১
আমার নাম নীপবন। আমার বাবা ‘এসো নীপবনে’ গানটাকে খুব সিরিয়াসলি নিয়েছিল। বাবার কোনও সমস্যা হয়নি। সমস্যাটা আমার হয়েছে। বন্ধুরা আমাকে ডেকে বলে, ‘এদিকে আয়, নীপবনে ছায়াবীথিতলে বসি’।
কেমন বিরক্তিকর একটা ব্যাপার। বাবা আর নাম খুঁজে পায়নি!
মাঝে মাঝে ভাবি বাবাকে খুব বকাঝকা করি। বলি, ‘তুমি আর নাম খুঁজে পেলে না?’
কিন্তু সেটা সম্ভব না। বাবা এখন আমাদের সঙ্গে থাকে না। মাধ্যমিকের অঙ্ক পরীক্ষার দিন, আমি বের হবার আগে দেখি মা হঠাৎ করে চিৎকার করে উঠল। আমি ছুটে গিয়ে মাকে জিগ্যেস করলাম, ‘কী হয়েছে?’
মা বলল, ‘ও কিছু না, টিকটিকি। তুই সাবধানে আয়ে’।
মা বরাবর টিকটিকিকে ভীষণ ভয় পায়। আমি আর অন্যকিছু ভাবিনি। বেরিয়ে গেছি। পরীক্ষা দিয়ে এসে শুনলাম বাবা আমার এক দূর সম্পর্কের মাসিকে নিয়ে আলাদা হয়ে গেছে।
মা নির্বিকার মুখে আমাকে বলল, ‘তুই বড় হয়েছিস। বাবার ঘরটা তুই নিয়ে নে’।
আমি বললাম, ‘তুমি সকালে এই জন্য চিৎকার করেছিলে?’
মা বলল, ‘হ্যাঁ। পরীক্ষার আগে তুই জানলে সমস্যা হত। তোর বাবার তো কোনওকালেই কাণ্ডজ্ঞান নেই। এসব করার আর সময় পেল না। যাক গে, কী আর করা যাবে। তুই পাঁপড় ভাজা দিয়ে হরলিক্স খাবি?’
মা’র কাছে আমি সব সময়ে কিছু না কিছু শিখি। এবারেও শিখলাম নির্বিকার হওয়া কাকে বলে। আমি ঘরে এসে দরজা বন্ধ করে কাঁদলাম। মা একবারও আমাকে বিরক্ত করল না। কাঁদতে দিল। একদিন পর ভৌতবিজ্ঞান পরীক্ষা। আমি বরাবর ভৌতবিজ্ঞানে ভালো ছিলাম। পরীক্ষার সময় আজেবাজে ভুল হতে শুরু হল। অভিকর্ষ বলের সংজ্ঞা ভুলে গেলাম। বুঝলাম, বাবা নীপবন নাম দেওয়ার সঙ্গে আরও অনেক কিছুর বারোটা বাজিয়ে চলে গেছে। পরীক্ষা শেষ হবার দিন বাবার সঙ্গে দেখা হল। বাবা স্কুলে চলে এসেছিল। বড় একটা ক্যাডবেরি নিয়ে অপ্রস্তুত মুখে বলল, ‘সবক’টায় লেটার পাবি তো?’
আমি বাবার সঙ্গে কথা বললাম না। হাঁটতে শুরু করলাম। বাবা ডাকল, ‘এই বুড়ি। বুড়ি। শুনে যা’।
আমি পাত্তা দিলাম না। আমার রাগ হচ্ছিল। কান্না পাচ্ছিল। লজ্জা হচ্ছিল। আমার মনে হচ্ছিল পাগল হয়ে যাব।
আমি হয়তো সত্যি সত্যিই পাগল হয়ে যেতাম যদি না আমার মা থাকত। শুয়ে থাকলে চুপ করে এসে আমার মাথার কাছে বসত। আমায় রাতে ঘুম পাড়িয়ে দিত। আমি সামনে কাঁদতাম না। বুঝতাম, মার কষ্ট হবে।
আমার মা স্কুলে পড়াত। আমাদের টাকা পয়সা নিয়ে বিশেষ অসুবিধা হল না। সমস্যা অবশ্য অন্যদিক দিয়ে এল। আমার দিদা একদিন সব বাক্স প্যাঁটরা নিয়ে এসে আমাদের বাড়িতে উঠল।
মা কিছু বলেনি। দিদা সব শুনে চলে এসেছে। এসেই বাবাকে শাপ শাপান্ত করল। মা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে সে সব শুনল। একসময় বলল, ‘তুমি নীপার সামনে এসব কথা বললে এ বাড়িতে থেকো না। চলে যাও’।
ঘাবড়ে গিয়ে দিদা চুপ করে গেল। আমার বড়মামা আর মেজমামা দুজনের কেউই দিদাকে রাখতে চাইত না। তাদের মধ্যে কী করে দিদাকে ঘাড় থেকে নামানো যায়ে সেই প্রতিযোগিতা চলত। দিদা আমাদের বাড়ি চলে আসায় তারা হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।
দিদা অবশ্য কিছুদিনের মধ্যেই আমার জীবন অসহনীয় করে তুলল, ‘মাইয়া মানুষ এটা করবি না, ওটা করবি না এখানে যাবি না, ওখানে যাবি না, রাইত হইলে পড়তে যাইস না, ফিরবি ক্যামনে? তোর ছ্যামরা বন্ধু আসে নাকি রে?’
মা কত দেখবে? সব সময় কি আমাকে পাহারা দেওয়া সম্ভব? ফলে দিদা রামের সুমতির রামের বউদির মায়ের মতো আমার মাথা খেতে শুরু করল।
আমি ঝামেলায় জড়ালাম না। একদিন দিদা বাথরুমে যাবে, আমি সাবান গোলা জল ঢেলে রেখে দিলাম। ভেবেছিলাম পড়ে গিয়ে দিদার হাত পা ভাঙবে।
সেটা হল না।
মাথায় মারাত্মক চোট পেয়ে দিদা মরে গেল।
২
দিদার মারা যাবার খবরে আমার মা এমন কিছু দুঃখ পেল না। অবশ্য দেখেছি বাবা চলে যাবার পর থেকে কোনও কিছুতেই মার আর কোনও অনুভূতি নেই।
মা স্কুল থেকে ফিরল। বাড়ি ভর্তি লোক। দিদার খবর পেয়ে চুপ করে সামনের ঘরে বসল। আমি জানতাম আমাকে অভিনয় করতে হবে। কাঁদতে কাঁদতে মার কাছে গেলাম, ‘দেখো না, হঠাৎ করে কী হয়ে গেল!’
শান্তভাবে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে মা বলল, ‘এটাই জীবনের নিয়ম মা। কখন যে কী হয়ে যায়, কেউ বলতে পারে না’।
বাবা এল সন্ধে নাগাদ। দরজায় দাঁড়িয়ে রইল। মা বাবাকে দেখে বলল, ‘এসো। বাইরে দাঁড়িয়ে আছ কেন?’
বাবা ভাবতে পারেনি মা এভাবে কথা বলবে। আমার দিকে ভয়ে ভয়ে তাকিয়ে ঘরে ঢুকে কী বলবে বুঝতে না পেরে বলল, ‘খুব বাজে হল। ভাবতে পারছি না’।
মা বলল, ‘বয়স হয়েছিল। একদিকে ভালোই হয়েছে। যা হয় ভালোর জন্যই হয়’।
তখনও জানি না বাবার সর্বনাশ হয়ে গেছে। ব্যবসার লাভের যা টাকা-পয়সা ছিল, সব চিটফান্ডে রেখেছিল। চিটফান্ডের ছেলেটা এখন আর ফোন ধরছে না। বাবা মাথা নেড়ে বলেছিল, ‘তাই হবে’।
এই ঘটনার পরে আমার আর তেমন কোনও অসুবিধা রইল না। আমি নিজের মতো বড় হতে লাগলাম। এক রবিবারে দেখলাম বাবা আমাদের বাড়ির সামনে ঘুর ঘুর করছে। মা বলল, ‘আমার ব্যাগে কিছু টাকা আছে। তোর বাবাকে দিয়ে আয় তো’।
আমি দিতে গেলাম। বাবা টাকাটা নিয়ে বিহ্বল হয়ে বলল, ‘তোর মা দিয়েছে?’
আমি বললাম, ‘হ্যাঁ’।
বাবা অবিশ্বাসী চোখে সেটা নিয়ে চলে গেল। মাকে গিয়ে জিগ্যেস করলাম, ‘বাবা টাকা নিতে এসেছিল?’
মা বলল, ‘হ্যাঁ। তুই একটা কাজ করবি তো, আমি মাইনে পেলে তোকে হাজার পাঁচেক টাকা দেবো। প্রতি মাসে গিয়ে ও বাড়িতে দিয়ে আসবি’।
আমি রেগে গেলাম, ‘কেন? টাকা দেবে কেন? তার থেকে তো এ বাড়িতেই আসতে বলতে পারতে!’
মা ক্লান্ত মুখে বলত, ‘বুঝবি না’।
সত্যিই আমি বুঝিনি। কিন্তু আমি যেতাম। আমার নতুন মা আমাকে দেখলে কী করবে বুঝতে পারত না।
‘নীপা, আগে বলবি তো, কেক বানিয়েছিলাম। ইশ, সব শেষ হয়ে গেল। কী বানাব বল?’
আমি খাটে বসে পা দোলাতে দোলাতে ফরমাইশ করতাম। নতুন মা একবারে হৈ চৈ করে সেসব রান্না করা শুরু করত। অনেক রাতে বাড়ি ফিরে দেখতাম মা ভাবলেশহীন মুখে বাইরের ঘরে বসে আছে। আমি ঢুকলে বলত, ‘হাত মুখ ধুয়ে ঘুমা’।
আর কোনও কথা বলত না। কোনও কৌতূহল দেখাত না। আমার মনে অপরাধবোধ জন্মাত। আবার লোভও লাগত ও বাড়ি যাবার। আমার তো বাবা। বাবাকে দেখব না? পরের দিন গিয়ে দেখতাম বাবা শুকনো মুখে বসে আছে। আমাকে দেখে খুশি হত। সে খুশিতে কোনও খাদ নেই।
বাবার সে হাসি দেখে আমার অদ্ভুত একটা কষ্ট হত। সে কষ্টের কোনও সীমা পরিসীমা নেই। মনে হত আমার বাবা কিছুতেই খারাপ হতে পারে না। শুধু একটা সম্পর্ক ছেড়ে চলে গেলেই কি মানুষ খারাপ হতে পারে?
বাবা কাঁদত। আমাকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদত। আমি চুপ করে বসে থাকতাম। নতুন মা দরজায় দাঁড়িয়ে দেখত। একদিন বাবা ছিল না। আমি গেছি। নতুন মা বলল, ‘নীপা, আমি খুব বড় একটা ভুল করে ফেলেছি রে। আমি বুঝি। তোর বাবাও বোঝে। আমাদের কিছু করার নেই। তুই আমাকে ক্ষমা করে দিবি মা?’
আমার মনে পড়ল, মা কীভাবে সেদিন বসে ছিল বাইরের ঘরে। আমি নতুন মার কথার উত্তর দিতে পারলাম না। কিন্তু ঠিক করলাম এ বাড়িতে আমি আর আসব না। এ বাড়িতে এলে আমি পাগল হয়ে যাব একদিন।
মাকে রাতে সে কথা বললাম। তবে সবটা বললাম না।
মা ঘাড় নাড়ল, ‘ঠিক আছে। তোকে যেতে হবে না। আমি স্কুলের তপনকে বলে দেব, ও দিয়ে আসবে’।
আমার কষ্ট হত, তবু আমি নিজেকে আটকে রাখতে পেরেছিলাম।
বাংলা সিরিয়ালের মতো কেচ্ছার পাশাপাশি আমার জীবনে একটা নতুন ঘটনা ঘটল।
একটা বিয়ের সম্বন্ধ এল। বাজারে গেছিলাম, পাশের পাড়ার কোন মহিলা দেখেছে, তার ছেলে সবে চাকরি পেয়েছে। আমার নাম ধাম জেনে মার কাছে এসে বিয়ের কথা পেড়ে বসল।
এত তাড়াতাড়ি বিয়ে? মা বলল, ‘দেখতে তো আপত্তি নেই। কথা বল’।
মা যেহেতু বলেছে, আমি কিছু ভাবলামই না। রাজি হলাম। ছেলেপক্ষ এল। ইনিয়ে বিনিয়ে বোঝাল বাবা অন্য মহিলার সঙ্গে পালালেও ওরা আধুনিক, ওদের কোনও সমস্যা নেই। বিয়ের ক্ষেত্রে ওসব দেখার কোনও মানেই নেই।
ছেলে আমার সঙ্গে আমার ঘরে গিয়ে বলল, ‘তোমার আমার প্রতি কেমন এক্সপেকটেশন আছে?’
আমি বললাম, ‘আমার বাবার মতো অন্য মেয়ের সঙ্গে পালাতে পারবেন?’
খুব হাসল। জিগ্যেস করল, ‘আর?’
আমি একটা অদ্ভুত শর্ত রাখলাম। ছেলেটা সে শর্ত শুনে গম্ভীর হয়ে গেল।
ভেবেছিলাম বিয়েটা ভেঙে যাবে। ছেলেটা বাড়ি গিয়ে বলল, বিয়ে করলে আমাকেই করবে। নয়তো করবে না।
৩
শীতের সকাল। আমি কম্বল দিয়ে তাঁবু বানিয়ে তার ভেতর সেঁধিয়ে আছি। মা স্কুলের জন্য রেডি হচ্ছিল। হঠাৎ আমার কাছে এসে বসল। কথা বলছে না। চুপ করে বসে আছে। আমি বললাম, ‘কিছু বলবে?’
মা বলল, ‘তুই কি বিয়ে করবি এখনই?’
আমি বললাম, ‘জানি না। আমি কিছুই বুঝতে পারছি না’।
মা বলল, ‘বাবাকে একবার জিগ্যেস করিস’।
আমি বললাম, ‘ঠিক আছে। জিগ্যেস করে নেব’।
মা উঠে গেল। আমায় কলেজ যেতে হবে। মা যাবার পর আমি রওনা হই। রিকশায় যায় মা। বেরিয়ে যাবার মিনিট পাঁচেকের মধ্যে কলিং বেল বাজল।
হিমাংশু এসেছে।
আমি দরজা খুলে ওকে দেখে বললাম, ‘মা বেরিয়ে গেল তো?’
হিমাংশু বলল, ‘তোমার শর্ত আমি মেনে নিলাম। তুমি তো আর কিছু জানালে না তারপর?’
আমি বললাম, ‘জানাব। কিন্তু আপনি এভাবে আমাদের বাড়িতে এলে সমস্যা আছে। এখন যান’।
হিমাংশু বলল, ‘আমি ঠিক করেছি তোমাকেই বিয়ে করব। নইলে করব না’।
আমি বললাম, ‘কেন? আমি তো কারো থেকে আলাদা না। সবাই যেমন, আমিও তেমন। আপনি খুঁজুন। অনেক মেয়ে আছে। তাছাড়া আমার বাবা পালিয়ে গেছিল জানেনই তো’।
হিমাংশু বলল, ‘কতবার বলবে এক কথা? আমি জানি। ওটার সঙ্গে তোমার তো কোনও সম্পর্ক নেই। তুমি আমাকে বিয়ে করবে। আমরা সংসার গড়ব’।
আমি বললাম, ‘ঠিক আছে। আমি জানাব’।
হিমাংশু বলল, ‘ভেতরে আসতে পারি?’
আমি মাথা নাড়লাম, ‘না। বাড়িতে কেউ নেই। আমি কলেজ যাব’।
হিমাংশু কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে চলে গেল।
আমার বুক ধড়ফড় করছিল। আমি তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে বেরলাম। কিছুতেই বুঝতে পারলাম না, ছেলেটা আমার মধ্যে কী দেখল।
কলেজে গিয়েও একটা প্রপোজাল পেলাম। এটাই হয়। কেউ পাচ্ছে না, পাচ্ছে না। একটা প্রপোজাল আসার পর ঢেউয়ের মতো প্রপোজাল আসতে থাকে।
অরিত্র বলে একটা ছেলে আমার হাতে একটা চিঠি গুঁজে দিল। তাতে বেশ ভালো হাতের লেখায় লেখা,
‘নীপবন,
তোমাকে যেদিন থেকে দেখেছি, আমি রাতে ঘুমাতে পারি না। সারাক্ষণ তোমাকে স্বপ্নে দেখি। স্বপ্নের মধ্যে আমি আর তুমি হাঁটতে হাঁটতে কোনও একটা নদীর তীরে বসে থাকি। একদিন না, প্রতিদিন ভোরবেলায় এই স্বপ্ন দেখি। আমার ভোরের স্বপ্ন সত্যি করবে প্লিজ?’
চিঠিটা পড়ে আমি বেশ ঘাবড়ে গেলাম। আমাকে নিয়ে নদীর তীরে বসে থাকবে কেন? আমি কী করব নদীর তীরে? তাছাড়া আমি সাঁতার জানি না। ডুবে গেলে কে বাঁচাবে?
তরী আমার পাশে বসে। ও বলল, অরিত্র সবাইকেই এই চিঠিটা দিয়ে বেড়ায়। এখনও কেউ সাড়া দেয়নি। সমস্যা হল সবাইকে নিয়ে যদি অরিত্র নদীর তীরে বসে থাকতে চায় তাহলে কী হবে, সেটা কেউ জানে না।
চিঠিটা আমি রেখে দিলাম। প্রথম কেউ আমাকে এরকম কোনও চিঠি দিয়েছে। সেটা ফেলতে পারলাম না।
কলেজ থেকে ফেরার সময় অনেকদিন পরে ও বাড়ি গেলাম। বাবা ঘুমাচ্ছিল। নতুন মা চিড়েভাজা করে দিল। আমি খেতে খেতে কার্টুন দেখলাম। নতুন মা বলল, ‘বাবাকে ডেকে দেব?’
আমি বললাম, ‘থাক না। ঘুমাক। ঘুম থেকে উঠলে কথা বলব’।
নতুন মা আর কিছু বলল না। অপ্রস্তুত হচ্ছে বুঝতে পারি। নিজে নিজে কাজ বানিয়ে করতে লাগল। হঠাৎ ঘর দোর পরিষ্কার করতে শুরু করল। ঝুল ঝাড়ল। আরও কী সব করে যেতে থাকল।
বাবা আমাকে দেখে খুশি হল, ‘কীরে মা, কেমন আছিস?’
আমি বললাম, ‘মা পাঠিয়েছে। বলল একটা ব্যাপারে তোমাকে জিগ্যেস করে যেন সিদ্ধান্ত নিই’।
বাবা অবাক হল, ‘কী হয়েছে’?
আমি বললাম, ‘আমার সম্বন্ধ এসেছে। ছেলেটা আমাকে পছন্দ করেছে। বলছে বিয়ে করবে’।
বাবা হাঁ হয়ে গেল, ‘এত তাড়াতাড়ি তুই বিয়ে করবি?’
আমি বললাম, ‘জানি না! মা তো সে জন্যই তোমার কাছে পাঠিয়েছে’।
বাবা বলল, ‘আমি নিজেই তো জানি না। আমি কি সিদ্ধান্ত নিতে পারি? আমার নিজের কিছু ঠিক আছে? আমি কী বলব? তোর কী ইচ্ছা?’
আমি বললাম, ‘আমি জানি না। বুঝতেও পারছি না। আজ আবার একটা ছেলে আমাকে চিঠি দিয়েছে জানো বাবা? এই দেখো’।
আমি বাবাকে চিঠিটা দেখালাম। বাবা চিঠিটা পড়ে হেসে উঠল, ‘এগুলো কলেজে হয়। সে ঠিক আছে, কিন্তু বিয়ে? আচ্ছা দাঁড়া ভাবি’।
বাবা গালে হাত দিয়ে ফ্যানের দিকে তাকিয়ে রইল। ছোট থেকে দেখছি বাবা এরকম। ফ্যানের দিকে তাকিয়ে ভাবে। বাবা বাড়ি ছেড়ে যাবার আগে দেখতাম এরকমই ফ্যানের দিকে তাকিয়ে থাকত। আজও একইভাবে বসে রইল। আমি জানি না কতক্ষণ ধরে ভাববে।
রান্না ঘরে গিয়ে দেখলাম, নতুন মা মটরশুটি বাছতে বসেছে। আমিও বসে পড়লাম। নতুন মার চোখের তলায় কালি। রোগা হয়ে গেছে। শরীর ভালো না বোধ হয়। ওষুধের তো অনেক দাম। ডাক্তারের ভিজিটও বেশি। দেখে কেমন লাগল। হঠাৎ আমার কষ্ট হতে শুরু হল। এই কষ্টটা কোত্থেকে আসে জানি না। যখন আসে, তখন মন ভীষণ খারাপ হয়ে যায়। হাহাকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করে। মনে হয় বেঁচে থাকার কোনও মানে নেই। কেন বেঁচে আছি? কেউ ভালো নেই আমরা। কেউ না।
সন্ধে সাতটা নাগাদ বাবা তৈরি হয়ে এসে বলল, ‘চল। ও বাড়ি চল। তোর মার সঙ্গেও কথা বলা দরকার’।
আমি বললাম, ‘চলো’।
রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে বললাম, ‘নতুন মায়ের শরীর ঠিক নেই মনে হল। কিছু হয়েছে কি?’
বাবা অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে বলল, ‘প্রেগন্যান্ট’।
আমি থমকে দাঁড়ালাম। মনে হল কোনও গভীর রাতে কোনও ভয়াবহ গভীর জঙ্গলে আমি পথ হারিয়েছি। আমার সঙ্গে কেউ নেই।
কেউ না…
৪
বড়লোক দেখেছি। দোতলা বাড়ি। সব ঘরে বাথরুম। এসি। পারলে বাথরুমেও এসি থাকে।
হিমাংশুর মামা শুধু বড়লোক নন। ভয়াবহ ধরনের বড়লোক। বিরাট একটা গাড়িতে আমাদের বাড়ি এলেন।
রবিবার সকালে ঘুম থেকে উঠতে হল মার ডাকে। হিমাংশুর মামা আসবেন বলে আমাকে সকাল থেকে সাজতে হবে। ওদের বাড়ি থেকে নাকি ফোন এসেছে।
আমার বাবা মত দিয়ে গেছে বিয়ের ব্যাপারে। মা জিগ্যেস করেছিল, ‘মেয়ের বিয়ের ব্যাপারে কী মনে হয় তোমার?’
বাবা প্রতিবারই ভাবে মা প্রচুর কথা শোনাবে। চিৎকার চ্যাঁচামেচি করবে। তার পরিবর্তে মার এই নির্লিপ্ত কথা শুনে প্রতিবার আরও ঘাবড়ে যায়। গোটা রাস্তা আমার সঙ্গে কথা বলে গেল, এত তাড়াতাড়ি বিয়ে করা আসলে ঠিক না। মার প্রশ্নটা শুনে সব গুলিয়ে ফেলে বলল, ‘দিয়ে দিলেই ভালো। বিয়ে তো দিতেই হবে’।
মা ঘাড় নাড়ল, ‘ঠিক আছে’।
বাবা উঠে প্রায় পালিয়ে গেল। মা আমাকে বলল, ‘তোর বাবা রাজি। আর ভাবছি না। তুই কি কিছু ভাবলি?’
আমি কী বলব? আমার সেই অনুভূতিটাও নেই যে কিছু বলার দরকার। আমি মাথা নাড়লাম, ‘তোমরা যা ঠিক করবে। মা জানো, নতুন মা প্রেগন্যান্ট’।
মা শুনল না যেন, ‘ভালো, তুই খেতে বস। রুটি ঠান্ডা হয়ে যাবে’।
এ নিয়ে আর কোনও কথা হল না। আমারই দোষ, আমি অকারণে বলতে গেছিলাম।
হিমাংশুর মামা গায়ে প্রচুর পারফিউম দেন। বেশ মোটা। ঘরে ঢুকে সোফায় বসে পড়লেন।
হিমাংশু লাজুক মুখে করে মামার পাশে বসল।
মামা এত বড় একটা সোনার নেকলেস নিয়ে বসে আছেন। আমি প্রণাম করতে এগোলাম। মামা আমার পিঠে ব্লাউজের ফাঁকা অংশে হাত বুলিয়ে বললেন, ‘দীর্ঘায়ু হও’।
আমার গা ঘিন ঘিন করল। সরে গেলাম। মামা বললেন, ‘হিমাংশু, বউ সুন্দর হয়েছে। এমন বউই দরকার, যাকে রাস্তায় নিয়ে বেরোলে পাবলিক সিটি মারবে। তোর বউকে দেখে আমারই সিটি মারতে ইচ্ছে করছে’।
মা গোটা ব্যাপারটাই দেখল। মামাকে বলল, ‘আপনি কি এখানেই থাকেন?’
মামা বললেন, ‘না, আমি নাসিকে থাকি। এখানে না’।
মা বলল, ‘তাও ভালো’।
মামা সেটা বুঝলেন না। বুঝলে রাগ করতেন হয়তো। বললেন, ‘বিয়েটা তাড়াতাড়ি দিয়ে দেওয়াই ভালো। আমাদের ছেলে তো পাগল হয়ে গেছে বিয়ে করবে বলে। আমার ভাগ্নে যে এত বিয়ে পাগলা আগে বুঝিনি’।
মা বলল, ‘ঠিক আছে। কথা চলছে। একটা ডেট ফাইনাল করা হবে খুব তাড়াতাড়ি’।
মামা বললেন, ‘সামনের মাসেই একটা ভালো ডেট আছে। দেখুন, আমি বাইরে চলে যাব। তার আগে বিয়েটা হয়ে গেলেই ভালো। আশা করি আপনি আপত্তি করবেন না। বিয়ের ব্যাপার, যত আগে হয়, তত ভালো। ফেলে রাখার মানে নেই। আর যা যা অ্যারেঞ্জমেন্ট দরকার হবে, ও আমরা দেখে নেব। তাই তো হিমু?’
হিমাংশু আমার দিকে তাকিয়ে আছে নির্লজ্জের মতো। মামার কথা শুনে বড় করে মাথা নাড়ল। মামা বললেন, ‘এখন থেকেই বউয়ের ন্যাওটা হয়ে গেছিস। বিয়ের পর কী হবি কে জানে। দিদির কথা ভেবে খারাপ লাগছে। তুমি কি খুব রাগী?’
মা বলল, ‘না। আমার মেয়ে রাগী না। আপনার দিদির কোনও অসুবিধা হবে বলে মনে হয় না’।
আমি মনে মনে বললাম, তবে আপনার দিদি বাড়াবাড়ি করলে কী করতে হবে সেটা আমি ভালো করেই জানি।
মামা জোরে হেসে উঠলেন, ‘আহা দিদি, আপনি রেগে গেলেন বোধ হয়। আমি একটু ভাগ্নের টাং খিচাই করছি। সেটা তো সারাক্ষণই করি। ভাগ্নে আমার বড় হয়নি। এত ভালো পড়াশুনায়, কিন্তু আপনার মেয়েকে দেখে একবারে পেগলে গেছে। আমাকে ফোন করে বলেছে বিয়েটা যত তাড়াতাড়ি হয় তার ব্যবস্থা করতে। আমি তো একবারে টাকার ব্যাগ নিয়ে চলে এসেছি’।
মা বলল, ‘ঠিক আছে। মেয়ের বাবার সঙ্গে দেখা করবেন আপনি?’
মামা হকচকিয়ে গিয়ে হিমাংশুর দিকে তাকালেন। পরক্ষণে সামলে নিয়ে বললেন, ‘না না। আমি কারো সঙ্গে কথা বলব না। বিয়েটাই বড় কথা’।
এর পরের কয়েকটা দিন ঝড়ের মতো গেল। আমি যেন নিজের মধ্যেই ছিলাম না।
হুঁশ ফিরল ফুলশয্যার রাতে।
