৪০
হিমু এসে মার সামনে বসেছে। সোফায় বসে পা দোলাচ্ছে। মা বলল, ‘তুমি কিছু ঠিক করলে?’
হিমু বলল, ‘নীপাকে সব বলে দিয়েছি আমি। আমার চাকরি নেই, সেভিংস নেই। এই মুহূর্তে আমি নিঃস্ব। আপনারা আমাকে লোন দিন, আমি দোকান দেব’।
মা একটা ডায়েরি বের করে শান্ত মুখে বলল, ‘আমি একজন সামান্য স্কুল শিক্ষক। আমার সীমিত সামর্থ্য। স্বামী পরিত্যক্তা। জানো আশা করি। তা সত্ত্বেও একটা বড় ঘরে নিজের একমাত্র মেয়ের বিয়ে দিতে গিয়ে আমাকে বারো লাখ টাকা লোন নিতে হয়েছিল। এই বারো লাখের মধ্যে পাঁচ লাখ টাকার গয়না আছে। পাঁচ লাখ টাকার গয়নায় কিছুই হয় না। আমার কিছু গয়না ছিল, সব মিলিয়ে মেয়েকে বিদায় দিতে পেরেছিলাম। সে গয়না উদ্ধার করতে আমার দম বেরিয়ে গেছে। এই বারো লাখ টাকা লোনের মধ্যে দশ লাখ টাকার ইন্টারেস্ট রেট অনেকটা বেশি। আমি কোনও রাজনৈতিক নেতা কিনে রাখা শিল্পপতি না যে লোন শোধ না করলে আমার কিছু হবে না। আমার জেল হতে পারে। বাড়িটাও চলে যেতে পারে। এত কিছুর পরে আমার মেয়েকে তোমরা তাড়িয়ে দিয়েছিলে। তারপরেও আমি তোমাকে এ বাড়িতে জামাই আদরে বসিয়ে রেখেছি। খাওয়াচ্ছি। কোনও অসুবিধে যাতে না হয়, সেটাও দেচ্ছি। তোমার এর পরেও মনে হয়, আমি তোমাকে টানতে পারব? তোমার মতো একজন মানসিক ভারসাম্যহীন ছেলে, যে একটা মেয়ের সঙ্গে থাকার জন্য চাকরি ছেড়ে দিতে পারে, তাকে টেনে আমার লাভ কী হবে বলতে পারো?’
হিমু মার কথাগুলো শুনে মাথা চুলকে বলল, ‘দশ লাখ তো নিয়েইছেন, আরও পাঁচ লাখ লোন নিয়ে নিন। তারপর একটা ভালো মাছের দোকান করব’।
মা বলল, ‘তোমাকে কথাগুলো বলার দরকার ছিল। বললাম। এবার তুমি উপরের ঘরে ফিরে যেতে পারো। তবে কী জানো তো, আমি আমার মেয়েকে চিনি। আমি এটুকু জানি, তুমি এখানে সারাজীবন হত্যে দিয়ে পড়ে থাকলেও ও তোমাদের বাড়ি যাবে না। তুমি বৃথা কষ্ট করছ’।
হিমু বলল, ‘আমি যদি এখানে থেকে যাই?’
মা বলল, ‘অকারণ থাকা হবে। আমার মেয়ে তোমার সঙ্গে ফিরবে না। আমি ওকে চিনি। ও আমার মতোই। তুমি যাও এবার। বাড়ি যাও’।
হিমু বলল, ‘কোথায় আর যাব? চাকরি চলে গেছে’।
মা বলল, ‘নিজের বাড়ি ফিরে যাও। বাড়ির লোকের থেকে আপন তো কেউ হয় না। তুমি এবার এসো’।
হিমু ব্যাজার মুখে কয়েক মিনিট বসে থেকে উপরে চলে গেল।
মা আমায় বলল, ‘দেখ কী করে। কাল অবধি দেখ। তারপর আমি দেখছি’।
আমি আর কিছু বললাম না। মার উপর আমার সম্পূর্ণ ভরসা আছে। এর পর কী করতে হবে মা সব জানে। অকারণ বেশি ভেবে লাভ নেই। মা বুঝুক, হিমুর সঙ্গে মা কী করবে।
আমাদের ক্লাসের রানির বয়ফ্রেন্ড অর্ঘ্য, রানির সঙ্গে ইংরেজিতে কথা বলে। সে ইংরেজির অর্ধেক ভুল। দুজন বাঙালি নিজেদের মধ্যে ইংরেজিতে কথা বলতে যাবে কেন আমি এটাই বুঝি না। ওতে কী লাভ হয়?
হিমুর সঙ্গে মা অবশ্য ইংরেজি বা হিব্রুতে কথা বলেনি। বাংলাতেই বলেছে।
এত কিছুর পরেও যদি হিমু না বোঝে, তাহলে সত্যিই সমস্যা।
হিমু রাতে রুটি মাংস খাবার ইচ্ছে প্রকাশ করেছে। মা বলে দিয়েছে, কুমড়োর ছেঁচকি আছে, খেলে ওটা খাও, নইলে রান্না করে নাও।
আই লাভ ইউ সিনেমার দেবের মতো হিমু লড়ে যাবার চেষ্টাও করেনি। ঘুমিয়ে পড়েছে। আমি আর চাপ নিলাম না। হিমুদের বাড়িতে ফোন করলাম। হিমুর মা ফোন ধরলেন, ‘হ্যালো’।
আমার বুক ঢিবঢিব করছিল। হিমুর মার ‘হ্যালো’ শুনে আমি হড়বড় করে বলে গেলাম, ‘হিমু এ বাড়িতে আছে। নিয়ে যান। নিজে বাঁচুন। আমাকেও বাঁচান’।
হিমুর মা ওপাশ থেকে একটা আর্তনাদ করলেন। সম্ভবত অজ্ঞান হয়ে গেলেন…।
৪১
বিয়ে মানে কী?
মানিয়ে নেওয়া?
আমার তো এটাই মনে হয়। আগে মানিয়ে নাও, তারপর বাকি কথা। মানিয়ে নেওয়ার সব দায়িত্বটাই মেয়েদের। ওই একটা বাড়িতে গেলাম, সে বাড়ির লোকজনেরা আমার বাড়ির সম্পর্কে আজে বাজে বকে যাবে, সেটা শুনে যেতে হবে হাসিমুখে, কোনও ব্যাপার না। আমার বাবা মা সম্পর্কে হুট করে আজে বাজে একটা মন্তব্য ভেসে আসতেই পারে। সেটাও শুনে হজম করে নিতে হবে হাসিমুখে। বিয়ে মানেই তো তাই।
আমার বন্ধু ইপ্সিতা সারাক্ষণ সবার সঙ্গে খিল্লি করে যেত। ওর সঙ্গে দেখা হল সেদিন। ইপ্সিতার বর ছিল। দেখলাম ইপ্সিতা এখন ভীষণ গম্ভীর। আমায় পরে আলাদা করে বলল, ওর বর বেশি হাসলে রেগে যায়। ওকে এখন ওর বর ইংরেজিতে কথা বলা শেখাচ্ছে। বাংলা বললেও রেগে যায়। অনেক কনভেন্ট স্কুলে যেমন ভুল করে বাংলা বলে ফেললে ফাইন হয়, ইপ্সিতা ওর বরের সঙ্গে বাংলায় কথা বলে ফেললে নাকি ওকে ফাইন দিতে হয়। ফাইনটা কী, সেটা বলতে গিয়ে ইপ্সিতা আরও গম্ভীর হয়ে গেল। ইপ্সিতার বরকে দেখে আমিই ভয় পেয়ে গেলাম। মনে হচ্ছিল যে কোনও সময় আমাকে ডেকে তেরোর ঘরের নামতা জিগ্যেস করতে পারে। কিংবা একটা বৃত্তের ক্ষেত্রফলের অংক দিয়ে দিতে পারে।
