৬৫
হিমুর মধ্যে একটা অদ্ভুত ব্যাপার আছে। হিমু যখন যেটাতে আটকে পড়ে, সেখান থেকে আর বেরোতে পারে না। আমার থেকে বেরিয়েছিল, সাফল্যের সঙ্গে চাকরি করছে, সবই ঠিক আছে, কিন্তু এত কিছু বলার পরেও যে হিমু যাবে না, আমি ভাবতে পারিনি।
আমি বললাম, ‘ভালো লাগছে। এসো’।
হিমু ঘরের ভেতরে এসে বসল। মা হিমুকে জিগ্যেস করল, ‘তুমি কি করবে? বাড়ি যাবে, না এখান থেকেই বেরিয়ে যাবে?’
হিমু বলল, ‘ভুবনেশ্বর থেকে যাবার কথা। আর বাড়ি ফিরব না। নীপা গেলে ওর টিকেট করিয়ে ফেলতাম। আমি যা বুঝলাম, ওর যাবার তেমন ইচ্ছে নেই। ঠিক আছে, অসুবিধে নেই। ও যদি পরে মনে করে, যেতে পারে’।
আমি বললাম, ‘তুমি আমার মধ্যে কী দেখলে বলো তো? এরকম নাছোড়বান্দা হয়ে গেছ কেন?’
হিমু বলল, ‘কিছু দেখিনি। আমার মধ্যে একটা অপরাধবোধ কাজ করে’।
আমি বললাম, ‘অপরাধবোধের কিছু নেই। তুমি যা করেছ, তার অনেক বেশি জ্বালাতন আমি করেছি। এখন তুমি নিশ্চিন্তে বিয়েটা ভেঙে দিয়ে একটা নতুন সম্পর্কে ঢুকতে পারো। পৃথিবীতে অনেক মেয়ে আছে। যে কাউকে বিয়ে করে ভালো থাকো’।
হিমু অস্বস্তির সঙ্গে আমার মার দিকে একবার তাকিয়ে আমাকে বলল, ‘থাক, এসব নিয়ে পরে কথা বলব’।
মা উঠে দাঁড়াল, ‘আমি একটু হেঁটে আসি বরং। তোরা কথা বল। কিছু খাজা কিনে আমি, পাড়ার লোকেদের দেওয়া যাবে’।
আমি মাথা নাড়লাম। দিদা বলল, ‘ওই দেখো, মাগি বন্ধ ঘরে লাগাইতে চায়’।
আমি দিদার কথা কানে নিলাম না। মা চলে গেলে বললাম, ‘বলো কী বলছিলে’।
হিমু বলল, ‘আমি অন্য কারো সঙ্গে থাকতে পারব না। আমার মাথার মধ্যে তোমার প্রোগ্রাম চলছে। অন্য কিছু নিয়ে আমি ভাবতেই পারব না’।
আমি বললাম, ‘চেষ্টা করো। আমি কিছু বইয়ের নাম বলতে পারি। সেগুলো পড়ো। দেখবে পারবে। মনের অস্থিরতা অনেক কমবে’।
হিমু হাসল, ‘মনের অস্থিরতা আমার অনেক আগেই কমে গেছে। ওটা কমানোর জন্য আমাকে কোনও বই পড়তে হবে না। কিন্তু আমি স্থির মনেও তোমাকেই ভালোবাসি। সে ভালোবাসা সরিয়ে দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব না’।
আমি বললাম, ‘আর আমি অন্য কাউকে বিয়ে করলে?’
হিমু বলল, ‘তখন তো পারতেই হবে’।
আমি হেসে ফেললাম, ‘তাহলে তো অন্য কাউকে বিয়ে করতেই হচ্ছে যাতে আমার ভূত তোমার মাথা থেকে নামে’।
হিমু বলল, ‘এসব কোরো না। আমি যদি তাকে মেরে ফেলি?’
দিদা বলল, ‘ওই দেখ ছেমরি, তোর ভায়রা ভাই। তোর মতো মারার কথা ভাবে। দ্যাখছস?’
আমি বললাম, ‘আমি অনেকবার বলেছি, আবারও বলছি। যে লোককে ভালোবাসি না, তার সঙ্গে থাকতে পারব না’।
হিমু মাথা নাড়ল, ‘ঠিক আছে। তাই করো। তোমাকে যেতে হবে না। তোমরা কাল ফিরবে। আমি কাল অবধি তোমাদের সঙ্গে থেকে বেরিয়ে যাব। আর জ্বালাব না তোমাকে। ঠিক আছে?’
