নীপাদের বাড়ি – ৭০

৭০

পীযূষজেঠুর বাড়ি থেকে ফিরে দেখি মা রান্না করছে। আমি গিয়ে বললাম, ‘তুমি জেনেশুনে ও বাড়িতে পাঠিয়েছিলে? ওর ছেলে আসবে বলে? তুমি তো এসব করো না। হঠাৎ কী হল তোমার?’

মা আমার কথার উত্তর না দিয়ে বলল, ‘কিছু খাবি?’

আমার আর মার মধ্যে একটা ব্যাপার আছে। আমরা যদি বুঝি কেউ কোনও বিষয়ে ওই মুহূর্তে কথা বলতে না চাই, আমরা পরস্পরকে বিরক্ত করি না।

আমি বললাম, ‘নাহ্‌। থাক’।

মা আর কিছু বলল না। আমিও মাকে বিরক্ত না করে ঘরে চলে এলাম।

রাতে খাওয়া হয়ে গেলে মা বলল, ‘একটা সময় ওদের বাড়ি আমরা যেতাম। ওরাও আসতেন। অনির্বাণ ভালো ছেলে। পীযূষদার সঙ্গে আমার সেদিন বাজারে দেখা হয়েছিল। উনি তোর ব্যাপারে জানতে চাইছিলেন। আমরা কেউই তোদের জোর করব না। তোর মনে হলে কিছু হবে। নইলে পড়াশুনা কর। পরে দেখা যাবে’।

আমি বললাম, ‘আমি তো হিমুর সঙ্গেই চলে যেতাম। এতই যদি গলার কাঁটা হয়েছিলাম, আগে বললে না কেন?’

মা বলল, ‘তুই হিমুকে ভালোবাসিস না। বাসতে পারবিও না’।

আমি বললাম, ‘কেন? আর অনির্বাণদাকে ভালোবাসতে পারব কেন?’

মা বলল, ‘হিমুকে কেন ভালোবাসতে পারবি না সেটা তুই নিজেকে জিগ্যেস কর। এত কিছু করার পরেও ওকে কি তুই ভালোবাসতে পেরেছিস?’

আমি নিরুত্তর থাকলাম। আমাকে মার চেয়ে ভালো কে চেনে? তারপরেও তর্ক করতে চাইলাম, ‘আর অনির্বাণদাকে আমি ভালোবাসব কী করে বুঝলে?’

মা বলল, ‘আমি বুঝতে চাইনি। অনির্বাণ ভালো ছেলে। তুই ভালো মেয়ে। আমি চাই একটা ফ্রেশ শুরু হোক। হলে ভালো, না হলেও জোর নেই। কোনও কিছু জোর করে করতে চাইলে কী হয় আমরা জানি। হিমু পারেনি। অহেতুক চেষ্টা করার দরকার নেই’।

আমি বললাম, ‘তুমিই বলছিলে আমায় পড়ায় মন দিতে। এখন আবার এসব বলছ’।

মা বলল, ‘মেয়েরা সব পারে। সংসার সামলাতে পারে, একই সঙ্গে পড়াশুনাও করতে পারে। তোকে অন্ধকার পেরোতে হবে। তার জন্য যদি পড়াশুনায় সমস্যা হবে কেন?’

বাবা চলে যাবার পর যে মহিলা একা হাতে সব কিছু সামলেছে, তাকে অমান্য করি কী করে? অন্ধের মতো বিশ্বাস করার জন্য ঈশ্বর আছেন, কিন্তু তাকে তো দেখতে পাব না কোনওদিন। মা যতদিন আছে, মার কথাই শোনা উচিত।

মার বয়স হচ্ছে, কত চুল পেকে গেছে। নিঃশব্দে ঘর সামলাতে সামলাতে, আমাকে সামলাতে সামলাতে আমার মা বুড়ো হয়ে যাচ্ছে। একদিন সকালে হঠাৎ করে আর থাকবে না। সেদিনের কথা যতবার ভাবি, আমার বুক কেঁপে ওঠে।

ঘরে এসে বসতেই দিদা এসে হাজির। শুধু হেসে যাচ্ছে। আমি বললাম, ‘কী হল?’