আমায় ইপ্সিতা হাতে পায়ে ধরল, ওর বরের লেগ পুল না করার জন্য। করলে নাকি বাড়ি ফিরে ওকেই আবার শাস্তি দিয়ে দেবে। সেটা শুনে আর কিছু বললাম না।
তবে এই বিয়ে নামক জিনিসটাকে মানিয়ে নেওয়ার বিষয়ে হিমু যে আমাকে ইপ্সিতার বরের থেকে বিন্দুমাত্র কম যন্ত্রণা দিচ্ছে তা নয়। হিমুর মাকে ফোন করার কথা আমি কোনওদিন ভাবিনি। সেই ফোন করতে হল।
ফোন করার মিনিট দশেকের মধ্যে হিমুর মা আমাদের বাড়ির সামনে এসে চিল চিৎকার জুড়ে দিলেন, ‘আমার ছেলেকে কালো জাদু করেছে, জাদু টোনা করেছে গো…’
আমার মা শান্ত মুখে বলল, ‘ডেকে নিয়ে আয়’।
আমি হিমুকে ডাকতে উপরের ঘরে গিয়ে দেখলাম, হিমু নেই। চমকে উঠলাম। সব ঘর দেখলাম। বুঝলাম হিমু পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়েছে।
হিমুর মা সেটা শুনে হাউমাউ করে উঠলেন, ‘এই দেখো, আমার ছেলেকে তেলে ভেজে খেয়ে নিয়েছে গো, আমি পুলিশ ডাকব, পুলিশ এসে সব বুঝে নেবে এবার। গুম খুন করেছে আমার ছেলেকে এই মেয়ে’।
মা বলল, ‘আপনি বসুন। আপনার ছেলে ঠিক চলে আসবে। আপনি না বসলে আমাকেই পুলিশ ডাকতে হবে’।
হিমুর মা রাগী মুখে আমার দিকে তাকিয়ে সোফায় বসে বললেন, ‘কবে থেকে আছে?’
মা বলল, ‘আপনার ছেলে চেন্নাই না গিয়ে এখানেই আছে। চাকরি চলে গেছে। হাতে টাকা পয়সা নেই। ও নীপাকে না নিয়ে কোথাও যাবে না বলছে। আর আমি চাইছি ডিভোর্স করাতে। আপনাকে সে জন্যই খবর দেওয়া হয়েছে। আপনিও ডিভোর্স চান, আমিও ডিভোর্স চাই। যেখানে যা খবর দিতে হয় দিন, যা লাগে বলুন, আপনার ছেলেকে এ বাড়ি থেকে বের করে নিয়ে যান। আপনিও ভালো থাকুন, আমাদেরও ভালো থাকতে দিন’।
লোকে অল্প শোকে কাতর হয়, অধিক শোকে পাথর। হিমুর মা এবার চুপ করে গেলেন। তারপর ফ্যাচফ্যাচ করে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘কী কুক্ষণে আমি বাজারে এই মেয়েটাকে পছন্দ করেছিলাম। আমার কপাল। আমায় পাগলা কুত্তায় কামড়েছিল’।
মা বলল, ‘কী হয়েছিল ভেবে কান্নাকাটি করে লাভ নেই। আপনি উপায় দেখুন। নইলে আমাকে দেখতে হবে। সেটা হলে ভালো হবে না’।
হিমুর মা বললেন, ‘কী করবেন?’
মা বলল, ‘সেটা দেখতেই পাবেন। চাইলে আপনি এ বাড়িতে যতক্ষণ খুশি থাকতে পারেন। কিন্তু আপনার ছেলেকে নিয়ে যান। মিউচুয়াল ডিভোর্সের জন্য যা যা করতে হয় করুন। আমি এ অশান্তি আর নিতে পারছি না’।
হিমুর মা খুনখুন করে কেঁদে যেতে লাগলেন। মা আর আমি চুপ করে বসে রইলাম। প্রায় ঘণ্টাখানেক বাদে জানলা দিয়ে দেখলাম, হিমু আমাদের বাড়ির পেছন দিক থেকে রাস্তার দিকে এগোল। ওর গায়ে কাদা লেগে আছে। মানে এতক্ষণ ধরে বাড়ির পেছনের পুকুরের জঙ্গলে ঘাপটি মেরে ছিল।
বুঝলাম যে কোনওদিন খালি গায়ে হিমু চৌমাথার মোড়ে ট্রাফিক কন্ট্রোল করার জায়গায় চলে গেছে।
৪২
ফ্যান চলছে। আমি চুপ করে শুয়ে ফ্যানটা ঘুরছে, দেখে যাচ্ছি।
হিমুকে ওর মা নিয়ে গেছে কিছুক্ষণ আগে। আমার মা বলেছে, হিমু হল গেরস্থ বাড়ির বেড়ালের মতো। বহু দূরে ছেড়ে দিয়ে এলেও ঠিক আবার চলে আসবে। এখনই আশ্বস্ত হবার কিছু নেই।
তবে হিমুর মা মিউচুয়াল ডিভোর্সের কথা বললেন। হিমুর মা ডিভোর্স চান। আমি ডিভোর্স চাই। আমার মা চায়। কিন্তু হিমু আমাকে চায়।
একটা কঠিন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। হিমুকে কী করে সামলানো হবে এটা নিয়ে পাড়ার নেতারা এসেছিল। সবার বক্তব্য, পাড়ায় দেখলে ঠ্যাং খোড়া করে দেওয়া যায়। সেক্ষেত্রে হিমু আর আসবে না। মা বারণ করেছে। মা গান্ধীপন্থী। কোনওরকম ভায়োলেন্সের বিরুদ্ধে। মা বলেছে ওকে মানসিকভাবে আমার থেকে দূরে করা দরকার।
আমি ভাবছি, কী করে এটা সম্ভব। মোমবাতি মিছিল করা যেতে পারে হিমুর বাড়ির সামনে। ‘হিমু তুমি আমাকে ভুলে যাও, আমার দাবি মানতে হবে’, এরকম টাইপ কিছু। হিমু কী বলবে সেটা দেখে? আরেকটা পোস্টার নিয়ে বেরিয়ে এল দেখা যাবে, ‘যা পারো করে নাও আমি তোমাকেই চাই’।
নিশির বাবা আবার ওদিকে পাড়ায় বলে বেড়াচ্ছে, আমিই নাকি নিশির মাথা খেয়েছি। কোনও বাড়ির বিপথগামী ছেলে বা মেয়েকে আড়াল করার জন্য তার পরিবারের লোক বন্ধুদের কুপ্রভাবের কথাই বলে বেড়ায়। আমি নিশির কুপ্রভাব। সেই নিশি যে ক্লাস নাইনেই পালিয়েছিল। এখানে আমি কীরকম কুপ্রভাব দিতে পারি, সেটা নিয়ে চিন্তা করছিলাম।
মা এসে আমার কাছে বসল, ‘তুই দু’দিন কলেজ যাস না। দেখা গেল হিমু কলেজের রাস্তায় তোকে ধরল’।
আমি বললাম, ‘কী করবে ধরে? কিছু করতে পারবে না’।
মা অস্বস্তির সঙ্গে বলল, ‘তাও। দেখা গেল অ্যাসিড নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রিজেকশন থেকে এসব হয়। তোকে পেতে চাইল, পেল না, ওকে এখান থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হল। ওদিকে চাকরি নেই। পুরোটাই হতাশা। দেখা গেল সব রাগ তোর উপর এসে পড়ল’।
আমি বললাম, ‘দূর, কিচ্ছু হবে না। ওসব নিয়ে ভেবো না। কলেজে যাওয়া দরকার’।
মা সন্দিগ্ধ হল, ‘কেন? কলেজে কী আছে? কেউ আছে নাকি?’
আমি মাথা নাড়লাম, ‘সম্ভব সেটা? আমার পক্ষে আর কাউকে ভালোবাসা সম্ভব না’।
মা বলল, ‘তাহলে দু’দিন যাস না। আমার কথা শোন’।
আমি বললাম, ‘আমি একা একা বাড়িতে কী করব? তার থেকে চলো আমরা দু’দিন কোথাও একটা ঘুরে আসি। সমুদ্রে যাবে? পুরী?’
মা বলল, ‘না। আমার এখনই হবে না। অন্য কাজ আছে’।
আমি বললাম, ‘কী কাজ?’
মা বলল, ‘স্কুলে পরীক্ষা চলছে। আমাকে স্কুল যেতে হবে। তোকে যেটা বলছি, তুই সেটা কর’।
আমি আর কিছু বললাম না। মা চলে গেল।
দিদা বলল, ‘তোর কুটকুট করে না? ছ্যামরারে তাড়াইলি কেন?’
আমি বললাম, ‘না। লাগবে না। তুমি চুপ করো’।
দিদা বলল, ‘ক্যান? শুকাইয়া গেসে?’
আমার কান মাথা গরম হয়ে গেল। ঘরের বাইরে এলাম। নিশির বাচ্চাটার কান্নার শব্দ ভেসে আসছে। কেমন একটা মন খারাপ করা কান্না। কোনও কোনও কান্নার শব্দ শুনলে আর কিছু ভালো লাগে না। এ শব্দটা সেরকম। হাওয়া দিচ্ছে। শীত চলে যাচ্ছে। বসন্ত আসছে। বসন্তের হাওয়ার মধ্যেও একটা ভীষণ মন খারাপ করা ব্যাপার আছে। ছোটবেলার কথা মনে পড়ে, এ সময়টাতেই বাবা পালিয়েছিল। যত বেশি জিনিস মনে পড়ে, তত বেশি মন খারাপ হয়।
দু-চোখ দিয়ে জল পড়ে যাচ্ছে নিজের থেকেই। আটকানোর চেষ্টা করলাম না। পড়ুক।
নিশির বাবা চোখ ছোট ছোট করে আমাকে দেখছিল। বলল, ‘তুই নিশিকে বুদ্ধি দিয়েছিলি মকবুলের সঙ্গে পালাতে?’
আমি বললাম, ‘আমি কেন দিতে যাব? তাছাড়া আমি মকবুলকে এখনও চিনি না’।
নিশির বাবা সন্দিগ্ধ মুখে পায়চারি করতে লাগল। বলল, ‘নিশির বিয়ে দেব। বাচ্চাটাকে আমি হোমে রেখে দিয়ে আসব। এখানে তো হবে না, এমন জায়গায় বিয়ে দেব, যেখানে কেউ কিছু জানবে না’।
আমি কিছু বললাম না। বললে ঝগড়া হবে। আমার আর ঝগড়া করতে ইচ্ছে করছিল না।
বাইকের হর্নের শব্দ পেলাম। অনীশ এসেছে। বাইক থেকে নেমে হাসিমুখে বলল, ‘তোর সঙ্গে দেখা করতে ইচ্ছে হল। তোর ক্রাইসিসটা জানতে চাই’।
আমি বললাম, ‘আমার মনে হয় আমার থেকে তোর পার্টির ক্রাইসিস এখন বেশি। তুই ওইদিকে মন দিলে ভালো হয়’।
অনীশ রাগল না। জোরে হেসে উঠে বলল, ‘এই যে এত কিছুর পরেও তুই এত হাসাতে পারছিস, এটার মানে হল তুই এখনও লড়াই করতে পারবি’।
দিদা আমার কানে কানে এসে বলল, ‘ভালো ভালো কথা বইলা শুইতে চায় তোর লগে, ছ্যামরা মানেই তাই। ভাগায়ে দে। ভাগা, ভাগা’।
আমি ভাগালাম না। অনীশকে বসার ঘরে বসালাম। নিশির সঙ্গে কথা বলা যাবে না। কাউকে একজন চাই যার সঙ্গে কথা বলা যাবে। অনীশ আসায় রাগ করলাম না, বরং খুশিই হলাম।
৪৩
মানুষের জীবনে সব থেকে বেশি দরকার একজন বন্ধু। যাকে সে সব কথা বলতে পারবে। সবাই সে কপাল নিয়ে আসে না।
আমার বন্ধুভাগ্য বরাবর খারাপ। নিশি পালাল ছোটবেলায়। ওর সঙ্গ যেসময় সবথেকে বেশি দরকার ছিল, সেই সময়ই রইল না। এরপরে একজন বন্ধু হয়েছিল সঙ্গীতা। আমি জানতামই না ও আমার সব কথা অন্য বন্ধুদের বলে বেড়াত। অনেক পরে জানতে পেরেছিলাম সেটা। সুলগ্না এল তারপরে। সে সময়টা আমি একজন বন্ধুর জন্য সত্যিই অস্থির হয়ে গেছিলাম। সুলগ্নার সঙ্গে অনেক কথা বলতাম। ওর বাড়ি যেতাম। ও আমাদের বাড়ি আসত। একদিন হঠাৎ করেই দেখা গেল সুলগ্না আমাকে আর পাত্তা দিচ্ছে না। ওর অন্য বন্ধু হয়েছে। তাদের সঙ্গে ঘুরছে। আমি চিরকালই বলদ। রাগ দেখাতে গেলাম। তাতে হিতে বিপরীত হল। সুলগ্না আমাকে লাথি মেরে চলে গেল।
বুঝলাম বন্ধুত্ব জিনিসটা আমার জন্য না। এই সময়টা অনীশ আসার পর তাই আমি ওকে তাড়াতে পারলাম না। অনীশ বলল, ‘তোর স্ট্রাগলটা এখন ঠিক কোথায়?’
আমি হেসে ফেললাম, আমার স্ট্রাগল জানতে চাইছে। বললাম, ‘পুরোটাই তো স্ট্রাগল। তুই জানিস না?’
অনীশ বলল, ‘জানি তো। তাও তোর কীরকম সমস্যা হয়?’
আমি বললাম, ‘মেয়েদের স্ট্রাগল মানে কী? বিয়ে করে শ্বশুরবাড়ির îûÄyগিং শুনে সেটল হওয়া তো? সেদিক থেকে দেখতে গেলে আমি ফেল করেছি’।
অনীশ বলল, ‘সেটা গুড সাইন। বাংলার ঘরে ঘরে নীপবনের মতো মেয়ে দরকার’।
দিদা বলল, ‘ওই দেখো। বার খাওয়ায়। শোয়ার ইচ্ছা। শুইতে চায়। বললাম না? ভালা ভালা কথা কইয়া বিছানায় নেবে তরে’।
আমি অনীশকে বললাম, ‘তাহলে সব মেয়ে বাপের বাড়ি চলে এসে আমার মতো থাকলে ভালো হত বলছিস?’
অনীশ বলল, ‘তা কেন? মেয়েদের পড়াশুনা করতে হবে। নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে’।
দিদা বলল, ‘ছেলেরাই দাঁড়াইতে পারতাসে না, উ আবার মেয়েদের দাঁড় করাইবে। লাথ মার, লাথ মাইরা বাইর কর হারামজাদারে’।
আমার হাসি পেল। আমাকে হাসতে দেখে অনীশ অবাক হয়ে বলল, ‘কী হল? হাসছিস কেন?’
আমি বললাম, ‘দাঁড়িয়ে কোথায় যাবে? সব কিছুর পরও তো শ্বশুরবাড়ির লোক বলবে বউমা চাকরি ছেড়ে ছেলে মানুষ করো। তখন কী করবে?’
অনীশ বলল, ‘তখন নিজের কথা শুনবে! সমস্যা কোথায়?’
আমি বললাম, ‘তুই এই সব বিপ্লব করে কবে নাগাদ আমেরিকা পালাবি?’
অনীশ বলল, ‘মানে?’
আমি বললাম, ‘এরকমই তো দেখি। যে যত বড় বিপ্লবী, সে তত তাড়াতাড়ি আমেরিকায় যায়’।
অনীশ মাথা নাড়ল, ‘এটা বাজে জেনারালাইজেশন। সবাই আমেরিকা যায় না’।
আমি বললাম, ‘ওই যাওয়ার সুযোগ পায় না আর কী। এদেশেই অন্যভাবে ক্যাপিটালিস্ট লাইফ লিড করে। কলেজ লাইফে কমিউনিস্ট, আরেকটু বড় হলে ক্যাপিটালিস্ট’।
অনীশ এবার সত্যিই অবাক হল, ‘তুই এসব টার্ম কোত্থেকে জানলি? তুই তো ভাই ফেসবুকেও নেই।’
আমি বললাম, ‘ফেসবুকে থাকলেই এসব জানে লোকে? ওসব না করলে জানা যায় না?’
অনীশ বলল, ‘কিন্তু না মাইরি, সত্যি করে বল, এসব কী করে জানলি?’
আমি বললাম, ‘জেনে গেছি। জানা আর কী এমন ব্যাপার। কিন্তু ভুল বলেছি কি?’
অনীশ বলল, ‘ভুল না। কিছুটা ঠিক। তবে নিঃস্বার্থ লোক নেই, তা নয়’।
আমি বললাম, ‘বাদ দে। চা খাবি? ক্লাস স্ট্রাগল বুঝিয়ে বুঝিয়ে ক্লান্ত হয়ে গেছিস না?’
অনীশ বলল, ‘চা খাই না। খাব না কিছু। কিন্তু তোর কথা শুনে ভালো লাগল। তুই আমাদের ইউনিয়ন জয়েন কর। অনেকের থেকে তোর পড়াশুনা বেশি। দেখ, যারা শাসক দল করে, তারা বেসিক্যালি ধান্দাবাজ হয়। আমাদের সময়ে যারা আমাদের দল করত, তারা কতজন এখন আমাদের দলে আছে? আবার এই দল যখন থাকবে না, দেখবি কেউ এ দল করবে না। পুরোটাই ক্ষমতার ক্ষীর। তুই এমনিই রেবেল। তোর মধ্যে একটা আগুন আছে’।
দিদা বলল, ‘ফাঁকা ফ্ল্যাট পাইলেই আগুনে দুধ ঢালার ধান্দা করতাসে পোলা’।
আমি আর পারলাম না। হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়লাম। অনীশ বোকার মতো আমাকে দেখতে লাগল…
৪৪
শীত শেষ হবার সময় প্রতিবার আমার ঠান্ডা লাগে। হাঁচি হতে শুরু করে। আমি একটার পর একটা হাঁচি দিয়ে যাই। নিয়ম করে প্রতিবছর আমার এটা হয়।
সেই ঠান্ডাটাই লেগেছে। নাক দিয়ে জল গড়াচ্ছে। হাতে রুমাল নিয়ে বসে থাকতে হচ্ছে।
রোদ ওঠেনি। আমি বারান্দায় বসে পাড়া পর্যবেক্ষণ করছি। দুপুরের দিকে বিভিন্ন বাড়ির কাকিমারা একজোট হয়ে একটা সার্ক সম্মেলনে বসে। ওদের জীবনের সমস্ত দাবি দাওয়া নিয়ে ওরা গোল টেবিল বৈঠক করে। ওখান থেকে আমার দিকে তাকিয়েই যখন কেউ মুখ ফিরিয়ে নেয়, বুঝতে হয় তখনই আমাকে নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
এবারে ওরা বলবে ধিঙ্গি মেয়েটাকে শ্বশুর বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার পর বাড়িতে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে। দুদিন পরে রাস্তায় ব্যবসা করতে দাঁড়াবে। আরেকটু এগিয়ে অন্য একটা কাকিমা বলবে, মেয়ে হয়ে জন্মেছ অত দেমাক কীসের? শ্বশুর বাড়িতে মাথা নিচু করে থাকবে। যা বলবে তাই শুনবে। কেন মেয়েদের এত অহংকার হবে। মেয়ে হয়ে জন্মেছ মানে সব শুনতে হবে।
এই সময় ওদের দেখিয়ে দেখিয়ে আমি আচারের বয়ামটা নিয়ে বসি। ওদের আরও জ্বলতে শুরু করে। চিড়বিড় করে। কই মাছের মতো লাফ ঝাঁপ দিতে শুরু করে, ওদের পিঠগুলো কেমন একটা বেঁকে বেঁকে ওঠে। বুঝতে পারি, জ্বলতে জ্বলতে ওদের মাথায় উঠে যাচ্ছে। বেহায়া, বেশরম মেয়ে মানুষ পাড়াটাকে নষ্ট করে দিচ্ছে, পাড়ার ছোট মেয়েরা কী শিখবে টাইপ আলোচনা সম্মেলনে প্যাক খেতে থাকে। মজার ব্যাপার হল, এই সময়েই, ওদের সামনেই ঘটনাগুলো ঘটে। যেমন ওই বৈঠক চলতে চলতেই বাইক নিয়ে অনীশ চলে এল।
অনীশ হালকা দাড়ি রেখেছে। লাল পাঞ্জাবি পরে বাইক নিয়ে ওর এন্ট্রি হতেই কনুই দিয়ে কাকিমারা একে ওকে ঠেলতে শুরু করে দিল। অনীশ এখন আমার উপর ইন্টারেস্ট নিয়েছে। ও আসবে আমি জানতাম। ঠিক করলাম কাকিমাদের আরও খোরাক দিতে হবে।
অনীশ বাইক থেকে নেমে বলল, ‘আজ কলেজ গেলি না?’
আমি বললাম, ‘বোস না। পাশে বোস’।
অনীশ আমার পাশে বসল। কাকিমাদের মিটিঙের দিকে তাকালাম। আড়চোখগুলো সিসিটিভি থেকে ড্রোন হয়ে এখন উপরে উড়ছে।
অনীশকে বললাম, ‘সিঙ্গুর থেকে টাটা চলে যাওয়ার সময় অ্যানসিলিয়ারি শিল্প চলে গেছিল জানিস তো?’
অনীশ ঘাবড়ে গিয়ে বলল, ‘মানে?’
আমি বললাম, ‘গাড়ির সঙ্গে অনুসারী শিল্প। আর যা যা শিল্প হতে পারত ওই গাড়ি কারখানাকে কেন্দ্র করে, সেটাকে অ্যানসিলিয়ারি শিল্প বলে। আমাদের পাড়ায় এই কাকিমাদের গসিপ শিল্পের ভালো অ্যানসিলিয়ারি শিল্প হতে পারত পপকর্ন, ফুচকা। কপাল, ওসব কিছুই নেই। ওদের আমার এই আচারের বয়ামটা দিয়ে আসবি? যা না। বেচারিরা কিছু পাচ্ছে না’।
অনীশ বলল, ‘আমি?’
আমি বললাম, ‘হ্যাঁ। দিয়ে আয়’।
অনীশ কী বুঝল কে জানে, সত্যি সত্যিই আচারের বয়ামটা নিয়ে ওদের গোল টেবিল বৈঠকের দিকে চলে গেল। কাকিমারা দেখলাম জোরে জোরে মাথা নাড়ছে।
অনীশ ব্যাজার মুখে বয়াম নিয়ে এসে বলল, ‘কেউ নিল না’।
আমি আরও খানিকটা আচার মুখে দিয়ে বললাম, ‘তোকে কেউ কিছু জিগ্যেস করল না? তুই কে, কোত্থেকে এসেছিস?’
অনীশ বলল, ‘হ্যাঁ করল তো। বললাম’।
আমি বললাম, ‘গুড। এবার বল। কী নিয়ে আলোচনা করতে এসেছিস?’
অনীশ বলল, ‘এমনিই খোঁজ নিতে এলাম। কলেজ গেলি না কেন?’
আমি বললাম, ‘ভালো লাগে না। কলেজ ভালো লাগে তোর?’
অনীশ বলল, ‘হ্যাঁ। কেন লাগবে না? বাড়িতে থাকার থেকে কলেজ যাওয়া ভালো’।
আমি আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলাম, নাট্যদৃশ্যে হিমুর আগমন হল। একটা সাইকেল নিয়ে উসকো খুসকো চুলে হিমু চলে এল।
কাকিমারা আবার নড়ল।
আমি হেবি খুশি হলাম। এই তো চাই। হিমুকে হাত নেড়ে ডাকলাম, ‘এসো এসো’।
হিমু উত্তেজনায় সাইকেল স্ট্যান্ড করতে গিয়ে সাইকেল সুদ্ধ ড্রেনে পড়ে গেল।
