘরে আছে। আরেকজন দক্ষিণের। সেভাবেই দেওয়া হয়েছে।
আমি যখন কলিং বেল বাজালাম, আমার ছোটমামি দরজা খুলল। ছোটমামির দশাসই চেহারা। বছরে তিনবার কোনও না কোনও নিউট্রিশন কোর্স করে। আশি থেকে আটাত্তর পয়েন্ট নয় ওজন হয়, সে আনন্দে এত খাওয়াদাওয়া করে যে ওজন একবারে বিরাশিতে পৌঁছে যায়।
মামির গা থেকে পারফিউমের সঙ্গে বিয়ের রান্নার গন্ধ আসছে। কন্যাযাত্রী সবে ফিরেছে। শাড়ি অবধি খোলেনি।
আমাকে দেখে চোখ কপালে তুলে বলল, ‘কীরে? তুই?’
আমি হাসিমুখে বললাম, ‘দরজা ছাড়তে টাকা দিতে হবে মামি? আমার কাছে তো টাকা নেই। ও সব তো বরের দেওয়ার কথা। আমাকে ও বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। দরজা ছাড়ো’।
মামি হতভম্ব মুখে দরজা ছাড়ল। মা বসার ঘরে ছিল। আমাকে ঢুকতে দেখে বলল, ‘কী হল?’
আমার চোখে এক ফোঁটাও জল নেই। যে মুহূর্তে হিমুর মা কাকিমারা আমাকে ঘিরে আজেবাজে কথা বলা শুরু করেছিল, তখনই ঠিক করে নিয়েছিলাম ও বাড়িতে আমি কিছুতেই থাকব না। সেটা যে এত তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে, আমি ভাবতে পারিনি। আমার আনন্দ হচ্ছিল। চূড়ান্ত আনন্দ হচ্ছিল। কিন্তু সেটা বুঝতে দিলাম না কাউকে। মা একা থাকলে বলতাম। ঘরে মামারা ছিল, মামাবাড়ির অনেকেই ছিল। ওদের সামনে কোনও কিছু বলার প্রশ্নই ওঠে না। আমি মার পাশে বসলাম, ‘ওরা তাড়িয়ে দিয়েছে’।
বড়মামা আর্তনাদ করে উঠল, ‘মানে? এত বড় সর্বনাশ? চল চল। ওদের বাড়ি গিয়ে কথা বলে আসি’।
মা বড়মামাকে নিচুগলায় ধমক লাগাল, ‘তুই চুপ কর। কোনও কথা বলবি না’।
আমার দিকে ফিরে বলল, ‘কী হয়েছে?’
আমি বললাম, ‘আমি ও বাড়ি আর যাব না। ভালো লাগছে না’।
ছোটমামা বলল, ‘মানে? ইয়ার্কি হচ্ছে নাকি?’
মা কড়া গলায় বলল, ‘তোরা অন্য ঘরে যা’।
দুই মামাই গাইগুই করতে করতে অন্য ঘরে চলে গেল। মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, ‘আমার মনে হয়েছিল, অস্বস্তি হচ্ছিল রে। সবাই বলল, তোর বাবা বলল, আমি ভাবলাম আমিই ভুল হয়তো। কী হয়েছে?’
আমি বললাম ওদের বাড়ির মেয়েরা কী করছিল। হিমুর কথাটাও বললাম।
মা আমার গালে হাত দিয়ে বলল, ‘আমারই ভুল। তোকে এত তাড়াতাড়ি বিয়ে দেওয়া ঠিক হয়নি। তুই চিলেকোঠার ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়, আমি দেখছি বাকিটা’।
বাবা পালানোর দিন মা ওই চিৎকারটুকু ছাড়া বিন্দুমাত্র ভাঙেনি।
আমি ভেবেছিলাম এবার অন্তত মা ভাঙবে। দেখলাম নাহ্, মা আগের থেকেও অনেক বেশি শক্ত হয়ে গেছে এতদিনে।
চিলেকোঠার ঘর ফাঁকাই থাকে। আমি আমার ব্যাগ নিয়ে সে ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলাম।
ভীষণ আনন্দ হচ্ছিল। সে আনন্দটা কেন হচ্ছিল আমি বুঝতে পারছিলাম না। আমার তো হাত পা ছুড়ে কাঁদতে বসা উচিত ছিল। আমায় শ্বশুরবাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে, আমি একজন অবাধ্য বউ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছি, কোথায় আমার এখন আত্মহত্যা করা উচিত, তা না। আমার চিৎকার করে সবাইকে জানাতে ইচ্ছে করছিল, ‘আমি মুক্ত! আমি মুক্ত’।
এরপর ঘটল পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য।
আরেকটু রাত বাড়লে আমার দুই মামি একসঙ্গে হাত ধরাধরি করে আমাকে বোঝাতে এল।
ইনিয়েবিনিয়ে সে কথার সারসংক্ষেপ করলে দাঁড়াবে,
‘শোন, মা তো বলবেই তুই এ বাড়িতে চলে আয়। কিন্তু ভেবে দেখ নীপা, কত বাজে ব্যাপার হবে সেটা। কষ্ট তো সবাই করে। হিমু তো তাও ভালোবাসতে চেয়েছে, কত ছেলে আছে এসেই জোর করে মুখে দিয়ে দেয়। কেউ তোকে সামনে ঘুরতেই দেবে না। হিমু কি তাই? সোনার টুকরো ছেলে। এ ছেলেকে কিছুতেই হাতছাড়া করিস না’।
আমি হাই তুলে বললাম, ‘মনে থাকবে। সকালে দেখছি। ছোটমামি, তুমি সাবধানে ফেরো। সিঁড়িটা কেমন যেন, পড়ে যেও না’।
দুজনেই রেগেমেগে ফিরে গেল।
মাঝখান দিয়ে আমি বাকসিদ্ধ হয়ে গেলাম। নামার সময় ছোটমামি সত্যি সত্যিই সিঁড়িতে পড়ে একবারে কুমড়ো গড়াগড়ি খেল…!
৭
যে-কোনও জিনিসের আগে যে শূন্য আসে, মাঝে-মাঝেই ভুলে যাই।
যেমন আমি আমার বউভাতের পরের দিনের বর্ণনা যদি করি, শুরুতেই বলতে হবে, সকাল সকাল আমাদের বাড়িতে হিমু এসে হাজির হল।
চোখ মুখ বিধ্বস্ত, চুল উলোঝুলো, কাঁদো কাঁদো হয়ে বাড়ির সামনে আগের মতো ঘুরতে শুরু করেছে। তখনও বাড়ির অতিথিরা ঘুমাচ্ছে।
ছোটমামা ছোটমামিকে অনেক রাত অবধি গরম সেঁক দিয়েছে। আমার ছোটমামা ছোটমামির উল্টো। ছোটমামির রোগা হবার সমস্ত উপকরণ আসলে ছোটমামা কনজিউম করেছে। মামা আগে এত রোগা ছিল না। যেদিন থেকে ছোটমামি রোগা হবার পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল, সেদিন থেকে আমার ছোটমামা রোগা হতে শুরু করেছে। এখন বেশ রোগা। সেই ছোটমামা ছোটোমামির পায়ে গরম সেঁক দিয়েছে। পড়ে গিয়ে যতটা ব্যথা ছোটমামির লেগেছে, তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি ব্যথা লেগেছে ছোটমামার। আমরা আয়তক্ষেত্রের ক্ষেত্রফল বের করতে গিয়ে বুঝেছিলাম ব্যাপারটা কষ্টকর। দৈর্ঘ্য এবং প্রস্থ দু’জায়গারই খেয়াল রাখা উচিত। ছোটমামা সে খেয়াল রাখতে গিয়ে বেশ ক্লান্ত হয়েছে। অস্বাভাবিক কিছু না।
আমি সবে নীচে নেমেছি, মা ক্লান্ত মুখে বলল, ‘ছেলেটা আবার হাঁটাহাঁটি শুরু করেছে। ওকে বল, এখন ও বাইরের লোক না। কিছু বলার থাকলে ভেতরে এসে বলতে পারে’।
আমি বললাম, ‘দেখছি’।
বাইরে গিয়ে ডাকলাম, ‘মা ডাকছে’।
হিমু ঘরে ঢুকল। মা বলল, ‘বসো’।
হিমু বসল। বিহ্বলভাবে বলল, ‘কাল রাতে আমি ঠিক ছিলাম না। আসলে বন্ধুরা আমাকে মদ খাইয়ে দিয়েছিল। তাই আমি খারাপ ব্যবহার করে ফেলেছি’।
মা যেন শুনতেই পায়নি কথাগুলো, এমনভাবে বলল, ‘চা খাবে?’
হিমু বলল, ‘আমি কি গাড়ি ডাকব?’
মা আমার দিকে তাকাল, ‘কী করবি?’
আমি বললাম, ‘আমি ওদের বাড়ি যাব না। ও চাইলে আমাদের বাড়িতে থাকতে পারে’।
হিমু বলল, ‘সেটা কেমন করে হয়?’
আমি বললাম, ‘একটা উপায় বললাম। আর কোনও উপায় মাথায় আসছে না। তুমি অত না ভেবে চা খেয়ে চলে যাও’।
হিমু মাথা চুলকাতে চুলকাতে চলে গেল।
কিছুক্ষণ পর আমার বাবা এল। বাবা যে আসবে আমি বা মা কেউই বুঝতে পারিনি। বাবা এসে দরজার বাইরে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
তখন আমার ছোটমামার ঘুম ভেঙেছে সবে। দরজার কাছে গিয়ে বাবাকে দেখে আঁতকে উঠেছে। চোয়াল লক হয়ে যায় অনেকের অর্ধাহার এবং অনাহার জনিত কারণে। অনাহার বললাম, কারণ ছোটমামিকে ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। ছোটমামি ঠিক করেছিল নিজে না করে সেটা মামাকে দিয়ে করাবে। ফলত চাইলেও মামা খেতে পারত না। আবার খাবার সময় উপস্থিত হলে ছোটমামি ডায়েটিশিয়ানের পরামর্শে মামাকে ওটস খাওয়াত।
দুর্ভিক্ষের ফলাফল ছোটমামা ঘুম থেকে উঠে দরজায় গিয়ে বাবাকে দেখে হাঁ হয়ে গিয়ে চোয়াল লক করে ফেলল। মুখ হাঁ হয়ে আছে। ভাগ্যিস, বাড়িতে দুষ্টু বাচ্চা ছিল না। থাকলে কী না কী ঢুকিয়ে দিত, ভয়াবহ ব্যাপার হয়ে যেত। ছোটমামা লকড চোয়াল নিয়ে মার কাছে এল ‘আ আ’ করতে করতে।
মা বুঝল কিছু একটা হয়েছে। বাইরে গিয়ে বাবাকে দেখে বলল, ‘এসো’।
তখন সবাই উঠে পড়েছে। জানলা দরজায় কৌতূহলী মুখ। বাবা কিছু বলবে ঠিক করে এসেছিল হয়তো। লোকজন দেখে আবার মাথা খারাপ হয়ে গেল, ‘সীমা কনসিভ করেছে শুনেছ তো? বাচ্চা হবে আর কী। বেশি বয়স, বোঝোই তো কত টেনশন!’
ঘরের ভেতর থেকে একটা আওয়াজ উঠল। মা বলল, ‘শুনেছি। তুমি বরং এখন যাও’।
বাবা ব্যস্ত হয়ে বলল, ‘ঠিক বলেছ। আসি’।
আমি তখনই ঢুকেছি। বাবা আমাকে একবার দেখে বেরিয়ে গেল।
এটা দু-নম্বর ঘটনা ছিল।
এবার শূন্য নম্বর ঘটনাটা বলি। ভোর চারটে। আমি ঘুম ভেঙে দেখলাম দিদা আমার সামনে বসে আছে। আমার ভয় ডর কম। মন খুব বেশি ঘাবড়ে গেলে লোকে হ্যালুসিনেট করে, তা জানি। আমি চোখ বুজে ফেললাম।
জ্যান্ত মানুষ নিয়ে মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে, এখন মৃত মানুষ নিয়ে ভাবার সময় নেই…।
৮
পৃথিবীর সব থেকে আনন্দের ব্যাপার হল, সব মানুষকেই একদিন ঘরে ফিরতে হয়।
মামারা কতদিন থাকবে? তাদের তো যেতেই হবে। চলেও গেল। আমাদের বাড়ি আবার ফাঁকা হয়ে গেল। মা আবার স্কুলে গেল।
হাতের মধ্যে শাঁখা পলা পরানো হয়েছিল। সিঁদুর দিয়েছিল। ওসব নিয়ে ঘুরতে যে এত অস্বস্তি হয়, তা আগে বুঝিনি। বাবা পালানোর পর দেখেছি মা কখন যেন সব সযত্নে খুলে ফেলে দিয়েছিল। সিঁদুর পরাও ছেড়ে দিয়েছিল। তবে সাদা শাড়ি পরত না। আমি জিগ্যেস করায় বলেছিল বাবা মরলেও সাদা শাড়ি পরবে না। কেন পরবে? তার থেকেও বড় কথা, এদ্দিন ধরে এসব শাঁখা টাখা পরেছে কেন, তাও যে মস্ত বড় ভুল ছিল, ঘুরিয়ে সেটাও বুঝিয়ে দিয়েছিল মা।
মামাদের গাড়ি বাড়ির সামনে থেকে বেরোতেই আমি প্রথমে যেটা করলাম, সেটা হল শাঁখা পলা খুলে মাকে বললাম, ‘রেখে দাও’।
মা বলল, ‘সেটা রাখছি। তবে ওদের বাড়িতে তোর সব গয়নাগুলো আছে’।
আমি বললাম, ‘দেবে না?’
মা বলল, ‘তুই যদি না যাস, তাহলে চেয়ে নেওয়াই ভালো। আমার মনে হয় হিমু আবার আসবে, তখন বলে দেখ। গয়নাগুলোর অনেক দাম। ওগুলো ওবাড়িতে ফেলে রাখার যুক্তি নেই’।
আমি বললাম, ‘সিঁদুরটা ধুয়ে দি?’
মা কয়েক সেকেন্ড আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ধুয়ে ফেল। নিজের ইচ্ছে হলে পরবি। নয়তো পরার দরকার নেই’।
আমি বাথরুমে গিয়ে মাথা ধুয়ে ফেললাম। কী জিনিস দিয়ে এসব বানায় কে জানে, আমার মাথা রীতিমতো চিড়বিড় করছিল। রংটা যত ধুয়ে বেরোচ্ছে, আমার শুধু ওদের বাড়ির মেয়েদের কথা মনে পড়ছে, আর আমি তত হেসে গড়িয়ে পড়ছি কলের তলায় বসেই।
চুল শোকাতে সময় লাগে। মা স্কুলে গেছে।
আমি খোলা চুলে বসে আছি। দেখলাম, দিদা কখন যেন সামনে এসে বসেছে। বিরক্ত গলায় বললাম, ‘কাজ নেই বুড়ি? মরেও শান্তি দেবে না?’
আমার কথা শুনে দিদা ফিক ফিক করে হাসতে হাসতে বলল, ‘আমাকে খাইলি, নিজের বিয়েটাও খাইলি’।
আমি বললাম, ‘বেশ করেছি। তোর তাতে কী?’
দিদা বলল, ‘মাইয়া মানুষরে কত সহ্য করতে হয় জানোস?’
আমি বললাম, ‘জানি। তোমার মেয়েকে দেখছি তো’।
দিদা বলল, ‘তোর মা আর তুই, তোদের দুজনেরই বর থাইকাও নাই। ছ্যা ছ্যা’।
আমি চোখ বুজে ফেললাম আবার। বুড়িকে বেশি লাইসেন্স দেওয়া যাবে না। বেশি লাইসেন্স দিলেই বুড়িটা ছুরি দিয়ে আমাকে ছারখার করে দিতে থাকবে।
চুল শুকোতে শুকোতেই কলিং বেল বাজল।
দরজা খুলে দেখলাম, একটা বড় ব্যাগ নিয়ে হিমু এসেছে। আমাকে দেখে এক গাল হেসে বলল, ‘চলে এলাম’।
আমি বললাম, ‘চলে এলে মানে?’
হিমু বলল, ‘তুমি বলেছিলে না এ বাড়িতে চলে আসতে? চলে এসেছি’।
পাড়ার কাকিমাগুলো রাস্তায় নেমে এসেছে। এমনিতেই এরা এখন দারুণ আনন্দে আছে। সারাক্ষণ আমাকে নিয়েই এদের সানাই বেজে যাচ্ছে। এর মধ্যে মঞ্চে হিমুর প্রবেশ। এর থেকে ভালো আর কী হতে পারে? আমি দরজা থেকে সরে দাঁড়ালাম, ‘এসো’।
হিমু ঘরে ঢুকল। ব্যাগ রেখে বলল, ‘মা খুব ঝামেলা করছে। আমাকে বলেছে আমি রাতে না ফিরলে সুইসাইড করবে। কী করা যায় বলো তো?’
আমি সিরিয়াস মুখে বললাম, ‘ঠিক কোন পদ্ধতিতে করবে জেনে নাও। যেটা লাগবে, সেটা তাহলে কিনে দিতে পারবে’।
হিমু সোফায় বসে রুমাল বের করে কপালের ঘাম মুছল, ‘রাতের ব্যাপার তো। রাতেই দেখা যাবে। আমি তোমাকে ভালোবাসি। আমি এখানেই থাকব’।
আমি বললাম, ‘তবে আলাদা ঘরে। তোমার জন্য দক্ষিণের ঘরটা ব্যবস্থা করে দিতে পারি’।
হিমু সাগ্রহে মাথা নাড়ল, ‘কোনও সমস্যা নেই। কিন্তু তুমি সিঁদুর মুছে ফেলেছ কেন?’
আমি বললাম, ‘পরব না ঠিক করেছি’।
হিমু মুষড়ে পড়ল, ‘তুমি খুব রেগে আছ নীপা? ঘাবড়েও গেছ মনে হয়। আমি কি খুব খারাপ ব্যবহার করেছিলাম?’
আমি হাই তুলে বললাম, ‘ভুলে গেছি। তুমি ব্যাগটা রেখে এসো। ওই তো, ওই ঘরটা’।
আঙুল তুলে দেখালাম।
হিমু উঠে ব্যাগটা নিয়ে ওই ঘরে গেল।
৯
মামিরা আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছে, আমার আসলে ভীষণ ভয় পাওয়া উচিত। স্বামী পরিত্যক্তা স্ত্রী মানে কঠিন ব্যাপার। সবাই রাস্তার মেয়ে ভাববে, সবাই বলবে আমি নাকি শরীর বেচে জীবন চালাই।
একথা শুনে আমার ভয় পাওয়া উচিত ছিল হয়তো, আমি হাই তুলেছি। হাই তোলা ছাড়া কীই বা করার আছে?
কোথায় যেন পড়েছিলাম, হাই ওঠে শরীরে অক্সিজেনের অভাব হলে। আমার অক্সিজেনের অভাব হয়েছে নাকি আমি জানি না।
হিমু এ ঘরে এল আবার। আমি বললাম, ‘বসো’।
হিমু বসল। পকেট থেকে রুমাল বের করে জোরে জোরে ঘাম মুছতে লাগল।
আমি চেয়ার নিয়ে বসলাম। হিমুকে একটা কেস স্টাডি হিসবে দেখা উচিত। একটা ছেলে, বিয়ের রাতে আমার সঙ্গে জোর করতে গেছিল, যেটা ওর কথা অনুযায়ী ও নাকি ‘মদ খেয়ে’ করেছিল, সে ছেলে এখন আমাদের বাড়িতে ঘর জামাই হয়ে থাকতে এসেছে।
যে-কোনও পাড়াতেই পরের জামাই ভাগানোর চেষ্টা করা একজন কাকিমা থাকে। আমাদের পাড়ায় আছে মঞ্জুকাকিমা। হিমুকে একদিন ডেকে ঘরে নিয়ে গিয়ে মঞ্জুকাকিমা তার মেয়ে পম্পার গুণকীর্তন করেছিল। ‘তুমি যে ও মেয়ের জন্য পাগল…’ পরক্ষণেই গলা নামিয়ে, ‘সে মেয়ের বাবা তো পালিয়েছে অন্য মেয়ের সঙ্গে’, গলা তুলে, ‘অথচ আমাদের পরিবার দেখো। আমার মেয়েকে দেখো। আমার বরকে দেখো। আমরা কত সুখী পরিবার। আমার মেয়ে তো কোনদিন কোনও ছেলের দিকে তাকালো না পর্যন্ত’।
পম্পার মোবাইল একদিন আমার হাতে পড়েছিল। ফোনে এতরকমের নীল জগতের জিনিসপত্র দেখেছিলাম, তাতে মনে হয়েছিল জাদুঘর যদি ভবিষ্যতে কোনদিন পানুর ডিপার্টমেন্ট খোলে, সেখানে পম্পার হেড অফ দ্য ডিপার্টমেন্ট হবার চান্স খুব বেশি থাকবে। সে মেয়েকে মঞ্জুকাকিমা পাম্প দিয়ে মা সারদা বানিয়ে দিল। পম্পা হারমোনিয়াম বাজিয়ে ‘উড়ি উড়ি বাবা’ও করেছিল।
হিমু কিছুক্ষণ সেসব শুনে আবার আমার জানলার সামনে ফিল্ডিং দিতে চলে এসেছিল।
পম্পাকে নিয়ে মঞ্জুকাকিমা দু’বাড়িতেই খেয়েছে। আমাদের বাড়িতে মাংসে নুন কম ছিল। ওদের বাড়িঘর দেখে মুখ বাঁকিয়ে কাকিমা বলেছিল, ‘সে বাপু দাসদের বাড়ি তো দেখোনি। এসব বাড়ি তার কাছে কী লাগে’।
মঞ্জুকাকিমার ফসকে যাওয়া মিসাইলের টার্গেট হিমু আমার সামনে বসে ঘামছে। ‘ঘামতে দেখেছি, থামতে দেখিনি’ টাইপের কোনও একটা লাইন এই বসে যাওয়ার সঙ্গে মিশ খাবে নাকি বুঝতে পারছি না। খিলখিল হাসির শব্দ পেয়ে বুঝলাম, বুড়ি আবার এসেছে। আমি পাত্তা দিতে চাইলাম না। বুড়ি বলল, ‘মেয়েদের একটা খরচ করতে পারার পোলা দরকার। বুঝছোস মাইয়া? তুই তো পাইছোস, ন্যাকামি করস ক্যান? যা, সংসার কর গিয়া’।
আমি হিমুকে বললাম, ‘এ ঘরে কাউকে দেখতে পাচ্ছ?’
হিমু ঘাড় নাড়ল, ‘না, কোথায়! কেউ তো নেই’।
আমি বললাম, ‘ভালো। তোমার মার খবর বলো। সময় ঠিক করতে পেরেছেন? জানো তো ফাঁসির আসামিরা কখন উপরে যাবে, সে সময়টা জানে। তোমার মা কি সেরকম কোনও সময় ঠিক করতে পেরেছেন?’
হিমু দুঃখিত গলায় বলল, ‘এরকম বোলো না। আমার মা, তোমার শাশুড়ি’।
আমি বললাম, ‘তোমার বাড়ি যাওয়া উচিত। না গেলে তোমার মা, আমার শাশুড়ি অফ হয়ে যেতে পারেন। সেটা ভালো হবে না’।
হিমু বলল, ‘তুমি কোনওভাবেই ও বাড়ি যাবে না?’
আমি বললাম, ‘জানি না। কী করব আমি নিজেই জানি না। জানলে তো হয়েই যেত’।
হিমু চুপ করে বসে রইল আবার। কিছুক্ষণ পর ঘুমিয়ে পড়ে নাক ডাকতে শুরু করল।
আমি বাইরে বেরোলাম। মঞ্জুকাকিমা দাঁড়িয়ে আছে। আমি ডাকলাম, ‘কাকিমা’।
মঞ্জুকাকিমা ভূত দেখার মতো চমকে উঠে সঙ্গে সঙ্গে সামলে নিল নিজেকে, ‘হ্যাঁ, কেমন আছিস মা?’
বুঝতে পারি না, সিরিয়ালে কেন এদের নেওয়া হয় না। এরা যে কোনরকম অভিনেত্রীদের থেকে একশোগুণ ভালো অভিনয় করতে পারে।
আমি বললাম, ‘তুমি যাকে জামাই করার চেষ্টা করেছিলে, সে আমাদের ঘরে আছে। একবার দেখবে নাকি? আমি তো মাঠ ছেড়ে দিয়েছি, দেখো পম্পা যদি এই সুযোগে ফটো ফিনিশে এগিয়ে যেতে পারে’।
মঞ্জুকাকিমা মুখ বাঁকিয়ে বলল, ‘ছ্যাঃ! ছেলেটা তো মাতাল। ও ছেলেকে তুই ছেড়ে চলে এসেছিস বেশ করেছিস’।
আমি গালে হাত দিয়ে বললাম, ‘সে কী গো! মার্কেটে এতক্ষণে শুধু এই খবরটুকু বেরিয়েছে, ছেলে মাতাল? কিন্তু ও তো মদ খায় না!’
মঞ্জুকাকিমা হকচকিয়ে গিয়ে বলল, ‘খায় না’?
আমি জোরে জোরে মাথা নাড়লাম, ‘একদম না’।
মঞ্জুকাকিমা বলল, ‘তবে? তবে তুই চলে এলি কেন?’
আমি ভালোমানুষের মতো মুখ করে বললাম, ‘ফুলশয্যার রাতে মনে হল ওই খাটে আমার থেকে পম্পাকে বেশি মানাবে গো, তাই চলে এলাম’।
মঞ্জুকাকিমা আমাকে একটা হাই ক্লাস লেভেলের মুখ ভেংচিয়ে ঘরের ভেতর চলে গেল।
