নীপাদের বাড়ি – ৩৫

৩৫

এই যে এত এত টাকা খরচা করে বিয়ে হয়, এত গয়না, এত লোক খায়, এত ছবি তোলা, তারপর কী হয়? আমার কী হল?

নিশি আজ আমার সঙ্গে শুয়েছে। নিশির বাচ্চা কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছে। নিশির দুঃখ ওর বাচ্চা নাকি হিন্দিতে কাঁদে। কান্নার ভাষা হয় নাকি, সে তো এমনিই অ্যাঁ-অ্যাঁ করতে করতে ঘুমিয়ে যায়, জিগ্যেস করতে বলল তুই বুঝবি না। ভাষা আছে। আমি বুঝিনি। কিন্তু নিশি নাকি ঠিকই বোঝে। আমি বললাম, ‘এই নিশি’।

নিশি ঘুমের ঘোরে বলল, ‘বল’।

আমি বললাম, ‘ভেবে দেখলাম তুইই ঠিক। বাপের বেশি টাকা খরচা করাসনি, পালিয়ে গেছিলি। আমার বাবাও ঠিক। পালিয়ে বিয়ে করাটাই ঠিক’।

নিশি হাই তুলে বলল, ‘না। বিয়ে করাটাই ভুল’।

আমি বললাম, ‘সেটাও ঠিক’।

নিশি বলল, ‘মকবুলের উপর আমার টান চলে যাচ্ছে। আমি ভেবেছিলাম পাগলের মতো চলে আসবে। আমার কাছে এসে পায়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে। তা তো এল না। নিশ্চয়ই আরেকটা জোগাড় করেছে। পুরুষ মানুষ শাহজাহানের বংশধর ভাই। গাদা গুচ্ছের বিয়ে করে, খেয়াল হলে একটা বউয়ের নামে তাজমহল করে। সে বউ আবার বাচ্চা বিয়োতে বিয়োতে পটল তোলে। ভালোবাসা না ছাই, সবই শোয়ার তাল’।

আমি বললাম, ‘শুধু শোবে? আর কিছু করবে না?’

নিশি রেগে গেল, ‘ন্যাকামি করিস না তো। ভাল্লাগে না। মকবুল কী করত জানিস? এই শীতের রাতে আমি শুয়ে আছি, সারাদিন দেখা নেই। মাঝরাতে এসে শুরু করবে। কেমন লাগে বল? দূর দূর! সব ফালতু। এসবের কোনও মানে নেই। অত প্রেম, এখন দেখ’।

আমি বললাম, ‘ঠিকই। তুই ঠিক বলেছিস’।

নিশি বলল, ‘বাচ্চাটাকে মানুষ করতে হবে ভাই। কত ঝামেলা। এখানে স্কুলে ভর্তি করো, বাচ্চা মানুষ করো। বাবা বলছে ছেলে দেখছে। বাচ্চাটাকে হোস্টেলে দিয়ে দেবে। সে বাড়িতে মকবুলের কথা চেপে বিয়ে করতে বলছে। ওরকম চাপা যায় বল? আমার তলা তো এখন সুয়েজ খাল। সবাইকে বোকা ভাবা ঠিক?’

আমি ঘাবড়ে গেলাম, ‘তোর বাচ্চা হয়েছে, শ্বশুর বাড়ির লোক পরে বুঝবে না? এভাবে সব চেপে যাওয়া যায় নাকি?’

নিশি বলল, ‘সেটাই তো বলছি। বাবা পেগলে গেছে। মকবুল থাকলে কী আমি এসব ভাবতাম?’

আমি বললাম, ‘তুই এক কাজ কর না। হিমুকে নিয়ে ভেগে যা’।

নিশি বলল, ‘ধুর। ও আমাকে নিয়ে যাবে কেন? ও তোকে ভালোবাসে’।

আমি বললাম, ‘আমি বাসি না। তুই নিয়ে যা’।

নিশি কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, এমন সময় ওর ফোন বেজে উঠল। স্ক্রিনের দিকে দেখেই নিশি উত্তেজিত হয়ে বসে ফোন কানে নিয়ে কথা বলতে শুরু করল।

কেমন চোস্ত উর্দুতে কথা বলতে শুরু করল। হেবি তো! এর মধ্যে এত কিছু শিখে গেছে?

