নীপাদের বাড়ি – ৬০

৬০

বাড়িতে থাকলে সত্যিই বুঝতে পারি না, জীবনটা আসলে কতটা বদ্ধ। বাইরে না গেলে সেটা বোঝা সম্ভবও না।

সমুদ্রটা যখনই চোখের সামনে এল, আমি যে এতটা অভিভূত হয়ে যাব, বুঝতে পারিনি। হোটেলে যাবার আগে সমুদ্রের কাছে গিয়ে বসে পড়লাম।

ঢেউ আসছে, ঢেউ চলে যাচ্ছে, আমার দু’চোখে জল ঘর বাঁধছে। আমি বসেই রইলাম কতক্ষণ।

মা দূর থেকে অনেকক্ষণ ধরে ডাকার পর হোটেলে গেলাম।

মা ঘরে ঢুকে বলল, ‘খেয়ে নিয়ে স্নান কর। আমি তোয়ালে নিয়ে যাচ্ছি’।

আমি বললাম, ‘তুমি স্নান করবে না?’

মা বলল, ‘ধুর, আমি কেন স্নান করতে যাব?’

আমি বললাম, ‘কেন, তোমার কি মানা আছে?’

মা বলল, ‘কেন মানা থাকবে? কে মানা করবে? আজকে ইচ্ছে করছে না। কাল করব’।

আমি বললাম, ‘থাক, তাহলে আমিও কাল স্নান করব’।

মা বলল, ‘ঠিক আছে। দেখা যাবে’।

মা ঠিকই বুঝেছিল। খেয়ে দেয়ে বিচে গিয়ে আবার জলে ঝাঁপ দিলাম। ভাগ্যিস মা গামছা নিয়ে গেছিল। স্নান করতে করতেই দেখলাম হিমু বিচে এসে দাঁড়িয়েছে।

আমি আন্দাজ করেছিলাম। শ্বাস ছেড়ে জল থেকে উঠে এসে হিমুকে জিগ্যেস করলাম, ‘তুমি এখানেও চলে এলে?’

হিমু বলল, ‘তোমার জন্য এসেছি, ভেবো না। আমার খুব ইচ্ছে করছিল সমুদ্র দেখতে। তাই অফিসে বলে দুদিন ছুটি এক্সটেন্ড করে নিলাম’।

আমি বললাম, ‘তুমি বুঝতে পারছ, আবার এক জিনিস শুরু করেছ?’

হিমু বলল, ‘করতে দাও না। বাইরের লোকের জন্য তো করছি না। নিজের বিয়ে করা বউয়ের জন্য করছি’।

আমি আর কথা না বাড়িয়ে মার কাছে গেলাম। মা চা খাচ্ছিল। হিমুকে আমার পেছন পেছন আসতে দেখে বলল, ‘তুমি আমাদের সঙ্গেই আসতে পারতে। আবার আলাদা টিকিট কাটতে গেলে কেন?’

হিমু বলল, ‘হঠাৎ করেই প্ল্যান হল। ঠিক করে কিছু করিনি। কাল আপনারা বললেন। আমিও ভাবলাম এখান থেকে ঘুরে যাই’।

মা বলল, ‘ভালো। তুমি খেয়েছ?’

হিমু বলল, ‘এই তো এলাম’।

মা বলল, ‘ম্যাগি খাবে?’

হিমু ঘাড় নাড়ল। মা হিমুর জন্য ম্যাগি অর্ডার করল। আমি ভেজা গায়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। মা বলল, ‘তুই হোটেলে গিয়ে চেঞ্জ করে আয়’।

হিমু বলল, ‘আমি যাব এগিয়ে দিতে?’

মা বলল, ‘না। তুমি বসো’।

মা আমাকে চোখের ইশারা করল। আমি হোটেলের দিকে রওনা দিলাম। পাড়ার পুকুর থেকে স্নান করে উঠলে পাড়ার সবাই দেখে। এখানে কিছু দুষ্টু কাকু ছাড়া তেমন কেউ দেখল না। হোটেলে ফিরে ভালো করে স্নান করে রুমেই ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘুম ভাঙল কলিং বেলের শব্দে। দরজা খুলে দেখি মা দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে দেখে বলল, ‘আমি ঠিক বুঝেছি তুই ঘুমিয়ে পড়েছিস’।

আমি হাই তুলতে তুলতে বললাম, ‘সে কই?’

মা দরজা বন্ধ করে বলল, ‘তুই কি আশা করেছিলিস ও আসবে?’

আমি বললাম, ‘না। কিন্তু যেরকম উদ্যোগ নিয়ে এল, তাতে এখানে না এলেই আশ্চর্য হব’।

মা পা ধুয়ে এসে খাটে বসে বলল, ‘তুই হিমুর সঙ্গেই যা। আমার মনে হচ্ছে তুই নিজেও তাই চাইছিস’।

আমি রেগে গেলাম, ‘এ কেমন কথা? আমি কখন বললাম?’

মা বলল, ‘তুইই ওকে পুরী আসবি জানিয়েছিলিস না?’

আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, কথায় কথায় বলেছিলাম’।

মা বলল, ‘ইচ্ছে করেই বলেছিলিস, তুই জানতিস ও ঠিক তোকে ফলো করে চলে আসবে। ও তোর থেকে দূরে চলে যাক, সেটাও তুই চাস না, তুই চাইছিস ও সব সময় তোর পেছন পেছন আসুক’।

আমি বললাম, ‘এরকম কেন হবে?’

মা বলল, ‘তুই আমার মেয়ে। তোকে আমার থেকে ভালো আর কে জানবে?’

আমি বললাম, ‘জানি না’।

মা বলল, ‘এক কাজ কর। তুই বেরো। হিমুকে পেয়ে যাবি রাস্তায়। যা দুজনে মিলে ঘোর’।

আমি মাথা নাড়লাম, ‘না, দরকার নেই’।

মা বলল, ‘আমি বলছি তো। যা’।

আমি শুয়ে পড়লাম। একটু পর দেখলাম, ভালো লাগছে না। সত্যি সত্যিই সেজেগুজে বেরিয়ে পড়লাম হিমুকে খুঁজতে।

৬১

সমুদ্র আর ঈশ্বর একে অপরকে জড়িয়ে আছে পুরীতে। পৃথিবীতে তিন ভাগ জল, এক ভাগ স্থল। পৃথিবীর ঈশ্বর তো সমুদ্রই।

মাথার সমস্ত চিন্তা সমুদ্রকে সঁপে দিয়ে কেমন ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিচে বসে থাকা যায়। রাস্তায় কিছুটা হেঁটে হিমুকে দেখলাম না। কিছু না ভেবেই বিচে চলে এলাম। বিচে ভিড় আছে। রাত হলে মেয়েদের জন্য কোনও জায়গাই নিরাপদ না। আমার মাথায় সেসব চিন্তা আসেনি। আমি চুপ করে বসে আছি।

‘কীরে ছেমরি, তোর কি এহন হিমুর লগে লটঘট করতে ইচ্ছা করে?’

দিদা এতক্ষণ দেখা দেয়নি। আমি ফাঁকায় আছি দেখেই জ্বালাতে এসেছে। বললাম, ‘তাতে তোমার কি শয়তান বুড়ি?’

দিদা খিলখিল করে হেসে বলল, ‘আমি তো তরে দেখি। তোর কুড়কুড়ি হইছে। বরের লগে যাইতে চাস তুই’।

আমি বললাম, ‘আমার বর কেন হতে যাবে?’

দিদা বলল, ‘বিয়া করছস যখন, তখন তর বরই হইব। যা গিয়ে ঘর নিয়া শুয়া পড়’।

আমি শ্বাস ছাড়লাম। দুটো আমার বয়সী ছেলে চারপাশে ঘুরঘুর শুরু করেছে। উঠে দাঁড়ালাম। ছেলেদুটো একটু দূরত্ব রেখে পেছন পেছন আসতে থাকল।

আশ্চর্যের ব্যাপার এবার রাস্তাতেই হিমুকে পেয়ে গেলাম। দেখা মাত্র ছুটে চলে এসে বলল, ‘হোটেলে গেছিলাম। তুমি নাকি আমাকে খুঁজতেই বেরিয়েছ?’

আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, তোমাকে পেলাম না তো’।

হিমু বলল, ‘আমি তো এখানেই ছিলাম। ভিড়ের মধ্যে দেখোনি তাহলে’।

আমি ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম ছেলে দুটো নেই। হিমুকে দেখে হতাশ হয়েছে হয়তো। ছেলেরা মেয়েদের একা দেখলে অনেক কিছু ভেবে ফেলে। সঙ্গে অন্য আরেকটা ছেলে থাকলে হতাশ হয়। আর কেউ কেউ থাকে, তারপরেও এগিয়ে আসে।

এরা সেরকম না দেখে বাঁচা গেল।

হিমু বলল, ‘তোমায় একটা শাড়ি কিনে দি? সম্বলপুরী না কী বলে দেখছিলাম’।

দিদা কানে কানে বলল, ‘ওই দ্যাখ, শাড়ি দিয়া শাড়ি খোলার ধান্দা করতাসে ছ্যামরা’।

আমি বললাম, ‘না না। ওসব লাগবে না। এমনি হাঁটি’।

হিমু তাও ছাড়ল না। বলল, ‘একটা দিই না। কিছুই তো দিইনি কোনওদিন’।

আমি মাথা নাড়লাম, ‘না না। থাক। দিতে হবে না’।

হিমু বলল, ‘তাহলে খাজা খাও? গরম গরম ঘিয়ে ভাজা খাজা?’

আমি না করতে পারলাম না। একটা করে খাজা নেওয়া হল। খেতে দিব্যি লাগছে। রাস্তার পাশে বিচের মধ্যেই মেলা বসেছে। নাগরদোলা ঘুরছে। আর উল্টোদিকে শ্মশানে মড়া পোড়াচ্ছে।

হিমু বলল, ‘কিছু ঠিক করলে?’

আমি বললাম, ‘না’।

হিমু বলল, ‘আমি আর অন্য কাউকে বিয়ে করতে পারব না নীপা’।

আমি বললাম, ‘কেন পারবে না? তুমি তো আমার থেকে বেরিয়ে গেছ। আগের মতো পাগলামি আর নেই। তার উপর তোমাকে অনীশের কথাও বলেছি। অন্য লোকের এঁটো হওয়া মেয়ে বলে ঘেন্না করবে না?’

হিমু বলল, ‘দূর, ওরকম কেউ অ্যাক্সিডেন্টালি এসে চুমু খেতে চাইলে তাতে যদি ঠোঁটে ঠোঁট লেগেও যায়, তাতে কী হয়?’

আমি বললাম, ‘পরে এ নিয়ে ঠিকই কথা শোনাবে তুমি’।

হিমু খাজাটা মুখে নিয়ে ওই রস লাগা হাতে আমার হাত ধরে বলল, ‘না না, শোনাব না। বিশ্বাস করো’।

আমি রেগে গেলাম, ‘তুমি এই রস লাগালে? জল দাও’।

আবার দোকানে ছুটলাম। জল দিয়ে হাত ধুলাম। রসের এই সমস্যা। হাতে একবার লাগলে আর যায় না। কেমন অস্বস্তি হতে থাকে। হিমু অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছে খানিকটা। রুমাল দিল, হাত মুছে টুছে নিয়ে বললাম, ‘আমাকে ভাবতে দাও। আমি কারো সঙ্গে থাকার লোক না। থাকলে আমার অস্বস্তি হয়। তাছাড়া তোমার মা আমাকে পছন্দ করেন না। আবার ঝামেলা শুরু হবে’।

হিমু বলল, ‘মাকে আমি বুঝে নেব। অনেকবার বলেছি তোমায়। তুমি নিজেও জানো বাইরে থাকলে, মা এমন কিছুই ঝামেলা করবে না’।

আমি বললাম, ‘তাও ভাবতে হবে। জোর করে কিছু হয় না’।

হিমু বলল, ‘তা তো বটেই। নাগরদোলা চড়বে?’

আমি বললাম, ‘না না, ওতে আমার বড় ভয় লাগে। বমি হয়ে যায় যদি। বেড়াতে এসেছি, এসব জিনিস তো আমাদের শিববাড়ির মেলাতেও আসে’।

হিমু বলল, ‘তাহলে চলো শাড়ি কিনি’।

কেমন অস্থির হয়ে উঠেছে ছেলেটা। বুঝতে পারছে না আমাকে নিয়ে কী করবে। আমার তো খুশি হওয়া উচিত, আমার জন্য কেউ এরকম পাগলামি করছে।

কিন্তু খুশি হতে পারছি না কেন, কে জানে। মাকেও তো বাবা এরকমই ভালোবাসত একদিন। তারপরেও কী সুন্দর চলে গেল। মরেও গেল।

আমি তো মা নই। আমি আরেকটা মেয়েকে সহ্য করব না। খুন করে ফেলব ঠিক।

হিমু আমাকে নিয়ে টানতে টানতে শাড়ির দোকানে গিয়ে খুব দামি একটা শাড়ি কিনেই ফেলল শেষমেশ।

৬২

আমাকে হোটেলে দিয়ে গেল হিমু। আমার হাতে হিমুর কিনে দেওয়া শাড়ি ব্যাগ। মা রুমের দরজা খুলেই ব্যাগ দেখে জিগ্যেস করল, ‘কী কিনলি?’

আমি বললাম, ‘হিমু জোর করে শাড়ি কিনে দিয়েছে’।

মা হিমুকে বলল, ‘এসো। বসো’।

হিমু ঘরে এসে বসল। মা দরজা বন্ধ করে আমাকে বলল, ‘পা ধুয়ে আয়’।

আমি বাথরুম থেকে পা ধুয়ে এলাম। মা আমাকে বলল, ‘তাহলে তুই কি হিমুর সঙ্গে যাবি বলেই ঠিক করেছিস?’

আমি বললাম, ‘কিছু ঠিক করিনি। এখনও কিছুই ঠিক হয়নি’।

মা বলল, ‘তাহলে শাড়ি নিলি কেন?’

হিমু বলল, ‘আমি দিয়েছি। ও তো কিছুতেই নেবে না’।

মা আমার দিকে সোজাসুজি ফিরল, ‘তুই যদি ওর সঙ্গে চলে যেতে চাস, তুই যেতে পারিস। সেটাই হয়তো উচিত। আমি আজ আছি, কাল থাকব না। তুই একা হয়ে যাবি। তোর কী হবে ভাবলে আমার পাগল পাগল লাগে’।

আমি বললাম, ‘আমি তোমার কাছেই থাকব। হিমুর সঙ্গে যাব না’।

হিমু বলল, ‘ঠিক আছে। এখন যেও না। পরে যাবে বলো’।

আমি চুপ করে রইলাম। হিমু বলল, ‘তোমার কী হয় নীপা? আমরা তো সুন্দর ঘুরলাম। তুমি এখন এরকম শক্ত হয়ে যাচ্ছ কেন? দেখো, বিয়ের রাতের ভুলটা আমি আর কোনওদিন করব না। আমার বাড়ির কেউ কোনওদিন তোমার বাবার নামে একটা বাজে কথা বললে আমি তার সঙ্গে চিরদিনের মতো সম্পর্কচ্ছেদ করব, আমি তোমাকে কথা দিলাম। এরপরে তোমার না ফেরার মতো কিছু আছে?’

আমি মাকে দেখলাম। মার দু’চোখের কোনায় জল। আমার জন্য মা কাঁদছে। আমি সংকুচিত হলাম। বললাম, ‘আমি এখনই মাকে ছেড়ে বাইরে কোথাও যেতে পারব না’।

হিমু বলল, ‘ঠিক আছে। তোমাকে যেতে হবে না কোথাও। কিন্তু তুমি আমারই থাকবে, সে কথা দাও’।

আমি বললাম, ‘মা, তোমার খিদে পায়নি? চলো খেয়ে আসি’।

হিমু হাল ছেড়ে দিল। মা বলল, ‘চল। হিমু তুমিও চলো’।

হিমু না করল না। তিনজনই খেতে বেরোলাম। হোটেল থেকে বেরিয়ে রাস্তায় এসে হাঁটতে শুরু করলাম। আমি মার হাত শক্ত করে ধরে আছি। হিমু একটু এগিয়ে গেছিল। মা বলল, ‘হিমুর মধ্যে অনেক পরিবর্তন লক্ষ্য করছি। অনেকটা ম্যাচিউরিটি এসেছে। ও তোকে ভালো রাখবে’।

আমি বললাম, ‘আমি এখন তোমাকে একা রেখে ওর সঙ্গে যেতে পারব না’।

মা বলল, ‘ঠিক আছে। হিমুকে বলে দে, তুই ওর জন্য অপেক্ষা করবি। ওর অস্থিরতা তাতে কমবে’।

আমি বললাম, ‘লিখিয়ে নি?’

মা বলল, ‘কী লেখাবি?’

আমি বললাম, ‘কোনওদিন অন্য কোনও মেয়ে দেখলে দৌড়বে না’।

মা বলল, ‘ওরকম লেখা যায় নাকি? তাহলে তো পৃথিবীর সব বউ তার বরকে দিয়ে এটা লিখিয়ে নিত। ব্যাপারটা অত সোজা না। বরকে ঠিক মতো জানলে ওসব লেখাতে হয় না’।

একটা প্রাণকাড়া হাওয়া আসছে সমুদ্র থেকে। শরীরটা ঠান্ডা করে দিচ্ছে। আমি বললাম, ‘তুমি বাবাকে জানতে পারলে না কেন মা?’

মা বলল, ‘অবচেতনে ঠিকই বুঝতাম তোর বাবার বাইরে মন চলে গেছে। হঠাৎ হঠাৎ সেন্ট দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া, রাত করে ফেরা, আমার সঙ্গে একটু একটু করে দূরত্ব তৈরি করা, আমার অবচেতন আমাকে ঠিকই বলেছিল। আমি সচেতন অবস্থায় সেটা মানতে চাইনি। না মেনে অস্বীকার করে গেছিলাম শুধু। বার বার নিজেকে বুঝিয়েছি এটা হতে পারে না। তোর বাবা কিছুতেই অন্য কাউকে ভালোবাসতে পারে না। মেয়েটা এত বড় একটা পরীক্ষা দিচ্ছে! কিছুতেই ও অন্য কোনও মহিলার সঙ্গে চলে যেতে পারে না। যখন ব্যাপারটা হল, আমি আকাশ থেকে পড়লাম। কিন্তু তখন আর কিছু করার ছিল না’।

এ কথাগুলো মা কোনওদিন বলেনি। সমুদ্র বলিয়ে নিল, নাকি শ্রীজগন্নাথ বলিয়ে নিলেন? জানি না।

আমরা খেতে বসলাম। নিরামিষ খাবার। হিমু খাচ্ছিল। হঠাৎ ফোন এল। ধরে বলল, ‘হ্যাঁ মা…ঠিক আছি। পুরীতে এসেছি।…না, কোনও মেয়ে দেখবে না। দয়া করে দিব্যি দিও না। প্লিজ না…না, আমি রাখছি’।

ফোন রেখে আবার খেতে শুরু করল হিমু। আমার খারাপ লাগতে শুরু করল হঠাৎ করে। আসলে কি আমি হিমুকে আটকে রাখছি? ওর মা যেমনই হোক, ওকে ওর মার কাছে মিথ্যে বলতে হচ্ছে। আমি নিজেও জানি না আমি ওর সঙ্গে কোনওদিন যাব নাকি! তাহলে ওকে আমি আটকে রাখছি কেন?

৬৩

ছোট থেকে ঠাকুরকে ডেকেছি। ঠাকুর কেমন দেখতে হয় জানি না।

কখনও দুর্গা ঠাকুর দেখেছি বাবার সঙ্গে, কখনও কালী ঠাকুর। বাড়িতে বলরাম, সুভদ্রা, জগন্নাথের ছবি ছিল। প্রতিদিন প্রণাম করেছি।

এত এত মানুষ ঠাকুরের কাছে আসছেন, লাইন দিয়ে দর্শন করছেন, পুজো করছেন, আমার তো বেশি কিছু চাহিদা নেই। আমি শুধু চেয়েছি, ঠাকুর আমাকে একটু শান্তি দাও।

দিদার থেকে আমি শান্তি চেয়েছিলাম, মারতে চাইনি। ঠাকুরের কাছে এসে সে কথা বললে কি ঠাকুর সেটা শুনবেন? চড়া রোদের মধ্যে মন্দিরে ঢুকেছি, প্রবল ঠেলাঠেলির মধ্যে পাণ্ডা ঠাকুর দর্শন করালেন। ঠাকুর মানুষের আদরের দেবতা, ভালোবাসার দেবতা, এতটুকু সময় পেলাম না, ঠাকুরকে মনের কথা বলার জন্য।

কেউ একজন পেছন থেকে আমায় ঠেলছিল। পেছন ফিরে দেখি বাবারই বয়সী লোক, গোটা শরীরটা দিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে আছে, তার যৌনাঙ্গ উত্তেজিত, আমায় ঠেলা মারছে। ঘেন্নায় ডুবতে ডুবতে চিৎকার করলাম, অত শব্দের ভিড়ে আমার চিৎকার কেউ শুনতেই পেল না। এরকম তো হয়ই। কোনও মতে দর্শন করে বাইরে এসে লোকটাকে খুঁজতে গেলাম। কিছুতেই পেলাম না। ঠাকুরের কাছে এসেও মানুষের নোংরামি বিন্দুমাত্র কমে না।

মা আমাকে বলল, ‘কী হয়েছে?’

আমি বললাম। মা আমার হাত শক্ত করে ধরে বলল, ‘চল, ফেরা যাক’।

হিমু মন্দিরে আসেনি। পাণ্ডার ঘর থেকে চটি পরে রিকশা নিলাম আমরা। সকাল থেকে খালি পেটে আছি। মা বলল, ‘খেয়ে নিবি?’

আমি বললাম, ‘না। আমি স্নান করব। হোটেলে চলো’।

মা আর কিছু বলল না।

হোটেলে গিয়ে দেখি হিমু বসে আছে রিসেপশনে। আমাকে দেখে হাসল।

আমি ওর সঙ্গে কথা না বলে স্নানে ঢুকে গেলাম। মনে হচ্ছিল লোকটার শরীরের নোংরা জিনিসগুলো আমার শরীরে মিশে গেছে, আমি কিছুতেই স্বাভাবিক হতে পারছিলাম না। জলের পর জল ঢালতে শুরু করে দিলাম। একটা সময় মা বাইরে থেকে দরজা ধাক্কাতে শুরু করল, ‘বেরো। আর স্নান করতে হবে না। ঠিক আছে সব। আর চিন্তা করিস না’।

আমি কোনওকালে ভিড় ট্রেনে বাসে যাতায়াত করিনি। আমি জানি, ওখানে মেয়েদের সঙ্গে এরকম অসভ্যতা সবসময় হয়। আমার সঙ্গে এই প্রথম হল বলে আরও গা ঘিনঘিন করছিল।

এরকম লোকগুলো দেখা যাবে হয়তো পরিবারের সঙ্গে আসে, দেখা যাবে লোকটার ফার্স্ট ইয়ারে পড়া মেয়ে আছে। মেয়েটা বাবাকে ভীষণ ভালোবাসে, বাবা কখন অফিস থেকে আসবে বলে মেয়েটা হাপিত্যেশ করে বসে থাকে। দেখা যাবে লোকটা অফিসে একজন সম্মাননীয় ব্যক্তি, সবার সঙ্গে খুব মিষ্টি সম্পর্ক। সেই লোকটাই মন্দিরের ভিড়ের সুযোগে তার মেয়ের বয়সী একটা মেয়ের সঙ্গে অবলীলায় এরকম অসভ্যতা করে ফেলতে পারে।

রাস্তায় বেরিয়ে লোকটা যখন হাঁটবে, আবার যখন বাড়ি ফিরে যাবে, কেউ জানতেও পারবে না, লোকটা আসলে সমাজের নিকৃষ্টতম লোকদের মধ্যে পড়ে। সারাদিন ধরে মুখের সমস্ত জমানো থুতু লোকটার মুখের উপর ফেললেও সে অসভ্যতার উত্তর লোকটাকে দেওয়া হবে না।

স্নান করে এসে আমার হাত-পা কাঁপছিল। কোনওমতে খাটের উপরে এসে বসলাম। মা হিমুকে ডাকল।

হিমু এসে আমাকে দেখে চমকে গিয়ে বলল, ‘কী হয়েছে?’

আমি কাঁপতে কাঁপতে বললাম, ‘কিছু হয়নি। কিছু হয়নি। আমি ঠিক আছি’।

মার উপস্থিতি অগ্রাহ্য করেই হিমু এগিয়ে এসে আমার কপালে হাত দিয়ে বলল, ‘জ্বর এসেছে। তুমি শোও। শুয়ে পড়ো’।

আমি হিমুকে সরিয়ে দিলাম, ‘তুমি দূরে যাও। আমাকে ধরবে না। দূরে যাও’।

মা তাড়াতাড়ি এসে আমাকে ধরল, ‘তুই শো। আমি তোকে ওষুধ দিচ্ছি। সব ঠিক হয়ে যাবে। চিন্তা করিস না’।

আমি বললাম, ‘কিচ্ছু ঠিক হবে না’।

মা হিমুকে বলল, ‘তুমি একটু ভাত আলুসেদ্ধ বা যা হোক নিয়ে এসো তো। ওকে খাইয়ে জ্বরের ওষুধটা দিয়ে দিই’।

হিমু দৌড়তে দৌড়তে বেরিয়ে গেল।

৬৪

একটা বিকেল আর সন্ধে জ্বরের ঘোরে কেটে গেল। রাতে বাবাকেও দেখতে পেলাম। লজ্জিত মুখে আমার সামনে বসে আছে। আমাকে বলছে, ‘কেমন আছিস রে মা?’

ছোটবেলায় আমার জ্বর হলে বাবা এরকমই করত। বার বার আসত, কোলে নিতে ঘুরত, আর কিছুক্ষণ পর পর বলত, ‘কেমন আছিস রে মা?’

ভোরে উঠে দেখি, হিমু সোফাতে ঘুমাচ্ছে।

আমার জ্বর ছেড়েছে। শরীর ঝরঝরে লাগছে।

মা আমার পাশে ঘুমাচ্ছে। আমি উঠে বসতে হিমুও উঠে আমার দিকে পিটপিট করে তাকাল।

আমি বললাম, ‘হিন্দি সিনেমার হিরোর মতো তো পুরো! সারারাত এখানেই কাটিয়ে দিলে?’

হিমু বলল, ‘তুমি যা শুরু করেছিলে!’

আমি বললাম, ‘কী শুরু করেছিলাম?’

হিমু বলল, ‘প্রলাপ বকছিলে তো। একবার বলছ, বাবা চল মেলা থেকে ঘুরে আসি, আরেকবার দিদাকেও মনে হয় ডাকলে’।

আমি জানি আমার জ্বর হলে এসব বলি। মা জানে। হিমু জানে না বলেই ঘাবড়ে গেছে।

আমি সন্দিগ্ধ কণ্ঠে বললাম, ‘দিদাকে কী বললাম?’

হিমু বলল, ‘সেটা মনে নেই। ওই কিছু একটা বলেছিলে আর কী!’

আমি বললাম, ‘চিন্তা কোরো না, আমার জ্বর হলেই এরকম হয়। তুমি হোটেলে ফিরে ঘুমাও। মা তোমাকে যেতে বলেনি?’

হিমু বলল, ‘অনেকবারই বলেছেন। আমিই জোর করে থেকে গেছি’।

আমি বললাম, ‘আমার সুস্থ লাগছে। চলো সমুদ্রে গিয়ে বসি’।

হিমু বলল, ‘সত্যিই?’

আমি বললাম, ‘কপালে হাত দিয়ে দেখো’।

হিমু কপালে হাত দিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ, সত্যিই জ্বর নেই। হতে পারে ওষুধের প্রভাব। আবার জ্বর আসবে পরে। তুমি বেরিও না। রেস্ট করো’।

আমি বললাম, ‘না। অনেক রেস্ট হয়েছে। তুমি গেলে চলো, নইলে আমি একা একা চলে যাব’।

হিমু বলল, ‘ঠিক আছে, চলো’।

আমি মাকে তুলে বললাম, ‘হিমুর সঙ্গে হেঁটে আসি, জ্বর কমে গেছে’।

মা ঘুমঘোরেই বলল, ‘যা’।

আমি হিমুকে নিয়ে বেরোলাম। সূর্যোদয়ের সময় এখন। আকাশ লাল হয়ে গেছে। মুগ্ধ হয়ে বালির উপরেই বসে পড়লাম।

হিমু বলল, ‘অ্যাই, এখানে বসলে কেন?’

আমি বললাম, ‘বসো না। কী সুন্দর লাগছে দেখো’।

হিমু বসে পড়ল। বলল, ‘নীপা, তুমি বুঝতে পারো আমি তোমাকে কতটা ভালোবেসে ফেলেছি?’

আমি বললাম, ‘পারি’।

হিমু বলল, ‘তাহলে যেতে চাও না কেন?’

আমি বললাম, ‘আমার কোথাও যেতে ইচ্ছে করে না’।

হিমু চুপ করে গেল। আমি বললাম, ‘তুমি যাও। মন দিয়ে চাকরি করো। আমার কথা ভেবো না’।

হিমু বলল, ‘তা কী করে হয়? আমি তোমাকে ভালোবাসি। তুমি অন্য কাউকে বিয়ে করবে, আমি সেটা নিতে পারব না’।

আমি বললাম, ‘আমি এখনও ভালোবাসতে পারি না। তোমাকে কেন, কাউকেই পারি না। কাউকে যদি ভালোবাসতে না পারি, তাহলে খামোখা নাটক করব কেন? শুধু সামাজিক নিরাপত্তার জন্য বিয়ে করে নেব?’

হিমু বলল, ‘পরে কাউকে ভালোবাসলে তাকে তুমি বিয়ে করবে?’

আমি একটুও না ভেবে বললাম, ‘করতেও পারি’।

হিমু আর কিছু বলল না। আমি সমুদ্রে স্নান করলাম, পুরো ভিজে হোটেলে ফিরে এলাম। হিমু আমাকে হোটেলে পৌঁছে দিয়ে চলে গেল।

আমি গরম জলে স্নান করে চা আনিয়ে খেলাম।

মা উঠে বলল, ‘হিমু কোথায়?’

আমি বললাম, ‘আর আসবে না মনে হয়’।

মা বলল, ‘কেন?’

আমি সব বলে বললাম, ‘ঠিক করিনি?’

মা একটু চুপ থেকে বলল, ‘ঠিক ভুল সব আপেক্ষিক রে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাল্টে যায়। আজ যেটা ঠিক মনে হবে, কাল সেটাই ভুল মনে হতে পারে। তোর বাবাকে যখন বিয়ে করেছিলাম, আমার মনে হত আমার কী ভাগ্য, কী ভালো একটা লোক! কত কেয়ারিং! আমাকে কিছু করতে হত না। যা চেয়েছি, তাই নিয়ে আসত। একটা সময় আর চাইতেও হয়নি। সাবান একটু বাকি, নিজে থেকে সাবান কিনে আনছে, শ্যাম্পু বল, যাই বল। তোকে ছোটবেলায় আমি কতটা দেখেছি? তোর বাবাই তো দেখেছে বেশিরভাগটা। তখন মনে হয়েছিল ঠিক। পরে মনে হল এত বড় ব্লান্ডার করে ফেলেছি? মানুষ কখন কী করে, কেউ জানে না। হিমু কম পরীক্ষা দেয়নি। চাইলে চলে যেতে পারত। কিন্তু ফিরে এসেছিল। জানি না, ঠিক হল নাকি’।

আমি বললাম, ‘আমি ওকে ভালোবাসি না। মায়া আছে। ভালোবাসি না’।

মা বলল, ‘তাহলে ঠিকই করেছিস হয়তো’।

আমি বললাম, ‘আমার যাওয়া উচিত হয়তো। যাব না। থাক। ও চলে যাক। ভালো থাকবে’।

মা বলল, ‘হু। ওর জন্য ভালোই’।

কলিং বেল বাজল। দরজা খুলে দেখি হিমু দাঁড়িয়ে আছে। হাসি মুখে বলল, ‘এখন কেমন লাগছে?’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *