নীপাদের বাড়ি – ৩০

৩০

মানুষ কখনও স্বেচ্ছায় কষ্ট সহ্য করে। আর কখনও নিজেও জানে না কেন কষ্ট করছে।

আমার হয়েছে সে অবস্থা। হিমুর টঙের ঘরে আত্মগোপনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। হিমু সেখানে দিব্যি আছে। ঠ্যাঙের উপর ঠ্যাং তুলে ঘুমাচ্ছে। আর জ্বালা হয়েছে আমার। সিঁড়ি ভেঙে ভেঙে খাবার দিয়ে আসতে হচ্ছে।

হিমু যে বিন্দুমাত্র দুঃখে আছে, তা না। ও খুব আনন্দে আছে। আমি খাবার নিয়ে গেলেই খুশি হয়ে আমাকে বলে, ‘উফ, কী দারুণ একটা অ্যাডভেঞ্চারাস ব্যাপার হচ্ছে বলো তো?’

আমি খাবার রেখে বলি, ‘হচ্ছে না’।

হিমু বলল, ‘কেন?’

আমি বললাম, ‘কারণ তোমাকে এখানে কোনও খাটাখাটনি করতে হচ্ছে না। আমাকে করতে হচ্ছে’।

হিমু বলল, ‘কিন্তু মজা হচ্ছে নাকি বলো? আমার মা জানে আমি চেন্নাইতে। ফোন করেছিল। আমি বললাম, এখন অফিসে বেরোচ্ছি। এখানে খুব টক রান্না। মা শুনে ফুল বিশ্বাস করে নিয়েছে’।

আমি নিচে নেমে এলাম। মা রেডি হচ্ছে। স্কুল যাবে। হিমুর দেখাশোনার জন্য আমার কলেজ যাওয়া হবে না। মাথা গরম হয়ে আছে।

মা বলল, ‘ছেলেটা ঝামেলা করবে। বাড়িতে ঢুকতে দেওয়া ঠিক হয়নি’।

আমি বললাম, ‘কী করব এখন?’

মা বলল, ‘বুঝিয়ে সুঝিয়ে চেন্নাইয়েই পাঠালে ভালো। এখানে থাকাটা খুব ঝুঁকির’।

আমি বললাম, ‘ঠিকই। আমার কলেজও আছে’।

মা বলল, ‘কলেজ গেলে যাবি। বেরিয়ে যাবি বাইরে থেকে তালা দিয়ে’।

আমি বললাম, ‘থাক আজকের দিনটা। পরে দেখা যাবে’।

মা বেরিয়ে গেল। আমি নিশির কাছে গিয়ে বসলাম। নিশি রোদ পোহাচ্ছিল। আমাকে বলল, ‘মালটা সুস্থ না’।

আমি বললাম, ‘আমরা কেউ সুস্থ না। কে সুস্থ আমাদের মধ্যে?’

নিশি আকাশের দিকে তাকাল, বলল, ‘আমি না। তুই না। তোর বাবা তো নাই। তোর মা সুস্থ। মারাত্মক সুস্থ’।

আমি বললাম, ‘অতিরিক্ত সুস্থ থাকতে গিয়ে লোকে বেশি অসুস্থ হয়ে যায়। যার উপর সব সামলানোর দায় থাকে, তার সমস্যা সব থেকে বেশি’।

নিশি বলল, ‘তা ঠিক। তোর মার উপর খুব প্রেশার আসছে’।

আমি বললাম, ‘আমার মাকে আর কী কী সামলাতে হবে বল? আমার একটা ভাই হবে। মাকে সেটাও সামলাতে হবে। কী করে পারবে?’

নিশি বলল, ‘যার বাচ্চা হবে সে সামলাতে পারলে তোর মার না পারার কিছু নেই’।

আমি কী বলব? নিশি ফিসফিস করে বলল, ‘আজ রাতে আবার পালাব। মকবুল আসছে’।

আমি বললাম, ‘পালানোর কী আছে? তুই এমনিই চলে যা’।

নিশি বলল, ‘সম্ভব না। বাবাকে কথা দিয়েছিলাম আমি কোথাও যাব না’।

আমি বললাম, ‘সে তো তুই এমনিই কথার খেলাপ করবি মকবুলের সঙ্গে গেলে’।

নিশি বলল, ‘তখন বলা যাবে মকবুল আমাকে জোর করে নিয়ে পালিয়েছে। আমার মত ছিল না’।

আমি বললাম, ‘যা পারিস কর। তবে তোর কাজকর্ম আমার ভালো ঠেকছে না’।

নিশি বলল, ‘মকবুল আমার জান ভাই। আমার কিছু করার নেই’।

আমি বললাম, ‘যা। তুই চলে গেলে আবার সব খালি হয়ে যাবে’।

নিশি বলল, ‘কেন? তোর বর আছে তো? উপরে চলে যা, শরীরের সব খালি জায়গা ভরে নে’।

আমি রেগে গেলাম, ‘আমার জীবনে অত ইচ্ছা নেই। তোকে ভাবতে হবে না’।

নিশি হঠাৎ আমার হাত চেপে ধরল, ‘শোন না নীপা। আমার মনে হচ্ছে এবারে গেলে আমি আর ফিরব না, তোর সঙ্গে আর কোনওদিন আমার দেখা হবে না’।

আমি হেসে বললাম, ‘কেন রে, তোকে কি মকবুল কোনও সুইসাইড মিশনে পাঠাচ্ছে নাকি? শাড়ির মধ্যে বোম লাগিয়ে পাঠিয়ে দেয় যেমন?’

নিশিও হেসে ফেলল, ‘না। আমার অন্য চিন্তা। আমার আজকাল মনে হচ্ছে আমি বেশি দিন বাঁচব না’।

আমি বললাম, ‘মরতে হলে তাহলে দূরে গিয়ে মর। কাছাকাছি মরলে সারাজীবন তোর কথা মাথায় আসবে’।

নিশি বলল, ‘তুই তো ভারি স্বার্থপর মেয়ে। আমি মরে যাব তখনও তুই নিজের মাথায় কী আসবে সে কথা ভেবে যাচ্ছিস’।

আমি বললাম, ‘একটা মানুষের অস্তিত্ব সবটাই তো মাথাতেই থাকে। আর কোথায় থাকে? মাথা থেকে সরিয়ে দিলেই তুই মুক্ত। বাবাকে যেমন সরিয়ে দিয়েছি। যদি হিমুর মাথা থেকে নিজেকে সরাতে পারতাম, তাহলে সব থেকে বেশি খুশি হতাম’।

নিশি বলল, ‘মাথা থেকে সরিয়ে দিয়েছিস বাবাকে?’

আমি বললাম, ‘হ্যাঁ। সরিয়ে দিয়েছি’।

নিশি বলল, ‘ওহ তোকে একটা কথা বলা হয়নি’।

আমি বললাম, ‘কী?’

নিশি বলল, ‘তোর প্রোফাইল খুলেছিলাম। সেই যে ফেসবুকে অ্যাকাউন্ট বানিয়ে দিয়েছিলাম মনে আছে?’

আমি বললাম, ‘হ্যাঁ। কী হয়েছে তাতে?’

নিশি বলল, ‘তোর একটা স্পেশাল মেসেজ আছে। লেখা হয়েছে তোকে অনেকদিন ধরে ভালোবাসে। কোনদিন বলতে পারেনি। সামনাসামনি বলার ক্ষমতা নেই। তাই ফেসবুকে জানাচ্ছে তোকে ভালোবাসে। নামটা সিদ্ধার্থ। চিনিস?’

৩১

সিদ্ধার্থ বলে আমি কাউকে চিনি না।

আবার চিনিও।

তখন ক্লাস নাইনে পড়তাম। ইতিহাস পড়তে যেতাম।

আমার একটু সময়ের আগে কোথাও যাওয়ার বাতিক আছে। স্যারের বাড়িতে পড়া থাকত সাড়ে পাঁচটা থেকে। আমি পাঁচটা পনেরোতে চলে যেতাম। তিন চার মাস পর লক্ষ্য করলাম একটা ছেলেও পাঁচটা পনেরোতে চলে আসত। আমি যখন বসে থাকতাম, ছেলেটাও বসে থাকত। প্রতিবার কথা বলতে যেত আমি বুঝতে পারতাম, কিন্তু পারত না। পুরো আমির খানের সিনেমার মতো ব্যাপার।

এরকম ব্যাপার বেশ ভালো। আমার এরকম লাজুক ছেলেই পছন্দ। যে ছেলে সারাক্ষণ মুখের উপর বলে যাবে ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’, ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’, সে ছেলে আমার পছন্দ না। যে ছেলে কিছু বলবে না, চুপ করে থাকবে, এদিকে হেবি ইচ্ছা দেখাবে, আমার সে ছেলে পছন্দ। নাইন থেকে মাধ্যমিক এভাবেই গেল।

ছেলেটা হয়তো ভেবেছিল মাধ্যমিক পরীক্ষা গেলে কিছু একটা বলে ফেলবে। কিন্তু হা ঈশ্বর! তার আর সুযোগ হল না আমার বাবার কৃপায়। বাবা পালিয়ে গিয়ে সব ভেস্তে দিল।

আমি নিশিকে বললাম, ‘ছেলেটাকে জিগ্যেস কর তো আল বিরুনির কাছে পড়ত নাকি?’

আমাদের ইতিহাস স্যারকে আমরা আল বিরুনি বলতাম। ইতিহাস ম্যাডামকে বলতাম, আল চিরুনি। আল চিরুনি আর আল বিরুনির হেব্বি রেষারেষি ছিল। আমরা যারা বিরুনির কাছে পড়তাম, চিরুনি তাদের নাম্বার কম দিত। টেস্টেও অনেকে কম পেয়েছিল চিরুনির কাছে। মাধ্যমিকে দেখা গেল বিরুনির পাবলিকরা বেশি নাম্বার পেয়েছে। বিরুনির তাতে ঘ্যাম বেড়ে গেছিল। ডিজে বাজিয়েছিল। পরের দিন হেড স্যার বিরুনিকে শোকজ করে। চিঠিতে লেখা হয়েছিল,

‘আপনি একজন গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষক হওয়া সত্ত্বেও অপসংস্কৃতির চর্চা করেছেন। আপনি শুধু জোরে গান বাজাননি, তাতে কুরুচিকর নৃত্য করেছেন। লোকে দেখেছে আপনার অন্তর্বাস অবধি বেরিয়ে এসেছিল। আপনি এই গর্হিত কাজের সপক্ষে যা বলতে চান, সাত দিনের মধ্যে জানান, অন্যথায় আপনাকে সাসপেন্ড করা হইবে’।

আল বিরুনি উত্তর না দিয়ে ক’দিন বাইরে বেড়িয়ে এল। স্কুলে হিস্ট্রির টিচার কম ছিল। হেড স্যার সে চিঠি প্রত্যাহার করলেন।

আল বিরুনি আবার পড়াতে শুরু করে দিলেন।

কিন্তু কথা সেটা না, কথা হল আমিও কানাঘুষোয় শুনেছিলাম যে ছেলেটার নাম সিদ্ধার্থ। এ ছেলে আমার কাছে ফেসবুকে কী জানাতে চায়?

আমি নিশিকে বললাম, ‘দেখা ছেলেটাকে’।

নিশি দেখাল। আমি ভালো করে দেখে বুঝলাম, হ্যাঁ। এই ছেলেটাই। আমিও আড়চোখে দেখতাম। ছেলেটাও দেখত।

নিশি বলল, ‘কী করব?’

আমি বললাম, ‘বাড়ির ঠিকানা দিয়ে দে। বিকেলে আসতে বল। কথা বলি’।

নিশি বলল, ‘তোর বর আছে তো’।

আমি বললাম, ‘সে তো অজ্ঞাতবাসে। আসতে দে’।

নিশি দিব্যি আমাদের বাড়ির ঠিকানা দিয়ে দিল।

বিকেল বেলা দেখি বাড়ির সামনে একটা বাইক হর্ন মারছে আর ঘুর ঘুর করছে। হিমু খেয়ে দেয়ে ঘুমাচ্ছে। আমি সামনের ঘরে বসে ছিলাম। বাইরে গিয়ে দাঁড়াতেই দেখি বাইকটা আমাদের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল। আমাকে দেখে বাইক থেকে সিদ্ধার্থ নেমে এগিয়ে এল, ‘তুমি আমাকে ডেকেছিলে?’

আমি আকাশ থেকে পড়ার ভান করলাম, ‘আমি? কোথায়?’

সিদ্ধার্থ ঘাবড়ে গেল। এদিক সেদিক তাকিয়ে বলল, ‘ফেসবুকে বললে যে? দেখাব?’

আমি বললাম, ‘আমি তো ফেসবুকে নেই। থাকলে তো ওসব বলতে পারতাম। কেউ আমার ছবি টবি ব্যবহার করে এসব করছে’।

সিদ্ধার্থ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মাথা চুলকাল। আমি বললাম, ‘তুমি চা খাবে? এসো’।

সিদ্ধার্থর চোখ মুখ লাল হয়ে গেল। বলল, ‘না, আমি পরে আসব’।

আমি বললাম, ‘এসো এসো। বসো’।

সিদ্ধার্থ এবার খানিকটা সাহস পেয়ে ঘরে এল। দিদা খাটে বসে আমাকে বলল, ‘হেবি বজ্জাত মাগি তো তুই!’

আমি পাত্তা দিলাম না। টঙের ঘরে গিয়ে হিমুকে তুললাম, ‘এই দেখো তো নীচে কে এসেছে’।

হিমু বলল, ‘মা এসেছে নাকি?’

আমি বললাম, ‘না। একটা ছেলে। দেখো’।

হিমু বলল, ‘কে সে?’

আমি বললাম, ‘আমার বয়ফ্রেন্ড। তোমার সঙ্গে দেখা করতে চায়। কী বলবে নাকি?’

হিমু ভীষণ চমকে ফ্যাল ফ্যাল করে আমার দিকে চেয়ে রইল…।

৩২

সিদ্ধার্থ বসে আছে। হিমু ধীরে ধীরে নামল। আমি হিমুর পেছন পেছন নামলাম। হিমু সিদ্ধার্থকে দেখে বলল, ‘আপনি নীপার বয়ফ্রেন্ড?’

সিদ্ধার্থ বিষম খেল। কাশতে শুরু করেছে।

আমি বললাম, ‘চা খাবে সিদ্ধার্থ?’

হিমু কী করবে বুঝতে পারছে না। রাগবে না অবাক হবে, সিদ্ধান্ত নেবার ঊর্ধ্বে চলে গেছে। বসে পড়ল। বলল, ‘আমি জানতাম না তোমার বয়ফ্রেন্ড আছে’।

সিদ্ধার্থ বলল, ‘আপনি কে?’

হিমু বলল, ‘আমি ওর বিয়ে করা বর’।

এবার সিদ্ধার্থ অবাক হল। বলল, ‘বিয়ে হয়ে গেছে?’

হিমু বলল, ‘হ্যাঁ। বিয়ে হয়ে গেছে’।

সিদ্ধার্থ আমার দিকে তাকাল। আমার সিঁথি ফাঁকা দেখে হেসে ফেলল, ‘ধুস, সিঁদুর নেই তো। সিঁদুর না থাকলে বিয়ে হয় নাকি?’

সিদ্ধার্থর প্রশ্ন শুনে হিমুও আমাকে দেখল। ওর মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল। কী বলবে বুঝতে পারছে না।

কেমন দিশেহারা হয়ে যাচ্ছে।

আমি বললাম, ‘বিয়ে হয়েছিল, তবে বিয়ের রাতেই ওদের বাড়ি থেকে আমাকে এ বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছে’।

সিদ্ধার্থ হাঁ করল। কেমন একটা অদ্ভুত পরিস্থিতি। সব কেমন স্লো মোশনে চলছে। হিমু সিদ্ধার্থর সামনাসামনি বসে বলল, ‘কিন্তু আমি নীপাকে ভালোবাসি’।

আমি বললাম, ‘আমি ওকে ভালোবাসি না’।

হিমু আরও কুঁচকে গেল।

সিদ্ধার্থ সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতে শুরু করেছে। কয়েক সেকেন্ড পর উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘আমি আসি’।

আমি বললাম, ‘তুমি কিছু ডিক্লেয়ার করবে না? তোমার কিছু বলার নেই। তুমি কি আমাকে ভালোবাসো?’

সিদ্ধার্থ জোরে জোরে মাথা নাড়ল, ‘হ্যাঁ, বাসি। বাসি। তুমি আমাকে ভালোবাসো?’

আমি হাসলাম। বাইরে থেকে একটা গান ভেসে আসছে। গান না ঠিক। গানের সঙ্গে মতোই কিছু। কী গান বোঝা যাচ্ছে না। কিন্তু ধুপ ধুপ ধুপ শব্দ হচ্ছে। এটাকে নাকি ডিজে বলে। কারো বাবার বিয়ে লাগলে ডিজে বাজায়। আমার অবশ্য বাবার বিয়ে খাওয়ার সৌভাগ্য হয়নি। আমার বাবা পালিয়েছিল। বাবা পালালে বাবার বিয়ে খাওয়া হয় না। আমি ঠিক করলাম বাবাকে একদিন বলব, ‘বাবা খাওয়াও। তুমি বিয়ে করে পালালে, বা পালিয়ে বিয়ে করলে, খাওয়ালে না তো!’

আমার বাবা ভালো বাজার করে। বাজরে গিয়ে মাছের পেট টিপে টিপে দেখে মাছ কেনে। বাবার জায়গায় অন্য কেউ বাজার করলে এত ভালো বাজার হত না। এখন যেমন হয়। মার ঘেন্নাপিত্তি বেশি। মাছ বোঝেও না। মাছ কেনার ক্ষেত্রে মা নিশ্চয়ই বাবাকে মিস করে।

সিদ্ধার্থ ওর প্রশ্নের উত্তর শোনার জন্য আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছে। আমি বললাম, ‘তুমি ভালোবাসো জেনে খুশি হলাম। তবে আমি ভালোবাসি না। তুমি নিশ্চিন্ত থাক। আমি তোমাকেও ভালোবাসি না, হিমুকেও ভালোবাসি না। আমি কাউকে ভালোবাসতে পারব না এ জন্মে। ওটা আর হবে না আমার দ্বারা’।

সিদ্ধার্থ আশা করেছিল ও ভালোবাসে বললে আমিও বলে দেব। তারপর দুজনে মিলে একটা বেশ তোমায় আমায় মিলে টাইপ ব্যাপার হবে। সেটা বললাম না দেখে ওর বেলুনটা কেমন চুপসে গেল। ফ্যাকাসে মেরে বলল, ‘ও। তাহলে আমি আজ আসি’।

আমি হিমুকে বললাম, ‘তুমি আবার এগিয়ে দিতে যেও না। তোমার মা দেখলে তোমার খবর আছে’।

সিদ্ধার্থ পালাতে পারলে বাঁচে। বুঝলাম সিদ্ধার্থর অত চাপ ছিল না। ও খানিকটা গুপ্তধন খোঁজার মতো করে আমাকে খুঁজছিল। পেয়েও এত জটিলতা নিতে পারল না।

সত্যি সত্যিই পালিয়ে গেল।

সিদ্ধার্থর পুরো চলে যাওয়াটা জানলা দিয়ে চুপ করে দেখে টেখে নিয়ে হিমু খুশি হয়ে বলল, ‘দেখো, ছেলেটা চলে গেল। ওকে তুমি ভালোবাসো না’।

আমি বললাম, ‘আমি তোমাকেও ভালোবাসি না’।

হিমু দাঁত বের করল, ‘কিন্তু আমি থাকব। কোথাও যাচ্ছি না। আমার সঙ্গে তোমার বিয়েও হয়েছে। আমি জিতে গেলাম’।

হিমু বসে বসে পা দোলাতে শুরু করল।

৩৩

নিশি আমাকে অনেকক্ষণ ধরে বোঝাল মকবুলের কাছে বিয়ে মানে কী। মকবুলের দাবি অনুযায়ী বিয়ে করেছ মানে মেয়ে তোমার। এবার তুমি তাকে থাবড়াও, পেটাও, যা ইচ্ছে কর, সেটা নিয়ে কিছু বলা যাবে না। তুমি হিরো। তুমি যা ইচ্ছে করতে পার। কেউ কিছু বললে ব্যাপারটা বুঝে নেব বাওয়া।

বেশ একটা গুহা মানব গুহা মানব ফিলিং লাগছে শোনার পর। মানুষ যখন অসভ্য ছিল, ছেলেরা একটা মুগুর নিয়ে ঘুরে বেড়াত। যে মেয়েকে পছন্দ হত, তার মাথায় ধাই ধাই করে চালিয়ে দিত। মেয়ে অজ্ঞান। উঠে দেখল তার রেপ হয়ে গেছে। আর কী করা যাবে? বিয়ে করতেই হবে।

কিন্তু আমি নিশির চোখ দেখে বুঝতে পারি। মকবুলের নেশা লেগে আছে নিশির চোখে। মানুষের চোখে কারো নেশা লেগে গেলে সে লোক অন্যরকম হয়ে যায়। সে লোকটার অত্যাচারের কাহিনি বলতে গিয়ে, কাঁদতে গিয়েও নেশাড়ু চোখ কোমল হয়ে আসে। ‘বদমাইশ’ বলবে, কিন্তু সে শব্দে রাগ থাকবে না। ভালোবাসা থাকবে। জড়িয়ে ধরা থাকবে।

নিশির চোখে সে ভালোবাসা আছে। আমি নিশিকে বললাম, ‘তুই কবে আবার মকবুলের কাছে যাবি এটা নিয়ে পাড়ায় বাজি ধরা হয়নি?’

নিশি বলল, ‘হয়েছে। আমিও দুদিকেই বাজি ধরে রেখেছি। নিজেই তো জানি না আমি কী করব’।

আমি আর নিশি দুজনেই খিলখিল করে হাসলাম। কেমন পেত্নির মতো হাসি আমরা। মা শুনলে রেগে যাবে। এই হাসিটা আমরা দুজনে টঙের ঘরে মজা করে হাসতাম। সে কী ভয়ংকর শোনাত! মা শুনে খুব বকেছিল। এরকম হাসি নাকি হাসা উচিত না। কিন্তু আমি কী করব? আমার এই হাসিটা হাসতে খুব মজা লাগে। কেমন একটা দিল খোলা হাসি। শুনতে কুৎসিত হলই বা। কী আর করা যাবে?

যাই হোক, ফেসবুক আমার জীবনে হঠাৎ করে সিদ্ধার্থকে ফিরিয়ে আনল। যদিও আমি এখন অবাক হয়ে দেখলাম সিদ্ধার্থর উপরে খুব বেশি একটা আকর্ষণ বোধ করছি না। হিমুদের বাড়ির একটা রাত আমাকে গোটা সম্পর্ক জিনিসটার উপর থেকেই সবরকম মোহমুক্ত করে দিয়েছে।

তুমি বাপু পুরুষ মানুষ হয়ে আমাকে খুব ভালো ভালো ভালোবাসার গল্প করে, আমার বাড়ির সামনে ঘুরে টুরে এসে ফুলসজ্জার সময় রাতের বেলা মদ গিলে আমাকে বলবে ‘খোল’, আর আমি খুলে শুয়ে থাকব, এটা যদি ভালোবাসা হয়, তাহলে সে ভালোবাসার আমি ইয়ে মারি। কী মারি? অমলকাকু বলত পাইট মারি। পাইট তো জানি মদের বোতল। সেটা কী করে মারবে?

কলেজের খিস্তি স্পেস্টালিস্ট ঋতবান আবার বলে, কথাটা পাইট মারা না। পাইন মারা। পাইন তো গাছের নাম। সেটাই বা কী করে মারে?

যাক গে, এত কিছু না বলে তাই ইয়ে মারি বলাই নিরাপদ বলে মনে হয়। গ্রামারের বড় হ্যাপা। কে যে কখন গ্রামারের জন্য গাঁড় মেরে চলে যায়, সেটা বোঝা আমার অসাধ্য। আমাদের এক স্যার আছেন, গ্রামার নাজি টাইপ। একটু এদিক থেকে ওদিক হলেই ব্যস। পাইট বা পাইন, কিছু একটা মেরে রেখে দেবে।

আবার ভাট বকে যাচ্ছি। যেটা ভালো পারি সেটা করে গেলে জনগণের ভালো লাগার কথা না।

আমার মা ফিরল কিছুক্ষণ পরে। হিমু নীচের ঘরে ছিল। মা হিমুকে দেখে আমাকে জিগ্যেস করল, ‘একে নিচে ছেড়ে রেখেছে কে?’

মা কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে। এমন করে বলল কথাটা, যেন হিমু ভোদাফোনের কুকুর। কিন্তু হিমু তো কুকুর না। আমায় বিয়ে করে আমাকেই বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়ে আবার চাকরি ছেড়ে আমার বাড়ি থাকতে আসা বর। হিমু কুকুর কেন হবে?

আমি বললাম, ‘সিদ্ধার্থ এসেছিল। ওর নাকি আমার প্রতি সফট কর্নার ছিল। হিমু আর সিদ্ধার্থকে মুখোমুখি বসালাম। সিদ্ধার্থ হিমুর সামনে টিকতে পারল না। পালিয়ে গেল’।

হিমু যুদ্ধজয়ীর মুখে আমাদের দেখল।

মা থমথমে মুখে বলল, ‘এটা ঠিক করিসনি’।

আমি বললাম, ‘কী করব বলো? আমার মাথা কাজ করছিল না। হিমুর মা জানলে কী হবে ভাবো’।

মা হিমুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমি হিমুর মাকে খবর দিয়েছি। ভদ্রমহিলা আসছেন’।

হিমু মার কথা শুনেই দৌড়ে উপরের ঘরে চলে গেল।

আমি বললাম, ‘সত্যিই বলেছ নাকি?’

মা বলল, ‘না। তবে এ বাড়িতে এসব হলে আমি বলতে বাধ্য হব। আমি স্কুলে থাকি। ফিরে এসে এখানে কয়েকটা লাশ পড়ে আছে, সেটা দেখতে পারব না’।

আমি বললাম, ‘তাহলে কী করবে? হিমুকে ভাগাবে?’

মা বলল, ‘ভাগিয়ে লাভ নেই। হিমু এখন বেড়ালের মতো হয়ে গেছে। ওকে যাই করবি, ঘুরে ফিরে এখানেই আসবে। ওর অন্য ওষুধ দরকার’।

আমি বললাম, ‘কী ওষুধ?’

মা হাসল, ‘পুরুষ মানুষের ওষুধ। তোর বাবা যে ওষুধে পালালো, সেই ওষুধ’।

৩৪

রাত ন’টা।

শীত পড়েছে ভীষণ। নিশি রান্না করছে আমাদের বাড়িতেই। কী অদ্ভুত একটা গন্ধ বেরিয়েছে। চারদিক একবারে ম-ম করছে।

রান্না করতে হবে না বলে মা ঘুমিয়ে পড়েছে।

খাওয়ার সময় ডেকে দেব।

কলিং বেলের শব্দে বাইরে গিয়ে দেখি বাবা দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে দেখে অপ্রস্তুত হাসি হেসে বলল, ‘ভালো আছিস?’

আমি দরজা ছেড়ে দাঁড়ালাম, ‘এসো’।

বাবা ঘরের ভেতর ঢুকে মাথা চুলকে বলল, ‘তোর মা আছে?’

আমি বললাম, ‘ঘুমাচ্ছে। কেন? টাকা লাগবে?’

বাবা হাসার চেষ্টা করল, ‘ওষুধ। মানে হাত একবারে খালি বুঝলি?’

আমি বললাম, ‘বসো’।

বাবা বলল, ‘মাংস রাঁধছিস?’

আমি বললাম, ‘নিশি রাঁধছে’।

বাবা বলল, ‘নিশি কবে এল?’

আমি বললাম, ‘তুমি জানো না নিশি এসেছে?’

বাবা বলল, ‘ভুলে গেছি। বলেছিস হয়তো। মা নেই?’

আমি বললাম, ‘ঘুমাচ্ছে। নিশি রাঁধছে। টেস্ট করবে?’

বাবা মাথা নাড়ল। আমি জানি বাবা মাংস খেতে ভালোবাসে। মাংস হলে বেশ কয়েকবার টেস্ট করত। মা বেশি পিস দিত বাবাকে। আমি খেতে পারতাম না। বাবা আমার পাতেরটাও খেত। আমি রান্নাঘর থেকে দু’পিস মাংস এনে বাবাকে দিলাম। বাবা তৃপ্তি করে খেতে খেতে বলল, ‘ভালো বানিয়েছে তো মেয়েটা। আবার একটা গোটা রসুন দিয়েছে’।

আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, শ্বশুরবাড়িতে রান্না করে হাত পাকিয়েছে, এটা ওদের ওখানকার প্রিপারেশন। গোটা রসুন দেয়। পেঁয়াজটাকেও কী সব কায়দা করে রান্নার সময়’।

বাবা বলল, ‘আহা, অসাধারণ খেতে হয়েছে। অনেকদিন এত ভালো রান্না খাইনি রে মা’।

খুব শিগগিরি দু’পিস শেষ হয়ে গেল। আমি আরও দু’পিস নিয়ে এলাম। সঙ্গে দুটো রুটি। বাবা খাচ্ছে। আমি দেখছি। মাঝে মাঝে মনে হয় আমি মারাত্মক একটা দুঃস্বপ্ন দেখছি। হঠাৎ চোখ খুলে দেখব বাবার কোলে করে মেলায় ঘুরতে গেছি। বাবা এটা সেটা কিনে দিয়ে নাগরদোলার সামনে নিয়ে গিয়ে ভয় দেখাচ্ছে ওটাতে চড়বে আর আমি কিছুতেই চড়তে চাইছি না।

এসব চেয়ে কোনও লাভ হয় না। যা ঘটে, তা ঘটতেই থাকে। সেটা আর কিছুতে দুঃস্বপ্ন হয় না। মাঝে মাঝে আমার ইচ্ছে করে পাঁচ বছর আগের কোনও দিনে চলে যাই। এমন কোনও দিনে যে দিনটা আমরা খুব ভালো কাটিয়েছিলাম। দার্জিলিংয়ের রাস্তায় ঘুরছি। এটা সেটা কিনছি। এরকম কিছু করা গেলে ভালো হত।

জিগ্যেস করলাম, ‘কত টাকা লাগবে?’

বাবা নাক টানছিল। মাংসে বেশ ঝাল হয়েছে। বলল, ‘হাজার দুয়েক লাগবে। কী একটা ওষুধ দিয়েছে, ওটার দামই দেড় হাজার টাকা। মানুষ বাঁচবে না ওষুধ খাবে বল তো? কী দাম এক একটা ওষুধের। অবশ্য ওষুধের কথাই বা বলি কেন? জিনিসের দাম কি কম বেড়েছে?’

আমি শ্বাস ছাড়লাম। আমার পালিয়ে বিয়ে করা বাবার কাছে দু’হাজার টাকাও নেই। টাকা কী অদ্ভুত একটা জিনিস! আবেগের বশে শাজাহান হতে চাওয়া লোককে কত সহজে নিজের জায়গা দেখিয়ে দিতে পারে।

আমি আমার জমানো টাকা থেকে তিন হাজার টাকা দিলাম বাবাকে। বাবা টাকাটা পকেটে নিয়ে বলল, ‘তুই ও বাড়িতে যাস’।

আমি ঘাড় নাড়লাম, ‘যাব’।

বাবা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে দাঁড়িয়ে বাড়িটা মায়াভরা চোখে দেখতে দেখতে বলল, ‘খুব ঠান্ডা পড়েছে’।

আমি খেয়াল করলাম বাবার মাফলার নেই। বললাম, ‘মাফলার কোথায় তোমার?’

বাবা বলল, ‘ওর ঠান্ডা লাগছিল। দিয়ে দিলাম। কিনতে হবে একটা, দেখি’।

আমার চাদরটা বাবাকে দিয়ে দিলাম, ‘মাথায় প্যাঁচাও ভালো করে’।

বাবা বলল, ‘না না। থাক’।

আমি বললাম, ‘নাও। ঠান্ডা লাগিও না আর’।

বাবা ধীর পায়ে বেরিয়ে গেল। আমি দরজা বন্ধ করে একটু কেঁদে নিলাম। এই কান্নাটা অদ্ভুত জিনিস। চোখের জলের উপর নিজের কোনও কন্ট্রোল থাকে না।

রান্না হয়ে গেছিল। হিমুকে ডাকলাম।

হিমু মাংস খেতে বসে আর্তনাদ করল, ‘এত ঝাল? ওরে বাবা। জলে চুবিয়ে দাও’।

আমি ধেড়ে খোকার জন্য গ্লাস এনে তাতে মাংস চুবিয়ে দিলাম।

দিদা ঠিক চলে এসেছে। ফিক ফিক করে হাসতে হাসতে বলল, ‘দুদ খাওয়া ছ্যামরারে। মিষ্ট লাগব’।

আমি একটু চাপ খেলাম। দিদা যদি ভূত না হয়ে আমারই মনের ভ্রম হয়, তাহলে কি আমি আজকাল এসব চাইছি? খেয়েছে!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *