৫৫
বাবা চলে যাওয়ার পর থেকেই মা শাখা সিঁদুর পরা ছেড়ে দিয়েছিল। তবে সাদা শাড়ি পরেনি। বাবা মরে যাওয়ার পরেও মা একই পোশাক রাখল। সাদা শাড়ি পরল না। নতুন মাকে দেখে আসে মাঝে মাঝে। বাজার করে দেয়। বাচ্চা সামলানোর জন্য আয়া রেখেছে। সুন্দর ব্যবস্থা। বাবা বেঁচে থাকলে এত ভালোভাবে থাকত না নতুন মা। বাবা না থেকে ভালোই হয়েছে।
কত লোকে কত কিছু বলল। মামারা এসে মাকে বলল, ‘কী দরকার ছিল এসব করার?’
মা ভাবলেশহীন মুখে বলল, ‘সেটা কাউকে ভাবতে হবে না। আমি দেখব’।
সবাই কমবেশি ভয় পায় মাকে। কেউ কিছু বলল না। এ বাড়িতে বাবার একটা ছবি টাঙানোও হল। মা বলে দিল, মাঝে মাঝে ফুল দিতে।
আমার বিয়ের সময় যেমন আত্মীয় স্বজনে ভর্তি হয়ে গেছিল বাড়ি, বাবার শ্রাদ্ধতেও তাই হল। তারপর সবাই চলে গেল। বাড়ি আবার ফাঁকা হয়ে গেল। মা স্কুল যায়, আমি কলেজ যাই। অনীশ আমার সামনে আসে না। পালিয়ে পালিয়ে থাকে।
প্রথমে ভাবছিলাম, আমি আর কলেজ যাব না। পালিয়ে থাকাটাই ঠিক হবে। তারপরে মনে হল কেন আমি পালিয়ে থাকব? আমার পালিয়ে থাকার তো কোনও কারণ নেই। পালিয়ে থাকতে হলে অনীশ থাকবে। যে দোষ করেছে, সে পালিয়ে থাকবে। আমি পালিয়ে থাকব কেন?
একদিন স্নিগ্ধা এসে আমাকে নিচু গলায় বলল, ‘তুই অনীশকে প্রপোজ করেছিলি?’
আমি আকাশ থেকে পড়লাম, ‘আমি? কে বলেছে?’
স্নিগ্ধা বলল, ‘বলতে শুনেছি। ওর বন্ধুদেরই’।
আমার মাথায় রক্ত উঠে গেল। বহু কষ্টে নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম, ‘মিথ্যে রটাচ্ছে। বরং ও অসভ্যতামো করেছিল আমার সঙ্গে। ও যা করেছে তা যদি এবার সবাইকে বলতে শুরু করি, তাহলে সমস্যাটা আমার না, ওর বাড়বে’।
স্নিগ্ধা আমার পিঠে হাত বুলিয়ে বলল, ‘ওরকম বলিস না নীপা। সবাই মেয়েদেরই খারাপ ভাবে। ও যদি এইভাবে বলতে শুরু করবে, তাহলে সবাই ভাববে তুই সত্যিই কিছু করেছিস’।
আমি কোনওদিকে না তাকিয়ে সরাসরি অনীশের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম, ‘কী রে, তুই নাকি বলে বেড়াচ্ছিস আমি তোকে প্রপোজ করেছি?’
জোঁকের মুখে নুন পড়লে যেমন হয়, অনীশের তাই হল। কুঁচকে গিয়ে বলল, ‘না না। আমি কিছু বলিনি। যারা আমার সম্পর্কে এসব বলছে, তারা মিথ্যা বলছে’।
আমি বললাম, ‘তোকে আমি এটা লাস্ট ওয়ার্নিং দিলাম। যদি আমি এর পরেও কাউকে কিছু বলতে শুনেছি, তাহলে তার সমস্ত কিছুর দায় তোর হবে’।
অনীশ পালিয়ে বাঁচল। এই ছেলেগুলো এমনই হয়। দোষও করবে, আবার সে দোষ থেকে বাঁচতে একটা কাঁধ খুঁজবে, যার উপরে সব দায় ঝেড়ে ফেলে দিয়ে নিশ্চিন্তে ঘোরা যায়।
একদিন হিমুর বাড়ি থেকে ওর কাকা জ্যাঠারা এল। আমায় ওর কাকা বলল, ‘হিমু একটা চাকরি পেয়েছে। এখন চণ্ডীগড় থাকবে ক’ দিন। পরে বাইরে চলে যাবে। তোমায় ফোন করে? তুমি কি জানো এই কথাগুলো?’
আমি মাথা নাড়লাম, ‘না। জানি না’।
কাকা বলল, ‘তাহলে তুমি কী চাইছ? ডিভোর্স?’
আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, সেটা হলে সব থেকে ভালো’।
হিমুর কাকা বলল, ‘হিমু এখন খুব মন দিয়ে কাজ করছে। কবে ফিরবে কেউ জানে না। খুবই গম্ভীর হয়ে গেছে নাকি।’
আমি চুপ করে সেসব শুনলাম। হিমুর জেঠু বলল, ‘তুমি একটু ভেবে দেখো। হিমুর মা যাই করুক, আমরা কেউই চাইছি না বিয়েটা ভাঙুক। দেখো মা তোমার রাগের সঙ্গত কারণ থাকতে পারে, কিন্তু আমাদের ছেলেটা সত্যি ভালো ছেলে। নিজে চিন্তা করে দেখো একদিন’।
আমি মুখ চোখ শক্ত করে বসে রইলাম। ওরা চলে গেলে মা বলল, ‘এবার হয়তো অফিসিয়ালি ডিভোর্সটা করে নিতে হবে। তোরও ভালো। আমি কি উকিলবাবুর সঙ্গে কথা বলব?’
আমি বললাম, ‘বলো’।
মা বলল, ‘নোটিস গেছিল। রেজিস্ট্রি হয়েছিল বিয়ের আগেই। ওই জন্যই আইনের ঝামেলাটা রয়ে গেল। নইলে সমস্যা হত না’।
আমি বললাম, ‘যা লাগে করতে তো হবেই’।
মা শ্বাস ছাড়ল, ‘তাও ঠিক’।
৫৬
কোনও কিছুই বেশিদিন একরকম থাকে না। স্বাভাবিক হয়ে আসে। আমাদের স্বাভাবিক হতে হয়েছিল বাবা চলে যাবার পরেই। আমাদের জীবন এমন কিছুই ওলট-পালট হল না।
নিশি মাঝে মাঝে চিৎকার করে। আমাদের বাড়ির দাওয়ায় এসে বসে থাকে। মানুষের মস্তিষ্ক যে এমন কঠিন একটা জিনিস, তা আগে বুঝিনি। যে মেয়ে আমার সঙ্গে এত গল্প করত, মজা করত, সে কেমন যেন হয়ে গেল। নিশির বাবাকে দেখে অবশ্য মনে হয় মেয়ে পাগল হওয়াতে বিশেষ সমস্যা হয়নি। লোকসমাজে নাক কাটেনি, তাতেই উনি খুশি।
জীবন স্থির জল নয়। স্থির হতে চায়, কিন্তু হয় না। ঠিক কোনও না কোনও ঢিল এসে সে জলকে তছনছ করে দেয়। তারপর একসময় জল আবার স্থির হয়ে আসে।
আমাদের সেটা হতে হতেও হল না। একসঙ্গে এতগুলো ঢেউ ওঠার পরে আবার আমি কলেজে নিয়মিত যাওয়া শুরু করলাম। মা স্কুল যেতে শুরু করল।
একদিন হঠাৎ বিপ্লবকাকু আসা শুরু করল। বাবা পালিয়ে যাবার পর দু-একদিন এসেছিল, কিন্তু একটা সময়ের পর আসা বন্ধ করে দেয়। এখন নিয়মিত আসা শুরু করল।
রবিবার সকালে আমি হয়তো একটু আরামে বাইরের ঘরে শুয়ে শুয়ে খবরের কাগজ পড়ছি, হঠাৎ কলিং বেল বেজে উঠবে। ‘কেমন আছিস? খোঁজ নিতে এলাম’। বলে দাঁত বের করে দাঁড়িয়ে থাকবে।
ভদ্রতাবশত ঘরের ভেতর বসাতে হয়। মাকে ডাকতে হয়।
বিপ্লবকাকু বাবার বন্ধু। এসে ইনিয়ে বিনিয়ে আগের কথা বলতে শুরু করে।
মা চুপ করে বসে থাকে। আমি দেখতে পাই বিপ্লবকাকুর চোখ মার শরীরে একবার বুলিয়েই অন্যদিকে চলে যায়। সব বোঝা যায়। কিন্তু লজ্জায় মাকে বলতে পারি না।
মা হয়তো বলল, ‘আপনি বউদিকে নিয়ে আসতে পারেন তো’।
বিপ্লবকাকু তখন বলবে, ‘আরে না। সারাক্ষণ ছেলেমেয়ে নিয়ে ব্যস্ত থাকে। আমি নিজেই খোঁজ নিতে আসি। আপনারা ইঁচড় খান? আমাদের গাছে ভালো ইঁচড় হয়েছে। নিয়ে আসব’।
মা মাথা নাড়ে, ‘না না। থাক না’।
বিপ্লবকাকু শোনে না। ইঁচড় নিয়ে আসে। মাঝে মাঝে বাজার দিয়ে যায়। পাড়ার সিসিটিভিরা আবার সক্রিয় হয়ে উঠে।
একদিন দেখলাম বিপ্লবকাকুর বাইকে করে মা স্কুল থেকে ফিরল। জিগ্যেস করায় বলল, ‘কী করব বল? স্কুল থেকে ফিরছিলাম, বলল চলুন নামিয়ে দিয়ে আসি। আমি আর বারণ করলাম না’।
দিদা গোমড়া মুখে বলল, ‘ওই দেখ। তোর মায়েরও চুলকানি উঠসে। কেচ্ছা হইব দেখ’।
আমি দিদাকে পাত্তা না দিয়ে মার কাছে গিয়ে বসে রইলাম কিছুক্ষণ।
‘মা, তুমি ওই লোকটার বাইকে উঠো না। লোকটার এ বাড়িতে আসা বন্ধ করে দাও। আমার একদম ভালো লাগে না লোকটাকে’।
মা দু চোখে ক্লান্তি নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ঠিক আছে। তুই বলে দিস। আমি লোকজনের সঙ্গে বাজে ব্যবহার করতে পারি না’।
মা মিথ্যে বলেনি। মা এরকমই। কাউকে বারণ করতে পারে না। বাবা মারা যাবার পর যেন আরও নরম হয়ে গেছে। আজ যদি একটা লোক বাক্স প্যাঁটরা নিয়ে আমাদের বাড়িতে থাকতে চলে আসে, মা তাকে বাধা দেবে না। দুদিন পর দেখা যাবে লোকটা আমাদের বাড়ির বাইরে বের করে দিয়েছে।
আমি ঠিক করলাম, অনেক হয়েছে। বিপ্লবকাকুর এন্ট্রি বন্ধ করতে হবে। রোজ আসা শুরু করেছে।
কলেজ থেকে ফিরে টিভি দেখছি, কলিং বেল বেজে উঠল। বিপ্লবকাকু এলে বোঝা যায় কারণ উনি কলিং বেল দুবার করে বাজান।
আমি ঠিক করেই নিয়েছিলাম। মাথা গরম করে দরজা খুলে দেখি, হিমু দাঁড়িয়ে আছে।
ঝকঝক করছে মুখে হাসি। আমাকে দেখে বলল, ‘কেমন আছ?’
আমার হৃদস্পন্দন এমনিই বেড়ে গেছিল। আমি দরজা থেকে সরে দাঁড়ালাম, ‘এসো’।
হিমু ঘরে এসে বসে বলল, ‘বাড়ি এসেছিলাম। ভাবলাম দেখা করে যাই’।
আমি একটা নোংরা ন্যাতা পরে থাকি ঘরের ভেতর। এই হিমুকে আমি চিনতে পারছিলাম না। চুলের স্টাইল অবধি পাল্টে গেছে। চোখে মুখে সাফল্যের ছাপ স্পষ্ট। বলল, ‘ভালো আছ তুমি?’
আমি বললাম, ‘চলছে। বাবার খবরটা পেয়েছ?’
হিমু বলল, ‘হ্যাঁ। ওই জন্যই আরও এলাম। কালকেই বেরিয়ে যাব আবার। কোথায় জানো?’
আমি বললাম, ‘বাইরে?’
হিমু বলল, ‘হ্যাঁ। লন্ডনে। আবার কবে আসব জানি না। আমি কিন্তু তোমাকে আর জ্বালাতে আসিনি, দেখলে তো?’
আমি বললাম, ‘হ্যাঁ। তুমি বড় জ্বালিয়েছিলে এককালে’।
হিমু আর কোনও কথা বলল না। চুপ করে আমার দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ।
আমি বললাম, ‘কী হল?’
হিমু বলল, ‘আমি নিজেকে অনেক বুঝিয়ে বেরিয়ে পড়েছি নীপা। যত দিন বাড়ির বাইরে আছি, নিজেকে তোমার জায়গায় বসিয়ে দেখেছি, তুমি একবারে ঠিক। কিন্তু তাও তোমাকে ভুলতে পারলাম কই? সেই সময়টা আমি ইনফ্যাচুয়েটেড ছিলাম। এখন নই’।
আমি বললাম, ‘তুমি কেন এসেছ বলবে? ডিভোর্স চাও? আবার নতুন করে শুরু করতে চাও?’
হিমু বলল, ‘না। আমি ডিভোর্স চাই না। কিন্তু তুমি মুক্তি চাইলে আমি তোমাকে মুক্তি দেব। তুমি কী চাও?’
আমি কিছু বলার আগেই আবার কলিং বেল বেজে উঠল। দরজা খুলতেই বিপ্লবকাকু ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ল। হিমুকে দেখে বলল, ‘বাঃ। তুমি এসেছ?’
হিমু বিপ্লবকাকুকে চিনতে না পেরে বলল, ‘হ্যাঁ। এই এলাম আর কী’।
বিপ্লবকাকু বলল, ‘নীপাকে নিতে এসেছ? বাঃ। ভালোই হল’।
আমার মাথার মধ্যে হঠাৎ কী যেন হয়ে গেল। মনে হল এই লোকটা আমি গেলেই এ বাড়ি এসে মার সঙ্গে অসভ্যতা করবে। আমি পাগলের মতো চিৎকার করে উঠলাম, ‘বেরোন। গেট আউট। বেরোন এখান থেকে’।
ঘটনার আকস্মিকতায় দুজনেই চমকে উঠল। বিপ্লবকাকু আমার হাত ধরে বোঝাতে গেল, ‘আরে মা, কী হয়েছে মা…’
আমি শুনলাম না, ‘মা? কে মা? ফালতু লোক একটা, দুটো মেয়ে থাকে দেখে রোজ চলে আসে। কী ভেবেছিস, আমি বুঝি না কিছু? বেরো, বেরো’।
বিপ্লবকাকু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে পালিয়ে গেল। হিমু হতভম্ব হয়ে বলল, ‘কী ব্যাপার বলো তো?’
আমি কেঁদে ফেললাম।
৫৭
হিমু আমার মাথায় হাত বোলাচ্ছে। আমি কাঁদছি। প্রায় মিনিট দশেক পরে উঠে বসলাম। হিমু নরম গলায় বলল, ‘তুমি ভীষণ স্ট্রেসড হয়ে আছ। এতটা স্ট্রেসড কেন নীপা?’
আমি চোখের জল মুছে বললাম, ‘এরকম উটকো লোকজন যাতায়াত করলে স্ট্রেসড না হবার কোনও কারণ আছে’!
হিমু বলল, ‘চা খাবে? আমি চা করতে শিখেছি’।
আমি বললাম, ‘করো’।
মেঝেতে বসে রইলাম। এবার লজ্জা লাগছে। মা এসে যদি জানতে চায়, আমি কী বলব? বেশি বলে ফেললাম মনে হয়। দিদা বলল, ‘ঠিক করসস। ওই লোক আইসিল চুলকানি করনের লাইগা’।
হিমু চা নিয়ে এল। সত্যি ভালো চা করেছে। আমি বললাম, ‘এসব শিখলে কোথায়? তুমি তো কুটোটি নাড়তে না’!
হিমু হাসল, ‘এবার গিয়ে মরমে মরে ছিলাম। কী সব করেছি বলো তো এখানে। সেসবের প্রায়শ্চিত্তও বলতে পারো। আমি এখন মাংস রাঁধতে পারি, ভাত তো কোনও ব্যাপারই না। যেখানে থাকি, নিজের রান্না নিজেই করেনি। অফিস থেকে ফিরলাম, এসে রান্না বসিয়ে দিলাম, সে যত রাতই হোক। প্রথম প্রথম বাইরে থাকতে পেটের সমস্যা হত। এখন আর হয় না’।
আমি চোখ বড় বড় করলাম, ‘বাওয়া! বিরাট উন্নতি হয়েছে তোমার’।
হিমু বলল, ‘হ্যাঁ। আমি পাল্টে গেছি। কিন্তু তোমার প্রতি আমার মনোভাব একটুও পাল্টায়নি। আমি তোমার সঙ্গে থাকতে চাই। আমাকে কি ক্ষমা করা যায় না?’
আমি মন দিয়ে চা খেতে লাগলাম। চা-টা সত্যিই ভালো বানিয়েছে।
দিদা বলল, ‘টোপ দেয় রে মাগি তোরে। টোপ বুঝস? এখন কইবে রান্না কইরা খাওয়াইবে, তারপর বাইরে নিয়া গিয়া কুত্তার খাটান খাটাইবে। ভাগা, ভাগা ছ্যামরাডারে’।
আমি হেসে ফেললাম।
হিমু অবাক হল, ‘কী হল?’
আমি বললাম, ‘এখন তুমি এসব বলবে, তারপর নিয়ে গিয়ে আমাকে কাজের মাসি করে দেবে, তাই না?’
হিমু হো-হো করে হেসে উঠল, ‘এসবও মাথায় খেলে তোমার? আচ্ছা পাগলি তো তুমি। দেখো, একসঙ্গে থাকলে দুজনকেই কিছু না কিছু কাজ করতে হবে। ওখানে তো আর কাজের লোক পাওয়া যাবে না। তা বলে ভেবো না তোমাকেই সব করতে হবে। আমিও করব’।
আমি বললাম, ‘ওরম মনে হয়। আমাকেই করতে হবে’।
হিমু বলল, ‘না না। আচ্ছা কোর্ট পেপারে সাইন করিয়ে নিও, ঠিক আছে বাপু, এবার তো চলো’।
আমি বললাম, ‘আমার ক্লাসের ছেলেটা বাবা মারা যাবার সময় আমাকে চুমু খেতে এসেছিল জানো। ঠোঁটে ওর ঠোঁট লেগেছিল। এবার বলো তো, আমাকে নিতে ইচ্ছে করছে?’
হিমু ফ্যাকাসে হয়ে গেল, ‘কোন ছেলেটা?’
আমি বললাম, ‘অনীশ। তুমি এত কিছু ভেবে ফেলেছ, তোমারও সব কিছু জানা উচিত, তাই না? পরে সন্দেহ করবে বসে বসে, তার থেকে সব কিছু জেনে নাও’।
হিমু বলল, ‘কেন চুমু খেয়েছিল? তোমার আচরণে কোনওরকম কিছু ছিল নাকি?’
যাও বা একটু নরম হয়েছিলাম, আমার আগের বৈরাগ্যভাব আবার ফিরে এল। বললাম, ‘না। আমার কারো উপরেই কোনও কিছু নেই। ছিলও না। ওর ধারণা হয়েছিল হয়তো বাড়ি ফাঁকা থাকলে ওসব করা যায়। সেদিন তাড়িয়ে দিয়েছি। তারপর কলেজে উল্টোপাল্টা রটাচ্ছিল। সেখানেও যা বলার বলেছি’।
হিমু বলল, ‘আমি ছিলাম না, আর এর মধ্যে এত কিছু হয়ে গেল?’
আমি বললাম, ‘তুমি থাকলে কী করতে?’
হিমু কথা খুঁজে পেল না। একটু পরে চলে গেল। আমি চুপ করে বসে রইলাম। কিছুক্ষণ পর আবার এসে আমার সামনে বসে পড়ে বলল, ‘আমার খুব কষ্ট হচ্ছে নীপা। আমি তোমাকে ভালোবাসি। তোমাকে ছাড়া আমি কিছু ভাবতে পারি না। অনেক কষ্টে আমি নিজেকে সামলে আবার চাকরি করছি। তুমি আমার সঙ্গে চলো প্লিজ। এখানে থেকো না। এখানে থাকলে এরকম আজে বাজে ছেলে এসে তোমাকে ডিস্টার্ব করবে আর আমি দূর থেকে কিচ্ছু করতে পারব না’।
আমি বললাম, ‘ঠিক আছে। আমি ভেবে দেখছি’।
হিমু বলল, ‘কী ভাববে? কত ভাববে?’
আমি বললাম, ‘ভাবি, আরেকটু ভাবি’।
হিমু আর কিছু বলল না। আমার সামনে বসে রইল।
৫৮
‘তোকে আমি কোনওদিন কিছু বলি না, কিন্তু তোকে বিপ্লবকাকুর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে’।
দরজা খুলতেই মা এই কথাটা বলল।
আমি বললাম, ‘তুমি ঘরে এসো আগে’।
মা দরজাতেই দাঁড়িয়ে রইল, ‘আমি ঘরে ঢুকব না। তুই ফোন করে আগে বিপ্লবকাকুর কাছে ক্ষমা চাইবি’।
আমি বললাম, ‘কেন ক্ষমা চাইতে হবে?’
মা বলল, ‘তুই বিনা কারণে ওর সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করলি কেন?’
আমি বললাম, ‘দিনের পর দিন লোকটা এ বাড়িতে আসছে। ওর বউ আছে, কোনওদিন সে বউকে এ বাড়িতে আনে না। এখানে আসার পর তোমার সঙ্গে ন্যাকা ন্যাকা ভাবে কথা বলে। এমনকি আমাকে অবধি এবাড়ি ছাড়া করে অন্য কোথাও পাঠানোর প্ল্যান করছে। আমি এটা সহ্য করতে পারব না। ও লোক যেন এ বাড়িতে না আসে’।
মা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘরে ঢুকল। সোফায় বসে বলল, ‘আমরা একটা সমাজে থাকি। এখানে কার সঙ্গে কে কী কথা বলবে, সেটাও ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ একটা ব্যাপার। তুই এটা না করলেই পারতিস’।
আমি বললাম, ‘তুমি ওকে বলে দিও এ বাড়িতে যেন আর না আসে। আমার এ লোকটাকে পছন্দ হয় না’।
মা বলল, ‘আচ্ছা ঠিক আছে আমি বলে দেব। কিন্তু একবার ক্ষমা চাস। পাড়ার সবাই জেনে গেছে, ছি-ছি হচ্ছে। এটা মফস্সল তো, লোকজনের খেয়ে দেয়ে কাজ নেই, প্রচার করতে শুরু করে দেবে এ বাড়িতে বাজে কাজ হয়। লোকের নামে কাদা ছেটানোর ধান্দা থাকলে যে কোনও বিষয় থেকেই সেটা করা যায়’।
আমি আর তর্ক করলাম না। বললাম, ‘চা বসাব?’
মা বলল, ‘না। বসাতে হবে না। তুই হঠাৎ করে রেগে গেলি কেন?’
আমি বললাম, ‘হিমু এসেছিল। নিয়ে যেতে চাইছে। উনি সেটা শুনেই খুশি হয়ে গেলেন। আমার মনে হল তুমি এখানে একা থাকবে, সেটার সুযোগ নিতে চাইছেন’।
মা কয়েক সেকেন্ড আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তুই জানিস একজন মহিলার কাছে কতরকম প্রস্তাব আসতে পারে? তোর কোনও ধারণা আছে? তুই নিজে বুঝছিস না সেটা? তোর বাবা যেদিন থেকে চলে গেছে, সেদিন থেকে তো কম দেখিনি। নিজে ঠিক থাকলে কারো কিছু করার ক্ষমতা থাকে না। এটা মাথায় রাখিস’।
আমি বললাম, ‘একাকিত্ব থেকে অনেকরকম সমস্যা তৈরি হয়’।
মা শান্ত স্বরে বলল, ‘তোর আমাকেও কি তাই মনে হয়?’
আমি গোঁজ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। মা শ্বাস ছাড়ল, ‘তোর দোষ নেই। আমি তোকে দোষ দিই না। আয়, আমার কাছে আয়’।
আমি মাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললাম।
মা আমার বুকে পিঠে হাত বুলিয়ে দিল অনেকক্ষণ ধরে। নরম গলায় বলল, ‘খুব কষ্ট হয় না তোর?’
আমি বললাম, ‘ও লোক যেন এ বাড়িতে না আসে মা। আমি খুব ঝামেলা করব’।
মা বলল, ‘আসবে না। আজকে যা করেছিস, বিন্দুমাত্র চক্ষুলজ্জা থাকলে আর আসবে না। কিন্তু এলে বাজে ব্যবহার করে তাড়াস না। ভালো করে বুঝিয়ে বলিস যে তোমার এখানে আসাটা ভালো দেখায় না, তুমি আর এসো না, কেমন?’
আমি বললাম, ‘তুমি নিশ্চয়ই এরকম করেই বলেছিলে। তো তারপরেও এসেছিল?’
মা এবার হেসে ফেলল, ‘হ্যাঁ, বলেছিলাম’।
আমি বললাম, ‘দেখলে তো? ভালো কথার লোক না?’
মা চুপ করে আমার মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে থাকল। একটু পরে বলল, ‘ঠিক আছে, চল ঘুরে আসি’।
আমি বললাম, ‘কোথায়?’
মা বলল, ‘তৈরি হয়ে নে। বলছি’।
আমি তৈরি হয়ে নিলাম। বাড়িতে তালা দিয়ে বেরোলাম মায়ের সঙ্গে। মা রিকশায় উঠল।
কিছুক্ষণ পরে আমরা বিপ্লবকাকুর বাড়িতে পৌঁছলাম।
বেল দিতেই বিপ্লবকাকু এসে দরজা খুলল। মা হাসল, ‘ভালো আছেন?’
বিপ্লবকাকু ফ্যাকাসে হয়ে গেল, ‘আপনারা?’
মা বলল, ‘নীপা ক্ষমা চাইতে এসেছে। বউদি কোথায়?’
বিপ্লবকাকু সভয়ে ঘরের ভেতরটা দেখে বলল, ‘বাইরে গেছে। আপনারা আসুন এখন’।
মা বিপ্লবকাকুকে একরকম ঠেলে ঘরের মধ্যে ঢুকে ‘বউদি, বউদি’ বলে ডাকতে শুরু করল।
বিপ্লবকাকুর বউ বেরিয়ে এল।
মা হাসিমুখে বলল, ‘আগামী রবিবার আপনারা আমাদের বাড়ি খাবেন। বিপ্লবদা রোজ আমাদের বাড়ি যান, কতবার বলেছি, আজ একবারে চলেই এলাম’।
বিপ্লবকাকুর বউ অবাক হয়ে ওর দিকে তাকাল। বিপ্লবকাকু হেঁহেঁ করে ‘বসুন বসুন, আমি একটু মিষ্টি নিয়ে আসি’ বলে পালিয়ে গেল।
৫৯
‘এই কাজটা আমাদের অনেক আগে করা উচিত ছিল। অকারণে বিপ্লবকাকুকে এতদিন এন্ট্রি দিয়েছিলে’।
বাড়ি ফেরার পথে মাকে বললাম।
হাওয়া দিচ্ছে সুন্দর। আমি আর মা ফিরছি। সত্যিই তো, কতদিন দুজনে একসঙ্গে কোথাও যাইনি। বিপ্লবকাকুদের বাড়িতে গেছি, তাতেই কী ভালো লাগছিল।
আমার কথার উত্তরে মা বলল, ‘মানুষকে শুরুতেই খারাপ ভাবতে যাই না কখনও। হয়তো ও খারাপ ভেবে আসেনি’।
আমি রেগে গেলাম, ‘এখনও তোমার তাই মনে হয়? বাড়িতে বলেনি কেন তাহলে?’
মা বলল, ‘জানি না রে। সব কিছু এত সরলভাবে ভাবলে তো হয়েই যেত। তবে হ্যাঁ, ওর আমাদের বাড়িতে আসাটা ঠিক হচ্ছিল না। আমারও তাই মনে হয়েছিল। যা হয়েছে, ভালোর জন্যই হয়েছে’।
দিদা কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বলল, ‘তরে কইসিলাম না, তোর মারও চুলকানি আছে?’
আমি সংকুচিত হলাম। কী বাজে লাগল কথাটা শুনতে! অস্বস্তি হতে শুরু করল।
রাস্তায় যেতে যেতেই একটা লোককে প্রায় ‘বাবা’ বলে ডেকে ফেলছিলাম। আমার বাবা যেমন হাঁটে, একবারে সেভাবে হেঁটে যাচ্ছিল। রিকশা লোকটাকে পেরোনোর সময় ভুল বুঝলাম।
মা নরম গলায় বলল, ‘আমাদের কোথাও বেড়াতে যাওয়া দরকার। এভাবে বাড়িতে থেকে তোর বেশ সমস্যা হচ্ছে’।
আমি বললাম, ‘কোথায় যাবে?’
মা বলল, ‘তুই বল কোথায় যাবি?’
আমি বললাম, ‘আমি কিছু জানি না, তুমি ঠিক করো। চলো ঘুরে আসি’।
মা বলল, ‘ঠিক আছে। দেখছি কোথায় যাওয়া যায়’।
আমি বললাম, ‘আবার বিপ্লবকাকুর ফ্যামিলির সঙ্গে যাওয়া প্ল্যান করো না’।
মা বিরক্ত গলায় বলল, ‘এ আবার কী? এটা কী বললি তুই?’
আমি জিভ কাটলাম। বেশি বলে ফেলেছি। বললাম, ‘আমার মাথা কাজ করছে না। তুমি কিছু মনে কোরো না’।
মা বলল, ‘তোর সেই সমস্যাটা হচ্ছে বল? একটা কথা মাথায় ঢুকে গেলে সেটাই ঘুরে যাচ্ছে। অন্য আর কিছু ভাবতে পারছিস না’।
মা ঠিকই বলেছে। এই সমস্যা আমার বরাবরের। বললাম, ‘হুঁ, ছাড়ো। এই নিয়ে কথা বলব না। বললেই মাথায় এই কথাগুলো ঘুরতে শুরু করবে’।
মা বলল, ‘ঠিক আছে। বলব না। কিন্তু রবিবার যদি সত্যি এরা আমাদের বাড়ি নেমন্তন্ন খেতে চলে আসে?’
আমি বললাম, ‘তখন রান্না বসানো যাবে’।
মা বলল, ‘তার থেকে কালকেই বেড়াতে চলে যাই চল। যা টিকিট পাবো, কেটে ট্রেনে বসে পড়ব। পাহাড়ে গেলে সোয়েটার নিতে হবে, সমুদ্রে গেলে অত ঝামেলা নেই। পুরী ঘুরে আসি চল’।
আমি বললাম, ‘চলো’।
মা বলল, ‘তোর মধ্যে উৎসাহ দেখছি না কেন?’
আমি বললাম, ‘বুঝতে পারছি না। উৎসাহী হবার দরকার ছিল হয়তো। কিন্তু হচ্ছি না’।
মা শ্বাস ছাড়ল, ‘ঠিক আছে। বাড়ি গিয়ে গোছগাছ শুরু কর। দেখ ভালো লাগে নাকি’।
বাড়ি পৌঁছে দেখি গেটের সামনে হিমু দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে মার সঙ্গে দেখে অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে হাসল।
মা বলল, ‘কেমন আছ তুমি?’
হিমু বলল, ‘ভালো আছি। আপনি ভালো আছেন?’
মা বলল, ‘হ্যাঁ। এসো। ঘরে এসো’।
যতক্ষণ মা দরজার তালা খুলল, হিমু চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। দরজা খুলতেই হিমু বসার ঘরে বসল।
মা বলল, ‘চা খাবে?’
হিমু বলল, ‘না। আমি আগেও এসেছিলাম। আবার এলাম। বারবার বিরক্ত করা ঠিক না। কিন্তু আমি চলে যাব, না বলে গেলে সমস্যা বাড়বে’।
আমি চমকালাম একটু। হিমু কেমন বয়স্ক মানুষের মতো কথা বলছে। পরিণত কথাবার্তা। মা বসে বলল, ‘বলো’।
হিমু বলল, ‘বাড়ি থেকে আমাকে এই বিয়েটা ভাঙার জন্য চাপ দিচ্ছে। আমি বিয়ে ভাঙতে চাইছি না। আমি একটা সময় ঘোরে ছিলাম। এখন সে ঘোর কেটে গেছে। তবুও বিয়েটা ভাঙতে চাই না। এর মধ্যেই আমি বাইরে চলে যাব। নীপা যদি আমার সঙ্গে যেতে চায়ে, যেতে পারে। যদি মনে করে এখন যাবে না, পরে যাবে, তাও করতে পারে’।
মা আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তুই কী চাইছিস?’
আমি হিমুকে দেখলাম। হিমু কেমন সাগ্রহে আমার মত শুনতে চাইছে।
বললাম, ‘আমরা পুরী যাব। ঘুরে এসে দেখা যাবে। তখন জানাই?’
হিমু মাথা নাড়ল, ‘ঠিক আছে। কিন্তু একটা কথা বলো, তুমি কি বিয়েটা ভাঙতে চাও?’
আমি অন্য দিকে তাকালাম, ‘জানি না’।