আমি বললাম, ‘তাই করো। আমাকে বার বার এক কথা বলে যেও না, আমাকে কেউ এক কথা বার বার বললে আমার মন বিদ্রোহ করে ওঠে। হয়তো আমি তোমার সঙ্গে যেতাম, এতবার ন্যাগ করে গেছ, এখন আর কিছুতেই যেতে ইচ্ছে করছে না’।
হিমু বলল, ‘আর করব না। আজ চিলকা ঘুরে আসি চলো’। পরক্ষণেই বলল, ‘না থাক। তোমার শরীর ঠিক নেই’।
আমি বললাম, ‘শরীর ঠিক আছে। চলো। ঘুরে আসি’।
হিমু উদ্যোগী ছেলে। কিছুক্ষণের মধ্যে গাড়ি ঠিক করে ফেলল। মার কী হল জানি না, বলল, ‘তোরা যা। আমি যাব না’।
আমি জোর করলাম না। হিমু একদিন পরে চলে যাবে, সত্যি যদি ওর কিছু বলার থাকে, মা থাকলে ওর বলতে অসুবিধা হবে।
হিমু গাড়ির ব্যবস্থা করল। চিলকা যে পুরী থেকে বেশ খানিকটা দূরে, আমি জানতাম না। গোটা রাস্তায় হিমু খুব বেশি কথা বলল না। চিলকা পৌঁছে দেখি চারদিকে শুধু জল আর জল। হিমু আমাদের জন্য একটা গোটা নৌকা নিয়ে নিল। মাঝি একদিকে, হিমু আমাকে নিয়ে আরেকদিকে বসল।
চিলকা ম্যাপ পয়েন্টিং করেছিলাম, হ্রদ, সবই জানতাম, কিন্তু চারদিকে যে এত জলের মাঝখানে নৌকোয় থাকতে হবে বুঝিনি। আমার অস্বস্তি শুরু হল।
শুধু মনে হতে লাগল, হিমু যদি আমার উপর সমস্ত প্রতিশোধ নিয়ে এখানেই আমাকে মেরে জলে ফেলে দেয়, তাহলে কী হবে?
৬৬
কয়েকটা নৌকো দূর থেকে চলে যাচ্ছে, আমার মাঝে মাঝে ইচ্ছে করছে চিৎকার করে ওদের ডাকি। এরকম কেন মনে হচ্ছে জানি না।
হিমু তো কোনওদিন আমার কোনও ক্ষতি করতে চেষ্টা করেনি। ভালোবেসেছে হয়তো, সব সময় আমার কাছে ছুটে এসেছে। তবু এরকম অদ্ভুত চিন্তা আমায় কেন গ্রাস করে নিচ্ছিল আমি নিজেই বুঝতে পারছিলাম না।
হিমু বলল, ‘এখানে নাকি ডলফিন থাকে, জানো। এই মাঝিরা বলে ডলফিন আছে। হঠাৎ করে বলবে ওই দেখুন ডলফিন, আসলে কেউ কিচ্ছু দেখতে পায় না’।
আমি বললাম, ‘আমার খুব অস্বস্তি হচ্ছে হিমু। আর ঘুরব না। ফিরে যাই?’
হিমু অবাক হয়ে গেল, ‘কেন বলো তো? কী সমস্যা হচ্ছে তোমার?’
আমি বললাম, ‘জানি না। অস্বস্তি হচ্ছে। মনে হচ্ছে যদি ডুবে যাই? আমি সাঁতার জানি না’।
হিমু বলল, ‘আমি জানি। খুব ভালো সাঁতার জানি। এই নৌকায় লাইফ বোটও আছে। একদম এসব নিয়ে ভেবো না’।
আমি চুপ করে গেলাম। অনেকগুলো পাখি ঘুরে বেড়াচ্ছে। বকই বেশি। জলেও বসে আছে।
হিমু বলল, ‘আমি তোমাকে অনেক জ্বালিয়েছি নীপা। এবার সত্যি-সত্যিই হয়তো চলে যাব। একবার দেশের বাইরে চলে গেলে আর ফেরা হয় না, আমি তো আমার সিনিয়রদের দেখেছি। অনেকেই আর ফেরেনি। তোমার জন্যই হয়তো আমি ফিরে ফিরে আসব’।
আমি বললাম, ‘কেন আটকে আছ তুমি? একটা ভালো মেয়ে দেখে বিয়ে করে নাও। অবশ্য ওসব দেশে মেয়ের অভাব নেই। ওখানেই বিয়ে করে নিতে পারবে’।
হিমু বলল, ‘আমি তোমার সঙ্গে থাকতে চেয়েছিলাম’।
আমি কথা ঘোরাতে চাইলাম, ‘খাজা খেতে ইচ্ছে করছে এখন। কী অদ্ভুত’।
হিমু বলল, ‘পুরী গিয়েই কিনে দেব। খেও ভালো করে’।
আমি বললাম, ‘ঠিক আছে’।
পাশ দিয়ে একটা নৌকো গেল। অনেকগুলো বন্ধু এসেছে, হইহই করতে করতে চলে গেল। জলে প্রথম দিকে একরকম লাগে, পরে একটা সময় ভীষণ একঘেয়ে লাগতে শুরু করে।
এত বড় হ্রদের মধ্যে নৌকোয় বসে আমার একটুও ভালো লাগছিল না।
হিমু বুঝল সেটা। মাঝিকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে বলল। মাঝি ঝিনুক দেখাবে বলল। হিমু বারণ করল। মাঝি শুনল না। নৌকো দাঁড় করাতেই একটা ছেলে এসে ঝিনুক থেকে মুক্তো বের করে দেখিয়ে আমাদের মুগ্ধ করতে চাইল। আমি হলাম না, হিমু হল। ফস করে একগাদা টাকা দিয়ে একটা মুক্তো কিনে আমাকে বলল, ‘এই নাও’।
আমি রেগে গেলাম, ‘তুমি কি গাধা?’
হিমু থতমত হয়ে বলল, ‘কেন? কী হল?’
আমি বললাম, ‘এগুলো ঝুটো মুক্তো। তুমি আমাকে একবার জিগ্যেস করে টাকা দেবে তো!’
হিমু বলল, ‘হোক না। রাখো’।
আমি বললাম, ‘কেন রাখব? অদ্ভুত ব্যাপার। এগুলো আমি রাখব না’।
হিমু বলল, ‘আমি তো চলেই যাব। আর বেশি যন্ত্রণা দেব না তোমায়। সেটা ভেবে অন্তত নাও’।
আমি আর কী বলব। ব্যাগে রাখলাম। নৌকো আবার ছাড়ল। হিমুকে বললাম, ‘এভাবে যেখানে সেখানে মানিব্যাগ থেকে টাকা বের করবে না। ঠকে যাবে’।
হিমু বলল, ‘ঠিক আছে। মাথায় রাখব’।
বাকি সময়টা চুপ করে বসে রইলাম। একসময় নৌকো আবার তীরে ভিড়ল। নৌকো থেকে নেমে গাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করলাম।
হিমু বলল, ‘এখানে খুব সুন্দর মাছ ভাজা পাওয়া যায়। একবারে তাজা মাছ। খাবে?’
আমি বললাম, ‘তা খাওয়া যেতে পারে’।
একটা ঘুপচিমতো রেস্তোরাঁয় বড় বড় চিংড়ি মাছ ভাজা, পমফ্রেট মাছ খেলাম। সত্যিই তাজা মাছগুলো। খেতে খুব ভালো লাগল। হিমু শুনে খুশি হয়ে বলল, ‘আর খাবে?’
আমি আঁতকে উঠে বললাম, ‘পাগল! এটুকুই ঠিক আছে। চলো ফেরা যাক’।
দুজনে গাড়িতে গিয়ে বসলাম। গাড়ি একটু চলতেই হিমুর ফোন বাজতে শুরু করল। হিমু ফোন ধরামাত্র আর্তনাদ করে উঠল, ‘কী?’
হিমু কাঁপছিল। আমি বললাম, ‘কী হয়েছে?’
হিমুর দু চোখ জলে ভিজে উঠল, ‘একটু আগে মা চলে গেল। হার্ট অ্যাটাক। আমাকে ফোন করছিল, নট রিচেবল বলছিল’।
জীবনে অনেকরকম অস্বস্তিকর পরিবেশে পড়েছি আমি। কিন্তু এমন পরিস্থিতিতে কোনওদিন পড়তে হবে ভাবতেও পারিনি।
৬৭
মানুষের কতরকম রূপ হয়?
যে ছেলেটা একটু আগেও আমার সঙ্গে মহানন্দে ঘুরছিল, সেই ছেলেটাই কাঁদতে শুরু করল। বাচ্চা ছেলের মতো কান্না। প্রথম দিন স্কুলে বাবা আমাকে স্কুলের বাউন্ডারিতে ঢুকিয়ে দিয়েছে, খানিকটা গিয়ে আমি দেখলাম, বাবা নেই। সে কী মারাত্মক নিরাপত্তাহীন অবস্থা, কী কান্নাটাই না কেঁদেছিলাম!
হিমুকে কাঁদতে দেখে আমার সেই কান্নার কথা মনে পড়ে গেল।
অনেকভাবে ওকে শান্ত করতে গিয়েও পারলাম না। হোটেলে ফিরে ঠিক হল আমরা হিমুর সঙ্গে তখনই ফিরব। একটা গাড়ি ঠিক করা হল।
হিমু অনেক কেঁদে চুপ করে গেল একটা সময়ে। পাথরের মতো মুখ করে বসে রইল গোটা রাস্তা। কিছু খেলও না।
ওর মায়ের মৃতদেহ রাখা ছিল বাড়ির উঠোনে। হিমু ছুটে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করল।
দিদা বলল, ‘দেখ ছেমরি, তুই মার থেকে ছেলেটাকে আলাদা কইরা দিছিলি। ছ্যামরাটা মারে ছাইড়া তোর কাছে আইছিল। মারে কয় নাই পুরীতে ছিল। তোর জন্যই এইসব হইল’।
আমি কেঁপে উঠলাম। দিদা ঠিক বলেছে। হিমু এ সমস্ত কিছুর জন্য আমাকে দায়ী করতে পারে। ওর মার সঙ্গে আমি খুব খারাপ ব্যবহারই তো করেছি। ওর আত্মীয়স্বজন যারা এসেছে, সবাই আমার দিকে বাঁকা চোখেই তাকাচ্ছে।
আমি মাকে বললাম, ‘বাড়ি চলো’।
মা বুঝল, ‘চলো। হিমুকে বলে আয়’।
আমি বললাম, ‘থাক। পরে আসব। চলো’।
হিমুর এক কাকিমা আমাকে যেতে দেখেই দাঁড় করাল, ‘কোথায় যাচ্ছ?’
আমি বললাম, ‘বাড়ি যাচ্ছি’।
হিমুর কাকিমা চিৎকার করে চিবিয়ে চিবিয়ে বলতে শুরু করল, ‘একটা মেয়ে কী করে একটা সংসার নষ্ট করে দিতে পারে, এই মেয়েকে দেখলে বোঝা যায়। শেষ করে দিল আমাদের পরিবারটাকে। দিদি চলে গেল, অথচ সবাই দেখো, এর চোখে একফোঁটা জল নেই। অপয়া মেয়ে একটা। অসভ্য বেহায়া কোথাকার। ছি!’
পাড়ার লোকেরাও আজেবাজে কথা বলতে শুরু করল। আমি একটুও দাঁড়ালাম না। চোখ মুখ শক্ত করে মাকে নিয়ে ওদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে রিকশা নিয়ে আমাদের বাড়ি এলাম।
ঘরে ঢুকে কাঁদতে শুরু করলাম। মা বাধা দিল না। অনেকক্ষণ ধরে শুধু কেঁদেই গেলাম।
হঠাৎ করে নিশির কান্নার শব্দও শুনতে পেলাম। কী বাজেভাবে কাঁদছে। আমি চুপ করে গেলাম। নিশির কান্নাটা কেমন যেন বুকে এসে লাগছে।
বাড়িটা দিন দিন কেমন নিরানন্দ ভবন হয়ে উঠল। দিদা মরল, আমি শ্বশুরবাড়ি থেকে চলে এলাম, নিশি পাগল হয়ে গেল, বাবা চলে গেল, হিমুর মা মারা গেল—সব পর পর মনে পড়তে শুরু করল। অনেকক্ষণ পর মা চা নিয়ে এসে বলল, ‘চা খা’।
আমি চুপ করে চায়ের কাপে চুমুক দিতে শুরু করলাম।
মা শান্ত গলায় বলল, ‘যা হয়েছে, তার জন্য নিজেকে দোষ দিবি না। হিমুর মা অসভ্যতা করেছিলেন, তুই উত্তর দিয়েছিলি। এখানে তোর কোনও দোষ নেই। ওর ছেলেকেও তুই ওর থেকে দূর করিসনি। ওর ছেলে নিজে বারবার এ বাড়িতে এসেছে। আমি তোর মা, আমি জানি, তুই কোনও দোষ করিসনি’।
এ কথাটা আমাকে যে কতটা জোর দিল, তা আমি জানি। মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, ‘কোনও মেয়েকে শ্বশুরবাড়িতে হ্যারাস করলে তুই যা করেছিস, তাই করা উচিত। একটুও ভুল কিছু করিসনি। তুই পড়াশুনা কর, চাকরি কর, নিজের পায়ে দাঁড়া, তোর কাউকে লাগবে না’।
আমি চুপ করে রইলাম। মা বলল, ‘হিমুর বাড়ির লোক বা পাড়ার লোক কী বলেছে, মাথায় নিতে হবে না। তুই তোর মতো করে জীবন কাটাবি। ঠিক আছে?’
আমি মাথা নাড়লাম।
মা বলল, ‘লোকে কী ভাববে, সেটা নিয়েই সারাক্ষণ ভেবে গেলে এ জন্মে সুখে থাকতে পারবি না। তুই নিজেকে ভালো রাখবি।’
আমি আবার মাথা নাড়লাম।
৬৮
অনেকটা রাস্তা আমরা গাড়ি করে এসেছি। এতটা রাস্তা গাড়িতে চড়া আমার কোনওকালেই অভ্যাস নেই। জ্বরটাও যেন শরীরের ভেতরেই লুকিয়ে ছিল। আবার জ্বর এল। জ্বরের ঘোরে ছটফট করছি। চারদিক অস্পষ্ট হয়ে আসছে, অসহ্য মাথাব্যথা। এত শরীর খারাপ আমার অনেক দিন হয়নি।
মা ডাক্তারবাবুকে নিয়ে এল, কড়া কড়া ওষুধ দেওয়া হল। জ্বর সারতে আমার দিন সাতেক লাগল। মা স্কুল ছুটি নিয়ে সারাক্ষণ আমার মাথার কাছে বসে রইল।
আমি কাঁদি। মা মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে, ‘কী হয়েছে মা?’
আমি আরও কাঁদি।
এভাবেই আটদিনের মাথায় সকালে ঘুম থেকে উঠে বসে দেখলাম শরীর সুস্থ লাগছে।
মা আমার পাশেই ঘুমাচ্ছিল। জড়িয়ে ধরে রইলাম। মা ঘুম ভেঙে উঠে বসল, ‘কীরে? ভালো লাগছে?’
আমি বললাম, ‘হ্যাঁ। এর মধ্যে হিমু এসেছিল?’
মা বলল, ‘না’।
আমি ফ্যাকাসে হলাম। মা বলল, ‘হিমুকে ওর মা বেঁচে থেকে ভাঙতে না পারলেও, এখন খুব সহজেই ভেঙে ফেলবে। ওর ধারণা হবে ওর মার মৃত্যুর জন্য তুই দায়ী। সম্ভবত ও আর আসবে না’।
আমি বললাম, ‘আমারও তাই মনে হয়’।
মা বলল, ‘তুই কি ওর প্রতি নরম হয়েছিলি? ওর সঙ্গে যেতে চাস?’
আমি হেসে ফেললাম, ‘না’।
মা বলল, ‘এখনও না?’
আমি বললাম, ‘না। আমি কোনওকালেই যেতে চাইনি। এখনও চাই না। তবে ও অনেকবার এসেছে। আমার খেয়াল রেখেছে, ওর যে ভুল ধারণাটা তৈরি হবে, সেটা ভেবে আমার অস্বস্তি হচ্ছে’।
মা বলল, ‘পৃথিবীতে সবাইকে একসঙ্গে কোনওদিন খুশি করতে পারবি না। সবাইকে খুশি করতে গেলে নিজে অসুস্থ হয়ে পড়বি। সুতরাং ওসব চিন্তা মাথাতেই আনিস না’।
আমি বললাম, ‘আর ও এলে কী করব?’
মা বলল, ‘বলে দিস। সম্পর্কটা রেখে লাভ নেই। অহেতুক আশা বাড়িয়ে লাভ নেই ছেলেটার’।
হিমু আর এল না। পাড়ার এক কাকিমা মাকে শুনিয়ে দিয়ে গেল মার শ্রাদ্ধ সেরে হিমু দেশ ছেড়ে চলে গেছে।
আমি বুঝতে পারলাম, আমার মন পাথরের মতো হয়ে গেছে। হিমুর জন্য আমি একটুও মন খারাপ অনুভব করতে পারলাম না। আবার কলেজ যাওয়া শুরু করলাম। অনীশ আমাকে দেখে দূরে দূরে পালাতে থাকল।
তবে মেয়েদের জীবন তো! খুব বেশি দিন শান্তি থাকে না। আমি কলেজ থেকে বেরোনোর সময় লক্ষ্য করলাম একটা ছেলে আমার পিছু নিচ্ছে।
দুদিন বাইক নিয়ে পুরো বাড়ি অবধি এল।
তৃতীয় দিনের দিন কলেজ থেকে বেরিয়েছি, ছেলেটা বাইক নিয়ে একেবারে আমার পাশে বাইক দাঁড় করিয়ে বলল, ‘আপনার সঙ্গে একটু কথা বলা যাবে?’
আমি কারো সঙ্গে কথা বলতে কোনওকালেই ভয় পাই না। বললাম, ‘বলুন’।
ছেলেটা বলল, ‘আমি হিমুদের পাড়ায় থাকি’।
আমি বললাম, ‘হিমু পাঠিয়েছে?’
ছেলেটা জোরে জোরে মাথা নাড়ল, ‘না না। হিমু পাঠায়নি। আমি ওই পাড়ায় অনেক পরে এসেছি। আমি জানি হিমুদের বাড়িতে আপনার উপর অত্যাচার হয়েছিল বলে আপনি আর সংসার করেননি। পাড়ার সবাই জানে’।
আমি বললাম, ‘ভালো কথা। আর কিছু বলবেন?’
ছেলেটা বলল, ‘আমি একটা ছোটখাটো ব্যবসা করি। রোজগার খুব একটা খারাপ না। আমি যদি আপনাকে বিয়ে করতে চাই, আপনি কি রাজি হবেন?’
ছেলেটা স্পষ্টবাদী। কোনও আজেবাজে কথা নেই। সরাসরি বিয়ের কথা বলেছে।
কিন্তু আমি তো নীপবন। ভালো ছেলে হলেও আমি ওসব নিয়ে ভাবলাম না। বললাম, ‘আমি এই মুহূর্তে বিয়ের কথা ভাবিনি। আপনার সঙ্গে কথা বলে ভালো লাগল। প্লিজ আর ফলো করবেন না’।
ছেলেটা অপ্রস্তুত হয়ে হেসে বলল, ‘আমি একটু ভয় পাচ্ছিলাম আসলে। এভাবে ফলো করাটা অসভ্যতা আমি জানি। সেরকম হলে আমি আপনাদের বাড়ি এসে…’
আমি বললাম, ‘দেখুন, বিয়ে জিনিসটাই আমার কাছে আতঙ্ক। এই নিয়ে আমি ভাবছি না’।
ছেলেটা আরও কিছু কথা বলত হয়তো। হঠাৎ নায়কের মতো অনীশ বাইক নিয়ে আমাদের কাছে এসে দাঁড়িয়ে বলল, ‘কোনও প্রবলেম?’
আমি বললাম, ‘না। তোর আবার কী ধান্দা?’
ধান্দা শব্দটায় অনীশ চুপসে গেল। আমার দিকে কড়া চোখে দেখে বাইক নিয়ে বেরিয়ে গেল। আমার মাথা গরম হয়ে গেছিল। ছেলেটাকে বললাম, ‘আপনি আসুন। নিজের কাজ করুন। আমি ঠিক ম্যারেজ মেটিরিয়াল নই’।
ছেলেটা বলল, ‘হিমুর মা যেদিন মারা গেছিল সেদিন আমি ছিলাম। পাড়ার অনেকে উল্টোপাল্টা বলছিল। তবে কেউ কেউ আপনার হয়েও কথা বলল পরে। বলল মেয়েটা কী করবে? হিমুর মাকে পাড়ার সবাই চেনে। উনি ওরকমই ছিলেন’।
আমি দেখলাম অনীশ দূরে বাইকটা দাঁড় করিয়ে সিগারেট খাচ্ছে। ছেলেটাকে বললাম, ‘আমাকে বাড়িতে ড্রপ করে দেবেন?’
ছেলেটা বলল, ‘শিওর’।
আমি ছেলেটার বাইকে চাপলাম। দেখলাম অনীশ বিষ দৃষ্টিতে আমাদের দিকে চেয়ে আছে।
৬৯
যখন বাড়ির সামনে নামলাম, মা একই সময়ে স্কুল থেকে ফিরেছে।
পাড়ার সিসিটিভি কাকিমারা গুরুত্বসহকারে আমাদের দেখল, যেভাবে নিউজ রিপোর্টাররা দেখে।
আমি বাইক থেকে নেমে বললাম, ‘অনেক ধন্যবাদ আপনাকে’।
ছেলেটা হাসল, ‘ভালো থাকবেন’।
আমি ঘরে আসতে বললাম না। অনীশকে দেখামাত্র আমার বিরক্ত লাগছিল। ও নিশ্চয়ই হিমুর চলে যাবার খবরটা পেয়েছে। এখন আবার জ্বালাতন করার চেষ্টা করবে।
ঘরে ঢুকতেই মা জিগ্যেস করল, ‘তোদের কলেজে পড়ে?’
আমি বললাম, ‘না। হিমুদের পাড়ায় থাকে। বিয়ে করবে বলল’।
মা বলল, ‘এ আবার কী! কেমন ছেলে? চেনা নেই, জানা নেই, এসে বিয়ের কথা বলে দিল? এর বাইকে এলি কেন?’
আমি বললাম, ‘আমি না করে দিয়েছি। ভাবলাম, হেঁটে আসব? তার থেকে নামিয়ে দিয়ে যাক’।
মা বলল, ‘এরকম করবি না কোনওদিন। ছেলেটা প্রশ্রয় পেয়ে যাবে। ভাববে মুখে না বললেও তোর ইচ্ছে আছে। বুঝেছিস? আর হিমুদের পাড়ার ছেলে বিয়ে করতে চাইছে কেন?’
আমি ছেলেটার বলা কথাগুলো মাকে বললাম। মা বলল, ‘যতসব আমাদের কপালেই জোটে। তুই পড়াশুনায় মন দে’।
আমি বললাম, ‘তাই তো দিই’।
মা বলল, ‘তোর টিউশন লাগবে? একা একা পড়িস। এবার এভাবে একা পড়লে হবে না। পীযূষদাকে আমি সেদিন বলেছিলাম। আজ সন্ধে থেকে যেতে বলেছে। আমি তোকে নিয়ে যাব’।
আমি ঘাড় নাড়লাম, ‘ঠিক আছে’।
মা সন্ধেবেলা পীযূষজেঠুর বাড়ি নিয়ে গেল। পীযূষজেঠু পড়াশুনা নিয়ে থাকেন। পণ্ডিত মানুষ। জেঠিমা সারাক্ষণ পুজো করে যান।
আমায় কিছু প্রশ্ন করে পীযূষজেঠু হতাশ হয়ে বললেন, ‘তোকে অনেক বেশি পড়তে হবে। আমি চারটে বই দিচ্ছি। প্রশ্ন তৈরি করে দিচ্ছি। বই ঘেঁটে উত্তর লিখে নিয়ে আসবি। আগে দেখি তোর নোটস তৈরি করার ক্ষমতা কেমন। আরেকটা কথা বল, পড়তে পড়তে বিয়ে করে পালাবি না তো? তাহলে আমি খাটব না। অহেতুক খাটার কোনও মানে হয় না’।
আমি জোরে জোরে মাথা নাড়লাম, ‘না। পালাব না। পড়ব’।
পীযূষজেঠু বই দিয়ে একগাদা প্রশ্ন লিখতে দিয়ে দিলেন। জেঠিমার সঙ্গেও অনেক গল্প হল। ফেরার সময় মা বলল, ‘আমি চাই তুই পড়াশুনা নিয়ে থাক। এই জন্যই স্কুলে আমার পীযূষদার কথা মনে হল। পড়াশুনা না থাকলে জীবন কাটাতে পারবি না ঠিক করে’।
আমারও তাই মনে হচ্ছিল। ক’দিন ধরে আমি একটা কথাই ভেবে যাচ্ছিলাম। বেঁচে আছি কেন? কী করতে? পৃথিবীতে আমার বেঁচে থাকা আর না থাকার উপরে কোনও কিছু নির্ভরশীল নয়।
চোখের সামনে আমাদের পাড়াটাও কেমন নিরানন্দপুর হয়ে গেল। নিশি ফেরার পর ভেবেছিলাম, সবকিছু আবার আগের মতো হয়ে যাবে।
সেটা হল না। বই খাতা নিয়ে জানলার ধারে বসে নিশিকে দেখি। নিশি নিজের মনে হাসে, খেলে, বাচ্চাটাকে ছুঁয়েও দেখে না। আমি ডাকি, ‘অ্যাই নিশি’।
নিশি আমার ডাক কখনও শোনে। কখনও শুনতে পায় না।
লিখতে লিখতে কান্না চলে আসে। নিরাপত্তাহীনতা ঘিরে ধরে। মা চলে গেলে আমার কী হবে?
আমি কী করে সব সামলাব? অনীশ আবার কলেজে গেলে দূর থেকে দেখে।
তবে আমাকে পীযূষজেঠুর বাড়ি পাঠানোর মধ্যে যে মা অন্য কিছু ভেবে রেখেছিল, তা বুঝিনি। এক সপ্তাহ পর পড়তে গিয়ে দেখলাম জেঠুর ছেলে অনির্বাণদা পুনে থেকে ফিরেছে। জ্যেঠিমা বলল, জেঠু বাজারে গেছে। বসতে। অনির্বাণদার সঙ্গে কথা বলতে।
আমার অ্যান্টেনায় বরাবরই সিগনাল ভালো করে ধরে। আমি বুঝলাম মা কিছু একটা ভেবে আমাকে এখানে আসতে বলেছে। অনির্বাণদা ভদ্র মানুষ। রিমলেশ চশমা পরে। বই পড়ার মতো চেহারা। জেঠিমা যেতেই বললেন, ‘তোমার নামটা বেশ অদ্ভুত কিন্তু। নীপবন। ইন্টারেস্টিং’।
আমি জানতাম না এসব হবে। আমি ন্যাতা টাইপ একটা কামিজ পরে এসেছি। অত্যন্ত অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে বললাম, ‘আপনি পুনেতে থাকেন, তাই না? জেঠু বলছিল’।
অনির্বাণদা বলল, ‘হ্যাঁ। তবে কলকাতায় ট্রান্সফার হব সামনেই। তুমি গল্পের বই পড়ো?’
আমি বললাম, ‘পড়তাম। এখন পড়া হয় না’।
অনির্বাণদা বলল, ‘কেন পড়া হয় না? মোবাইল ঘাঁটো?’
আমি বললাম, ‘না। আমার মোবাইল নেই। মানে ওই স্মার্ট ফোন জিনিসটাই নেই’।
অনির্বাণদা চোখ কপালে তুলে বলল, ‘সেকি? এটা তো যুগান্তকারী ব্যাপার। এও সম্ভব এই সময়ে?’
আমি বললাম, ‘আমার মতো অনেকেরই নেই। যুগান্তকারী কিছু না’।
অনির্বাণদা বলল, ‘তোমাকে তো কাল্টিভেট করতে হচ্ছে। বই পড়ো না, নেট ঘাঁটো না, তাহলে কী করো?’
আমি বললাম, ‘পড়ার বইটুকু পড়ি। ওটুকুই। এর বেশি কিছু করা হয় না তেমন’।
অনির্বাণদা বলল, ‘তোমার একটা ডার্ক পাস্ট আছে শুনেছি’।
আমি বললাম, ‘ডার্ক ঠিক না। আমার বিয়েটা ভেঙে গেছে। কারো বিয়ে ভেঙে যাওয়াটা ডার্ক পাস্ট বলে আমার মনে হয় না’।
অনির্বাণদা বলল, ‘আমারও বিয়ে ভেঙে গেছে জানো। ডিভোর্স হয়েছে। আমার এখনও সেটা খুব একটা ভালো ব্যাপার বলে মনে হয়নি। বাজে বলেই মনে হয়েছে’।
আমি এবার বুঝলাম, মা কেন এখানে পাঠিয়েছে আমাকে। এই হিসেবটাই মিলছিল না।