দিদা বলল, ‘তোর মা কইল অনির্বাণ ভালো ছেলে, আর তুই নাকি ভালো মেয়ে। কীরে ছেমরি, তুই ভালো মেয়ে? তুই আমারে মারছস তোর মা জানলে তোরে ভালো মাইয়া কইবে?’

আমি বললাম, ‘তুমি যাও। ভালো লাগছে না’।

দিদা বলল, ‘যা, মায়েরে গিয়া ক, তুই কেমন ভালো মাইয়া, তোর মায়েরে গিয়া ক’।

আমি উত্তর দিলাম না। দিদা ভ্যানভ্যান করতে থাকল, ‘ওই অনির্বাণেরে বিয়া করবি এখন। আহারে, হিমু ছেলেটা কত বার আইসিল, তোরে কত ভালোবাসে, তুই সেইডা বুঝলি না। তর জন্য ওর মা মইরা গেল…ছি-ছি ছেমরি, তোর জন্য…তোর কোনও লাজ লজ্জা নাই। তুই…মর তুই। তুই মর’।

আমার ভীষণ কান্না পেয়ে গেল। ক’দিন ধরে এই হচ্ছে আমার। অকারণে চোখে জল চলে আসছে। হিমুর সঙ্গে আমি অন্যায় করলাম কি? হিমু এসেছিল, বাড়ির সবাইকে ছেড়ে আমার কাছে থাকার জন্য কাঙালের মতো এসেছিল। অথচ আমি ওকে দূরে ছুঁড়ে দিলাম। ও আর কী করত?

অনেক রাত অবধি কাঁদলাম। দিদা অনেক বাজে কথা কানের কাছে বলে গেল। তবু এত কিছুর পরেও আমি বুঝলাম হিমুর জন্য আমার মায়া আছে ঠিকই, কিন্তু হিমুকে আমি কোনওদিন ভালোবাসিনি।

মা এটা বুঝেই পীযূষজেঠুর বাড়ি আমাকে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। মা ঠিক। এই চিন্তাগুলো মাথায় আসার পর আর দিদা এল না। বুঝলাম, বুড়ি আমাকে এবারে হারাতে পারেনি। বাকি রাতটা আমার ভালো ঘুম হল।

৭১

অনির্বাণদা ভালো কথা বলতে পারে। অনেক বিষয়ে পড়াশুনা আছে। পীযূষজেঠু যেমন পড়াশুনা করেন, অনির্বাণদার মধ্যেও সে জিনিসটা আছে।

অবশ্য আমার সঙ্গে পড়াশুনার কথা দিয়ে কথা শুরু হল না। আমাকে বলল, ‘তোমার মনে আছে তুমি একসময় খুব ছোট ছিলে?’

আমি হেসে ফেললাম, ‘আমরা সবাই ছোট ছিলাম। আপনি কি শুরু থেকেই বড়?’

অনির্বাণদা বলল, ‘অ্যাকচুয়ালি। আমার ম্যাচুরিটি অনেক বেশি। আমি আমার এক্স বউকে বই পড়তে বলতাম বলে আমাকে বোরিং বলে চলে গেল। কী মজার না?’

আমি বললাম, ‘মজার কিছু নেই। কারো পার্টনার চলে গেলে সেটা মজার হয় না’।

অনির্বাণদা বলল, ‘তা ঠিক। তোমার কি তোমার পার্টনারের জন্য মন খারাপ হয়?’

আমি মাথা নাড়লাম, ‘না। আমারা সেরকম পার্টনার ছিলাম না। আমাদের বিয়েটা ঠিক করে টেকেনি। আমিও ওকে ভালোবাসতে পারিনি কোনওকালে। ফলে কেটে গেছে’।

অনির্বাণদা বলল, ‘গুড। তুমি তোমার রিলেশনের ব্যাপারে ক্লিয়ার দেখে ভালো লাগল’।

আমি বললাম, ‘ভাবি না কিছু। ভাবতে ইচ্ছে করে না। আপনি ভাবেন?’

অনির্বাণদা বলল, ‘আমাদের সমাজে বিয়ে ভেঙে যাওয়াটাকে নিচু নজরে দেখা হয়। এটা একটা বড় সমস্যা। আহারে, তোর বিয়েটা ভেঙে গেল? এসব শুনে শুনে কান পচে যায়’।

আমি বললাম, ‘ঠিকই। বড় বিরক্তিকর’।

কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলাম। আমার অস্বস্তি হল। যার কাছে পড়তে এসেছিলাম, তিনি থাকছেন না, অথচ তার ছেলের সঙ্গে কথা বলছি। সবাই চাইছে আমরা একটা সম্পর্কে যাই, অথচ সরাসরি কেউ কিছু বলছে না। এর থেকে ‘কেমন কেমন ব্যাপার’ আর কী হতে পারে? স্বভাবতই আমি পালাই পালাই করতে শুরু করলাম।

অনির্বাণদা সেটা বুঝেই হয়তো বলল, ‘তুমি কি একদমই গল্পের বই পড়ো না?’

আমি বললাম, ‘খুবই কম পড়ি। আগের দিনই তো বললাম। পড়ার বই বেশি পড়ি।’

অনির্বাণদা বলল, ‘তাও, কী ধরনের বই পড়তে ভালোবাসো?’

আমি বললাম, ‘শরৎচন্দ্র, বঙ্কিমচন্দ্র’।

অনির্বাণদা বলল, ‘ব্যস? এই যুগের কারো লেখা পড়োনি?’

আমি বললাম, ‘নাহ্‌। পড়ার সময় পেলাম না। ইচ্ছে ছিল মাধ্যমিকের পরে লাইব্রেরি থেকে বই নিয়ে এসে পড়ব, বাবা গেল ভেগে, আর কিছুই হল না’।

অনির্বাণদা আবার হাসল, ‘ভেগেটা কেমন শব্দ নীপা?’

আমি বললাম, ‘পালানো, ভেগে কাছাকাছিই তো। ভেবে দেখুন একজনের বাবা পালিয়ে যাচ্ছে আরেকজনের সঙ্গে। এটা কি খুব গৌরবের ব্যাপার?’

অনির্বাণদা বলল, ‘মহাভারতের আগের সময়েও তাই হত জানো? একজন আরেকজনের বউয়ের হাত ধরে নিয়ে যাচ্ছে, আরেকজন অন্য কোনও মহিলাকে নিয়ে আসছে; তখন একজন মুনি বললেন, না, এসব তো হবে না। এসব বন্ধ করতে হবে। নিয়ম করা হল পরকীয়া ব্যাপারটা পাপের শ্রেণীতে নথিভুক্ত করতে হবে’।

আমি বললাম, ‘জানি। কিন্তু পরকীয়া পাপ কেন হবে? ভালোবাসাই তো। কে ঠিক করে দিয়েছে সারা জীবনে আপনি শুধু একজনকেই ভালোবাসতে পারবেন? হতেই পারে অন্য কাউকে ভালোবেসে ফেললাম’।

অনির্বাণদা বলল, ‘সেটা কি তুমি তোমার বর্তমান পার্টনারকে জানিয়ে করবে, না না জানিয়ে?’

আমি বললাম, ‘জানিয়ে করব। বলে দেব দেখো, তোমাকে আমার ভালো লাগছে না। তুমি এসো। বাবার মতো কাউকে না বলে ফ্যামিলিকে পথে বসিয়ে পালিয়ে যাব না অন্তত’।

অনির্বাণদা মাথা নাড়ল, ‘ইন্টারেস্টিং। তুমি জীবন থেকে শিক্ষা নিতে চাও যা বুঝছি’।

আমি বললাম, ‘কেন? আপনি নিতে চান না?’

অনির্বাণদা বলল, ‘জীবন যে ঠিক কী চায় সেটাই তো বুঝে উঠতে পারি না মাঝে মাঝে। জীবন বড়ই অহেতুক একটা ব্যাপার’।

আমি বললাম, ‘তাও লোকে জীবন কাটাতে বিয়ে করে। আরও জীবন তৈরি করে। অহেতুক বলে বলে লোকে বিয়ের জন্য তৈরিও হয়’।

অনির্বাণদা বলল, ‘এ কথাটা কি তুমি আমাকে বললে?’

আমি বললাম, ‘সবাইকেই। আপনি আবার বিয়ে করতে চাইছেন কেন?’

অনির্বাণদা বলল, ‘একজন লাইফটাইম বন্ধু পাবার জন্য’।

আমি বললাম, ‘এসব শুরুতে বলে, তারপর বিয়ের পরে ঘর মোছায়’।

অনির্বাণদা হো হো করে হেসে উঠে বলল, ‘আমি ভালো ঘর মুছি। ওসব করতে বলব না কোনওদিন’।

আমি বললাম, ‘আর যদি একদিন সকালে আপনার স্ত্রী এসে বলে আপনার সঙ্গে থাকতে ভালো লাগছে না, চলে যাবে অন্য কারো সঙ্গে, তখন কী করবেন?’

অনির্বাণদার চোখ দুটো জ্বলে উঠল, ‘তাহলে খুন করে ফেলব’।

আমি চমকালাম। আপাত নিরীহ এই মানুষটার চোখে একটা খুনি বাস করে। যে কেউ চোখ দুটো দেখলেই বুঝে যেত।

৭২

মা আগ্রহ নিয়ে বসেছিল। আমি বাড়ি ঢুকতেই জিগ্যেস করল, ‘কথা বললি?’

আমি বললাম, ‘হ্যাঁ। বললাম’।

মা বলল, ‘কেমন লাগল?’

আমি বললাম, ‘আমি আর ও বাড়ি যাব না মা। পড়তেও যাব না’।

মা বলল, ‘কেন বল তো? অনির্বাণ তো খুব ভালো ছেলে’।

আমি বললাম, ‘আমার ভালো লাগেনি। আমি আর যাব না’।

মা আর কিছু জিগ্যেস করল না।

আমি ঘরে এসে বসলাম। আমাকে দুটো বই দিয়েছে অনির্বাণদা। একটা ‘পথের পাঁচালী’, আরেকটা ‘আরণ্যক’। এই দুটো বই পড়ে কেমন লাগল, জানাতে হবে। আমি বই দুটোকে যত্ন করে রাখলাম। যেমনভাবে এনেছি, তেমনভাবে ফেরত দিতে হবে।

বাড়িতে এলেই আমার মাথার মধ্যে বিভিন্ন চিন্তা আসতে শুরু করে। কখনও মনে হয় আমি জীবনে কী করব, আবার কখনও কখনও মনে হয় মা মারা গেলে কী করব? সুইসাইড করলে কীভাবে করব?

মানুষ তো মানুষকে জড়িয়ে বাঁচে। আমার জড়িয়ে থাকার মানুষ আমাকে ছেড়ে মাধ্যমিকের সময় চলে গিয়ে আমার পৃথিবীটা ওলট-পালট করে দিয়ে গেছে।

আমার মধ্যে দ্বিধাও কাজ করতে শুরু করল। মাকে বললাম যদিও, আমি আর যাব না, আমার মনে হয়েছে অনির্বাণদার চোখে খুনির চোখ দেখলাম, হতে পারে, ব্যাপারটা সেটা না। আমার মনের মধ্যেই একটা বাধা কাজ করতে শুরু করেছে, যখনই অবচেতন বুঝেছে আমি অনির্বাণদায় ইমপ্রেস হতে চলেছি, তখন আটকাতে চাইছে সেটা। আমার মাথার তো ঠিক নেই। কখন কোন জটিলতায় আবদ্ধ হয়ে পড়ে! আমি নিজেকেই মাঝে মাঝে নিজে বিশ্বাস করতে পারি না।

‘চুলকানি হইছে ছ্যামরা দেইখা?’

দিদা এসে গেছে।

আমি বললাম, ‘চুপ করো। ভালো লাগছে না’।

দিদা বলল, ‘লাগব ক্যান? বয়সের মাইয়া তুমি। তোমার কুড়কুড়ি দিতাসে। যাওয়ার কথা ছিল হিমুর লাগে, তা তো তুমি গেলা না। এখন তুমি নতুন ছ্যামরা পাইছ, তোমার তো ইচ্ছা করবই’।

আমি বললাম, ‘তুমি এইসব ভাবো কেন? আমার কি আর কোনও কাজ নেই?’

দিদা বলল, ‘আবার কী কামে লাগে ছ্যামরা? ছ্যামরারাও মাইয়াদের কাছে কী চায়? দাবা খেলতে চায়?’

আমি বললাম, ‘চুপ করো। আবার একঘেয়ে বক বক শুরু করেছ। ভালো লাগছে না’।

দিদা খিকখিক করে হাসতে শুরু করল।

কলিং বেল বাজল। বেরিয়ে গিয়ে দেখলাম বাবার ছোট বউ এসেছে। কোলে বাচ্চা। সাদা শাড়ি পরেছে। আমার অস্বস্তিটা বেড়ে গেল। বলল, ‘ভালো আছিস?’

আমি বললাম, ‘হ্যাঁ’।

বলল, ‘তোর মা আছে?’

আমি দরজা ছেড়ে দাঁড়ালাম।

মাকে ডাকলাম। মা এসে বলল, ‘বোস’।

বাচ্চা কোলে হিমসিম খাচ্ছে। আমার ইচ্ছে হলেও বাচ্চাটাকে আমি নিলাম না।

মা বলল, ‘টাকাটা পাঠাইনি এখনও। পুরী গেছিলাম তো। ওটার জন্যই এসেছিস তো?’

নতুন মা বলল, ‘ও বাড়িটায় থাকতে পারছি না। অনেক সমস্যা। আমাকে মেজদা বলল, এ বাড়িতে আমারও অধিকার আছে। এখানেই থাকতে পারলে ভালো হত’।

মা মাথা নাড়ল, ‘না। কোনও অধিকার নেই। কাগজপত্র সব আমার নামে। তোর মেজদাকে বলে দিস, এসব নিয়ে ঝামেলা করে লাভ নেই। আর আমি তোর সঙ্গে থাকব না। তুই যদি মনে করিস বাড়ি নিয়ে ঝামেলা করবি, তাহলে মাসে মাসে যে টাকাটা দি, আমি সেটাও বন্ধ করে দেব। অনেক বাঁদরামি সহ্য করেছি, তুই যদি ভাবিস আমি সব মেনে নিয়েছি বলে এটাও মেনে নেব, তাহলে ভুল করবি’।

নতুন মা চুপ করে রইল। কিছু লোক হয় যাদের কেউ পাখি পড়া শিখিয়ে দেয়, পরে জায়গামতো পড়া ভুলে যায়, নতুন মাকে দেখে সেরকম মনে হল।

মা বলল, ‘তোর মেজদার তোর জন্য যখন এত দরদ, ওর বাড়িতে রাখছে না কেন?’

নতুন মা অসহায়ের মতো বলল, ‘আমাকে যা বলল আমি তাই বললাম’।

আমার আবার কষ্ট হল। আমারই যে কেন এসব হয় কে জানে!

৭৩

বাবা বাড়ি ছেড়ে চলে যাবার পর থেকে আমি কোনওদিন মাকে এত রেগে যেতে দেখিনি। মা সংযত থেকেছে, স্থির থেকেছে। বরাবর বাবাকে বা নতুন মাকে সাহায্য করে এসেছে।

মা যে এত রেগে যাবে, আমি ভাবতেও পারিনি।

নতুন মা আমার বাবার সন্তানকে কোলে নিয়ে চুপ করে বসে আছে। মা বলল, ‘তুই নিজে বুঝিস না, এক বাড়িতে আমাদের থাকা উচিত না? বুঝিস?’

নতুন মা নিষ্প্রাণভাবে মাথা নাড়ল। বলল, ‘আমি আর পারছি না। একা একা এভাবে টানা যায় না। এটুকু বাচ্চা নিয়ে আমি কী করব?’

মা বলল, ‘এতদিন পর বুঝলি সেটা? এই দিন তো আসারই ছিল। ছিল না?’

নতুন মা আবার মাথা নাড়ল।

মা বলল, ‘একটা সম্মানজনক কাজ খোঁজ। কাজ কর। বাচ্চাটাকে মানুষ করার সঙ্গে সঙ্গে কাজে ব্যস্ত হলে বেঁচে থাকাটা অতটা কঠিন হয়ে উঠবে না। আমাদের তো দেখছিস, নীপার মনটাকেই ওর বাবা শেষ করে দিয়ে চলে গেছে। এরপরেও কেন এরকম করার কথা ভাবছিস?’

নতুন মা বলল, ‘মেজদা রোজ আসে। রোজ বলছে’।

মা বলল, ‘আসবে। ওরা তোকে রাগাবে, ব্যবহার করতে চাইবে। কেন জানিস? এ বাড়িটা বড়। তোকে একটা ঘর দিলে দুদিন পরে আমরা যখন বাড়ি থাকব না, তোর মেজদা এসে বাড়ি দখল করবে। আমি সেটা হতে দেব না। তোকে হয়তো আমি রাখতে পারতামও, কিন্তু শুধু এই ঝামেলার জন্য কোনওদিন সেটা করব না’।

নতুন মা বলল, ‘আমি বলতে পারি না’।

মা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল, ‘তোর মেজদা বাইরেই আছে না? ঘুর ঘুর করছে?’

নতুন মার মাথা ওঠা নামা করল।

মা দরজা খুলে বেরোল। আমিও বেরোলাম। দেখলাম একটা চিমসে মার্কা লোক, হরলিক্স ফ্রেমের চশমা পরা, বেশ বৈপ্লবিক ভঙ্গিতে চলা ফেরা করছে। মা ডাকল, ‘এই সমীরণ, শোন, এদিকে আয়’।

মামার নাম সমীরণ। আমার দূর সম্পর্কের মামা। লোকটাকে মামাবাড়ির বিভিন্ন কাজে দেখেছি। মার ডাক শুনে গম্ভীর মুখে এগিয়ে এল, ‘বল’।

মা ঠান্ডা গলায় বলল, ‘তুই যে কাজটা করছিস, তার ফল তুই পাবি’।

সমীরণমামা বলল, ‘তুই কি আমাকে ভয় দেখাতে চাইছিস?’

মা বলল, ‘না। ভয় দেখাতে চাইছি না। তবে তুই আমার সংসারে আগুন লাগাতে চাইছিস। এরপর আমি সত্যি সত্যি পেট্রোল নিয়ে গিয়ে তোদের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে আসব। সামলাতে পারবি তো?’

মা হঠাৎ রুদ্রমূর্তি ধারণ করেছে। মার এরকম রূপ আমি কোনওদিন দেখিনি।

সমীরণ মামা আঙুল তুলে বিড় বিড় করল, ‘তু…তুই…তোকে দেখে নেব…’

দরজার পিছনে দরজা দেবার ডাসা ছিল। মা সে ডাসাটা নিয়ে সমীরণমামাকে তাড়া করল। পাড়ার লোক জমে গেছিল। তারাও এগিয়ে এসে মাকে জিগ্যেস করল, ‘কী হয়েছে বউদি?’

মা বলল, ‘ঝামেলা করতে এসেছে’।

সমীরণমামা মার খেয়ে যেত। পাড়ার লোক জড় হয়ে গেছিল। মা হাঁফাতে হাঁফাতে বলল, ‘আজ ছেড়ে দাও। এরপর এলে বুঝে নেব’।

সমীরণমামা তিড়িং বিড়িং করে লাফাতে লাফাতে চলে গেল, ‘এত বড় সাহস, আমি এবার কোর্টে যাব, দেখব কী করা যায়! বেশি বাড় বেড়েছে না? দেখব’।

মা ডাসা নিয়ে ঘরে ঢুকল। নতুন মাকে বলল, ‘বাড়ি যা। সমীরণকে বাড়িতে ঢুকতে দিস না। বেশ বাড়াবাড়ি করলে টাকা দিতে বলবি। লোকের ঘরে আগুন লাগানো সোজা। কন্ট্রিবিউট করা কঠিন। যেদিন কন্ট্রিবিউট করবে অন্যের ঘরে আগুন না লাগিয়ে, সেদিন বুঝবি ওর কথা শোনা যায়, তার আগে না’।

নতুন মা মাথা নেড়ে উঠল। মা ঘর থেকে টাকা নিয়ে এসে বলল, ‘নিয়ে যা। আমাদের এ বাড়িতে যেন এসব ঝামেলা আর না দেখি’।

নতুন মা চলে গেল।

মা দরজা বন্ধ করে জোরে জোরে শ্বাস ছাড়তে ছাড়তে বলল, ‘কত বড় সাহস!’

৭৪

সকালে এসেছি পীযূষজেঠুর বাড়িতে। মা বলেছিল জেঠু ডেকেছে।

ওদের বাড়িতে ঢুকতেই জেঠি আমাকে বললেন, ‘নীপা, তুই মাংস রাঁধতে পারিস? তোর জেঠু মাংস এনেছে। আমি বুঝতে পারছি না, কী করে করা যায়’।

আমি বুঝলাম, পরীক্ষা নেবার চেষ্টা। আমার স্বভাব যা, আমি তাই করলাম। বললাম, ‘না গো জেঠিমা, আমি রান্না পারি না’।

জেঠিমা হেসে ম্যানেজ দেওয়ার চেষ্টা করলেন, ‘ওহ, পারিস না? আচ্ছা, আয় শিখিয়ে দিই’।

আমি বললাম, ‘না না এই গরমে কে গ্যাসের কাছে দাঁড়াবে। আমার ভাল্লাগছে না’।

জেঠিমা আর কিছু বললেন না।

আমার মেজাজটাই তিতকুটে হয়ে গেল। এই যে রান্নাঘর দেখিয়ে দেওয়ার ব্যাপারটা, এটা ভারি বিরক্তিকর। এত এত বই, এত পড়াশুনা, এত বইয়ের গল্পের পর আমি কেমন মাংস রাঁধি, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ হল?

অনির্বাণদা খবরের কাগজ পড়ছিল। আমাকে দেখে বলল, ‘এসো। কেমন আছ?’

আমি বললাম, ‘ভালো আছি’।

অনির্বাণদা বলল, ‘আচ্ছা তোমার যে ছেলেটার সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল, সে এখন কোথায়?’

আমি বললাম, ‘জানি না। বাইরে থাকার কথা’।

অনির্বাণদা বলল, ‘দেশের বাইরে?’

আমি বললাম, ‘হ্যাঁ’।

অনির্বাণদা কাগজটা টেবিলে রেখে বলল, ‘তোমার জীবনে আবার চলে এলে কী করবে?’

আমি বললাম, ‘আমি ওকে ভালোবাসি না’।

অনির্বাণদা বলল, ‘তুমি শিওর?’

আমি বললাম, ‘আমি শিওর। আমি কাউকেই ভালোবাসতে পারি না। আমার ভালোবাসার ক্ষমতাটাই নষ্ট হয়ে গেছে’।

অনির্বাণদা বলল, ‘ওটা একটা মেন্টাল স্টেট। ঠিক করে কাউন্সেলিং করলে সব ঠিক হয়ে যাবে’।

আমি বললাম, ‘হলে হবে। দেখা যাবে’।

অনির্বাণদা বলল, ‘তোমাকে একটা কবিতা শোনাতে ইচ্ছে করছে। শুনবে?’

আমি নিঃস্পৃহ কণ্ঠে বললাম, ‘শোনান’।

অনির্বাণদা আমার অনিচ্ছাটা বুঝল না। বলল, ‘কাল রাতে লিখেছি, বুঝলে। দেখো তো কেমন লাগে। কবিতার নাম—

রাত জাগিও না আমায়

হে প্রিয়তমা,

রাত জাগিওনা আমায়।

রাতের পর রাত বসে আছি,

ভাঙা হৃদয়ে

তোমার অপেক্ষায়।

তুমি জানো না,

কতদিন ধরে শুধু

তোমার জন্য বসে আছি।

সাড়া দাও।

কেমন?’

অনির্বাণদা উৎসুক মুখে আমার দিকে তাকাল। বুঝলাম, কবিতার মাধ্যমে কিছু বলতে চাইছে। আগুন জ্বলেছে-টলেছে বোঝাতে চাইছে। আমি এক বালতি জল ঢাললাম, ‘হে প্রিয়তমা বলে কিশোরকুমারের একটা গান আছে। শুনেছেন?’

অনির্বাণদা দমে গেল। বলল, ‘ভালো লাগল না? এটা গুন্টার গ্রাসের একটা কবিতার অনুবাদ’।

আমার এটাও পোষায় না। নিজের লেখা না চললে অন্য বিখ্যাত কারো ল্যাজ ধরে ঝোলার চেষ্টা। এটা কেমন ব্যাপার?

বললাম, ‘আচ্ছা। ঠিক আছে। ভালো’।

অনির্বাণদা বলল, ‘প্রেমের বিভিন্ন স্টেপ থাকে। আমার এত কিছুর মধ্যে পূর্বরাগই ভালো লাগে। একটা ইচ্ছা থাকে, মন কেমন কেমন। তোমার কোনটা ভালো লাগে?’

আমি বললাম, ‘আমার প্রেম জিনিসটাই ভালো লাগে না। বাজে ব্যাপার’।

অনির্বাণদা হেসে ফেলল, ‘আবেগহীন মেয়ে তুমি। তাই তো?’

আমি বললাম, ‘হ্যাঁ। জেঠু কোথায়?’

অনির্বাণদা বলল, ‘জানি না। বাজার করে এলে আবার বাজারে গেল। দেখে আসি’।

অনির্বাণদা দেখে এসে বলল, ‘ওই দেখো, মাও আবার পাড়ার দোকানে চলে গেল। রান্না করে না কী করে কে জানে’।

আমার পাশে বসে পড়ল অনির্বাণদা। বলল, ‘শরীর নিয়েও কি তোমার একই ধারণা?’

আমি বুঝলাম বাড়িতে কেউ নেই দেখে ছেলে উৎসাহিত হয়ে পড়েছে।

উঠে উল্টোদিকের সোফায় গিয়ে বসলাম। বললাম, ‘ভাবিনি এসব নিয়ে। আপনি আরও দু-চারটে কবিতা শোনালে শোনান’।

অনির্বাণদা বলল, ‘তুমি কি আমাকে অ্যাভয়েড করতে চাইছ?’

আমি বললাম, ‘না। কবিতা শুনতে চাইছি তো। অ্যাভয়েডের প্রশ্ন নেই’।

অনির্বাণদা অস্থির হয়ে সোফার হাতলে একটা ঘুষি মেরে বলল, ‘না, অ্যাভয়েড করছ। উঠে চলে গেলে কেন?’

আমি একটা কথা শুনেছিলাম। কোনও মানুষকে চেনার সব থেকে ভালো উপায় তার সঙ্গে থাকা। বেশি করে কথা বলা। যত বেশি কথা বলা যায়, থাকা যায়, সে মানুষকে তত বেশি করে চেনা যায়।

অনির্বাণদার এই অস্থিরভাবটা দেখে আমি বললাম, ‘কবিতা বলবেন না?’

অনির্বাণদা বলল, ‘আমি তোমাকে বিয়ে করার কথা ভাবছি। আর তুমি আমাকে অ্যাভয়েড করতে চাইছ। কেন?’

আমি বললাম, ‘আমি ভাবছি না’।

অনির্বাণদা চিৎকার করে উঠল, ‘গেট আউট। বেরোও আমার বাড়ি থেকে’।

আমি একটু থতমত খেয়ে গেলাম। সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, ‘ঠিক আছে। আসি’।

আমাকে অবাক করে দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে অনির্বাণদা শান্ত হয়ে গেল, ‘সরি। এক্সট্রিমলি সরি। বসো। ওভাবে বলা আমার উচিত হয়নি’।

আমি বেরোতে গেলাম। অনির্বাণদা আমার হাত ধরল, ‘বসো’।

এমনভাবে ধরেছে, আমার ব্যথা লাগছিল। বুঝলাম বেশি টানাটানি করলে আমারই লাগবে। আমি বসে পড়লাম। অনির্বাণদা বলল, ‘তোমার বিয়ে করার দরকার। আমারও। বাবা মা বলেছে তোমাকে আজ বলতে। তুমি রাজি থাকলে কথা এগোবে। বিয়েটা দরকার না নীপা?’

আমার হাতে ভালোই ব্যথা করছিল। আমি যদি বলে দিই না, তাহলে যদি আবার মারে টারে। ভয়ই পাচ্ছিলাম। বললাম, ‘ভেবে বলি দাদা?’

দাদায় জোর দিলাম।

অনির্বাণদা আবার জোরে জোরে শ্বাস ফেলা শুরু করল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *