৪৫
কাদায় মাখামাখি হিমুকে ড্রেন থেকে তুলে বাথরুমে ঢোকানো হল। অনীশ চিন্তিত গলায় বলল, ‘এ কী রে, এর সঙ্গে তোর বিয়ে হয়েছিল? এ কি মাতাল না পাগল?’
আমি হাই তুলে বললাম, ‘কোনওটাই না। খুব ভালো অ্যাকাডেমিক রেজাল্ট। আপাতত আই কিউ নেগেটিভে চলে গেছে। এই নিয়ে তোর কোনও রেফারেন্স আছে? কোনও বইপত্রে এসব নিয়ে কিছু লেখা নেই?’
অনীশ মাথা চুলকে বলল, ‘না, আমি তো ক্লাস স্ট্রাগল জানি। এসব প্রেম ট্রেম নিয়ে সিরিয়াস বইতে কিছু লেখা নেই। পার্টির উচ্চ নেতৃত্বের সঙ্গে কথা বলে দেখতে হবে। বুঝতেই পারছিস, এখন আমাদের স্ট্রাগলের সময়, প্রেম ভালোবাসা নিয়ে মাথা ঘামালে চলবে না’।
আমি বললাম, ‘প্রেম বুঝে নিলে তো সব বুঝে যাওয়া যেত। প্রেম কমে যাচ্ছে বলেই দলের হাল খারাপ হচ্ছে। তোর কী মনে হয়? এই যে কিছু ছেলে বিপ্লবের কথা বলে সব থেকে বেশি রেসিস্ট, ক্লাসিস্ট আর হিংসুটেপনা করে বেড়ায়, কেউ ভালো কিছু করলেই তাদের টেনে নামাতে চায়, সারাক্ষণ নিজে একটা হনু সেটাই প্রমাণ করে যায়, তোর মনে হয় না এর জায়গায় প্রেমের কথা বললে লাভ হত?’
অনীশ গলা খাকরে বলল, ‘তুই কি এটা আমায় বললি?’
আমি বললাম, ‘কেন? তোর প্রোফাইল ম্যাচ করছে নাকি? যদি করে তাহলে তোকেও বলতে পারি’।
অনীশ অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে বলল, ‘আমি বিপত্তারিণীর তাগা বাঁধি। পরীক্ষার সময় এখনও ঠাকুর প্রণাম করি। তাহলে হয়তো এখনও পিওর কমিউনিস্ট হতে পারিনি। কিন্তু রেসিস্ট না আমি। হিংসেটা হয়, ধর আমি যে মেয়েটাকে পছন্দ করি, সে যদি অন্য ছেলেকে পাত্তা দেয়, হিংসে হবে না বল? সেটা খারাপ?’
হিমু বাথরুম থেকে গামছা গামছা বলে চিৎকার করছে। ওকে গামছা দেওয়া হল। এ বাড়িতে ওর পায়জামা আছে। সেটা পরে বেরিয়ে এসে দাঁত বের করল, ‘কেমন পড়ে গেলাম দেখলে?’
আমি বললাম, ‘তুমি এখানে কী করতে এসেছিলে?’
হিমু খুব আনন্দের খবর শোনাচ্ছে এমন গলায় বলল, ‘দেখো আমার চাকরি কিছুতেই আর হবে না। এদিকে পকেটও গড়ের মাঠ। বাড়িতে বসেই বা কী করতাম? ঘুরতে বেরোলাম। আমার চাকরি নেই, টাকা পয়সা নেই দেখে যা বুঝলাম মাও আর আমাকে নিয়ে তেমন চাপ নিচ্ছে না। বাধাও দিল না জানো তো? পৃথিবীতে গরিব হওয়াই ভালো। ইম্পরট্যান্স কমে যায়, ব্যক্তিস্বাধীনতা বেড়ে যায়’।
‘গরিব’ শব্দটা কারো কারো অর্গাজম ঘটাতে সাহায্য করে। অনীশের যেমন হল! অনীশ পারলে সদ্য কাদামুক্ত হিমুকে জড়িয়ে ধরে, গদগদ গলায় বলল, ‘একদম ঠিক বলেছেন। আপনার বেশ পড়াশুনা আছে তো’।
হিমু এতক্ষণে অনীশকে দেখল। অবাক হয়ে বলল, ‘আপনি কে?’
অনীশ বলল, ‘আমি নীপার ক্লাসমেট’।
আমি বললাম, ‘ও আমাদের ক্লাসের বিপ্লবী নেতা’।
হিমু বলল, ‘এ বাড়িতে কী করছে?’
আমি বললাম, ‘বিপ্লব বোঝাতে এসেছে। তুমি বুঝবে? অনীশ ওকে বোঝা’।
তবে অনীশ আমাকে যে উৎসাহ নিয়ে বিপ্লব বোঝাতে চায়, হিমুর সামনে তেমন উৎসাহ দেখাল না। কেমন একটা হাসি হেসে বলল, ‘বাদ দে’।
হিমু বলল, ‘চা খাওয়াবে? পাঁচ টাকাও নেই চা কেনার জন্য। কঠিন একটা অবস্থা হয়েছে’।
আমি বললাম, ‘বসো। তুমি আর অনীশ বিপ্লব নিয়ে আলোচনা করো’।
অনীশ বলল, ‘আমি বরং যাই বুঝলি।’
দিদা সঙ্গে সঙ্গে উদয় হল, ‘ওই দেখো, মাইয়া একা থাকলেই ওর চুলকানি হয়। এখন মাইয়া একা নাই, ও পালাইবে। কেমন ঢ্যামন দ্যাখসো’?
আমি বললাম, ‘না না বোস না। দেখ হিমুকে হেল্প করতে পারিস নাকি। ওর একটা কাজ দরকার’।
আমি চায়ের জল বসিয়ে এলাম।
অনীশ বলল, ‘আমার কাজ দেওয়ার ক্ষমতা নেই। এখন কাজ কোথায়?’
হিমু বলল, ‘আমি দোকান দেব। কাজ করে লাভ নেই। দোকান দিতে হবে। কিন্তু তার জন্য টাকা লাগবে। টাকা কোথায় পাব?’
আমি বললাম, ‘অনীশ, তুই ওকে বোঝা পুঁজিটাই বড় কথা না। ইচ্ছাটা আসল। শ্রমিক হতে শেখা। কাল একটা কোদাল নিয়ে লোকের বাড়ির বাগান কোপাক। শ্রমের মূল্য বুঝবে। যেন মানুষ না, প্রেমের কাহিনির দেব’।
অনীশ মুখ টুখ কুঁচকে গোমড়া হয়ে গেল।
হিমু বলল, ‘মা বলছে তোমায় গয়নার কথা বলতে। তুমি কিছু গয়না দিলে সেটা বিক্রি করে দোকান দেওয়া যাবে’।
আমি হেসে ফেললাম, ‘শেষে আমার গয়না তোমার ব্যবসার “মূলধোন”?’
অনীশ গলা খাকরাল, ‘আহ, ও কার নেই! কী সব বলছিস?’
আমি বললাম, ‘ফুলশয্যা থেকে যার ক্রাইসিস ওইটার ইউজ না হবার জন্য, তার ব্যবসার জন্য ওকার লাগবে যা বুঝতে পারছি’।
অনীশ এবার একটু গরম হল, ‘ঠিকই তো। তুই ঠিক বলেছিস। এই যে মশাই, আপনাকে বলছি, আপনার বাড়িতে নীপার যে অপমান হয়েছে, আপনি তার বিরুদ্ধে কী স্টেপ নিয়েছেন? প্রতিবাদ করেছেন?’
হিমু ভয় পেয়ে বলল, ‘আপনি কে?’
আমি বললাম, ‘বলেছি তো। আমাদের নেতা’।
হিমু বলল, ‘আমি অনেকবার ক্ষমা চেয়েছি। বিশ্বাস করুন’।
অনীশ বলল, ‘ক্ষমা চাইলেই সব হয়ে গেল?’
এদের কথায় ভুলে গেছিলাম চায়ের জল গরম হয়ে গেছে। দৌড়ে গিয়ে চা নিয়ে এসে টেবিলে রাখলাম।
অনীশ উৎসাহ ফিরে পেয়েছে। হিমুকে ডাউন দেখাতে চাইছে। আমি মজা পেলাম। চা খেতে খেতে এসব ক্যাচাল দেখার আলাদা মজা আছে।
অনীশ বলছে, ‘সোশিও ইকোনমিক গ্রাউন্ড থেকে বিচার করুন। আমি তো এইরকম বিয়েরই পক্ষপাতী নই। ডাউরি দেওয়া হবে, জিনিস দেওয়া হবে, গাদা গাদা বাজে টাকা খরচা করা হবে। মামাবাড়ি? কোনও মানে হয় এত খরচা করে বিয়ে করার? আবার নতুন কায়দা হয়েছে রবীন্দ্রসঙ্গীতে বিয়ে। কোথাও আবার নারী পুরোহিত। আরে যদি নতুনত্বই চাই, তাহলে পুরোহিত কেন লাগবে? ছেলে মেয়ের হাত ধরে বলবে আমরা বিবাহিত। গল্প শেষ। এটা তো মহাভারতেও আছে। একে বলে গান্ধর্বমতে বিবাহ।’
হিমু চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, ‘কিন্তু আমার কাছে আর টাকা নেই। দোকানটা খুলতে কোথায় টাকা পাব?’
এত জ্ঞান দিয়ে সেটা নিষ্ফলে গেল দেখে অনীশ মুষড়ে পড়ল, ‘আমরা পুঁজির বিরোধী। টাকা দিয়ে দোকান খুলে কী হবে? আপনাকে যেটা বললাম তাই করুন। মাটি কোপান। টাকা যা পাবেন, জমিয়ে দোকান কিনুন’।
হিমুর মুখ উজ্জ্বল হল, ‘এটা ভালো আইডিয়া। আমি কাল থেকে বাগান করার কাজে লেগে যাব’।
অনীশ বলল, ‘আপনার কোনও সমস্যা হলে বলবেন, আমি আমার সংগঠন নিয়ে আপনার হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ব’।
দিদা বলল, ‘মুখে কইব পাশে আছে, আর এ বাড়িত আইসা তোর লগে শুইতে চেষ্টা করব। সব ছেলে বন্ধু এমন হয়। বুঝস তুই মাগি?’
আবার সেই বিচ্ছিরি হাসিটা আসছে। আমি হাসতে শুরু করলাম। হঠাৎ দেখি অনীশের আঙুলে আংটি। আমি জিগ্যেস করলাম, ‘কীসের আংটি রে?’
অনীশ বলল, ‘এটা পান্না, আমি মানি না। মা জোর করে পরাল’।
আমি হেসে ফেললাম। অনীশ বলল, ‘আরে, হাসছিস কেন? আমি জ্যোতিষ মানি না’।
হিমু বলল, ‘না মানলে আমাকে দিয়ে দাও। বেচে দিয়ে ব্যবসা করব’।
আমি আবার হাসতে শুরু করলাম। যার যা ধান্দা।
৪৬
‘প্রিয় এক দিন কা শাশুড়িমা,
আপনার ছেলেকে সামলান।
সামলানো মানে জানেন? জানেন না বোধ হয়। জানলে আর আপনার ছেলে আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে সকাল বিকেল যাতায়াত করত না।
আমাদের দেশে কোনও কোনও বাড়িতে বাচ্চা হবার পর যদি ছেলে হয়, তাদের ওই জন্মের সময় থেকেই একটা বিরাট ব্যাপার হয়ে যায়। সে আলাদা। কেন আলাদা? না সে ছেলে। ফার্স্ট ক্লাস সিটিজেন। সে যা ইচ্ছা তাই করবে, বাপ তার দিদি বা বোনকে বিন্দুমাত্র প্রায়োরিটি না দিয়ে তাকেই সব প্রায়োরিটি দেবে, সব ভালো ভালো জিনিস তার জন্য থাকবে, ভাবটা এমন হবে, সে জন্মে আমাদের কেতাত্থ করে দিয়েছে। তার জন্যই সব কিছু। বাকিরা নিমিত্তমাত্র। বিয়ের পর সে নিজের বাড়িতেই থাকবে, তার মা বাপ ভেবে নেবে অন্যের বাড়ি থেকে যে মেয়েটা আসবে, তাকে যা ইচ্ছে বলার অধিকার তাদের অটোমেটিক্যালি হয়ে গেছে। সে যা চাইবে করবে, ফুলশয্যার রাতে একটা অপরিচিত মেয়েকে তার শাড়ি খোলানোর জন্য আরামসে জোরাজুরি করতে পারে। একবারও দেখার চেষ্টা করবে না মেয়েটা আদৌ প্রস্তুত নাকি। তার মানসিক অবস্থা কী? তার পিরিয়ড হয়েছে নাকি? পিরিয়ডের কথায় মনে পড়ল, আপনার ছেলেকে জিগ্যেস করে দেখবেন তো পিরিয়ড মানে কী? জানে? মনে হয় না জানে। সেসব শিক্ষা তো…হেঁ হেঁ, দেননি নিশ্চয়ই। দিলেও বিপদ অবশ্য। অতিশিক্ষায় পিরিয়ড কবি হয়ে যাবে। লিখে বসল হয়ত, এই শীতের দিনে পিরিয়ড হলে কী কষ্ট তুমি কী করে জানবে। যেন এই মাত্র কাপড়ে চোপড়ে করে বসে আছে।
যাই হোক, অনেক ভ্যানতাড়া মারলাম। আসল কথা বলি। প্রিয় এক দিন কা শাশুড়িমা, নিজের ছেলেকে সামলান। জানি আপনি ঝাঁসির রানি, আমার মতো মেয়েরা আপনার ব্লাউজের খাঁজে থাকে। কিন্তু সত্যি বলছি বিশ্বাস করুন, এবার বাড়াবাড়ি হচ্ছে। আপনার ছেলে সকাল বিকেল আমাদের বাড়ি আসছে, সাইকেল নিয়ে ড্রেনে পড়ছে, আমাদের বাড়িতে থেকেও গেছে কয়েকদিন বিনা পয়সায়। সে ঠিক আছে। আমার মার টাকা আছে। বাবাকে খাওয়ালে আপনার ছেলেকেও খাওয়াতে পারে। অসুবিধে নেই। কিন্তু আমি আপনার হাতে পায়ে ধরছি, এবার বেড়াল সামলান। দরকারে হাত পায়ে বেড়ি পরান। কিন্তু দেখুন যেন এ বাড়িতে না আসে। আর নেওয়া যাচ্ছে না। ছেলেকে বড় করেছেন, ছেলে পড়াশুনায় ভালো, কিন্তু ছেলেকে বোঝান, নিজের বাড়ি বাদে বাকিদের বাপের সম্পত্তি না ভাবতে। দূরত্ব শেখান।
বাদ দিন। এত শেখানোর ক্ষমতা আপনার থাকলে তো হয়েই যেত। নিজেই তো আমার সঙ্গে অসভ্যের মতো ব্যবহার করেছেন। বাড়ির লোক যেমন হবে, সে বাড়ির ছেলে তো তেমনই হবে।
আপনাকে আমি অনুরোধই করলাম।
ধন্যবাদান্তে
জানেনই তো কে।’
চিঠিটা একটা খামে ভরে অনীশকে বললাম, ‘এটা ওদের বাড়িতে দিয়ে আসিস তো!’
অনীশ বলল, ‘আমি যাব?’
আমি বললাম, ‘পোস্টও করে দেওয়া যায়। সেক্ষেত্রে বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে। পোস্টবক্স একটা দেখেছিলাম ও বাড়িতে। সেখানে দিয়ে আসিস না হয়’।
অনীশ মাথা নাড়ল, ‘ঠিক আছে। তুই যাবি? তুই নিজের হাতেও দিয়ে আসতে পারিস। আমার বাইকে চল’।
দিদা বলল, ‘ওই দেখো, ঠেকাইব পিছনে, ছ্যমরার লাফাইব সামনে। কেমন শয়তান দ্যাখসস?’
আমি অনীশকে বললাম, ‘আমি যাব না। ভাল্লাগছে না। তুই যা’।
অনীশ চলে গেল। দিদা খাটের উপর বসে পা দোলাতে দোলাতে বলল, ‘বাইকে ঘুরবা? খুব মজা লাগে না?’
আমি বললাম, ‘আমি ঘুরেছি? দেখলে যেতে?’
দিদা বলল, ‘যাইবার তো ইচ্ছা লাগে। ছ্যামরা মানুষের ছোঁয়া লাগলে আনন্দ হয় না?’
আমি বললাম, ‘না। সবাইকে নিজের মতো ভেবো না’।
দিদা বলল, ‘ওরকম লাগে। তোরও ইচ্ছা করে। ছোঁয়াইতে, ঠ্যাকাইতে। ছ্যামরারে গায়ে উঠাইতে চাস তুই’।
আমি বিরক্ত মুখে ঘরের বাইরে এলাম। নিশি ঘর থেকে বেরিয়েছে। দু’চোখের তলায় কতটা কালি। সারাক্ষণ কেঁদে যাচ্ছে মেয়েটা। আমি ডাকতে গেলাম, নিশির বাবা রাগী চোখে আমাকে কথা না বলতে ইশারা করল।
নিশিকে বললাম, ‘কীরে? তোকে আটকে রাখছে?’
নিশির বাবা আঙুল তুলে নিশিকে সঙ্গে সঙ্গে বলল, ‘তুই ঘরে যা’।
নিশি ক্লান্তমুখে আমাকে দেখে ঘরে চলে গেল।
নিশির বাচ্চা কেঁদে যাচ্ছে একভাবে।
কী করা যায়? ঝামেলা করা যায়। কিন্তু নিশি নিজেই যদি সব মেনে নিয়ে বসে থাকে, তাহলে কী করে হবে?
নিশি হাল ছেড়ে দিয়েছে। নিশিকে বোঝানো হয়েছে ওর জন্য ওর বাবা যা সিদ্ধান্ত নেবে সেটাই সব থেকে ভালো।
নিশির আর কিছু করার নেই।
আমার আবার বাবা থেকেও নেই। সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার লোক নেই।
কে বেশি সুখী? আমি না নিশি?
৪৭
দিনের একটা সময় আসে, যখন কেউ আর আসে না। পাড়ার কাকিমাদের গলার স্বর অবধি পাওয়া যায় না। মা স্কুলে গেছে। নিশির বাচ্চাটা কাঁদছে না, হিমু কিংবা অনীশ কারো দেখা নেই। চুপ করে জানলার ধারে বসে থাকলে রাস্তা দিয়ে কাউকে যেতে অবধি দেখা যায় না।
অদ্ভুত একটা সময়। দুপুর দুটো থেকে এই মন খারাপ করা একটা সময় শুরু হয় হঠাৎ করে। এই সময় বুকটা দুরু দুরু করতে থাকে। নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করতে শুরু করি, ‘আমার কী হবে? এরকম ভাবে চলবে?’
তখন মার কথা মনে পড়ে। মা নিশ্চয়ই কিছু একটা ভেবে রেখেছে। সময় হলেই আমাকে ঠিক বলবে।
হিমুকে অবশ্য বেশিক্ষণ আটকে রাখা সম্ভব না। হিমু এল দুপুর সাড়ে তিনটে নাগাদ। হিমু এখন আমার একটা গয়না চায়। বিক্রি করে দোকান দেবে। বদ্ধ উন্মাদ হয়ে যাবার আগের স্টেপে মানুষ কেমন হয়? হিমুর মতো? নাকি আগের স্টেজ ফেজ না, হিমু বদ্ধ উন্মাদ হয়েই গেছে?
হবে কিছু একটা। অস্থির ভাবে ঘরে ঢুকে হিমু বলল, ‘তুমি মাকে চিঠি দিয়েছ?’
আমি বললাম, ‘পড়েছ চিঠিটা?’
হিমু বলল, ‘না। তুমি এরকম করলে কেন?’
আমি বললাম, ‘আমার আর কিছু করার নেই বলে’।
হিমু কেমন উদ্ভ্রান্তের মতো বলল, ‘তুমি সত্যিই চাও না আমি এখানে থাকি?’
আমি হাসিমুখে বললাম, ‘তাই চাই। এসো না’।
হিমু থমকে গেল। বড় বড় চোখ করে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল। অনেকক্ষণ পর বলল, ‘ঠিক আছে। আমি আর আসব না তবে’।
আমি বললাম, ‘এসো না। চাকরি পাবার চেষ্টা করো। যে ভালোবাসে না, তার কাছে এভাবে আসতে নেই। নিজেই ছোট হয়ে যাবে’।
হিমু মাথা নাড়িয়ে বলল, ‘ঠিক আছে। তাহলে তাই হবে। আমি আর আসব না। ভালোবাসো না যখন এসে কী করব? ঠিকই তো’।
হিমু ধীর পায়ে বেরিয়ে গেল। আমি ভাবতে পারিনি হিমু চলে যাবে। আবার আসবে? নাও আসতে পারে। জীবনের তো কোনও ঠিক নেই। কোনও কিছুরই ঠিক নেই।
আমি যেমন মাঝে মাঝে ভাবতে বসি আকাশ কুসুম। এই যে এত বড় একটা পৃথিবী, সূর্যের চারদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে আর বাকি গ্রহগুলোর মতো, এত এত গ্রহগুলোর মধ্যে খালি পৃথিবীতেই মানুষ আছে। এখনও অবধি অন্য কোনও গ্রহে মানুষ আছে নাকি তার কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তা এই এত গ্রহের মধ্যে মাত্র একটা গ্রহতে মানুষ আছে, আর সেই মানুষের আবার কত কায়দা। মানুষ ঠিক করে দেবে কে কী করবে, কে করবে না, কে কোন পোশাক পরবে, কোন ধর্ম ভালো, কোনটা খারাপ, কে কোন দেশে যাবে, কে যেতে পারবে না।
এত বড় বড় গ্রহের মধ্যে ছোট্ট একটা গ্রহ, সেখানে আবার তাদের কত দাবিদাওয়া। এই যে নিশির বরকে নিশির বাবা মেনে নিচ্ছে না, বৃহস্পতি গ্রহের বা তার উপগ্রহগুলোর কি তাতে কিছু যায় আসে? নাকি সূর্য থেকে যে আলোটা এসে এই গ্রহে পড়ছে, তাতে কারো কিছু যায় আসে? নিজেরাই নিজেদের মতো কত কিছু ঠিক করে বসে আছে সব। কাল একটা বড় পাথর এসে লাগলে গোটা পৃথিবীটাই নষ্ট হয়ে যাবে। তাতে এই মহাবিশ্বের কার কী যায় আসবে?
কে জানে! এত ভেবে কী হবে? আমার ছোট মাথা। বেশি ভাবলে সব ওলট-পালট হয়ে যায়। বেশি ভাবতে চাই না এই জন্যই।
মা এল কিছুক্ষণ পরে। আমাকে দেখে বলল, ‘তোর বাবার নাকি জ্বর হয়েছে। খোঁজ নিস তো। দোকানের লোকটার সঙ্গে দেখা হয়েছিল। তোর বাবার তো আবার জ্বর এলে একবারে সারে না। দেখিস’।
আমি ভীষণ রেগে গেলাম হঠাৎ করে, ‘তাতে তোমার কী?’
জোঁকের মুখে নুন পড়ার মতো মা কেমন মিইয়ে গেল, সোফায় বসে পড়ে বলল, ‘ও হ্যাঁ। তাও তো ঠিক’।
মাকে ওভাবে দেখে আমার ভীষণ কান্না পেল। আমি আমার ঘরে চলে গেলাম। মার সামনে কাঁদব না।
৪৮
মার কাছে আমি বেশিক্ষণ থাকি না কোনওদিন। মাকে দেখেছি বাবা চলে যাবার পরে স্বাভাবিক মুখে ঘরের কাজ করে যাচ্ছে। রান্না করছে, আমাকে স্কুলে পাঠাচ্ছে, আবার নিজের স্কুলের জন্য রেডি হচ্ছে। আমি যদি আগে ফিরে আসি, সে কথা মাথায় রেখে আমি কী খাব, তার ব্যবস্থাও করে গেছে। ছোটখাটো খুঁটিনাটি মার ঠিক মাথায় থাকবে। শীতকালে কখন গরম জল লাগবে, স্কুল বা কলেজ যাবার আগে কখন ব্যাগে জলের বোতল বা টিফিন দিয়ে দিতে হবে, সব একবারে নখদর্পণে। এতকিছু মাথায় রেখে এত কিছু সামলানো বড় সোজা কাজ না। মা পারে। আমি পারব না আমি জানি। আমি তো কিছুই পারি না। সারাদিন শুধু শুয়ে থাকতে জানি। শুয়ে থাকাটা কোনও কাজের কথা না। কাজ শেখা দরকার। যদি মা আমাকে অনেক কাজ শিখিয়েছে, তবু মনে হয় আমি এখনও কিছুই শিখিনি।
মা আছে জানি। কখনও ভেবে দেখিনি, মা না থাকলে কী হবে। হঠাৎ করে আমার সেটাই মনে হল। বাবার শরীর খারাপের কথায় যতটা না কষ্ট হল, মার ওরকম চুপ করে যাওয়াটা যেন বুকে এসে বিঁধল।
আমি অনেকক্ষণ চুপ করে কেঁদে গেলাম। কাঁদা ছাড়া আর কীই বা করতে পারি?
চোখের জলের সমস্যা হল, এলে আসতেই থাকে। বুক হু-হু করে, কষ্টে সব ফেটে যেতে থাকে। অনেকটা সময় পরে স্বাভাবিক হলাম। সোজা হয়ে বসলাম। ধীরপায়ে মার ঘরে গিয়ে দেখলাম মা চুপ করে শুয়ে আছে। আমি গিয়ে মার পাশে শুয়ে বললাম, ‘তুমি কি চাইছ আমি বাবাকে দেখে আসি?’
মা অন্যমনস্ক মুখে বলল, ‘যাবি? ইচ্ছে হলে যাস’।
আমি বললাম, ‘ঠিক আছে। দেখা যাবে। আজ হিমু এসেছিল’।
মা বলল, ‘সে আর নতুন কী? রোজই তো আসে’।
আমি বললাম, ‘না, ও বলেছে আর আসবে না। এবারেই শেষ’।
মা বলল, ‘ভালো। না এলেই ভালো। ওর জন্যই ভালো’।
আমি বললাম, ‘আমার মনে হয় আর আসবে না। এরকম ওকে আমি কোনওদিন দেখিনি’।
মা বলল, ‘তোর খারাপ লাগছে?’
আমি বললাম, ‘নাহ। না এলেই ভালো’।
মা বলল, ‘ঠিক আছে। আমি উকিলের সঙ্গে কথা বলেছি। মনে হয় বেশি ঝামেলা হবে না। হয়ে যাবে ডিভোর্স’।
আমি বললাম, ‘আমি আর বিয়ে করব না’।
মা বলল, ‘অনেক সময় আছে। এখনই এইসব নিয়ে ফাইনাল কিছু ভাবিস না’।
আমি মাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকলাম। কী শান্তি হয়! এর থেকে শান্তি মনে হয় পৃথিবীতে আর কোনও কিছুতে হয় না। আমার সব চিন্তা মাকে দিয়ে কেমন নিশ্চিন্তে থাকা যায়।
কিন্তু মা কাকে মার চিন্তাটা দেয়? কেউ নেই তো। আমি বললাম, ‘মা’।
মা বলল, ‘হু’।
বললাম, ‘তুমি খুব চিন্তায় পড়লে কাকে বলো? আমি যেমন তোমাকে বলি। তুমি কাকে বলো?’
আমি বললাম, ‘সমস্যা হয় না? দম আটকে আসে না?’
মা বলল, ‘তোর কী হয়েছে রে? তুই কি কিছু চেপে যাচ্ছিস?’
আমি বললাম, ‘না। আমার কিছু হয়নি। তুমি বলো না। তোমার দম আটকে আসে না?’
মা বলল, ‘ভাবিনি। ভাবলে আসত। অত ভেবে কী হবে? ভাবলে কি কিছু হত?’
আমি বললাম, ‘হুঁ। ভাবলে বাবা তো ফিরে আসত না’।
মা বলল, ‘ওরকম ভাবিস না। মন খারাপ হবে’।
আমি বললাম, ‘তুমি ভাবো না? জেলেও দেওয়া যেত বাবাকে।’
মা বলল, ‘না। ভাবতে নেই। যে যার সঙ্গে ভালো থাকে, থাকতে দে। সেটাই ভালো। জোর করে কোনও কিছু আটকানো উচিত না’।
আমি বললাম, ‘তুমি বিয়ে করতে পারতে আরেকটা’।
মা বলল, ‘তোর কী হয়েছে? এসব কী বলছিস? আমি ওসব কোনওদিন ভেবেছি?’
আমি বললাম, ‘বাবা তো ভেবেছে। তাহলে?’
মা বলল, ‘ছেলেদের সমস্যা হয়। হয়তো সব ছেলেদের না। তোর বাবারই, বা আর কারো কারো। এরা একজনে সন্তুষ্ট হয় না। যার জন্য সব করবে ভাবে, যাকে রানি করে রাখবে বলে, দু’বছর পেরোলে যখন দেখে সেই মেয়েটা হাতের কাছেই আছে, তাকে ছোঁয়া যায়, যা খুশি করা যায়, বলা যায়, তখন থেকেই তাদের হাঁফ ধরতে শুরু করে দেয়’।
আমি বললাম, ‘আমি কী করে ছেলেদের বিশ্বাস করব মা?’
মা উত্তর দিল না। আমি চুপ করে শুয়ে রইলাম।
৪৯
সব পাড়াতেই নাকি একজন করে পাগল থাকে।
সে পাগল নিজের মনে ঘোরে, হাসে, খেলে, লাফায়। কেউ কেউ তেড়েও যায়। এক মনে কথা বলতে থাকে।
কখনও মানুষটা জন্ম থেকেই পাগল হয়। আবার কেউ কেউ হয়ে
যায়।
আমি ভেবেছিলাম আমাদের পাড়ায় আমার মধ্যেই সেসব লক্ষণ
যাবে।
ভেতরে ভেতরে অনেকখানি হলেও পাড়ার লোক অতটা দেখেনি। কিন্তু চোখের সামনে আমি একজনকে পাগল হয়ে যেতে দেখলাম।
নিশি।
সবটাই হঠাৎ করে হল।
সন্ধেবেলা। আমি আমার ঘরে ছিলাম। কী করব বুঝতে না পেরে অনেক দিন পরে পড়ার বই নিয়ে বসেছিলাম। আমার বই পড়তে ভালো লাগে। কেন এতদিন পড়িনি সেটাই বুঝতে পারছিলাম না। বইয়ের থেকে বড় বন্ধু বোধ হয় আর কিছু হয় না।
জীবনে একবারে ‘কিছু না’ থেকে খুব উপরে যাবার অনেকরকম মাধ্যম থাকতে পারে, কিন্তু শুধু ভালোবেসে পড়ার বই পড়লে যে কেউ অনেক দূরে যেতে পারে।
এ কথা আমার না। আমার বাবার। বাবা মাঝে মাঝে অনেক কথাই বলত যেগুলো আমি কোনওদিন ভুলতে পারব না।
যাই হোক, যেটা বলছিলাম। ঘরে বসে পড়ছিলাম আমি। হঠাৎ করে একটা তুমুল হাসির শব্দ শোনা গেল। মনে হল যেন হঠাৎ করে কোনও পেত্নি চিৎকার করে উঠেছে। দৌড়ে বাড়ির বাইরে গিয়ে দেখছি নিশি সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে ওদের আর আমাদের বাড়ির মাঝের জায়গাটায় লাফালাফি আর চিৎকার জুড়েছে। নিশির বাবা ওর গায়ে শাড়ি দিচ্ছে আর নিশি সব শাড়ি ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছে। কিছুক্ষণ পর শাড়িগুলো টেনে টেনে ছিঁড়তে শুরু করল।
আমি ভয় পেয়ে গেলাম। এতটাই ভয় পেয়ে গেলাম যে নিশিকে ডাকার সাহসটুকু পর্যন্ত পেলাম না।
নিশি অনেকক্ষণ ধরে চিৎকার করল, নিজেই নিজের বুকে চাপড় মারতে লাগল, প্রায় আধঘণ্টা তাণ্ডব চালানোর পর একটা ছেঁড়া শাড়ি গায়ে দিয়ে মেঝেতে গড়াগড়ি দিতে শুরু করল।
নিশির বাবা আমাকে বললেন, ‘দেখ না, কী শুরু করেছে। ঘরের ভেতর ছিল। বাইরে থেকে তো আটকেই রেখেছিলাম। হঠাৎ দেখি দরজায় বাড়ি মারার শব্দ। দরজা খুলে দেখছি এরকম করছে’।
আমি এবার একটু সাহস করে এগিয়ে গিয়ে ডাকলাম, ‘এই নিশি! কীরে, এরকম করছিস কেন?’
নিশি জোরে চিৎকার করে হেসে উঠল। আমি যা বললাম, সেটাই বলতে শুরু করল, ‘এই নিশি, কীরে, এরকম করছিস কেন?’
কথাগুলো বলতে বলতে নিশি উঠে দাঁড়িয়ে লাফাতে শুরু করল আবার। নিশির বাবা বলল, ‘পাগল হয়ে গেলি নাকি?’
নিশি আমাকে চমকে দিয়ে দৌড়ে গিয়ে ওর বাবার গায়ে লাথি মারল। নিশির বাবা প্রস্তুত ছিলেন না। মাটিতে পড়ে গেলেন।
নিশি একজায়গায় দাঁড়িয়ে লাফাতে শুরু করল। যেন ওর ভর হয়েছে।
ছোটবেলায় আমাদের পাড়ার মন্দিরে একজনের উপর ভর হত। মাথা ফাথা ঘুরিয়ে কী সব করত। অন্য সময় বাজারে সবজি বিক্রি করত সেই মাসি। শুধু অমাবস্যা হলেই এসব করত। সবাই ভেবেছিল সত্যিই ঠাকুরের ভর হয়। একদিন ধরা পড়ে গেল।
কয়েকজন তক্কে তক্কে ছিল। ভর হবার পর লুকিয়ে লুকিয়ে মন্দিরের পেছনের ঘরে ঘাপটি মেরে সে মন্দিরের লোকের সঙ্গে দর কষাকষি শুনে ফেলেছিল। তারপর বেচারির খুব খারাপ হাল হয়েছিল। মাসি ভাড়া বাড়িতে থাকত। সে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হল।
অন্ধবিশ্বাস আর যুক্তির লড়াই আজ থেকে না। যাকে দেখে মনে হবে ভর হয়েছে, যাকে দেখে মনে হবে স্বয়ং ঈশ্বর ওর মধ্যে অধিষ্ঠান করেছে, যুক্তি বুঝিয়ে দেবে ব্যাপারটা সব সময় তা নয়। অনেক ভগবান সেজে বসে থাকা মানুষের থেকে বড় অপরাধী খুব কম আছে এই পৃথিবীতে। ভালো ভালো কথার আড়ালেই লুকিয়ে থাকে আসল শয়তানেরা।
মাও ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিল। নিশির গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে ঠান্ডা করল।
প্রথমে ভাবা গেছিল, স্নায়ুর উত্তেজনায় নিশি এসব করছে। বাস্তবে
দেখা গেল তা হয়নি। নিশি সত্যিই পাগল হয়ে গেল। ওর বাচ্চাটা সারাক্ষণ কেঁদে যাচ্ছে, নিশির সেদিকে ভ্রুক্ষেপই নেই। কেউ আর ওকে সামলাতে পারছিল না।
শেষমেশ হাসপাতাল থেকে নার্স ডেকে ইনজেকশন দিয়ে নিশিকে ঘুম পাড়িয়ে দিতে হল।
সে রাতে ভেবেছিলাম সকালে উঠে হয়তো দেখব নিশি ঠিক হয়ে গেছে, বাস্তবে দেখা গেল তা হয়নি। সকালে উঠে উলোঝুলো মুখে মাটি মেখে বাগানে বসে রইল বিকেল অবধি। ওর বাবা লাঠি দিয়ে মারল। নিশি অবাক চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে জোরে জোরে হাসতে থাকল।
প্রবল চাপ মানুষকে কী থেকে কী করতে পারে, নিশিকে না দেখলে জানতেই পারতাম না। একটা সুস্থ স্বাভাবিক মেয়ে চোখের সামনে পাগল হয়ে গেল।