ফোন রেখে নিশি উত্তেজিত ভাবে বলল, ‘অনেক দিন বাঁচবে ভাই। ফোন করেছিল। স্টেশনে এসে গেছে। আসছে নিতে’।

আমি ঘাবড়ে গিয়ে বললাম, ‘সে কী রে! এখন?’

নিশি তাড়াতাড়ি খাট থেকে নেমে বলল, ‘হ্যাঁ। এখন। বাবা জানতে পারলে আমাকে জীবনেও যেতে দেবে না। আমি এখান থেকেই মোড়ের মাথায় চলে যাই’।

আমি বললাম, ‘এখনই যাবি? আর জামাকাপড়?’

নিশি বলল, ‘আর কখন যাব? এখনই যেতে হবে। জামাকাপড় পরে দেখছি। দাঁড়া, ব্যাটাকে কোলে নিই’।

বাচ্চাকে কোলে নিয়ে নিশি হড়বড় করে বেরিয়ে গেল।

আমার বুক ধড়ফড় করছিল। আমি বাইরের দরজা বন্ধ করে ঘরে এসে কোনওরকমে বসলাম।

এরকম করে হয় নাকি? ব্যাগটাও নিয়ে যাবে না? কেমন যেন ঘোরের মাথায় চলে গেল। যেন সত্যিই নিশিকে নিশি ডেকে নিয়ে গেল।

কিন্তু আমি কী করব? আমি কীই বা করতে পারি?

চোখ বুজলাম খাটে শুয়ে।

বেশিক্ষণ শুতে পারলাম না। হই হই শব্দ আসতে লাগল। তাড়াতাড়ি বাইরে বেরিয়ে দেখি পাড়ার সব লোক বেরিয়ে এসেছে। আরেকটু পরে বুঝলাম, মকবুল ধরা পড়েছে।

তাকে মাঝরাস্তায় হাতে পায়ে দড়ি বেঁধে ফেলে রাখা হয়েছে। এবার নাকি বিচার হবে।

ভয়ে আমার হাত পা পেটের ভেতরে ঢুকে গেল।

৩৬

ছোটবেলার কথা মনে পড়ে মাঝে মাঝে। কেমন না চাইতেই চলে আসে। মাসি আসত আমাদের বাড়িতে। মা রান্না করছে। কত মজা হত। বাবার সঙ্গে মাসি কথা বলছে। মাংস রান্না হয়েছে। সবাই মিলে খেতে বসলাম। আমায় বাবা খাইয়ে দিচ্ছে।

সে মাসির সঙ্গে বাবা পালিয়ে গেল।

স্মৃতি যে কোনওদিন এভাবে পাথরের মতো বুকে এসে সজোরে ধাক্কা মারতে পারে, তা আমি কোনওদিন বুঝিনি। স্মৃতি সতত সুখের নয়। আমার সুখের স্মৃতিগুলোও দুঃস্বপ্ন হয়ে যায় এ কথা ভাবলে, যার সঙ্গে আমার মা ভালো সময় কাটিয়েছে, সেই বোনই বাবাকে মার থেকে কেড়ে নিয়েছে। মার নিজের মায়ের পেটের বোন নয় ভাগ্যিস।

এই যে মকবুলকে পাড়ার ক্লাবে আটকে রাখা হয়েছে, আমরা সবাই মিলে শীতের রাতে কাঁপতে কাঁপতে দেখতে এসেছি, তার মধ্যে এই কথাগুলো আমার কেন মনে পড়ল জানি না। মনে পড়া উচিত না। কিন্তু আমার মনে পড়ল। জীবনটাই এরকম।

মকবুল আর নিশির বাবাকে সামনা সামনি বসানো হয়েছে। নিশির বাবা হিন্দি বলার প্রাণপণ চেষ্টা করছে, মকবুলের দিকে আঙুল তুলে কাকু বলল, ‘তুমি আমার লাড়কিকো নিয়ে ভাগতে এসেছ?’

মকবুল স্পষ্ট বাংলাতে বলল, ‘আমার বিবি, ওকে নিতে এসেছি’।

নিশির বাবা জোরে জোরে মাথা নাড়তে শুরু করল, ‘হবে না। আমি দেব না। আমার মেয়েকে নিতে দেব না’।

নিশির বাচ্চা চিৎকার করে কাঁদছে। ভিড়ের মধ্যে পাড়ার একজনের গলা পেলাম, ‘কুড়ি টাকা কুড়ি টাকা, নিশি যাবে না। আমি কুড়ি টাকা দিচ্ছি’।

আরেকজন বলল, ‘আমি এখনও যাবার দিকেই দেব। একশো। একশো দেব। আছে কেউ?’

নিশিকে অন্য ঘরে রাখা হয়েছে। বাচ্চা সামলাচ্ছে। আমি ওর কাছে গেলাম। নিশি পাংশু মুখে বলল, ‘কী বুঝছিস?’

আমি বললাম, ‘জানি না। তোদের ধরল কী করে?’

নিশি বলল, ‘বাচ্চাটা কেঁদে উঠল। কী করব বল? কপাল আমার। এবার কী হবে?’

আমি বললাম, ‘তুই বাজি ধর কী হবে। ওরা ধরছে’।

নিশি উত্তেজিত হয়ে উঠল, ‘কে টাকা জমা নিচ্ছে, বলাই? তুই ধর তো’।

ওর ক্রন্দনরত বাচ্চাকে আমার হাতে তুলে দিয়ে নিশি ‘এই বলাই, এই বলাই’ বলে চিৎকার করতে করতে চলে গেল। নিশির বাচ্চা কিছুতেই থামে না।

মিনিট পাঁচেক পরে নিশি বাচ্চাকে আবার কোলে নিয়ে পিঠে চাপড় মারতে মারতে বলল, ‘মকবুল যখন এসেছে, আমি ফিরবই। দেখে নিস’।

আমি আবার ও ঘরে গেলাম। পুলিশ এসেছে। নিশির বাবাকে পুলিশ কী সব বোঝাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর মকবুলকে নিয়ে চলে গেল।

নিশির বাবা রাগী মুখে নিশির কাছে এসে বলল, ‘যা, ঘরে গিয়ে ঘুমা। মান সম্মান রাখলি না’।

নিশি ব্যাকুল গলায় বলল, ‘ওকে নিয়ে গেল কেন? কী করেছ তোমরা? এই নীপা, দেখ না কী হল’।

আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না। ভিড়, নিশির বাচ্চার তারস্বরে কান্না, লোকজনের চিৎকারে আমি কিছু বুঝে ওঠার আগে নিশিকে টানতে টানতে ওর বাবা ওদের বাড়িতে নিয়ে গেল। নিশি যাবে না বলে যারা বাজি ধরেছিল, তারা আনন্দে লাফালাফি করছে।

এই সময়টাই আমার কী যেন হল, সব কিছু টলতে শুরু করল, বুক ধড়ফড় করতে লাগল। আমি কোনওমতে দৌড়ে ঘরে এসে দরজা বন্ধ করে সোফায় বসলাম। গোটা শরীরে প্রবল একটা অস্বস্তি হচ্ছে। বমি পাচ্ছে। ঘামতে শুরু করেছি।

এরকম কেন হচ্ছে জানি না। মকবুলকে নিয়ে নিশি আর কাকুর টানাপড়েন দেখে হল নাকি তাও বুঝলাম না। তবে শরীর খারাপ লাগছিল রীতিমতো। নিজের ঘরে গিয়ে চমকে গেলাম। হিমু বসে আছে।

আমাকে দেখে লাজুক গলায় বলল, ‘আমি তোমার সঙ্গে শুই? উপরে ভয় লাগছে’।

আমি ওকে তাড়াতে পারলাম না। অস্বস্তিটা তখনও হচ্ছিল। শুধু বললাম, ‘সোফায় শোও’।

হিমু ভালো ছেলের মতো সোফায় গিয়ে শুয়ে পড়ল।

৩৭

ভালোবাসার বয়সের এক একটা ভাগ হয়। জ্ঞানবুদ্ধি হবার সময় ভালোবাসার আবেগ আকাশ ছোঁয়া থাকে। আমি যেমন কতকিছু ভাবতাম। ক্লাস নাইনেও। মাধ্যমিকের সময় বাবা পালিয়ে যাবার আগেও।

একটা না একটা মানুষকে নিয়ে স্বপ্ন দেখা চলেই। সে লোকের গা থেকে গন্ধ বেরোয় নাকি, দাঁত মাজে নাকি, হেগে ঠিক করে ছোঁচে নাকি, তখন সেসব মাথায় থাকে না।

পাড়ার ইলেক্ট্রিশিয়ান বিজনদাকে নিয়ে আমি হেবি স্বপ্ন দেখেছিলাম। বিজনদা কী সুন্দর সরস্বতী পুজোর সময় পাড়ার প্যান্ডেলে আলো লাগাত। গম্ভীর মুখে কাজ করত।

আমি যে লাইন মারতাম, বুঝত না। কাছে গিয়ে দাঁড়াতাম ওই সময়টা, ‘বিজনদা, একটা ভালো গান দাও না’।

বিজনদা কুমার শানুর গান চালিয়ে দিত। আমার হেবি আনন্দ হত। সেই শীত চলে যাবার সময় ‘রাহো মে উনসে মুলাকাত’ চলছে, আর আমি চেয়ারে বসে বিজনদাকে ঝাড়ি মারছি।

বিজনদা জীবনেও বুঝল না। মাধ্যমিকের টেস্টের সময় বিয়ে করে নিল। টেস্টই তো নাকি? কে জানে! হবে কিছু একটা।

আমি হেবি কাঁদলাম একা একা। তারপর দেখলাম ওদের বাড়িতে ফুচকার স্টল হয়েছে। যত চাই ফুচকা দিচ্ছে। তাও ফ্রি। ইয়ার্কি নাকি?

মাথা থেকে সব বেরিয়ে গেল। এক গাদা ফুচকা খেলাম। এমন খেলাম যে ভাত খেতে গিয়ে দেখা গেল আর খেতে পারছি না। বাবা রেগে গেল, ‘কী খেয়েছিস যে খেতে পারছিস না?’

আমি কাঁদো কাঁদো মুখে বললাম, ‘ফুচকা’।

বাবা গজগজ করতে লাগল।

এখন বিজনদা একটা লুঙ্গি পরে লোমশ ভুঁড়ি বের করে ক্যারাম খেলে। আমি দেখলেই ভাবি কত বড় দুই অক্ষর হলে এই লোককে আমি পছন্দ করেছিলাম।

একটা সময় অবধি আমরা সবাই সেটাই থাকি। পরেও যে সেটা বদলায়, তা নয়। পরে গিয়ে দেখা যায় আরও বড় দুই অক্ষর হয়ে গেছি।

আর আমি হিমুকে নিয়ে ক্লান্ত বোধ করছি।

সকালের খাবার দিতে গিয়ে দেখছি হিমু ঠ্যাঙের উপর ঠ্যং তুলে শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে কত কিছু ভাবছে। আমার মনে হল, এ তো ভারি আনন্দে আছে!

এদিকে আমার হাল খারাপ হয়ে যাচ্ছে এর খাবার নিয়ে উপর নিচ করতে করতে। টেবিলের উপর ট্রে রেখে বললাম, ‘তুমি কবে যাবে?’

হিমু হাসি মুখে বলল, ‘যাব না ঠিক করেছি। দোকানের প্ল্যানটা নিয়েই ভাবছিলাম। এ পাড়ার ডিমান্ড নিয়ে রিসার্চ করব। তুমি একটা হেল্প করো। পাড়ার লোকেদের কী কী লাগে?’

আমি বললাম, ‘মুদির দোকান আছে’।

হিমু বলল, ‘রাইট। একটা থাকলে আরেকটা দোকান দিয়ে লাভ নেই। বাঙালির সমস্যা একটাই। যেখানে অলরেডি একটা মুদির দোকান আছে, সেখানে আরেকটা মুদির দোকান দেবে কেন? সেখানে মাছের দোকান দেবে, মাংসের দোকান দেবে। আমি ভাবছি মাছের দোকান দেব। তুমি মাছ কাটবে। আমি বিক্রি করব। হাই মার্জিন বিজনেস’।

দিদা বলল, ‘মোড়ের মাথায় দাঁড়াইতে ক হারামজাদারে, ওর দিয়া বেশি কামাইবোনে। সবাই মাইরা যাইব, আর হাতে দশ টাকা দিয়া যাইবোনে’।

আমি সশব্দে হেসে উঠলাম। হিমু অবাক হয়ে বলল, ‘কী হল? হাসছ কেন?’

আমি বললাম, ‘তুমি কিছু পারবে না। এখানে আমার মার টাকায় খাবে আর ঘুমাবে’।

হিমু বলল, ‘তুমি কি কোনওভাবে আমাকে অপমান করার চেষ্টা করছ?’

আমি বললাম, ‘সে বোধ তোমার থাকলে আমাকে এত কষ্ট করতে হত?’

হিমু হাসিমুখে খাবারের ট্রে নিয়ে বলল, ‘তা ঠিক। নিজের লোকেদের কাছে আবার লজ্জা কী? তোমরা কি পর?’

আমি বললাম, ‘পরই। তুমি এবার যাও। অনেক হল’।

হিমু বলল, ‘তাড়িয়ে দেবে?’

আমি বললাম, ‘না। এটাকে তাড়ানো বলে না। এখানে এভাবে তোমার থাকাটা সলিউশন না’।

হিমু বলল, ‘সলিউশন ভেবে নেব ঠিক। ওটা নিয়ে মাথা ঘামিও না। আমি তোমার সঙ্গে থাকতে পারলেই খুশি’।

আমি কঠিন গলায় বললাম, ‘আমি খুশি না। আমার কোনও আনন্দ হচ্ছে না তুমি থাকায়। আমি তোমাকে ভালোওবাসি না। খামোখা আছ তুমি। আমার মনে হয় তোমার চলে যাওয়াই ভালো। না গেলে পাড়ার লোকেদের বলে দেখি, ওরা নিশির বরকে তাড়িয়েছে, তোমাকে তাড়াতে পারবে। এরা ভালো তাড়াতে পারে’।

হিমু করুণ মুখে আমার দিকে তাকিয়ে রইল।

৩৮

‘ফেসবুক হল নিজেকে লিবারাল প্রমাণ করার জায়গা। বুঝলি? ওখানে বেশিরভাগই বামপন্থী নাস্তিক, ফোন পকেটে রেখে রাস্তায় বেরিয়ে শনি মন্দির দেখলে প্রণাম করে। ফেসবুকে কাজের লোককে লেখে গৃহ সহায়িকা। আর ফোন পকেটে ঢুকিয়ে একদিন না এলে মাইনে কেটে নেয়’।

অনীশ আমাদের ইউনিয়ন লিডার।

অফ পিরিয়ডে ক্লাসে বসেছিলাম। অনীশ সবাইকে ফেসবুক বোঝাচ্ছে। অনীশ ব্রাইট ছেলে। চোখ মুখ থেকে ওর জ্যোতি বেরোয়। আমার সমবয়সী না হলে নিশ্চয়ই প্রেমে পড়তাম। কিন্তু আমার সমবয়সী ছেলে নিয়ে সমস্যা আছে। আমাকে দিদা বলেছিল বাবা মা সমবয়সী বলেই বাবা পালিয়েছে। মেয়েদের যৌবন আগে শেষ হয়। ওখানের জ্বালাও তাড়াতাড়ি শেষ হয়। সমবয়সী যৌনসঙ্গীর তখন জ্বালা বাড়ার আদর্শ সময়। তার খিদে না মিটলে সে পালাবেই।

আমি বলেছিলাম সবাই পালায় না। দিদা পান চিবোতে চিবোতে বলেছিল, ‘না পালাইলে নাড়ায়। অন্যেরে ভাইবা নাড়ায়। বুঝস? তোর বর তোরে না চাইয়া অন্য মাগিরে লইয়া ভাইবা নাড়ায়। তুই খুশি হবি?’

‘অ্যাই নীপা, তোকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছি। অ্যাক্সেপ্ট করিসনি কেন?’ অনীশ কখন আমার সামনে চলে এসেছে দেখিনি। বললাম, ‘আমার স্মার্ট ফোন নেই। বন্ধুর আছে। ও-ই প্রোফাইল বানিয়ে দিয়েছিল’।

অনীশ হাঁ করে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘সেকি রে? তুই কি গুহামানব, সরি মানুষী?’

আমি হাসলাম, ‘বাবা পালিয়েছিল ছোটবেলায়। তারপর ওসব নিয়ে ভাবার সময় পাইনি’।

অনীশ ঘাড় নাড়ল, ‘রাইট। ক্লাস স্ট্রাগল। তোর ব্যাপারটা আমি জানি। কাকিমা ছিলেন বলে স্ট্রাগলটা এখনও অতটা করতে হয়নি। মানুষ স্ট্রাগল ভুলে যায় আফিম পেলে। তুই ভুলতে পারিসনি। কারণ তোকে ওই সময় থেকেই টিকে থাকতে হয়েছে। বাপের টাকায় খাওয়া লোক স্ট্রাগল বুঝবে কী করে?’

আমার সব মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। আমি বললাম, ‘থাক ভাই। তুই আমাকে পলিটিক্স বোঝাস না। অত বুঝি না’।

অনীশ রেগে গেল, ‘বুঝিস না মানে কী? না বুঝলে টিকে থাকবি কী করে? তুই কি জানিস তোর বাবার পালিয়ে যাওয়াটাও আসলে রাজনীতি না বোঝার ফল?’

আমি ঘাবড়ে গেলাম, ‘মানে?’

অনীশ বলল, ‘এটাকে বলে মূল্যবোধের পতন। মানুষ ভালোবাসার মূল্যবোধকেও পাত্তা দিচ্ছে না। কেন? তাদের আইডল নেতারা তাদের বউকে ছেড়ে আরেকজন বিবাহিত মেয়েকে নিয়ে থাকছে। মিডিয়া সেটাকে সেনসেশনাল নিউজ হিসেবে দেখাচ্ছে’।

রজত খচে গেল, ‘এই অনীশ, সব ব্যাপারে পলিটিক্স টানবি না। তোদের পলিটিক্স আমাকে শেখাবি না, ঘরে হাজব্যান্ড ওয়াইফের মধ্যেও তোরা পলিটিক্স ঢুকিয়েছিস। তোদের দলে এসব হয়নি?’

অনীশ বলল, ‘হয়েছে তো। কিন্তু সেটা মিডিয়ায় নিয়ে গিয়ে অমর প্রেম কথা প্রচার হয়নি’।

আমার সামনে একটা ভয়াবহ রাজনৈতিক ক্যাচাল শুরু হয়ে গেল। আমি এই জিনিসটা ভয় পাই। পৃথিবীতে সবাইকে সব কিছু বুঝতে হবে তার দায় নেই, কিন্তু কমবয়সী ছেলেদের রাজনৈতিক ঝগড়ার থেকে ঝামেলার কিছু হয় না।

আমি সরে পড়লাম। ক্লাসে বসে থাকলে রোজ কিছু না কিছু ঝামেলা লাগবেই। অনীশ কিন্তু ওখানে ঝগড়া করল না। আমার পেছন পেছন এসে আমাকে পাকড়াও করল, ‘এই শোন না। পালাচ্ছিস কেন?’

আমি বললাম, ‘এসব পোষায় না বলে। তুই একটু পরে মার খাবি, সেটাও আমি দেখতে পাচ্ছি’।

অনীশ বলল, ‘মার খাব কেন? কেউ মারবে না, আমাদের ঝগড়া চলে কিন্তু মারামারিতে যায় না। পলিটিক্স সেটাই বলে’।

আমি বললাম, ‘বলুক। আমি ভাই এমনিতেই অনেক ঝামেলায় আছি। আর ঝামেলায় যেতে চাই না’।

অনীশ বলল, ‘আমি সেই ঝামেলার ব্যাপারেই জানতে চাইছি। আমরা সবাই দেখেছি তুই চুপচাপ বসে থাকিস। তোর বিয়ের ব্যাপারটাও জানি। আমরা তো তোর বন্ধু। তুই আমাদের সঙ্গে শেয়ার করিস না কেন?’

আমি অবাক হলাম। এসব নিয়ে ওরা আলোচনা করে নাকি? বন্ধু মানে কী? আমার বন্ধু তো ছোট থেকে নিশি। নিশির সব আমি জানি, আমার সব নিশি জানে। অনীশরা আবার কেন জানবে?

আমি বললাম, ‘করিনি। তোরা কেউই আমার ক্লোজ বন্ধু না বলেই করিনি’।

অনীশ বলল, ‘এবার থেকে করবি। সবাই সবার পাশে থাকবে। তাহলে কেউ আর একা বোধ করবে না। বুঝলি?’

আমি বললাম, ‘বুঝলাম না। আমি আবার তোদের মাথায় কবে ঢুকলাম? কবে সাবজেক্ট হলাম?’

অনীশ বলল, ‘আমাদের না। আমার। আমার মনে হয় তোর বড় কোনও সমস্যা আছে। আর সেটা তুই কারো সঙ্গে শেয়ার করতে পারিস না। তুই চাইলে আমাকে বলতে পারিস’।

আমি কঠিন মুখে বললাম, ‘না আমার কোনও সমস্যা নেই। আমি বাড়ি যাব’।

অনীশ বলল, ‘বাড়ি যাবি? চল তোকে ছেড়ে আসি’।

আমি শ্বাস ছাড়লাম। মহা উৎপাত শুরু হল তো!

অনীশ একটু খ্যাপাটেও বটে। সেদিন শুনছিলাম, বলছিল এই ভয়াবহ পচে গলে যাওয়া সমাজে সবার আগে মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সব কিছু নতুন করে শুরু করতে হবে।

শুরু করলেই হবে? শেষ করবে না? পাশ করে যাবার পর চাকরি করতে বাইরে গেলে ক্লাস স্ট্রাগলের কী হবে? বললাম, ‘তুই অন্য কাউকে ধর। আমাকে ছাড়। আমার কোনও সমস্যা নেই’।

অনীশ বলল, ‘ঠিক আছে। কিন্তু সমস্যা হলে বলবি। আমরা আছি’।

আমি হেসে ফেললাম।

কেউ থাকে না আসলে। সবাই পরশ্রীকাতর আর নিজেরটা বুঝতে ব্যস্ত। আছি কথাটার থেকে মিথ্যে কথা আর কিছু হয় না।

৩৯

নিশিকে আটকে রাখা হয়েছে ওদের বাড়িতে। নিশি আর নিশির বাচ্চা দুটোকেই।

আমি ঢোকার চেষ্টা করেছিলাম। কাকু ঢুকতে দেননি। কোমরে হাত দিয়ে বলেছেন, ‘বাড়ি যা। তোরাই ওর মাথা খেয়েছিস’।

আমি ভালো মেয়ের মতো বাড়ি চলে এলাম। দিদা বারান্দায় বসে খিলখিল করে হাসছে, ‘মাথা খাইছে নাকি। মাথা খাইছোস তুই?’

আমি দিদাকে পাত্তা না দিয়ে বসলাম। রাস্তা দিয়ে একটা ছেলে গোলাপ নিয়ে যাচ্ছে। দিদা বলল, ‘গোলাপ নিয়া কই যায় ছ্যামরা?’

আমি বললাম, ‘গোলাপ দেয় মেয়েদের। তারপর হাঁটু গেড়ে বসে প্রপোজ করে। তুমি বুঝবে না’।

দিদা বলল, ‘বুঝুম না ক্যান? আমি কি গাধা? আমি সব বুঝি’।

আমি বললাম, ‘কী বোঝো?’

দিদা বলল, ‘ছ্যামরারা শোয়ার আগে গোলাপ দেবে, লজেন দেবে, আরও কত কী দেবে। শুয়া হইয়া গেলে পাত্তাও দেবে না। আরেকটা মাগির দিকে তাকায় থাকবে। ওই যে ছাওয়ালটা পইড়া আছে তগো বাড়িতে, তুই কী ভাবছোস শোয়া হইয়া গেলে আর থাকব? পালাইব’।

আমি শ্বাস ছাড়লাম। এটা আমিও বুঝতে পারি। সব কিছু আগে বুঝে যাওয়া ভালো ব্যাপার না। সমস্যার ব্যাপার। এগুলো না বুঝতে পারাই ভালো। সারসত্য বুঝে গেলে ভারি বাজে ব্যাপার হয়। তখন সবকিছু তেতো লাগে।

উপরের থেকে ঘণ্টার শব্দ আসছে। হিমুকে একটা ঘণ্টা দিয়ে আসা হয়েছে। কিছু দরকার হলে ও ঘণ্টা নাড়ায়। আমি আবার উপরে গেলাম। জিগ্যেস করলাম, ‘কী হয়েছে?’

হিমু হাসিমুখে বলল, ‘তোমার কথা মনে পড়ছিল। তাই ডাকলাম’।

আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, ‘রাখালের গল্পটা শুনেছ তো? পালে বাঘ পড়ার পর কিন্তু কেউ আসেনি। এরকম ফালতু কারণে ডেকে যাচ্ছ তুমি। এরপর সত্যি দরকার হলে আসব না’।

হিমু বলল, ‘তখন নীচে নেমে যাব। আমি ভেবেছি মাকে আর ভয় পাব না। তোমাকে বাড়ি নিয়ে যাব’।

আমি বললাম, ‘সেই একই কথা কেন বলে যাচ্ছ? আমি তো তোমার বাড়িতে যেতে চাই না। আমি চাই তুমি এবার বিদেয় হও’।

হিমু বলল, ‘আমি কোম্পানিতে ফোন করেছিলাম। ওরা জানিয়েছে আমার চাকরি আর নেই। পাওনা গণ্ডা বুঝিয়ে মেইল করে দেবে এর মধ্যেই’।

আমি ঘাবড়ে গিয়ে বললাম, ‘এবার কী হবে? অন্য চাকরি পাবে?’

হিমু আনন্দিত মুখে বলল, ‘না। এখন রিসেশন। কোথাও পাব না। তার উপরে আমার সেভিংস জিরো। একটা টাকাও নেই হাতে। আমার সঙ্গে সন্ন্যাসীর কোনও পার্থক্য নেই বুঝলে?’

কী ভালো কথা! আহা! আমার নাচতে ইচ্ছে করছে। হিমুর মা জানলে সব দোষ নিশ্চিন্তে আমাকেই দেবে। দিদা খাটের উপরে নাচতে নাচতে বলছে, ‘এবার কী করবি মাগি? আমারে মারছিলি, ভাবছিলি খুব আনন্দ হইছে? নে এইবার’।

আমি হিমুকে বললাম, ‘তুমি একটা কাজ করো। আমার বাবার বাড়ি চলে যাও। আমার বাবাকে আমার মা একটা মাসোহারা দেয়। মার সঙ্গে কথা বলে আমিও না হয় তোমার জন্য একটা মাসোহারা জোগাড় করব। আমার ভাই হবে। তুমি সেই ভাইকে কোলে নিয়ে ঘুরবে। সুখী পরিবার হবে’।

হিমু জিভ কেটে বলল, ‘ধুস, আমি তোমাকে ভালোবাসি। ও বাড়ি যাব কেন? আমি দোকান দেব’।

আমি বললাম, ‘দোকানের টাকা কে দেবে?’

হিমু বলল, ‘তুমি ধার দেবে’।

আমি আঁতকে উঠলাম, ‘আমি! আমি কোত্থেকে দেব?’

হিমু বলল, ‘কেন? তোমার কাছে নেই?’

আমি বললাম, ‘আমার কাছে দশ টাকাও নেই। তুমি দয়া করে এবার বাড়ি যাও। অনেক সর্বনাশ হয়েছে আমার। আর সর্বনাশ সহ্য করার ক্ষমতাটুকু নেই আর। যাও’।

হিমু বলল, ‘ভেবো না। সব ঠিক হয়ে যাবে’।

আমি বললাম, ‘কী করে ঠিক হবে?’

হিমু বলল, ‘ম্যানেজমেন্ট ক্লাসে শিখেছিলাম। সব খারাপ সময় ঠিক হয়। এটা তো কিছুই না। আমি ভালোবেসে থাকি এখানে। খারাপ ভালোর ব্যাপার নেই কোনও। ভালোবাসার দেবতা সব ঠিক করে দেবেন’।

আমি কিছু বললাম না, নীচে নেমে এলাম।

মা ঘরে ছিল। ঢুকে বললাম, ‘মা, এবার মনে হয় ওর বাড়িতে বলার সময় হয়েছে’।

মা জিজ্ঞাসু মুখে বলল, ‘কী হয়েছে?’

মা সব শুনল। শুনে বলল, ‘নীচে ডেকে নিয়ে আয়। দেখছি কী করা যায়’।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *